সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মায়াবী সৌরভ

 খুব বাটুল ধরনের একটা শিশি কিনে আনলো বাবা।

অমন শিশি আগে দেখিনি। এমনিতে নারকেল তেলের শিশি দেখেছি। শীতকালে ভেতরের তেল জমে দারুন একটা হালুয়ার মত হয়ে যায়। বুঝতে পারি সেই দিন কড়ক ধরনের শীত পড়েছে ।

অহ হ্যাঁ,  কেরাসিন তেল ও শিশি ভর্তি করে কিনি। ওটার গলায় আবার পাটের সূতলি বাঁধা থাকে । মনে হয় শিশিটা মরার আগে ফাঁসি দিয়েছে।কিন্তু অমন গোলাপি রঙের বাটুল শিশি ... নাহ প্রথম দেখলাম।

'ওটাকে পারফিউম বলে।' লেকচার দেয়ার চেষ্টা করলো বাবা। 'বিদেশী আতর বলা যায়।ধরবি না কিন্তু। তাহলে টেংরি ভেঙ্গে লুলা বানিয়ে ফেলব। শুধু বিয়ে বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাবার সময় একটু দিয়ে যাবি। তাহলে সবাই বুঝবে তুই অভিজাত  আর রইস আদমি ।'

এই বলে শিশিটার মাথায় কায়দা করে চাপ দিল । সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাস ফ্যাস করে মিহি তরল কি যেন বের হল। আর অদ্ভুত এক মিষ্টি সৌরভে পুরো বাড়ি ভরে গেল।আলমারির উঁচু একটা তাকে ওটা রেখে দিল বাবা। যাতে নাগাল না পাই।

দাওয়াতের আশায় রইলাম।

হিন্দুরা দিত নিমন্ত্রণ আর মুসলমানরা দিত দাওয়াত।

হিন্দুদের খাওয়ায় পাঁঠার মাংস থাকতো। কয়েক জায়গায় লুচি দিত।এক হাতা সবজির ঘ্যাঁট। ল্যাবড়া বলতো ওটাকে।  বেগুনী দিত প্রায় দশ নাম্বার চটি জুতার সাইজের।মুসলমানদের দাওয়াতে গরুর মাংস আর ফিরনী বা জর্দা সাথে বোরহানি থাকতো।

বেশির ভাগ দাওয়াত পেতাম শুক্রবার।

সবার সুবিধে হত।

ঝলক কমিউনিটি বা খাই খাই কমিউনিটি সেন্টার চালু হয়নি তখনও ।

মহল্লার একটা ফাঁকা মাঠে বা কারো বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল করে অনুষ্ঠান চালান হত। ভাই ভাই ডেকরেশন বা টিপটপ ডেকোরেশন থেকে  ভাড়া আনা হত ফোলডিং করা চেয়ার টেবিল। সস্তা কাচের গ্লাস। চিনামাটির বড় বড় তশতরী।  

চেয়ারগুলোতে বসতে গেলে দশ জনের মধ্যে দুই জন চিত পটাং হয়ে পরে যেত।ডেকোরেশনের লোক জন একটা বেসিন দিত সাথে টিনের বড় একটা ড্রাম। ড্রামের মধ্যে কায়দা করে কল সেট করা। হাত মুখ ধোয়ার জন্য এই নাটক।পাশে আমের আঁটির সাইজের একটা সাবান আর ময়লা তোয়ালে  থাকতো। তোয়ালেতে মাংসের ঝোলের ঘ্রান।আর হলুদ দাগ।

 এই সব প্যান্ডেলের বাইরে এক গাদা কুকুর হাঁটা হাঁটি করতো।

ওদের দাওয়ার বা নিমন্ত্রণ দিতে হত না। খাবারের ঘ্রানে সব চলে আসতো। পাশের মহল্লার কুকুরও চলে আসতো। দুই মহল্লার কুকুরের মধ্যে ভাল এক চোট দাঁত খিচানি লড়াই হত। বাধ্য হয়ে কর্তা মার্কা কোন ব্যক্তি মোটা এক লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তো কুকুর পেটাতে । কুকুরগুলো তখন কাউইয়াই  কাউইয়াই  বলে চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড় দিত। খানিক পর লোভী চেহারা করে আবার ফেরত আসত।

আমি নিজে এক বিয়ে বাড়িতে খেতে গিয়ে টের পেলাম, টেবিলের তলায় কি যেন নড়ছে। দেখি, এক গাদা কুকুর।হায় হায়। টেবিলের পাশে চেয়ারে বসে মানুষ খাচ্ছে। আর টেবিলের তলায় এক গাদা কুকুর হাড্ডি গুড্ডি নিয়ে মহাভোজ করছে।

সাদামাটা ছাপানো কাগজে নিমন্ত্রণপত্র চলে আসতো ।

ভেতরে সুন্দর বিনয়ী ভাষায় কিন্তু একঘেয়ে বাচন ভঙ্গিতে লেখা থাকতো- পর সমাচার  এই যে আমার কনিষ্ঠ পুত্র লালু দারুওয়ালার  সাথে পিতল ঠাকুরের এক মাত্র কন্যা শ্রীমতি  ঝিঙা রানীর শুভ বিবাহ ধার্য করা হয়েছে, আপনি/  আপনারা সবান্ধব আমন্ত্রিত।

নীচে ভোজের জায়গা আর সময় দেয়া থাকতো। সাথে লেখা থাকতো -রোজ শুক্রবার।

ব্যাপারটা ফাজলামি। অনেক নিমন্ত্রণ কার্ডের কথা অনুয়ায়ি আমি পরের শুক্রবার গিয়ে দেখেছি খাওয়া দাওয়ার কোন ব্যবস্থাই নেই। তা হলে রোজ শুক্রবার লেখার মানে কি ? অ্যাঁ ?

আর দাওয়াতে গেলে যে জিনিস বিরক্ত লাগতো তা হল আমার চেয়ারের পিছন ধরে আরেক জন ক্যংলা মত লোক দাঁড়িয়ে থাকতো। মানে আমি উঠা মাত্র সে চেয়ার টেনে বসে পড়বে।এখন কথা হল , খাওয়ার সময় যদি কেউ ঘাড়ের উপর লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তবে কি খাওয়া যায় ?

দুই চার জন দেখি মুরগীর রান এমন ভাবে চিবোয় যে দুই গালে মাংসের ঝোলের প্রলেপ পড়ে যায়। মেয়েরা মেকাপ করার সময় যে ভাবে রুজ বা অন্য কোন মেকাপ দেয় । বেশির ভাগ সময় গরমে দরদর করে ঘামতে ঘামতে দাওয়াত খেতে হত।

সালাদ হয়ে যেত টক।

বিয়ে বাড়ির দাওয়াত হলে একটা কেওয়াজ হতো ই হত।

একজন মোটা মত লোক হঠাৎ চিক্কুর দিয়ে বলত, হায় হায় আমাকে দেখি দই দেয় নাই। ঘটনা কি ? অ্যাঁ ? আমি কি হালার ধইঞ্চা ? শালার দাওয়াতই খামু না।

অথচ ইতিমধ্যে তার খাওয়া শেষ। এক্সটা তিন পিস মুরগীর রোষ্ট খেয়ে বসে আছেন। সেটা কাউকেই বলেননি। গরুর রেজালা নেননি। যে দিতে এসেছিল তাকে বলেছে, ভাই আমি হিন্দু গরু খাই না।অথচ তিনটে রোষ্ট খেয়ে বলে উঠলেন, মাশাল্লা দারুন রান্না।

হায় হায়।

ইস্কুলের বাংলা স্যার একবার বিরস মুখে বলেছিলেন, "দাওয়াতের আগে যাবি, নইলে পরের ব্যাচে খেতে বসলে দেখবি প্লেট ভাল করে ধোয়া হয়নি।গ্লাসে মেয়েদের লিপস্টিকের দাগ। আর ভাল মাংসের বদলে খালি হাড্ডি আর চর্বির টুকরা। এই জন্যই কথায় বলে দাওয়াতের আগে আর বিচারের শেষে।'

তো আসল কথায় আসি।

সেই মৌসুমে নিমন্ত্রণ পেলাম। তবে ভিন্ন ধরনের। বিয়ে বা জন্ম দিন না।আধা পরিচিত এক বুড়ো লোক মারা গেছে। ধরা যাক তার নাম মদন তপাদার। সেই মৃত ব্যক্তির ছেলে পিলে সবাইকে খাওয়াবে।একে শ্রাদ্ধ বলে। আমি বই পত্র পড়ে জানতাম শুধু ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ হয়।

এমনিতে শ্রাদ্ধ খাওয়া নাকি ভাল না। কিন্তু আমার বাবা নিমন্ত্রণ পেলে না করে না। যাবে ই যাবে।সাথে করে আমাকে নিয়ে যাবে। আর এক গাদা মানুষের সামনে জিজ্ঞেস করবে,আচ্ছা বল তো বানর কুৎসিত হলেও চালাক প্রাণী ইংরেজিতে কি হবে?

সঙ্গত কারনে এই সব বিদঘুঁটে অনুবাদ পারি না। আর বাবা সবার সামনে নিজের কপাল থাপরে হায় হায় করে বলে আহা রে তর লেখা পড়ার নামে আমি টাকা পয়সা জলে ফেলছি রে...

 নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে বাবা নানা রকম নাটক করে।

যত বিচ্ছিরি রান্নাই হউক খাওয়া শেষে তিনি বাবুর্চিকে গিয়ে বলবে, ভাই আপনার হাতে তো জাদু আছে। এমন হাত  প্যালাডিয়াম   (Palladium) দিয়ে বাঁধাই করা দরকার।

যাকে বলা হত সে ভয়ে তোম্বা হয়ে যেত। অর্থ বুঝলে তো।কে জানে   প্যালাডিয়াম  নামে ভয়াবহ মূল্যবান এক ধাতু আছে। যা সোনা রূপার চেয়ে বহুগুণ দামি।

মদন তপাদারের শ্রাদ্ধ খাওয়ার জন্য রেডি হলাম। বাবা আলমারির ভেতর থেকে গোলাপি রঙের বাঁটুল শিশি বের করে আনল।যেটা কিনা পারফিউম বলে।বলল, এই এদিকে আয় তো পারফিউম দিয়ে দেই।'

আমি সামনে যেতেই বাবা  ফ্যাস করে  শিশির  কোথায় যেন চাপ দিল। এক গাদা  বাস্পের মত তরল এসে ঢুকে পড়ল আমার বাম চোখে। ভীষণ জ্বালা করতে লাগল।মুহূর্তেই আমার চোখ ফুলে লাল হয়ে গেল।

মদন তপাদারের বাসায় যখন শ্রাদ্ধ খাচ্ছিলাম তখন ও আমার চোখ লাল হয়েছিল।

কে একজন বলল, ছেলেটা কাঁদছে রে। মদন বাবুর নাতি বোধ হয়। দে, ওকে একটা বেশি লুচি দে।

লাল চোখের জন্য একটা লুচি আর এক হাতা লাবড়া বেশি পেলাম।

মদন তপাদারের শ্রাদ্ধ খাওয়া ছিল আমার শেষ নিমন্ত্রণ খাওয়া।

কারন আর কিছুই না। খেয়াল করে দেখি স্বয়ং মদন তপাদার বাবুই সবাইকে লুচি আর দই দিচ্ছেন।এত ভয় পেয়েছিলাম বলার মত না।গলায় লুচি আঁটকে মরে যেতাম প্রায়। শুধু বাবা বলেছিল, উনাকে প্রনাম কর। উনি মদন তপাদারের যমজ ভাই, খুব ভাল মানুষ।

আরও একটা কারনে আর নিমন্ত্রণে যাইনি।

পরের বছর বাবার ব্রেইন ষ্টোক হল। হাসপাতালে নেয়া হল বাবাকে। আর কি ভাবে যেন বাঁটুল সেই গোলাপি সৌরভের শিশিটা আলমারির উপর থেকে ফেলে ভেঙ্গে ফেললাম ।

শীতের উদাস দুপুরে আমাদের বাড়িটা ভরে গেল অচেনা মন মাতানো এক সৌরভে।

ঠিক যেন জনপ্রিয় কোন লেখকের লেখা ছোট গল্পের মত।

যা সবার জীবনে হয়।

বাইরে তখন গাদা ফুলের মত রোদ। আমার বুক ভর্তি শোক আর সোনালী সৌরভ।

 

সুগন্ধির ব্যবহার মানুষ সেই প্রাচীন কাল থেকেই করতো। মহাভারতে কত সুগন্ধির কথা আছে। আমরা শুধু চন্দনের কথা জানি। প্রাচীন মিসরে হরেক কায়দা করে নানান ধরনের সৌরভ বানানো হত।

আজকাল কত কোম্পানি বের হয়েছে। ওরা গোলাপ ফুল থেকে শুরু করে তিমি মাছের তেল দিয়েও নাকি পারফিউম বানায়।

ভাল কথা আমরা কিন্তু নাক দিয়ে ঘ্রান পাই না। ঘ্রান চিনতে পারি মস্তিষ্ক দিয়ে।ঘ্রানের আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এটা আমাদের মনের জানাল খুলে দিতে পারে চট করে । তৈরি করতে পারে মায়াবী বিভ্রম। মুহূর্তের জন্য নিয়ে যেতে পারে অতীতে।

ঘ্রান থেকে যায় মগজের কোষে কোষে। সারা জীবন। জরিপে দেখা গেছে একজন মানুষের কাছে শৈশবের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘ্রান হচ্ছে ক্রেয়নের( এক ধরনের খড়িমাটির রঙ পেনসিল) ঘ্রান।

যাদের ঘ্রান শক্তি কম তারা হতাশায় ভোগে বেশি। আমাদের নাকের যেই সব কোষ ঘ্রান নিতে সাহায়্য করে সেই সব কোষ প্রতি ২৮ দিন পর পর নতুন করে জন্ম নেয় ।অর্থাৎ ২৮ দিন পর পর আমরা নতুন নাক পাই। কিন্তু দুঃখজনক বয়সের কারনে আমাদের ঘ্রান শক্তি কমে যায়।

যে কোন সৌরভের জাদুকরী শক্তি আছে, মুহূর্তের মধ্যে আপনার মন ভাল করে দিতে পারে। কাজে উৎসাহ ফিরিয়ে আনতে পারে। প্রিয়জনের প্রতি ভালবাসা তৈরি করতে পারে।অন্ধ মানুষের ঘ্রানশক্তি কম হয়।

পারফিউম প্রথম বানানো হয় প্রাচীন মিসরে। ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করা হত।মেসপটেমিয়ায় প্রথম পারফিউম বিক্রি হত। নাম ছিল- টাপুটা।

সবচেয়ে  প্রাচীন যে পারফিউমের কারখানা পাওয়া গেছে সেটা ৪ হাজার বছরের পুরানো।

জরিপে দেখা গেছে ছেলেরা সকালের নাস্তার টাটকা ঘ্রান বেশি পছন্দ করে করে। আর মেয়েরা সদ্য জন্ম নেয়া বাচ্চার শরীরের ঘ্রান বেশি পছন্দ করে। ১৩৭০ সালে প্রথম পারফিউমের কোম্পানি বাজারে ওদের পণ্য ছাড়ে। নাম ছিল- হাংরি ওয়াটার।

মানুষের শরীররে ৬ মিলিয়ন গন্ধ সনাক্তকরণ কোষ আছে।খরগোসের আছে ১০০ মিলিয়ন। কুকুরের আছে ২২০ মিলিয়ন।আমাদের যেমন প্রিয় ঘ্রান আছে জীব জন্তুর আছে।

সিংহ পুদিনা পাতার ঘ্রান পছন্দ করে। বিড়াল করে ভ্যালেরিয়ান (Valerian -কড়া গন্ধযুক্ত সাদা বা গোলাপী ফুলের গুল্ম) আর উট করে তামাকপাতার ঘ্রান।

গবেষণায় দেখা গেছে চামড়ার নতুন জ্যাকেট আর নতুন জুতার ঘ্রানে সবার মন কম বেশি ভাল হয়ে যায়। সব চেয়ে বেশি হয় নাকি নতুন গাড়ির ঘ্রানে।তাই গাড়ি কোম্পানি গাড়ির ভেতরে নতুন গাড়ির ঘ্রান কৃত্রিম ভাবে স্প্রে করে দেয়।

মজার ব্যাপার মেয়েদের ঘ্রান শক্তি ছেলেদের তুলনায় অনেক গুন বেশি।

প্রকৃতি তাদের এই গুন দিয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই।

স্মৃতির সাথে ঘ্রান মিশে থাকে। বা উল্টো বলা যায় ঘ্রানের সাথে অতীতের স্মৃতি মিশে থাকে।

আমার শৈশবের কথা মনে হলেই বৃষ্টির ঘ্রান পাই আমি।

বিশ্বাস করুন একদম টাটকা ঘ্রান। জানালার পাশে বসে আছি যেন আজও। বাইরে আকাশ ভর্তি মেঘ। হাতির পালের মত মেঘ দৌড়ে বেড়াচ্ছে আকাশ ভর্তি। যেন এক পাল হাতি মোম্বাসা থেকে নাইরোবি যাচ্ছে। বাতাসে ভেজা ঘ্রান। দূরের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে জলজ ঘ্রান ভেসে আসছে। বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়তেই ভেজা মাটি থেকে অদ্ভুত রকম একটা ঘ্রান বের হয়।

আপনি জানেন ? পেয়েছেন কখনও ?

পাঠাগারে যেতাম বই পড়তে। নিঝুম দুপুরে বইয়ের পাতায় চোখ রেখে মগ্ন হয়ে যেতাম।

পুরানো বই , কাঠের গোবদা গোবদা আলমারি আর ধূলা মাখা কাঁচের ভেতর থেকে অচেনা মিশ্র একটা ঘ্রান পেতাম।

বইগুলো সব আদ্দিকালের পুরানো। কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে কাঠের ব্লকে ছাপানো। দেব সাহিত্য কুটির বা অমন কোন মিষ্টি নামের।

মনে হত হাজার বছরের জ্ঞানের ঘ্রান পাচ্ছি। ঠিক মন মাতানো ঘ্রান না। দুর্লভ কোন গুল্মের ঘ্রানের মত।

কিন্তু ভাল লাগতো। মনে হত অতীতে হারিয়ে গেছি।বসে আছি  ব্যবিলনের কোন রাজার পাঠাগারে।

সন্ধ্যায় বই বগলে নিয়ে বাড়ি ফিরতাম।

নির্জন একটা পথ । লাল সুরকি বিছানো। দুই পাশে বুনো তুলসির ঝোপ। কেমন বুনো  ঝাঁঝালো একট।ঘ্রান পেতাম।মাতাল বানিয়ে ফেলত আমাকে।

এই একটা পথেই এক এক মৌসুমে ভিন্ন ভিন্ন ঘ্রান পেতাম।

পথের ধারে কালো কুচকুচে ডোবা থেকে ভেসে আসতো জিওল মাছের ভেজা ঘ্রান। জল কলমি আর কচুরিপানার শেকড়ের ঘ্রান।

রেল ইষ্টিশনের পাশে শুকনো লতাপাতা পুড়িয়ে ওম পোহাত এক দঙ্গল বুড়ো মানুষ।ধোঁয়ার মিষ্টি একটা ঘ্রান পেতাম শীতের কমলা রঙের বিকেল গুলোতে।

ফসল পেকে গেলে একটা ঘ্রান পেতাম। কবি সাহিত্যিকরা যেটাকে বলত- ফসল বিলাসি হাওয়া। সেই ঘ্রানে সারারাত ফসলের ক্ষেতে পাগলের মত ছুটোছুটি করতো লক্ষ্মী প্যাঁচা আর ইঁদুর।আবার ফসল কাঁটা হয়ে গেলে মাঠে ঘাটে ছড়িয়ে থাকতো অন্য রকম একটা ঘ্রান।

কে না জানে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রকৃতিতে অদ্ভুত সব সৌরভ জন্ম নেয়।

উৎসবের আগে বাতাসে খুশির ঘ্রান পাওয়া যায়।যেমন শরৎ কাল এলেই বাতাসে পূজার ঘ্রান পেতাম।

তখন প্রকৃতি কেমন হয়ে যেত।

আমাদের বাসায় আনন্দমেলা পত্রিকা আসতো। ওখানে হরেক কমিকস ছাপা হত। টিনটিন, রোভাসের রয়,অরন্যদেব যেটা পরে ফ্যা্নটম নামে ছাপা হত। ছিল জাদুকর ম্যানড্রেক,টারজান আর ফ্ল্যাস গরড়ন।

বুদ্ধদেব গুহের ঋজুদা নামের এক চরিত্রের গল্প ছিল। শিকার কাহিনি।প্রফেসর শঙ্কুর গল্প ও পেতাম।

পূজার আগে আকাশটা অপরাজিতা ফুলের মত নীল হয়ে যেত।তুলার মত আকাশে মেঘ থাকতো কিছু। বাতাসে কেমন পূজার ঘ্রান।

সন্ধ্যার সময় কেমন বেলি ফুলের গন্ধওয়ালা বাতাস ভেসে আসতো

কোত্থেকে যেন।

আহা!

তখন আমার শহরের বাতাসগুলো কত দূর দেশের খবর নিয়ে আসত সৌরভের খামে করে।

আমার জীবন কেটেছে সৌরভময়। পরম করুণাময় বিধাতার কাছে আমি কৃতজ্ঞ ঘ্রান ইন্দ্রিয় সুস্থ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন উনি। উপভোগ করেছি ধরিত্রীর ঘ্রান।

ময়ূরকণ্ঠী রাতে বুক ভরে শ্বাস নিয়েছি। চারিদিকে জোসনার ঘ্রান।কাঠ গোলাপ ফুল ভর্তি ছিল মারিয়ানা দ্বীপ। রাতের বেলা  দ্বীপের বাতাস হয়ে যেত সুগন্ধি চাদরের মত । কাঠ গোলাপ ফুলের ঘ্রান ভেসে বেড়াতো দ্বীপের নিঝুম গ্রামগুলোতে ।

সে কি পাগল করা সৌরভ...

নারকেল গাছের ডালাপালায় আঁটকে থাকতো হলুদ চাঁদ। বাতাসে সমুদ্রের নোনা ঘ্রান । লেগুনের ভেতরে শ্যাওলা পচা ঘ্রান, দূর সমুদ্রে হাঙরের কান্না।

কোন ঘ্রান আপনার ভাল লাগবে বা কোন ঘ্রান আপনার ভাল লাগবে না সেটা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। ধর্ম, রুচি, বিশ্বাস, সংস্কৃতি,আপনার  ভৌগলিক অবস্থান এই সবই আপনার ঘ্রান রুচিকে নিয়ন্ত্রন করবে।

ফিলিপিনো কিছু প্রতিবেশী ছিল । খাবারে ফিস সস ব্যবহার করতো।শিশি ভর্তি বাদামী তরল। ছিপি খুললেই শুটকি মাছের মত ঘ্রানে চারিদিক উথাল পাথাল হয়ে যেত।সুস্থ মানুষ পাগল হয়ে যাবে সেই ঘ্রানে। কিন্তু ওদের খুব প্রিয় এই ফিস সস।

ঝলসানো ঝিনুকের ঘ্রানে আমার জিভ দিয়ে পানি চলে আসে। অথচ অনেক বাঙ্গালী আমাকে এড়িয়ে চলে কেন আমি সি ফুড শেফ হলাম।

বাড়িওয়ালা মাইকেল সেদ্ধ বাঁধাকপি দিয়ে পাউরুটি খেতে পছন্দ করে।অথচ ভারতীয় এক ভাড়াটে গুরু ভাই সেই মন মাতানো বাঁধাকপির ঘ্রানে বলে- ইয়ার বদবু আ রাহা হ্যায়।।

বোঝ ঠ্যালা।

পিচ্চিবেলায়  ইশকুল থেকে ফেরার পথে এক শরবতওয়ালাকে পেতাম পথে। মাত্র পঞ্চাশ পয়সা দিলেই দারুন এক গ্লাস শরবত বানিয়ে দিত। শুধু বরফের কুঁচি আর বোতল ভর্তি রঙ ছিল। শেষে এক পিচ্চি শিশি থেকে এক ফোঁটা কি যেন ঢেলে দিত  শরবতে। বললে বিশ্বাস করবেন না। অদ্ভুত চনমন করা কলার ঘ্রানে ভরে যেত শরবতের গ্লাসটা।

অনেক দিন পযন্ত রহস্য ভেদ করতে পারিনি।শরবতওয়ালার কাছে কখনই কলা ফলা দেখিনি।

পরে বড় হয়ে জেনেছি ওটা ফুড ফ্লেভার। যে কোন খাবারের ঘ্রান কৃত্রিম ভাবে বানানো যায়। আর ব্যবহার করাও হয় হরদম।

আমার কাছে খুব বড় মাপের শিল্পী মনে হত লোকটাকে ।আমি নাম দিলাম বরফের কারিগর ।এই বরফের কারিগরকে পুরো গরমকালটাই পেতাম ।ঢাউস কাঁচের গ্লাসে করে রঙিন শরবত বিক্রি করত ।ছোট ছক্কা সাইজের এক টুকরো লেবুও দিত ।লেবুটার সাইজ ছিল ছয়মাসের একটা বাচ্চার কড়ে আঙ্গুলের প্রথম কড়ের সমান ।আমরা জল্পনা কল্পনা করতাম একটা আস্ত লেবু আসলে কয় টুকরো করে এই বরফ শিল্পী ।সাহস করে প্রশ্ন করতে পারিনি কোনো দিন ।আমি শুধু অবাক বিস্ময়ে দেখতাম এক টুকরো বরফ ঘষে কিভাবে সে বানিয়ে ফেলে রঙিন একটা বরফের ফুল বা বরফ মালাই ।আজকাল এদের আর দেখিনা পথেঘাটে ।গরমের ঝিমধরা দুপুরগুলোতে কোথায় গেল এরা ?

স্বাদ এবং ঘ্রান কিন্তু একই জিনিস না।

আমরা মনে করি এক। লেকিন কভি নেহি। তবে স্বাদের ৮০% হচ্ছে ঘ্রান।

ঘ্রান ভাল তো খাবার ভাল। ঘ্রানের রহস্য আছে।যেমন লবঙ্গ হচ্ছে একটা ফুল। শুকিয়ে গেলে দারুন

ঘ্রান বের হয়। খাবারে সুগন্ধি যোগ করার জন্য আমরা তেল, পাতা , কুঁড়ি, শেকড়,গুল্ম এমন জিনিস যোগ করি।

জিনিস যথেষ্ট না থাকলে কৃত্রিম সৌরভ যোগ করি খাবারে। এই কৃত্রিম সৌরভ বানানো হয় হরেক পদের ক্যামিকেল দিয়ে। সে গুলোর নাম আমাদের জানার দরকার নেই। কারন এটা রসায়নের ক্লাস না। মিলন বাবুর আড্ডা।

ঠিক আছে ?

খাবারের কৃত্রিম সৌরভ বানানোর জন্য যে সব ক্যামিকেল ব্যবহার করে অমনটা ভাবা ভুল। যেমন ধরা যাক ভ্যানিলার কথা। চন মন করা ভ্যানিলা আইসক্রিমের স্বাদ কে না জানে ? এই ভ্যানিলা বানানো হয় মেক্সিকান এক অর্কিড দিয়ে। সমস্যা আগের মতই ।এত হাজারে বিজারে ভ্যানিলার অর্কিড পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম ভাবে ভ্যানিলা বানাতে হয়।বেশির ভাল লোকজন জানে না তারা হরদম কৃত্রিম সৌরভের খাবার খাচ্ছে। স্ট্রবেরি শেক নামে যে পানীয় বিক্রি হচ্ছে মোটেও  স্ট্রবেরি থাকে না ওখানে। থাকে শুধু ঘ্রান।

আঙ্গুরের   ঘ্রানওয়ালা যে সব ক্যান্ডি আর কোমল পানীয় পাওয়া যায় জীবনেও ওখানে আঙুর দেয়া হয় না।

সামান্য কোন ঘ্রান আপনাকে একদম সুখী করে তুলতে পারে, জানেন ?যেমন পাইন গাছের সুবাস। জুঁই ফুলের ঘ্রান। ভ্যানিলার ঘ্রান।কফির ঘ্রান। এমন কি শুনতে অদ্ভুত হলেও সদ্য কাঁটা ঘাসের ঘ্রান আপনাকে সুখী করে তুলতে পারে মুহূর্তেই।

সাইকোলজিক ব্যাখ্যা ও আছে।

আমি তখন সিডনী শহরে মাসকট নামে এক জায়গায় থাকতাম।

বাড়ির খানিক দূরে ছিল রুটির দোকান। ওরা গভীর রাতে কাজ শুরু করতো যাতে সকাল সকাল সদ্য আভেন বেকড করা রুটি সারা শহরে বিক্রি করতে পারে।বিশ্বাস করবেন না, টাটকা রুটির মায়াবী এক মিষ্টি ঘ্রান ছড়িয়ে পড়তো সারা এলাকা জুড়ে।বুক ভরে ঘ্রান নিতাম। মনে হত এটাই বোধ হয় জীবনের গন্ধ।

সবারই উচিৎ মাঝে মাঝে বুক ভরে ঘ্রান নেয়া।

 কত পদের সুগন্ধি বাজারে পাওয়া যায়। অভাব নেই। ফুটপাথের সস্তা বোতল হতে শুরু করে দামি ব্র্যান্ডের পযন্ত। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় চ্যানেল নাম্বার ফাইভ। প্রতি ৫৫ সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও বিক্রি হচ্ছে এর একটা শিশি।

সারা জীবন শেফ হিসাবে কাজ করেছি। দিনে গড়ে ১০ ঘণ্টা পার করেছি কিচেনে।সারাক্ষণ লোভনীয় খাবারের ঘ্রান পেয়েছি। গলদা চিংড়ি সাথে রসুনের সস। বড় বড় বাগদা চিংড়ি সাথে মাখন আর লেবুর সস। ঝলসানো স্যামন মাছ যার পেটের ভেতরে ঠেসে ভরা সুগন্ধি লেবুর  ঘ্রানওয়ালা ঘাস  আর থাইম নামের এক গুল্ম ।

কয়লার হালকা আঁচে যখন বড় বড় সবুজ খোসার ঝিনুক ঝলসানো হয় তখন যে কি মাতাল করা ঘ্রান বের হয় কে না জানে?

তারপরও কাজ শেষ করে যখন হোটেল থেকে বের হই মনে হয় -আহ, বাইরে কত সুন্দর ভরা জোসনার ঘ্রান!

ঠিক তখন দেখি ময়লা ছেঁড়া জামা পরে একটা বাচ্চা আর কুকুর বসে আছে খাবারের দোকানের সামনে। ভেতরে গরম তন্দুরি রুটি আর মশলা মাখানো মুরগী ঝলসান হচ্ছে। দুই চোখ বড় বড় করে ভিন্ন দুই প্রাণী লোভী চোখে চেয়ে দেখছে।রাতের প্রথম প্রহরের তারার মতজ্বল জ্বল করছে ওদের চোখ।

ওদের কাছে টাকা নেই তাই মাগনা ঘ্রান নিচ্ছে।

বাইরের তরল জোসনা ওদের কাছে অর্থহীন।

পৃথিবীর সব চেয়ে মূল্যবান সুগন্ধি  ও কারো কারো কাছে অর্থহীন।

(শেষ)


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...