সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বোতাম গাছ

 একদম পরিষ্কার দেখতে পাই।

যদিও অনেকগুলো বছর আগের ঘটনা।

গরমের অলস দুপুরে সুই সুতো নিয়ে মা বসে সেলাই করছে।সুই সুতার আলাদা বাক্স আছে। রোল করা হরেক পদের সুতা। নানান সাইজের সুই। একটার নাম আবার সোনামুখী সুই।

কাঁচেরস্বচ্ছ  একটা বয়ামে আছে মুঠো মুঠো বোতাম। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কমলা ,বেগুনি, সাদা, কালো , ফিরোজা। নানান রঙের । নানান সাইজের।

মা বোতাম জমাত। মানুষের কত বিচিত্র শখ ছিল। আমার মায়ের বোতাম সংগ্রহের বাতিক ছিল।

 ব্যাপারটা  বেশ মজা লাগতো আমার কাছে।

 কত বিচিত্র ধরনের বোতাম ছিল আমাদের বাসায়। কাঁচের, প্ল্যাস্টিকের,পেতলের, কাঠের, ঝিনুকের, এমনকি গরুর শিঙের ও ছিল। লুডু খেলতে গিয়ে গুঁটি হারিয়ে ফেললে একই রঙের চার বোতাম দিয়ে গুঁটি বানিয়ে গুঁটিবাজি শুরু করতাম।খেলতে গিয়ে জামার বোতাম ছিঁড়ে ফেললে অমন রঙ মিলিয়ে আরেকটা বোতাম জামায় লাগিয়ে দিত মা।

ভেবে পেতাম না ,কে কবে বোতাম ব্যবহার শুরু করেছিল কে জানে ?

 কেউ জানে না।

তবে সবচেয়ে পুরানো বোতাম পাওয়া গেছে মহেঞ্জোদারো- তে। মহেনজো দারো হচ্ছে খুব পুরানো এক সভ্যতা।সিন্ধু সভ্যতা বলে অনেকে।  যীশুর জন্মের বহু বছর আগে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। পরে রহস্যময় ভাবে হারিয়ে গেছে। কেউ জানে না ঐ লোকদের কি হয়েছিল , বা কোথায় গেছে ওরা ।

মহেঞ্জদারো জায়গাটা বর্তমানে পাকিস্তানে। ওখানে যে বোতামটা পাওয়া গেছে সেটার বয়স পাঁচ হাজার বছর।

শঙ্খ কেটে বানানো হয়েছিল ওটা।

 বোতামকে ইংরেজিতে বলে বাটন, সেটা আবার ফরাসি ভাষা থেকে এসেছে। শব্দটার মানে- কুঁড়ি বা শক্ত গাঁট।

দীর্ঘ একটা সময় পযন্ত বোতাম গয়না হিসাবে ব্যবহার করতো মানুষ। মানে জামা কাপড়ে বোতাম সেলাই করা হত। কিন্তু বোতাম লাগানোর কোন ঘর থাকতো না। কি কাণ্ড !

রাজা ফ্রান্সিস বোতাম পছন্দ করতেন। তিনি তার জামাতে ১৩৬০০ সোনার বোতাম লাগিয়েছিলেন।

বিশ্বাস করবে না,  রেড ইনডিয়ানরা বোতামকে টাকা হিসাবে ব্যবহার করতো। ১৭৫০ সালে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়াতে প্রথম বোতাম বানানোর কারখানা  চালু করে। ধনী লোকজন হাতির দাঁত দিয়ে বানানো বোতাম ব্যবহার করতো। কিন্তু উনিশ শতকের দিকে হাতির দাঁতের দাম বেড়ে যায়। তখন দক্ষিণ আমেরিকায় বিশেষ এক ধরনের বাদাম দিয়ে বোতাম বানাতে শুরু করে।ওটাকে সবাই ভেজিটেবল আইভরি বলতো। বোতামগুলো দেখে মনে হত আসলেই হাতির দাঁত দিয়ে বানানো।

হাওয়াই আর ক্যারাবিয়ান দ্বীপগুলোতে নারকেলের খোসা দিয়েও বোতাম বানায়। আজও।

দেখতে কিন্তু বেশ লাগে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের বোতাম বানানো হত। পরে আমেরিকায় বানানো শুরু হয়।

আর ইউরোপের মধ্যে প্যারিসের বানানো বোতাম বেশ বিখ্যাত ছিল। ওরা  প্রথমে  সোনা আর রুপা দিয়ে বোতাম বানালেও পরে কাঠ আর প্ল্যাস্টিক দিয়ে বোতাম বানানো শুরু করে।

বোতাম জমানো একটা মজার শখ। অনেকেই জমায়। সেইজন্য  ১৯৩৮ সালে ন্যাশনাল বাটন সোসাইটি নামে এক সংগঠন তৈরি করা হয়। এই বোতাম সংগঠনের বহু সদস্য আছে। বছরে একবার এক সাথে মিলিত হয়ে সবাই সবার বোতাম প্রদশনির ব্যবস্থা করে। বোতাম বদলা বদলি ও করে। এরা বছরে চারটা পত্রিকাও বের করে। বেশ জমজমাট ব্যাপার।  মনে রাখবে, প্রতি বছর নভেম্বর মাসের ১৬ তারিখ হচ্ছে আন্তজাতিক বোতাম দিবস।

তবে সবাই যে বোতাম পছন্দ করে অমন না কিন্তু। অনেকেই কোন এক অদ্ভুত বিচিত্র কারনে বোতাম ভয় পায়। এই রোগটার নাম-কোউমপোউনোফোবিয়া (koumpounophobia) সহজ কথায় বাটন ফোবিয়া বলা যায়।

এই রোগের লক্ষণ অদ্ভুত। এরা বোতাম বিহীন জামা কাপড় কিনতে এবং পতে পছন্দ করে।

বোতাম দেখলে এরা মনে করে, গোল একটা মুখ । আর বোতামের দুই ছিদ্র দেখলে মনে করে দুটো চোখ কট মট করে চেয়ে আছে।

বড় বড় বোতামওয়ালা কোট পরে এদের সামনে কেউ বসলেও এরা নার্ভাস হয়ে যায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে কোউমপোউনোফোবিয়া রোগীদের রোগটা হয় খুব ছোট বেলায়। বোতাম নিয়ে এদের কোন অপ্রিয় স্মৃতি আছে যা তারা ভুলে গেছে কিন্তু মগজ মনে রেখেছে।

সেটাই বড় হয় অসুখে পরিণত হয়েছে।

এরা বোতাম ভয় পায়। কাঁচের বয়াম ভর্তি বোতাম দেখলে ভয় পায়। বাথরুমে একটা বোতাম পড়ে থাকতে দেখলেও ভয় পায়। বোতাম ধরে ফেললেও তারাতারি হাত ধুয়ে ফেলে।অদ্ভুত রোগ তাই না ?

ভাল কথা আমাদের দেশে ছোট্ট বেগুনি রঙের একটা ফুল পাওয়া যায়। বোতাম ফুল বলে সবাই। রঙটা ঠিক পাকা জামের ভেতরের অংশের মত। চিনেছ ? ইউরোপে এই ফুলকে ব্যাচেলার বাটন বলে। কারন কি জানো ?

ফচকে ধরনের ছেলেরা এই ধরনের ফুল জামায় আঁটকে রেখে বোঝাত ওরা মেয়ে   বান্ধবী  খুঁজছে।

একটা মজার জিনিস বলে গল্প শেষ করি। কাউকে বলবে না কিন্তু , ঠিক আছে ?

একদম পিচ্চি বেলায় আমি কতগুলো বোতাম বাগানে বুনেছিলাম ভেবেছিলাম ওগুলো থেকে বোতাম গাছ হবে।গাছ ভর্তি  রঙ বেরঙের হাজার হাজার বোতাম ধরে থাকবে ।  বোতামের কোন অভাব থাকবে না।  নিয়মিত জল দিতাম । আগাছা পরিষ্কার করে দিতাম। অপেক্ষা করতে করতে হতাশ হয়ে খেয়াল করলাম , কোন চারা গাছ জন্মাচ্ছে না।

বোতামের গাছ হয় না অনেক পরে জেনেছিলাম।

তাতে কি  ?

 আজও ঘুমের মধ্যে বা  কল্পনায়  একটা গাছ দেখি । বাঁটুল ধরনের ঝাঁকড়া গাছ।

 শরৎ আর  হেমন্তের মাঝাঁমাঝি একটা মৌসুম এলে  চেরি ফলের মত  হাজার হাজার বোতাম দিয়ে  ঐ  গাছ ভর্তি হয়ে যায়। পান্নার মত সবুজ,কয়লার মত কালো, ঘাস ফড়িঙের মত নীল, পাকা টম্যাটোর মত লাল, হাতির দাঁতের মত সাদা, গাজরের মত কমলা, আর দুপুরের রোদের মত হলুদ বিচিত্র সব বোতাম।

  আমি  দেখি।

সেই বোতাম দিয়ে কাচের পেল্লাই একটা বয়াম ভর্তি করে নিয়ে ছুটে যাই মায়ের কাছে।  


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...