মাত্র ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়েছি। ইশকুল অনেক দূরে। মাইল খানেক পথ হেঁটে যেতে হয়। একটা বড় মাঠ পযন্ত রাস্তা মা এগিয়ে দিয়ে আসে।
মাঠের পাশেই বড় রাস্তা কালো অজগরের মত। ওখান দিয়ে গো গো করে দৌড়ে যায় মাল বোঝাই বড় বড় ট্রাক আর মানুষ ভর্তি বাস। ওখানে পৌছে মাকে হারিয়ে ফেলি। একবার শুধু পিছন ফিরে দেখি।
মা দাঁড়িয়ে আছে।আমি ফিরে তাকালে হাত নাড়ত। মুখে হাসি। আমিও হাত নাড়তাম।
তারপরই অচেনা দুনিয়া।
অনেক খানি পথ একা হেঁটে যেতাম। দুই পাশে বড় বড় বাবলা গাছ। হলুদ ফুলে ভর্তি। বড় বড় সবুজ ঘাস আছে কিছু। আনারসের পাতার মত ধার ।
ইস্কুলে যাবার সময় বেশ তাড়া থাকতো। খিঁচে হাঁটতাম। ছুটির পর ফেরার সময় শামুকের মত হেঁটে বাড়ি ফিরতাম। কত কিছু দেখার আছে পথের দুই ধারে। গাছ পালা আর ঝোপঝাড়ের একটা তালিকা বানাতাম মনে মনে। পাখীগুলো ও মন দিয়ে দেখতাম। নতুন একটা প্রজাপতি পেলাম একদিন। সাদা রঙের। উপরে কালো গোল দাগ। বল প্রিন্টের কাপড়ের মত।
ফনিমনসা আর রাংচিতার ঝোপ ও আছে বেশ।
সবচেয়ে প্রিয় ছিল পিচ্চি একটা ডোবা। অমন সুন্দর ডোবা আগে দেখিনি। একদম ছোট।
পাশা পাশি বড় দুটো বিছানা রাখলে যতটা বড় হয় তেমন সাইজের এই ডোবাটা।আমি নাম দিলাম, ঘাস পুকুর।
ঘাস পুকুর নাম দেয়ার যথেষ্ট কারন আছে। লম্বা, নরম আর টিয়া পাখীর পালকের মত সবুজ ঘাস ডোবার চারিদিক ভর্তি।
দেখলে চোখের আরাম হয়। মনটা ভাল হয়ে যায়। মিষ্টি একটা ঘ্রান আছে ঘাস গুলোতে। এমন ঘাস দিয়েই হয়তো শরবত বানায় হাঙর দ্বীপের লোকজন।
আমি ঠিক জানি না।
আর ডোবার জল কিন্তু একদম পরিষ্কার। তলায় কিছু পাথর পড়ে আছে। আগে হয়তো চকমকি পাথরের মত ছিল । এখন পান্নার মত সবুজ হয়ে গেছে। এই ঘাস পুকুরে কি এক মাছ ছিল। কাঁচের মত স্বচ্ছ। আজও ওদের নাম জানি না। আর ঘাস পুকুর ছিল ব্যাঙদের একটা কলোনি।
নুড়ি পাথরের সাইজের ব্যাঙ ছিল এক গাদা। ওদের ডিম ভাসতো ভেজা ইসবগুলের ভুষির মত।
ইশকুল ছুটির পর ফেরার পথে বেশ খানিক সময় দাঁড়িয়ে ঘাস পুকুর দেখে বাড়ি ফিরতাম।
একদিন ইশকুল থেকে ফিরছিলাম। দেখি ঘাস পুকুরের সামনে কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড়। ওরা ইস্কুলে যায় না।
এই পাড়ার ছেলে। বেশ ফচকে ধরনের। লুঙ্গি পড়ে খালি গায়ে রাস্তায় হাটে ওরা।
সবাই মিলে ওরা ঢিল মারছে ঘাস পুকুরে।আর হাসছে। একজন আরেক জনকে উৎসাহ দিচ্ছে- মার হালাগো।
বর্ষা মাত্র শেষ হয়েছে। ঘাস পুকুর ভর্তি এক গাদা ব্যাঙ। ওরা খুশি।
পুকুরে জল বেড়েছে। মানে ওদের বাসা বড় হয়েছে। খুশি হবে না ? সেই খুশিতে ব্যাঙেরা আনন্দে চিৎকার করে একে অপরকে ডাকছিল বা কথা বলছিল। আর সেই ফচকে ছোঁড়াগুলো পথের পাশ থেকে পাথর আর ইটের টুকরো কুড়িয়ে ব্যাঙদের ঢিল মারছিল।
ঢিল খেয়ে ব্যাঙদের অবস্থা বেশ খারাপ। বেশির ভাগই ওদের মাথা বা ঠ্যাং থেঁতলে গেছে। মরে গেছে কতগুলো। বাকিগুলো পালানোর জন্য দিশা খুঁজে পাচ্ছে না।বেচারা বুঝতেও পারছে না ছেলেগুলো ওদের মারছে কেন ?
হয়তো দয়া ভিক্ষা করছে, কিন্তু ওদের ভাষা তো আমরা বুঝি না।থেঁতলে যাওয়া শরীর নিয়ে ওরা পালাতে চাইছে। আর ফচকে ছেলেগুলো ওদের অবস্থা দেখে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে হাসতে মরে যায় আরকি।
বুকটা হাহাকার করে উঠলো।
পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললাম- আপনারা ওদের মারছেন কেন ?
কা গো ? জানতে চাইলো একটা ছেলে। চোখ ট্যাঁসরা করে চেয়ে আছে আমার দিকে।মুখের ভাব ভঙ্গি ঢাকাই সিনেমার ভিলেনদের মত।
ব্যাঙগুলোকে মারছেন কেন ? গলা উচিয়ে বললাম।
হায় হায় , ঐ দ্যাখ দ্যাখ ব্যাঙ কুমার আইছেরে। টিটকারি মেরে বসলো ছেলেটা।
তারপর ধাওয়া করলো আমাকে।
পাই করে ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড় দিলাম।
পিছনে হল্লা করে ধাওয়া শুরু করলো দলটা। যারা এতক্ষণ ঘাস পুকুরের ব্যাঙ মারছিল মজা করে।
পিঁছনে একবার তাকাতেই পিলে চমকে গেল। হায় হায়, বিরাট দল।ধরতে পারলে মেরেই ফেলবে। হাতে ওদের ইটের টুকরো।
বাউলি কেটে দৌড়াচ্ছি। হাতে অ্যালুমিনিয়ামের সুটকেস। ওটায় করে বই নিয়ে যাই। তখন সুন্দর সুন্দর পিঠ ব্যাগ চালু হয়নি।ভারি অ্যালুমিনিয়ামের সুটকেসটা নিয়ে দৌড়াতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।তার উপর ঠিক দুপুর বেলা। আকাশের ব্যালকনি ধরে সূর্য একদম মাথার উপর ঝুলে আছে। হাঁপাতে হাঁপাতে দৌডাচ্ছি । ঘামে জামা ভিজে গেছে।গলা শুকিয়ে শিরিষ কাগজ।
সে যাত্রা বেঁচে গেলাম।
একটা নিদিষ্ট দূর পযন্ত তাড়া করলো ফচকে ছোঁড়া গুলো। তারপর পিছিয়ে গেল। সম্ভবত ওদের পাড়া শেষ।
আমি ঘামে ভিজে একশা হয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি ফেরার পথে পাড়ার সামনের নল কূপ থেকে জল দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে একটু ফ্রেস হয়ে নিলাম।
মাকে বললাম- একটু খেলা ধূলা করেছিলাম।
ভেবেছিলাম ঘটনা এখানেই শেষ। কিন্তু পরদিন ইশকুল ছুটি হতেই ভুল ভাঙল।
সেই ফচকে ছোঁড়াগুলো দাঁড়িয়ে আছে।
আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমাকে দেখেই হৈ হৈ করে ধাওয়া করলো। দারুন মজা পাচ্ছে ওরা। বুঝতে পারলাম, নতুন একটা খেলা পেয়ে গেছে শয়তানগুলো ।
আমার জন্য এক দুঃস্বপ্ন শুরু হল।
ইশকুল যাওয়া বন্ধ করতে পারি না। বড় কেউ নেই যে আমাকে ঐ পথটুকু পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবে। বন্ধু নেই। অন্য পথ দিয়ে বাসায় ফিরব সেই উপায় নেই।
চারদিন একই ঘটনা হল।
আমার মনে হয় সারা জীবন এই ঘটনা ঘটেই যাবে। ইস্কুলের ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠলেই আমি জুতার ফিতে শক্ত করে বেঁধে তৈরি হয়ে যাই। আর চালাকি করে খুব কম বই নিয়ে যাই ইস্কুলে। তখন অবশ্য আজকাল কার দিনের মত বাচ্চারা পনের কেজি বই নিয়ে ইস্কুলে যেত না।
প্রতিদিন ঘামে ভিজে ধাওয়া খেয়ে ফিরি।
ওদের সাহস দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। ধাওয়া করার সময় ঢিল ছুড়ে মারে।ইয়া বড় বড় ঢিল। আমি বাউলি কেটে দৌড়াই। তাই আজ তক ও গায়ে লাগেনি। একটা যদি মাথায় লাগে আমি শেষ।
মাঝে একদিন বৃষ্টি ছিল। ইস্কুলে যাইনি, বেঁচে গেলাম দৌড় থেকে।
পরের দিন ঘটে গেল সাংঘাতিক ঘটনাটা।
ঘাস পুকুরের কাছা কাছি আসতেই দলটা আক্রমণ চালাল। হা হা করে হাসছে। ঝেড়ে দৌড় দিলাম। খানিক দৌড়ে বুঝে গেলাম নিখুঁত ফাঁদ পেতেছে ওরা। চারিদিক থেকে ঘিরে আনছে আমাকে। পর পর কয়েক দিনের ধাওয়া থেকে ওরা বুঝে গেছে কি করতে হবে। আমি পাগলের মত দৌড়াচ্ছি। আবিষ্কার করলাম - ভুল পথে অচেনা রাস্তায় চলে এসেছি।
আর ফাজিলগুলো ঘিরে ফেলেছে আমাকে। কতগুলো ইট পাঁজা করে রাখা। দালানের কাজ ধরেছে কেউ ।
ওখানে আসতেই দম ফুরিয়ে গেল আমার। ধরা পড়ে গেছি। ওরা বৃত্ত ছোট করে আনছে।
আমার কাণ্ড দেখে ওরা হেসেই খুন। সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দলের সর্দার। ওর হলুদ দাঁত দেখতে পাচ্ছি।
কি চান্দু ? কেমুন আছ ? জানতে চাইল হলুদ দাঁত ওরফে সর্দার।
ফোঁপাতে ফোঁপাতে নিচু হয়ে ভাঙ্গা ইটের একটা টুকরো তুলে নিলাম।
ছুড়ে মারলাম শরীরের সব শক্তি দিয়ে।
ঠাস করে গিয়ে লাগল হলুদ দাঁত ওরফে সর্দারের কপালে।
গেছিরে গেছি। কপাল ধরে চিৎকার করে উঠল সর্দার। বাকি সবাই বেশ থতমত খেয়ে গেল।
সাহস পেয়ে নিচু হয়ে আরেকটা বড় ইটের টুকরো তুলে নিলাম। এই বার দলের সবাই ঝেড়ে দৌড় দিল। সর্দার ও কপাল চেপে দৌড় দিচ্ছে। হালকা রক্ত দেখলাম ওর কপালে।
উল্টো দিকে মুখ করে আমিও দৌড়।
বাড়ি ফিরে শান্তি পাচ্ছি না। একজনের মাথা ফাটিয়ে এসেছি। এখন ?
পুলিশ আসবে তো।
সারা দিন আতঙ্কের মধ্যে রইলাম। অমন ঘটনা হলে পুলিশ তো আসবেই। বাসন্তী পিসির বাবার মুখে শুনেছি স্কটল্যান্ডে শারলক হোমস নামে এক গোয়েন্দা আছে নাকি। ভদ্রলোক বেকার স্ট্রীটর থাকেন। সেই ভদ্রলোক যদি আমার খোঁজ পেয়ে যান ?
স্কটল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে আসা কি অমন কোন কঠিন কাজ ? বিশ, একুশ টাকা লাগবে জাহাজে করে চলে আসতে।
পরদিন ইশকুল ছুটি। কিন্তু দুপুর বেলা বাইরে যখন খেলছিলাম খাকি পোশাক পড়া এক পুলিশ এসে হাজির হল। পুলিশটাকে দেখে পিলে চমকে গেল আমার।
দৌড়ে ভাগব ভাবছি তখন পুলিশটা মিহি হেসে বলল- খোকা অলি সাহেবের বাসা কোনটা চেন ? উনার নামে চিঠি এসেছে।
ভাল করে চেয়ে দেখি লোকটা আসলে পুলিশ না। পোস্টম্যান। পিয়ন।
কেন যে পুলিশ আর পিয়নের একই রঙের পোশাক দেয় সরকারই জানেন।
রাতে কোন দুঃস্বপ্ন দেখলাম না।
পরদিন ইশকুল। ছুটি হতেই তৈরি হলাম। জুতার ফিতে শক্ত করে বেশে নিলাম। বড় বড় কয়েকটা নুড়ি পাথর হাফ প্যান্টের পকেটে ভরে নিলাম। তারপর হাঁটতে শুরু করলাম। ঘাস পুকুরের সামনে আসতেই হাঁটার গতি স্লো হয়ে গেল।
একগাদা ছেলে দেখলাম। আমার জন্যই অপেক্ষা করছে। দলের সর্দারের মাথায় সাদা কাপড়ের অদ্ভুত এক ব্যান্ডেজ। মনে হয় মাথায় ঘোমটা দেয়া।আমাকে দেখেই চিৎকার করে উঠলো সর্দার।
তারপর সবাই ঝেড়ে উল্টো দিকে দৌড় দিল পাগলের মত।
ব্যাপারটা ঠিক কি সেটা ভাল মত বুঝতে পারলাম না। তবে ভয় চলে গেল।
ধীর পায়ে হেঁটে ঘাস পুকুরের পাশে দাঁড়ালাম। মনে হল অনেক দিন পর দেখলাম আমার প্রিয় জায়গাটা। ব্যাঙ আর গুগলি শামুক দেখে মনে হল পুরানো বন্ধুদের ফিরে পেয়েছি।
ফিরে এলাম বাড়ি। আর কখনও কোন সমস্যা হয়নি। ফচকে ছেলেদের দেখতাম। অনেক দূর থেকে আমাকে দেখলেই কর্পূরের মত গায়েব হয়ে যেত।
আমি ফিরে পেলাম আমার ঘাস পুকুর। কেউ ঢিল মেরে ব্যাঙ মারত না।
আরও একটা ভীষণ দরকারি জিনিস শিখলাম। শিক্ষাটা সারা জীবন কাজে লেগেছে আমার।
সমস্যা বা শত্রু যত বড় বা বেশি হউক না কেন পালিয়ে না বেড়িয়ে ওদের মুখোমুখি হতে হয়। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা বা শত্রুকে আক্রমণ করতে হয় আগে । তাহলে বাকি পিচ্চি সমস্যা দৌড়ে ভেগে যাবে।
তো এই হচ্ছে আমার ঘাস পুকুরের গল্প। তোমাদের যদি কেউ বলে, মিলন আঙ্কেল বদরাগী আর মারকুটে মানুষ তখন বুঝবে লোকটা মিথ্যে কথা বলছে।
কারন মিলন আঙ্কেল অল অয়েজ ফাইট ফর হিজ রাইট।
তো, আমার গল্প ফুরলো , তরমুজ গাছটি মুড়ল ।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন