এক
আশ্বিন মাসের বেলা কেমন যেন হয়।
দুপুরের পর রোদটা নরম হয়ে যায়।বাড়ির পিছনে ছোট্ট মত বাগান। রান্নার পর সবজির আবর্জনা ফেলা হয়। সবজির খোসা আর মাছের ফুলকা পচে ভাল সার হয়ে গেছে মাটিতে। জন্মেছে মরিচের চারা আর ধুন্ধুল।
ধুন্ধুল ফুলটা দেখতে সুন্দর। ঘন হলুদ। পাঁচটা পাপড়ি। ছোট্ট মত উচ্ছে হয়। বুড়ো আঙ্গুলের সমান। মাত্র দুইদিনেই হলুদ হয়ে যায় পেকে। ফেটে লাল দানা বের হয়ে যায়। আর একটা কি যেন ফুল হয়। সাদা রঙের। মাঝখানটা হলুদ। মনে হয় একগাদা ডিম পোঁচ ফেলে রেখেছে কেউ।
আকাশের রঙ ফ্যাকাসে নীল, রঙ জ্বলা জিন্সের প্যান্টের মত।
গোল করে প্যাচিয়ে আমসত্ত্বের টুকরো খাব বলে মাত্র ধরেছি, জানালা দিয়ে একটা চেহারা দেখা গেল। ভ্যাবলা। আমার বন্ধু।ভ্যাবলা দেখতে বাটুল ধরণের। সব সময় ঢোলা জামাকাপড় পরে। ওর বড় ভাইয়ের বাতিল জামাকাপড়। মাথার চুলটা বটতলার সস্তা নাপিতের কাছ থেকে কাটায়। মাঝখানে চুল কম । দুই দিকে বাবরি। ফলে দেখতে কেমন ডাব বা নারকেলের মত লাগে।
‘ আমসত্ব নাকি ?’ মিহি গলায় বলল ভ্যাবলা।
‘ হ্যাঁ।’
‘ আমসত্ব কি ভাবে বানায় জান ?’
‘ নাহ।’
‘ টানা সাত দিন পচা আম গরুকে খাওয়ায়। পরে গরু যখন হাগু করে গোবরের বদলে এই আমসত্ব বের হয়। রোদে শুকিয়ে নিলেই হয়ে গেল। দেখি, আমাকে দাও দেখি।’
হাত বাড়িয়ে আমসত্বের রোলটা নিল ভ্যাবলা। চুপচাপ পুরোটা খেয়ে শেষ করে বলল। ‘ হু, যা ভেবেছি তাই। খুব বাজে জিনিস। আরও আছে নাকি ?’
‘নাহ , নেই।’ সত্য কথাই বললাম।
‘ ইয়ে, তিলের নাড়ু বা তক্তি বিস্কুট ?’
‘ রান্নাঘরের উপরের তাকে। নামাতে পারব না। ’
‘ সমস্যা নেই। কাল হবে। চল এবার।’
‘ কোথায় ?’
‘ আরে ঘরে বসে থাকলে চলে ? যারা বাইরে টো টো করে তারাই জীবনে সফল হয়। যেমন- সিনবাদ। নীল কমল । লাল কমল। ডালিম কুমার। বেদানা কুমার। আপেল কুমার। হেন তেন। জলদি চল।’
‘ আপেল কুমার আছে নাকি?’
‘ বিদেশে থাকার কথা।’
আস্তে করে বের হয়ে এলাম।
‘ আজ দুপুরে হরিণের মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছি।’ হাঁটতে হাঁটতে বলল ভ্যাবলা।
‘ কোথায় পেলে, হরিণের মাংস ?’
‘ ইলিশ মাছের সাথেই থাকে। সামান্য। মাছের পাশে দেখবে কালো রঙের অংশ ওটা হরিণের মাংস ।’
‘ হরিণের মাংস ইলিশ মাছের গায়ে এলো কেমন করে ?’
‘ আরে অনেক আগে হরিণ আর ইলিশ মাছের দৌড় প্রতিযোগিতা হয়েছিল। চুক্তি হয়ে ছিল দৌড়ে যে হেরে যাবে তার শরীরের মাংস কেটে অন্য জনকে দিয়ে দেবে। হল দৌড়। হরিণ হেরে গেল। বাধ্য হয়ে কেটে দিল নিজের শরীরের মাংস। সেটাই ইলিশের গায়ে আছে ।’
‘ দৌড়টা কোথায় হয়েছিল ? নদীতে না বনে ?’
‘ আরে বোকা পাশাপাশি। ইলিশ তো বনে দৌড়াতে পারবে না। হরিণ তো নদীতে দৌড়াতে পারবে না। নদীর পাশে বন ওখানেই দৌড় দিয়েছিল দুইজন।’
‘ কিন্তু হরিণকে তো বনের গাছপালার মধ্যে দৌড়াতে হয়েছিল। জলের নীচে ইলিশকে তো অত ঝামেলার মধ্যে দৌড়াতে হয়নি । হাতি আর ঈগলের মধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতা হলেও তো অমন হবে।’
‘ তাও ঠিক। বিচারক কারা ছিল কে বলবে !’ বলল ভ্যাবলা।
বাইরে সাই সাই বাতাস। নরম বাক্সা ঘাস আর নুনিয়া শাকের দঙ্গল দুলছে বাতাসে। সুষুনি শাকগুলো দেখতে জাহাজের প্রপেলারের মত। কাঁপছে ওরা। বাউ কুড়ানি বাতাসে উড়ছে চিনা মুরগির পালক। পালকগুলোতে শাদার মধ্যে কালো ফুটকি। বাতাসে কেমন একটা মিষ্টি ঘ্রান। যেন কাছেই কোথাও আছে উইলোর বন। বা নদীর পাড়ে ঘন হয়ে আছে চন্দনের বন।
‘ কোথায় যাব ?’
‘ আগে চল অলি সাহবের বাসায়। উনি একটা অদ্ভুত রকম ঠাণ্ডা বাক্স কিনেছেন।দেখে আসি।’
‘ ঠাণ্ডা বাক্স ?’
‘ হ্যাঁ। ঠাণ্ডা আলমারিও বলতে পার। খাবার আর জল ঠাণ্ডা থাকবে। উপরে আবার বরফ জমে নাকি !’
‘ অদ্ভুত জিনিস তো।’
‘ সেইজন্য ই বললাম।’
অলি সাহেবের বাসা মাত্র বিশ কদম দুরে। আমাদের বিশ কদম। বড়দের দশ কদম হবে। অলি সাহেব তাগড়া এক মানুষ। প্রায় দৈত্য বলা যায়। হাত দুটো মুগুরের মত। ওখানে আবার দূর্বার মত লোম ভর্তি। যেন মাকড়সার হাত। মানুষ হিসাবে ভালই। তবে ভদ্রলোকের অসুখ আছে। অসুখটা কি আমি বা ভ্যাবলা কেউ জানি না।
তবে অসুখের জন্য ভদ্রলোককে রোজ কেমন একটা ওষুধ খেতে হয়। সেই ওষুধের শিশিটা কেমন বাঁটুল ধরনের। দুপুরের দিকে উনি ওষুধ খেতে বসেন। ভারি মোটা একটা খাঁজকাটা গ্লাসে বরফের কিউব নিতে হয় সেই ওষুধ খাওয়ার জন্য। সাথে আবার পেঁয়াজ দিয়ে চানাচুর মাখাও লাগে।
অনেক সময় নিয়ে ওষুধ খান অলি সাহেব। যত ওষুধ খান তত উনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। চাকরটাকে অচেনা ভাষায় ধমক দেন। অচেনা ভাষা হলেও শব্দগুলো আমি চিনি। অমিভাত বচ্চন সাহেব ঐ ভাষায় কথা বলেন। যেমন- হারামজাদে, কামিনে, কুত্তে। ম্যায় তুজে জিন্দা নেহি ছরেঙ্গে। এইসব আর কি।
আমাদের ধারনা অলি সাহেব খুব জলদি মারা যাবেন। সেই ওষুধ খেতে খেতেই। যদিও আমার ইস্কুলের বইতে লেখা আছে- ‘ ওষুধ খেলে অসুখ সারে।হাস মুরগি ঘরে তোল। দাদিকে ওষুধ দাও।’
অলি সাহেবের বাসার জানালা দিয়ে আমরা উঁকি দিলাম। লোহার একটা আলমারির মত।কারেনটে চলে। উনার বাসার চাকরটা একবার এসে জিনিসটা খুলল। দরজা খোলা মাত্র ভেতরে আলো জ্বলে উঠে। তাকের মধ্যে সবজি আর নাশপাতি রাখা।
‘ এটাই জিনিস ঠাণ্ডা রাখে ?’ জানালা ধরে ঝুলে থাকা অবস্থায় জিজ্ঞেস করলাম।
চাকরটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আমাদের চিনতে পেরে একগাল হেসে বলল- ‘ আরে হ। নাম অইল ফিরিজ।উরফে বরফ। এই দেহ।’
দেখাল আমাদের। দরজা খুলতেই ঠাণ্ডা ধোঁয়া বের হয়ে এলো।
‘ অলি সাবের সসুর দিছে এই ফিরিজ। হেয় কিন্তু কিনে নাই।’ ফিসফিস করে ষড়যন্ত্র করার মত ভঙ্গিতে বলল চাকরটা।
দারুন জিনিস। একমত হলাম।
রোদের রঙ হলুদ। বাতাসে ঘাসের দানা উড়ছে। দানা ফেটে কেমন অচেনা স্পেসশিপের মত গোল বল হয়ে আছে।
আমীর হাজির বাড়ির দেয়াল টপকে বাইরে ঝুকে আছে হাস্নাহেনা গাছের ডাল। রাতের বেলা মাতাল করা সৌরভ ছড়ায় । সামনে রামসীতা মন্দির। মন্দিরের দেয়ালের বাইরে আটার রুটির মত সেঁটে আছে গোবরের দলা। গরীব মানুষেরা দিয়েছে।শুকিয়ে গেলেই জ্বালানী। ভাত খাওয়া অনেক কষ্টের।
আরেক দিকে একগাদা ফণীমনসার ঝাড়। মনে হয় কাঁটায় সবুজ রঙের নানরুটি। একটা মৌসুমে মায়াবী লাল রঙের ফুল ধরে ফণীমনসা গাছে। মান্দার গাছ আছে হলুদ কাঁটা ভর্তি। আরেক কোনে বেল গাছ। শিবপূজায় বেলপাতা লাগে। দেবতাদের মধ্যে শিব খুব সহজে খুশি হয়ে যায়। বেলপাতা, ধুতরা ফুল। ঠাণ্ডা দুধ। না থাকলে নদীর জল।
পাকরাশিদের মুদির দোকান আর নাপিতের দোকান পার হয়ে আমরা হেঁটে বড় রাস্তায় গেলাম। রাস্তার পাশেই শীতলক্ষ্যার সরু একটা হাত। আরও খানিক দূরে মূল নদী। রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে কয়েক জন। নীচে ঠাণ্ডা জল। জলের তলায় ছায়া ছায়া মাছ।
‘ ছিপ, সুতা, বড়শি আর আধার থাকলে মাছ ধরা যেত।’ চিন্তিত সুরে বলল ভ্যাবলা।
‘ অনেকগুলো জিনিস নেই।’ বিরক্ত হলাম।
‘ তাতে কি ?’ হাসল ভ্যাবলা।’ নদী আর মাছ আছে তো। কেমন হত যদি ছিপ, সুতা , বড়শি সব থাকতো। কিন্তু নদীটাই না থাকতো ?’
ভ্যাবলাকে এই জন্য ভাল লাগে।
‘ তো, কি করব আমরা ?’
‘ সব বানিয়ে নেব।’
যারা মাছ ধরছিল তাদের চিনি। মুখ চেনা। থাকে চারিপাশে। রাতের খাবারের প্রোটিনের জন্য মাছ ধরতে আসে। বাচ্চা কাচ্চাদের মুখে ভাল কিছু তুলে দিতে চায়। পিচ্চি কিছু মৎস্য শিকারি আছে। লুঙ্গি পড়া। খালি গা। ওরাও পরিবারের খাবারের জন্য মাছ ধরে। মাছ ধরে নিয়ে গেলে ওদের বাসায় সবাই খুশি হয়।
শুধু গাড়িতে করে একজন মধ্য বয়স্ক লোক আসে । বেল বটম ঢোলা ইংলিশ প্যান্ট আর বড় কলারওয়ালা জামা পরে। উনার ছিপ, ফাতনা, রীল সব দামি। এমন কি সূতা ও কেমন পরিষ্কার। নাইলনের নাকি। মাঝে মাঝে সুন্দর একটা ফ্ল্যাক্স থেকে চা ঢেলে খায়। বেশ একটা ভাব আছে।
আবার বাড়ি ফিরে এলাম।
মায়ের সেলাই করার বাক্স থেকে পাঁচতারা মার্কা সুতার একটা রীল গায়েব করে ফেললাম। রান্নাঘর থেকে নিলাম খানিক ময়দা। বাইরে এসে দেখি ভ্যাবলা কোত্থেকে যেন দুটো বাঁশের কঞ্চি আর খানিক টিনের তার নিয়ে এসেছে, টিনের তারগুলোকে আমি গুণা বলি। বেড়ার ঘর বাঁধতে কাজে লাগে। গুণা দিয়ে কায়দা করে দুটো বড়শি বানাল ভ্যাবলা। কঞ্চির সাথে সুতো বেঁধে বড়শি বাঁধলাম। মন্দিরের বাইরে সরকারী কলের জল দিয়ে ময়দাগুলে ফেললাম। মাখা ময়দা কচু পাতায় মুড়ে নিলাম। ফিরে এলাম শীতলক্ষ্যার হাতের কাছে।
পছন্দ মত একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে বড়শি ফেললাম জলে।
পিচ দেয়া রাস্তা বেশ উঁচুতে। দেড় মানুষ সমান নীচে নদীর জল। দেয়ালে সেঁটে আছে গুগলি শামুক। পরিষ্কার দেখতে পেলাম নীচে শ্যাওলা আর পাথরের ফাঁকে ফাঁকে মাছ আসা যাওয়া করছে। হাতের তালুর মত বড় বড় এক একটা।
ছিপ ফেলে অপেক্ষা করলাম। খুব কাছাকাছি চলে এলো কয়েকটা মাছ। বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করছে। ইস কেমন হবে যদি টুপ করে একটা মাছ আমাদের বড়শিতে কামড় দিয়ে বসে ? সত্যি যদি একটা মাছ ধরে ফেলতে পারি ? সবাই নিশ্চয়ই অবাক হয়ে তাকাবে ?
ময়দার দলা জলে ভিজে নরম হয়ে খসে পড়লো আমাদের হাতে বানানো বড়শির গা থেকে। তখন চালু একটা মাছ টুপ করে খেয়ে ফেলল সেই দলা। আবার ময়দার দলা বড়শির গায়ে গেঁথে জলে ফেললাম। লাভ হল না। বারবার ময়দার দলা নরম হয়ে খসে গেল। চালাক মাছগুলো তখন খেয়ে ফেলল সুস্বাদু ময়দার দলা। কোন বোকা মাছ কামড় দিল না আমাদের বড়শিতে।
‘ সমস্যা নেই , ’ বলল ভ্যাবলা। ‘ এইসব নদীর মাছ খেয়ে লাভ নেই। বাজারেই তো পাওয়া যায়। আমরা বড় হয়ে মস্কো, সেন্টপিটারবার্গ বা লেলিনগ্রাদ যাব। ওখানে বড় বড় দিঘি আছে। লেক বলে। শীতকালে পুরো দিঘি জমে বরফ হয়ে যায়। তখন খানিক জায়গার বরফ কেটে ছিপ ফেললেই মাছ উঠে আসে। দারুন সব মাছ। স্যামন, স্টারজন, ক্যাস্পিয়ান কুটুম, হেরিং, কত কি ! এইসব দারকিনা আর টাকি মাছ খেয়ে কি হবে।’
‘মস্কো, সেন্টপিটারবার্গ , লেলিনগ্রাদ কোথায় ?’
‘ পৃথিবীর উপর দিকে। ওখানে ঠাণ্ডা। সেই ঠাণ্ডা আলমারির মত। ফিরিজ না কি যেন বলে। ’
সূর্যটা রঙ পাল্টে ফেলেছে। সময় এসে গেছে ওর ছুটি হবার । খানিক পর আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। কাল সকালে আবার আসবে।বাতাসটা কেমন পাল্টে গেছে। শীতলক্ষ্যার সরু হাতের ওখানে কয়েকটা শিরীষ গাছ। ফুল হয়ে আছে ডালাপালা ভর্তি। ফুলগুলো সাদা। উপরের অংশ আলতায় চুবানর মত লাল।
আমাদের পাশে জংলার মত হয়ে আছে কদমঘাস। দূর্বার মত। পাতা একটু মোটা। তিনটে পাতার মাঝে কদমফুলের মত একটা গোল্লা। ঘাসটা শুকিয়ে গেলেও ফুলের মত বাসায় রাখা যায়। নদীর দুই পারে শেয়ালকাঁটার ঝোপ ভর্তি। হলুদ সুন্দর ফুল ধরে। আরও আছে একগাদা নয়নতারা গাছ। দশ পয়সার মত দেখতে ফুল ধরে। আর কিবাহারি রঙ !
পেপারমিয়া নামে তুলতুলে শাকের মত একটা পিচ্চি গুল্ম ধরনের গাছ আছে। ইঁদুরের কানের মত পাতা। অনেকে নাকি এই শাকটা খায়।
মাছ ধরতে না পেরেও আমাদের মন খারাপ হয়নি। কারন বড় হয়ে আমরা উত্তরের দেশগুলোতে যাব। লেক থেকে মাছ ধরে কেটে লবণ মাখিয়ে বয়ামে ভরে রেখে দেব। বা হিকরি ( Hickory) গাছের বাকলের কুঁচি আগুনে পুড়িয়ে সেই ধোঁয়ায় মাছের ফালি শুকিয়ে নেব। তাতে দারুন চনমন করা এক লোভনীয়ে ঘ্রানে জড়িয়ে থাকবে মাছের ফালিগুলো। ভাড়ার রুমে জমিয়ে রাখব পনির আর মাখন।
শীতের সন্ধ্যাগুলোতে নতুন লাল মোজা আর মাঙ্কিক্যাপ পরে আগুনের পাশে বসে মজা করে খাব সেই লবণে জারানো মাছের ফালি। সাথে হলুদ লেবু। কালো জলপাইয়ের সালাদ। টেবিলের উপর বেতের ঝুড়ি ভর্তি থাকবে ওকফল।জানালার কাচের শার্সিতে জমে থাকবে দামি রত্নের মত বরফের কুঁচি।
বাড়ি ফেরার পথে দেখি বকের পালকের মত চাঁদ উঠেছে আকাশে। যদিও সূর্য ডুবতে অনেক দেরি।
' চাঁদে মানুষ গেছে তাই না ?' জানতে চাইলাম।
'শুধু মানুষ না। একটা কুকুর পর্যন্ত গেছে ।' জবাব দিল ভ্যাবলা।
' কুকুর নিল কেন সাথে ?' অবাক হলাম।
' অচেনা জায়গা। যদি রকেটের জিনিসপত্র চুরি হয় তাই। কুকুরটা নিয়ে গেছে পাহারা দেবে মনে করে ।'
‘বুড়িটাকে পাওয়া গিয়েছিল ?'
'চাঁদের বুড়িটা ? চরকা কাটে যে ? নাহ। বুড়ি আর বাচ্চা খুঁজে পাওয়া মুশকিল।দেখ না মেলায় ভিড়ের মধ্যে শুধু বুড়াবুড়ি আর বাচ্চা হারায়।'
‘ বুড়িটা চাঁদে গেল কি করে ?’
‘কি জানি । হতে পারে বুড়ির ছেলে মেয়েরা ওখানে রেখে দিয়েছে বুড়িকে। শুনেছি অনেক ছেলে পিলে বুড়ো বাপ মাকে আশ্রমে রেখে আসে। তেমন হয়তো।’
' চাঁদে নাকি জল নেই।'
' হ্যাঁ। খুশি খুশি গলায় বলল ভ্যাবলা। ' শরবতের দোকান দিলে দারুন চলবে।'
দুই
দুপুরের পর ভ্যাবলা আসে। সময় তখন কত বলতে পারব না। ঘড়ি চিনি না। টেবিলের উপর পেল্লাই ঘড়ি আছে একটা। চারকোণা। ভেতরে রঙচঙ্গা পাখির ছবি ভর্তি। সবচেয়ে সরু কাঁটাটা টিকটিক করে চলে। ওটা ব্যস্ত। বাঁটুল মোটা কাঁটা ঘণ্টা বুঝায় ওটা জানি। কিন্তু মাঝারি কাঁটা ওটার কাজ কি জানি না। কাজেই পৌনে তিন , সোয়া তিন বা সারে তিন অমন বিচ্ছিরি সময় ঠিক বুঝি না।
কিন্তু ঘড়ি আমাদের লাগেও না। রোদের রঙ দেখে বুঝি সময় কত। পাখিদের বাসায় ফিরে আসতে দেখলে বুঝি সময় কত। আবার গগন বাবুর আম বাগানের ওখানে সূর্যটা যখন মসুরি ডালের রঙ হয়ে যায় বুঝি বাসায় ফিরতে হবে। আর রেডিওতে একটা লোক খানিক পর পর বলতেই থাকে এখন বেলা অতটা । এটাই লোকটার কাজ। কখন অনুরোধের আসর হবে সেটাও বলে । আবার ভারতীয় বিভিন্ন শিল্পীদের গান হলে সেটাও বলে।
আমরা যে শুধু টো টো করে ঘুরি তা না। এমনিতে অনেক কাজ আমাদের। পিঁপড়ের বাসাগুলো দেখি ঠিক আছে কি না। ওরা প্রতিবেশী। ওদের খোঁজ নিতেই হয়।
পাখির বাসাগুলো দেখি ঠিক আছে কিনা। নীলাভ রঙের পাখির ডিম। দুধের মধ্যে এক ফোঁটা কাপড় কাচার নীল ফেলে দিলে অমন রঙ হয়। ডিমগুলো সোনালি খড়ের শুয়ে থাকে। একদিন ওখান থেকেই পিচ্চি বাচ্চা বের হয়। বিচ্ছিরি দেখতে। শরীরে তেমন পালক থাকে না। প্যাঁচরাঅয়ালা মাথা ন্যাড়া করলে যেমন দেখায় অমন লাগে নতুন বাচ্চাগুলোর শরীর। মা পাখিটা যত্ন করে খাওয়ায় ওদের। পালক আর পাখা গজালে উড়ে যায়।
বাংলার মাঠে গিয়ে নিম গাছদুটো দেখি। চিরকি মিরকি পাতা দেখি ওদের । ঘন মাখনের রঙের নিমফল খাওয়ার লোভে হাজির হয় একগাদা কালো কাক।
তারপর নদীটা দেখি। নদী সব সময় একই জায়গায় থাকে। তারপরও বাসন্তী পিসীর বাবা বলেছে- নদী নাকি এক জায়গায় থাকে না। অন্য কোথাও চলে যায়। বা নদী নাকি মরেও যায়। সর্বনাশ। নদী মরলে মাছ আর গুগলি শামুকগুলোর কি হবে ?
রোজ যখন দেখি নদীটা আগের জায়গায় আছে তখন শান্তি পাই মনে। বাঁচা গেল রে।
আমরা তখনও জানতাম না, একদিন এই সব ঘাস, পাখি, ফুল সব হারিয়ে যাবে শীতের প্রথম প্রহরের স্বপ্নের মত। জানলে দিনমান বসে থাকতাম বাংলার মাঠে। শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে বট গাছের নীচে। দেখতাম শেয়ালকাঁটা ঝোপের মধ্যে ফুটে থাকা গাঢ় হলুদ রঙের ফুল । যার পাপড়িগুলো সূর্যের ফালি থেকে বানানো। মাঝে রক্তের বিন্দুর মত লাল ছোপ ।
তারপর একদিন কেমন কেমন উত্তুরে হাওয়া বইতে থাকে। দুপুররের রঙ হয় হলুদ আর বিকেলের রঙ হয় কমলা। বাঙলার মাঠের এক কোনে জমি কুপিয়ে শিম, গাজর, বাধাকপি আর মূলার চাষ করে বাংলোর দারোয়ান। অচেনা ভিনগ্রহের প্রাণীর ডিমের মত বাধাকপি দেখে অবাক হই। অপূর্ব লাগে সাদা আর ফিকে গোলাপি রঙের মুলা । ঘন কমলা রঙের লোভনীয় গাজরের লোভে রাতের বেলা ক্ষেতের মধ্যে ঢুকে পড়ে ভীতু খরগোস। সতর্ক চোখে তাকায় চারিদিক। কূট করে কামড় বসায় গাজরের গায়ে। মনে মনে সাফাই দেয়- আমরা তো ভেজেটেরিয়ান। কার ক্ষতি করছি না তো !
টিয়ার পালকের মত মটরশুঁটির খোসা ছড়িয়ে দেখেছি , ভেতরে পিচ্চি মার্বেলের মত মটরদানা গুটিসুটি হয়ে ঘুমিয়ে থাকে । সুন্দর একটা পরিবার ওরা।
কচুর পাতার মধ্যে টলটল করে জমে থাকা শিশির। ভেজা মাটির ঘ্রান কি মিষ্টি। আরও মিষ্টি কুয়াশার ঘ্রান। গাছের দুই ডালে মাকড়সার জালে জমে থাকে শিশিরের কণা। রোদে ঝিকিয়ে উঠে দূর পাহাড়ের মণির মত। বাসায় বসে থেকে কায়দা করে খাবার পায় ধূর্ত মাকড়শা।
কুমোর পোকা কাঁদা মাটি লেপে নিজের বাসা বানায় । খাবারের ফাঁকে ফাঁকে খড় কুটো জোগাড় করে পাটকিলে রঙের চড়াই। এই সব ভাল লাগে।
বড় রাস্তা। কালো কুচকুচে। চলে গেছে দূরে। গরমে হালকা পিচ উঠে। স্যান্ডেলে শব্দ হয়।
রাস্তার পাশে একগাদা কড়ই গাছ। ওদের শুকনো পাতাগুলো স্প্যানিশ ডাবলুনের মত। পরে থাকে পথের উপর । কালো পথের উপর সোনালি পাতা , মন ভাল করে দেয়। আকাশের মত কোমল নীল ঘণ্টি ফুল । মোরগের ঝুঁটির মত লাল বোতল ব্রাশ ফুল দেখে ভাবি একদিন চেষ্টা করে দেখব ? বোতল পরিষ্কার করা যাবে ?
আমরা জানতাম না ওরা সবাই হারিয়ে যাবে। ভাটায় পরে থাকা গুগলি শামুকের মত স্মৃতি থাকবে আমাদের মনে।
কোন কোন বিকেলে দেখি একগাদা লাল টুকটুকে ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে মাঠের উপর। সব সময় না। এক মৌসুমে ওরা এমন জড় হয়ে উড়ে বেড়ায়। এক সাথে এক ঝাঁক লাল ফড়িং , নীচে সবুজ নরম বিজন ঘাস- দেখার মত এক দৃশ্য।
অচেনা বড় গাছটার কর্কশ বাদামি বাকল যা দেখতে নিউজপ্রিন্ট কাগজের মত সেটায় ঠুকরে ঠুকরে পোকা বের করে খায় কাঠ ঠোকরা।
কত জায়গায় না খাবার লুকিয়ে থাকে !
লজ্জাবতীর ঝাড় থর থর করে কাপে উত্তরের হাওয়ায়। ওদের গোলাপি রঙের ফুল মুগ্ধ করে আমাকে।
কী এক গাছে পিচ্চি টম্যাটোর মত ফল ধরে। সবুজ। বেগুনি। কমলা। বেগুনীটা বেশি হয়। ওটা নিয়ে দেয়ালে ঘসে দিলে সেই রঙ আর উঠতে চায় না সহজে।
বছরের শেষ দিকে মৌসুমটা কেমন হয়ে যায়।
বৃষ্টি বাদল হয় না। ওরা ছুটিতে গেছে। দুই এক টুকরো মেঘের দলা অদ্ভুত সব আকার নিয়ে অলস ভাবে আকাশে উড়ে। নিজেদের সাথে ধাক্কা খেয়ে চেহারা বিগড়ে নতুন চেহারা বানিয়ে উদাস ভাবে উড়ে বেড়ায়। রোদের ফালিগুলো ভুবন চিলের গায়ের মত সোনালি রঙের । দূরের সাই বাবলা আর কড়ই গাছগুলো পান্নার মত ঝিকিমিকি করে। বাতাস হয়ে যায় মচমচে , ঢেউ খেলানো আর টাটকা। মটরশুটির মত গাঢ় রঙ নিয়ে উড়ে যায় গঙ্গাফড়িং ।
টিয়াপাখির পালকের মত সবুজ রঙের গাছের পাতায় উজ্জল কমলা রঙের কেমন এক পোকা হেঁটে বেড়ায়। দেখে অবাক হই। কি বিচিত্র রকমের পোকা মাকড় আছে কে জানে।
জীবজন্তু আর গাছাপালার চেয়ে পোকা মাকড়ের প্রজাতি অনেক বেশি। প্রাণী জগতের ৮০% হচ্ছে পোকা মাকড়। কিছু পোকা আমাদের ক্ষতি করলেও বাকি সবাই ভাল। অনেকে আবার উপকার ও করে। মৌমাছির কথাই ধর । আমাদের জন্য মধু জোগাড় করে না সত্যি। ওদের মধুই আমরা চুরি করি। ১ পাউনড মধু যোগাড় করতে একটা মৌমাছি ৪৩ হাজার মাইল উড়ে যায়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলেন মৌমাছি না থাকলে নাকি গাছপালার বংশ বিস্তার অনেক কমে যেত। ওরা নাকি ফুলে ফুলে উড়ে গিয়ে রেনু ফেনু মিলিয়ে গাছের বংশ বিস্তার করায় ।
পোকা মাকড় যে কম খেয়ে বাঁচে তা না। পঙ্গপাল নিজের ওজনের দ্বিগুণ খাবার খায়। সবচেয়ে পুরানো পোকার ফসিল যেটা পাওয়া গেছে সেটা হল তেলাপোকা। ২৮০ মিলিয়ন বছর আগের। মানে ডাইনোসরদের আগে ওরা পৃথিবীতে এসেছিল। মশা এক সেকেন্ডে ৫০০ বার ডানা ঝাপটায় । এইজন্য মশা মারা এত কঠিন। আর মশা উড়লে অমন বিরক্তিকর পুউউ শব্দ হয় ।
সূর্য ডুবে যাবার সাথে সাথে কাকের পালকের মত অন্ধকার নেমে আসে চারিদিকে। পুরো এলাকা কেমন যেন নিঝুম হয়ে যায়। বাড়ির পিছনের গগন বাবুর আম বাগান থেকে বিচিত্র সব শব্দ ভেসে আসে। ডানা ঝাপটে বাদুড় উড়ে যায়। পাকা ফলের লোভে ওরা বাগানে যায়। থাবা দিয়ে পাকা ফল আঁকড়ে ধরে উড়ে যাবার সময় কখন কখন টুপ করে খসে পরে টিনের চালে। পরদিন বাইরে পাই লাল টুকটুকে পাকা বরই। অমন গোলাকার আর মিষ্টি বরই পরে কোথাও পাইনি।
ঝি ঝি পোকার ডাক শুনি রোজ । ওরা নিশাচর পোকা। দিনে ওদের খোঁজ পাওয়া যাবে না। ঝি ঝি পোকা শুধু পুরুষ পোকারা ডাকে। মেয়ে ঝি ঝি পোকারা কখনই ডাকে না। গরমের দিনে ওরা বেশি চিল্লা ফাল্লা করে। শীতে কম। ওদের ডাক শুনে ব্যাঙ, গিরগিটি আর কচ্ছপ উৎসাহে বাগানে ঢুকে পরে। কারন ঝিঝি পোকা ওদের প্রিয় খাবার। ভিয়েতনাম আর কম্বোডিয়ায় ঝি ঝি পোকা ভেজে খায় ওখানের মানুষরা। কে জানে খেতে কেমন ? জাপান আর চায়নার লোকজন ঝি ঝি পোকার ডাক শুভ লক্ষণ মনে করে। আমার ভাল লাগে ওদের হল্লা আর গুলতানি।
তিন
নদীর পাড়ে লাল চুলের কতগুলো মেয়ে কি একটা খেলা খেলছে। ওদের চুল লাল । ওরা বিদেশী মেয়ে না । রোদে ঘুরে ঘুরে কাগজ কুড়ায় বা বাংলার মাঠের ওখানে শাকপাতা সংগ্রহ করে ওরা। সবার রঙ জ্বলা ছিটের কাপড় পড়নের । একটা মেয়ে গোল বৃত্তে দাঁড়িয়ে সুরে সুরে বলছে-আর সবাই জবাব দিচ্ছে।-
“নামতা বল রে ।এক হল রে।নামতা বল রে।দুই হল রে।আমার ঘরে কে রে ? আমি রে ।কি খাস ? লবণ খাই । লবণের দাম দে ।”
দাম চাওয়া মাত্র সব মেয়ে থু থু দিয়ে দৌড় দেবে। বৃত্তের মেয়েটা তখন দৌড়ে ওদের ধরার চেষ্টা করবে।
আমরা মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে খেলা দেখলাম। খেলাটা তেমন রোমাঞ্চকর মনে না হওয়ায় আবার হাঁটা ধরলাম।
কয়েকটা ছেলে যুদ্ধ -যুদ্ধ খেলছিল। আমাদের দেখে জানতে চাইল খেলব কি না। রাজি হয়ে গেলাম। দুইজনকে দুই দলে নেয়া হল।
ভ্যাবলা এখন আমার শত্রু । শুরু হল ভয়াল যুদ্ধ । নদীর এক জায়গায় জল শুকিয়ে কাঁদা কাঁদা হয়েছিল। ওটাই আমাদের ময়দান। মুঠি ভর্তি প্যাক-কাঁদা হচ্ছে গোলা বারুদ। মুঠ করে তুলেই ছুড়ে মার। দূরে দাঁড়িয়ে হাসছিল ভ্যাবলা। আমার ছুড়ে দেয়া কাঁদা সোজা গিয়ে আঘাত করলো ওর মুখে। মুখটা লেপটে গেল। হাসতে লাগলাম । প্রতিশোধ নিতে ওর হাতের কাঁদা ছুড়ে মারল আমার দিকে। পালাতে চেষ্টা করলাম। হায় হায়। নরম কাঁদার মধ্যে গোড়ালি এমন ভাবে এঁটে গেছে যে আমাদের সবার গতি স্লো মোশন মুভির মত। আমার মুখ লেপটে গেল কালো কাঁদায়। মুখের ভেতরে কাঁদার স্বাদ পেলাম। বিচ্ছিরি।
পরের সময়গুলো শুধু মহাউৎসাহে যুদ্ধ চালিয়ে গেলাম। কাঁদা মাটির গোলা বারুদ উড়ে যাচ্ছিল এদিক ওদিক । দেখার মত চেহারা হল এক একজনের । একসময় অনেকে হতাহত হল। আমি আর ভ্যাবলা নিপাত গেলাম। কবর দেয়া হল মরা সৈনিকদের। মানে নদীর পাড়ে নরম বালিতে চাপা দিলাম। মুখটা বাইরে রইল। কয়েকটা বেগুনি রঙের কচুরি ফুল রেখে দিলাম কবরের উপর। মরা সৈনিকদের সম্মান দিতে ।
যুদ্ধ শেষ। বাড়ি ফিরতে হবে। খানিক পর সূর্যটা মুসুর ডালের রঙ হয়ে যাবে। আমাদের শরীর ভর্তি কাঁদা। যে কেউ দেখলে ভয় পাবে। শাখা নদীর এক কোন যেখানে স্রোত নেই সেখানে বড় বড় কয়েকটা কৃষ্ণচুড়া আর রাধাচুড়া গাছ দাঁড়িয়ে আছে হাতে হাত ধরে। জ্বলন্ত কয়লার মত ফুল ধরে কৃষ্ণচুড়া গাছে ।
রাধাচুড়া গাছে পাকা লেবুর মত হলুদ ফুল ধরে। গাছদের কাছেই একটা বাঁধান ঘাঁট। কে কবে মানুষের উপকারের জন্য বানিয়েছে । আমরা উনার নাম ভুলে গেছি। কারন উনি ভাল মানুষ। খারাপ মানুষ বানালে এই ঘাঁটের সাথে সেই মানুষের নাম জুড়ে থাকতো।
ঘাঁটের সিঁড়ি বড় বড়। শ্যাওলা পরে গেছে। কিনারে শামুকদের বস্তি। শ্যামা ঘাসের দঙ্গল। ওখানেই আমাদের শরীরের কাঁদা পরিষ্কার করার জন্য নামলাম। ঝুপ ঝাঁপ করে ঠাণ্ডা জলে ডুবিয়ে নিজেদের পরিষ্কার করে নিচ্ছিলাম। তখন দেখি সিঁড়িতে একটা পিতলের আংটি পরে আছে। তুলে দেখি আংটির মাঝে মিছরির টুকরোর মত পিচ্চি একটা পাথর।
‘ আরে এটা তো দৈত্যর আংটি ।’ চেঁচিয়ে উঠলো ভ্যাবলা।’ ঘষা দিলেই দৈত্য আসবে।’
‘ উহু, আংটির সাইজ ছোট। দৈত্যের আংটি হয় কি করে ?’ বললাম।
‘ আরে বেকুব। এটা ঘষা দিলেই দৈত্য আসবে। তখন ওর কাছে যা চাইব তাই পাওয়া যাবে ।’
‘ আরে হ্যাঁ আমিও অমন গল্প শুনেছি মায়ের কাছে। দাঁতভাঙ্গা শহরের গল্প না ।’
‘ দাঁতভাঙা না। বাগদাদ। ‘
‘ তো দৈত্যকে ডাকি ?’
‘ আগে জেনে রাখা ভাল কি চাইব আমরা। দৈত্য অপেক্ষা করতে পছন্দ করে না।’
‘ আমাদের মাছ ধরার ছিপ, সুতা, ফ্যাৎনা এইসব দরকার।’
‘ না, না। পাঁচ কেজি শনপাপড়ি, দশটা আইসক্রিম, তিন রোল আমসত্ত্ব , আর এক বাটি হালুয়া হলে ভাল হয়।’
‘ আমরা টাকা চাইলেই পারি। দরকার মত কিনে নিলাম।’
‘ তর মাথায় মজ্জা আছে রে।’ খুশি খুশি গলায় বলল ভ্যাবলা। ‘ আপাতত ৫৭০ টাকা চাই। পরে দরকার মত চেয়ে নিলেই হবে।’
‘ ঠিক। পরে বললেই হবে ।’
সিঁড়িতে বসে ভাল মত ঘষা শুরু করলাম আংটিটা। পাশে ধনেশ পাখির মত গলা বাড়িয়ে রইল ভ্যাবলা।
কয়েকটা ঘষা দেয়া মাত্র পেছন থেকে বাজখাই গলায় কে যেন বলল-’ অ্যাই তরা কি করিস রে ?’
তাকিয়ে দেখি দৈত্য এসে গেছে। খালি গা। ধুতি পড়নের। মাথায় চুল নেই। তবে টিকি আছে। কয়লার গুড়া দিয়ে দাঁত মাজছে। গলায় গামছা। পেতলের এক বাউলে সর্ষের তেল। চেহারা রাগি রাগি ।
দৈত্যের গায়ের রঙ সবুজ হয় এমনটা শুনেছিলাম। শোনা কথা বিশ্বাস করা উচিৎ না। এই দৈত্যের গায়ের রঙ কাটা আলুর মত ফর্সা। পায়ে নাগড়া নেই। আর হাতা কাটা ব্লাউজের মত কি একটা পরা থাকে। তাও নেই।
‘ তরা আমার স্নানের জায়গা নষ্ট করলি রে পামর। নরকে অধিস্থান করবি। ভাল করে সিঁড়ি পরিষ্কার কর।’ রাগি গলায় বলল দৈত্য। ‘ নইলে নদীতে ফেলে দেব।’
ভয়ে ভয়ে আমরা সিঁড়ি পরিষ্কার করলাম। পরিষ্কার সিঁড়িতে ধপাস করে বসে পড়লো ফর্সা দৈত্যটা। সর্ষের তেলের বাউল দিয়ে বলল-’ ভাল করে সারা শরীরে মাখিয়ে দে। স্নানের আগে শরীরে তেল মাখা ভাল।’
‘ইয়ে মানে আমাদের শনপাপড়ি আর...।’ বলার চেষ্টা করলাম।
‘ হবে হবে । সব হবে।’ হাত তুলে আশ্বাস দিল দৈত্য।
‘ পিঠের ঘামাচি গেলে দেব ?’ আহ্লাদে বলল ভ্যাবলা। মনে মনে বিরক্ত হলেও কিছু বললাম না।
‘ দে।’ উদার ভঙ্গিতে বলল দৈত্য।
দশ মিনিট ধরে আমরা দৈত্যর শরীরে ভাল করে তেল মাখিয়ে ঘামাচি গেলে দিলাম। তারপর দৈত্য স্নানে নামলো। অং বং কিছুক্ষণ মন্ত্র পড়লো। তারপর গুনে গুনে একুশটা ডুব দিল। উঠে গামছা দিয়ে যেই মাত্র শরীর রগড়ানো শুরু করেছে অমনি ঘাটলার সামনে সুন্দর চেহারার দুই যুবক হাজির। রাগি গলায় একজন বলল- ‘ বাবা আপনি আবার নদীর ধারে এসেছেন ? আপনার সাহস দেখি আমরা অবাক। ’
দৈত্যটা কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
দুই যুবক হিড়হিড় করে বাবা দৈত্যকে ধরে নিয়ে গেল। পিতলের বাউল সহ। একজন শুধু আমাদের দিকে ফিরে বলল-’ বাবাকে দেখলেই আমাদের খবর দেবে। মাসে একটাকা করে বেতন পাবে।’
‘ আপনাদের কাজটা আমরা নিলাম।’ বেশ ভাব ধরেই জবাব দিলাম। ‘ কাকুর সমস্যা কি ?’
‘ জ্যোতিষী বলেছে- জলে উনার ফাঁড়া আছে। নদীতে ডুবে মৃত্যুর যোগ আছে। কিন্তু উনি পূজা শেষে নদীতে স্নান করতে চান। লুকিয়ে চলে আসেন।’
দৈত্য তখনও চেঁচাচ্ছে- ‘ আমাকে ছেড়ে দে পাপিষ্ঠ। সব ভস্ম হয়ে যাবি...।’
হেন তেন।
চার
‘ সবচেয়ে বেশি টাকা কার কাছে আছে ?’ জানতে চাইলাম।
‘সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যানের কাছে।’ ঘাসের ডগা চিবুতে চিবুতে বলল ভ্যাবলা। ‘ ওকে বানাতেই তো ছয় মিলিয়ন ডলার লেগেছে।’
‘ছয় মিলিয়ন ডলার কত টাকা ?’
‘ সাত আটশো টাকা হবে ।’ অনেকক্ষণ হিসাব কষে বলল ভ্যাবলা।’ বেশির ভাগ টাকা থাকে অবশ্য খনির মালিকদের কাছে।’
‘ খনির মালিক কি ভাবে হওয়া যায় ?’
‘ দূরের দেশে গিয়ে খনি খুঁজে বের করতে হয়। যে খুঁজে পায় সেই হয় খনির মালিক। তবে আমরা নিজেদের খনি বানিয়ে নেব।’
‘ খনি বানানো যাবে ?’ অবাক আমি।
খনি বানানোর কাজে লেগে গেলাম। বাগানে শসা আর ধুন্ধুল গাছের নীচে নরম মাটিতে পিচ্চি পিচ্চি গর্ত খুঁড়লাম। রান্নাঘর থেকে চুরি করে বেশ খানিক সরষের তেল আর লবণ নিয়ে এলাম। মা- টের পেল না। প্ল্যাসটিকের ব্যাগে কয়েক মুঠো লবণ আর সর্ষের তেল মুড়িয়ে গর্তে রেখে মাটি চাপা দিতেই দু- দুটো খনির মালিক হয়ে গেলাম আমরা। তেলের খনি আর লবণের খনি। দাম বাড়লেই বিক্রি করব।
নিজেরা খুঁড়ব না। কয়েকজন খনি শ্রমিক ভাড়া করব। শ্রমিকদের আমরা শূয়রের মাংস আর বাদামি রুটি খেতে দেব। সাথে টিনের মগ ভর্তি লাল চা । সপ্তাহে একদিন একটা করে আপেল। রাই পচানো মদ এক বোতল ।
রোজ গিয়ে পাকরাশিদের দোকানে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম, আজকে শর্ষের তেল বা লবণের দাম কত ?
ভ্যাবলা বুঝিয়ে বলল- এইসব কাজে সবুরে মেওয়া ফলে।
মাঝে একদিন ভ্যাবলার মা ওকে তেলের শিশি দিয়ে বলল দোকান থেকে আটা আনার শর্ষের তেল নিয়ে আসতে। ভ্যাবলা হাঁপাতে হাঁপাতে চলে এলো আমার কাছে। বলল- ‘খনি থেকে এখনই তেল উত্তোলন করে পার্টির কাছে পৌঁছে দিতে হবে ।’
‘ কত ব্যারেল তেল দিতে হবে ?’ গম্ভীর মুখে বললাম।
‘ ছটাক। এই মুহূর্তে খনি শ্রমিক পাওয়া যাবে না। নিজেরাই খুড়ি। ধরে নিলাম বেতন বোনাস পেয়ে শ্রমিকরা জাম্বিয়াতে গেছে ।’
আমরা খনি খুঁড়লাম। ভেজা মাটির জন্য সব লবণ গলে জল হয়ে গেছে। দেখে হায় হায় করে উঠলাম। ঠাণ্ডা মাথায় নিজেদের মনে করিয়ে দিলাম , সব ব্যবসায় লাভ ক্ষতি আছে। হোক সেটা মাইনিং বিজনেস। ব্যাগের তেল যত্ন করে শিশিতে ঢেলে বিক্রি করলাম ভ্যাবলার মায়ের কাছে । ধরা পরে মার খেল ভ্যাবলা। তেলের পরিমাণ নাকি কম। আর শর্ষের তেলের ঝাঁঝ নাকি একদম কম নেই ।
খনির ব্যবসা এখানেই শেষ। তবে কাউকে না জানিয়ে ভাঙ্গা দুটো চিনামাটির পেয়ালা আর তশতরী লুকিয়ে রাখলাম মাটি খুঁড়ে । অনেক বছর পর নাকি ওসব তুলে অনেক দামে বিক্রি করা যাবে। আন্তিক না কি নাকি বলে। ধনী লোকজন নাকি অমন ভাঙ্গা চুড়া পুরানো জিনিস অনেক দাম দিয়ে কিনে নেয়। পাগলের কি অভার আছে দুনিয়ায়।
আমরা অপেক্ষায় আছি।
পাঁচ
শীতের শুরুতে ভ্যাবলা ব্যস্ত হয়ে পড়লো ঘুড়ি, নাটাই নিয়ে।
এবং সব নিজে নিজেই বানাবে। নাটাই বানানো বেশ সহজ। একটা খালি গুড়া দুধের কৌটা জোগাড় করলো।মাঝ বরাবর ছিদ্র। ভেতরে গোল মত একটা কাঠের টুকরো কায়দা করে দিতেই হয়ে গেল। সুতা আমার কাছ থেকেই নিল। এবার দরকার মাঞ্জা দেয়া। মাঞ্জা কি ভাবে দিতে হয় জানি না। তবে খুব ঝামেলার কাজ।
বাংলার মাঠে কয়েকটা বড় ছেলেকে দিতে দেখেছি। তবে ওটার ব্যবস্থাও ভ্যাবলা করবে। আমরা টই টই করে নানান জায়গায় হেঁটে চালতা গাছের পাতা, বোতল, জোগাড় করলাম। সাগুদানা , ভাতের মাড় আর লাল রঙ ভ্যাবলার বড় ভাই জোগাড় করে দিল। বোতল ভেঙ্গে গুড়া করে একদম পাউডার বানিয়ে ফেললাম। বড় একটা পাতিলে জ্বাল দেয়া হল সব। কেমন বিচ্ছিরি ঘ্রান। ন্যাকড়ায় মুড়িয়ে সেই মাঞ্জা সুতায় মাখান হল। শুকানোর পর হাত দিয়ে দেখি বেশ ধাঁর। আঙুল কেটে যায়। তারমানে জিনিসটা কাজে দেবে।
রঙিন কাগজ কেটে ঘুড়ি বানিয়ে ফেললাম।
মায়াবী বিকেলে ঘুড়ি, নাটাই নিয়ে বের হলাম আমরা। বিশ্বকর্মা পুজার শেষ। আকাশ ভর্তি দূর দ্বীপের অতিথি পাখির মত রঙ বে-রঙের ঘুড়ি। কি সুন্দর সব রঙ। বজ্রপাতের মত ঘন বেগুনি। কাঁঠালের কোষের মত হলুদ । অপরাজিতা ফুলের মত নীল। গাজরের মত কমলা। জবা ফুলের মত লাল। পাকা জামের ভেতরের রঙের মত মায়াবী রঙের ঘুড়িও আছে।
হরেক সাইজের। উড়ছে সবাই। দুই ডানা ধরে উপরে তুলে দিতেই আমাদের ঘুড়িটা উঠে গেল আকাশে। আহ। আরও । আরও উপরে। আরও। অন্য কিছু ঘুড়ি তেড়ে এলো আমাদেরটাকে কাটবে বলে। প্যাঁচ কষাকষি চলল। কেটে গেল সুতো। আমাদের ঘুড়ি মাতালের মত টলতে টলতে গিয়ে পড়লো বিপিন বাবুর আম বাগানের ভেতর।
এবার ভয় পেয়ে গেলাম। বিপিন বাবুর আম বাগানের ভেতরে গেলেই পাব ঘুড়িটা। কিন্তু কেউ যায় না ওখানে। ভয়ে। ভুত আছে ওখানে। সবাই জানে। সন্ধ্যার পর ভূতটাকে দেখেছে কেউ কেউ।
বিপিনবাবুরা দেশ ছেড়ে চলে গেছে, ১৯৭১ সালে। ঐ বছরটা বাংলাদেশের জন্ম বছর। বিপিনবাবুর মত অনেকেই তখন কোলকাতায় চলে গেছে। উনাদের বাড়িটা খালি পরে আছে। একজন দূরের আত্মীয় এসে দেখে যায়। বাকি সময় অমনিতেই পরে থাকে। জাম, জারুল আর আম গাছের ঝাড় বেড়ে গিয়ে জঙ্গলের মত হয়ে গেছে।
বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম বোকার মত। ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছি না। শেষ বিকেলের আলোতে রহস্যময় লাগছে বাড়িটা। এক মানুষ সমান উচু দেয়াল। দেয়ালের উপর কাচের টুকরো বসান। যাতে দস্যু তস্কর ভেতরে ঢুকতে না পাড়ে। মখমলের মত সবুজ শ্যাওলা জমে আছে দেয়ালের নানা জায়গায়। ছোপ ছোপ । লোহার গেইট। মরচে ধরা।
‘ দুইজনে এক সাথেই যাই নাকি ?’ বললাম ।
‘ চার আনা পয়সা থাকলে বের কর। টস করি। যার নাম উঠবে সে যাবে। ’ বলল ভ্যাবলা।
পকেট থেকে মাছের আঁশের মত চকচকে রুপালি পয়সা বের করতেই থাবা মেরে তুলে নিজের প্যান্টের পকেটে রেখে দিল ভ্যাবলা। ‘ দুই জনেই যাই। টস করার দরকার কি ?’
ঠেলা দিতেই লোহার গেইট খুলে গেল। লম্বা ঘাস। সরু পথ। সামনে একতলা পুরানো বাড়ি। চারিদিকে গাছ । আর সেই গাছের ডালে ফলের মত প্যাচিয়ে রয়েছে নানান রঙের ঘুড়ি। অনেক অনেক ঘুড়ি। সাথে আমাদের ঘুড়িটাও । স্বপ্নের মত অপূর্ব দৃশ্য।
‘ এটা তো দেখছি ঘুড়ির খনি রে।’ ফিসফিস করে বললাম।
‘ হ্যাঁ, কবিই বলেছেন, হারাস যদি এক ঘুড়ি ফিরে পাবি ভুরি ভুরি।’ ফিসফিস করে জবাব দিল ভ্যাবলা।
‘ভয়ে কেউ আসে না এখানে। সব ঘুড়ি আমাদের।’
‘ সে আর বলতে।’
আমচকা আমাদের কলজে কাপিয়ে বু -বু- উ-উ -উ উ করে কেঁদে উঠলো কেউ।কোন মানুষ বা জন্তু অমন চিৎকার করতে পারে না । একদম অসম্ভব।
এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর পারলাম না। উল্টে দুইজনেই দৌড় দিলাম। এর আগে বা পরে অমন দৌড় কখন দেইনি আর কখনই । গগন বাবুর বাড়ি ছেড়ে অনেক অনেক দূরে এসে হাফ ছাড়লাম।
‘ কিসের কান্না ওটা ?’ হাঁপাতে হাঁপাতে জানতে চাইলাম।
‘ জানি না। ভুত হবে।’ জবাব দিল ভ্যাবলা। আমার চেয়ে বেশি হাঁপাচ্ছে।
জামফলের মত সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসার আগেই বাড়ি চলে এলাম। কানের ভেতরে বাজছে সেই ভয়াল কান্নার সুর। সারা রাত ঘুমের মধ্যে ভয়াল সব স্বপ্ন দেখলাম। গগনবাবুর আম বাগানের ভেতরে পিচ্চি একটা পিশাচ বসে ঘুড়িগুলো পাহারা দিচ্ছে। পিশাচটার মুখ ওর পেটের মধ্যে। ঢ্যাঁড়শের সাইজের দাঁত মুখ ভর্তি ।
পরদিন দুপুরে ভ্যাবলা এলো। সাথে লোহার দুই পেরেক। কাগজে মোড়ানো শর্ষে আর রাম নাম লেখা ওর দাদুর একটা মাদুলি।
‘ চল, ঘুড়ি নিয়ে আসি। বৃষ্টি হলেই নষ্ট হয়ে যাবে।’
‘ কিন্তু...।’
‘লোহা, শর্ষে আর রামনাম থাকলে ভুত আসে না।’
আস্তে করে চলে এলাম। বিছানায় শুয়ে থাকা মায়ের মুখের দিকে একবার তাকালাম। আর যদি না ফিরি !
গগন বাবুর বাড়ির বাইরে আসতে করে দাঁড়ালাম। ভয়ে বুক টিপটিপ করছে। আচমকা শুনতে পেলাম সেই কান্নার সুর। অনেক কষ্টে দৌড় দেয়া থেকে নিজেকে সামলে নিলাম। কিন্তু শরীর হিম হয়ে গেছে।
‘ভুত ?’ জানতে চাইলাম।
‘ দিনের বেলা বের হয় না ওরা।’ চিন্তিত মুখে বলল ভ্যাবলা।
‘তাহলে ?’
‘ মনে হয় বুঝতে পেরেছি। চল ভেতরে।’
আগের দিনের মত মরচে পরা গেইট ঠেলে ঢুকে পড়লাম। আলো সব কিছু অন্য রকম করে দেয় আমাদের চোখে। বিকেলের আলোতে অনেক বিভ্রান্তি ছড়ায়। দুপুর সব সমাধান দেয়। গেইটের ভেতরে নরম দূর্বা ঘাস। আগের দিনের মতই আম গাছ ভর্তি ঘুড়ি। পাখির ডাক। সেই সাথে ভূতের কান্নার রহস্য পরিষ্কার হল।
কারন আবার কান্না শুনতে পেলাম। কোন ভাবে নষ্ট বাতিল হওয়া গানের ক্যাসেটের একগাদা ফিতে উড়ে এসে সমান্তরাল ভাবে জড়িয়ে ছিল দুই গাছের ডালে। জোড় বাতাস পেলেই থির থির করে কেঁপে উঠে বিচ্ছিরি শব্দ করতো। আর আমরা খামাখাই ভয় পেয়েছিলাম।
বেশ কিছু ঘুড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ভালগুলো আমরা বেছে নামালাম। আটটা ঘুড়ি পেলাম। একদম ভাল।
‘ আটআনা ( পঞ্চাশ পয়সা ) করে বিক্রি করা যাবে।’ হাসল ভ্যাবলা।
আমিও।
‘ সন্ধ্যায় সবাই যে ভুত দেখে ওটা তাহলে বাতাসির মা ?’ ভাঙ্গা বাড়ির উঠানের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখালাম।
ওখানে মাটির একটা চুলা। কয়লা। একটা ভাঙ্গা টিনের থালা আর চটের বস্তা রাখা।
‘ হু, সারাদিন পথের ধারে ভিক্ষা করে রাতে এখানেই ঘুমায়।’ জিনিসগুলো ভ্যাবলাও চিনল।
‘ভয় করে না ?’
‘ভয় পেলেই কি কেউ তাকে দালানের ভেতর নিয়ে রাখবে ? খাওয়াবে ? আদর করবে ? এই পৃথিবীতে মা ছাড়া কেউ কারো খোঁজ নেয় না। ’
চুপ করে গেলাম।
দুই বন্ধু বের হয়ে এলাম লাল কমল আর নীল কমলের মত ।
হাত ভর্তি রঙ বেরঙের ঘুড়ি।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন