১
শুরু থেকে শুরু
ফ্লাইং সসার।
উড়ন্ত সসার।
নাম শোনেনি অমন কাউকে আজকাল পাওয়া যাবে না।
দিন দুনিয়া সম্পর্কে যার কোন রকম জ্ঞান নেই সেও উড়ন্ত সসারের কথা শুনলে দুই চারটি জ্ঞান গর্ভ মন্তব্য করবেই।
কমিক্স, ফিচার , সায়েন্স ফিকশন মুভির কল্যাণে এই উড়ন্ত সসার এখন একেবারে নিচু ক্লাসের ইস্কুলের বাচ্চারাও জানে।
উড়ন্ত সসার শব্দটার সাথে প্রথম পরিচিত হই ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়।
তখন রাস্তা থেকে পুরানো বই কেনার নেশাটা বেশ রকম শুরু হয়েছিল।
প্রায় প্রত্যেক বিকেলে চলে যেতাম শহরতলির শেষ মাথায়। গুলশান সিনেমা হলের সামনে । আমার শহরে মাত্র একটাই পুরানো বইয়ের দোকান ছিল তখন।
আধবুড়ো মত এক প্রাচীন লোক চালাত দোকানটা।
বিচিত্র দুর্লভ সব বই পাওয়া যেত , নাম মাত্র মুল্যে।
অনেক সময় নিয়ে নাড়াচাড়া করে এক আধটা বই কিনে বাড়ি ফিরতাম, মায়াবী হলুদ বিকেলগুলোতে।
বগলে সদ্য কেনা বই। হনহন করে হাঁটছি।
কক্ষন বাড়ি ফিরব ? কত দ্রুত খুলে বসব সেই কেতাব। যার পাতায় পাতায় রয়েছে অমোঘ আকর্ষণ !
অমন এক গরমের বিকেলে পেয়েছিলাম বইটা। ইয়া মোটা পেপারব্যাক। দাম এগার টাকা। বিবশ করা প্রচ্ছদ।
সে সময় আমার চিন্তা চেতনার অদ্ভুত পরিবর্তন এনেছিল বইটা।
নক্ষত্র ভরা গভীর রাতে ছাদে বসে চেয়ে থাকতাম খোলা আকাশের দিকে। অচেনা কোন আলোর বিন্দু দেখলেই চমকে ধরাস করে উঠত বুকের ভেতরে।
ভাবতাম- ওরা কি এসেছে ?
কল্পনা করে বেশ লাগত- আমরা যখন গভীর ঘুমে, তখন ছায়া ছায়া নিঝুম জায়গায় , যেখানে শন ঘাসের দঙ্গল ভর্তি, লম্বা লম্বা অচেনা গাছ হাত ধরাধরি করে দাড়িয়ে থাকে , সেই ঝি ঝি ঢাকা অচেনা প্রান্তরে লাল- নীল- হলুদ বিচিত্র আলো জ্বেলে নামে ফ্লাইং সসার।
বড় হয়েও যখনই আনসলভড মিস্ট্রি জাতীয় বই পত্র পেয়েছি, দেদারসে সংগ্রহ করেছি। পড়েছি নাক ডুবিয়ে।
যে কয়েকটা বিচিত্র বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মাতামাতি হয়েছে, সবচেয়ে বেশি মানুষজন আগ্রহ বোধ করেছে, সেটা হচ্ছে- ফ্লাইং সসার।
লেখা হয়েছে হাজার হাজার বই।
আক্ষরিক অর্থেই হাজার হাজার।
দীর্ঘ দিন ধরেই বইগুলো ছিল বেস্ট সেলার।
এখন কথা হল এই ফ্লাইং সসার আসলে কি ?
অনেকে UFO বলে যাকে। UFO মানে আন আইডেনটিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট । (unidentified flying object) সম্ভবত ম্যাক ডেভিড নামের এক ভদ্রলোক এই শব্দটা জনপ্রিয় করতে শুরু করেছিলেন।
পরে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে ।
১৯৪৭ সালের শুরুর দিকেই সারা পৃথিবীর লোকজন এই অদ্ভুত উড়ন্ত চাকতিগুলো দেখা শুরু করে। দেখতে বড় সড় তশতরীর মত হওয়াতে, লোকজন ফ্লাইং সসার নামে ডাকা শুরু করে ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সবচেয়ে বেশি আর ঘন ঘন দেখা যেতে থাকে অচিন এই জিনিসগুলো।
সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ১৯৬৬ সালে। মোট দশ হাজার বারের চেয়েও বেশি !
পৃথিবীর নানান দেশে, নানান জায়গায় হাজার হাজার মানুষ দেখেছে সেই সময় । পৃথিবীর নানান দেশে তৈরি হয়েছে UFO ক্লাব। বিজ্ঞানের নতুন শাখা হয়েছে ইউফোলজি।
১৯০৮ সালের ৩০ জুন , সাইবেরিয়ার তাঙ্গুসকাতে যে রহস্যময় বিস্ফোরণ হয়েছিল সেটাও কোন একটা উড়ন্ত সসার ধ্বংস হবার জন্য দায়ী অমন প্রমাণ নিয়েও হাজির হয়েছেন এক দল বিজ্ঞানী।
অসংখ্য বার তোলা হয়েছে উড়ন্ত সসারের ছবি। আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে বেশির ভাগ ছবিই ভুয়া। সস্তা খ্যাতি আর অর্থ উপার্জনের জন্য কায়দা করে সেইসব ছবি বানিয়েছিল জালিয়াত কিসিমের কিছু মানুষ।
আমেরিকান এয়ার ফোরসের AFR 8017 নাম্বার নির্দেশনায় পরিষ্কার বলা আছে , আকাশে উড়ার সময় ফ্লাইং সসারের মুখোমুখি হলে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে !
এই দিকে আবার বহু বিজ্ঞানী আছেন, যারা ফ্লাইং সসারের অস্তিত্ব স্বীকারই করেন না। আবার উল্টা দিকে বহু বিজ্ঞানী দাবী করেছেন - উনারা নিজের চোখে দেখেছেন ফাইং সসার !
কি এইগুলো ?
কোত্থেকে আসে ?
আবার চোখের পলকে কোথায় হারিয়ে যায় ?
আজও জানা যায়নি ।
অস্ট্রেলিয়া থাকার সময় আবিস্কার করলাম - কুইন্সল্যান্ডে ১৯৫৬ সালে করা হয়েছিল UFO রিসার্চ সেন্টার । আজও এরা ফ্লাইং সসার নিয়ে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে।
প্রায় হাজার খানেক ফ্লাইং সসার ক্লাব আছে দুনিয়ার নানান দেশে।
যে মতটা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় সেটা হল , ফ্লাইং সসার আর কিছুই না, বর্হিজগতের বুদ্ধিমান প্রাণীদের স্পেসশিপ ।ওরা নিয়মিত আসে আমাদের সভ্যতার খোঁজ খবর নিতে।
আরেকদল বিজ্ঞানী মনে করেন, ফ্লাইং সসারগুলো দূর কোন মহাজাগতিক সভ্যতা থেকে আসে না। এখানেই আছে। পৃথিবীর গভীরে গোপন কোন স্থানে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে ওগুলো। গোপন বন্দর আছে কোথাও ।
কেউ কেউ বলেন- আমাদের উপগ্রহ চাঁদ, হতে পারে ফ্লাইং সসারগুলোর ঘাঁটি।
রহস্যের শেষ নেই।
এমন মতও খুব জনপ্রিয় - ফাইং সসারগুলো পৃথিবীর মানুষদেরই তৈরি। হয়তো ,সামাজ্যবাদী কোন রাষ্ট্রের নতুন আবিস্কৃত বিচিত্র মহাকাশ যান।
কেউ কেউ যুক্তি দেখায়- যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রথমে নজরে এসেছিল এই জিনিসগুলো তারমানে হিটলারের আবিস্কৃত কিছু হবে এই ফ্লাইং সসার।
কথা হল, আমাদের আকাশে এরা নতুন কিছু না।
হাজার হাজার বছর আগেও এদের দেখা যেত।
প্রাচীন ব্যবলিয়নের সভ্যতার লোকজনও ফ্লাইং সসার চিনত।
ব্যবিলনের প্রাচীন মহাকাব্য মহাকাব্য গিলগামেশে ফ্লাইং সসারের বর্ণনা আছে
খৃস্টপূর্ব ১০০ শতাব্দীতে প্লিনি তার ন্যাচারাল হিস্টোরি বইতে লিখে গেছেন - এক সন্ধ্যায় তিনি আগুনের একটা পাত্র উড়ে যেতে দেখেছিলেন !
মিসরের পিরামিডের দেয়ালে ফ্লাইং সসার আঁকা আছে।
ফারাও তুথমোজের রাজ্যত্ব কালের বিবরণের মধ্যে নিখুঁত ভাবে লেখা আছে ফ্লাইং সসারের বর্ণনা।
সেই মাটির লিপিটা আজও সযত্নে রাখা আছে ভ্যাটিকান যাদুঘরে।
এম,কে, জেসাপ নামের এক জ্যোতিবিদ , দ্যা কেস ফর দ্যা ইউএফওজ- নামের বইতে লিখেছেন ফ্লাইং সসার যে অন্য কোন গ্রহের স্পেসশিপ অমনটা ভাবার কোন কারণই নেই। হয়তো পৃথিবীর মানুষেরাই বানিয়েছে। আজ থেকে হাজার হাজার বছর পরের মানুষেরা বানিয়েছে ওই গুলো । কোনভাবে তাদের ডাইমেনশন থেকে ক্ষণিকের জন্য চলে আসে আমাদের ডাইমেনশনে ।
তখনই আমরা দেখি ওইগুলো।
আমেরিকায় বেশ কয়েক বারই দ্যা গ্রেট ব্ল্যাক আউট হয়েছে।
মানে, সঙ্গত যুক্তিগ্রাহ্য কোন ব্যাপার ছাড়াই বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল আচমকা। অমনটা কেন হয়েছিল আজও রহস্য। অমীমাংসিত ঘটনা হিসাবে রয়ে গেছে ঘটনাগুলো ।
তবে অদ্ভুত ব্যাপার হল, প্রত্যেকবারই ব্ল্যাক আউট হবার সময় আকাশে দেখা গিয়েছিল ফ্লাইং সসার।
এক বা একাধিক।
নীল -সবুজ- হলুদ উজ্জ্বল আলো ছড়াতে ছড়াতে উড়ে গেছে দিগন্তের এক পাশ থেকে অন্য পাশে।
এত ঘটনার পর ও কিছু বিজ্ঞানী ফ্লাইং সসারের অস্তিত্ব স্বীকার করতে চায় না কেন ?
কেন বহু দেশের সরকারী সংস্থা গোপন রাখতে চায় তাদের ফাইলগুলো , যেগুলোতে ফ্লাইং সসারের ব্যাপারে তথ্য সংরক্ষণ করা আছে।
পুরো ব্যাপারটাই কি প্যারানরমাল ?
আজ এত গুলো বছর পর ফিরে দেখার সময় হয়েছে।
শেষ বার ফ্লাইং সসার দেখা গেছে মাত্র গত বছরে।
আমাদের হাতে যে তথ্য প্রমাণ আর যুক্তি রয়েছে তাতে আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারব।
ফ্লাইং সসার আসলে কি ?
সত্যি কি ওরা এসেছিল ?
না সবই বানান ভুয়া গাল গল্প । মিডিয়া আর বিজ্ঞানের তৈরি মনোরঞ্জনের নতুন উপাদান। মনে রাখবেন, সত্য সব সময় কল্পনার চেয়েও চমকপ্রদ হয় ।
তবে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব আপনার।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন