সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সব পাখিদের পৃথিবী

 


অনেক অনেক আগের কথা।

বেশ দূরে ছোট মত একটা দেশ ছিল। দেশটার নাম ধরো নেই দেশ।

যদিও সব কিছুই ছিল সেই দেশে তারপরও নাম অমন। সেই দেশে  কচি লেবু পাতার রঙের  এক  গ্রাম ছিল। সেইখানে    তোমাদের বয়েসি ছোট্ট একটা মেয়ে ছিল। নাম কুমকুম।

 

  ও  ইস্কুলে  যায়।   রান্না বান্নায় মা-কে সাহায়্য করে। বৃষ্টি হলে  কাগজ দিয়ে নৌকা বানিয়ে  বারান্দার জলে ছেড়ে দেয়। নদীর পার থেকে  সোনালী মাটি এনে পুতুল বানায়। তালপাতা দিয়ে দারুন কায়দা করে সেপাই বানায়।

ও ফুল ভালবাসে। জোনাকি ভালবাসে। প্রজাপতি ভালবাসে। সব চেয়ে প্রিয় হচ্ছে পাখি।

 কাঠ দিয়ে সুন্দর করে একটা পাখির বাসা বানিয়েছে কুমকুমের বাবা। ওখানে মটর দানা আর  মাটির পাত্র ভর্তি করে জল রেখে দেয় কুমকুম। ভর দুপুর বেলা পাখিরা লাঞ্চের লোভে চলে আসে। হারকে মারকে খায় দানা। জল খেয়ে স্নান করে নেয় মাটির  বাউলে।

আর ওদের গ্রামে অনেক অনেক পাখি।  অভাব নেই। নীল রঙের মখমলের কাপড়ের মত আছে  বটেরা  পাখি। লাল মাথাওয়ালা বাতাবি কাঠকুড়ালি। সবুজ হলুদ মেশানো উলের বলের মত কাঠঠোকরা।

এক শীতে  শহর থেকে  এক মোটা মত লোক এসে হাজির হল। সাথে বন্দুক। ঠুস থাস গুলি করে রোজই পাখি মেরে ফেলে। সন্ধ্যায় বাগানে বসে বন্ধুদের সাথে সেই পাখী কয়লার আগুনে ঝলসে খায়।  খ্যাক খ্যাক করে হাসে।

 ওদিকে  গ্রামের এক ধনী লোক   কাউনের চাষ করলো। কাউন পেকে  মৌ মৌ করছিল ফসলবিলাসী হাওয়ায়।  লোভে কয়েকটা পাখী এসে টুক করে খেয়ে ফেলল ফুলের রেনুর মত কাউন। ধনী লোকটার কি রাগ ! ভুট্টার সোনালী দানার মধ্যে বিষ মাখিয়ে ফেলে রাখল নানান জায়গায়। প্রদিন সেই বিষ খেয়ে সারা গ্রামের সব পাখী মরে গেল।

সেইদিন থেকে আর কোন পাখী ডাকে না গ্রামের পথে। হিজলের বনে। গগন  শিরিষের ডালে।

খুব কাঁদল কুমকুম। ভাত খেল না তিনদিন। শেষে মরা কয়েকটা পাখী  ঝুড়িতে     নিয়ে হাঁটতে লাগল। সাথে মোটা কাগজে লিখে নিল- পাখী হত্যার বিচার চাই।

রাজার কাছে যাবে সে।  রাজা নিশ্চয়ই শাস্তি দেবে খারাপ লোকটাকে। যারা বিষ দিয়ে পাখী মারে  তারা খারাপ লোক।

  রাজার বাড়ি অনেক অনেক দূরের পথ।

হাঁটতে লাগল কুমকুম। মাথার উপর শিমফুলের মত  নীল আকাশ। কদমফুলের মত সূর্য। জলপাই তেলের মত রোদ। পথের দুই ধানে বুনো লতা। হাঁটতে গেলেই পা জড়িয়ে ধরে। পথের মাঝে চুলের ফিতার মত নদী। আলতার মত লাল মাটি। সাই সাই বাতাসে পাখিদের কান্না।

হেঁটে হেঁটে রাজপ্রাসাদের সামনে চলে গেল কুমকুম।

ইয়া বড় প্রাসাদ। সিংহ দরজার সামনে দুইজন প্রহরী দাড়িয়ে বাইরে। ফ্রকের মত জামা পরনের। হাতে বর্শা আর চিতই পিঠা বানানোর কড়াইয়ের মত ঢাল। মাথায় টিনের বিদঘুঁটে  টুপি। পেল্লাই গোঁফ। দুইজনের মুখেই জ্রুল। চোখ পাকা করমচার মত লাল।

কি চাই ?’ জানতে চাইল এক প্রহরী।

রাজার সাথে দেখা করব ?’ বলল কুমকুম।

উনি মরা পাখী কিনবেন না।সাফ সাফ জানিয়ে দিল এক প্রহরী।

আমি পাখী বিক্রি করতে আসিনি। লেখাই তো আছে কাগজে পাখী হত্যার বিচার চাই ।অবাক হয়ে বলল কুমকুম।

আমরা  লেখাপড়া জানি  না।মিহি হেসে বলল এক প্রহরী।  মন্ত্রীকে দশটা সোনার মোহর দিয়ে চাকরি নিয়েছি।

রাজার সাথে দেখা করা যাবে ? অনুরোধ করলো কুমকুম।  

উনি খেতে বসেছেন।

ব্লুন আমি অনেক দূর থেকে এসেছি।

রাজার সাথে দেখা করতে সবাই দূর থেকেই আসে। আচ্ছা আমি খবর পাঠাচ্ছি।

দরজার পাশেই  গুড়াদুধের কৌটা দিয়ে বানানো একটা টেলিফোন ছিল সেটা তুলে এক প্রহরী কাকে কি যেন বলল। মিনিট খানেক পর বাঁটুল ধরনের এক লোক হাজির হল।   প্রায়  বয়ামের সাইজ।

চলুন। মহারাজ আপনার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন।বলল বয়াম।

দুইজনে রাজপ্রাসাদের ভেতরে ঢুকে গেল। ধাউস সব কামরা। হরেক জিনিসে ভর্তি। অমন জিনিস আগে দেখেনি কুমকুম। এই ঘর সেই ঘর। পার হয়ে খাবারের ঘরে গেল।

বিশাল লম্বা এক টেবিল। কমপক্ষে ত্রিশজন লোক বসে  খেতে পারবে। কিন্তু রাজা একাই খাচ্ছেন। দশজন লোক দাড়িয়ে আছে পরিবেশনের জন্য। টেবিল ভর্তি খাবার। কমপক্ষে দুইশ পদের।

রাজার মাথা ভর্তি চুল। মুখ ভর্তি দাঁড়ি। সবই তুলার মত সাদা। গায়ে হিরে জহরতের কাজ করা জামা।

তুমি নাকি কিসের হত্যাকাণ্ডের বিচার চাও ?’ মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে আউ আউ করে বললেন  রাজা।

সব  বলল কুমকুম।

 পাখী।অবাক হয়ে বললেন রাজা । সেটা কি করে সম্ভব  !  আমি নিজেই তো পাখীর মাংস রোজ  খাই। এই যে আজ খাচ্ছি  কবুতরের স্যুপ। ঘি দিয়ে  চড়ুই ভাঁজা। টিকি হাঁসের রোস্ট। প্রচুর জায়ফল আর এলাচি দিয়ে চিত্রা বনমুরগির কাবার। রেসিপিটা তোমাকে বলছি । সারারাত চিত্রা বনমুরগিটাকে টক দইয়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে। সকাল বেলা পাঁচ সের রসুন...

আপনি পাখী হত্যার বিচার করবেন না ? অভিমান করে বলল কুমকুম।

নাহ। ওরা বিদেশি পাখী  হলে বিচার করতাম। বা নোটিশ দিতাম । কিন্তু দেশিপাখী ..নাহ একদম আগ্রহ  নেই  আমার।

সবার  প্রাণ রক্ষা করা রাজার কর্তব্য।

দেখ  তুমি বড্ড বেশি কথা বল।  আমার জল্লাদ যদি আজ সিনেমা দেখার জন্য ছুটি না নিত তবে তোমাকে ফাঁসিতে চড়াতাম। ভাল দড়ি ও নেই। তুমি চলে যাও। এই বছর আমরা শুধু কুমির নিয়ে ভাবছি। পাশের দেশের সব কুমির আমাদের  রাজ্যে আনব। সবাই খুশি হবে। তুমি চলে যাও। চাইলে পাখীর মাংসের বড়া খেতে পার।

কিছু না বলে কুমকুম বাইরে চলে এলো।

বাড়ির পথ ধরল।

কিচির মিচির শব্দ শুনে মুখ তুলে দেখল আকাশে এক ঝাঁক পাখী উড়ে যাচ্ছে।

আমরা দূর দেশে চলে  যাচ্ছি। যেখানে অনেক অনেক বন আছে। আমাদের কেউ মারে না। বন কেটে কেউ কারখানা বানায় না।  বলল একটা পাখী। তোমার কথা মনে রাখব আমরা। মন চাইলে চলে এসো।

আমি আসব। বড় হলেই চলে আসব। বলল কুমকুম।

পাখিরা চলে যায়।

   

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...