সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জাদুকর আর ঘোড়াগুলো

 -------------------------

শহরের শেষ মাথায় নিঝুম  বাড়িটায় থাকতো এক  জাদুকর ।

তেমন একটা মিশুক  ধরনের লোক ছিল না সে ।

একা একাই থাকতো ।  এমন কি,   মোড়ের চায়ের দোকানে  তাকে  বসে কোনদিন এক পেয়ালা চা পান করতে  দেখেনি কেউ ।

 সপ্তাহে একদিন অবশ্য বাজার করতে বের হত,   হাতে পাটের থলে নিয়ে ।

 সে    বাড়ি থেকে  বের হয়েছে ,   সেটা সবাই বুঝতে পারত ।  কারন জাদুকরের মাথার টুপির মধ্যে তিনটে  পিতলের ঘণ্টা ছিল । বাতাসে কেমন টুং টাং করে বেজে উঠতো ।জাদুকরের গায়ে রঙ্গিন ছাপরাঅয়ালা  জামা ।  অনেকগুলো রঙ্গিন টুকরো  কাপড় যোগার করে তালি দিয়ে অমন ফতুয়া মার্কা জামা বানিয়ে নিয়েছে সে।

মাথায় তিনকোনা টুপি । সেটা অবশ্য কালো কুচকুচে ।

পায়ে চুমকির কাজ করা নাগরা । অনেকটা হোজ্জা  নাসিরুদ্দিন যেমন পরে ।

জাদুকরের মাথায় চুল বেশ লম্বা । মুখে  শনপাপড়ির   মত দাড়ি ।   

অনেকে বলে লোকটা দুষ্ট জাদুকর । তেমন কোন প্রমাণ নেই । কারন সারাক্ষণ বাড়ির ভেতরেই থাকতো সে ।

ফেরিওয়ালার কাছ থেকে পুরানো শিশি বোতল কেনার জন্য নিচে নেমে আসতো । ডজন হিসাবে সেই শিশি বয়াম কিনে বাড়ির তাক ভর্তি করে রেখে দিত ।

তারপর পুরানো বই দেখে দেখে হরেক পদের পাঁচন বানাত । এই পাঁচন  বানানোর কাঁচামাল কেনার জন্য সপ্তাহে একদিন বেগমগঞ্জ বাজারে যায় সে । হাবিজাবি অনেক কিছুই কিনে আনে । যেমন-  ন্ধব লবণ , তিলের তেল  , শুকনো  ধুন্ধুল, হিং   

 বাকি জিনিসগুলো  আমি  চিনি না । তাই নাম  বলতে  পারলাম না ।

গরমের দুপুরে বাড়ির ছাদে নানান জিনিস রোদে শুঁকাতে দিত   ।

 যেমন -    গোরস্তানের মাটি ,  ড্রাগনের দাঁত ,  মড়া মানুষের হাড়গোর  - সেইগুলো আবার আঁটি করে বাঁধা,  শাকের আঁটির মত  ।   শিশি ভর্তি   বাদুড়ের   দূষিত রক্ত  ।  কালো বিড়ালের পশম  ।  বাঁদরের নখ ।

গ্রাম থেকে লোকজন আসতো জাদুকরের সাথে দেখা  করার জন্য । মাথায় করে একটা পাকা কাঁঠাল বা একফানা কলা নিয়ে আসতো । ফানা শব্দের অর্থ জানি না। কয় কলায় এক ফানা হবে বলতে পারব না । তবে কাঁঠালে পাকা ঘ্রাণে নীল ডুমো মাছি বিনবিন করতো । সেটা পরিষ্কার দেখতে পেতাম ।

গ্রামের লোকজন তাকে ভাড়া করে নিয়ে যেত । বৃষ্টি নামানোর জন্য । বা আখের লালপচা রোগের ওষুধ দেয়ার জন্য ।   

জাদুকরের বাড়ির পাশেই ছিল একটা পেল্লাই মাঠ । তকতকে সবুজ ঘাস ভর্তি । সেই মাঠে রাতের বেলা ঘাস খেতে আসতো এক পাল ঘোড়া ।  শাদা ,  হলুদ , নীল , বেগুনি অনেক বিচিত্র রঙের সেই ঘোড়াগুলো ।

বিশেষ করে কার্ত্তিক মাসের পুরো মাসটা   সেই মাঠে ঘোড়া চড়ে বেড়াতো ।

সেই মাঠেই রাতের বেলা গোল্লা গোল্লা চোখের মোটা মত এক কবি বসে কবিতা লিখেছিল একবার । উনার মতে এইসব ঘোড়াগুলোর কোন মালিক নেই । সেই গুহাযুগের ঘোড়া ।  জোছনা রাতে ওরা ঘাস খাওয়ার জন্য নেমে আসে আকাশ থেকে ।

মাঝে মাঝে কেমন চিহি করে ডেকে উঠত ঘোড়াগুলো ।   ঘোড়ার ডাককে  বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে  লেখা আছে -  হ্রেষা । পড়াশোনা যাতে কঠিন লাগে সেইজন্য আর কি।

ঘোড়ার ডাকে বেশ বিরক্ত হত জাদুকর ।

 উনার ঘুমের সমস্যা আছে ।  ঘুমের সমস্যা মেটানোর জন্য  প্রচুর গিমা শাক আর মৌশিম ভর্তা খায় দুইবেলা । লাভ তেমন হয় না । জাদুকর একবার  নওয়াব বাড়ির হাটেও গিয়েছিল । ওখানে নাকি ঘুম কিনতে পাওয়া যায় । পাওয়া যায়নি । আগে নাকি এক লোক বিক্রি করতো । সেই লোক কলকাতা চলে গেছে ।

ঘুম ভাঙ্গার পর জানালার ধারে গিয়ে বসে ঘোড়াগুলোকে  বকাঝকা দিত জাদুকর । ওতেও লাভ হত না ।

শেষে এক রাতে রেগে গিয়ে  টুপির তলা থেকে জাদুর লাঠিটা বের করে হিং টিং মন্ত্র বলে এক বালতি পাঁচন ছুড়ে দিল ঘোড়াদের উপর ।

সেই থেকে আর কোন ভরা জোছনা রাতে ঘোড়াগুলো নেমে আসতো না মাঠে ।

ওরা হারিয়ে গেল ।

তবে শহরের শেষ মাথায় যে ছোট্ট ঘাসের পুকুর ছিল সেটা মধ্যে গিজগিজ করে ঘুরে বেড়াতো একগাদা ঘোড়া মাছ । সি হর্স যাকে বলে।

গরমের বিকেলগুলোতে  যখন পুকুরের জল কমে যায়,   তখন   লোকজন দেখতে পেত জলজ ঘাসের তলায় লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করে বেড়াচ্ছে  বাহারি একগাদা ঘোড়া মাছ ।  একটা ঘোড়ার উপর বসে আছে   হাসি খুশি চেহারার একজন মানুষ  ।

 সেই কবি     ।   

  যে ঘোড়া পছন্দ করতো ।

 লোকজন টিনের বালতি আর কাচের বয়ামে করে সেই ঘোড়া মাছ ছড়িয়ে দিয়েছে দুনিয়ার সব সাগর আর মহাসাগরে ।

তোমরা চাইলে আমার সাথে গিয়ে সেই জাদুকরের বাড়ি আর ঘোড়া মাছ ভর্তি ঘাসের পুকুরটা দেখে আসতে পারো ।

পরীক্ষা শেষ হলে যাবে ?


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...