পূর্বকথা
সমুদ্রের এই জায়গাটা অন্য রকম।
মতিগতি বোঝা যায় না। কেমন যেন থমথমে পরিবেশ। গহন ঘন অন্ধকারে বিচ্ছিন্ন ভাবে ছড়িয়ে ছড়িয়ে আছে তিনশোর মতো দ্বীপ।
জনবসতিশূন্য।
ঝিনুক তুলতে এসেছিল দাদু আর নাতি। বিকেলে ঘন কুয়াশায় পথ হারিয়ে ফেলেছে । বাড়ি ফিরতে দেরী হয়ে গেছে । দাদু নৌকার দাঁড় বাইছে । নাতি বসে আছে গলুয়ের কাছে। নৌকার পাটাতন ভর্তি ঝিনুক । বেছে বেছে বড়গুলো জোগাড় করেছে ওরা।
নাতি অবাক হয়ে লক্ষ্য করল বাচাল দাদু একদম বোবা হয়ে গেছে । বরাবরের মতো সাগরের রহস্যময় স্রোত আর মাছের দেশান্তর নিয়ে বকবক করছে না।
দ্বীপগুলিতে কারা থাকে ? প্রশ্ন করল নাতি।
কেউ না। মুখ না ফিরিয়ে জবাব দিল দাদু।
কেন ? অবাক হল নাতি
ও গুলোতে কেউ থাকতে পারে না। নিচু গলায় বলল দাদু। তুই তাকাবি না ওখানে।
সমস্যা কী?
ওগুলো শয়তানের দ্বীপ । অস্বস্তি ভরা গলায় জবাব দিল দাদু।
মুহূর্তে ফ্যাকাশে গেল নাতির চেহারা। কত শুনেছি সে এই দ্বীপ আর সাগরের গল্প৷ ওখানের সাগরে সমস্যা আছে। দুপুর বেলা হঠাৎ করেই অন্ধকার হয়ে যায় আকাশ । কারণ ছাড়াই কালো কুচকুচে হয়ে যায় সাগরের জল। ঘন সবুজ কুয়াশা দেখা যায় দিগন্তে ।
কেউ আসে না এখানে । দূর থেকে এড়িয়ে যায়।। দ্বীপগুলোর নাম শুনলে চমকে ওঠে বুড়ো নাবিক আর জাহাজিরা । কেউ থাকে না এই প্রবালদ্বীপগুলোতে । তারপর ও গভীর রাতে নীল রঙের ভুতুড়ে আলো দেখা যায় দ্বীপের এখানে - ওখানে ।
ভয়ে কাঁপতে লাগল নাতি । বিড়বিড় করে ক্রুশ আঁকল বুকে।
এক
১৯৪৫ সালের, ৫ ডিসেম্বর ।
ফ্লোরিডা।
ফোর্ট লয়ালডেল স্টেশন ।
সামনেই ক্রিসমাস। ছুটির আমেজ চলে এসেছে। ঢিলেঢালাভাবে ডিউটি করছে আফিসারেরা । আজ তেমন কাজ নেই।
রুটিন চেক হিসাবে চৌদ্দ জন পাইলট আকাশপথে মহড়া দেবে।
অপারেশনের নাম, ফ্লাইট নাইনটিন । পাঁচটা বোমারু বিমান নিয়ে আকাশে উড়বে। এগুলিকে অ্যাভেঞ্জার বিমান বলে । জার্মানির তৈরি জিনিস । ঘণ্টায় তিনশ মাইল বেগে উড়তে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান TBF অ্যাভেঞ্জার বিমানগুলি বেশ নাম করেছিল। ঊনিশশো বিয়াল্লিশ সাল থেকেই আমেরিকান বিমান বাহিনী আভেঞ্জার বিমান ব্যবহার শুরু করেছে। বোমা ফেলায় জুড়ি নেই।
রোদেলা গরমের দুপুর।
তাপমাত্রা ৬৭ ডিগ্রি।
দক্ষিণ- পশ্চিমের শক্তিশালী বাতাস এক ফালি মেঘ ও জমতে দিচ্ছে না আকাশে।
ফ্লাইট- 19 কে মজা করে অফিসাররা লস্ট পেট্রোল বলতো। কেন কে জানে ! যদিও পেট্রোল ফ্লাইট হিসাবে এই বিমানগুলো কখনও ব্যবহার করা হত না। বেইজের আশপাশে ঘুরে বোমা ফেলার প্রশিক্ষণ দিত শুধু ।
চৌদ্দ জন পাইলট সবাই পুরাতন ।দলে নতুন কেউ নেই । আগেও একই মহড়া দিয়েছে দলের সবাই। নতুন কিছু না।
দুপুর ২.১০ মিনিটে বেইজ থেকে উড়ে গেল পাঁচটা আভেঞ্জার বিমান।
ওরা যাবে একশ ষাট মাইল পূর্ব দিকে। তারপর চল্লিশ মাইল উত্তরে। সেখান থেকে সোজা বেইজে ফেরত আসবে। একটা বিমান তিন জন করে যাত্রী নিতে পারে। একদম জলের মতো সহজ রুটিন । পুরো যাত্রাপথ এবং রুটিন চেক মিলিয়ে মাত্র দু ঘণ্টার মামলা৷ সবগুলি বিমানের ট্যাঙ্ক ফুয়েলে ভর্তি।
বেইজের কন্ট্রোল টাওয়ারে বসে রইল একজন রেডিও ম্যান। অ্যাভেঞ্জার বিমানের পাইলটরা নিয়মিত যোগাযোগ করবে রেডিও ম্যানের সাথে । সবকিছু ঠিকঠাক মতো চললে বিকেল চারটার সময় বেইজে ফেরত আসবে সবাই।
সব ঠিকঠাক।
ঠিক তিনটে পঁয়তাল্লিশ মিনিটে কন্ট্রোল টাওয়ারের রেডিও ঘরঘর করে উঠল।
‘... কন্ট্রোল টাওয়ার দিস ইজ ইমারজেন্সি। মনে হচ্ছে আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। বিমান কোনদিকে যাচ্ছে বুঝতে পারছি না।’
ভড়কে গেল রেডিওম্যান। মেসেজ যে পাঠাচ্ছে তাঁকে ভাল করে চেনে সে । অ্যাভেঞ্জার বিমানগুলোর লিডার চার্লস টেলরের গলা।
কন্ট্রোল টাওয়ারের সবাই অবাক হয়ে গেলো। চার্লস টেলরের মেসেজ সবাই পরিষ্কার শুনতে পেয়েছে ।
‘অবস্থান জানাও তোমাদের।’ দ্রুত জানতে চাইল রেডিওম্যান । বুঝতে পেরেছে নিশ্চয়ই সাংঘাতিক কোনও ভজকট ঘটে গেছে কোথাও।
‘ আমরা কোথায় যাচ্ছি বলতে পারব না। সম্ভবত হারিয়ে গেছি আমরা। নীচের সমুদ্র একদম অচেনা মনে হচ্ছে।’
রেডিওতে জবাব এল ।
কন্ট্রোল রুমের সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। এ সব কী বলছে চার্লস টেলর ?
‘ পশ্চিম দিকে প্লেন ঘোরাও।’ অ্যাভেঞ্জার বিমানগুলি লিডারকে কন্ট্রোল রুম থেকে পরামর্শ দেওয়া হল। ‘সোজা পশ্চিম দিক ধরে টানা উড়ে গেলেই বেইজে ফেরত আসতে পারবে তোমরা।’
‘ পশ্চিম দিক কোনটা সেটাই বুঝতে পারছি না। আমাদের সবগুলো কম্পাস নষ্ট হয়ে গেছে। বিমানের যন্ত্রপাতি কাজ করছে না। সূর্য দেখতে পাচ্ছি না। নিচে ওটা মার্টি না সমুদ্র তাও বুঝতে পারছি না।’
পুরো ন্যাভাল স্টেশন আর কন্ট্রোল টাওয়ার জুড়ে হুলস্থুল পড়ে গেল।
কি এ সব? পাগল হয়ে যায়নি তো অ্যাভেঞ্জারের লিডার চার্লস টেলর ?
বাইরে ঝকঝকে আকাশ । পরিষ্কার হলুদ রঙের রোদ। মাত্র বিকেল চারটে । তাহলে সূর্য দেখতে পাবে না কেন আভেঞ্জার বিমানের পাইলটরা ? পাঁচটা বিমানের কম্পাস একই সাথে নষ্ট হয়ে যায় কী করে?
এবার বিমানের পাইলটরা নিজেদের সাথে নিজেরা যোগাযোগ করতে লাগল। ভয় পেয়ে গেছে পাইলটেরা। বোঝাই যাচ্ছে চরম কোনও পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে ওখানে।
আকাশে অনেক রকম ভূতুড়ে ঘটনা হয় বলে এতোকাল শুনেছে সবাই।
কিন্তু এমন কোনও ব্যাপার আগে হয়েছে বলে তো শোনা যায়নি।
যদিও এই বিমানগুলির লিডার ছিলেন চার্লস টেলর। তারপরেও ক্যাপ্টেন জন স্টিভাসের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিলেন তিনি।
আতঙ্কে মাথা কাজ করছিল না টেলরের । নিজেদের মধ্যে ক্রমাগত বিপদের কাহিনি বর্ণনা করে যাচ্ছেন ক্যাপ্টেন স্তিভাস।
কন্ট্রোল টাওয়ার আর বেইজের সবাই হাঁ করে শুনছে সেই সব কথোপকথন। ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে জর্জের কণ্ঠস্বর। হয়তো রেডিওর ব্যাটারি দুর্বল হচ্ছে। বা অন্য কিছু। কী বলছে তা বোঝা যাচ্ছে না।
সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে এবং আবহাওয়া আরও খারাপ হতে লাগল, ফ্লাইট ১৯-এর সাথে রেডিও যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে গেল। একজন পাইলটের কাছ থেকে শেষ বার্তাটি এলো, "আমরা সাদা জলে প্রবেশ করছি। কিছুই ঠিক মনে হচ্ছে না। আমরা জানি না আমরা কোথায় আছি।"
একসময় আর শুনতে পাওয়া গেল না। কন্ট্রোল টাওয়ারের সবগুলো রেডিও দিয়ে বিমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় অসংখ্যবার। কিন্তু লাভ হল না।
বিকেল ৪.২৫ তখন।
সাথে সাথে কোস্টগার্ড আর নেভির একঝাঁক জাহাজ বেরিয়ে পড়ল বিমানগুলোকে খুঁজতে।
ফোরট লয়ারডেল স্টেশনের দেড়শো মাইল উত্তরে আরেকটা বেইজ আছে। ব্যানানা রিভার এয়ার স্টেশন। বিকেল পাঁচটা পাঁচ মিনিটে ওদের রেডিওতে একটা মেসেজ পাওয়া গেল। মাত্র দুটি সংকেত।
FT ।
মাত্র দুইবার । সেটা ছিল ফ্লাইট 19 এর সঙ্কেত। অর্থাৎ পাঁচটা বিমানের কোনও একটা থেকে কেউ একজন পাঠিয়েছে।
সেটাই ছিল শেষ সঙ্কেত ।
ব্যানানা রিভার এয়ার বেইজের কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট হ্যারি এই সঙ্কেত পাওয়া মাত্র বারো জন দক্ষ বৈমানিকসহ মার্টিন মেরিনার PBM নামের উদ্ধারকারী বিমান নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন।
মার্কিন মেরিনার PBM অতীতে বহু বিমান দুর্ঘটনা উদ্ধারকাজে চমৎকার কৃতিত্ব দেখিয়েছে ।
অনেক খানিকটা জায়গা জুড়ে অনুসন্ধান চালাল ওরা। ফ্লাইট 19 যেখান থেকে শেষ মেসেজ পাঠিয়েছিল সেই জায়গাটা শনাক্ত করার চেষ্টা করল সবাই। কাছাকাছি যতগুলো বেইজ আছে সবগুলো বেইজে নিজেদের রিপোর্ট দিতে লাগল মার্টিন মেরিনার PBM ।
এবং আচমকা … হঠাৎ করেই রিপোর্ট পাঠানো বন্ধ করে দিল মারটিন মেরিনার PBM। পাগল হওয়ার দশা হল সবগুলো বেইজের কন্ট্রোল রুম অফিসারদের। সবারই চেষ্টা করতে থাকল মেরিনার এর সাথে যোগাযোগ করার জন্য।
কোনো লাভ হলো না। আর কোনও মেসেজ পাঠালো না মেরিনার। বেইজেও ফিরে এল না কোনও দিন।
পাঁচটা বিমান তো হারালোই। ওগুলোকে খুঁজতে গিয়ে উদ্ধারকারী বিমানটাও হারিয়ে গেল । আশপাশের হাজার মাইল জায়গায় গরু খোঁজার মতো খোঁজা হল ।
বিমান বা বিমানের কোনও ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেল না।
অ্যামেরিকান ন্যাভাল বোর্ড অফ অ্যানকোয়ারি তদন্ত শুরু করল।
টানা ছয় মাস অনুসন্ধান করলেন তাঁরা।
যদি অ্যাভেঞ্জার বিমানগুলো জ্বালানি ফুরিয়ে যেত, তবে সমুদ্রে পড়ে যেত বিমানগুলো। কিন্তু পাইলট যারা ছিল , কেউ না কেউ বেঁচে যেত। কারণ বিমানে রাবারের নৌকা ছিল।
কিন্তু জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে এটা অসম্ভব। বেইজ থেকে ওড়ার আগে সবার ফুয়েল চেক করা হয়েছিল। তেল ভর্তি।
আর উদ্ধারকারী মেরিনার এর জ্বালানি শেষ হবার প্রশ্নই আসে না। একটানা চব্বিশ ঘণ্টা উঠতে পারে এমন ফুয়েল নিয়ে আকাশে উড়েছিল মেরিনার ।
প্রশ্ন আরও আছে।
পাঁচটা বিমানের কম্পাস একইসাথে নষ্ট হল কী করে ? সবার রেডিও একই সাথে বিকল হল কেন?
কেন চার্লস টেলর বলেছেন, সাগর একদম অচেনা মনে হচ্ছে । সূর্য দেখা যাচ্ছিল না কেন ?
একদম পরিষ্কার আকাশ। ঝড় বৃষ্টির কোনও চিহ্ন ছিল না । একমুঠো মেঘ ছিল না আকাশে। তারপরও সূর্য দেখতে পায়নি কেন?
তাঁদের শেষ মেসেজ ছিল- আমরা পুরোপুরি হারিয়ে গেছি ।
আমেরিকার নাভাল বোর্ড অফ ইনক্যুয়ারি তদন্ত শেষে সাতশ পাতার রিপোর্ট জমা দিল ।
সিদ্ধান্ত নেওয়া হল৷ হ্যাঁ, এটি তাদের জানা মতে, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আকাশ রহস্য। গ্রেটেস্ট অ্যাভিয়েশন মিস্ট্রি অফ অল টাইম। ফাইলে বড় করে লেখা হল - অ্যানসলভড । অমীমাংসিত।
গাল গল্পের শাখাপ্রশাখা ছড়াতে লাগল তখন থেকেই। কারণ বিমানগুলো যে জায়গাতে হারিয়ে গেছে সেই জায়গাটা বেশ বদনাম আছে। জায়গাটার নাম - বারমুডা ট্রায়াঙ্গল ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন