ঠিক দুপুর বেলা।
গরমের মধ্য দুপুর ।
কেদারনাথ রিয়েল এস্টেটের সামনে গাড়িটা এসে থামল ।
অফিসের ভেতরে নরম গদিওয়ালা চেয়ারে বসে ছিলেন কেদারনাথ মিত্র।ওখান থেকেই গাড়িটা দেখলেন।
লাল টুকটুকে রঙ। হুড খোলা ক্যাব্রিওলেট।
দেখেই বুঝা যাচ্ছে আগন্তুক বকশি নগরে একদম নতুন। এই ধরা মড়া শহরে এই ধরনের গাড়ি আগে কখনই দেখেননি তিনি। জীবনেও না।
গাড়ির মালিকের চর্বি আছে নিঃসন্দেহে ।
গাড়ি থেকে নামলো লোকটা। নেমেই , সোজা সরল রেখার মত তাকাল আপিসের উপরের সাইনবোর্ডটার দিকে।
'মনে হচ্ছে মালাইওয়ালা খদ্দের ।' উল্টা দিকের ডেস্কে বসে থাকা তরুণী সেক্রেটারি হিমানীর দিকে ফিরে ফিস ফিস করে বললেন কেদারনাথ । ' ভাব দেখাও আমরা খুব ব্যস্ত ।'
মেয়েটা সাথে সাথে সামনে রাখা কম্পিউটরের কি বোর্ডে পাগলের মত আঙুল চালাতে লাগল । খামাখাই ফোনটা কানে ঠেকিয়ে ফেলেছে এর মধ্যেই । চালু মেয়ে।
আগন্তুক আসলেও খদ্দের ।
লোকটার বগলে ভাঁজ করা খবরের কাগজ । শরীরের গড়ন ভারী । প্রায় আচারের বয়ামের মত মোটা। বৈশাখী মেঘের মত ধূসর রঙের পাতলা কাপড়ের কোট গায়ে। বয়স পঞ্চাশের মত । মাথায় কোঁকড়ানো চুল । গরমে মুখটা লালশাকের মত রাঙ্গা হয়ে গেছে । কিন্তু চোখ দুটো মাছের আড়তের বরফের মত ঠাণ্ডা ।
আপিসের ভেতরে ঢুকে লোকটা জানতে চাইল , ' আপনিই কি মিস্টার কেদারনাথ মিত্র ?'
‘ জী স্যার।' খদ্দের নরম করার সবচেয়ে সেরা হাসিটা বিলিয়ে দিলেন কেদারনাথ । ' আসুন স্যার আসুন। বলুন কী ধরনের সেবা দিতে পারি ? '
খবরের কাগজটা বাতাসে দুলিয়ে লোকটা বলল , ' আপনার আপিসের নাম আর বিজ্ঞাপন দেখলাম । রিয়েল এস্টেটের পাতায় ।'
' জী স্যার। প্রত্যেক সপ্তাহেই বিজ্ঞাপন দেই। বড় বড় শহরের ধনী লোকজন আজকাল মফস্বল বা শহরতলীর দিকে বাড়িঘর কিনতে চায়। ঐ যে স্যার শখ । শখের দাম বিয়াল্লিশ টাকা মিলি গ্রাম। বকশি নগর আপনার ভাল লাগবে ...মিস্টার ...। '
' নওশের আব্দুল্লাহ ।' পকেট থেকে সাদা রুমাল বের করে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে অভিযোগ করলো লোকটা , ' সাংঘাতিক গরম ।'
' একটু বেশিই পড়ছে আজ ।' তাড়াতাড়ি বললেন কেদারনাথ । ' চৈত্র মাসে এত গরম কক্ষনো পড়েনা আমাদের বকশি নগরে । সামনেই আনারকলি নদী । সারা বছরই শীতল বাতাস বয় জুড়ায় শরীর , পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির টাইপের আবহাওয়া এখানে । আরে আরে, এখনও দাঁড়িয়ে কেন ? বসুন না স্যার ।'
চেয়ারটা টেনে ধপাস করে বসে পড়লো নওশের আব্দুল্লাহ । দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ' আপনাদের বিজ্ঞাপনের সুন্দর বর্ণনা পড়েই লং ড্রাইভে যাচ্ছিলাম এই পথ দিয়ে। বেশ ছিমছাম জায়গা । আর নিরিবিলি । এমন ধরনের শহর পছন্দ আমার ।‘
'আমাদেরও বেশ ভাল লাগে স্যার।' জবাব দিলেন কেদারনাথ ।
মনটা ভাল হয়ে যাচ্ছে । মনে হয় বড় দাঁও মারতে পারবে আজ । ভগবান দয়া কর ।
' আমার হাতে সময় খুব কম, মিস্টার কেদারনাথ । খেজুরে আলাপ করার জন্য আসিনি আমি। সোজা কাজের কথায় গেলে ভাল হয় ।'
' সেটা তো আমার জন্য আনন্দের খবর স্যার। এখন বলুন নিদিষ্ট কোন জায়গা বা বাড়ি আপনার পছন্দের তালিকায় আছে ?'
' বলতে গেলে কি আছে । শহরের একদম শেষ মাথায় পুরানো দিনের একটা নির্জন টাইপের বাসা আছে না? ওটা পছন্দ আমার ।'
' হলুদ রঙের পুরানো বাড়িটা ? সামনেই বারান্দা আর বড় বড় পিলার আছে যে, ওটার কথা বলছেন ?' জানতে চাইলেন কেদারনাথ রায় ।
'হ্যাঁ, ওটাই। আপনাদের বিজ্ঞাপনে দেখলাম বাড়িটা নাকি বিক্রি করা হবে। কিন্ত বাড়ির দাম লেখা নেই । বাড়িটা আছে ? না বিক্রি হয়ে গেছে ?'
মুখ টিপে হাসলেন কেদারনাথ , ' হ্যাঁ, আমাদের বিজ্ঞাপনে ওটা আছে বটে ।' আলগা পাতাওয়ালা ছাপানো একটা ক্যাটালগ বের করলেন ড্রয়ার থেকে। ' কিন্তু বাড়িটার প্রতি আপনার আগ্রহ বেশিক্ষণ থাকবে না । একদম উড়ে যাবে ।'
' অমনটা হবে কেন ?'
ক্যাটালগটা সামনে বাড়িয়ে দিলেন কেদারনাথ , ' নিজেই পড়ে দেখুন ।'
লোকটা তাই করলো ।
ক্যাটালগে সুন্দর করে লেখা –
বিক্রয় হবে
দোতলা। পুরানো দিনের জমিদারি স্টাইলের বাড়ি।
আট কামরা। দুই স্নানঘর । বড় বড় বারান্দা। সামনে বাগান আর বাড়ির পিছনে প্রচুর গাছপালা আছে । দোতলার বারান্দা থেকে আনারকলি নদী দেখা যায় । সেন্ট পিটার ইশকুল আর বাজারের একদম সামনে।
মূল্য ৭৫ লক্ষ টাকা ।
'এখনও কিনতে চান ?' সকৌতুকে প্রশ্ন করলেন কেদারনাথ । মুখে চাপা হাসি। চোখের তারায় কৌতূহল ।
' কিনব না কেন ?' অস্বস্তি নিয়ে নড়ে চড়ে বসলো লোকটা । ' কোন রকম সমস্যা টমস্যা আছে নাকি ?'
' ভাল কথা বলেছেন ।' কপাল চুলকাতে চুলকাতে বললেন কেদারনাথ । ' যদি আমাদের শহরটা আপনার পছন্দ হয়েই থাকে, আর আপনি যদি সত্যি সত্যি এখানেই সেটেল হতে চান, তবে আপনাকে আমি আরও কয়েকটা বাড়ি দেখাতে পারি। একদম খাসা ধরনের । সস্তার মধ্যে ।'
'এক মিনিট ।' খানিকটা রুষ্ট মেজাজে বলল লোকটা । ' এই হলুদ রঙের বাড়িটা আমি কিনতে চাইছি । পছন্দ হয়েছে আমার । কিন্তু আপনি বলছেন, অন্য কিছু । মানে অন্য বাড়ি দেখাবেন । কারণ কি ? বাড়িটা কী আপনারা বিক্রি করতে চান না ?'
'আমি বিক্রি করতে চাই কি না ?' মুখ টিপে আবারও হাসলেন কেদারনাথ । ' জনাব নওশের আব্দুল্লাহ সাহেব, বাড়ি বিক্রি হলেই আমি কমিশন পাই। ওতেই ডাল ভাত আর ডিমের তরকারির যোগাড় হয় আমার। গত পাঁচ বছর ধরে এই বাড়িটা আমার হাতেই আছে কিন্তু বিক্রি করতে পারছি না। '
' একটু ব্যাখ্যা করে আরেকটু সহজ ভাষায় বলবেন ?'
'মানে আপনিই কিনতে চাইবেন না। পিছিয়ে যাবেন । পাঁচ বছর ধরে এই বাড়ির বিজ্ঞাপন দিয়ে যাচ্ছি শুধু বাড়ির মালিক বুড়ি আশালতা দেবীর অনুরোধে । কিন্তু আমি জানি , জীবনেও বিক্রি হবে না এই বাড়ি।'
'আপনার কথা ঠিক বুঝলাম না ।'
' ঠিক আছে আমি বুঝিয়ে বলছি । পাঁচ বছর আগে আশালতা দেবী এই বাড়িটা বিক্রি করবেন বলে ঘোষণা দেন। বিক্রি করতেন না। এক ছেলে ছাড়া তার আর কেউ নেই ইহজগতে । ছেলের মৃত্যুর পর বাড়িটা বিক্রির ব্যাপারে মনস্থির করেন । আমাকেই সেই ভার দেন। সে এক বিরক্তকর ব্যাপার স্যার। প্রতি সপ্তাহেই একবার আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন , কোন খরিদ্দার পেলে ? কোন খরিদ্দার পেলে ? আমি সাফ সাফ উনার মুখের উপর বলে দিয়েছি এই বাড়ি দশ লক্ষ টাকায়ও বিক্রি করা যাবে না, আর আপনি কি না চাইছেন পচাত্তর লক্ষ টাকা ? টাকা কি গাছে ধরে ? টাকা কি ছেলের হাতের ঘুগনি ? '
লোকটা ঢোক গিলে বলল , ‘ মানে দশ লক্ষ টাকা দামের বাড়ি উনি চাইছেন পচাত্তর লক্ষ টাকা ?’
' তবেই বুঝুন ? বাড়িটা শুধু পুরানো না। একেবারে ঝুনঝুনির মত অবস্থা , একেবারে ধইঞ্চা । লেতাফেতা হয়ে গেছে । বাড়ির কয়েকটা পিলার আর বীম আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ধসে যাবে। এক পশলা বৃষ্টি হতে না হতেই একতলায় জল জমে যায় বর্ষাকালে । সেই জল শুকাতে মাস তিনেক চলে যায় । দোতলাটা ডান দিকে প্রায় নয় ইঞ্চি হেলে পড়ছে । লোহার বারান্দা যে কোন মুহূর্তে ধসে পড়বে । দেয়ালে নোনা ধরে গেছে। শেওলা ফেওলা বটগাছের চারা দিয়ে ছাদ ভর্তি। '
![]()
' অবস্থা যদি এতই খারাপ হয় তবে ভদ্রমহিলা এত দাম চাইছেন কেন ?' অবাক গলায় প্রশ্ন করল লোকটা ।
দুই হাত উল্টে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বিচিত্র এক ভঙ্গী করলেন কেদারনাথ রায়। যেন দুনিয়ার উপর থেকে হাল ছেড়ে দিয়েছেন । ' আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না। আমি জানি না। সম্ভবত সেনটিমেনট। আবেগের ঠেলায় অমন করছেন । এই বাড়িটা ইংরেজদের আমলের । উনার ঠাকুরদা পাটের ব্যবসা করে প্রচুর টাকা কামিয়ে বাড়িটা তৈরি করেছিলেন।আমাদের বকশি নগরের প্রথম দোতলা বাড়ি। এইসব হাবিজাবি আর স্মৃতির পাখনা মিলে উনার আবেগি মন, বাড়িটার যুক্তিগত মূল্যের চেয়ে অনেক গুণ বেশি ধরে ফেলেছে আর কি ।'
চুপচাপ মেঝের দিকে চেয়ে আছে লোকটা । 'খুব খারাপ কথা।' বিড়বিড় করে বলল সে , ' খুবই খারাপ কথা ।' মুখ তুলে চাইল কেদারনাথের দিকে । শান্ত ,নির্ভীকভাবে হাসল , ' সত্যি বলতে কী বাড়িটা আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। কী ভাবে ব্যাখ্যা করব বুঝতে পারছি না। এমন বাড়িই খুঁজছিলাম । একদম মনের মত । '
' আপনার মনের ভাব বুঝতে পারছি।' মরমী বন্ধুর মত মাথা ঝাঁকালেন কেদারনাথ । ' অনেকেই অমন পুরানো ধাঁচের জিনিস পছন্দ করে । কিন্তু বাড়িটার অবস্থা এক দম ঝিরঝিরে । খুব বেশি হলে দশ লাখ টাকা মানানসই দাম। কিন্তু তাই বলে পচাততর লাখ টাকা ! টাকা কী গাছের গোটা ?’
খানিক হাসলেন কেদারনাথ। বলতে লাগলেন , ' আমি অবশ্য আশালতা দেবীর যুক্তি ও বুঝতে পেরেছি । ওই ভাঙ্গা বাড়িটা ছাড়া। ভদ্রমহিলার হাতে একটা কানা কড়িও নেই । উনার ছেলে সংসার চালাত । শহরে থেকে ছেলেটা ভালই আয় উপার্জন করছিল । আচমকা মারা গেল ছেলেটা। আহারে ! মহিলা কি আর করবে ? বাড়িটায় উনার কত কালের স্মৃতি। আবার এত বড় বাড়ি দিয়ে করবেনই বা কি ? ঐ দিকে খাওয়া পড়ার জন্য পয়সাও লাগবে, কাজেই তিনি এক ফন্দি বের করেন । এমন দাম চেয়ে বসেন যাতে বাড়ি কেউ কিনতে না পারে। সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার স্যাপার আরকি।'
দুঃখী মানুষের মত মাথা নাড়লেন কেদারনাথ , ' দুনিয়াটা বড্ড বিচিত্র জায়গা মশায়। তাই না ?'
চিন্তিত ভাবে মাথা নাড়ল নওশের আব্দুল্লাহ , ' ঠিকই বলেছেন। বড্ড অদ্ভুত জায়গা ।'
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে , ' এক কাজ করলে কেমন হয় কেদারনাথ বাবু ? আমি যদি গাড়ি নিয়ে উনার বাসায় চলে যাই। আশালতা দেবীর সাথে ব্যক্তিগত ভাবে কথা বলি যদি ? আপনার কী মনে হয় ? দামাদামি করে বাড়ির মুল্য খানিকটা কমিয়ে আনতে পারব ? হতে পারে, উনি হয়তো দাম কমিয়ে রাখতে পারেন। কথা বলে ভজানো আর কি । '
' জনাব নওশের আব্দুল্লাহ সাহেব , সেটা হবে উলুবনে ডায়মন্ড বা প্লাটিনাম ছড়ানোর মত । বা ভস্মে ঘি বা আইসক্রিম ঢালার মত । বা কলা গাছের ফার্নিচার বানানোর মত।আপনার কী মনে হয় ? গত পাঁচ বছর ধরে আমি কী কম চেষ্টা করেছি নাকি ? ‘
' কে জানে ! যদি অন্য কেউ চেষ্টা করে। সফল হতেও তো পারে । '
কেদারনাথ বিচিত্র ভঙ্গিতে দুই হাত উল্টে কেমন একটা ভাব ধরে বললেন , ' কে জানে ! হতেও তো পারে। দুনিয়াটা বড্ড বিচিত্র জায়গা মশায় । চেষ্টায় কি না হয় ? আপনি যদি নিজে গিয়ে দামাদামি করে সফল হন তবে আমার চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হবে না।'
' তাহলে আমি এখন আসব ...? '
' কোন সমস্যা নেই। এখনই আমি আশালতা দেবীকে ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি , আপনি উনার সাথে দেখা করতে আসছেন । নাকি ? আর কিছু ? '
শহরতলীর নির্জন পথ বেয়ে গাড়ি নিয়ে চলল নওশের আব্দুল্লাহ ।
দুই পাশে দানব সাইজের বনগাব , পাকুড় আর সাইবাবলা দাঁড়িয়ে থাকায় ছায়া ছায়া , আছন্ন আরামদায়ক একটা যাত্রা পেয়েছে।
শহরটা এতই নিঝুম, বড় রাস্তা ছেড়ে আসার পর , পথে আর অন্য কোন গাড়ির সাথে দেখা হল না।
শেষ পর্যন্ত হলুদ বাড়িটার সামনে এসে থামল সে ।
পচা কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো বেড়া। ওখানেই গাড়ি পার্ক করল ।
বাড়ির সামনের এই জায়গায় এক কালে বাগান ছিল । এখন বড় বড় ঝোপ আর কাঁকড়া ঘাসে ভর্তি। দেউরি বা গাড়িবারান্দায় এক সময় হয়তো টমটম গাড়ি থাকতো।ছিল গোলাপ বাগান । এখনও , দুই পাশে কলমকাঁটা গোলাপের মলিন ঝাড় । সেখানে মহাজগতের সমস্ত ধূলা জমে আছে।
মেয়েদের হাতের বালার মত দেখতে , পিতলের কড়া দরজায় । দুইবার নক করতেই দরজা খুলে গেল।
যিনি দরজা খুললেন তিনি বেঁটে এবং খানিকটা পৃথুলা । চুল রসুনের খোসার মত সাদা । মুখে মাকড়সার জালের মত ডোরাকাটা বয়সের চিহ্ন । এই গরমেও উলের কেমন ফ্যাকাসে একটা সুয়েটার গায়ে দেয়া।
' আপনি নওশের আব্দুল্লাহ ? ' বৃদ্ধা মহিলা কথা বললেন ।' কেদারনাথ বাবু আমাকে ফোন করেছেন , বলল , আপনি আসছেন ।'
'হ্যাঁ।‘ লোকটা হাসল । ' আপনি কেমন আছেন আশালতা দেবী ?'
'এই বয়সে যেমনটা আশা করা যায় ততটুকু ভালই আছি। ভেতরে আসবেন নিশ্চয়ই ?'
'বাইরে ভীষণ গরম ।' মুচকি হেসে যেন অভিযোগ করলো লোকটা ।
'হু, ভেতরে আসুন। আমি আপনার আসার খবর পেয়েই লেবুর শরবৎ বানিয়ে ফ্রিজে রেখে দিয়েছি। শুধু একটা শর্তে কথা বলতে পারি , বাড়ির দাম নিয়ে কোন রকম মুলামুলি করতে পারবেন না। অমনটা আশাও করছি না। আমি সেই ধরনের মহিলা না।'
'না । না তেমন মোটেও হবে না। ' হাসি মুখে বলল লোকটা। তারপর আশালতা দেবীকে অনুসরণ করলো ।
বর্গাকার একটা কামরায় প্রবেশ করলো দুইজনে। পুরানো আমলের ধাউস সব আসবাবপত্র দিয়ে ভর্তি । সব কেমন বিবর্ণ। মেঝেতে রঙ জ্বলা ন্যাকড়ার মত জিনিসটা এক কালে শীতল পাটি ছিল । কাঠের ইজিচেয়ারে ভদ্রমহিলা বসে পড়লেন নিঃশব্দে। মাছের চোখের মত ভাবলেশহীন ভাবে চেয়ে আছেন হবু ক্রেতার দিকে ।
' ভাল কথা নওশের সাহেব ।' বললেন বৃদ্ধা মহিলা। ' আপনার বলার কিছু থাকলে বলতে পারেন এখন ।'
গলা খাঁকারি দিয়ে কণ্ঠনালী পরিষ্কার করে নিল নওশের আব্দুল্লাহ । ' দেখুন আমি সবে মাত্রই দালাল কেদারনাথ বাবুর সাথে কথা বলে এসেছি...।'
'সে সব আমি জানি।' খানিক ঝংকার দিয়ে উঠলেন বুড়ি আশালতা দেবী । ‘ কেদারনাথ তো একটা আস্ত বেকুব। ও ভেবেছে আপনি আমার সামনে এসে খানিক গল্প সল্প করলে আমার মন নরম হয়ে যাবে। আর আমি বাড়ির দাম কমিয়ে ফেলব । অত সহজ না। আমি পুরানো চাল। অত সহজে সিদ্ধ হই না।'
' আসলে ...ইয়ে, সেই রকম কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আমি আসিনি আশালতা দেবী । তারপরও খানিক কথা বার্তা তো বলা যায় না কি ?'
ভদ্রমহিলা ইজিচেয়ারে ঠেস দিয়ে আমার করে বসলেন। খানিক দুলতে লাগল চেয়ারটা , ' বলুন, কী বলতে চান বলে ফেলুন ।'
'নিশ্চয়ই , লোকটা আবার রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে সেটা কোটের পকেটে গুঁজে রাখল । ' কাজের কথায় আসি। আমি ব্যবসায়ী মানুষ। অবিবাহিত। একদম একা মানুষ। শৈশব থেকে ফ্যামিলি ব্যবসার হাল ধরে প্রচুর টাকা পয়সার মুখ দেখেছি। এখন মনে হচ্ছে অবসরে যাবার সময় হয়ে গেছে আমার। বিশ্রাম দরকার । শহরের হৈ চৈ একদম বরদাস্ত করতে পারি না। নির্জন জায়গা দরকার আমার। বকশি নগর একদম ফাস্ট ক্লাস জায়গা আমার জন্য । কয়েক বছর আগে ব্যবসার কাজে এখান দিয়েই যাচ্ছিলাম । তখনই জায়গাটা পছন্দ হয়ে যায়। ঠিক করি অবসর নিলে এই শহরে এসেই থিতু হব। '
'তো ?'
'আজ যখন এই শহরেই এসেছিলাম তখন জানলাম আপনার বাড়ি বিক্রি হবে। আর কী বলব , এই ধরনের পুরানো প্রাচীন ধাঁচের বাড়ি আমার দারুণ লাগে। স্মৃতি জাগানিয়া ।'
' বাড়িটা আমার কাছেও তেমনি লাগে। সেইজন্যই তো অমায়িক নায়্য একটা দাম চেয়েছি ।'
‘ নায়্য দাম ?' দুই চোখের পাতা পিট পিট করল নওশের আব্দুল্লাহ । ' ম্যাডাম আপনি নিজেও স্বীকার করবেন আজকের দিনে অমন একটা বাড়ির দাম কিছুতেই অত হতে পারে না...।'
'অনেক হয়েছে।' হাউ মাউ করে উঠলেন আশালতা দেবী । ' আপনাকে আগেই কিন্তু বলেছি সাহেব। আমি এখানে সারাদিন বসে এইসব নিয়ে তর্ক করতে পারব না । দর কষাকষি তো একেবারেই না। দাম বেশি মনে হলে বাদ দিন সব আলোচনা । ভুলে যান সব। '
' কিন্তু ম্যাডাম, একটু বুঝার চেষ্টা করুন । আজকাল ...।'
'আপনি আসতে পারেন জনাব নওশের আব্দুল্লাহ সাহেব ।'
উঠে দাঁড়ালেন আশালতা দেবী। আঙুলের আবছা ইঙ্গিত দিয়ে দরজা দেখালেন । আশা করছেন ক্রেতা উঠে যাবে। ইশারা অনুসরণ করে বাইরে চলে যাবে ।
তেমনটা হল না।
আগের জায়গায় বসে আছে নওশের আব্দুল্লাহ ।
' আমার কথা শুনুন আশালতা দেবী।' বলল সে। ' এক মিনিট। আমার কথা শুনুন । হ্যাঁ, জানি একদম বেশি আর অস্বাভাবিক দাম। তারপরও ...তারপরও আপনার চাওয়া দামেই বাড়িটা কিনতে রাজি আছি আমি ।'
অনেক সময় নিয়ে আশালতা দেবী চেয়ে রইলেন তার সামনে বসে থাকা লোকটার দিকে । শান্ত একঘেয়ে গলায় বললেন , ' আপনি তাহলে আমার হাঁকানো দামেই কিনবেন ?'
' নিশ্চয়ই, তবে আর বলছি কি। টাকার অভাব নেই আমার। আর পছন্দের জিনিসে টাকা খরচ করতেও আপত্তি নেই।'
মহিলা হাসলেন ,' আমার মনে হয় এতক্ষণে লেবুর শরবৎ বেশ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। নিয়ে আসছি আপনার জন্য। তারপর এই বাড়ির একটা মজার ইতিহাস বলব আপনাকে। শুনে আপনার ভাল লাগবে।'
ট্রে হাতে যখন আশালতা দেবী ফেরত এলেন তখনও রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছছিল নওশের আব্দুল্লাহ । ঘেমে উঠা লম্বা কাচের গ্লাস ভর্তি হলদে তুষারতুল্য শীতল পানীয় দেখে লোভীর মত ঢোক গিলল ।
‘ এই বাড়িটা আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি।' শরবৎ বিলিয়ে নিজের ইজিচেয়ারে আরাম করে বসে বললেন আশালতা দেবী । ' আমার ঠাকুরদাদা বানিয়েছিল । নারায়ণগঞ্জে পাটের ব্যবসা ছিল উনার । রাজলক্ষ্মী জুট মিল থেকে পাট নিয়ে ইংল্যান্ডে পাঠাতেন । পরিবারের সব সদস্য এই বাড়ির দোতলায় জন্মেছে। শুধু আমার ছেলে মানিক ছাড়া। ও জন্মেছিল আমার শ্বশুর বাড়িতে।
আমার স্বামী আর শ্বশুর মারা যাবার পর ছেলে মানিককে নিয়ে এই বাড়িতেই ফিরে আসি ।
আমি জানি, পুরো বকশি নগরে, আমাদের এই বাড়িটা এই মুহূর্তে সেরা কোন বাড়ি না। একদমই না। বাড়িটার বয়স হয়েছে। দেশ ভাগের পর আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। বাড়ি মেরামতের খরচ অনেক। পোষায় না।
আমার ছেলে মানিকের জন্মের বছরে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল । বন্যার জল বাড়ির বেইজমেনটের অনেক ক্ষতি করেছে । এখন আষাঢ় শ্রাবণ মাসে বৃষ্টি হলেই এক তলায় জল জমে যায়। শুকাতে চায় না কিছুতেই। দেয়ালে নোনা । তারপরও বাড়িটা আমি অনেক ভালবাসি। এক জনমের কত কত স্মৃতি ! একা বসে থাকলেই সব যেন দেখি চোখের সামনে। আপনি নিশ্চয়ই আমার মনের ভাব বুঝতে পারছেন ?'
‘ সে আর বলতে ।' জবাব দিল নওশের আব্দুল্লাহ ।
' মানিকের বয়স যখন নয় ওর বাবা মারা যায় । এই বাড়িতেই ফিরে আসি। সেলাইয়ের কাজ করে সংসার চালাতে থাকি। বাবার রেখে যাওয়া সামান্য কিছু টাকা ছিল ব্যাঙ্কে। কিছু সুদ পেতাম। তাই দিয়ে মায়ে ছেলেতে ডাল ভাত খেয়ে চলতো । খুব ভাল যে চলতো তা না। কিন্তু চালিয়ে নিতাম । বাপের অভাবে মানিক একটু বন্য হয়ে বড় হল । '
অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বুঝদার মানুষের মত মাথা ঝাঁকাল নওশের আব্দুল্লাহ ।
' এখানের ইশকুল শেষ হতেই মানিক শহরে চলে গেল। বড় কলেজে পড়বে । না করলাম না। ছেলের ভাল সব মায়েই চায়। আরও অনেক তরুণের মত ওরও অনেক বড় বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল । ওখানে কি করতো কে জানে ! নিশ্চয়ই ভাল কিছু করতো আমার বাবা। ভাল উপার্জন হত ওর। প্রতি মাসে টাকা পাঠাতো আমার নামে। যাই হোক টানা নয় বছর ওকে দেখিনি আমি।'
‘ আহারে ! ' দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস করলো লোকটা ।
![]()
'ছেলেটা দূরে ছিল সেটাই বোধ হয় ভাল ছিল। কষ্ট হত, কিন্তু সহ্য করতে পারতাম। মানিক এক সময় বাড়ি ফিরল। কিন্তু সেটা হল আমার জন্য আরও খারাপ। ঘাড়ে বিপদ নিয়ে বাসায় ফিরল আমার খোকা।'
‘ অ্যা ?'
'বিপদটা কী ধরনের আর কত ভয়ংকর, সে সম্পর্কে আমার কোন ধারনাই ছিল না। আচমকা এক মধ্যরাতে হাজির হল এই বাড়িতে । দেখলাম আগের চেয়ে অনেক রোগা আর কালো হয়ে গেছে। চেহারায় ক্লান্তির আর বয়সের ভাঁজ । দেখে বিশ্বাস হচ্ছিল না। এতো বদলে গেছে আমার খোকাটা ? কোনরকম বাক্স-পেটরা বা বোচকা বুচকি ছিল না ওর কাছে । শুধু কালো রঙের পাতলা একটা সুটকেস ছিল হাতে। সেটা যখন ওর হাত থেকে নিতে গেলাম আমাকে ধাক্কা মেরে বসলো। আমাকে ? মায়ের গায়ে হাত দিল ছেলেটা !
' যত্ন করে বিছানায় শুয়ে দিলাম ছেলেটাকে। শুনলাম, সেই রাতে কাঁদছে ও। একা একা কাঁদছে । পরদিন মানিক আমাকে বললো , মা তুমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাও । ঘন্টা কয়েক এর জন্য । তারপর ফিরে এসো । একা একা কিছু করবে সে । আমাকে এও বলল, পরে সময় মত সব কিছু আমাকে খুলে বলবে । সেদিন বিকেলে যখন আমি বাড়ি ফিরলাম, প্রথম যে জিনিসটা আবিষ্কার করলাম কালো সেই সুটকেসটা নেই ।'
শরবতের গ্লাসের আড়াল থেকে লোকটার বিস্ফারিত চোখ দেখা গেল , ' মানে কী ?'
' আমি জানি না আসলে কি হচ্ছিল।' বলতে লাগলেন আশালতা দেবী । ' তবে সব কিছুই জানতে পারলাম। খুব জলদি । সেইরাতে এক লোক হাজির হল আমাদের বাড়িতে। আমি নিচের ঘরেই ছিলাম। লোকটা কিভাবে বাড়িতে ঢুকেছিল আজ ও পরিষ্কার না । নিচ তলা থেকেই শুনতে পেলাম, উপরে মানিকের রুমে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে আমি ধীরে ধীরে উপরে উঠে গেলাম। দরজায় কান পেতে শুনতে চেষ্টা করছিলাম, আমার ছেলেটা কী ধরনের বিপদ মাথায় করে নিয়ে এসেছে। কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। শুধু শুনতে পেলাম কেউ একজন আমার ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।‘
খানিক থামলেন আশালতা দেবী। হতাশা আর দুঃখে কাঁধদুটো ঝুলে গেল ।
'আচমকা ভেতরে গুলির শব্দ শুনলাম ।' আবার বলতে লাগলেন । ' দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে যখন ঢুকলাম তখন দেখি বিছানার পাশের জানালাটা খোলা। সেই জানালা গলে জলের পাইপ বেয়ে নেমে যাচ্ছে অচেনা লোকটা। আর আমার মানিক মেঝেতে পড়ে আছে। মারা গেছে।'
ইজি চেয়ারটা মচমচ করে শব্দ করলো।
‘ পাঁচ বছর আগের কথা ।' বলতে লাগলেন আশালতা দেবী । ' পাঁচ বছর আগেই ধীরে ধীরে সব কিছু বুঝে ফেলেছি আমি। জেনেছি , আসলে কি হয়েছিল সেই রাত্রে। পুলিশ এসে সব গল্প কাহিনি বলছে আমাকে।এখানকার পুলিশ ও চিনে ফেলেছে আমার ছেলেকে। শহরে গিয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে উচ্ছন্নে গিয়েছিল আমার বাবাটা। কোন এক ঘাগু অপরাধীর পাল্লায় পড়ে নিজেও হয়ে গিয়েছিল পেশাদার অপরাধী। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মত জঘন্য সব কাজ করতো দুইজনে মিলে ।
‘ সেইবার মস্ত এক দাও মারে দুইজনে। হীরা ব্যবসায়ী জগত শেঠের কাছ থেকে হীরা ভর্তি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। পুলিশের হিসাব মতে পঞ্চাশ কোটি টাকার হীরা ছিল । পুরো মাল একা হজম করার জন্য, মানিক শহর থেকে পালিয়ে বাড়ি চলে আসে। ভেবেছিল ওর পার্টনার কিছুতেই খুঁজে পাবে না ওর হদিশ । এই বাড়ির ভেতরে কোথাও পঞ্চাশ কোটি টাকার হিরে লুকিয়ে রেখেছে মানিক। কোথাও আছে। আমি জানি না কোথায় । কিন্তু আছে।
গন্ধ শুকে শুকে মানিকের সঙ্গী লোকটাও চলে আসে সেই রাত্রে। নিজের ভাগ বুঝে নিতে চায় । তর্ক উঠে দুইজনে। যখন সে আবিস্কার করে মানিক সব মাল হাপিস করে ফেলেছে তখন লোকটা ...লোকটা আমার ছেলেকে গুলি করে ।'
খানিক চুপচাপ রইল পরিবেশটা।
বাইরে রোদ নেমে গেছে নরম হয়ে। বাতাসে কেমন বিষাদ ।
আবার বলতে শুরু করলেন দুঃখিনী মা।' তখনই আমার বাড়িটা বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দেই । কিন্তু অনেক অনেক চড়া দাম চেয়ে বসি । কারণ আমি জানি , একদিন না একদিন , আমার ছেলের খুনি এই বাড়িতে আসবেই। সেই হীরার খোঁজে । আসবেই । যে কোন মূল্যে সেই লোকটা এই বাড়ি কিনতে চাইবে। আমার কাজ শুধু একটাই । ততদিন ধৈয়্য ধরে অপেক্ষা করা। কবে একজন লোক আসবে আর অবিশ্বাস্য দামে এই ভাঙ্গা বাতিল বাড়িটা কিনতে চাইবে। শুধু অপেক্ষা করাই আমার কাজ। '
থামলেন বৃদ্ধা মহিলা । ইজিচেয়ারে বসে দোল খাচ্ছেন তিনি ।
ক্যাচ ক্যাচ শব্দ হচ্ছে।
শরবৎ শেষ। খালি গ্লাসটা টেবিলের উপর নামিয়ে রাখল নওশের আব্দুল্লাহ । শুকনো ঠোঁট চাটলো জিভ দিয়ে । চোখের পাতা ভারী হয়ে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ওর । মাথার ভেতরে কেমন যেন ঝিম ঝিম করছে। বুকের ভেতরে কেমন জ্বালা পোড়ার মত ভাব।
'আচ্ছা ,এইজন্য শরবৎ অমন তেঁতো লাগছিল ?'
ওটাই ছিল তার শেষ কথা ।
The Right Kind of House - Henry Slesar

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন