সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অন্য রকম রহস্য

 তারপর  ধরা যাক  বৃষ্টির দিনগুলোর কথা।

 

এমন দিনগুলোতে  জানালার পাশে বসে থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই।

 বাইরে  ঝাঁকড়া জামরুল গাছ।

গাছটা ভর্তি জামরুল। জামরুলের রঙটা কেমন যেন। ঘন সবুজের মধ্যে বেশি করে শাদা রঙ মিশিয়ে ফেললে অমন দেখায়। তারচেয়ে বড় কথা ফলটা দেখতে ইশকুলের হেডস্যারের নাকের মত। একদম হুবহু লোম ভর্তি।

 মনে হয় গাছ ভর্তি হেডস্যারের নাক ঝুলছে।

কী  একটা অবস্থা !

 কিন্তু আমার মন তো আকাশে।

 আকাশ ভর্তি মেঘ।  মনে হচ্ছে একগাদা ধূসর আর কালো তিমি মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। সাঁতরে যাচ্ছে দূরে, বহু দূরের দেশে। হয়তো নরওয়েতে। ওদের বাসা ওখানেই । এই বাদলার দিনে আকাশে ভেসে ওরা আমাকে দেখে গেল শুধু। শুধু আমাকেই।

 কল্পনায় দেখতে পাই ,  ওদের পাশাপাশি  আকাশে  ভেসে যাচ্ছে আমার পিচ্চি একটা জাহাজ। আমিই ক্যাপ্টেন, আমিই খালাসি। আর কোন লোক নেই ।  গোল চাকার মত চারিদিকে ডাণ্ডাওয়ালা হুইল ঘুরিয়ে জাহাজ চালাচ্ছি।হলুদ রেশমি  পতাকা বাতাসে ফিনফিন করে উড়ছে। পতাকায় একটা তিমি মাছের ছবি।

 জাহাজের ডানে বামে মেঘের দলার মত তিমি মাছ।

 সবাই এক সাথে ভেসে যাচ্ছি।

 দূরে।

বহু দূরে।

অন্য কোনখানে।

তখন দুপুরে ঘুমিয়ে গেলে বিপদে পড়তাম।

 সন্ধ্যাবেলায় ঘুম ভেঙ্গে মনে হত, হায় হায় ইশকুলে যেতে হবে। আমি এত ভোরে জাগলাম কেমন করে ?

 মা বলতো,  আরে মাত্র  সন্ধ্যা।

 মনে মনে খুশি হয়ে আবার ঘুমুতে যেতাম। আধো ঘুমে স্বপ্ন দেখতাম,  লম্বা ঢ্যাঙ্গা একটা লোক কাঁধে মই নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। অন্য হাতে একটা লোহার ঝুড়ি।লোকটার  গায়ে ঢোলা জামা। সেই জামার ঝুল নেমে এসেছে  হাঁটু পর্যন্ত। মাথায় উরকা মুরকা চুল।

  ইটের  দাঁত বের করা কোন একটা    দেয়ালে মইটা   ঠেস দিয়ে,   উপরে  উঠে যেত তরতর করে । লোহার  ঝুড়ি থেকে বের করে আনত চুমকির  মত তারা। সেগুলো একটার পর একটা সেঁটে দিত আকাশের গায়ে। ন্যাকড়া দিয়ে আকাশটা পরিষ্কার করতো। তারপর আধ খাওয়া বিস্কুটের মত চাঁদটা আকাশের গায়ে পেরেক দিয়ে সেঁটে আবার  মই কাঁধে নিয়ে হাঁটা ধরত।

কী   রকম স্বপ্ন !

অবেলায় ঘুমালে যেমন বেখাপ্পা স্বপ্ন দেখি,  তেমন দেখি  জ্বরের সময়।

 একবার জ্বরের সময়  ঘোরের মধ্যে দেখলাম,   মা  চুলার উপর কেটলি বসিয়েছে চা  বানানোর জন্য।

 কি একটা  কাজে  মা গেছে  ভেতর কামরায় ।ওমা কেটলিটা চুলার উপর থেকে নেমে গট গট করে হেঁটে বাইরে চলে গেল।

 বাইরে ব্লু বেরি ফলের মত  নীল অন্ধকার। বাসক পাতার দঙ্গল। কাক  ডুমুর আর আম বাগান। ওখানে গিয়ে কেটলিটা হাতি হয়ে গেল। তারপর শুড়  দোলাতে দোলাতে হারিয়ে গেল বাসক পাতার দঙ্গলের ভেতর।

 যদি স্বপ্নই হয় তবে কেটলিটা পরে আর পাওয়া গেল না কেন ?

সবাই বলে  চুরি হয়ে গেছে। দুষ্টু কোন চোর নিয়ে গেছে। ওর কেটলি দরকার।

কিন্তু আমি জানি ওটা হাতি হয়ে ঘুরে  বেড়াচ্ছে। হয়তো চলে গেছে দফলার জঙ্গলে । বা তরাইয়ের বনে । বতসোয়ানার বিরান ঘাসের প্রান্তরে।     

 কিন্তু আমাকে বিশ্বাস করবে কে ?

আরেক বার চাঁদমারি থেকে খেলা শেষ করে ফিরছিলাম।

 জায়গাটা অনেক সুন্দর। বড় একটা টিলা আছে। রাইফেল  ক্লাবের লোকজন প্রতিবছর   শীতের শুরুতে   ওখানে গিয়ে শুটিং প্যাকট্রিস করে। ধনী ঘরের ছেলে পিলে শাদা প্যান্ট আর হাফ হাতা জামা পরে ব্যাট বল দিয়ে ক্রিকেট খেলে। ওদের ঢং দেখে আমরা হাসি।

 লম্বা লম্বা ঘাস ভর্তি। ঘাসের  ডগায় লাল চিঁড়ের মত কি যেন   সাঁটা। ওই ঘাসের নাম নাকি চিড়ে ঘাস। হরিণের শিঙের মত আঁকা বাঁকা কয়েকটা নালা আছে। কয়লার মত  কালো জল। ভীষণ ঠাণ্ডা। মনে হয় শরবৎ ঢেলে রেখেছে কেউ ।

 চ্যাপ্টা,   শাদা অচেনা একটা মাছ দেখতাম।  মনে হয় নতুন টিন কেটে বানানো। ভীষণ চালাক মাছ।  ধরা যায় না।

 ফেরার পথে নির্জন মত জায়গা। মস্ত বড় বড়  কয়েকটা কড়ই গাছ সব সময়  দাঁড়িয়ে থাকে হাত ধরাধরি করে। দুপুর বেলায় জায়গাটা ছায়া ছায়া অন্ধকার। বিকেলে ছায়া ঘনায়  ঘন   হয়ে।

 শেষ বিকেলের পারসিমন ফলের মত যে রোদ,  সেটা কখনই  উপুর হয়ে নেমে আসে  না এই গলির ভেতরে।  

 এক বিকেলে খেলা শেষে ফেরার সময়  দেখি গাছতলায় পরে আছে একগাদা  মানুষের  কঙ্কালের  খুলি ।  দাঁত বের করে  হাসছে ওরা।

 ভয়ে শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে গেল।

 এতগুলো  কঙ্কালের খুলি এলো কোত্থেকে ? কাছেই কি কোন রাক্ষসপুর। লাল কমল আর নীল কমলের গল্পে পড়েছি, ধু ধু প্রান্তরে ওরা খুঁজে পায় কড়ির পাহাড়, হাড়ের পাহাড় আর খুলির পাহাড়।

 আমিও কী  অমন পেয়েছি ?

 দূরের বড় বাড়ি যেটায় কখনও আলো জ্বলে না সেটা কী  রাক্ষসের বাসা ?

 ভাল করে চেয়ে দেখি ওগুলো আসলে শাঁস বের করে নেয়া তালের খোসা। কাছেই কেউ  তালের  শাঁস বিক্রি করে । সারাদিন  বিক্রির পর খোসাগুলো ফেলে গেছে গাছতলায়।

 সেটাই   কল্পনাপ্রিয় আমার চোখে   মড়ার খুলি হয়ে ধরা দিয়েছে ।

 সব কিছু  অমন হয় কেন আমার কাছে ?

আরেক বার পাকরাশিদের দোকান থেকে ফিরছিলাম।

 চার আনার চা পাত্তি আর নীলের গুড়া আনতে গিয়েছিলাম।  চায়ের পাতাকে উনারা কেন যেন পাত্তি বলে। দারুন মিহি জিনিস। কেটলিতে গরম  জল ফুটিয়ে সেই পাতার  গুড়ো ছেড়ে দিলেই দারুন চনমন করা ঘ্রাণ বের হয়।

 আর নীলের গুড়া অদ্ভুত জিনিস।

এক বালতি জলে সামান্য গুড়া মিশিয়ে ঘুঁটে দিলেই সেই জল তিনিয়ান দ্বীপের লেগুনের  রঙের  মত   হয়ে যায়। শাদা জামাকাপড় সেই নীল জলে আচ্ছা করে চুবিয়ে নেয় মা। জামা কাপড় নাকি আরও ফর্শা হয়। কেন কিভাবে জানি না। আবার কাণ্ড দেখ, এই নীলের চাষ করার জন্য পোড়া ইটের মত লাল ইংরেজরা নাকি আমাদের দেশে এসেছিল।

 ফেরার পথে আনন্দ বাবুর বাড়ি।

উনি একা থাকেন। আগে পোস্ট আপিসে চাকরি করতেন। এখন সারাদিন বাসায় বসে বই পড়েন। একটা বিড়াল আছে, উনার সঙ্গী। নাম- মিনি। বিড়ালটা সুন্দর। প্রায় কাঞ্চনপুরের  বাঘের মত।  হলুদ- শাদা। শুধু মাত্র ডাইনিদের বিড়াল  আলকাতরার মত  কালো কুচকুচে  হয়।

 

বৃষ্টি হলে   কখনও কখনও বাজারে নাকি মাছ সস্তা হয়ে যায়  ।

মাছ   বিক্রেতারা  ভিজে গামছা পরে খালি গায়ে  বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে ,  কম দামে মাছ বিক্রি করে দেয়। আনন্দ বাবু সেইসব দিনে বাজারে চলে যান। এক পোঁটলা পুঁটি মাছ নিয়ে ফিরে আসেন। পরের দিন যদি রোদ উঠে তবে সেই মাছ  পাঁটের সূতলি দিয়ে বেঁধে জামা কাপড় শুকাতে দেয়ার  তারে  ঝুলিয়ে দেয়। মাছগুলো লেজে বাঁধা হয়ে উল্টা ঝুলে থাকে কয়েকদিন।

 আমাকে দেখলেই মিহি গলায় আনন্দ বাবু বলেন , ' শুটকি বানাচ্ছি। পেয়াজ  রসুন  মাখিয়ে  গরম ভাত দিয়ে খাব।'

 ফেরার সময় আনন্দ বাবুর জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম। দেখি উনি রান্না ঘরে রুটি বানাচ্ছেন। চুলার উপর চ্যাপ্টা কালো তাওয়া। কাঠের হ্যানডেল। লোহার চামচ দিয়ে উল্টে পাল্টে দিচ্ছেন  ধূসর রঙের আটার রুটি।

 পাশে মিনি বেলনি দিয়ে সুন্দর করে রুটি বেলে দিচ্ছে। একদম  মাঘী    পূর্ণিমার  চাঁদের মত গোল সেই রুটি।

 পরের দিন  আনন্দ বাবুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। জবাব না দিয়ে উনি কেমন একটা হাসি হাসলেন  । কিচ্ছু বললেন না।

 মিনিকে আমি পিয়ানো বাজাতে ও দেখেছি কয়েকবার।

 একবার রান্নাঘরে গিয়ে শুনি  কেতলি তার জীবনের গল্প বলছে । পেয়ালাগুলো তশতরীতে বসে মন দিয়ে শুনছে । আমাকে দেখেই চুপ হয়ে গেল ।

অমন প্রায়ই হয় ।

গতরাতে ডিমের ঝুড়ি থেকে কয়েকটা ডিম হেঁটে গিয়ে জানালায় বসে আড্ডা দিচ্ছিল । যতদূর মনে হল ওরা হামটি ডামটি । পরদিন সকালে দুটো ডিম ভাঙ্গা দেখেই বুঝলাম - অনুমান সঠিক ।

বৃষ্টির দিনের কথা অনেকবার বলেছি।

তোমরা হয়তো বিরক্ত হও। কিন্তু আমার কাছে বাদলার দিন খুবই অদ্ভুত লাগে।  এই যে শন শনে হাওয়া ,  ওরা  আসে কোত্থেকে ? সব সময় কেন আসে না ? হাওয়া  কী  বেড়াতে যায় দূরে কোথাও ?

 মা বলে,  হাওয়াগুলো নদীর পাড় থেকে চলে আসে।  হতে পারে। নদীর পারে সবসময় সুন্দর হাওয়া পাই।

 বৃষ্টি ভাল লাগে এইজন্য যে, ওরা আসলে নদী আর   সাগরের জল। গরমে বিরক্ত হয়ে ওদের বাসা,  মানে পুকুর নদী ছেড়ে চলে গিয়েছিল আকাশে। ওখানে গিয়ে কয়েকদিন মনের সুখে উড়ে  বেড়ালও। তারপর মনে পড়লো ওদের বাড়ির কথা।

 হায় হায়। কেমন আছে বাকি সবাই। নদী আর  সাগরের মাছ! বাকি সব জল ??

 তখন ওরা হুড়োহুড়ি করে বাসায় ফিরতে চায়।

 ওটাই বৃষ্টি।

 দুই একটা মাছ ওদের চেনে। সেই মাছগুলো বৃষ্টির সময় পুকুর, নদী ছেড়ে লাফ দিয়ে উপরে উঠে আসে। বলে, ভাই জলদি চলে আস। কতদিন দেখা হয়নি। কোথায় ছিলে ?

 বিশ্বাস না হলে বাসায়  দাদু বা দিদাকে জিজ্ঞেস কর, মাছেরা অমন করে কিনা ?

 আমি মিথ্যা বলতে যাব কেন  ?

 সব মাছ অমন করে না। কারন সবার ভালবাসা সমান না।

বৃষ্টির দিনে আমি জানালার পাশে অনেক-  অনেক সময় বসে থাকি। ওটা বেশ দরকারি কাজ। ইস্কুল বন্ধ । মাত্র কিছুদিন হল ভর্তি হয়েছি। খুব ভাল পড়ায় বলে  মনে হয় না। A -তে আপেল।   B-তে বল এইসব  হাবিজাবি পড়ায়। বীজগণিত আর  রসায়ন পড়াতে অনেকগুলো বছর লাগবে।   

 আপেলের বাংলা মানে নাকি আতা ? ভুল।

ইংরেজি এ, বি, সি এইসব নাকি বড় হাতের আবার ছোট হাতের আছে।

অথচ আমাদের  দুই হাত সমান ।

 কী  কাণ্ড !

 বৃষ্টিটা একটু থামলেই বাইরে দাড়াই।

রান্নাঘরের খানিক  দূরেই বিজন ঘাস। বৃষ্টির পর ওরা চো- চো শব্দ করে জল চুষে খায়। কান পেতে একটু দাঁড়ালেই সেই শব্দ পাওয়া । তুমি পেয়েছ কখনও ?

 জল খেয়ে ওরা আরও সবুজ আরও লম্বা হয়ে যায়।

 আমার বেশ ভাল লাগে। কারন ঘাসেরা আমার বন্ধু । পড়ার টেবিলে বসলেও ওদের দেখা যায়। সব সময় কি যেন বলে আমাকে। কী  বলে বুঝি না। তবে  ' পড়ার দরকার নেই মাঠে খেলতে যাও।' ওটা পরিষ্কার শুনতে পাই।

এমনিতে আমার কাজ অনেক।

 রান্নাঘরে গিয়ে পিঁপড়ে গুনি, কয়টা পিঁপড়ে পেলাম, দাগ দিয়ে লিখে রাখি বাঁধাই করা খাতায়। জুতার বাক্সে খেলনা গুছিয়ে রাখি। মোমরঙ দিয়ে ছবি আঁকি। ছবি এঁকে আবার পাশে লিখে রাখি কিসের ছবি। যেমন - গরু, মাছ, গাছ।

 অনেকেই ছবি দেখে জিজ্ঞেস করে ওটা কিসের ছবি।

কি কাণ্ড ! অথচ আমার ছবি পিকাসোর চেয়েও ভাল। তবে  সিনেমার ব্যানার যারা আঁকে  তারাই  দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর ছবি আঁকে ।

 বৃষ্টিটা থেমে যেতে নৌকা বানাতে বসলাম। মা রান্নাঘরে। ইলিশ ভাঁজার ঘ্রাণ পাচ্ছি।  সুগন্ধি  তেল মশলার  ঝাঁঝ ।

 লেখার খাতার পাতা ছেড়া  মা পছন্দ করে না। এখন কে দেখবে ?

 সাতটা  নৌকা বানালাম। আগের দিনের সওদাগররা সাত নৌকা নিয়ে বানিজ্যে যেত। তাদের প্রতি সম্মান রেখে সাত নৌকা। তা ছাড়া সিন্দবাদ ও সাতবার সমুদ্র যাত্রা করেছিল।

সাত নৌকা সাত রঙ করলাম। দেখার মত জিনিস।

এবার বাইরে চলে গেলাম। উঠানের অনেক দূরে,  বৃষ্টির জল জমে এক হাত চওড়া আর ইয়া লম্বা আকা বাঁকা কেমন একটা নদীর মত হয়ে গেছে। গভীরতা মাত্র  কয়েক আঙ্গুল।

 ওটা  আমার পোষা নদী। আবার দেখ,   স্রোত ও আছে ! বৃষ্টি হলেই পোষা নদীটা জন্ম নেয়। রোদ উঠলে দুই বা তিনদিন পর হারিয়ে যায়। আবার বৃষ্টি হলেই ফেরত আসে। রেডইনডিয়ানদের  রহস্যময় নদীর মত।   

 সাত নৌকা ছেড়ে দিলাম। দুরন্ত ঢেউয়ের মাথায় ভেসে যেতে লাগল। নৌকায় একটা করে লবঙ্গ দিয়েছি।  লবঙ্গগুলো কাপ্তান।

 ভেসে চলল ওরা। আমি খুশি। নৌকাগুলো ও। লবঙ্গ  কাপ্তানগুলো ও।

 দুই পাশে শ্যামাঘাসগুলো যেন ভয়াল অরন্য।

পোষা নদীতে এত স্রোত যে  নৌকাগুলো প্রায় নেচে নেচে যাচ্ছে ।

 এই ভাবেই চলতো কিন্তু আচমকা একটা কাণ্ড ঘটে গেল।

 কোত্থেকে যেন  লক্কড় বককর একটা গাড়ি হেলতে  দুলতে চলে গেল পাশ দিয়ে। কয়েক বালতি ময়লা জল ছিটিয়ে দিল আমাদের উপর। আমাদের মানে আমি আর  সপ্তডিঙার উপর।

  ভিজে নরম হয়ে  একে একে ডুবে গেল আমার সব নৌকা। সাথে লবঙ্গ  কাপ্তান।

 সলিল সমাধি না কি যেন বলে ?  সেটাই।

 মন খারাপ হয়ে গেল।

ভেজা ময়লা কাগজ  ভেসে আছে  পোষা নদীতে। আমার জামা ময়লা। ভয়ে ভয়ে বাসায়  ফিরলাম। মা ধমক দিতে গিয়েও কিছু বলল না। জানতে চাইল কি হয়েছে। মিথ্যা বললাম, উঠানে পরে গিয়েছি।

 মিথ্যা বলা খারাপ। মিথ্যাবাদীকে কেউ পছন্দ করে না। একটা রাখালের গল্প শুনেছিলাম। মিথ্যা বলে কেমন  বাঘের দুপুরের  লাঞ্চ হয়েছিল ।

 কিন্তু আমার উপায় নেই।

 প্রচুর সাবান ঘষে স্নান করে নিলাম কলতলায়। সাবানের নাম গ্যকোটাচ। মাখলে নাকি  খোশ পাঁচড়া হয় না। বৃষ্টির জন্য কলের জল শরবতের মত ঠাণ্ডা।

 রোজ অমন জল আসলে আমাদের ফ্রিজ কিনতে হত না।   আমাদের ফ্রিজ নেই। মা ঘ্যান ঘ্যান করে। বাবা কিনে আনে না।

মাত্র দুপুর।

 ওমা , বললে বিশ্বাস করবে না। কোত্থেকে পোঁটলা পোঁটলা মেঘ এসে আকাশ মাখিয়ে ফেলল। অমন দৃশ্য দেখা যায় না। মেঘলা আকাশের ছবি একমাত্র হাশেম খান আঁকতে পারেন।

 আর বাতাসও বইতে লাগল।

 নামলো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। অমন বৃষ্টিকে ইলশেগুড়ি বৃষ্টি বলে। অনেকে মনে করে ইলিশ মাছের ডিমের সাইজের বৃষ্টির কণা সেইজন্য এই নাম।

 ভুল। গলদ।

 অমন সাইজের বৃষ্টি হলে ইলিশ মাছেরা পাগল হয়ে যায়। ওরা সাগর ছেড়ে স্রোতের উল্টা দিকে হেঁটে হেঁটে সোজা চলে আসে নদীতে। তখন জেলেদের জালে ধরা পরে।  কবি তো বলেই গেছেন- গোয়ালন্দ ঘাটে এসে ইলিশ ধরা পড়লো শেষ।

 গোয়ালন্দ ঘাট জায়গাটা চিনি না আমি। কবি চেনেন ।

 মা খেতে দিল। কাসুন্দি মাখিয়ে ইলিশ। গরম ভাত। কাঁঠাল মাছের কুঁচি দিয়ে কাচকি মাছ। ওটা খাব না। ডাল খাব।  মুসুরির ডাল, অনেকে  মশারির ডাল বলে। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক বলেন- মসিউরের ডাল।  

 খাওয়া শেষ হতেই চারিদিক আরও অন্ধকার হয়ে  ঝিমঝিম বৃষ্টি নামলো। টিনের চালে মনে হচ্ছে হাজারে বিজারে কাক নেচে বেড়াচ্ছে। অমন শব্দ।

দুপ করে বিজলি চলে গেল।

মনে হচ্ছে অনেক রাত।   আসলে দুপুর দুটো।

হাওয়ায় কেমন  শীত শীত। সুতার কাজ করা একটা  কাঁথা  গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। বুকের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া নৌকার জন্য মন খারাপ করা অনুভূতি।

 ওরা হারিয়ে গেছে। সাথে লবঙ্গ কাপ্তান।

 বৃষ্টির শব্দ কেমন ঘুমের দেশে নিয়ে যায়। চোখে মাকড়সার জালের মত ঘুম নেমে আসলো যেন।

 অনেক অনেক সময় চলে গেল। বাইরে আরও বৃষ্টি।  সব ভেসে যাবে যেন।

 হালকা ঘুমের মধ্যে  জলের স্রোতের শব্দ পেলাম।

 জাহাজের নোঙ্গরের শব্দ।

 উঠে বাড়ির পিছনের জানালা খুলে উঁকি দিলাম। ওখান দিয়ে বিপিন বাবুর আম বাগান আর দূরের পথ দেখা যায়। রাস্তার দুই পাশ বিষকাঁটালি গাছে ভর্তি।

অবাক হয়ে গেলাম জানালা খুলে ।

 জানালার বাইরে সমুদ্র। পিচ্চি একটা বন্দর।   বন্দরে আমার সেই সাত নৌকা। উজ্জ্বল রঙ করা। ঢেউয়ে দুলছে।

 একগাদা খালাসি মাল তুলছে নৌকায়। বন্দরের বাইরে একটা কাঠের  দোকান। দোকানের ভেতরে চারকোণা কাঁচের লণ্ঠন।  লণ্ঠনের ভেতরে হলুদ   রহস্যময় আলো। ভেতরে  বসে মোটা চালের ভাত আর কি একটা মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছে সাতজন লোক। ওদের গায়ে শাদা ধপধপে  জাহাজীদের  পোশাক। মাথায় শাদা টুপি।   এত দূর থেকেও বুঝলাম,  মাছের তরকারি খুব ঝাল। সাতজন লোককে চিনলাম । সেই সাত লবঙ্গ কাপ্তান।

 এক কাপ্তান আমার দিকে চেয়ে বলল,' আপনি অনেক ভাল । আপনার কথা মনে থাকবে।

খাওয়া শেষ  করে ওরা   আমার নৌকায় উঠে চলে গেল। সাগরে ঢেউ উঠলো। মিশে গেল অন্ধকারে। সাগরটা ছোট হতে হতে টিনের বালতি হয়ে গেল। আমাদের বালতি। মা বাড়ির পিছনে রেখেছে। বৃষ্টির জল ধরবে। ও জল দিয়ে নাকি রান্না করলে স্বাদ ভাল হয়।

 ঘুমের মধ্যে শুনলাম মা ডাকছে, ' মিলু উঠে পড়। স্বপ্ন দেখছিস ? উঠ, মুসি গুড় দিয়ে চা খাবি ? একদম পায়েসের মত লাগে । উঠ ।'

 আমি ঘুম ভেঙ্গে স্বপ্নের জগত থেকে আরেক রূপকথার জগতে গেলাম।

 রাজকন্যার মত আমার মা।

 

হ্যারিকেনের কমলা রঙের আলো।

শো শো করে  চায়ের জল ফুটছে  চুলায়  ।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...