প্রফেসর হুঁশিয়ার আমাদের মহল্লায় থাকতেন।
খুবই ব্যস্ত মানুষ। মাথায় শোলার টুপি । গায়ে শিকারিদের জ্যাকেট। চোখে চশমা। চশমার কাচ প্রায় আতসি কাঁচের মত । ফলে উনার চোখ দুটো তারাপদ বাবুর দোকানের পান্তুয়ার মত মনে হয়।
আমার প্রকাশক , প্রকাশ মিত্র বললেন - যদি পারেন তো প্রফেসর সাহেবের একটা ইন্টারভিউ নেয়ার ব্যবস্থা করুন ।
আমি কয়েক বার প্রফেসর সাহেবের বাড়িতে গিয়েছিলাম।
কুকুরটার জন্য ভেতরে ঢুকতে পারিনি।
তাছাড়া প্রফেসর হুঁশিয়ার তখন বাড়িতে ছিলেন না। শামুকগঞ্জের উত্তরে গভীর জঙ্গলের ভেতরে টিন আর অভ্রের খনি আবিস্কার করতে গেছেন। তবে তার ভাগ্নে চন্দ্রখাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে।
সন্ধ্যেবেলা দোকান থেকে চায়ের পাতা আর গুড়োদুধ কিনে ফিরছিলাম তখন দেখি চন্দ্রখাই টঙ্গের দোকানে বসে প্রায় ইটের সমান একটা পাউরুটি কলা দিয়ে খাচ্ছে।
আমার উদ্দেশ্য শুনে খুবই বিরক্ত হয়ে বলল - ' সন্দেশ পত্রিকায় মামার ইন্টারভিউ ছাপা হয়নি। তাই মামা নতুন করে ইন্টারভিউ দিতে আগ্রহী নন। তবে আপনি চাইলে মামার একটা ডাইরি দিতে পারি। দেখুন ছাপাতে পারেন কি না।'
তো প্রফেসর হুঁশিয়ারের ডাইরিটা হুবহু দিয়ে দিলাম । সত্য মিথ্যা তোমরা যাচাই করবে। )
৫ আগস্ট।
আমরা এখন বন্দাকুশ পাহাড়ের দশ মাইল দক্ষিনে আছি। আমরা সব মিলিয়ে দশজন। আমি, ভাগ্নে চন্দ্রখাই। দুইজন শিকারি। ছক্কড় সিং আর লক্কড় সিং। আর ছয়জন কুলি।
কুলিদের ফিগার প্রায় আলাদিনের চেরাগের দৈত্যের মত। বেশ ভাল খাটতে পারে।
তাবু টাঙানোর ভার কুলিদের উপর ছেড়ে দিয়ে আমরা নদীর ধারে চলে গেলাম । সাথে শুকনো খাবার, বন্দুক, গুলি, ম্যাপ, কম্পাস আর মস্ত একটা বাক্সে দরকারি যন্ত্রপাতি । টানা দুই মাইল হেঁটে যাবার পর অচেনা জায়গায় চলে এলাম।
পরিবেশটা খুব সুন্দর। কোন রকম হৈ চৈ নেই।
এখানের গাছপালাগুলো অদ্ভুত রকমের ।
একটা গাছের নামও আমরা কেউ জানি না। মস্ত একটা গাছ দেখলাম । ঝুপসি পাতা। হুবহু জিলিপির মত প্যাচানো ফল ধরে আছে । কয়েকটা ফল লাল টুকটুকে । আর কয়েকটা জাফরানি রঙের ।
জিনিসটা দেখে সন্দেহ হচ্ছিল। বিষাক্ত যদি হয় ? ভাবলাম, কুকুরটাকে খেতে দেই। মনে সায় দিল না। অবলা জীবজন্তুর উপর অমন পরীক্ষা নিরীক্ষা আমার পছন্দ নয়। কিন্তু তার আগেই দেখি ভাগ্নে চন্দ্রখাই মুঠো ভর্তি করে নিশচিন্তে সেই ফল খাওয়া শুরু করেছে । এই এক মস্ত দোষ ভাগ্নের । লোভ সামলাতে পারে না।
খাওয়া শেষ করে চেচিয়ে বলল ,’ মামা ফলের স্বাদ হুবহু জিলিপির মত।’
ওর কথা শুনে আমরা সবাই মুঠো মুঠো সেই ফল তুলে মুখে দিলাম। বললে বিশ্বাস করবে না। সত্যি সত্যি জিলিপির মত।
লাল ফলগুলো যেন গুঁড়ের জিলিপি। আর জাফরানি রঙের গুলো চিনির জিলিপি। বুঝলাম একদম নতুন জাতের ফল।
লক্কড় সিং বলল, জিলিপি ইংরেজি সুইট পেজগি।
ছক্কড় সিং বলল, জিলিপি ইংরেজি - সুইট হিজিবিজি।
কারটা সঠিক বলা মুশকিল। ডিকশনারি নেই সাথে , দেখে যে নিশ্চিত হব সেই উপায় নেই ।
বাংলায় জিলিপি গাছই নাম দিলাম। প্রচুর ছবি তুলে নিলাম। কিছু স্কেচও এঁকে ফেললাম। ব্যাগ ভর্তি ফল নিলাম। কিন্তু এই জিলিপি গাছ চারা থেকে জন্মে নাকি বীজ থেকে হয় কে বলবে ?
২২ আগস্ট।
বন্দাকুশ পাহাড় থেকে একুশ মাইল দক্ষিণে চলে এসেছি। জায়গাটা একদম নিঝুম। তিন শো নতুন ধরনের গাছ পেলাম , মোট দুই শত রকম পোকা আর প্রজাপতি , পাঁচশত রকম ফুল ফল সংগ্রহ করেছি। হাজারে বিজারে ছবি তুলেছি।
এক সকালে মস্ত এক বুনো আম বাগানে ঢুকে পড়লাম।
অবাক হয়ে দেখি প্রায় মানুষের সমান বড় কিন্তু গরিলার মত দেখতে মস্ত একটা প্রাণী গাছের ডালে বসে বসে আম খাচ্ছে।
ছবি তোলার সময় আমাদের দিকে আমের আঁটি ছুড়ে মারল। প্রাণীটার গায়ের রঙ খোসা ছাড়ানো পাকা আমের মত। শরীর ভর্তি হলুদ রঙের বড় বড় লোম। খেয়ে ফেলার পর আমের আঁটি যেমন দেখায় তেমন মনে হচ্ছিল ।
আমরা ওর নাম দিলাম- আমথেরিয়াম ।
যেই সব বানর আম খেতে পছন্দ করে তাদের কোন প্রজাতি বিবর্তনের ফলে অমন হয়ে গেছে মনে হয় ।
সারাদিন চলার পর দূরে একটা পাহাড় পেলাম। হুবহু সিঙ্গারার মত দেখতে। আমরা নাম দিলাম সিঙ্গারা পর্বত।
পাশে একটা জলাভূমি। একদম গোল। নাম দিলাম -ডালপুরি হ্রদ। অচেনা জলজ গাছ ভর্তি। সাথেই সরু একটা উপত্যাকা । লক্কড় সিং বলল , ওটার নাম বেগুনি উপত্যাকা রাখতে।
ওখানের জঙ্গলে বিশাল এক ধরনের পাখি পেলাম। কালো কুচকুচে। ডানার সাইজ বারো ফুট । চোখগুলো কাঁচের পেপার ওয়েটের মত বড় বড় । পাখি দেখার বইতে আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও অমন পাখি পেলাম না।
নাম দিলাম আলকাতরা পাখি। ওদের পালক থেকে আলু ভর্তার ঘ্রান আসে।
২৭ আগস্ট।
ঠিক দুপুর বেলা বিশাল এক জলাভূমির সামনে চলে এলাম আজ। জলাভুমির পাশে একজন হিমালয়ের সাধু পেলাম। বড় একটা গাছের তলায় বসে ধ্যান করছে। মাথায় পাগড়ী। কিন্তু গায়ে কোন কাপড় নেই। দেখতে একদম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত।
আমার কুকুরটা সাধুকে দেখে ঘেউ ঘেউ করায় সাধুর ধ্যান ভেঙ্গে বিরক্ত হয়ে আমাদের দিকে করমচার মত লাল চোখে তাকাল।
চন্দ্রখাই বলল, মামা জলাভুমি থেকে কিছু মাছ ধরলে দুপুরের খাবারটা ভাল হবে। টিনের বিস্কুট, পাউরুটি আর জেলি খেয়ে মুখটা আসানশোলের বেকারির দোকান হয়ে গেছে ।
বেশ খুশি হলাম।
আমার খুশি দেখে সাধু বিরক্ত হয়ে বলল - ' অই জলাভূমিতে ভয়ংক রকমের মাছ আছে। কেউ নামলেই কামড়ে দেয়। আমি অনেক বছর আগে স্নান করতে নেমেছিলাম। মাছেরা কামড়ে আমার ধুতি খেয়ে ফেলেছিল। সেই থেকে আমি এখানেই কাপড় ছাড়া বসে আছি। আমি আসলে কোন সাধু নই ।'
আমরা সতর্ক হয়ে গেলাম সাধুর কথা শুনে।
বন্দুক আর মিহি জাল নিয়ে লক্কড় সিং আর ছক্কড় সিং নেমে পড়লো। নামতে না নামতেই লক্কড় সিং চেঁচিয়ে উঠলো- আরে ম্যায় মর গিয়া।
মাছের কামড় খেয়েছে বেচারা।
মিহি জাল নিয়ে আক্রমণ চালালাম।
ধরা পড়লো কড়ে আঙ্গুলের সমান কতগুলো মাছ। পরীক্ষা করে দেখি- হাঙর। এত পিচ্চি হাঙর আগে দেখিনি । পিগমি হাঙ্গর সবচেয়ে ছোট, ওরাও সাত বা আট ইঞ্চি হয়।
এইগুলো তো ভীষণ ছোট। তবে মুখটা বিশাল, দাঁতের সাইজ আরও বড়। টিনের বয়ামে রেখে দেখি টিন ও খেয়ে ফেলতে পারে। আমরা নাম দিলাম - পিচ্চিলোডন ।
পিচ্চিলোডন নাম দেয়ার সঙ্গত কারন আছে। প্রায় সারে তিন মিলিয়ন বছর আগে বিশাল সাইজের হাঙর ঘুরে বেড়াত গভীর সাগরে। ওরা ষাট থেকে সত্তর ফুট লম্বা হত। ওজন হত ষাট টনের মত। ওর এক একটা দাঁত হত সাত ইঞ্চি।
সকালের জলখাবার হিসাবে আস্ত একটা তিমি মাছ না হলে চলতো না।
খিদে পেলেই এক একটা আস্ত তিমি গিলে ফেলত । সেই হাঙরের নাম ছিল - মেগালোডন ।
আমাদের এই পিচ্চিলোডন ভীষণ ক্ষুধার্ত হাঙর।
কয়েকটা নমুনা নিতে পারলে ভাল হত। কিন্তু ওরা এত কামড়া কামড়ি করে যে আবার জলে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। তবে ছবি তুলে স্কেচ এঁকে নিলাম।
দুপুরের খাবারে মাছ না হওয়াতে চন্দ্রখাই বেশ মনক্ষুন্ন হয়ে পড়লো। আমাদের অবস্থা দেখে সাধু স্মিত হেসে বলল- ' আরও মাইল তিনেক এগিয়ে গেলেই সুন্দরমত একটা জলাভূমি পাবেন। ওখানে বিচিত্র মাছ পাবেন। না খেলে জীবন বৃথা।
‘আপনি যাবেন আমাদের সাথে ?’ জানতে চাইলাম।
সাধু মাথা নেড়ে জানালো সে নাকি মাছ মাংশ ডিম খায় না। শুধু গাছের গুঁড়িতে জন্মানো নীল রঙের শ্যাওলা খেয়ে বেঁচে আছে । এই শ্যাওলা খেলে আয়ু বাড়ে।
জানতে পারলাম সাধুর বয়স নাকি পৌনে দুইশ। আমরা শ্যাওলার নমুনা সংগ্রহ করে নিলাম। দেশে ফিরে বানিজ্যিক ভাবে যাতে চাষ করতে পারি। কত মানুষের মঙ্গল হবে তাতে । শ্যাওলার স্বাদ খারাপ না। পুডিঙের মত।
মালপত্র নিয়ে আবার হাঁটা ধরলাম।
পেয়ে গেলাম সেই জলাভূমি।
কালো কাঁচের মত জল।
এখানেই আমরা অদ্ভুত রকম মাছ পেলাম। আকৃতি রূপচাঁদার মত চারকোণা। জাল বা বড়শি দিয়ে ধরা যায় না। কিন্তু জলাভূমির পাশে আগুন জ্বেলে উপরে তাওয়া বা ফ্রাইপ্যান রাখা মাত্র মাছগুলো লাফ দিয়ে উড়ে এসে তাওয়ার মধ্যে শুয়ে পরে।
অমন বিচিত্র আর রহস্যময় স্বভাবের মাছ নিখিল বিশ্বে আর আছে কিনা সন্দেহ।
ছক্কড় সিং জানালো এইগুলো সুইসাইড মেনটালিটির মাছ। জাতিঙ্গা পাহাড়ে নাকি বছরে একবার অমন করে হাজারে বিজারে পাখি উড়ে এসে আত্নহত্যা করে।
আমরা মাছের নাম রাখলাম তাওয়া মাছ। ফ্র্যাইপ্যান ফিস । লম্বায় ছয় ইঞ্চি। শরীরে কোন আঁশ নেই। স্বাদ অপূর্ব। ডিম দেয়। ডিমের স্বাদ জাম্বুরার মত।
আমরা সবাই ইচ্ছামত গানডে পিণ্ডে মাছ ভাঁজা খেলাম।
চন্দ্রখাই একুশটার মত মাছ খেয়েছে , গুনে দেখলাম। তারপর হিসেব করা বাদ দিয়ে দিয়েছি। খাক যত ইচ্ছে । এটা তো হোটেল না যে বিল দিতে হবে ।
বেশ কিছু মাছ ধরে পরিষ্কার করে লবণ মাখিয়ে বাক্স ভর্তি করে নিলাম। কালী পুজায় কাছের মানুষদের নেমন্ত্রণ করে খাওয়াব।
১ সেপ্টেম্বর।
মাঝখানে কিছু হয়নি। তাই ডায়েরি লেখার দরকার মনে করিনি।
তাছাড়া পিচ্চিলোডন ধরার সময় আমার কলমটা টুপ করে জলে পরে গিয়েছিল। এক ঝাঁক পিচ্চিলোডন মুহূর্তেই তিলে গজার মত সেটা খেয়ে ফেলেছিল।
এখন ডায়েরি লিখছি আলকাতরা পাখির পালক দিয়ে। বুনো লতাপাতার রস দিয়ে কালি বানিয়ে নিয়েছি।
এর মধ্যে নতুন নতুন নমুনা পেয়েই যাচ্ছি। সবচেয়ে ভাল লেগেছে ঘুম প্রজাপতি। হাতের তালুর সমান এই প্রজাপতির পাখা দারুণ বর্ণালী। সাদার মধ্যে লাল ফুটকি। উড়ে কারো নাকের ডগায় বসলে সেই ব্যক্তি বা প্রানী সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়বে। কাঁচের বয়াম ভর্তি করে ঘুম প্রজাপতি সংগ্রহ করে নিলাম ।
আজ সারাদিন টই টই করে ঘুরে বিকেল বেলা যা আবিস্কার করলাম এক কথায় চমকপ্রদ।
সঙ্গত কারনেই আবিস্কারটা করলো চন্দ্রখাই। কুকুরটারও খানিক কৃতিত্ব আছে। একটা শুকনো কাঠ কাঠ ওয়ালা গাছ পেলাম। পাতাগুলো চারকোণা। প্রায় স্বচ্ছ কাঁচের মত পাতা। ভেতরের শিরা উপশিরা দেখা যায়।
হলুদ রঙের ফল ঝুলছে গাছ ভর্তি। পাতার তুলনায় ফল বেশি। সব একই সাইজের। একগাদা পাখি বসে মহানন্দে সেই ফল খাচ্ছে।
ফলটা দেখেই কুকুরটা লোভীর মত গাছ বেয়ে উঠার চেষ্টা করতে লাগল। অবাক হলাম।
কুকুর ফল খায় না। আগে ওকে আপেল কমলা হাবিজাবি দিয়ে দেখেছি। খায়নি। কোন কুকুর ফল খায় কিনা জানি না, প্রতিবেশী মদন তপাদারের কুকুরটা বেলের শরবত খায় শুনেছি। তাও নাকি কুকুরটার শরীর খারাপ হলে।
গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা হল। চন্দ্রখাই গপগপ করে এক মুঠো ফল খেয়ে চেঁচিয়ে বলল - মামা একদম বিস্কুটে মত ।
খেয়ে দেখি নির্জলা সত্য।
আটার সস্তা বিস্কুট বিক্রি হত আমাদের মহল্লার মুদির দোকানে। তাও আমাদের ছেলেবেলায়। ফলটার স্বাদ বিল্কুল সেই রকম। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতে যেমন রুটিফল পাওয়া যায়। খেতে একদম রুটির মত। সেই কথা মাথায় রেখে এই গাছের নাম আমরা বিস্কুট গাছ রাখলাম।
জ্যাম মাখিয়ে সবাই পেটচুক্তি বিস্কুট খেলাম।
৩ সেপ্টেম্বর।
গত কয়েকদিন ধরে আবহাওয়াটা দারুণ হচ্ছে। তবে থারমোমিটার আর ব্যারোমিটার দুটোই নষ্ট থাকায় তাপমাত্রা বুঝতে পারছি না। বৃষ্টি হবে কি না তাও বুঝতে পারছি না। বন একটু পাতলা।
সামনে এগিয়ে যেতে লাগলাম। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম পথের দুই ধারে প্রচুর ডিমের খোসা পরে আছে। লক্কড় সিং বলল - কেউ হয়তো এই খানে বসে সেদ্দ ডিম বিক্রি করতো শীত কালে। কিন্তু ব্যাপারটা তেমন বিশ্বাস যোগ্য মনে হল না। এই বিজনপুরীতে আগে কোন লোকজন এসেছে বলে বিশ্বাস হল না।
মাইল খানেক এগিয়ে যেতেই বনের মধ্যে কাঠের একটা টঙের দোকান পেলাম।
ক্লাসিক চায়ের দোকান যেমন হয়। মিহি চেহারার একজন লোক বসে আছে। রোগা। মাথায় বেতের টুপি। সামনে বড় বড় সাদা ডিম। পাউরুটি। একটা কয়লার চুলোয় মুরগির মাংস ঝলসানো হচ্ছে। দারুণ চনমন করা ঘ্রাণ।
দোকানের উপরে টিনের সাইন বোর্ড। বিচ্ছিরি হাতের লেখা- মুরগীসরাস ক্যাফে।
আমাদের দেখে যারপর নাই ব্যস্ত হয়ে উঠলো লোকটা।
কথা বলে আমাদের সবার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল। এইসব ডিম আর মাংস নাকি মুরগির না। এক ধরণের ডাইনোসর আছে একদম ছোট সাইজের। মুরগি বা মোরগের সাইজ। ওদের মুরগীসরাস বলে। সেই মুরগীসরাসের ঝাল গ্রিল আর ডিমের অমলেট দিয়ে ক্যাফেটা চলে।
অবাক কাণ্ড!
‘এই বনে ছোট ডাইনোসর পাওয়া যায় ?' অবাক হয়ে গেলাম।
ছক্কড় সিং ও ব্যগ্র হয়ে জানতে চাইল- ছোটে ডাইনো মিলতা হ্যায় ইধার ক্যা জঙ্গল মে।
‘না এই জঙ্গলে পাওন যায় না। সত্য কথাই বলল মিহি চেহারার দোকানদার। ‘ হেরা প্রিয়লাল জগৎ থেকে আমাদের দুনিয়ায় আইসা পরে।’
ব্যাপারটা ঠিক পরিষ্কার না আমাদের কাছে।
তখন মিহি আমাদের দোকানের পিছন নিয়ে গেল। ওখানে কতগুলো ভাত ছড়িয়ে দিয়ে উপরে একটা মুরগি আঁটকে রাখার বেতের পলো ঝুলিয়ে দিল। পলোর সাথে দড়ি বাঁধা। দড়ির অন্য প্রান্ত নিজে ধরে দোকানের আড়ালে লুকিয়ে রইল মিহি।
সাথে আমরাও।
ফিসফিস করে মিহি বলল- প্রত্যেক এক ঘণ্টা পরপর জংলের এই জায়গাটা প্রিয়লাল জগৎ হয়ে যায়। অখান থেকে মুরগীসরাস আইসা পরে।
আর কতক্ষণ লাগবে ? জানতে চাইলাম।
পকেট থেকে একটা টেবিল ঘড়ি বের করে বলল- পুনর মিনিট।
মানে পনের মিনিট।
অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ঠিক পনের মিনিট পর অবাক হয়ে দেখি পিছনের জঙ্গলে কেমন অদ্ভুত রকমের হলুদ কুয়াশা নেমে আসছে। আকাশে কেমন যেন মেঘ জমা হয়ে
আঁধার হয়ে গেল। সাই সাই করে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে লাগল।
আর জঙ্গলের ভেতর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বিচ্ছিরি ক্যাঙ্গারুর মত কতগুলো প্রাণী চলে এলো এইদিকে।
ওদের সাইজ মুরগির সমান। ঠোঁট হাঁসের মত। খুঁটিয়ে ভাত খেতে লাগল। হাতের দড়িটা ছেড়ে দিতেই পলোর নিচে চাপা পড়লো মুরগীসরাস গুলো।
মাত্র কয়েক মুহূর্ত পরেই সব আবার আগের মত হয়ে গেল।
' এটাই প্রিয়লাল জগৎ।' হাসিমুখে বলল মিহি।
' প্রিয়লাল না প্যারালাল জগৎ ।' বিরক্ত হয়ে বলল চন্দ্রখাই।
দুপুরে আমরা খাওয়া দাওয়া করলাম।
মিহির মুখে শুনতে পেলাম মিহির বস ছিলেন একজন বিজ্ঞানী। উনি বিদ্যুৎ চুম্বক নিয়ে গবেষণা করতেন। কোন জায়গায় যদি শক্তিশালী বিদ্যুৎ তরঙ্গ চালানো যায় তবে সেখানে চুম্বকের সৃষ্টি হয়।
সেই জায়গায় সময় নাকি ভিন্ন জগতের সময় হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য। বিজ্ঞানী সাহেব যন্ত্রপাতি নিয়ে এখানে পরীক্ষা করেন। কিন্তু কি এক ভুলে যন্ত্র নিয়ে তিন নিজেই হারিয়ে গেছেন ভিন্ন জগতে।
মিহি খানি দূরে তাবুর ভেতরে ছিল । আজ ছয় বছর ধরে বিজ্ঞানীর জন্য অপেক্ষা করছে। রোজ প্যারালাল জগৎ থেকে হাবিজাবি জানোয়ার চলে আসে। মাথা খাটিয়ে দোকানটা চালু করেছে মিহি। পিকনিকে লোকজন আসে। দোকান খারাপ চলে না।।
অপেক্ষা করছে। একদিন যদি বস ফিরে আসে।
মিহিকে বাহবা না দিয়ে পারলাম না।
ওর কাছ থেকে আমরা কয়েক হালি মুরগীসরাস আর এক ডজন ডিম কিনে নিলাম। নমুনা হিসাবে।
২৬ সেপ্টেম্বর।
আমাদের সাথের খাবার প্রায় শেষ।
জলখাবারের ডিম সেদ্দ করার সময় ভুলে কম্পাসটা সেদ্দ করে ফেলেছে চন্দখাই। কাজেই দিকদিশা হারিয়ে ফেলেছি।
সূর্য দেখে অবস্থান খুঁজে পাওয়া যেত। কিন্তু আকাশ মেঘলা। জঙ্গলের বড় বড় গাছের উত্তর দিকে শ্যাওলা হয়। এই দিকে জঙ্গলে বড় কোন গাছ নেই। সামনে ফাঁকা জায়গা। ধু ধু বালি ।
একটা সাইন বোর্ড দেখলাম-
সামনে জাদুকর ঝনটু কাঁকরিয়ার আস্তানা । সাবধান ।’
আমাদের সাবধান করা হয়েছে কেন বুঝলাম না।
লক্কড় সিং খুব খুশি।
অনেক দিন নাকি জাদুর খেলা দেখে না। ছোটবেলায় মেলায় গিয়ে জাদু দেখেছিল চার আনা দিয়ে। চুমকির কাজ করা লম্বা আলখেল্লা পরা এক জাদুকর টুপির ভেতর থেকে খরগোশ বের করেছিল। খরগোশটা আবার কমলা রঙের গাজর খাচ্ছিল।
সামনে এগিয়ে গিয়ে অবাক হলাম ।
একটা প্রাসাদ দেখা যাচ্ছে।
খেলার তাস দিয়ে বানানো তাসের প্রাসাদ। জানালা দরজা সব তাসের। বাইরে বুড়ো মত একটা লোক বসে আছে। গায়ে তাপ্পিমারা পানজাবি-পায়জামা। মাথায় ত্রিভুজ সবুজ টুপি। পায়ে চপ্পল। হাতে জ্যামিতির বই । বড় একটা মাটির পাতিল থেকে কাঠের চামচ দিয়ে টক দই তুলে তুলে খাচ্ছে। আমাদের দেখে বিরক্ত হয়ে তাকাল।
‘ নোটিশ দেখার পরও আমার বাসায় ঢুকলেন কেন ?’ ঘড়ঘড়ে গলায় বলল জাদুকর।
একবার মনে হল বলি আমরা লেখাপড়া জানি না। শেষে সত্য কথাই বললাম- পথ হারিয়ে ফেলেছি।
আমরা অভিযাত্রী শুনে চেহারা সামান্য নরম হল। জিজ্ঞেস করলো চা পান করব নাকি ?
না করার উপায় নেই। ক্লান্ত । তেষ্টা পেয়েছে।
সবাই গোল হয়ে বসে পড়লাম। জাদুকর সাহেব হেঁড়ে গলায় বললেন- ' এই কেতলি কই গেলি ?'
বলা মাত্র তাসের প্রাসাদের ভেতর থেকে হেঁটে হেঁটে একটা পেল্লাই সাইজের কেতলি চলে এলো। গিয়ে বসলো চুলার উপর।
মারাত্নক দৃশ্য।
এইবার জাদুকর আকাশের দিকে চেয়ে আঙ্গুল দিয়ে তুড়ি দিল। কয়েক টুকরো মেঘ ছেঁড়া তুলার মত ভাসতে ভাসতে চলে এলো কেতলির উপর । মেঘ গলে বৃষ্টি হয়ে নামলো কেতলির ভেতর।
পাঞ্জাবির পকেট থেকে এক মুঠো চায়ের পাতা নিয়ে ছুড়ে দিল কেতলির ভেতরে। চা ফুটতে শুরু করলো।
‘চিনি দেবেন না ?’ মিহি গলায় জানতে চাইল চন্দ্রখাই।
আবারো বিরক্ত হল জাদুকর।
পরিস্থিতি সামলে নেয়ার জন্য বললাম-' বাথরুমে গিয়ে হাত মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা আছে ?'
হাত তুলে দেখিয়ে দিল জাদুকর।
সামনে একটা বাথরুম। পিচ্চি একটা হাতি শুড় দিয়ে বালতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাথরুম ভর্তি আয়না। কাজ শেষে বাইরে বেরুতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেললাম। ঘুরে ঘুরে ফাঁকা একটা জায়গায় দেখি একগাদা বুড়ো মানুষ শুয়ে শুয়ে মরার মত ঘুমাচ্ছে।
চমকে গেলাম। আরে একি কাণ্ড !
মনে পড়লো- অনেকের মুখে অমন একটা গল্প শুনেছি।
বান্দাকুশ পর্বতের আরও দূরে মায়া পর্বত।
দুষ্ট এক জাদুকর থাকে। অভিযাত্রীদের বিচিত্র পানীয় পান করায় আপ্যায়নের ছলে। সেই পানীয় পান করলে মানুষগুলো ঘুমিয়ে পড়ে । সেই ঘুম আর ভাঙ্গে না।
দ্রুত ফিরে এলাম।
চা বানানো শেষ । সবার হাতে নীল পেয়ালা ভর্তি চা।
ভাগ্য ভাল তখনও কেউ চুমুক দেয়নি। শুধু আমার কুকুরটা সামান্য খেয়ে ফেলেছে। চটপট চন্দ্রখাইয়ের কানে কানে সব বললাম। চন্দ্রখাই আবার লক্কড় সিং আর ছক্কর সিঙের কানে কানে বলল।
‘কি ব্যাপার ? চা খাবার সময় কানে কানে কানাঘুষা করছ কেন ?’ বিরক্ত হয়ে বলল জাদুকর।
‘আসলে বিস্কুট ছাড়া চা গিলতে কষ্ট হয়।’ মিহি গলায় বলল চদ্রখাই। ‘ আমাদের বয়ামে কিছু বিস্কুট আছে । বের করি ?’
এই বলে চন্দ্রখাই বয়াম খুলে কয়েকটা ঘুম প্রজাপতি বের করে ছেড়ে দিল জাদুকরের মুখের সামনে।
সেইগুলো উড়তে উড়তে গিয়ে বসলো জাদুকরের নাকের ডগায়। হাউ মাউ করে চেঁচিয়ে উঠলো দুষ্টু জাদুকর । দুই হাত উপরে তুলে -ছু মন্তর ছু বলে উঠলো।
আমরা উঠে দৌড় দিলাম।
সঙ্গে সঙ্গে তাসের প্রাসাদটা ভেঙ্গে পড়তে লাগল ।
বাতাসে ভেসে তাসগুলো ছুটে আসতে লাগলো আমাদের দিকে। ক্ষুরের মত ধার সেই তাস । কয়েক জায়গায় কেটে গেল।
সাই সাই শব্দে বালুঝড় উঠলো। আমাদের জামা কাপড় ছাড়া সব উড়ে গেল। চোখের সামনে হারিয়ে গেল দুষ্ট জাদুকরের শেষ চিহ্ন।
বড় একটা পাথর আমার মাথায় আঘাত করতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। যখন হুশ ফিরল তখন দেখি পাশে বসে লক্কড় সিং আর ছককড় সিং নিজেদের সারা শরীরে ব্যাথানাশক মলম মালিশ করছে।
চন্দ্রখাই বসে বসে খুব মনযোগ দিয়ে লবণ দেয়া মাছ খাচ্ছে। আমরা তখনই আর বেশি আলোচনা না করে জিনিসপত্র গুটিয়ে বন্দাকুশ পাহাড়ের দিকে ফিরে চললাম।
[ প্রফেসর হুঁশিয়ারের ডায়েরি এইখানেই শেষ।
কিন্তু আমরা আরো খবর জানবার জন্য তাঁকে চিঠি লিখেছিলাম।
তার উত্তরে তিনি তাঁর ভাগ্নেকে পাঠিয়ে দিয়ে লিখলেন, "এর কাছেই সব খবর পাবে।"
চন্দ্রখাই-এর সঙ্গে আমাদের যে কথাবার্তা হয় খুব সংক্ষেপে তা হচ্ছে এই-
আমি এবং প্রকাশক প্রকাশ মিত্র - ' আমরা আপনার মামার ডায়েরিটা বই হিসাবে ছাপতে চাই । এখন পাঠক প্রমাণ হিসাবে সেইসব নমুনা দেখতে চাইবে। ঘুম প্রজাপতি। মুরগীসরাস। তাওয়ামাছ। পিচ্চিলোডন।জিলিপি ফল। সেই সব নমুনা কোথায় গেলে পাওয়া যাবে ?’
চন্দ্রখাই- ' সব নমুনা বালিঝড়ে হারিয়ে গেছে।'
আমি এবং প্রকাশক - ' সব হারিয়ে গেল ? আপনাদের এই নমুনা সারা দুনিয়া পাল্টে দিতে পারত আর আপনারা হারিয়ে ফেললেন ?'
চন্দ্রখাই- ' বেঁচে যে আছি সেটাই বড় কথা। জাদুকরের ঝড় সহজ ভেবেছেন নাকি। এটা তো কাল বৈশাখী ঝড় না, যে কয়েকটা পাকা আম পড়বে আর টিনেরর চাল উড়বে।
' অমন ঝড় তো আপনারা দেখেন নি। কল্পনাও করতে পারবেন না। এক-এক ঝাপটায় আমাদের যন্ত্রপাতি, বড়ো-বড়ো তাঁবু আর নমুনার বাক্স, সব কাগজের মতো হুস্ করে উড়িয়ে নেয়। আমাকেই তো পাঁচ-সাতবার উড়িয়ে নিয়েছিল।
' একবার তো ভাবলাম মরেই গেছি। কুকুরটাকে যে কোথায় উড়িয়ে নিল, সে তো আর খুঁজেই পেলাম না। সে যা বিপদ! কাঁটা কম্পাস, প্ল্যান ম্যাপ, খাতাপত্র কিছুই আর বাকি রাখে নি। কি করে যে ফিরলাম, তা শুনলে আপনাদের কম্পজ্বর হয়ে যাবে। তিন লিটার করে লেবুর শরবত খেতে হবে। বাসক পাতার ভর্তা ও খেতে হবে ।
' আধপেটা খেয়ে, কোনোদিন না খেয়ে, আন্দাজে পথ চলে, দুই সপ্তাহের রাস্তা পার হতে আমাদের পুরো তিনমাস লেগেছিল। আমাদের দাঁড়িগোঁফ বড় হয়ে সাধু সন্ন্যাসীদের মত হয়েগিয়েছিল । ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে আমাদের চুল দাঁড়ি কাটতে হয়েছিল।’
আমি এবং প্রকাশক - ' আমাদের তো প্রমাণ লাগবে। নইলে তো এই লেখা ছাপা যাবে না।'
চন্দ্রখাই- ' ' কেন আমি আছি। মামা আছে। কতগুলো ছবি এঁকে এনেছি। লেখার সাথে দিয়ে দিন। এতেই পাঠক খুশি হবে।’
আমাদের জন্য যে ছেলেটা চা বানাচ্ছিল সে হেসে বলল- ' দাদা , এইগুলো তো গোগোল থেকে প্রিন্ট করা যায় ।'
প্রুফ দেখার ছেলেটা বলল - ' তা , আপনি কোন সরাস ? মনে তো হচ্ছে গপ্পোসরাস।
সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রখাই ভীষণ রেগে টেবিলের উপরে রাখা সিঙ্গারা থেকে ছয়টা সিঙ্গারা টুক করে পকেটে ভরে ফেলল। চায়ের কেতলিটা হাতে নিয়ে হনহন করে চলে গেল।
তো, ঘটনা এখানেই শেষ। এখন তোমরা কেউ যদি আরো জানতে চাও, তা হলে আমাদের ঠিকানায় প্রফেসর হুঁশিয়ারকে চিঠি লিখলে আমরা তার জবাব আনিয়ে দিতে পারি। ]
(শেষ)


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন