আফ্রিকা সব দিক দিয়েই কেমন যেন একটা অশুভ দেশ।
সেই ভিক্টোরিয়ান যুগ থেকেই অন্ধকার মহাদেশ হিসাবে নাম কামিয়েছে ।
বদনামের ভাগ কমাতে পারেনি বেচারা । আজও ।
যদিও আফ্রিকাতে আধুনিক শহরের অভাব নেই। রেললাইন, পাথরের ব্লক বিছানো সুন্দর চওড়া পথ , ককটেল বার , অন্য সব অতিরিক্ত জিনিসপত্র - সভ্য মানুষদের যা যা দরকার হয় , সবই আছে ।
তাতেও কোন ফায়দা হয়নি । আফ্রিকা আজও তার আগের বদনাম ধরে রেখেছে।
বিশেষ করে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল এলাকাটা এত বেশি বদনাম কামিয়েছিল, সবাই জায়গাটাকে ‘ সাদা মানুষের গোরস্থান ’ নামে ডাকতো। এত সব গল্পগাঁথা ছড়িয়ে আছে বলার মত না।
কাঁটা ঝোপ ভর্তি বড় বড় সব জঙ্গলের দেয়াল । আড়ালে ঘাপটি মেরে আছে সাপ আর ভয়াল সব জানোয়ার। সুযোগ পেলেই তোমার উপর লাফিয়ে পড়বে। জ্বলজ্বলে চোখের চিতা, হিশহিশ করা সাপ। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া কুমির যেগুলো দেখলে নিরীহ মরা গাছের গুড়ি ছাড়া অন্য কিছুই মনে হবে না। এদের থাবা থেকে কোনভাবে বেঁচে গেলেও গিয়ে পড়বে আদিবাসিদের হাতে।
আদিবাসি আবার দুই প্রকার। রাক্ষস আদিবাসি আর নন- রাক্ষস আদিবাসী ।
ওরা যদি রাক্ষস মানে নরমাংসভোজী হয় , ওদের হাতে বর্শা থাকবে। আর যদি নরমাংসভোজী না হয় তবে হাতে তীর ধনুক থাকবে। আবার সেই তীরের ফলা বিচ্ছিরি নাম না জানা বিষে মাখা মাখা থাকবে। কেমন করে সেই বিষ বানায় , আধুনিক বিজ্ঞান কিছুতেই ব্যাখ্যা করতে পারবে না।
আজগুবি সব বর্ণনা দিয়ে ভর্তি। এর চেয়ে ভাল কিছু কল্পনার কোন সুযোগ নেই।
যারা ইহ জিন্দেগিতে এই ওয়েস্ট কোস্ট এলাকাতে যায়নি তারাই বিচ্ছিরি সব গালগল্প ছড়াত। আর এই সব কাহিনি শুনেই জেরাল্ড ডুরেলের মন কেঁপে উঠত ।
১৯২৫ সালে ভারতের জামসেদপুরে ডুরেলের জন্ম। প্রকৃতিবিদ। জীবজন্তু নিয়ে গবেষণা করেন। চিড়িয়াখানার জন্য জীবজন্তু ধরাই তার কাজ। নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন একগাদা বই। ড্রাংকেন ফরেস্ট। মাই ফ্যামিলি অ্যান্ড আদার আনিম্যালস। এ যু ইন মাই পকেট।
সবই বেস্ট সেলার।
ট্রপিক্যাল অরন্যে বহুবার গেছেন ডুরেল। জ্যান্ত জীবজন্তু ধরা যখন ভদ্রলোকের পেশা, বাধ্য হয়েই গহীন আর ঘন নিবিড় জঙ্গলের ভেতরে যেতে হয় ওদের খোঁজে। আর জীবজন্তুগুলো কিন্তু পায়ে হেঁটে হেঁটে তোমার সামনে হাজির হবে না।
ট্রপিক্যাল অরন্যে অনন্য সুলভ লক্ষণীয় বিচিত্র প্রাণী খুব একটা পাওয়া যায় না। সারাদিন হেঁটে হয়তো মাত্র একটা বিতিকিচ্ছিরি পাখি বা প্রজাপতি দেখা যেতে পারে ।
ব্যস। বেশি কিছু আশা করাটাই হবে ভুল।
জীবজন্তু যে একেবারে নেই অমনটাও না। কিন্তু , ওরা আশ্চর্য চালাকির সাথে তোমাকে এড়িয়ে যাবে। ওদের ধরতে হলে তোমাকে জানতে হবে, ঠিক কোথায় ওদের খোঁজ নিতে হবে।
এখানে বলা দরকার, একবার ডুরেল ছয় মাস ক্যামেরুনের জঙ্গলে জানোয়ার ধরেছিলেন। এই ছয়মাসে তার সংগ্রহে জমা হয়েছিল দেড়শ বিভিন্ন জাতের স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, এবং সাপখোপ।
ওই এলাকায় এক ভদ্রলোক পঁচিশ বছর ধরে বসবাস করতেন। তিনি ডুরেলের সংগ্রহ দেখে তম্বা মেরে গেলেন। জানতেনই না তার এলাকায়, দরজার গোঁড়ায় এত হরেক প্রজাতির জীবজন্তু রয়ে গেছে।
উনি নাকি জীবনেও এইসব দেখেননি ।
পশ্চিম আফ্রিকায় ইংরেজি চলে।
চাইনিজরা যেমন হাস্যকর উচ্চারনে ইংরেজি বলে, তেমন।অরণ্যকে এরা বলে - বুশ। এই বুশ আবার দুই ধরনের। গ্রাম বা শহরের চারিদিকে ঘিরে এক ধরনের অরণ্য থাকে। শিকারিরা সহজে যেতে পারে । অমন কিছু জায়গায় অবৈধ ভাবে চাষাবাদ করা হয়। তবে এখানে তেমন কোন জীবজন্তু সহজে চোখে পড়ে না।
আরেক ধরনের অরণ্যকে ব্ল্যাক বুশ বলে।কালো অরণ্য । একদম হাতের কাছের গ্রাম থেকেও এইসব জঙ্গল মাইল মাইল দূরে। হাতেগোনা কিছু শিকারি যায় সেখানে , কখনও কখনও।
ওখানে গিয়ে তুমি যদি শুনশান হয়ে বসে অপেক্ষা কর , তাহলেই বুনো জানোয়ারের দেখা পাবে।
এখন জানোয়ার ধরা মানেই এই না , ফাঁদগুলো তুমি জঙ্গলের নানান জায়গায় হারকে মারকে ফেলে রাখবে। আর ওরা সোজা এসে টুপ করে ধরা পড়বে।
আপাতত মনে হতে পারে জানোয়ারগুলো এলোমেলো চলাফেরা করে। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবে ওদের প্রায় সবাই এক- একটা ছক মেনে চলে। নির্দিষ্ট পথে চলাচল করে সারা বছর ধরে। খাবারের লোভে, নিদিষ্ট সময় নিদিষ্ট জায়গায় ওরা হাজির হয় ।যেখানে খাবার পাওয়া যাবে সেখানেই যাবে ।
আবার খাবারের স্বল্পতা দেখলেও গায়েব হয়ে যাবে ওরা। জলের জন্যও এক জায়গায় যায় বারবার। বাসার কাছাকাছি কোন একটা জায়গা ধোলাইখানা হিসাবে ব্যবহার করে। ধোলাইখানা বলতে আমি টয়লেট করার কথা বুঝিয়েছি।
তুমি চাইলে, ঘন বনের ভেতরে ফাঁদ পাততে পারো ।
লাভ কিছু হবে না।
জানোয়ারদের চলাচলের পথের ডানে বা বামে কয়েক গজ দূরে ফাঁদ পেতে রাখলেই ওদের ধরতে পারবে।তবে ফাঁদ পাতার আগে একটু সময় নিয়ে সতর্ক ভাবে জায়গাটা জরিপ করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে চলাফেরার জন্য কোন পথ ওরা বেশি ব্যবহার করে। গাছের ডালাপালা নাকি বনের মাটি ?
বুনোফল পেকে গেছে কোনখানে ? কোন গর্তগুলো নিশাচর প্রাণীগুলো দিনের বেলা বেডরুম হিসাবে ব্যবহার করে ?
ডুরেল যখন পশ্চিম আফ্রিকায় ছিলেন তখন অনেকটা সময় এই ব্ল্যাক বুশ বা নিঝুম অরন্যে সময় কাটিয়েছিলেন । বনের প্রাণীদের দিকে নজর রাখতেন। ওদের অভ্যাস- হাবভাব জানার চেষ্টা করতেন। যাতে সহজেই ওদের ধরতে পারেন ।
টানা তিন সপ্তাহ ক্যামেরুনের জঙ্গল জরিপ করলেন ডুরেল।
এই বনের ভেতরের হর হামেশাই নরম ঝুরঝুরে মাটি পাওয়া যায় । অমন মাটিতে বড় বড় গাছ শেকড় আঁকরে ধরে দাঁড়াতে পারে না। নরম গুল্ম আর ঝোপঝাড় ধরনের গাছপালা এই জায়গাগুলোতে সুন্দর করে নিজেরদের আস্তানা বানিয়ে ফেলে। পাতলা আবরণের মত জড়িয়ে ধরে রাখে শিলা আর পাথরের খোল।
ডুরেল আবিস্কার করলেন, তার ক্যাম্প থেকে মাত্র তিন মাইল দূরেই রয়েছে ঘাসে ছাওয়া অপূর্ব ঘাসের বন । তৃনভূমি। জীবজন্তু দেখার জন্য একদম আদর্শ একটা জায়গা।
অনেক কারনেই জায়গাটা সেরা।
প্রথমত- খাসা রকমের ঘাস , পাঁচ একর জায়গা জুড়ে আছে ।
সূর্যের ঝিলিমিলি আলোতে প্রায় চকচকে সাদা হয়ে গেছে ঘাসের দঙ্গল। এদের সাথে মিলেমিশে আছে সরু লতানো গুল্ম , পরাশ্রয়ী লতা। নানান শাকপাতা । আছে প্রাণবন্ত বেগুনী রঙের ইক্ষুগন্ধা ফুল ।
এবং শেষমেশ এই নিচু এলাকা ছড়িয়ে খানিক দূরে দাড়িয়ে আছে জঙ্গলের আসল বাসিন্দারা - পেল্লাই দৈত্যের সাইজের গাছের সারি । এক একটা গাছ দেড়শ ফুট উচু । সবুজ একটা ছাদ যেন অসংখ্য খুঁটির উপর দাড়িয়ে আছে।
যদি সুবিধাজনক একটা জায়গায় দাঁড়াও, তবে সব ধরনের গাছপালার বেশ কিছুটা চেহারা আর চরিত্রের আভাস পাবে।
ডুরেল খুব সকালে ক্যাম্প ছাড়তেন।
সূর্য তখনও ওর রাগি চেহারা দেখানোর সুযোগ পায়নি।
ক্যাম্পে বসে হাঁসফাঁস করার চেয়ে জঙ্গলের ছায়াছায়া ঠাণ্ডা পরিবেশে হাঁটা অনেক বেশি ভাল ।
তখন গাছপালার উপর রোদ পড়ে, পাতায় পাতায় ফিল্টার হয়ে ফিকে সবুজ আলো ছড়াচ্ছে । চারিদিকে দানব সাইজের গাছ। শুকনো পাতা খসে পড়ে স্তরে স্তরে জমা হয়ে পার্সিয়ান কার্পেটের মত নরম হয়ে গেছে।
বনভূমি যে চুপচাপ আছে সেটা বলা যাবে না।
লক্ষ লক্ষ ঘুর্ঘুরে পোকা লাগাতার শব্দ করে যাচ্ছে। রুপালি সবুজ পোকাগুলো গাছের বাকল ধরে ঝুলে আছে আর চিৎকার করে শব্দ তৈরি করেই যাচ্ছে। কাঁপিয় দিচ্ছে বাতাস। যখন এই ঘুর্ঘুরে পোকাগুলোর একদম সামনে যাবে, তখন ওরা ওদের স্বচ্ছ ডানা তুলে প্রায় বিমানের মত করে উড়ে যাবে।
কিছু পিচ্চি পিচ্চি পাখি দেখেছেন ডুরেল। কখনই জানতে পারেননি ঐ পাখিগুলোর নাম ঠিকানা কি ? কিন্তু ওরা সারাক্ষণ নরম তরল সুরে ডুরেলের সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করছিল ।
মাথার উপরে বনের ছাদ। সমতল না। নানান জায়গায় ফোঁকর আছে। বড় বড় ডালপালা পোকার আক্রমণে, অসুখে- বিসুখে ভুগে শুকিয়ে ধপাস করে ভেঙ্গে পড়েছে শ- খানেক ফুট নিচের বনভূমির মাটির উপর। গাছের শামিয়ানায় উজ্জল সোনালি রোদ এসে নরম হয়ে গেছে। রোদের ফালিগুলো কমলা- লাল রঙের মোমবাতির সলতের মত।
জ্বলছে যেন !
আরও সামনে হেঁটে যেতেই ছোট মত একটা ঝর্না পেলেন ডুরেল । ফিসফিস করে বয়ে যাচ্ছে ওটা। পানা আর শেওলার টুপি পরে আছে ঝর্ণার পাড়ের সব কটা নুড়ি । বনের ভেতর থেকে বের হয়ে তৃনভূমি পর্যন্ত চলে গেছে ঝর্ণাটা । দুই ধারে উজ্জল হলুদ রঙের ফুল ফুটেছে। এত সুন্দর, মনে হয় ফুলগুলো মোম দিয়ে বানানো।
বনের এক কোনে বড় একটা গাছের গোঁড়া তুমুল বৃষ্টির জলে ক্ষয়ে গেছে। কতদিন ধরে অমন হয়েছে কে বলবে ? শেষে সামাল দিতে না পেরে গাছটা ওর বিশাল শরীর নিয়ে ধপাস করে অর্ধেক বনের মধ্যে আর বাকি অর্ধেক তৃণভূমির মধ্যে দিয়ে পরে আছে।
বেচারার শরীর ভর্তি ফোঁপরা , পচা খোলা, শেওলা, লাল সাদা ছিট পড়া মাশরুম সব মিলিয়ে একটা কেমন বস্তি বানিয়ে ফেলেছে। গাছের গুঁড়িটা ক্ষয় হয়ে ক্যানোর মত হয়ে গেছে। ক্যানো মানে আফ্রিকান পিচ্চি ডিঙ্গি নৌকা। ইচ্ছা করলেই ভেতরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা যায়।
ডুরেল যখন দেখলেন গাছের গুঁড়িটার আর কোন দাবিদার নেই, মানে অন্য কোন প্রাণী ওটা নিজের বাসা হিসাবে ব্যবহার করছে না তখন ঠিক করলেন ওটার আড়ালেই বসে কাজ করবেন।
ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করবেন।
তিনি জানেন প্রথম এক ঘণ্টা বা তারও খানিকটা বেশি সময় কিছুই হবে না।
ঘুর্ঘুরে পোকার চেঁচামেচি ছাড়া কোন শব্দ নেই। গেছো ব্যাঙ দেখা যাবে ঝর্ণার তীরে। নিয়মিত না। হঠাৎ। আচমকা ।
প্রজাপতি পাশ দিয়ে চলে যাবে কখনও কখনও। তবে - কিছু সময়ের ভেতরেই এই বনভূমি তোমাকে ভুলে যাবে। একদম ভুলে যাবে। নিজের ভেতরে বুঁদ হয়ে যাবে গহীন অরণ্য।
অপেক্ষা কর খানিক ।
অরণ্য ওর মঞ্চ সাজাচ্ছে।
সাধারণত প্রথমে আসে প্ল্যানটেইন ইটার (Plantain-eater)।
তৃনভূমির ঘাসের জঙ্গলের পাশেই জংলা ডুমুর গাছ। বুনো ডুমুর খাওয়ার লোভে ওরা আসে। উলের বলের মত পাখিটার ঠোঁট গাঢ় হলুদ। ম্যাগপাই পাখির মত পেল্লাই ঝুলন্ত লেজ আছে। আধ মাইল দূর থেকে নিজের আগমনী বিজ্ঞাপণ দেবে। টানা নিয়মিত ছন্দে ... কারু, কুও, কুও, কুও আনন্দিত শব্দে জানাবে সে আসছে।
সবাই মিলে ডুমুরের ডালে লেজ ঝুলিয়ে বসবে । এবং গলাবাজি করবে নিজেদের মধ্যেই । লেজের ঝাপটা দিয়ে একে অপরকে আঘাত দেবে। নড়াচড়ায় ঝিলিমিলি করে উঠে ওদের সোনালি সবুজ মায়াবি পালক। গাছের সরু ডালের উপর নিখুঁত ভাবে ক্যাঙ্গারুর মত লাফিয়ে লাফিয়ে জংলা ডুমুর বেছে খায় ওরা।
জঙ্গলের এই অনুষ্ঠানের পরবর্তী আকর্ষণ হচ্ছে এক দঙ্গল মোনা বানর। ওরা আসবে দল বেঁধে। শরীরে বাদামি লাল পশম। ধূসর পা আর চকচকে উজ্জ্বল সাদা লেজ নিয়ে । ওরা আসে বেশ শব্দ করে। মনে হয় এক গাদা শুকনো পাতা বাতাসে উড়ে গাছের শাখায় বাড়ি খেয়ে শব্দ করছে। সেই সাথে যেন পাগলাটে বাতাসের গর্জন।
কিন্তু তুমি যদি মনোযোগ দাও , তবে বিচিত্র রকমের হুপ হুপ শব্দ শুনতে পারবে । অনেকটা যেন পুরানো দিনে রাস্তায় জ্যাম লাগলে ট্যাক্সিগুলো কেমন একটা শব্দে ভেঁপু বাজাতো না ? - ঠিক সেই রকম।
হর্নবিল পাখি এই শব্দ শুনেই বানরদের অনুসরণ করে। বানরদের পিছে পিছে গেলে খাবার পেয়ে যায় ওরা। শুধু যে ফল আবিস্কার করে তাই না। গিরগিটি, পোকা আর গেছো ব্যাঙ ও পেয়ে যায়। গাছের নাড়াচাড়ার জন্য বিরক্ত হয়ে ওগুলো বের হয়ে আসে।
বনে পৌঁছে বানরদের নেতা গাছের ডাল বেয়ে একটা সুবিধামত জায়গায় বসে। যতদূর সম্ভবত সতর্ক চোখে সামনের তৃনভূমির দিকে চেয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে। পিছনে দলের বাকি সদস্য চুপ করে অপেক্ষা করে। সবাই যে চুপ থাকে সেটা বলা যাবে না। পিচ্চি বানর মানে বাচ্চা বানর চুপ থাকতে পারে না। ওরা চিল্লা ফাল্লা করে।
নেতা যখন দেখবে বিপদের কিছু নেই তখন নিজের লেজটা প্রশ্নবোধক চিহ্নের মত বাঁকা করে ফেলবে। লাফ দিয়ে গিয়ে প্রথম ফলটা তুলে মুখে দেবে দলের নেতা । বিচ্ছিরি শব্দে চিৎকার করে বাকি সবাইকে খাবার জন্য ডাক দেবে।
ডাক দিতে যতটা দেরি , তারপরই সমুদ্রের গর্জনের মত শব্দ করে ঝাঁপিয়ে পড়বে বানর বাহিনী।
সাগরের জল যেমন করে বেলাভূমিতে আছড়ে পরে , ওদের হুটোপুটির জন্য তেমন শব্দ হবে। মুখ দিয়ে খামাখাই শব্দ করছে। ডুমুর গাছ ঢেকে গেছে ওদের জন্য। মা বানরগুলোর গলা ধরে পিচ্চি বাচ্চা বানরগুলো ঝুলছিল। মা যখন লাফ দিচ্ছিল গাছের ডালে চড়ার জন্য তখন বাচ্চাগুলো ভীষণ জোরে চেঁচিয়ে উঠছিল। ভয়ে না উত্তেজনায় সেটা বলা মুশকিল।
কে জানে !
বানরগুলো সব কটা ডালে গিয়ে বেছে বেছে পাকা ডুমুর খায় । কখন মাত্র এক কামড় দিয়েই ডুমুর ফেলে দেয় গাছের নিচে। অভাব না থাকলে যা হয় আর কি। সামনে এগিয়ে আরও মজাদার ডুমুরের খোঁজ করছিল। আধা ঘণ্টা বা ওরকম কিছু সময়ের মধ্যে ডুমুর গাছের তলা আধা খাওয়া ডুমুরের স্তূপে দেখার মত এক দৃশ্য হয়ে যায়।
বানরের দল খাওয়া শেষ করলেই হর্নবিল পাখির ঝাঁক হাজির হয়। এরা আরও বেশি শব্দ করে। খামাখাই চিৎকার করে ডানা ঝাপটে ঝাপটে ।
পরের খদ্দের হচ্ছে ডোরা কাঁটা ছোট ইঁদুর।
শরীর ভর্তি ধূসর পশম। নাকটা মাখনের ফেনার মত । দেখতে বেশ ভদ্রলোক । সাইজে এতই পিচ্চি , ফিল্ড গ্লাস না থাকলে তুমি দেখতেই পাবে না। ঘাসের দঙ্গলের মধ্যে যেই ঘাস সামান্য একটু বড় ওখানেই বা গাছের শেকড়ের তলায় দেখা মিলবে এই ইঁদুরগুলো। বাড়ি ঘরে যেই রকম ইঁদুর দেখি সাইজেও তেমনই।
সরু নলের মত ঘাসের ভেতর থেকে পিচ্চি এই ইঁদুরগুলো বের হয়ে আসে সতর্ক ভাবে। নিজেদের পাছার উপর ভর করে বসবে। গোলাপি হাতগুলো মুঠো করা। যেন ঘুষাঘুষির জন্য তৈরি। নাকের গোঁফ ফুলিয়ে বাতাসে বিপদের ঘ্রাণ খুঁজছে। শত্রুর উপস্থিতি খোঁজ ও নিচ্ছে।
ঘাসের নলিকা আর ডাটা থিরথির করে কাঁপা বন্ধ হলেই ওরা চলাচল শুরু করে। ওদের গায়ের ডোরাকাঁটা কোট আর ঘাসের দঙ্গল অলঙ্কারের মত মিশে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
ইঁদুরগুলো প্রথম নিশ্চিত হয়ে নেবে হর্নবিল পাখির দল চলে গেছে কি না। তারপর গুঁটিগুঁটি পায়ে এগিয়ে যাবে ডুমুর গাছের তলায়। বানর বাহিনি ওদের জন্য হাজারে বিজারে পাকা ডুমুর ফেলে রেখে গেছে গাছের তলায়। সিরিয়াস একটা ভঙ্গিতে খাওয়া শুরু করবেওরা । আর সব বুনো ইঁদুরের মত এরা ও খাবার নিয়ে বেশ ঝগড়াটে, কলহপ্রিয় আর ঝামেলাবাজ।
এত খাবার থাকার পরও মাঝে মাঝে দুইজনেই একই ফলের উপর থাবা মেরে বসে নিজের বলে দাবি করতে থাকে। গোলাপি থাবা দিয়ে নিজের দিকে টানতে থাকে। হাল্কা মেজাজ দেখায়। অন্যের মনের জোর ভেঙ্গে নিজের দিকে ডুমুরটা টেনে আনতে চায় ।
বেশ একটা মারমুখি ভাব।
ডুমুরটা বেশি পাকা হলে একটা সুবিধা হয়। টানাটানিতে মাঝখান থেকে অর্ধেক ভাগ হয়ে দুইজনেই উল্টো দিকে গড়িয়ে পড়ে। ট্রফি জেতার মত দুইজনেই দুটো আলাদা টুকরো পেয়ে যায়। তখন বেশ শান্তিপূর্ণ ভাবেই ছয় ইঞ্চি দূরে বসে নিজের ভাগের ডুমুর খায়। খাওয়ার সময় আচমকা কোন শব্দ পেলে খাওয়া থামিয়ে শরীর শক্ত করে বসে থাকে। বুঝার চেষ্টা করে- কোন রকম আপদ বা বিপদ আছে কি না। সতর্ক ভাবে তোম্বা মেরে বসে থাকে , যতক্ষণ না নিশ্চিত হতে পারছে বিপদ চলে গেছে।
আবার খাওয়া নিয়ে ঝগড়া কলহ শুরু।
ইঁদুরদের ঝগড়া মেশানো খাওয়া দেখতে গিয়ে করুন এক নাটক দেখেছিলেন ডুরেল। পাকা ডুমুর খাচ্ছিল ওরা। আচমকা জংলের ভেতর থেকে বের হয়ে এলো সোনালি রঙের একটা জ্যানেট (Genet ) । জঙ্গলের সবচেয়ে সুন্দর আর চটপটে প্রাণী। বেজি আকৃতির শরীর। মুখটা বিড়ালের মত। সোনালি পশমে শরীর ভর্তি। কালো চাকা চাকা দাগ আছে। লেজটাও অমন সাদা কালো ছোপ ছোপ।ক্ষুদে চিতা যেন।
একদম সকালের দিকে জ্যানেট সহজে শিকারে বের হয় না। সন্ধ্যা বা রাতের বেলাই শিকার করার প্রিয় সময় ওর।
হয়তো কাল রাতে শিকার তেমন জোটেনি , সকাল সকাল বের হয়ে পড়েছে কিছু পাবার আশায়। পেটে কিছু তো দিতে হবে। তৃনভূমির শেষ মাথায় এসেই ডোরাকাঁটা ইঁদুরগুলোর উপর নজর পড়লো ওর। সাবধানে ঘাসের সাথে মিশে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো ইঁদুরগুলোর উপর। কি ভাবে যেন টের পেয়ে ঝেড়ে দৌড় দেয় ডোরাকাঁটা ইঁদুরগুলো। ছিটকে পড়ে বাতাসের চারিদিকে।
বেশির ভাগ পালিয়ে গেলেও জ্যানেট ওর মুখের মধ্যে দুটো ইঁদুর ধরে বনের মধ্যে চলে যায়। খানিক আগেই এই দুই ইঁদুর একটা পাকা ডুমুরের মালিকানা নিয়ে নিজেরদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া চালাচ্ছিল। সেইজন্যই পালাতে দেরি হয়ে গেছে। প্রাণটা গেল নিজেদের দোষে ।
মধ্য দুপুরে পুরো দেশটাই যেন সূর্যের গরমে নিঝুম হয়ে যাচ্ছিল।
এমন কি ঘুর্ঘুরে পোকাও চুপ করে গেছে। মধ্য দুপুরের নিদ্রা দিচ্ছিল ওরাও ।
ভাত ঘুম না বলে রোদ ঘুম বলা যায় ।
খুব একটা জীব জানোয়ার দেখা যাবে না এই সময়।
তবে এক ধরনের গিরগিটি আছে যারা রোদ পোহাতে পছন্দ করে। সেগুলোই পাথর আর ঘাসের উপর হাজির হল। পঙ্গপাল খেয়ে সাফ করতে লাগলো।
উজ্জ্বল এই গিরগিটিগুলো দেখলে মনে হয় রঙ মিস্ত্রীর কাছে গিয়ে মাত্র রঙ পালিশ করে এসেছে। শরীরটা যেন বিচিত্র রঙের- পিচ্চি পিচ্চি টাইলস দিয়ে মোজাইক করা। চেরি লাল। ঘন কালো । আর মাখন রঙা। ঘাসের উপর দিয়ে এত দ্রুত নড়াচড়া করছিল , রোদের জন্য মনে হচ্ছে জ্বলন্ত কোন আতশবাজি দৌড়াচ্ছে।
এই রঙ্গিন গিরগিটি ছাড়া সূর্য ডুবে যাবার আগ পর্যন্ত , দিনটা শীতল হবার আগ পর্যন্ত অন্য কোন কিছুর দেখা পাবার আশা করা ভুল।
এই সময়টা একদম বেকার।
সকালবেলায় কিছু খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের জন্য, এই সময়টাতে দুপুরের খাবার সেরে ফেলতেন ডুরেল। সাথে কয়েকটা সিগারেট ও খরচ করতেন।
দুপুরের ভোজের বিরতির সময় একটা মজার ঘটনা চাক্ষুষ করলেন ডুরেল ।
যেখানে বসেছিলেন সেই গাছের গুড়ি বেয়ে পেল্লাই সাইজের একটা শামুক অনেক কষ্টে পিষ্টে বেয়ে উঠছে। শামুকটা প্রায় আপেলের সমান বড়। ভূমি শামুক বলে। লাল হলুদ ছোপ দেয়া ব্যাঙের ছাতা আর পান্না রঙের শ্যাওলার মধ্য দিয়ে পথ খুঁজে খুঁজে যাচ্ছিল যাচ্ছিল। কিন্তু নিজের লালায় নিজেই পিছলে একই পথে হাঁটছিল সে।
বেচারা।
কে তাকে পথের দিশা দেখাবে ?
দুপুরের গরমটা একটু কমে আসতেই জঙ্গলের জীবন আবার শুরু হয়।
ডুমুর গাছের নতুন মেহমান আসে- কাঠবিড়ালী। ডালে ডালে দৌড়ে লুকোচুরি খেলতে থাকে। ভাগ্য ভাল থাকলে দেখতে পাবে বাদামি রঙের অ্যান্টিলোপ । খসখসে বাদামি রঙের কোট গায়ে।কাঠ পেন্সিলের মত সরু পা।
ঝর্ণার কাছে আসে- জলের তেষ্টা মেটাতে। বড় বড় তরল চোখে চারিদিকে চায় । কান খাড়া করে জঙ্গলের শব্দ নেয়। ঘন হয়ে বেড়ে উঠা ঘাসে কোন শব্দ না করেই সতর্ক ভাবে ঝর্ণার কাছে যায় ।
ওদের দেখে কয়েকটা জলজ ইঁদুর বেশ বিরক্ত হবে। জলজ ইদুরগুলো চেহারা লম্বাটে , কেমন যেন বোকা বোকা । আধা স্বচ্ছ কানগুলো খচ্চরের কানের মত। পিছনের দুই পা একটু বেশি লম্বা , সেইজন্য বোধ হয় একদম পিচ্চি ক্যাঙ্গারুর মত লাগে।
সন্ধ্যার আগের এই সময়টায় ওরা নিয়ম করে জলাভূমির কাছে যায়। সামনের সরু সরু হাত দিয়ে আগাছার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদে জলজ পোকামাকড়, শামুক আর কাঁকড়ার বাচ্চা যোগাড় করে।
সময়টা সব ধরনের ইঁদুরদের জন্য ব্যস্ত সময়। কাজের ফুরসৎ নেই ওদের। লালচে শেয়ালের চামড়ার মত শরীর। মনে হয় মুখে মুখোশ আর পায়ে কাপড়ের জুতা পরে আছে। খাবার খোঁজার জন্য ওরা বড় বড় গাছের গুড়ি আর শেকড়ের কাছেই ঘুরঘুর করে। ওখানে পাতা ঝরে নরম হয়ে আছে মাটি। নিজেরদের মধ্যে চি- চি শব্দ করে যোগাযোগ করে। খাবার না পেলে অভিযোগ করে পাশের জনের কাছে ।
হেলেদুলে হাঁটে। ছোট খাট পাথর কামড়ে দেখে পাথরের তলায় পোকা আছে নাকি ।
বেশ খোঁজাখুজির পর চকোলেট রঙের একটা গুবরে পোকা আবিস্কার করে ফেলে । গুবরে পোকা কিন্তু দুর্বল না। শিং আছে। গায়ে জোর ও বেশ। তারপরও ইঁদুর চেষ্টা করে ওকে টিট করার জন্য। কায়দা করে গুবরে পোকাটাকে চিত করে ফেলে । দ্রুত কয়েকটা কামড় দিলেই পোকা ইহলীলা সাঙ্গ হয়ে যায়। ইঁদুরটা পিছন পায়ে বসে সামনের হাত দিয়ে দ্রুত গুবরের দেহ খাওয়া শুরু করে।
ঘাসের বনে তখনও আলো ছিল।
মনমরা বিষণ্ণ আলো।
এই আলোতে জঙ্গল দেখা বেশ কষ্টকর। ভাগ্য ভাল থাকলে এই সময় রাতের শিকারিদের কাউকে কাউকে এক ঝলক দেখতে পাবে তুমি। জুতার বুরুশের মত লেজওয়ালা শজারু দেখতে পাবে। ব্যস্ততম ভাবে চলছে সে।
ডুমুর গাছটা আবার রাতের প্রাণীদের মিলনস্থল হয়ে যাবে। গালাগোস বা বুশবেবি বানর আসবে। ওদের পিরিচ আকারের চোখ অন্ধকারে ভৌতিক লাগে।
সূর্যাস্তের রঙ আকাশের সাথে মিশে গেছে।
ধূসর রঙের একজোড়া তোতা পাখি চিৎকার করে উড়ে যাচ্ছে গহীন বনের ধারে। জঙ্গলে প্রতিধ্বনি হয়ে শব্দ আরও বেশি হচ্ছিল।
রাত নেমে আসছে।
উঠে দাঁড়ালেন ডুরেল
।
ট্রপিক্যাল এই অরন্যকে বই পড়ার মত পড়েছেন তিনি।
এইবার ফেরার পালা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন