-------------------------
শহরের শেষ মাথায় নিঝুম বাড়িটায় থাকতো এক জাদুকর ।
তেমন একটা মিশুক ধরনের লোক ছিল না সে ।
একা একাই থাকতো । এমন কি, মোড়ের চায়ের দোকানে তাকে বসে কোনদিন এক পেয়ালা চা পান করতে দেখেনি কেউ ।
সপ্তাহে একদিন অবশ্য বাজার করতে বের হত, হাতে পাটের থলে নিয়ে ।
সে বাড়ি থেকে বের হয়েছে , সেটা সবাই বুঝতে পারত । কারন জাদুকরের মাথার টুপির মধ্যে তিনটে পিতলের ঘণ্টা ছিল । বাতাসে কেমন টুং টাং করে বেজে উঠতো ।জাদুকরের গায়ে রঙ্গিন ছাপরাঅয়ালা জামা । অনেকগুলো রঙ্গিন টুকরো কাপড় যোগার করে তালি দিয়ে অমন ফতুয়া মার্কা জামা বানিয়ে নিয়েছে সে।
মাথায় তিনকোনা টুপি । সেটা অবশ্য কালো কুচকুচে ।
পায়ে চুমকির কাজ করা নাগরা । অনেকটা হোজ্জা নাসিরুদ্দিন যেমন পরে ।
জাদুকরের মাথায় চুল বেশ লম্বা । মুখে শনপাপড়ির মত দাড়ি ।
অনেকে বলে লোকটা দুষ্ট জাদুকর । তেমন কোন প্রমাণ নেই । কারন সারাক্ষণ বাড়ির ভেতরেই থাকতো সে ।
ফেরিওয়ালার কাছ থেকে পুরানো শিশি বোতল কেনার জন্য নিচে নেমে আসতো । ডজন হিসাবে সেই শিশি বয়াম কিনে বাড়ির তাক ভর্তি করে রেখে দিত ।
তারপর পুরানো বই দেখে দেখে হরেক পদের পাঁচন বানাত । এই পাঁচন বানানোর কাঁচামাল কেনার জন্য সপ্তাহে একদিন বেগমগঞ্জ বাজারে যায় সে । হাবিজাবি অনেক কিছুই কিনে আনে । যেমন- সৈন্ধব লবণ , তিলের তেল , শুকনো ধুন্ধুল, হিং ।
বাকি জিনিসগুলো আমি চিনি না । তাই নাম বলতে পারলাম না ।
গরমের দুপুরে বাড়ির ছাদে নানান জিনিস রোদে শুঁকাতে দিত ।
যেমন - গোরস্তানের মাটি , ড্রাগনের দাঁত , মড়া মানুষের হাড়গোর - সেইগুলো আবার আঁটি করে বাঁধা, শাকের আঁটির মত । শিশি ভর্তি বাদুড়ের দূষিত রক্ত । কালো বিড়ালের পশম । বাঁদরের নখ ।
গ্রাম থেকে লোকজন আসতো জাদুকরের সাথে দেখা করার জন্য । মাথায় করে একটা পাকা কাঁঠাল বা একফানা কলা নিয়ে আসতো । ফানা শব্দের অর্থ জানি না। কয় কলায় এক ফানা হবে বলতে পারব না । তবে কাঁঠালে পাকা ঘ্রাণে নীল ডুমো মাছি বিনবিন করতো । সেটা পরিষ্কার দেখতে পেতাম ।
গ্রামের লোকজন তাকে ভাড়া করে নিয়ে যেত । বৃষ্টি নামানোর জন্য । বা আখের লালপচা রোগের ওষুধ দেয়ার জন্য ।
জাদুকরের বাড়ির পাশেই ছিল একটা পেল্লাই মাঠ । তকতকে সবুজ ঘাস ভর্তি । সেই মাঠে রাতের বেলা ঘাস খেতে আসতো এক পাল ঘোড়া । শাদা , হলুদ , নীল , বেগুনি অনেক বিচিত্র রঙের সেই ঘোড়াগুলো ।
বিশেষ করে কার্ত্তিক মাসের পুরো মাসটা সেই মাঠে ঘোড়া চড়ে বেড়াতো ।
সেই মাঠেই রাতের বেলা গোল্লা গোল্লা চোখের মোটা মত এক কবি বসে কবিতা লিখেছিল একবার । উনার মতে এইসব ঘোড়াগুলোর কোন মালিক নেই । সেই গুহাযুগের ঘোড়া । জোছনা রাতে ওরা ঘাস খাওয়ার জন্য নেমে আসে আকাশ থেকে ।
মাঝে মাঝে কেমন চিহি করে ডেকে উঠত ঘোড়াগুলো । ঘোড়ার ডাককে বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে লেখা আছে - হ্রেষা । পড়াশোনা যাতে কঠিন লাগে সেইজন্য আর কি।
ঘোড়ার ডাকে বেশ বিরক্ত হত জাদুকর ।
উনার ঘুমের সমস্যা আছে । ঘুমের সমস্যা মেটানোর জন্য প্রচুর গিমা শাক আর মৌশিম ভর্তা খায় দুইবেলা । লাভ তেমন হয় না । জাদুকর একবার নওয়াব বাড়ির হাটেও গিয়েছিল । ওখানে নাকি ঘুম কিনতে পাওয়া যায় । পাওয়া যায়নি । আগে নাকি এক লোক বিক্রি করতো । সেই লোক কলকাতা চলে গেছে ।
ঘুম ভাঙ্গার পর জানালার ধারে গিয়ে বসে ঘোড়াগুলোকে বকাঝকা দিত জাদুকর । ওতেও লাভ হত না ।
শেষে এক রাতে রেগে গিয়ে টুপির তলা থেকে জাদুর লাঠিটা বের করে হিং টিং মন্ত্র বলে এক বালতি পাঁচন ছুড়ে দিল ঘোড়াদের উপর ।
সেই থেকে আর কোন ভরা জোছনা রাতে ঘোড়াগুলো নেমে আসতো না মাঠে ।
ওরা হারিয়ে গেল ।
তবে শহরের শেষ মাথায় যে ছোট্ট ঘাসের পুকুর ছিল সেটা মধ্যে গিজগিজ করে ঘুরে বেড়াতো একগাদা ঘোড়া মাছ । সি হর্স যাকে বলে।
গরমের বিকেলগুলোতে যখন পুকুরের জল কমে যায়, তখন লোকজন দেখতে পেত জলজ ঘাসের তলায় লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করে বেড়াচ্ছে বাহারি একগাদা ঘোড়া মাছ । একটা ঘোড়ার উপর বসে আছে হাসি খুশি চেহারার একজন মানুষ ।
সেই কবি ।
যে ঘোড়া পছন্দ করতো ।
লোকজন টিনের বালতি আর কাচের বয়ামে করে সেই ঘোড়া মাছ ছড়িয়ে দিয়েছে দুনিয়ার সব সাগর আর মহাসাগরে ।
তোমরা চাইলে আমার সাথে গিয়ে সেই জাদুকরের বাড়ি আর ঘোড়া মাছ ভর্তি ঘাসের পুকুরটা দেখে আসতে পারো ।
পরীক্ষা শেষ হলে যাবে ?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন