এক
জলদস্যুদের ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই।
ফালতু একটা পেশা।
কতগুলো ডাকাত জাহাজে করে সমুদ্রের বুকে ঘুরে বেড়ায়। অন্য কোন জাহাজ পেলে লুটপাট করে নেয়। শত্রুর জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেয়। বা কামানের ভারি গলার আঘাতে ডুবিয়ে দেয়। অমন বহু বিচ্ছিরি কাজ করে ওরা।
নিজেদের মধ্যে নিজেরা ঝগড়া তো করেই। সামান্য কারনেই একজন আরেকজনকে ধারালো চাকু বা তলোয়ার দিয়ে আক্রমণ করে বসে।খুব বাজে অভ্যাস। তারচেয়ে বড় কথা মাসের পর মাস ওরা সমুদ্রে থাকে। সমুদ্রের পানি তো নোনা। গোসলও করে না নিয়মিত। নিশ্চয় বাজে গন্ধ থাকে ওদের শরীরে ?
কাজেই জলদস্যুদের প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই।
তবে মাঝে একটা কাণ্ড হল। সেটা বলার জন্যই এই লেখা।
ইশকুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠলাম।
ইস্কুলে তখনও নতুন বইয়ের লিস্ট দেয়া হয়নি। পড়া শুনা শুরু হয়নি। হাতে বেশ সময়। আমাদের বাড়িতে কাঠের এক আলমারি ভর্তি বই আছে।
বইগুলো সব জেঠুর। উনি দিন রাত ইজি চেয়ারে শুয়ে বসে বই পড়তেন।বই পড়তে পড়তে তার চোখ দুটো প্রায় নষ্ট হবার দশা। সারাক্ষণ চশমা পড়ে থাকতেন। চশমার কাঁচ দুটো বোতলের তলার মত মোটা। ভেতরে চুনু মাছের মত জেঠুর চোখ দুটো দেখা যেত।
আলমারির চাবিও ছিল জেঠুর কাছে।
উনার অনুমতি ছাড়া কেউ কোন বই নিতে পারতো না।আগে নাকি জেঠর বইয়ের সংখ্যা হাজারে বিজারে ছিল।
তখন বাড়িতে যেই আসতো। সেই নাকি আলমারি ভর্তি বই দেখে ধার নেয়ার জন্য আবদার ধরে বসতো। সেই বই কখনই ফেরত দিত না। এই ভাবে প্রচুর বই গচ্চা যাবার পর বইয়ের আলমারিতে তালা মেরে রাখতেন জেঠু ।
চাবি থাকতো উনার কোমরের কাছে কালো কাইতনে বাঁধা।
এক ছুটির দুপুরে আমি রবাট লুই স্তিভেনসন সাহেবের ' ট্রেজার আইল্যান্ড ' বইটা পড়ে ফেলি।
দুপুরটা ছিল সাংঘাতিক রকম নিরিবিলি।
বাইরে কোন ফেরিওয়ালা বা আইসক্রিমওয়ালার হাঁক ডাক নেই।বহু দূরে নতুন কোন একটা দালানের ছাদ পিটান হচ্ছে। আর সব চুপচাপ।
বাইরে হলুদ রঙের রোদ।
সুপারি গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে লম্বা টুকরো টুকরো রোদ এসে পড়ছে বারান্দায়। পাটকিলে রঙের কতগুলো চড়ুই বারান্দায় বসে চিরিপ চিরিপ করে শব্দ করছিল।আর মুড়ি খাচ্ছিল।
মুড়ি আমিই দিয়েছি।পাখীদের খাওয়াতে ভাল লাগে আমার।একবার ওদের খাবার দিলে নিয়ম করে প্রত্যেক দিন একই সময় ওরা এসে হাজির হবে।
ট্রেজার আইল্যান্ড বইটাতে কিশোর জিম ওর নিজের গল্প বলছিল।
ওরা একটা সরাইখানা চালাত। নাম- অ্যাডমিলার বেনবো। একদিন বুড়ো মত এক নাবিক এসে উঠল সেই সরাইখানাতে।
লোকটার গালে একটা কাটা দাগ। রুক্ষ চেহারা। গায়ের রঙ পুরে বাদামী হয়ে গেছে।হাতের আঙ্গুলগুলো কুঁচকানো। নখগুলো কালো, ময়লা আর ক্ষয়ে যাওয়া।মাথার চুলগুলো বেণী করে বাঁধা। গায়ে রঙ জ্বলা নীল একটা কোট।
লোকটা সঙ্গে করে বিশাল একটা সিন্দুক নিয়ে এসেছিল।
প্রথম দিনই সরাইখানার ভেতরে ঢুকে এক গ্লাস রামের অর্ডার দিল ।সারাক্ষণই গুনগুন করে বিচ্ছিরি সুরে শিস দিচ্ছিল।জিমের বাবাকে লোকটা জানালো -জায়গাটা নিরিবিলি কিনা ?
যদি নিরিবিলি হয় তবে কয়েকটা দিন এখানে থাকতে চায় সে। তেমন কিছু লাগবে না ।শূয়রের মাংস, ডিম, আর রাম হলেই চলবে।দোতলার কামরাতে থাকতে চায় সে।যাতে বন্দরে নতুন কোন জাহাজ এলেই নিজের কামরাতে বসে দেখতে পারে।
আর তাকে ক্যাপ্টেন বলে ডাকতে হবে।দোতলার কামরাতে থাকতে চায় সে।যদিও লোকটার জামা কাপড়ের দশা দেখে জিম আর ওর বাবা বিশ্বাস করতে পারেনি যে লোকটা জাহাজের ক্যাপ্টেন।তবে সেই দিন থেকেই লোকটা থাকা শুরু করলো অ্যাডমিলার বেইনবো সরাইখানাতে।
প্রত্যেকদিন সকালে পিতলের একটা দূরবীন নিয়ে চলে যেত দূর পাহাড়ের উপর।সেখান থেকে সমুদ্রগামি জাহাজের উপর নজর রাখত।
কিশোর জিমকে ডেকে বলেছে খোঁড়া কোন নাবিককে দেখলে সাথে সাথেই যেন ক্যাপ্টেনকে খবর দেয়। বদলে মাসে চার পেনি করে বেতন পাবে।বেতনের লোভে না। কৌতূহলের জন্য জিম কাজটা শুরু করে।
সারাক্ষণ সে খোঁড়া নাবিকের কথা চিন্তা করে। ফলে রাতে ঘুমের মধ্যে বিচ্ছিরি সব দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু করলো। আর ঐ দিকে ক্যাপ্টেনের অত্যাচার দিন দিন বাড়তেই থাকে।
প্রত্যেক সন্ধ্যায় প্রচুর মদ গিলে মাতাল হয়ে হৈ চৈ শুরু করে। নিজের পয়সায় মদ খাওয়ায় সবাইকে।এবং যখন বিচ্ছিরি সুরে গান গায় তখন সবাইকে বাধ্য করে তার সাথে তালে তাল রেখে গলা মেলানোর জন্য। একটানা বকবক করে গল্প করে যায়। গল্পের মাঝখানে কেউ প্রশ্ন করলে সাংঘাতিক বিরক্ত হয়।
আবার সবাই চুপচাপ থাকলে মনে করে কেউ মনোযোগ দিয়ে তার গল্প শুনছে না।
সে এক বিচ্ছিরি অবস্থা।
তবে স্বীকার না করে উপায় নেই দারুন গল্প করতে পারত এই ক্যাপ্টেন। দূর সমুদ্রের বুকে ভয়াল সব ঝড় উঠে। সেই সবের বর্ণনা দিতে পারে। ফাঁসিতে কি ভাবে মানুষ লটকানো হত সেই সবের প্রাঞ্জল বর্ণনা দিতে পারত। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত আর পীত জ্বরে মানুষ মরার বর্ণনা থাকতো ঘন ঘন।
আর সব খদ্দেররা ক্যাপ্টেনের সেই গল্প শুনে ভীষণ ভয় পেত। তবে চ্যাংরা ছোকড়া যারা তারা ছিল ক্যাপ্টেনের মহাভক্ত। আসলে সবাই বিনে পয়সায় মদ খাওয়ার মওকা পাবার জন্য এসে আড্ডা জমাত ফায়ারপ্লেসের পাশে।
তো রবার্ট লুই স্তিভেনশন সাহেবের ট্রেজার আইল্যান্ড বইটা এইভাবেই শুরু। তারপর তো একটার পর একটা ঘটনা ঘটতেই থাকে। শেষে কিশোর জিম জাহাজে করে সেই রত্নদ্বীপে হাজির হয়। দারুন রকমের একটা অ্যাডভেঞ্চার করে ফিরে আসে।
সাধারণত এই ধরনের বই পড়ে আমার মন খারাপ হয় না। কিন্তু এইবার হল। আফসোস হতে লাগল। আহা জলদস্যুদের জাহাজে কাজ করা কত মজার ব্যাপার। কিন্তু কল্পনা করাই সার। জলদস্যুদের যুগ শেষ। ১৬৯০ সাল থেকে ১৭২০ সাল পর্যন্ত সমুদ্রের বুকে জলদস্যুদের তাণ্ডব ছিল। পরে কমতে কমতে হারিয়ে গেছে।
দুই
সেই বছর কিসের গণ্ডগোলের জন্য যেন ইস্কুলের বুকলিস্ট বের হতে দেরি হচ্ছিল।
জানুয়ারি মাস প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। ইশকুলও চলছিল না। এই রকম দিনগুলোতে সময় কাটতে চায় না।বাসায় থাকলেও শান্তি নেই। খানিক পর পর জেঠুর ফাই ফরমায়েশ খেটে দিতে হয়। বেশির ভাগ সময় মোড়ের দোকান থেকে প্রচুর জর্দা দেয়া পান এনে দিতে হয়। দশটা ঘামাচি গেলে দিলে মাত্র ১ টাকা করে দেন জেঠু। অথবা মাথার চুলগুলো টেনে দিতে হবে। যতক্ষণ না উনি আরাম পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ততক্ষণ পর্যন্ত । ততক্ষণ টেনে দিতেই হবে। দিতেই হবে। চুল আস্তে টানলেও জেঠু বিরক্ত হয়। জোড়ে টানলে জেঠুর তম্বি দেখে কে?
কাজেই সময় আর সুযোগ পেলেই আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়ি।
বাড়ির খানিক দূরেই সমুদ্র। এই মিনিট দশেক হেঁটে যেতে হয় আরকি। আমার যখন একা লাগে তখনই সমুদ্র তীরে গিয়ে বসে থাকি। ঢেউ গুনি। একটার পর একটা ঢেউ দেখতে দেখতে মন ভাল হয়ে যায়। সৈকতে বেগুনি রঙের তারামাছ এসে পরে থাকে কখনো কখনো। পাখি এসে ঠুকরে খায় ওদের।
বেশির ভাগ সময় সাথে করে প্ল্যাস্টিকের বালতি আর বেলচা নিয়ে আসি। বালি দিয়ে বালতি ভর্তি করে উপুর করে ঢেলে দিলেই ঢিবির মত হয়ে যায়। তখন ওটাকে খুচিয়ে খুচিয়ে দুর্গ বানাই।
আজ সৈকতে গিয়ে দেখি লোকজন তেমন নেই। বেশ দূরে কয়েকজন মোটা বুড়ো ব্যায়াম করছে। এই রকম বুড়ো রোজই আসে। মাত্র তিন চার মিনিট ব্যায়াম করে। সাথে করে টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে লুচি আলুর দম এইসব হাবিজাবি নিয়ে আসে। রাক্ষসের মত খায়। ফ্ল্যাক্স ভর্তি চা- ও আনে।
খানিক দূরে একটা নির্জনমত জায়গা আছে। বড় বড় পাথর আর গোঁড়ায় নরম ঘাস। এই ঘাস ছিঁড়লে লেবুর ঘ্রাণ পাওয়া যায়। ওখানে গিয়েই বালি খুড়তে লাগলাম। সুন্দর মত কড়ি পেলে রেখে দেব। দিদা কড়ি জমাতে পছন্দ করে। বড় কাচের বয়াম ভর্তি অনেক কড়ি আছে আমাদের বাসায়।
দিনটা রোদেলা। হলুদ রঙের রোদ।
বেলচা মেরে যেতেই লাগলাম। যেতেই লাগলাম। বালির তলা থেকে ছোট ছোট শামুক আর ঝিনুক বের হয়ে আসছিল। পাশেই রেখে দিচ্ছিলাম। যাবার সময় বালতি করে নিয়ে যাব।
আচমকা কেমন ঠাণ্ডা বাতাস বইতে লাগল। ঘাড়ের কাছের চুলগুলো সড়সড় করে দাড়িয়ে গেল আমার। আকাশটাও কেমন কালো হয়ে গেছে। অবাক কাণ্ড। আজ সকালেও তো রেডিও শুনলাম। কই এমন কোন ঘোষণা তো শুনলাম না- আকাশ মেঘলা থাকবে বা ঝড় বৃষ্টির সম্ভবনা আছে। হেন তেন। তবে ?
সৈকতের দিকে চেয়েই অবাক হয়ে গেলাম। একদম খালি। একটা মানুষও নেই। সৈকত খালি। খানিক আগেও কয়েকটা বুড়ো হাবড়াকে দেখেছিলাম যোগ ব্যায়াম করছে । গেল কোথায় সবাই ?
খোলা সমুদ্রের দিকে তাকাতেই আমার চোখ গোল্লা গোল্লা হয়ে গেল। বললে বিশ্বাস করবে না- পুরানো দিনের একটা পালতোলা জাহাজ দেখা যাচ্ছে ওখানে। কাঠের জাহাজ। লম্বা মাস্তুল। কাপড়ের বড় বড় পাল। মৌসুমি বাতাসে সেই পাল ফুলে গেছে তিমি মাছের পেটের মত। তারচেয়ে অবাক কাণ্ড পিচ্চি একটা ডিঙিতে করে চার পাঁচ জন লোক সৈকতের দিকেই আসছে। লম্বা পাহাড়ের মত একটা লোক নেতৃত্ব দিচ্ছে অদের।হাবভাবে বুঝা যাচ্ছে সেই পাহাড়ই ওদের নেতা।
ডিঙিটা সৈকতের লাল বালির মধ্যে ঠেকতেই লোকগুলো লাফ দিয়ে নামলো। সর্দার লোকটা বেশ লম্বা। মাথায় লাল রুমাল বাঁধা। মুখ ভর্তি নরম দূর্বাঘাসের মত দাড়ি। দুই কানে বড় বড় পিতলের রিং। স্বর্ণের ও হতে পারে। কালো লাল ডোরা কাঁটা জামা পড়নের। উপরে লম্বা কালো কোট। ঢোলা প্যান্টের কোমরে বিচ্ছিরি গাদা বন্দুক ঝুলছে। লোকটার একটা ঠ্যাং নেই। কাঠের একটা ক্র্যাচ নিয়ে কায়দা করে ঠুক ঠুক শব্দ করে হেঁটে আসছে। কাঁধে আবার সবুজ রঙের দাঁড়কাক বসে আছে। সব মিলিয়ে বইয়ে পড়া লং জন সিলভারের মত লাগছে।
‘ এই পিচ্চি।’ হাঁক দিল লোকটা । ‘ এটা কি জাঞ্জিবার উপকূল ?’
‘ জাঞ্জিবার ?’ অবাক হলাম। ‘ না আঙ্কেল । এটা তো কক্সবাজার।’
‘ হায় হায়।’ বিচিত্র ভঙ্গিতে বিলাপ করে উঠলো খোঁড়া লোকটা।
লোকটার কাঁধে বসে থাকা সবুজ রঙের দাঁড়কাকটাও ডানা ঝাপটে তীক্ষন গলায় বিলাপ করে উঠলো, ‘ হায় হায়।’
‘ আপনার পাখি কথা বলতে পারে নাকি ?’ অবাক হলাম।
‘ নিজের কানেই তো শুনলে ।’ বিরক্ত হয়ে বলল লোকটা । ‘ ফালতু প্রশ্ন করার মানে কি ? কত কষ্ট করে এটাকে কথা বলা শেখালাম। যাই হোক মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে এখানে নেমে। আমি ভেবেছিলাম জাঞ্জিবার। এমন ভুল প্রথমবার হল। কেন এমনটা হল বুঝতে পারছি না। সম্ভবত বাসি আখরোট খেয়েছিলাম সেই জন্য। নিশ্চয়ই জানো, বাসি আখরোট আর পচা পনীর খেলে নানা রকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় মানুষের মগজে। যাই হোক, নতুন করে পাল খাটাতে হবে। শীতল স্রোতে জাহাজ ভাসালে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে জাঞ্জিবার পৌঁছে যাব আশা করছি।’
‘ আপনি কি লং জন সিলভার ?’ প্রশ্নটা না করে পারলাম না।
‘ এই ব্যাটা আবার কে ?’ আগের মতই বিরক্ত খোঁড়া ।
‘ না, মানে বইতে পড়েছিলাম।’ মিনমিন করে সাফাই গাইলাম।
‘ বুদ্ভু কাহাকা।’ খেঁকিয়ে উঠলো খোঁড়া । ‘ এত বই পত্র পড়েই তো তোমার মত পিচ্চিদের মাথা নষ্ট হয়ে যায়। যত সব ফালতু আইডিয়া। লং জন সিলভার ! কোন নাম হল ? হ্যাহ। আমাকে ক্যাপ্টেন পাইন্ট বলে ডাকবে। এবার চল জাহাজে।’
‘ কেন ? ‘ ঢোক গিলে বললাম। হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে ভয়ে।
‘ আমাদের একটা পিচ্চি দরকার। আলুর খোসা ছাড়ানোর জন্য বা অমন হালকা কোন কাজের জন্য।’
‘ আমি তো হালকা পাতলা কোন কাজ জানি না।’
‘ কে বলল জানো না ? মাত্র তো দেখলাম সুন্দর করে বেলচা মেরে বালি তুলছিলে। কোন দ্বীপে নিয়ে যখন গুপ্তধন পুঁতে রাখব তখন তো বেলচা মারার দরকার হবে।’
ক্যাপ্টেন নামের বিশাল আর কুৎসিত লোকটার কথা শুনে পরিষ্কার বুঝতে পারলাম ছেলে ধরাদের পাল্লায় পড়েছি। জেই করেই হোক ধানাই পানাই দিয়ে পালাতে হবে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। বিশাল লোকটা হাত বাড়িয়ে মুরগি ধরার মত আমার ঘাড়টা চেপে ধরল। আর মু হা হা করে হাসতে লাগল।
‘ চল দেখি পিচ্চি।’ হাসতে হসাতে বলল ক্যাপ্টেন। ‘ আমাদের সাথে নোনা সাগরের বাতাস খেয়ে এসো কয়েকটা দিন। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার টিংটিঙে স্বাস্থ্য ভাল হয়ে যাবে। ফালতু বই পড়া রোগ ভাল হয়ে যাবে। এক নাম্বার জাহাজি হয়ে যাবে তুমি। মু হা হা।’
ততক্ষণে বাকি লোকগুলো চ্যাংডলা বড় একটা চটের বস্তার ভেতরে ভরে ফেলল আমাকে। পরের ঘটনা সামান্যই। সিমেন্টের বস্তার মত ধরাধরি করে ডিঙিতে তোলা হল আমাকে। বস্তার ভেতরে থাকায় কিছুই দেখতে পারছি না। তবে ঢেউয়ের দুলুনি, দাঁড়ের শব্দ আর বিচ্ছিরি লোকগুলোর হাসির শব্দ ঠিকই শুনতে পাচ্ছিলাম। বস্তা বন্দি হয়ে ডিঙির পাটাতনে পরে রইলাম। বস্তার মধ্যে একটা ফুটো আবিস্কার করে চেয়ে রইলাম। পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যে ডিঙ্গি পৌঁছে গেল জাহাজের পাশে।
‘ আহোয়।’ চিৎকার করে বলল ক্যাপ্টেন।
সঙ্গে সঙ্গে উপর থেকে কপিকলের সাথে ঝুলানো মোটা দড়ি নেমে এলো চারটে। দড়ির মাথায় বড়শির মত পেল্লাই সাইজের হুক। সেই চারটে ডিঙির চারদিকের চারটে আংটার সাথে গেঁথে দিতেই উপর থেকে সবাই মিলে কপিকল টেনে উপরে তুলে ফেলল আমাদের।
জাহাজের পাটাটনের উপর ধরাম করে ফেলে বস্তার মুখ খুলতেই কচ্ছপের মত আমার মাথাটা বের হয়ে এলো।
বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।
আমার চারিদিকে গোল হয়ে দাড়িয়ে আছে এক গাদা মানুষ। ওদের একেক জনের চেহারা দেখলে যে কারো ভাল মানুষের পিলে চমকে যাবে। বিদঘুঁটে চেহারা। কারো মাথা ন্যাড়া। মাথা ভর্তি খুজলি প্যাঁচরা। কারো লম্বা চুল। কেউ মাথায় চামড়ার টুপি পরে আছে। টুপি এত পুরানো যে শেওলা পরে গেছে টুপির গায়ে। এক জনের ডান চোখ নেই। সেখানে চামড়ার একটা গোল টুকরো কায়দা করে ফিতা দিয়ে বাঁধা। আরেক জনের সামনের পাটির চারটে দাঁত নেই। হাসছে- মুখটা কবুতরের খোপের মত লাগছে। সবার মুখেই দাড়ি গোঁপের জঙ্গল। কারো কম। কারো বেশি।কেউ বেঁটে। কেউ তালগাছের মত লম্বা। কেউ পিপের মত মোটা। কেউ চ্যাপা শুঁটকির মত রোগা। সবার পড়নের প্যান্ট ঢল ঢলে। ইয়া মোটা চামড়ার বেল্ট। বেল্টের বকলস ভারি পিতলের।
একজনের হাতে ইয়া মোটা রশি। জীবনেও এত মোটা রশি দেখিনি। আরেক জনের হাতে বিটকেলে ধরনের বর্শা। পরে জেনেছি ওটার নাম হারপুন। তিমি মাছ মারতে লাগে। আরেকজনের হাতে ফুটবলের মত বড় কালো কি যেন। পরে জেনেছি- কামানের গোলা।
‘ ক্যাপ্টেন পাইন্টের জাহাজে স্বাগতম।’ হেঁড়ে গলায় বলল ক্যাপ্টেন। ‘ তোমরা দেখে নাও , এই হচ্ছে আমাদের নতুন সঙ্গী। আজ থেকে ওর নাম পিচ্চি রোজার।’
‘কিন্তু...।’ বাঁধা দিয়ে কিছু বলতে চাইলাম আমি। তার আগেই মোটা মত একটা লোক ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল আমাকে।
‘ খামোশ।’ গর্জে উঠলো মোটা। ‘ যখন ক্যাপ্টেন কথা বলবে তখন কথার মাঝখানে কথা বলবে না। তাহলে শাস্তি পেতে হবে। সেটা হতে পারে নীচের সেলারে এক সপ্তাহ বন্দি থাকা। খাবার বা পানি ছাড়া। অথবা নয় লেজের বিড়াল দিয়ে পিটান হবে। অথবা ফাঁসি।’
শাস্তির কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম।
ফাঁসির কথা শুনে আমার হাত পা বরবটির মত নরম হয়ে গেল। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম সাংঘাতিক বিপদের মধ্যে পড়েছি।
‘ আপনারা কি জলদস্যু ?’ ঢোক গিলে প্রশ্ন করলাম।
প্রশ্ন শেষ হবার সাথে সাথেই লোকগুলো বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে হেসে ফেলল। হাসির কি ছিরি। কেউ মুহা হা করে হাসছে। কেউ খ্যাক খ্যাক করে হাসছে। সাইকেলের চাকার হাওয়া বের হতে থাকলে যেমন শব্দ হয় তেমন শব্দ করেও হাসছে। বাচ্চাদের হুপিং কাশি হলে যেমন শব্দ হয় তেমন শব্দ করেও হাসছে কেউ কেউ। মোট কথা হাসির বিশ্ব হাট। থামতেই চায় না সেই হাসি। একজন থামতে গেলে পাশের জনের হাসি দেখে আবার হাসতে থাকে।
‘ জেনে খুশি হবে আমরা আদি এবং আসল জলদস্যু।’ হাসির হুল্লোড় একটু কমে আসতেই বলল ক্যাপ্টেন পাইন্ট । ‘ সমুদ্রের মালবাহী জাহাজ লুট করাই আমাদের কাজ। দারুন রোমাঞ্চকর একটা পেশা। কত মানুষ জলদস্যু হবার জন্য মুখিয়ে আছে। তোমার ভাগ্য ভাল না চাইতেই সুযোগ পেয়ে গেছ। কারন ও আছে, আমাদের একটা পিচ্চি দরকার। আলুর খোসা ছাড়ানোর জন্য।’
‘ সেই সাথে প্রতিদিন সবার জাইঙ্গা আর নোংরা মোজা সাবান জলে কেঁচে দিতে হবে।’ পাশ থেকে বলে উঠলো মোটা লোকটা।
‘ কিন্তু নতুন আইন অনুসারে আমরা তো মাসে একদিন করে মোজা আর জাইঙ্গা পরিষ্কার করব বলে ঠিক করেছি।’ বিরক্ত হয়ে বলল ক্যাপ্টেন পাইন্ট ।
‘ ঠিক, ঠিক।’ এক সাথে সবাই চিৎকার করে সায় দিল। ‘ প্রতেকদিন জাইঙ্গা আর মোজা পরিষ্কার করার দরকার দেখি না। এই জিনিসগুলো আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে নেই।’
‘ জলদস্যুদের জাহাজে কি আর কাজের অভাব হবে ?’ গম্ভীর গলায় বলল ক্যাপ্টেন। ‘ কোয়াটার মাস্টার তুমি পিচ্চি রোজারকে নীচের সেলারে নিয়ে যাও। জাহাজের নোঙর তোলা হোক। কেবিনে গিয়ে চার্ট আর কম্পাস দেখে কোর্স ঠিক করছি। কাকের বাসায় একজনকে পাঠাও । নতুন কোন দ্বীপ পেলে চেঁচিয়ে যেন আমাদের জানায়। কারন লেবু দরকার আমাদের।’
‘ আই আই স্যার।’ সবাই চিৎকার করে এক সাথে বলল।
কাঠের মেঝেতে ঠক ঠক করতে করতে নিজের কেবিনে চলে গেল ক্যাপ্টেন পাইন্ট । আর ভিড়টাও পাতলা হয়ে যার যার কাজে চলে গেল। এতক্ষণ যেন সবাই ফুটপাথে ওষুধ বিক্রি করা দেখছিল।
‘ চলো, তোমাকে সেলার রুমটা দেখিয়ে আনি।’ পাশে এসে দাঁড়ালো কোয়াটার মাস্টার। মানে মোটা লোকটা। পরে জেনেছি কোয়াটার মাস্টার ক্যাপ্টেনের পরের পদ। সবাই তার আদেশ মেনে নিতে বাধ্য থাকে।
ততক্ষণে জাহাজের নোঙর তুলে ফেলা হয়েছে। পালগুলো ভুঁড়িওয়ালা মানুষের জামার মত ফুলে উঠেছে। তরতর করে নীল সাগরের বুকে ভেসে যাচ্ছে জাহাজটা। ঢেউয়ের শব্দ- ছলাৎ, ছলাৎ ।
সেলার রুমটা আসলে একদম নীচের দিকের একটা কামরা। সব কিছু জমা রাখা হয় এখানে। গুদামঘর বলতে পারি। কামরার চারিদিকের দেয়ালে বড় বড় কাঠের তাক। সেই তাকে বস্তা ভর্তি আলু, পেয়াজ, কুমড়া আরও নানান সবজি। বড় বড় জুনিপার কাঠের পিপে। পিপে ভর্তি রাম। কতগুলো শূন্য ঝুড়ি দেখলাম। লেবু থাকার কথা। নেই। শেষ হয়ে গেছে। জাহাজে লেবু খুব দরকারি। মাসের পর মাস জাহাজগুলো সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়। বেশির ভাগ সময় জলদস্যুদের মাছ আর মাংস খেতে হয়। তাজা শাক সবজি খাওয়া হয় না। ফলে স্কার্ভি নামে একটা রোগ হয়। এই রোগ হলে চামড়া কুচকে দ্রুত বুড়ো হয়ে যায় মানুষ। দাঁত গুলো পাকা ফলের মত টুপ টাপ খসে পরে যায়। স্কার্ভি থেকে বাঁচার জন্য জাহাজিরা প্রচুর লেবু খায়। মাছ খাবার সময় অনেক ফালি লেবু নিয়ে বসে।
কোয়াটার মাস্টার লোকটা নেহায়েত খারাপ না। আমার সাথে বেশ ভাল ব্যবহারই করলো।
এক বস্তা আলু টেনে আমার সামনে ধপাস করে ফেলল কোয়াটার মাস্টার। আলুর সাইজ ইয়া বড় বড়। মঙ্গলগ্রহের সমান। খসখসে বাদামি রঙের খোসা ।
‘ জ্যামাইকার আলু।’ জ্ঞান দেয়ার ভঙ্গিতে বলল কোয়াটার মাস্টার। ‘ গতবার জ্যামাইকায় নেমে কয়েক টন আলু কিনেছিলাম বুদ্ধি করে। নইলে খাবারে টান এই মাসে।’
‘ জাহাজে খাবারে টান পরে নাকি ?’
‘ পরে তো।’ লজ্জিত গলায় বলল কোয়াটার মাস্টার। ‘ মাঝে মাঝে মাসের পর মাস বন্দরে জাহাজ ভিড়াতে পারি না। তখন ।
‘ সমস্যা কি ?’
‘ রয়্যাল নেভির লোকজন জাহাজ নিয়ে আমাদের ধরার জন্য সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ায় তো।’
‘ রয়্যাল নেভি মানে ইংল্যান্ডের নৌ - বাহিনির জাহাজ ?’
‘ তবে আর বলছি কি ? গত বার তো টানা ছয় মাস কোন বন্দরে জাহাজ ভিড়াতে পারিনি। খাবারের সব স্টক শেষ হয়ে গিয়েছিল। না খেয়ে মরেই যেতাম। শুধু আমাদের এক সঙ্গী, ওর নাম জো। ও ব্যাট্যাঁ পুরানো লবণ ...।’
‘ পুরানো লবণ মানে ?’
‘ এটা হল জলদস্যুদের ভাষা । পুরানো লবণ মানে পুরানো নাবিক বা পুরানো জলদস্যু । ঐ জো তখন হারপুন দিয়ে তিমি মারত। টানা চার মাস আমরা লবণ দিয়ে তিমির মাংস খেয়েছিলাম।’
‘ খাবার যোগার হয় কি করে ?’
‘ বেশির ভাগ সময় অন্য জাহাজ লুট করার সময় খাবার পাই আমরা। অন্য জাহাজ থেকে বস্তা ভর্তি ময়দা, আলু, পিপে ভর্তি মদ তুলে নেই নিজেদের জাহাজে। কোন দ্বীপ পেলেও সেখানে জাহাজ থামাই। দেখি খাবার পাই কি না।’
‘ দ্বীপে খাবার পাওয়া যায় ?’
‘অভাব নেই। দ্বীপ মানেই তো খাবার। আনারস, তরমুজ, শালগম, কাঠ বাদাম, শিমের দানা, চুপড়ি আলু, রুটিফল । সৈকত থেকে ঝিনুক আর কাঁকড়া তুলে নেই। কচ্ছপের ডিম পাই। দক্ষিণ সাগরের দ্বীপে প্রচুর শুয়োর আর মুরগি আছে। ধরি। শুয়োর ফালি করে লবণ মাখিয়ে রেখে দিলে মেলা দিন চলে যায়। তবে পানির সমস্যা ঘনঘন হয় ।’
‘ কেন ?’
‘ পাবো কোথায় ?’ দুই হাত তুলে হতাশ একটা ভঙ্গী করে বলল কোয়াটার মাস্টার। ‘ চারিদিকেই তো নোনা পানি। বন্দরে বা দ্বীপে নামলে প্রথমেই চেষ্টা করি মাটির জালাগুলো মিষ্টি পানি দিয়ে ভরে ফেলতে। বৃষ্টি হলেও চেষ্টা করি । এক একটা জালার পানি তিন মাস পর্যন্ত ভাল থাকে। তারপর পানি পচে যায়। এই সব তো ইস্কুলে পড়ায় না। জানবে কি করে ? সবে মাত্র জাহাজে উঠে এসেছ। আস্তে আস্তে তুমিও পুরানো লবণ হয়ে যাবে।’
‘কিন্তু আমি যে বাড়ি ফিরে যেতে চাই।’
‘ ভুলেও ক্যাপ্টেনের সামনে ও কথা বলবে না।’ চোখ পাঁকালো মোটা । ‘ তাহলেই হয়েছে। একেবারে তক্তায় হাঁটাবে।’
‘ সে আবার কি ?’
‘ এটা জলদস্যুদের সবচেয়ে বড় শাস্তি। আমরা বলি- ওয়াক অন দ্যা প্ল্যাঙ্ক । জাহাজের ডেকে একটা তক্তা ফিট করা হয়। তক্তার শেষ মাথা থাকে খোলা সাগরের দিকে। চোখ আর হাত বেঁধে বলা হয়- তক্তার উপর দিয়ে সোজা সামনের দিকে হেঁটে যাও। না গেলে পিছন থেকে ড্যাগার বা তলোয়ারের ডগা দিয়ে একটার পর একটা খোঁচা দেয়া হতে থাকে।বেচারা বাধ্য হয়ে সামনের দিকে হেঁটে যায়।’
‘ বলেন কি এ তো ঠাণ্ডা মাথায় খুন !’
‘ না, খুন শব্দটা ব্যবহার করা ঠিক হবে না। এটাকে আমরা বলি মাছের খাবার। আমরা মাছ খাই না ? তো মাছদের ও তো খাবার দেয়া দরকার , নাকি ? এইভাবেই দেই। কখনও কখনও জাহাজে বন্দি বেশি হয়ে গেলেও আমরা ওদের তক্তায় হাঁটিয়ে মাছের খাবার বানাই।’
‘ এ তো সাংঘাতিক !’
‘ আরে নাহ। জলদস্যুদের জাহাজের নিয়ম একটু ভিন্ন, এই আর কি । কিন্তু নিয়ম নিয়ম ই । নাহ মেলা বকবক করলাম তোমার সাথে। আমার অনেক কাজ পড়ে আছ। তুমি আলুর খোসা ছাড়ানো শুরু কর।’
কথা শেষ করে মাস্টার পানি ভর্তি দুটো বড় বড় টিনের বালতি ধরিয়ে দিল আমার হাতে। আলুর খোসা ছড়িয়ে যাতে সেই পানিতে ডুবিয়ে রাখি। তা না হলে খোসা ছাড়ানো মাত্র আলু কয়েকমুহূর্তে কালো হয়ে যাবে। দেখতে বিচ্ছিরি লাগে। খেতেও নাকি বিস্বাদ হয়। খোসা ছাড়ানোর জন্য পিচ্চিমত একটা চাকু ধরিয়ে দিল আমার হাতে। অমন বিচ্ছিরি চাকু আগে মাত্র একবার দেখেছি। সন্ধ্যে বেলায় মহল্লার মোড়ে গগন হাজরা ঘুগনি বিক্রি করতে আসে। উনার কাছে অমন বিচ্ছিরি চাকু দেখেছি। লেবু, মরিচ কাটে।
চাকু ধরিয়ে দিয়ে মাস্টার চলে গেল হন হন করে। বসে বসে আলুর খোসা ছাড়াতে লাগলাম। বাড়ির কথা ভাবছি। হায় হায়। আমাকে না পেলে কি অবস্থা হবে বাড়িতে ? নিশ্চয়ই সবাই খুব দুশ্চিন্তা করবে। প্রায় কেঁদেই ফেলতাম। তার আগেই শুটকো মত একটা লোক হাজির হল । মাথায় কাপড়ের টুপি । টুপিটা দেখতে পাউরুটির মত। গায়ে অ্যাপ্রন। হাতে ময়লা ন্যাকড়া। টুপি আর আপ্রনের নানান জায়গায় তেল আর মশলার দাগ। মনে হচ্ছে আধুনিক শিল্পীর আঁকা কোন অয়েল পেইন্টিং।
‘ কি হল তোমার ? জলদি আলুর খোসা ছিলে শেষ কর। দুপুরের খাবার রেডি করতে হবে আমাকে।জলদি জলদি কাজ শেষ না করলে শূয়রের ঠ্যাঙের কাছে গিয়ে নালিশ করব।’
লোকটার ধাতানি খেয়ে দ্রুত হাত চালালাম। অনুমান করলাম বাবুর্চি হবে। আসলেও তাই ছিল ।
‘ শূয়রের ঠ্যাং ?’ অবাক হলাম।
‘ অহ তুমি তো নতুন লবণ। তাই না ? ‘ মিহি একটা হাসি উপহার দিল বাবুর্চি। ‘ ক্যাপ্টেনের একটা পা তো কাঠের তাই না ? লেংড়া লোককে আমরা শূয়রের ঠ্যাং বলি।’
‘ জলদস্যুদের ভাষা কত বিচিত্র । একটা ডিকশনারি লেখা যাবে বোধ হয় ?’
‘ তা আর বলতে । জলদি কর। আমিও তোমার সাথে হাত মিলাচ্ছি। তবে শুধু এই বেলা। পরের বার থেকে নিজেরটা নিজেই করবে । নইলে শূয়রের ঠ্যাং তোমার উপর নয় লেজের বিড়াল ব্যবহার করবে।’
‘ হায় হায়। ওটা আবার কি ?’
‘ চাবুক। জলদস্যুদের ভাষা। কিছু শব্দ শিখে রাখ। কাজে লাগবে। যেমন- বারবি কোস্ট মানে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল। বিলগি র্যাট মানে ভাঁড়ার ঘর আর বাতিল কেবিনের ইঁদুর। তবে ওটা আসলে একটা গালি। ভুলেও কাউকে বিলগি র্যাট বলবে না। বিল্লি না কিন্তু বিলগি।’
‘ মনে থাকবে।’
‘কনভয় মানে দলবন্ধ জাহাজের সাড়ি। ক্রো নেস্ত মানে কাকের বাসা। ওটা জাহাজের মস্তুলের উপর একটা মাচার মত জায়গা। ওখানে দিনরাত চব্বিশ না ছাব্বিশ ঘণ্টা যেন সারাক্ষণ কেউ না কেউ পালা করে পাহারা দেয়।দূর দিগন্তের দিকে চেয়ে থাকে।’
‘ কি খেয়াল রাখে ওরা ?’
‘ শত্রুপক্ষের জাহাজ। দুরের দ্বীপ। দিগন্তের কাছে জমে থাকা ঝড়। ডুবো পাহাড়। সব । দ্বীপ পেলে ভাল লাগে। দ্বীপ মানেই নতুন ঘাঁটি। নির্জন জনমানববিহীন দ্বীপ হলে আরও ভাল। ঘাঁটি বানাতে পারি। মানে আস্তানা। গোপনে জাহাজ মেরামত করতে পারি। মাটিতে হাঁটাহাঁটি করতে পারি। যাই হোক, পিসেস অভ এইট মানে, স্প্যানিশ রূপার মুদ্রা। ডেভি জোন্স লকার মানে সমুদ্রের তলা। ধর কোন বাতিল জিনিস সমুদ্রে ফেলে দিতে হবে তখন আমরা বলি ডেভি জোন্স লকারে রেখে দাও তো।’
‘ দারুন তো।’
‘ আরও আছে তিনপর্দা বাতাস মানে মাতাল নাবিক বা মাতাল জলদস্যু। মরা মানুষ গল্প করে না, মানে ঐ লোকটাকে মেরে ফেলতে হবে।’
বাবুর্চি সাহেব বকবক করে যেতেই লাগল। যেতেই লাগল। তবে সেই সাথে হাত চালাতে লাগলাম দুইজনেই। বাড়িতে আলুর খোসা ছাড়ানোর মত কাজ টাজ করিনি। মহল্লার মোড়ের দোকান থেকে বেশি হলে এক হালি ডিম কিনে এনেছি। ভাল কথা, আলুর খোসা ছাড়ানো শেষ করেই আমরা বালতির জলে ভিজিয়ে রেখেছি। কাজ শেষ হতেই বালতি ভর্তি আলু নিয়ে কিচেনে গেলাম।
কিচেনের অবস্থা খুবই খারাপ। খুব, খুব , খবু খারাপ। সব দেয়াল কালো। কিচেনের ছাদে মাংসের ঝোল গেল কি করে উপরওয়ালাই জানেন। একগাদা লোক কাজ করছে ভেতরে । সবাই ব্যস্ত। । গাট্টাগোঁটটা দুইজনকে দেখলাম কাঠের বৈঠার মত লম্বা তক্তা দিয়ে পেল্লাই সাইজের আস্ত রুটি গুঁজে দিচ্ছে তন্দুরির ভেতরে। ডালিমের দানার মত কয়লা জ্বলজ্বল করছে ওখানে। ব্রনটোসরাসের সাইজের দুটো আস্ত শূয়র ঝলসানো হচ্ছে। বড় একটা গ্রিলে নাম না জানা কতগুলো সামুদ্রিক মাছ ঝলসানো হচ্ছে। চনমন করা দারুন একটা ঘ্রাণ ভেসে আসছে ওখান থেকে।
একজনকে দেখি মেরুন রঙের বড় বড় আপেল কাটছে ফালি ফালি করে। বাবুর্চির কাছে জানতে পারলাম লোকটা নাকি আপেল দিয়ে দারুন হালুয়া আর কেক বানাতে পারে। শুনে লোভ হল। আমাকেও নিশ্চয়ই দেবে? লোভ সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করে ফেললাম।
যার পর নাই অবাক হল বাবুর্চি। আমাকে আশ্বাস দিয়ে বলল- খাবার আর মদের ব্যাপারে কোন বাঁধা ধরা নিয়ম নেই। সবার জন্য সমান বা যার যত দরকার। যে যত খেতে পারে। কোন না নেই। ইচ্ছেমত গানডে পিণ্ডে খাও। সবার জন্য একই খাবার। কোন ফাস্ট ক্লাস বা সেকেন্ড ক্লাস নেই। তবে লুটপাটের মাল বণ্টনের নিয়ম আছে।এখানেও সবাই সমান ভাগ পাবে। তবে ক্যাপ্টেন আর কোয়াটার মাস্টার এক ভাগ বেশি পাবে। আর দলের মধ্যে যারা অন্ধ, লেংড়া বা কানা তারাও এক ভাগ বেশি পাবে।
নিয়মটা শুনে বেশ ভাল লাগল।
রান্নার কাজ চলছেই। হিন্দুরা পুজার সময় যেমন পুজার চেয়ে রান্নার বা ভোগ দেয়ার কাজে বেশি ব্যস্ত থাকে , তেমনই। আমাকে দেয়া হল আলু বেকড করার কাজ। ইহ জিন্দেগীতেও করিনি। তবে মোটেও কঠিন কিছু না। বাবুর্চি সাহেব দেখিয়ে দিল । আস্ত আলুগুলোকে কাঁটা চামচ দিয়ে কেঁচে নিতে হল ইচ্ছামত। বড় একটা টিনের পাত্রে আলু রেখে জলপাই তেল মাখান হল ইচ্ছামত। সাথে একটু লবণ । পাত্রটা ঢুকিয়ে দিলাম আভেনের ভেতরে।
জলদস্যুদের জাহাজে কাজের অভাব নেই। কাজ, কাজ আর কাজ। মোট বেয়াল্লিশ জন ক্রু আছি এই মুহূর্তে। আমাকে নিয়ে তেতাল্লিশ জন। জলদস্যুদের জাহাজে যত লোক থাকে ততই নাকি ভাল। ম্যান পাওয়ার না জনশক্তি কি বলে, সেটাই। সবাই কাজ করছে। বালতি ভর্তি পানি আর সাবানের দলা দিয়ে জাহাজের পাটাতন পরিষ্কার করছে দুইতিন জন। মোটা সূই- সুতা দিয়ে পাল সেলাই করছে কয়েকজন ভয়াল চেহারার জলদস্যু। তলোয়ারে ধার দিচ্ছে কেউ কেউ। পিস্তল আর মাসকট (পুরানো দিনের গাদা বন্দুক) নিয়ে বসে আছে কয়েকজন। তেল মাখাচ্ছে। জাম্বুরার মত বড় কিন্তু কালো কামানের গোলা , সেগুলো ও সাজিয়ে রাখছে কয়েকজন।
জলদস্যু জাহাজের এটাও একটা নিয়ম। সব সময় তৈরি থাকতে হয় । কখন মালবাহি জাহাজ দেখা যাবে কেউ জানে না। কখন রয়্যাল নেভির জাহাজ তেড়ে এসে আক্রমণ করে বসবে কেউ জানে না। অথবা ঝড় ।সমুদ্রের ঝড়ের নাকি কোন আগামাথা নেই। আগাম কোন নোটিশ না দিয়ে হঠাৎ করেই শুরু হয় এইসব ঝড়। এক একটা ঢেউ নাকি দশতলা দালানের সমান বড় হয়।
জাহাজে কোন ঘড়ি নেই। ক্যাপ্টেন পাইন্টের কোটের পকেটে শুধু একটা ট্যাগ ঘড়ি আছে। গোলমত। পিতলের তৈরি। উপরে ঢাকনা। সময় দেখে ঢাকনা বন্ধ করে দিতে পারে। তবে কিচেনে আর ডাইনিং রুমে বালি ঘড়ি দিয়ে সময় দেখা হয়। বালিঘড়িগুলো সুন্দর। বাংলা সংখ্যা ৪ এর মত দেখতে। কাচের তৈরি। ভেতরে বালি ভর্তি। উপুর করে দিলেই উপরের গোল অংশ থেকে মিহি সোনালি বালি নীচের অংশে ঝুরঝুর করে পড়তে থাকে। মোট এক ঘণ্টা সময় লাগে সব বালি খসে পড়তে।
রান্না শেষ হতেই ডাইনিং রুমে যেতে হল। জাহাজের সব চেয়ে বড় কামরাটাই ডাইনিঙ রুম। পিচ্চি পিচ্চি টেবিল। চারজন করে বসা যায়। দিলখুশ বিরিয়ানি হাউজের মত। টেবিলের উপর টেবিল ক্লথের কোন বালাই নেই। সাথে খটখটে চেয়ার। অনেকেই খালি মদের পিপের উপর বসে খাওয়া দাওয়া করছে। ডাইনিং রুমেই জাহাজের একমাত্র বার। একটা বুড়ো বারটা দেখাশোনা করে। বুড়োর বয়স কত হবে বলা মুশকিল। একশো দেড়শো হলেও অবাক হব না। চোখে চশমা। বোতলের তলার মত মোটা চশমার কাচ।
যে চাইছে তাকেই টিনের মগ ভর্তি করে রাম দেয়া হচ্ছে। বারের চারিদিকে শুধু বড় বড় রাম ভর্তি পিপে। সবাই রাম গিলছে।
এক পাশে তাক ভর্তি বড় বড় টিনের থালা। সবাই একটা করে থালা নিয়ে খেতে বসেছে। সবার নিজের নিজের ছুরি, চামচ আর কাঁটা চামচ আছে। দুই একজন আবার শখ করে ছুরি কাঁটা চামচে নিজের নাম খোদাই করে রেখেছে। অনেকে খাওয়া শেষ করে ছুরি কাঁটা চামচ ধুয়ে কোটের পকেটে রেখে দেয়।
খাওয়ার আয়োজন প্রচুর।
তবে সবাই এক সাথে খেতে বসে না। শিফট করে বসে। বাদবাকি লোক যার যার কাজ করে। ক্রো নেসটে একজন থাকতেই হয় । যারা কামানের গোলা ছুড়ে যাদের বলা হয় গানার মানে গোলন্দাজ। ওদেরও কয়েকজনকে তৈরি থাকতে হয় ।
প্রথম ব্যাচেই খেতে বসে গেলাম। কারন আমি নতুন লবণ। কি কি রান্না হয়েছে তা তোঁ কিচেনেই দেখেছি। লাগাতার অঢেল খাবার আসতেই থাকলো কিচেন থেকে। শূয়রের রোস্ট আর ঝলসানো সামুদ্রিক মাছের কথা আগেই বলেছি। মাছের সাথে কমলা রঙের কিসের সস। পুদিনা পাতার ঘ্রান ।আভেন বেকড করা আলু , সেগুলোর উপর সুগন্ধি লতাগুল্ম দেয়া। বাদামি রঙের বড় বড় পাউরুটি । বাউল ভর্তি হলুদ মাখন। কমলা রঙের পনীর। আপেলের হালুয়া। কচি পালং পাতার সালাদ। লাল রঙের বড় বড় গলদা চিংড়ি। চীনেমাটির তশতরি ভর্তি ঝিনুক। সাথেই ফালি করা হলুদ, সবুজ লেবু।
শুরু হল খাওয়া।
আবিস্কার করলাম, প্রত্যেকটা লোক পশুর মত খায়। আসলে পশুর মত বললে ঠিক বোঝান যাবে না। বিয়ে বাড়িতে গিয়ে লোকজন যেমন করে খায় তেমন করে খাচ্ছে জলদস্যুরা। ইচ্ছেমত মত খাচ্ছে। উপবাস ছিল নাকি ওরা ? সাথে মগ ভর্তি রাম।
আমার পাশেই অল্প বয়সী একটা জাহাজি বসে ছিল। ওদের বলে মেট। ফাই ফরমায়েশ খাটে ওরা।
‘ খাওয়া দাওয়ার আয়োজন কি রোজই এমন থাকে নাকি ?’ জানতে চাইলাম। আমার হাতে বাউল ভর্তি আপেলের হালুয়া।
‘ আরে নাহ।’ বিরক্ত হয়ে মুখ বাকিয়ে বলল মেট । ‘ গত পরশু দিন একটা জাহাজ লুট করেছি। তাই এত চর্বি আমাদের। এত এত খাবার সেইজন্য। কোন বন্দর ছেড়ে আসলে বা জাহাজ লুট করলে খাবারের স্টক বেড়ে যায়। স্টক বেড়ে গেলে সবাই মিলে কয়েকটা দিন গাণ্ডে পিণ্ডে খাই আরকি। তারপর তো খাওয়া কমতে থাকে।’
‘ কেন ?’
‘কেন আবার , স্টক কমছে না। পনীর, মাখন,সবজী , ডিম দ্রুত নষ্ট হয়। ওগুলো আগে খেয়ে ফেলি। যেমন- আজকে দেখ কচি পালং পাতার সালাদ আর আপেলের হালুয়া পেয়েছ। পালং পাতা দুইতিন দিনের বেশি টাটকা থাকে না । তাও আবার ভিজে তোয়ালে দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। প্রথমেই শাক সবজি শেষ করি। আপেলও বেশি দিন ভাল থাকে না। দ্রুত হলুদ থেকে বাদামি তারপর বাদামি থেকে কালো হয়ে পচে যায়। যেই ক্যদিন জাহাজে ঝুড়ি ভর্তি আপেল থাকে ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক আপেলের পিঠা বা হালুয়া খেতে হয়। সে এক বিরক্তকর অবস্থা।’
চেহারাটা হাঁড়িচাচা পাখির মত করে বলল মেট।
‘ তারপর ?’ জানতে চাইলাম।
‘ কি তারপর ?’
‘ মানে খাবার শেষ হয়ে গেল, তারপর ?’
‘তারপর সেই ফালতু খাবার। লবণে মাখান মাংস। শুকনো বিস্কুট, বেকন ভাঁজা, লবণ মাখা মাছ খেতে হয় দিনের পর দিন বা রাতের পর রাত। এক সময় সেই নোনা মাছ, মাংস আর বিস্কুট ও শেষ হয়ে যাবে। তখন হাড্ডির স্যুপ খেতে হবে।’
‘ হাড্ডির স্যুপ ? জিনিসটা কি ?’
‘ জিনিসটা আর কিছুই না, প্রত্যেকবার কাছিম খাওয়া হলে ওর খোলসটা জমাই আমরা। জাহাজে খাবারের স্টক শেষ হয়ে গেলে সেই কাছিমের খোলসগুলো গরম পানিতে সেদ্ধ করি অনেক সময় নিয়ে। সেই সেদ্ধ পানিতে লবণ আর গোল মরিচের গুড়া দিয়ে গরম গরম খায়। ওটাই হাড্ডির স্যুপ।’
‘ ভাল লাগে ?’ অবাক হলাম।
‘ আরে খিদে পেলে বাঘেও টম্যাটোর সালাদ খায় । হাঙরও সাগর কলা খায় ।’ বিরক্ত হয়ে বলল মেট। মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে আউ আউ করে কি যেন বলল ঠিক বুঝতে পারলাম না।
আমিও আর কথা না বাড়িয়ে খাওয়া শুরু করলাম। যা বুঝতে পারলাম তা হচ্ছে, থাকতে খেয়ে নেয়া ভাল। কখন খাবারে টান পড়বে কেউ জানে না।
খেলাম ইচ্ছামত ।
খাওয়া শেষ হতেই এঁটো বাসন কাঠের একটা গামলায় ভিজিয়ে রাখলাম, গামলা ভর্তি সাবান গোলা গরম পানি । মিনিট কুড়ি ভেজান থাকলে ন্যাকড়া দিয়ে ডলা দিলেই বাসন পরিষ্কার।
খাবার সময় প্রচুর হল্লা করে জলদস্যুরা। কথা বলে প্রচুর। বিচ্ছিরি সুরে গান গায়। গানের কথাগুলোর কোন আগামাথা নেই । রেডিও ধনিয়া বা রাত জাগা কাক মার্কা রেডিওতে অমন ফালতু গান শোনা যায়। একটা গান অমন-
‘ জনম আমার ধন্য হল জলদস্যু হতে পেরে।
লুটছি সম্পদ শত্রুকে মেরে।
নিন্দুকের মুখে দিয়ে ছাই।
আমরা সবাই রাম খাই।’
এটা কোন গান হল ? ছি। শেষের লাইনটা যখন সবাই চিৎকার করে গায় তখন মনে হয় ডাইনিং রুমের সব জানালার গোল কাচগুলো ভেঙ্গে যাবে। বারের সাজানো বোতলগুলো ঠন ঠন করে কাঁপতে থাকে।
সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল আমার শিফট।
থাকার জন্য একটা কেবিন দেয়া হল আমাকে। ছোট্ট একটা কেবিন। চারজনে থাকে। কাঠের দোতলা বিছানা। বালিশটা সিমেন্টের বস্তা ভেবেছিলাম। কম্বলটা মনে হল গরুর চামড়া। ভারি। দূগন্ধ ।
‘কত দিন কম্বল কাঁচা হয়নি ?’ দম আঁটকে মারা যেতে যেতে পাশের বিছায় শুয়ে থাকা মেটকে প্রশ্ন করলাম।
‘ বছর খানেক হবে।’ নির্লিপ্ত ভাবে জবাব দিল মেট। হাতে একটা পঞ্জিকা। সমুদ্রে জোয়ার ভাঁটা আর অমাবস্যা পূর্ণিমা কবে হবে সেই সব লেখা আছে পঞ্জিকায়।
‘ এক ব-ছ- র ?’ পিলে চমকে গেল আমার। ‘ আগে কে ঘুমাত এই বিছানায় ?’
‘ নিকলাস নামে এক মেট থাকতো।’ নির্লিপ্ত ভাবে বলল পঞ্জিকার পাঠক। ‘ গত বছর আমরা পনাপে দ্বীপে নেমেছিলাম। ওখানেই ধরা পড়েছিল নিকলাস। দবিপের গভর্নর ওকে ফাঁসিতে লটকে দিয়েছে।’
‘ ধরা পড়লেই ফাঁসি ?’
‘ ওটাই জনপ্রিয় শাস্তি।’ গম্ভীর গলায় বলল পাঠক। ‘ ধরা পড়া মাত্র ঝোলানো হবে। কোন কথা চলবে না। তুমি পিচ্চি বলে পাড় পাবে না। ফাঁসি দিয়ে লটকে রাখবে যাতে সবাই দেখে শিক্ষা পায়।’
‘ তাহলে সারাজীবন কি আমরা শুধু জাহাজে করেই ভেসে বেড়াব ?’
‘ এছাড়া তোঁ কোন উপায় নেই পিচ্চি মেট। জাহাজে থাকবে, লুটপাট করবে। ক্যারাবিয়ান দ্বীপে নামলে মস্তি করবে, কতগুলো ক্যারাবিয়ান দ্বীপ আছে যেখানে আমরা স্বাধীন। জলদস্যু বৈধ একটা পেশা ওখানে। কেউ বাঁধা দেয় না। জলদস্যুদের স্বর্গরাজ্য বলতে পার। ওখানেই জলদসুরা যায়। মদ খায়। ফুর্তি করে। দুই হাতে টাকা পয়সা খরচ করে ফেলে। ’
‘ টাকা পয়সা জমায় না ?’
‘ জমিয়ে কি হবে ? যে কোন মুহূর্তে রয়্যাল নেভির লোক আমাদের ধরে ফেলতে পারে। ঝড়ে জাহাজ ডুবে যেতে পারে যে কোন সময় । শত্রুপক্ষের গোলার আঘাতে জাহাজ উড়ে যেতে পারে। কোন ভরসা নেই। তাই জলদস্যুদের নীতি হল, খাও- দাও আর ফুর্তি কর।’
‘ কিন্তু আমি যে শুনেছি জলদস্যুরা সারাজীবন ধন সম্পদ লুট করে নির্জন দ্বীপে লুকিয়ে রাখে।’
‘ কথাটা খানিকটা সত্য। তবে পুরোপুরি সত্যি না। যেমন ধর ক্যাপ্টেন কিড আর ফ্রাঙ্ক ড্রেকের গুপ্তধনের কথা কে না জানে। কোথাও না কোথাও উনাদের গুপ্তধন লুকানো আছে। ঘটনা সত্যি। অমন দু চারটে উদাহরণ যে নেই তা নয়। তারপরও বেশির ভাগ জলদস্যু গুপ্তধন লুকিয়ে রাখা পছন্দ করে না। কারন কথায় আছে- আজ মরলে কাল দুইদিন। যাক মেলা বকবক করলাম তোমার সাথে। এখন যাই জাহাজের আসল রুম থেকে ঘুরে আসি।’
‘ আসল রুম কোনটা ?’
‘ টয়লেট । ওটাকে আসল রুম বলি আমরা। দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা সিরিয়াল লেগেই আছে।’ কথা শেষ করেই মেট পঞ্জিকা ছুড়ে ফেলে দিয়ে কেমন অস্থির ভাবে দৌড় দিল।
কম্বল ছাড়াই শুয়ে পড়লাম। ক্লান্তি লাগছে বেশ।
বাইরে অন্ধকার। সমুদ্রের রঙ আলকাতরার মত । জাহাজে মাত্র দুই তিনটে কাচের লণ্ঠন ঝুলছে। বেশি আলো জ্বালানো নিষেধ। বহু দূর থেকে সেই টিমটিমে আলো দেখে ফেলতে পারে অন্য জাহাজের লোকজন। সেটা মোটেও ভাল খবর না।
রাত আটটার সময় রাতের খাবারের জন্য ডাক পড়লো।
জলদস্যুদের জাহাজে কিছু নিয়ম আছে। সবাইকে সেই নিয়ম মেনে চলতে হয়। যেমন-
১। তাস খেলা যাবে না। সাধারণত তাস খেলতে গিয়েই বড় বড় ঝগড়া শুরু হয়।
২। নিজেদের মধ্যে লড়াই করা যাবে না।
৩। যার যার অস্ত্র সব সময় তৈরি রাখতে হবে। ঘুমানোর সময় বা পায়খানায় গেলেও সাথে অস্ত্র রাখতে হবে।
৪। যে কোন সিধান্ত নেয়ার আগে ভোট নেয়া হবে। সবাইকে ভোট দিতে হবে।
৫। জাহাজে কখনই মেয়ে মানুষ তোলা যাবে না। কারন মেয়ে মানুষ মাত্রই অশুভ। জাহাজে মেয়ে থাকে সেই জাহাজ ঝড়ের মুখে পড়বেই। আর তাতে সবারই সলীল সামধি হবে।
৬। আসল নামে কাউকে ডাকা যাবে না। উপাধি বা খেতাব ধরে ডাকতে হবে।
৭। আইন কানুন হঠাৎ হঠাৎ বদলাতে হতে পারে। আপত্তি চলবে না। ভোট নেয়া হবে আবার।
আইনের সংখ্যা প্রচুর। তবে এই কয়টা দরকারি । মোটামুটি আইন কানুন জানার পর ভাল লাগল । বেশ স্বস্তি পেলাম। যাক বাবা তেমন ভয়ংকর কোন জায়গা না। অনেকটা বোডিঙ ইসকুলের মতই যেন। ততক্ষণে আমার মন খারাপ অনেকটাই কমে এসেছে। জলদস্যুদের জাহাজ খারাপ কি ? রোজ রোজ ইস্কুলে যাবার চেয়ে অনেক ভাল তোঁ।
বাড়িতে আমাকে না পেয়ে ওদের মন খারাপ হবে সত্যি। কিন্তু ওদের শিক্ষা দেয়ার দরকার ছিল। মনে মনে বেশ শান্তি পেলাম। বড় জেঠু বহু কাজ করিয়েছে আমাকে দিয়ে। বাবা বকাঝকা করতো। পড়াশুনা পড়াশুনা করে মা-ও মাথার ঘিলু খেয়ে ফেলত।
রাতের বেলায় নতুন কিছু খাবার দেয়া হল না। দুপুরের খাবারই নতুন করে গরম করে দেয়া হল। এটাই নিয়ম। দুইবেলা খাবার রান্না হয় না। যদি না খাবারের টান পড়ে।
মোটামুটি সবার সাথেই পরিচয় হয়ে গেল। সবাই মদ গিলছে। জলদস্যুরা সব সময় মদ গেলে। জাহাজ চালানোর সময় মদ গিলে। খাওয়ার সময় মদ গিলে। আড্ডা দেয়ার সময় মদ গিলে। মদ্দা কথা ঘুমানোর সময় ছাড়া সব সময় মদ গিলে ওরা।
জলদস্যুদের পতাকাটাকে বলে- জলি রোজার ফ্ল্যাগ। কালো কাপড়ের উপর সাদা এক জোড়া হাড় ক্রস করে রাখা। মাঝে সাদা ধপধপে খুলিটা দাঁত বের করে হাসতে থাকে বিপিনের দাদুর মত। স্প্যানিশ জলদস্যুরা প্রথম দিকে কালো কাপড়ের উপর আস্ত কঙ্কালের ছবি আঁকত। পরে দেখে আস্ত কঙ্কালের ছবি আঁকা বেশ কষ্টকর আবার সময়সাপেক্ষ । পরে শুধু এই দুই হাড্ডি আর আমার বন্ধু বিপিনের দাদুর মত দেখতে খুলি ব্যবহার শুরু হয়েছে।
কবে থেকে সাগরের বুকে জলদস্যুদের উৎপাত শুরু হয়েছিল ?
নাহ, কেউ বলতে পারবে না। তবে এই পাইরেটগিরি খুবই পুরানো এক পেশা। বোম্বাই জলদস্যু। চিনা সাগরের জলদস্যু। ক্যারাবিয়ান জলদস্যু। দক্ষিণ সাগরের জলদস্যু। স্প্যানিশ জলদস্যু। অভাব নেই।
এখন কথা হল জলদস্যুদের মধ্যে তোতাপাখি পোষার প্রবণতা এত বেশি কেন ?
অনেকগুলো কারন আছে।
মূলত জাহাজের ক্যাপ্টেন নিজের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য একটা কথা বলা তোতাপাখি নিজের কাঁধে বসিয়ে রাখতে পছন্দ করে। একা থাকার সময় পাখিটা কথা বললে তার মন ভাল হয়ে যায়। একঘেয়েমিতে ভোগার কোন সুযোগ থাকে না।
ক্যারাবিয়ান দ্বীপগুলোতে প্রচুর তোতাপাখি আর কাকাতুয়া মার্কা পাখি পাওয়া যায়। মোট ৩০০ জাতের তোতাপাখি আছে সারা দুনিয়ায়। লম্বায় ৩ ইঞ্চি থেকে ৩৩ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। শুনেছি দক্ষিণ আমেরিকার তোতাপাখিগুলো ৩০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। কাজেই কোন এক জলদস্যু মারা গেলে তার তোতাপাখির মালিক অন্য এক জলদস্যু হয়ে যায়।
পুরো সন্ধ্যাটা ডাইনিং রুমেই বসে রইলাম।
দেখার মত কিছু নেই। সবাই মদ গিলছে।গ্লাস বা মগ ভর্তি বিয়ার নিয়ে এক ঢোকে গিলে ফেলা হয়। এঁকে বলে বটম আপ। বাজি ধরে মদ গেলা হচ্ছে। কে কত গিলতে পারে। রাম , লেবুর রস আর দারুচিনি মিশিয়ে অদ্ভুত রকমের একটা ককটেল বানায় ওরা। নাম- বুম্বু ( Bubo) । গুগ (Goog) নামে একটা ককটেল দারুন প্রিয় ওদের। মিক্সটা হল- আধা কাপ রামের সাথে ২ ক্যান বিয়ার। সাথে সামান্য ওটমিল, পাপরিকা আর দারুচিনির গুঁড়া। পাপরিকা জিনিসটা আর কিছুই না শুকনো ক্যাপসিকামের গুঁড়া।
আজকাল দুনিয়ার নাম করা বারগুলোতে যে সব ককটেল বিক্রি হয় তার মধ্যে অনেকগুলোই জলদস্যুরা আবিস্কার করেছিল। যেমন- ডাইকিরি (Daiquiri ) , বারবি কোস্ট , ডার্ক অ্যান্ড স্তমি, ফগ কাটার, ডার্ক মুন, ট্রপিক্যাল স্তরম।
অপূর্ব সব পানীয়। বেশির ভাগই আনারস বা নারকেলের সাথে পুদিনা পাতা আর লেবুর মিকচার। দুনিয়ার প্রথম বারটেন্ডার আমাদের এই জলদস্যুরা। ককটেল আর নোনতা মাংস ওদের কালচার।
জলদস্যুরা সাদা রঙের যে ঢোলা জামা পরে ওটাকে বলে পোয়েট সার্ট বা কবিদের জামা। আগের দিনে কবিগন নাকি অমন জামা পড়তো। কোথায় কবি আর কোথায় ডাকাত। কি কাণ্ড। পাইরেট ব্লাউজ ও বলে। হায়। হায়।
মাথায় ওরা কাপড়ের ব্যান্দানা বাঁধবেই। যাতে ঘাম গিয়ে চোখে মুখে না পরে।
জলদস্যুদের জাহাজে একজন ডাক্তার থাকবেই।
উপায় নেই। জাহাজে কেউ না কেউ অসুস্থ থাকবেন। তবে মোটামুটি তিনটে অসুখে ভুগে ওরা টপাটপ মরে যায়।
১। স্কার্ভি
২। ইয়েলো ফিভার
৩। গ্রাংগ্রিন
স্কার্ভি হয় ভিটামিন সি - এর অভাবে। দিনের পর দিন এই ফচকে জলদস্যুরা টাটকা শাক সবজি খায় না। কাজেই খুব সহজেই স্কার্ভি রগে আক্রান্ত হয়ে দাঁত পরে চোখ নষ্ট হয়ে ভুগতে ভুগতে ভবলীলা সাঙ্গলীলা হয়ে যায়।
ইয়েলো ফিভারকে পীত জ্বর বলে। আগের দিনের মানুষ মনে করতো জাহাজীদের এই রোগ হবেই হবে। মশার কামড়, দূষিত পানি এই সব হাবিজাবি কারনে হলুদ জ্বর রোগটা হয়। জ্বরে ভুগতে ভুগতে মারা যায় জাহাজি।
গ্রাংগ্রিন হয় নানান কারনে। লড়াই করতে গিয়ে বা দুর্ঘটনায় পড়ে হাত পা কেটে যায় অনেক সময়। ক্ষতস্থান ভাল করে পরিষ্কার না করে ব্যান্ডেজ ফেন্দেজ করলে জায়গাটা বিষিসে যায়। আস্তে আস্তে পচতে থাকে। পচা গন্ধে বেচারা নিজেই
বন্ধ কেবিনের ভেতরে থাকতে পারে না। যন্ত্রণা তো আছেই।
তখন পুরানো লবণেরা মিলে ঠিক করে ওকে মাছের খাবার বানান হবে।
ব্যাপারটা শুনতে খারাপ মনে হলেও উপায় নেই। যন্ত্রণা পেয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মাছের খাবার বানানোই ভাল।
আমাদের ক্যাপ্টেন পাইন্ট মানুষ হিসাবে ভাল। ক্যাপ্টেনের আসল নাম আমরা কেউ জানি না। জলদস্যুদের আসল নাম হারিয়ে যায় সব সময়। কিম্ভুত সব নাম রাখতে পছন্দ করে ওরা। এক পাইন্ট রাম এক ঢোকে গিলে ফেলতে পারত আমাদের ক্যাপ্টেন, সেই থেকে উনার নাম ক্যাপ্টেন পাইন্ট।
ক্যাপ্টেন পাইন্ট বেশির ভাগ সময় নিজের কেবিনে বসে থাকে। রাজ্যের সব ম্যাপ দেখে খুঁটিয়ে। বেশির ভাগ সমুদ্র নাকি ক্যাপ্টেনের মুখস্থ। তারপরও দেখে। সাগরের রহস্যের নাকি শেষ নেই। সাগরের একটা এলাকায় নাকি বাতাস একদম শান্ত থাকে। পালতোলা জাহাজ থমকে যায়। যেতে পারে না। অনেক আগে নাকি ঘোড়া নিয়ে এক জাহাজ যাচ্ছিল। এই এলাকায় এসে থমকে গিয়েছিল তাদের জাহাজ। জাহাজের নাবিকেরা তাদের সব ঘোড়া ফেলে দিয়েছিল সমুদ্রে। সেই থেকে এই এলাকার নাম অশ্ব অক্ষাংশ বা অশ্বাক্ষ । খুব খারাপ জায়গা। রাতের বেলা সাগর থেকে ঘোড়ার চিঁহি ডাক আর খুড়ের শব্দ ভেসে আসে।
তো শুরু হল আমার জলদস্যু জীবন।
পরের কয়েকটা দিন স্বাভাবিক ভাবেই চলে গেল। রুটিন মোটামুটি একই। কোন বৈচিত্র নেই।
প্রচুর কাজ করতে হয়। আমার কাজ সকালের শিফটে ।সামনের মাস থেকে রাতের শিফটে কাজ করতে হবে। যদি আমরা ততদিন বেঁচে থাকি।
প্রথম কয়েক রাত ঘুমাতে পারলাম না ঠিক মত। সারাক্ষণ জাহাজেরর দুলুনিতে বিছানটা দোলনার মত দুলছিল। পর পর কয়েক সকাল বমি করলাম বেশ খানিক। পেটের ভেতর থেকে হর হর করে বের হয়ে এলো। গরমের দিনে শরবতের দোকানে ফালুদা বিক্রি করে এই রকম আরকি।
বমি করার পর শরীরটা দুর্বল লাগল।
আমাদের জাহাজে একজন ডাক্তার আছে। ভবানী বাবু। উনি আসলে ভারতবর্ষের লোক। কলিকট বন্দর থেকে আফ্রিকার কেপ টাউনে যাচ্ছিল উনাদের জাহাজ। তখন ক্যাপ্টেন পাইনট আক্রমণ করে বসেছিল। সব কিছু লুটপাট করে ডুবিয়ে দিয়েছিল জাহাজ। বন্দিদের সবাইকে আরব দাস ব্যবসায়ি মুস্তাফা ইবনে জলিলের কাছে সবাইকে বিক্রি করে দিয়েছিল পাইন্ট। ভবানী বাবু ডাক্তার জানার পর উনাকে রেখে দেয়া হয়েছিল। জাহাজে ডাক্তার থাকা খুবই ভাল।
ভবানী বাবু খুবই দারুন মানুষ। সারাক্ষণই সবার খোঁজ খবর রাখছেন। সবার সাথেই গুলতাপ্পি মারছেন। বই পড়ছেন। আর অচেনা কোন মাছ দেখতে পেলেই রঙ তুলি নিয়ে বসে পড়ছেন ছবি আঁকতে। মাছ তার প্রিয় বিষয়।
বমি করার পর আমার কেবিনে এসে দেখা করে গেছেন ভবানী বাবু। বললাম না অত্যন্ত ভাল মানুষ। আমাকে তেমন কোন ওষুধ দিলেন না। উনার কাছে অবশ্য ওষুধ নেই তেমন। তবে পথ্য দিলেন। বড় বড় সাগুর দানা ভিজিয়ে মিছরির জল দিয়ে খেতে দিলেন। সাথে লেবু হলে ভাল হত।
আগেই বলেছি লেবু নেই আমাদের জাহাজে।
আমার এই বমি এটা নাকি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। সি সিকনেস বলে। জাহাজে উঠলে সবারই নাকি অমনটা হয় প্রথম প্রথম। পরে ঠিক হয়ে যায়। মানে ঠিক হলেই পুরানো লবণ হয়ে যাব।
পাঁচ দিনের দিন আমার সি সিকনেস ভাল হয়ে গেল। আবিস্কার করলাম সমুদ্রের তাজা বাতাসে দারুন খিদে পায়। বাড়িতে তেমন কিছু খেতে চাইতাম না। আমার খাওয়া দাওয়া নিয়ে মা সারাক্ষণ রাগারাগি করতো। কিন্তু এখন তিনবেলায় সাপটে খাওয়া দাওয়া করছি। অবশ্য আজকাল বেশ খাটুনি করতে হচ্ছে।
রাত নয়টা পর্যন্ত ডাইনিঙ বা কিচেন খোলা থাকে। এর মধ্যে সবাইকে খেয়ে নিতে হয়। কিচেন বন্ধ হলেও ওখানের টেবিলের উপর দুই একজন মেট ঘুমিয়ে থাকে। কারো খিদে পেলে ঝুড়ি ভর্তি বাসি রুটি আছে। খেয়ে নেয়। বড় বড় ঝুড়ি ভর্তি লাল সবুজ আপেল আছে। খেয়ে নেয়। রাতের বেলাও একগাদা লোক জেগে থাকে। ঐ যে বললাম না সব সময় তৈরি থাকতে হয়।
টানা এক সপ্তাহ ভেসে চললাম আমরা।
এই এক সপ্তাহে লুট করার মত কোন জাহাজ পাইনি। স্রোতের অনুকুলে পাল তুলে ভেসে গেছি। শাক সবজি শেষ। লবণ দেয়া মাছ আর মাংস খাই শুধু। লেবু নেই। দাঁত শিরশির করে। মনে হয় বেরি বেরি রোগ হয়ে গেছে। তবে আমাদের ভাগ্য দারুন ভাল। ভারত মহাসাগরে পিচ্চি পিচ্চি অনেক দ্বীপ আছে। খালি। মানুষজন থাকে না। গাছপালায় ঠাসা। অমন একটা দ্বীপ পেয়ে গেলাম।
দূরে নোঙর করে ডিঙ্গি নিয়ে কয়েকজন গিয়ে দ্বীপে নামলো। আমাকে ওরা নিতে চাইছিল না। নতুন লবণেরা নাকি প্রথম কোথাও নামলেই ভেগে যেতে চায়। পাইনটের অনুমতি নিয়ে নামলাম। প্রচুর কলা আর আনারস গাছ ভর্তি। সব কলা আমরা গায়েব করে ফেললাম। কাঁচা বা পাকা কিছুই বাদ দিলাম না। সেলারে রেখে দিলেই হবে। আস্তে আস্তে পেকে হলুদ হয়ে যাবে। আমরা সিরিয়াল দিয়ে খাব। আনারসগুলোর ব্যাপারেও তাই।
আবিস্কার করলাম এক একটা আনারস মাত্র হাতের মুঠোর সমান বড় হয় । প্রায় গোল। ক্যাপ্টেন পাইন্ট জানাল, এইগুলো নাকি আসল আনারস। আপেলের সমান বড় হয় তাই ইংরেজিতে পাইনআপেল বলে।
লেবুগাছ পেলাম। সংখ্যায় কম। গাছে যত লেবু ছিল নিয়ে গাছগুলোকে ন্যাংটা বানিয়ে ফেললাম। সৈকত থেকে কয়েকটা পেল্লাই সাইজের কাছিম ধরা হল। এই এলাকার দ্বীপগুলোতে নাকি প্রচুর কাছিম থাকে। কয়েকজন মেট সৈকতের নরম বালি খুড়তে লাগল। খানিক খোঁড়ার পর পিচ্চি পিচ্চি সাদা ডিম বের হয়ে এলো। কচ্ছপের ডিম। ভেজা নরম বালিতে বেশির ভাগ সময় ডিম পাওয়া যায়। কচ্ছপের ডিমের অমলেট নাকি দারুন !
নারকেল গাছের কথা না বললে অন্যায় হয়ে যাবে। হাজারে বিজারে। এত নারকেল গাছ এক সাথে জীবনেও দেখিনি। হলুদ রঙের নারকেল আর টিয়াপাখি রঙের ডাব ভর্তি। সব নিয়ে নিলাম।
দলের এক মেট নাম ফারনান্দ । মজার একটা কথা জানালো সে। অনেক দ্বীপে নারকেল গাছে বানর থাকে। সেই বানরগুলোকে কয়েকটা পাথরের ঢিল মেরে খেপিয়ে দিলেই হল।বানরগুলো রাগের মাথায় প্রতিশোধ নিতে চায়। ওরাও ঢিলের বদলে পাটকেল হিসাবে নারকেল ব্যবহার করে । গাছ থেকে একটার পর একটা নারকেল ছিঁড়ে কামানের গোলার মত ছুড়ে মারে নীচে দাঁড়ানো জলদস্যুদের লক্ষ্য করে।
জলদস্যুরা নিরাপদ দূরত্বে দাড়িয়ে খ্যাক খ্যাক করে হাসে। নীচে এক সময় নারকেলের স্তূপ হয়ে যায়। গাছের নারকেল শেষ হয়ে গেলে বানরদের আর কিছু করার থাকে না। ওরা দাঁত মুখ খিচিয়ে ভ্যাঙ্গাতে থাকে। আর জলদস্যুরা বস্তা ভর্তি নারকেল নিয়ে চম্পট দেয়।
ভাল কথা দ্বীপে পাখি পেলাম প্রচুর। গুলি করে কিছু শিকার করা হল। বাকি সব তল্লাট ছেড়ে ভেগে গেল। জলাশয় বা ঝর্না পেলাম না। ভাগ্য ভাল গত দুইদিন আগে বেশ বৃষ্টি হয়েছিল। বৃষ্টির জল সব জ্বালা ভর্তি করে রেখেছিলাম। বুদ্ধি করে বৃষ্টির জলে স্নানও করে ফেলেছিলাম। ওটা বরাবর করা হয়। নিয়ম। এমনিতে টানা দশ বারো দিন স্নান না করেও থাকতে হয়। নোনা জলে স্নান করা যায় বটে। লাভ হয় না। জল শুকিয়ে গেলেই শরীরে সাদা মিহি লবণ দেখা যায়।
মাঝে মাঝে মনে হয় জলদস্যুদের জীবন আসলে ও তত মজার কিছু না। যেমন বৃষ্টির সময় আমাদের সবাইকে জাহাজের ডেকে দাড়িয়ে ন্যাংটা হয়ে স্নান করতে হল। ব্যাপারটা বিরক্তকর । তার উপর সাবান মাত্র একটা । সেটাই সবাই হাতে হাতে করে নিয়ে শরীরের নানান জায়গায় ঘষে মেজে ময়লা পরিষ্কার করছিল। আর এক এক জনের শরীর থেকে ময়লা উঠছিল দেখার মত।
ক্যাপ্টেন পাইন্ট দ্বীপটা ভাল করে ঘুরে দেখল। দ্বীপটা ঘাঁটি বানিয়ে লাভ হবে না। মিষ্টি জল নেই। এই রকম কোন দ্বীপে ঘাঁটি বানালে পরে বিপদ হতে পারে। কোন কারনে দ্বীপে বেশিদিন থাকতে হলে তখন দ্বীপটা বন্দীশালা হয়ে যাবে।
আমাদের যা যা দরকার ছিল বা বলা যায় যা যা দ্বীপে পেলাম সবই নিলাম। পালা করে সবাই দ্বীপে নেমে হাঁটা হাটি করল। মাটিতে নেমে হাঁটাহাঁটি করলে নাকি অনেক রোগ ভাল হয়ে যায়। পুরানো লবণ যারা তারাও স্বীকার করলো অনেক দিন জাহাজে থাকলে শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে। সময় এর সুযোগ পেলে মাটিতে হাঁটাহাঁটি করা ভাল।
ভবানী বাবু দ্বীপে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ভাল কোন লতাগুল্ম পেলেন না । গিমাশাক আর বাসকপাতা দরকার ছিল তার। পেলে নাকি উপকার হত। পাথরকুচি আর ঘৃতকুমারি পেলেন। পাথরকুচি পাতা থেঁতো করে লবণগোলা জলে খেলে নাকি আমাশয় ভাল হয়ে যায়। ভাবনীবাবুর ভাষায় দ্রুত আরোগ্য লাভ করে।
সেই রাত্রে দ্বীপে আগুনের বিরাট কুণ্ড জ্বালিয়ে উৎসব করা হল । এটাও জলদস্যুদের নিয়ম।
আস্ত এক শূয়রের পেটের ভেতরে বড় মোটা চাল, আলু, বাঁধাকপি, মটরসুটি, পাখির ডিম অমন বহু জিনিস ঠেসে ভরে কয়লার আগুনের ঝলসান হল। যখন খাওয়া শেষ হল তখন শূয়রের পেটের ভেতর থেকে বিরিয়ানির মত দারুন সব জিনিস বের হতে লাগল। হতেই লাগল।
সবাই গানডে পিণ্ডে খেলাম। সাথে রাম আর ডাবের জল। আগুনের পাশে বসে পিশাচের মত খেল সবাই। সাথে আড্ডা। এমনিতেই জলদস্যুরা প্রচুর কথা বলে।
আমাদের কোয়াটার মাস্টার বেশ রসিয়ে রসিয়ে ব্ল্যাক বিয়ার্ড গল্প বলল।
খুব নামকরা তিনজন জলদস্যু ছিল। ব্ল্যাক বিয়ার্ড, রেড বিয়ার্ড, আর হোয়াইট বিয়ার্ড । এদের তিনজনের গাল ভর্তি ছিল দাড়ি। দাড়ি তো না যেন দাড়ির দোকান। একজনের পাকা জামের মত কালো কুচকুচে দাড়ি, আরেকজনের ভাঁজা সেমাইয়ের মত লাল দাড়ি। আরেকজনের দাড়ি শনপাপড়ির মত সাদা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জলদস্যু হলে যেমন দেখাত ঠিক তেমনই।
এই তিন জলদস্যু ছিল ভাল বন্ধু। এদের জীবনী নিয়ে ‘ তিন জলদস্যু’ নামে সিরিজ লেখা যেতে পারত। এরা এক সাথে লুট পাট করতো। নীল সাগরের আতঙ্ক। প্রচুর সোনা দানা আর বস্তা বস্তা পিসেস অভ এইট মানে মোহর সংগ্রহ করেছিল ওরা। তারপর একবার রয়্যাল নেভির জাহাজের সাথে ওদের টক্কর বাঁধে। গোলার আঘাতে মারা যায় রেড বিয়ার্ড। ধরে নিয়ে ফাঁসিতে ঝোলান হয় হোয়াইট বিয়ার্ডকে। কোন রকমে প্রান নিয়ে পালিয়ে যায় ব্ল্যাক বিয়ার্ড। এখন ক্যারাবিয়ান সাগরের কোন একটা দ্বীপে লুকানো আছে ব্ল্যাক বিয়ার্ডের গুপ্তধন।
সারারাত চলল খাওয়া আর উৎসব। বালিতে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়লো যার যেখানে মর্জি।
পরদিন দুপুরবেলা ঝিমঝিমে মাথা আর লাল চোখ নিয়ে সবাই যাত্রা করলাম। তিন পর্দা বাতাস হয়ে আছে সবাই।
এই কয়েকদিনে রোদে আমার গায়ের রঙ কুচকুচে কালো হয়ে গেছে। নাকের চামড়া উঠে কেমন সসেজের মত মনে হচ্ছে নাকটা। জাহাজে আমার মাপের কোন জামাকাপড় ছিল না। তাই সারাক্ষণ ঢোলা ল্যাগব্যাগে প্যান্ট আর লম্বা কোট পরে থাকতে হয়। মাথায় তোবড়ানো একটা চামড়ার টুপি। এক কোনে একটু কাটা। আগে যে জলদস্যু এই টুপি ব্যবহার করতো সে তলোয়ারের কোপ খেয়ে মারা গেছে। প্যান্টটা ঢোলা তাই কোমরে ইয়া মোটা একটা বেল্ট বেঁধে রাখতে হয়। ওটার মধ্যে পিতলের একটা বকলস আছে। বকলসের ওজন প্রায় দেড় কেজি।
জাহাজ ভেসে চলল।
আমরা চলতে লাগলাম আমাদের নিয়মে।
রাতের শিফট দেয়া হয়েছে আমাকে। পুরো জাহাজের ডেক হেঁটে হেঁটে পাহারা দেয়ার কাজটা আসলেও খুব কঠিন। খালি ঘুম পায়। ঘুমের মধ্যে রেলিং টপকে সাগরে পরে যেতে পারি সেই ভয়ে কোমরে দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকে। তারপরও ঘুমের ঘোরে হাঁটতে গিয়ে নানান জায়গায় ঠোকর খেতাম।ঠোকর খেয়ে খেয়ে কপালের কয়েক জায়গায় ফুলে রাজহাঁসের ডিমের মত ফুলে গেছে।
আর সব পুরানো লবণদের সাথে মিশে বহু ধরনের কাজ শিখে ফেললাম। যেমন- পাল খাটানো। দড়ির গিঁট দেয়া। বহু রকমের গিঁট দিতে হয় দড়িতে। নানান রকমের নাম আছে এই সব গিঁটের। যেগুলো বললে কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে। গিঁট দিলে বাঁধন সহজে খুলবে না। কিন্তু দড়ির মাথা ধরে টান দিলে সুরসুর করে খুলে যাবে।
দড়ির গিঁট খুলতে খুলতে হাতের তালুতে ফোস্কা পরে গেল। সেই ফোস্কায় নোনা জল লাগতেই সে কি জব্লুনি।বাধ্য হয়ে কাটা চামচ আর ছুরি দিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। কয়েকদিন বাঁধো বাঁধো ঠেকলেও পরে ঠিক হয়ে গেল। অভস্ত্য হয়ে গেলাম।
রাম গিলাম একবার। বিচ্ছিরি স্বাদ। গলগল করে তরল আগুনের মত নেমে গিয়েছিল গলা দিয়ে। গলায় আঁটকে মারাই যেতাম। নাকে মুখে দম আঁটকে কাশতে কাশতে। আশেপাশে সব লবণেরা হাসতে হাসতে শেষ। কি বিচ্ছিরি ওদের হাসি।
মাতাল হবার অনুভূতি খুব খারাপ। আমি সব কিছু দুটো তিনটে করে দেখেছিলাম।
রাতের শিফটে কাজ করার সময় এক জলদস্যু আমাকে আকাশের তারা চিনিয়ে দিল। কত পদের যে তারা আছে আকাশে। কালপুরুষের কোমরের বেল্টে তিনটে তারা। দূর সমুদ্রগামী জাহাজের মানুষজন প্রাচীন কাল থেকেই এই তারা দেখে পথ চিনে নিত। নিজেদের সুবিধার জন্য এক একটা তারার সাথে অন্য তারার কল্পনার দাগ কেটে কোন প্রাণী বা মানুষের মত বানিয়ে নিয়েছিল। যেমন কালপুরুষ তারাটা দেখতে একজন শিকারি মানুষের মত। লম্বা তিনটে তারা পাশাপাশি গিয়ে কোমরের বেল্টটাও বানিয়েছে মানুষ।
শিখতে হল সমুদ্রের স্রোত আর মৌসুমি হাওয়ার গতিপথ। সমুদ্রের বুকে সব সময় স্রোত বয়ে যায়। এই স্রোত দুইরকম। ঠাণ্ডা আর গরম। সাগরের স্রোতগুলো একবার চিনে নিতে পারলেই হল। ওখানে গা ভাসিয়ে দিলেই জাহাজ তরতর করে চলে যাবে নিজে থেকেই। মৌসুমি হাওয়ার ব্যাপারেও একই কথা। চিনে নিতে পারলেই হয়। সামনে কোন দ্বীপ বা স্থল থাকলেও হাওয়ার মতিগতি অন্য রকম হবে।
বললাম না শুধু চিনে নিতে হবে।
কয়েক দিনের মধ্যেই আমি খুব ভাল এক পিচ্চি মেট হয়ে গেলাম।
বাড়ির কথা মনে হয়। কবে আবার ফিরে যেতে পারব ? হয়তো সারাজীবন জাহাজে ভেসেই চলে যাবে। কোন দিন যদি রয়্যাল নেভির লোকজন ধরে ফেলে সাথে সাথে ফাঁসিতে লটকানো হবে । মাফ নেই।
ক্যাপ্টেন পাইন্ট জাহাজের ডেকে আসে খুব কম । নিজের কামরায় কালো টেবিলের সামনে বসে থাকে। টেবিল ভর্তি ম্যাপ। এত ম্যাপ কোন কাজে লাগে কে বলবে। সারাক্ষণ ম্যাপ দেখার কি দরকার আছে তাই বা কে বলবে। কম্পাস আর কাটা কম্পাস দিয়ে কি সব মাপে সারাক্ষণ।
একদিন লুট করার জন্য জাহাজ পেলাম।
সে এক দারুন অভিজ্ঞতা।
ঠিক দুপুরবেলা কাকের বাসা থেকে চেঁচিয়ে উঠলো একজন মেট। দূরবীন চোখে দিগন্তের উপর নজর রাখছিল সেই ছোকরা। রোদের জন্য চেহারাটা ঝলসে পাঁপড় ভাজার মত মচমচে হয়ে গেছে ওর। তেষ্টায় গলা কাঠ। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো - ‘ জাহাজ। জাহজা।’
মুহূর্তেই হুলস্থুল পরে গেল।
সবাই দৌড়াদৌড়ি করতে লাগল। ক্যাপ্টেন পাইন্ট কাঠের ক্র্যাচ নিয়ে ঠক ঠক করতে করতে বের হয়ে এলো কেবিন থেকে। চিৎকার করে নির্দেশ দিল । সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের পাল নামানর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো একদল খালাসি। পালের মোড় ঘুরিয়ে দিতেই ভুঁড়িওয়ালা লোকের জামার মত পালগুলো ফুলে গেল। চাকার মত বিশাল হুইলটা নিয়ে ইচ্ছামত মোচড়াতে লাগল তাগড়া এক নাবিক। পাই করে ঘুরে গেল জাহাজের মুখ। তর তর করে এগিয়ে যেতে লাগল সামনের দিকে। গোলন্দাজরা দৌড়ে গেল কামানের সামনে। বাকি সবাই যার যার অস্ত্র নিয়ে ডেকের উপর জমা হল। দৌড়ে গিয়ে একজন জলি রোজার পতাকাটা তুলে ফেলল। বাতাসে পতপত করে উড়তে লাগল খুলি আর হাড়ের পতাকা।
আমাদের সামনে যে জাহাজ ওটা ডেনিশ জাহাজ। বারমুডা বা ফ্লোরিডা থেকে ফিরছিল। ক্যাপ্টেন পাইন্টের ধারনা শাঁসালো মাল। মানে প্রচুর সোনা দানা আছে।
ডেনিশ জাহাজের লোক বুঝে গেছে অরাআ বদমায়েশের পাল্লায় মানে ইয়ে জলদস্যুর পাল্লায় পড়েছে। ওরা পাল তাল খাতিয়ে ভাগতে লাগল। ওদের সবগুলো কামানের মুখ ঘুরে গেছে আমাদের জাহাজের দিকে। কিছু বুঝে উঠার আগেই কামান দাগতে লাগল ওরা। দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় সব গোলাই আমাদের সামনে এসে টুপ টাপ করে পড়লো। বালতি বালতি পানি এসে ভিজিয়ে দিল আমাদের।
রেগে গিয়ে ক্যাপ্টেন পাইনট হুকুম দিলেন- ফায়ার।
আমাদের প্রত্যেকটা কামানের সামনে একজন করে গোলন্দাজ দাড়িয়ে ছিল। পাশে একজন করে সহকারী। সহকারী ঝুড়ি থেকে গোলা তুলে কামানের ভেতরে ঠেসে দেয়।
ক্যাপ্টেনের মুখে ফায়ার শব্দটা শোনার সাথে সাথেই গোলন্দাজরা গোলার সলতের মধ্যে আগুন ধরিয়ে দিল। সলতে চিড়বিড় করে জ্বলতে জ্বলতে ভীষণ শব্দ করে দৌড়ে গেল। সম্ভবত আমাদের কামান ভাল। বেশ কয়েকটা গোলা গোলা গিয়ে আঘাত করলো ডেনিসদের জাহাজে। ওদের মাস্তুল গেল ভেঙ্গে।
চারিদিকে হৈচৈ। চিৎকার, চ্যাঁচামেচি। আর বারুদের গন্ধ মিলে বিচ্ছিরি অবস্থা।
দেখতে দেখতে আমাদের জাহাজ আরও সামনে চলে এসেছে। রাইফেল তুলে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে । আমার পাশের দুই চারজন মেট গুলি খেয়ে টুপ টুপ করে সমুদ্রে পরে মাছের খাবার হয়ে গেল। ভাগ্য ভাল লড়াইটা বেশি সময় ধরে চলল না। চললে মাছের খাবার অনেক বেশি হয়ে যেত।
আমাদের মেটরা মোটা দড়ির মাথায় লোহার হুক বেঁধে ছুড়ে দিল ডেনিস জাহাজটা লক্ষ্য করে। লোহার হুকগুলো শত্রু জাহাজের কার্নিশের নানান জায়গায় আঁটকে গেল। দড়ির অন্য মাথা আমরা শক্ত করে আমাদের জাহাজের সাথে বেঁধে ফেললাম। এখন আর শত্রুপক্ষের জাহাজ সহজে পালিয়ে যেতে পারবে না।
পরের অংশ খুবই ভয়ংকর। বর্ণনা করতে গেলে হাত পা শরীর সব আইসক্রিমের মত ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
দুই পক্ষের লোকজন তলোয়ার বন্দুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো এঁকে অপরের উপর। ভীষণ লড়াই চলতে লাগল। আমি ঝাঁমেলা বাচানর জন্য কাকের বাসায় গিয়ে বসে রইলাম । খামাখা গুলি টুলি খেয়ে মরার দরকার কি ? সামনে আমের সিজন। বেঁচে থাকলে কয়েক হালি আম খেতে পারব।
কাকের বাসার উপর থেকে সব দেখতে পাচ্ছি। ভীষণ রকম লড়াই। ডেনিস জাহাজের ওরা তেমন যুদ্ধবাজ নয়। বেশির ভাগই মাছের খাবার হয়ে গেল। দুই একজন প্রান বাচাতে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়লো। সাঁতার কেটে কোথায় যাবে বলে ভাবছে ওরা কে জানে। খানিক পর দেখা গেল হাঙর এসে ওদের সিঙ্গারার মত কামড়ে কামড়ে খেয়ে ফেলছে।
বাদবাকি ডেনিশরা হাতের অস্ত্র ফেলে দুই হাত উপরে তুলে দাড়িয়ে রইল। সবাইকে ছাগলের পালের মত খেদিয়ে নিচের একটা কেবিনে বন্দি করা হল । পরে ব্যবস্থা করা হবে। ডেনিশ জাহাজের ক্যাপ্টেন বুড়ো মত একজন মানুষ। মুখ ভর্তি সাগরের ফেনার মত দাড়ি। লোকটাকে মারধর করা হল না। ক্যাপ্টেন পাইন্ট অসম্ভব নীতিবান। তারমতে অন্য যে কোন জাহাজের ক্যাপ্টেনকে নুন্যতম হলেও সম্মান করা উচিৎ।
বন্দি ক্যাপ্টেনকে অনুরোধ করা হল তাদের জাহাজে মুল্যবান যা কিছু আছে উনি যেন আমাদের হাতে তুলে দেন। তা হলে কোন রকম ঝামেলা হবে না।
ভদ্রলোক কোন রকম ঝামেলা করলেন না। তাতে অবশ্য ঝামেলা বাড়ত। উনি নিজেই সিন্দুক খুলে বড় বড় ডাবলুন ভর্তি কাপড়ের ব্যাগ তুলে দিলেন আমাদের হাতে। সব ডাবলুন এনে আমাদের সিন্দুক ভরে ফেললাম। সেলারের যত খাবার ছিল সব নিয়ে এলাম। আপেল, পনির, ময়দার বস্তা, জল ভর্তি পিপে- মোট কথা যা যা দরকার। সব নিয়ে জাহাজ খালি করলাম।
শেষে শূন্য জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিলাম।
শুনতে নিষ্ঠুর মনে হলেও এটাও নিয়ম। খালি জাহাজ তো আমরা কেজি দরে বিক্রি করতে পারব না। বন্দিদের নিয়ে কি করা হবে সেটা ভোটাভুটি নেয়া হল। ভোট দেয়ার নিয়ম খুব সহজ। ছোট ছোট কাগজে টিক চিহ্ন বা কাটা চিহ্ন দিতে হয়। সেই কাগজের টুকরো ভাঁজ করে একটা টিনের বাক্সে ফেলতে হয়। বাক্সটা থাকে কোয়াটার মাস্টারের জিম্মায় থাকে। আমি ও ভোট দিলাম। ভোট দেয়া এত আনন্দের ব্যাপার সেটা জানতাম না।
টিক চিহ্ন মানে বন্দিদের সমুদ্রে ফেলে দেয়া হবে। আর কাটা চিহ্ন মানে সামনে যে দ্বীপ পড়বে ওখানেই ওদের নামিয়ে দেয়া হবে। ভোট শেষে দেখা গেল কাটা চিহ্ন বেশি পড়েছে, সবাই বেশ খুশি হলাম। এমনিতেই ক্যাপ্টেন পাইনট পাইকারি খুন খারাব পছন্দ করেন না।
সেই রাতে জাহাজে বিশাল উৎসব হল। কারন প্রচুর খাবার আর রাম আছে আমাদের হাতে। লুট করার পর উৎসব না দিলে জাহাজিদের মন মর্জি ভাল থাকে না। কাজে উৎসাহ পায় না। তবে বন্দিদের শুধু বাঁধাকপি সেব্ধ আর শুকনো রুটি দেয়া হল। বন্দিদের খুব বেশি দয়া দেখালে আমাদের খাবারে টান পড়বে। ওদের ভাগ্য ভাল আমরা ওদের মাছের খাবার বানিয়ে দেইনি।
জাহাজ চলতে লাগল। আমার আবার নাইট শিফটে কাজ পড়লো।
ব্যাপারটা বিরক্তকর। কিন্তু উপায় নেই। আর রাতের শিফট একদম খারাপ না। বরং খুশি থাকার কথা । দিনের শিফটে খোলা ডেকে দাড়িয়ে কাজ করাও বেশ ঝক্কির কাজ। মুখের চামড়া পুরে যায়। চোখ ঝলসে যায়। কানা কানা লাগে নিজেকে। ডেকে যারা কাজ করে তারা এক চোখে চামড়ার পট্টি লাগিয়ে কাজ করে। নীচে নামার সময় চোখের পট্টি পাল্টে নেয়। নইলে পরে জাহাজের ভেতরে ঢুকলে ঘণ্টা খানেক এখানে সেখানে ঠোক্কর খায় ।
কিচেনে আলুর খোসা ছাড়ানোর কাজটা এখন আর কঠিন লাগে না। আলুগুলো ট্যাবা টুবা হলেও অনায়াসে ছিলতে পারি। কিন্তু জলদস্যুদের মোজা আর আন্ডারঅয়ার পরিষ্কারের কাজটা বেশ কঠিন ।
এক রাতে নাইট শিফটে কাজ করার সময় বেশ একটা কাণ্ড হল।
ডেকের এক মাথা থেকে হেঁটে যাচ্ছি আর ফিরে আসছি। এটাই কাজ । রাত দুটো পর্যন্ত ডিউটি। এমন সময় দেখলাম ডাক্তার ভবানী বাবু গোপনে বের হয়ে আসছে উনার কেবিন থেকে। হাতে একটা কাচের বোতল। ভেতরে কাগজের একটা রোল। বিড়ালের মত নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছেন জাহাজের রেলিঙের দিকে।
পিছন থেকে হাক দিলাম , ‘ এই যে ডাক্তার সাহেব, কি করছেন ?’
আমাকে দেখে কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন উনি। অন্ধকারেও দেখতে পেলাম- মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। দ্রুত বোতলটা ফেলে দিলেন সাগরে।
সামনে এগিয়ে গেলাম। মনে হচ্ছে সাংঘাতিক কোন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। ডাক্তার বাবুর আচরণ অস্বাভাবিক রকমের।
‘ কি ব্যাপার ডাক্তার বাবু ? আমাকে দেখে অমন ভয় পেয়ে গেলেন কেন ? আর বোতলটাতে বা কি ছিল ?’
কেমন যেন আমতা আমতা করতে লাগলেন ভবানী বাবু। ভয় পেয়ে গেছেন উনি।
‘ আপনার শরীর খারাপ নাকি ?’ অবাক হয়ে জানতে চাইলাম। ‘ দাঁড়ান ক্যাপ্টেনকে খবর দিচ্ছি।’
‘ না।’ চাপা স্বরে আর্তনাদ করে উঠলেন ডাক্তার ।
‘ কিন্তু কেন ?’ অবাক হলাম। সর্বদা হাসিখুশি ডাক্তার এমন আচরণ করছে কেন ?
খানিক ইতস্তত করলেন ভবানী বাবু। যেন বুঝে উঠতে পারছেন না কি করবেন। শেষে বললেন, ‘ ঠিক আছে চল। ডেকের এক কোনে দাড়িয়ে কথা বলি। নাকি ডিউটি শেষ করে আমার কেবিনে আসবে ? সেটা অবশ্য ভাল হবে না। কেবিনে যে কেউ চলে আসতে পারে। মাঝ রাতেও অনেকের অসুখ বিসুখ হয়।’
সন্দেহ রইল না ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। পা চালিয়ে ডেকের এক কোনে চলে এলাম। ভবানী বাবু সাবধানে চারিদিকটা দেখে ফিরে এলেন। কেউ নেই আশেপাশে। বুদ্ধি করে সেলার রুম থেকে এক হালি পাকা আপেল নিয়ে এলেন। গোলাপি রঙের এই আপেলকে ক্রাব আপেল বলে। কাঁকড়ার মত রঙ। তাই।
এখন কেউ দেখলে ভাববে রাতের বেলা খোলা ডেকে দাড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছি দুইজনে । সাথে হালকা আপেল চিবুচ্ছি। আপেলে কামড় দিয়েই কথা বলা শুরু করলেন ভবানী বাবু । আউ আউ করে কি বললেন কে জানে।
‘ আপনি আপেলটা আগে খেয়ে শেষ করে তারপর কথা বলুন।’ কিছুটা বিরক্ত হলেও শান্ত গলায় বললাম। শত হলেও মুরুব্বি।
খানিক লজ্জা পেলেও তাই করলেন । পরপর দুটো আপেল খেয়ে শেষ করে আপেলের মেরুদণ্ড দুটো বাইরে ফেলে দিলেন।
‘ আপেলের দানাতে বিষ থাকে।’ সাফাই গাইলেন ডাক্তার। ‘ ডানা ফেলে দিয়ে আপেল খাওয়া ভাল। এক কাপ পরিমাণ আপেলের দানাতে যে পরিমাণ বিষ থাকে তাতে একটা আস্ত ঘোড়া মুহূর্তেই মারা যেতে পারে।’
‘আমরা বোতল নিয়ে কথা বলতে এসেছিলাম।’ এবার সত্যি সত্যি রেগে গেলাম। ‘ আপনি একটা সিলগালা বোতল ফেলে দিয়েছেন সাগরে।’
‘ অহ হ্যাঁ, হ্যাঁ। বিব্রত গলায় বললেন ভবানী বাবু। ‘ আসলে তোমাকে বিশ্বাস করে বলছি। দয়া করে ক্যাপ্টেনের কাছে গিয়ে কিছু বলো না।’
‘ এখন পর্যন্ত তো কিছুই শুনলাম না। আর আমার তো খেয়ে দেয়ে কাজ নেই সোজা গিয়ে ক্যাপ্টেনের কাছে কথা লাগাব।’
‘ ব্যাপারটা সিরিয়াস। আমি মুক্তি চাই।’ বললেন ভবানী বাবু।
‘ আস্তে বলুন ।’ খেঁকিয়ে উঠলাম। ‘ মেটদের কেউ যদি শুনে ক্যাপ্টেনের কানে গিয়ে লাগায় তবে বিদ্রোহী হিসাবে আপনাকে মাছের খাবার বানাবে অথবা ফাঁসিটে ঝুলিয়ে দেবে।’
‘ আরে নাহ , জাহাজে আমিই একমাত্র ডাক্তার। তারপরও সাবধানের মার নেই।’
‘কিন্তু সামান্য এই বোতল সাগরে ফেলে কি ভাবে মুক্তি পাবেন ?’ অবাক হলাম।
‘বোতলের ভেতরে যে কাগজের রোল ছিল খেয়াল করনি ? ‘
‘ হ্যাঁ একটা রোলের মত কি যেন দেখেছি।’ স্বীকার করলাম।
‘ ওটাই আসল জিনিস। প্রতি সপ্তাহেই অমন একটা রোল করা কাগজে জাহাজের অবস্থান, দ্রাঘিমাংশ, অক্ষাংশ এই সবের বর্ণনা লিখে বোতলে ভর্তি করে ফেলে দেই। বোতলগুলো ভাসতে ভাসতে ছড়িয়ে পরে সামুদ্রের নানান জায়গায়। আজ বা কাল হয়তো রয়্যাল নেভির হাতে পড়বে অমন একটা বোতল। ওরা সহজেই বুঝে যাবে আমাদের অবস্থানটা কোথায়। একগাদা জাহাজ নিয়ে অনুসরণ করলেই ধরে ফেলবে আমাদের। তারপরই আমাদের মুক্তি।’
‘ কিন্তু নিয়ম অনুয়ায়ী দীর্ঘ সময় ধরে যারা জলদস্যুদের জাহাজে থাকে তারাও জলদস্যু। ধরা পরা মাত্র আমাদেরও ফাঁসি হবে।’
‘মোটেই না।’ উত্তেজিত ভাবে বললেন ডাক্তার। ‘ আমি প্রমান করতে পারব তুমি বা আমি নির্দোষ। অনেকগুলো বছর আমি কেপটাউনে ছিলাম। ওখানের গভর্নর চার্লস বাটলি আমাকে দারুন পছন্দ করতেন। উনার অসুখ বিসুখ হলে আমিই দেখ ভাল করতাম। উনার মেয়ে মারিয়ার চিকিৎসা আমি ই করতাম। প্রত্যেক রোববার উনার বাসায় বসে চা আর পনির খেতাম। সাথে মাছের ডিম ভাঁজা।’
এতক্ষণে যেন আশার আলো দেখতে পেলাম। এই বন্দিদশা থেকে আমিও মুক্তি চাই। কোন ভাবে একটা বোতল রয়্যাল নেভির হাতে পৌছলেই হল।
আরও খানিক সময় দুইজন গুজগুজ ফুসফুস করলাম। আমাদের এখন একমাত্র কাজ হচ্ছে প্রতি সপ্তাহে একটা করে বোতল সমুদ্রে ফেলে দেয়া। আরও কয়েকটা আপেল সাবাড় করে ভবানী বাবু চলে গেলেন নিজের কামরায়। আমি বড় একটা পিপের উপর বসে ঠাণ্ডা মাথায় সব ভাবতে লাগলাম।
পরদিন।
সাগর শান্ত। আফ্রিকার উপকূলের সামনে চলে এসেছি। এই গতিতে চলতে থাকলে মাদাগাস্কার দ্বীপ সামনে পাব। এই এলাকায় প্রচুর মাছ ধরা পরে। দুপুরের খাওয়ার জন্য জাল ফেলা হয়েছিল। ঠিক দুপুর বেলা অদ্ভুত ধরনের একটা মাছ ধরা পড়লো।খালাসিরা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করলো অমন মাছ জীবনেও দেখেনি কেউ। মাছটা দেখতে কৈ মাছের মত। কিন্তু আরও বড়। আঁশগুলো কেমন নীলচে। বেশ বিচ্ছিরি । অচেনা ধরনের কোন মাছ ধরা পড়লেই সবাই দউরে দৌড়ে ভবানী বাবুকে খবর দেয়।
আজও তাই হল।
ভবানী বাবু চলে এলেন। সাথে করে রঙ তুলি আর মোটা কাগজ নিয়ে এসেছেন। ছবি আঁকবেন। বড় একটা কাচের পাত্রে জল ভর্তি করে মাছটা রাখা হয়েছে। নিশ্চিন্তে সাঁতার কাটছে মাছটা।
অনেক সময় নিয়ে মাছটা পরীক্ষা করলেন ভবানী বাবু। ইয়া মোটা একটা বই আছে উনার কাছে। সচিত্র মাছের গাইড টাইপের বই। এই বই ঘেঁটে তিনি মাছের প্রজাতি চেনেন। কিন্তু বইটাতে নতুন এই মাছটার কোন ছবি নেই। ভাবনী বাবু বুঝতে পারলেন এটা একদম নতুন ধরনের মাছ। তিনি ছবি আঁকতে বসে গেলেন। কখনও বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেলে ছবিগুলো দিয়ে উনি বই বের করবেন। আঁকা শেষ করে কাচের গোলপাত্রটা নিজের কেবিনে রেখে দিলেন। বাউলের ভেতরে মাছটা নিয়মিত চন্দে চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে । অন্ধকারেও মাছটার চোখদুটো ঝিকিমিকি করছে।
পরদিন আমরা বন্দি হলাম।
খুব সকাল বেলা আক্রমণটা হল।
রোস্ট করা আলু আর ভাঁজা মাংসের প্লেট নিয়ে খেতে বসব তখনই কাকের বাসা থেকে একজন হৈ চৈ শুরু করলো । দৌড়ে ডেকে উঠে দেখি একদম কাছে এসে পড়েছে অন্য একটা জাহাজ। ওদের মাস্তুলে জলিফ্ল্যাগ উড়ছে । মানে ওরাও জলদস্যু ! দৌড়ে গিয়ে প্রস্তুত হবার আগেই আক্রান্ত হলাম। চুপিচুপি করে ডিঙিতে চড়ে ওদের কয়েকজন একদম কাছে এসে পড়েছিল। বড় বড় বরশীর মত আঁকশি ছুড়ে আগেই রেলিং ধরে ফেলেছে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে শত্রু পক্ষের জলদস্যুরা পিলপিল করে আমাদের জাহাজে উঠে এলো। গুড়ের ডেলার মধ্যে যেমন করে পিঁপড়ে উঠে।
লড়াই জমে উঠতে না উঠতেই শেষ হয়ে গেল। কারন প্রতিপক্ষের গোলার আঘাতে আমাদের একটা মাস্তুল ভেঙ্গে দড়িদড়া আর মোটা পাল নিয়ে ঝুপ্পুস করে নীচে নেমে এলো। সোজা পড়লো ক্যাপ্টেন পাইনটের মাথায়। ছালার বস্তার মধ্যে কুমড়া যে াবে প্য্যাচিয়ে যায় সেইভাবে পালের সাথে প্যাচিয়ে জাহাজের ডেকে গড়াগড়ি খেতে লাগলেন তিনি। শত্রুপক্ষের দুই জলদস্যু ক্যাপ্টেন পাইনটের মাথায় তরোয়াল ঠেকাতেই আমরা আমাদের অস্ত্র ফেলে দুই হাত উপরে তুলে দাড়িয়ে রইলাম।
সবাইকে সারিবন্ধ করে দাড় করিয়ে রাখা হল। হাত পিছমোড়া করে বাধা । উজবুকের মত দাড়িয়ে আছি। ইস্কুলে পড়া শিখে না আসলে অমন করে দাড়িয়ে থাকতাম। নতুন কিছু না।
ততক্ষণে দুই জাহাজের মাঝখানে তক্তা বিছানো হয়েছে। ইয়া মোটা এক লোক চলে এলো আমাদের জাহাজে। শত্রু জাহাজের ক্যাপ্টেন। লাল টুকটুক সিল্কের জামা পরনে। মাথায় চামড়ার টুপি। চোখদুটো গোল্লা গোল্লা। সেই গোল্লা চোখে আমাদের সবাইকে দেখল অনেক সময় ধরে। সোজা গিয়ে দাঁড়ালো ক্যাপ্টেনের পাইনটের সামনে।
‘ তারপর, কেমন আছ ? আবার আমাদের দেখা হয়ে গেল , তাই না ?’ বিচ্ছিরি অঙ্গভঙ্গি করে প্রশ্ন করলো শত্রুপক্ষের ক্যাপ্টেন। ‘ সব সমুদ্র আসলে একটা সমুদ্র। শুধু ভৌগলিক অবস্থানে নাম ভিন্ন হয়।
বলেই খ্যাক খ্যাক করে হেসে ফেলল শত্রু ক্যাপ্টেন।
‘ আমি তোমাকে ঘৃনা করি হেরিং ।’ এই প্রথম রাগতে দেখলাম ক্যাপ্টেন পাইনটকে।
‘ হেরিং না, ক্যাপ্টেন হেরিং বলবে।’ বিচ্ছিরি একটা হাসি হেসে বলল লোকটা। ‘ তো বল এবার ক্যাপ্টেন মরগ্যানের গুপ্ত ধন কোথায় লুকিয়ে রেখছ ?’
আমরা সবাই বুঝতে পারলাম এই দুই ক্যাপ্টেন একে অপরকে অনেক আগে থেকেই চেনে।
‘ আমি জানি না।’ বেশ ঝাঁঝের সাথে বলল ক্যাপ্টেন পাইন্ট। ‘ আর জানলেও বলতাম না।’
আবারও খ্যাক খ্যাক করে হেসে ফেলল ক্যাপ্টেন হেরিং। ‘ চিন্তা করবে না। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙ্গঅল বাঁকা করতে হয়। সে আমি জানি। সবাইকে বন্দি কর। কাল সকালে ওদের জাহাজ ভেঙ্গে ভাসিয়ে দেব। তার আগে ক্যাপ্টেন পাইন্টকে পিটিয়ে গুপ্তধনের খবর বের করে নেব আমরা। খ্যাক খ্যাক খ্যাক ।’
টেনে হিঁচড়ে আমাদের সেলারের তলায় বন্দি করা হল আমাদের। বসে রইলাম ঘুটঘুটটি অন্ধকারে। সবার ঘাম আর রসুনের গন্ধে মরার দশা। বুঝতে পারছি সামনে অনেক ভোগান্তি আছেন ।
‘ ক্যাপ্টেন পাইন্ট আর হেরিং কি পুরানো শত্রু ?’ জানতে চাইলাম পাশের মেটের কাছে। ওর নাম কলম্বাস । ভাল মানুষ।
শুনেছি আমাদের জাহাজের বহু পুরানো লবণ।
‘ আগে ওরা খুব ভাল বন্ধু ছিল।’ জবাব দিল কলম্বাস। ‘ ক্যাপ্টেন সবাতিনির জাহাজে এক সাথে কাজ করতো দুইজন। বছর পাঁচেক আগে আলাদা হয়ে গেছে।’
‘ শত্রুতা কি নিয়ে ?’
‘ ক্যাপ্টেন মরগ্যানের গুপ্তধনের খোঁজ জানত সাবাতিনি। তো মরার আগে সাবাতিনি সেটা কাউকে বলে গেছে কি না জানি না। তবে পাইন্ট আর হেরিং একে অপরকে সন্দেহ করে। এর আগেও এই মহান দুই শত্রু কয়েকবার সাগরের বুকে মুখমুখি হয়েছিল। ভীষণ লড়াই হয়েছিল। দুই পক্ষই পালিয়ে বেঁচেছিল। কিন্তু এইবার শেষ। আমরা ধরা পড়েছি। মাছের খাবার বানাবে। সামনে কোন দ্বীপ পেলে ওখানের নরম বালিতে পুঁতে রাখবে গলা পর্যন্ত। রোদে শুকিয়ে শুটকি হয়ে মরব সবাই।’
কলম্বাসের কথা শুনে হাত পা বরবটির মত ল্যাগব্যাগে হয়ে গেল। বাঁচার এর কোন উপায়ই দেখতে পারছি না। কোন কুক্ষণে যে সমুদ্র সৈকতে গিয়েছিলাম ? আহা সেদিন যদি বাসা থেকে বের না হতাম তবে এই ভয়ংকর বিপদে পড়তে হত না।
অন্ধকার সেলার রুমে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়লাম এক সময়।
বিরাট হাকদাকের মধ্যে পরদিন ঘুম ভাঙল। হেরিঙ্গের লোকজন আমাদের টেনে হেঁচড়ে বের করে খোলা ডেকে নিয়ে গেল। উজ্জ্বল রোদেলা দিন বাইরে । আমাদের চোখ ধাধিয়ে দিনকানা হয়ে গেলাম। সামনেই একটা দ্বীপ। মানে ওখানেই আমাদের ব্যবস্থা করবে হেরিঙ।
ক্যাপ্টেন পাইনটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো হেরিং। দাঁতমুখ খিচিয়ে বলল,’ বলে ফেল, মরগ্যানের গুপ্তধন কোথায় ? সময় নেই আমাদের হাতে। জলদি।’
‘ তার আগে বল আমার পোষা সবুজ রঙের দাড়কাকটা কোথায় ?’ চিন্তিত সুরে বলল ক্যাপ্টেন পাইন্ট । ‘ কাল রাত থেকে খুঁজে পাচ্ছি না ওকে ।’
‘ মৃত্যুর মুখে দাড়িয়ে থেকেও সামান্য একটা পোষা কাকের জন্য উতলা হচ্ছ ? ভড়ং কত প্রকার ও কি কি তোমাকে দেখেই শিখলাম। ইতিহাস তোমাকে কিং অভ ভড়ং নামে ডাকবে।’ বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বলল হেরিং। তোমার সেই সবুজ রঙের দাঁড়কাক কাল রাতে আমরা রান্না করে খেয়ে ফেলছি।’
‘ সে কি ? না না না এ হতে পারে না।’ চিৎকার করে উঠলো ক্যাপ্টেন পাইন্ট ।
‘ হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ সেটাই হয়েছে। দারুন সুস্বাদু ছিল সেই সবুজ কাকের মাংস। পালক টালক ফেলে দিয়ে ওটা ছয় ঘণ্টা টক দৈ আর লেবুর রসে ভিজিয়ে রেখেছিল আমার বাবুর্চি। পরে কমলার খোসা দিয়ে রান্না করা হয়েছে। অপূর্ব স্বাদ। এখনও আঙুলে ঘ্রান লেগে আছে।’
হাউ মাউ করে কাদতে লাগল ক্যাপ্টেন পাইন্ট। বেচারার কান্না দেখে আমরা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলাম বোকার মত। সবাই জানি পোষা কাকটাকে ভীষণ ভাল বাসত বেচারা। কিন্তু তারপরও শোকটা বেশি রকম মনে হল আমার কাছে।
হেরিঙ ও যেন কেমন থতমত খেয়ে গেল। শেষে আমতা আমতা করে সান্তনার সুরে বলল, ‘ আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। আই এম সো সরি ব্রো। বুঝতে পারিনি সবুজ দাঁড়কাকটা তুমি এত ভালবাসতে। কথা দিলাম নতুন একটা কাক বা কাকাতুয়া পেলেই তোমাকে উপহার দেব। এখন বলে ফেল তো মরগ্যানের গুপ্তধন কোথায় ?’
‘ বলার আর কোন উপায় নেই।’ হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল পাইন্ট । ‘ কারন এই সবুজ কাকটা ছিল মরগ্যানের পোষা কাক। মরার আগে মরগ্যান গুপ্তধনের হদিস এই পোষা কাকটাকে বলে গিয়েছিল । আমি আর মরগ্যান তখন রয়্যাল নেভির তাড়া খেয়ে ক্রিসমাস আইল্যান্ডে লুকিয়ে ছিলাম। মরগ্যানের মৃত্যুর পর কাকটা আমিই পাই। যত্ন করে নিমফল খাইয়ে মানুষ করেছি সরি কাক করেছি। কাকটা আমাকে পথ দেখাত সমুদ্রে। পুরানো ম্যাপ ঘেঁটে ঘেঁটে যায়গা মত যাচ্ছিলাম। আর কয়েক দিনের মধ্যেই পৌঁছে যেতাম গুপ্তধনের কাছাকাছি। হায়রে দুর্ভাগ্য আমার তুমি এসে সব ভণ্ডুল করে দিলে।’
আবার ও হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো পাইন্ট। দর দর করে তরল শিকনি বের হয়ে এলো পাইন্টের নাক দিয়ে। ফুচকা খাবার সময় অনেকের অমন হয়।
‘ হায় হায়, এই কথাটা আগে বলনি কেন বন্ধু ? মুখে কলা ঢুকিয়ে রেখেছিলে নাকি ? ‘ বিচিত্র ভঙ্গিতে বিলাপ করে উঠলো হেরিং।
‘ বলার সুযোগ দিলে কোথায় ?’ রাগি গলায় জবাব দিল পাইন্ট। ‘ তোমরা আক্রমণ করার সাথে সাথেই কাকটা উড়ে চলে চলে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম পরে ঠিকই ফেরত আসবে।’
পাথরের মত মুখ করে দাড়িয়ে রইল দুই ক্যাপ্টেন। শেষে ফোস করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হেরিং বলল, চলো সবাই মিলে রাম খাই। দুঃখের ভাগি হই। মরগ্যানের গুপ্তধন আমাদের ভাগে নেই। কবি নিজেই বলে গেছেন, ওরে ক্ষ্যাপা মিছে কেন খুঁজে বেড়াস পরশ পাথর।’
এতক্ষণ আমাদের পাশেই দাঁড়িয়েছিল মোটামত এক শত্রুপক্ষের মেট।
খালাসি টালাসি হবে। অনেকক্ষন ধরেই বেচারা উসখুস করছে। কিছু বলতে চায় যেন কিন্তু ভয়ে বলতে পারছে না।
‘ কি ব্যাপার ? তোমার আবার কি হল ?’ খেঁকিয়ে উঠলো ক্যাপ্টেন হেরিং।
‘ ইয়ে মানে কি ভাবে বলব বুঝতে পারছি না।’ বিব্রত ভাবে বলল খালাসি। ‘ হতে পারে ওটা সুসংবাদ আবার হতে পারে ওটা দুঃসংবাদ।’
‘ নাটক না করে বলে ফেল তো ।’ ঘেউ ঘেউ করে উঠলো হেরিং।
‘ক্যাপ্টেন হয়েছে কি সবুজ কাকটা আমরা রান্না করতে পারিনি। ডানা ঝাপটে উড়ে চলে গেছে ঐ দ্বীপের কাছে। আমরা ভয়ে আপনাকে কিছু বলিনি।’ দুই হাত কচলাতে কচলাতে বলল খালাসি।
হুরররররে । সবাই মিলে চিৎকার করে উঠলো। অনেক সময় লোড শেডিঙের পর কারেন্ট চলে এলে আমাদের পাড়ার লোকজন অমন সুরে চেচিয়ে উঠে। খানিকদূরেই একটা লোক দাড়িয়ে ছিল। কোমড়ে এক হাত লম্বা টেলিস্কোপ গোঁজা। থাবা মেরে টেলিস্কোপটা কেড়ে নিয়ে চোখের সামনে ধরল হেরিং।
সময় কেটে যেতে লাগল।
পাক্কা তিন মিনিটের মাথায় চিৎকার করে উঠলো হেরিং। ‘ পেয়েছিরে পেয়েছি । ঐ যে বড় একটা রুটিফল গাছের উপর বসে আছে সবুজ দাঁড়কাকটা। পাইন্ট দোস্ত দেখত এটাই তোমার সেই সবুজ কাক কি না ?’
টেলিস্কোপ হাত বদল হল।
কয়েক মুহূর্ত পরেই চেচিয়ে উঠলো পাইনট , ‘ আরে ওটাই তো আমার প্রিয় সেই সবুজ কাক। আদর করে বাতাবি লেবু বলে ডাকি।’
হুরররে। আবার সবাই চেঁচিয়ে উঠলো।
আজকে আর কিছু না হোক আমাদের কানের মেয়াদ শেষ।
‘ যাক চিন্তার কিছু নেই।’ দরাজ গলায় বলল হেরিং। আমরা পাখিটাকে ধরে ওর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে গুপ্তধন উদ্ধার করি। আমি অর্ধেক নেব বাকি অর্ধেক বন্ধু পাইন্ট নেবে, আর বাদবাকি সবাই ভাগ করে নেবে।’
হুরররে। আবার চিৎকার।
সবাইকে মগ ভর্তি রাম দাও । ঘোষণা করলো হেরিং।
হুরররে । আবার চিৎকার।
‘সামনে মস্ত বিপদ।’ পাশে কে যেন ফিসফিস করে বলল।’
দেখি ভবানী বাবু। টের ও পাইনি কখন যেন আমার পাশে চুপচাপ এসে দাঁড়িয়েছে।
‘কিসের বিপদ ?’ ফিসফিস করে বললাম।
‘ আরে দেখছ না অর্ধেক গুপ্তধন পাইন্ট পাবে বাকি অর্ধেক হেরিং পাবে। আর বাদবাকি সবার। অর্ধেক অর্ধেক গেলে আর থাকে কি ? আর গুপ্তধন পেলেই খুুনোখুনি লেগে যাবে। সবাই মরবে । প্রানে বাঁচবে না কেউ।’
ভাল মত চিন্তা করতে গিয়ে দেখি কথা সত্য।
কয়েকটা ডিঙ্গি নামান হল সাগরের জলে। ক্ষুধার্ত হাংরের মত ওরা ছুটল দ্বীপটার দিকে। জাহাজে যারা ছে সবার হাতে রামের মগ। ঢক ঢক করে গিলছে সবাই।উৎসব উৎসব ভাব । গুপ্তধনের লোভে সবার চোখ ঝিকিমিকি করছে।
‘ আজ রাতে আমরা পালাব। তৈরি থেকো।’ নিচু গলায় বললেন ভবানী বাবু। ‘ এই বিপদে থাকলে মাথার কল্লা থাকবে না।’
‘ গুপ্তধন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম।’
‘ পাগল হয়ে গেছ নাকি ? গুপ্তধন দেখার খায়েস থাকলে বসে থাকো। আমি আজ রাতেই ভাগব। ’
‘ ঠিক আছে , ঠিক আছে ।’ রাজি হলাম। ভেবে দেখলাম ভবানী বাবুর কথার মধ্যে যথেষ্ট যুক্তি আছে।
দুপুরের আগেই দ্বীপের মধ্যে ডিঙ্গি নেমে গেল। পাইন্ট বিচ্ছিরি শিস দিয়ে সুর তুলে গান গাইতে লাগল। সেই সুর শুনে দাঁড়কাকটা ফিরে এলো। হাসতে হাসতে কাক সহ পাইন্ট ফিরে এলো জাহাজে। । কিছু মেট দবিপে রয়ে গেল। রাতে উৎসব হবে।
খ্যাক খ্যাক করে হাসছে পাইন্ট আর হেরিং। একগাদা ম্যাপ , কম্পাস আর সবুজ দাঁড়কাকটা নিয়ে হেরিঙ্গের কেবিনে ঢুকে পড়লো দুইজনে। শুরু হল গোপন শলা পরামর্শ।
প্রচুর রাম গেলার জন্য দুই জাহাজের মেট মধ্যে বেশ বন্ধুত্ব জমে উঠেছে ইতিমধ্যে।
রাতে দ্বীপে বিশাল এক ভোজের আয়োজন হল। খাওয়ার জন্য কি কি ছিল বিস্তারিত লিখতে গেলাম না । মেজাজ খিঁচরে আছে এমনিতেই। সারাদিন ভবানীবাবুর টিকিও দেখিনি। দুই ক্যাপ্টেন কেবিনে ঢুকেছে বের হবার নাম নেই । রাতে নিজের কেবিনে গিয়ে শুয়ে রইলাম। দ্বীপে একগাদা মেট আগুনের পাশে বসে এখনও হাউকাউ করছে। যে হারে রাম গিলছে সমুদ্রের সব জল রাম হয়ে গেলেও ওদের তেষ্টা মিটবে না।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। প্রচণ্ড রকম হট্টগোলে ঘুম ভাঙল। কয়েক মুহূর্ত আলুথালু মনে হলেও বুঝতে পারলাম লড়াই বেঁধেছে। গোলাগুলির শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে।
বিছানা থেকে নেমে দ্রুত বুট পায়ে দিয়ে বের হয়ে এলাম। দরজার বাইরেই ধাক্কা খেলাম কারও সাথে।
‘ জলদি কর ।’ চাপা গলায় বললেন ভবানী বাবু। ‘ দড়ি বেয়ে নীচে নেমে যাব। একটা ডিঙ্গি তৈরি রেখেছি আমাদের জন্য। জলদি কর। উপরে দুই ক্যাপ্টেনের লড়াই শুরু হয়েছে। খুব খারাপ অবস্থা।’
‘লড়াই বাধল কি নিয়ে ? ঘণ্টা খানেক আগেই তো দেখলাম দুই ক্যাপ্টেন খোশ মেজাজে আড্ডা দিচ্ছে।’
ততক্ষণে কেবিনের বাইরে চলে এসেছি । ভবানী বাবুকে অনুসরণ করছি ।
‘ আর বলো না হেরিঙ্গের ধারনা সবুজ কাকটা ইচ্ছে করে পথের ঠিকানা ভুল দিচ্ছে। এই নিয়ে কথা কাটাকাটি করতে করতে লড়াই বেঁধে গেছে দুইজনের।’
রেলিঙের সাথে শক্ত দড়ি ঝুলছিল। সেটা ধরে সরসর করে দুইজন নীচে নেমে গেলাম। নীচে ডিঙ্গিটা ঢেউয়ের উপর দুলছিল। আমরা নামতেই দড়ি কেটে দিলেন ভবানী বাবু। উনার হাতে চাকু। মাথায় লাল কাপড়ের ব্যানডানা বাঁধা। উপরের দিকে চেয়ে দেখি ভয়াল লড়াই বেঁধে গেছে ওখানে। কে কাকে মারছে জানি না। তবে পোকা মাকড়ের মত মানুষ মরছে।
দড়ি কেটে দিতেই ডিঙ্গি ছুটল ঘোড়ার মত। দুইজনেই দাড় বাইতে লাগলাম । পিছন ফিরে চেয়ে দেখি ডেকের উপর কুরুক্ষেত্র চলছে। চাদের আলোতে পাইন্ট আর হেরিংকে দেখতে পেলাম। হাতে তলোয়ার। লড়ছে দুইজন। দুইজনের শরীরে রক্ত।
স্রোত আমাদের অনুকূলে ছিল। ডিঙ্গি দৌড়াতে লাগল পাই পাই করে। ভবানী বাবু কাঁচা কাজ করার মানুষ না। ডিঙ্গির মধ্যে কম্বল , মাছ ধরার যন্ত্রপাতি, কম্পাস, পিপে ভর্তি জল আর শুকনো খাবার সাথে করে নিয়েছেন। ভাঁজা মাংসের চনমন করা ঘ্রান বারবার ধাক্কা দিচ্ছিল নাকে। এত কাজ কখন করলেন কে জানে ! তা হলে এইজন্যই গায়েব ছিলেন সারাদিন ধরে। এমন কি তার সেই মাছটা পর্যন্ত সাথে করে নিয়ে এসেছেন । কাচের গোল বাউলের মধ্যে সাঁতার কাটছে সেটা। পাশেই আঁকা ছবিগুলো।
‘কিছুই বাদ রাখেনি দেখছি ।’ হাসতে হাসতে বললাম।
‘ কম্বলের তলায় একটা কাঠের বাক্স আছে। খুলে দেখ।’ শান্ত গলায় বললেন ভবানী বাবু।
সত্যি তাই। বড় একটা বাক্স আছে । বাক্সের গায়ে পেতলের ফুল লতা নকশা ফক্সা আঁকা।
দালা খুলে ভেতরের দিকে চেয়ে বোকা হয়ে গেলাম। ওটা ভর্তি বর বর সোনার ডাবলুন। তারার আলোয়, চাদের আলোয় ঝিকিমিকি করছে।
ফিরে তাকালাম ভবানী বাবুর দিকে।
‘অর্ধেক তোমার।’ নিশ্চিত মনে দাড় টানতে টানতে জবাব দিলেন ।
অবাক হয়ে ধন্যবাদ দেব তার আগেই আমাদের চমকে দিয়ে দূরের জাহাজ থেকে ভীষণ রকম গর্জন ভেসে এলো।
‘ বারুদের রুমে আগুন ধরে গেছে।’ বিড়বিড় করে বললেন ভবানী বাবু।
দাউ দাউ করে হেরিঙ্গের জাহাজে আগুন জ্বলে উঠলো। কাঠের টুকরো, পিপে আরও হরেক পদের জিনিস ছিটকে পড়তে লাগল সাগরে।
‘ বেশিক্ষণ টিকতে পারবে না ওরা। দুটো জাহাজেই আগুন ধরে যাবে। ডুবে যাবে এক সময় । তবে বেশির ভাগ জলদস্যু বেঁচে থাকবে। ওরা সাঁতরে গিয়ে উঠবে দ্বীপে । সারা জীবনের জন্য বন্দি হয়ে থাকবে।’ বললেন ভবানী বাবু।
‘ হ্যাঁ, হাসলাম। ‘ একদম পাইরেটস ফ্যামিলি রবিনসন। ‘
আমাদের ডিঙ্গি বাতাসের বেগে যাচ্ছে। দিগ্নতের কাছে পৌছতেই আরও কয়েকবার বিকট শব্দ পেলাম। কয়েকজনকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখলাম সাগরে। দাউ দাউ করে জ্বলছে দুই জাহাজ। ধোঁয়ার কুণ্ডলী প্যাচিয়ে উঠছে উপরে। বুম বুম কয়েকটা শব্দ করে আস্তে আস্তে তলিয়ে যেতে লাগল , এক সময় হারিয়ে গেল অতল জলে।
মনটা খারাপ হয়ে গেল অকারনেই।
মাত্র তিন মাস সময় কেটেছে পাইনটের জাহাজে। মনে হয় অনেকগুলো বছর বন্দি ছিলাম।
কত স্মৃতি।
পরের তিন দিন আমরা সাগরে ভেসে রইলাম। পাল তুলে দিয়েছিলাম। বাতাসে তর তর করে ভেসে গেলাম। আমরা
রেশন করে খাবার খেতাম। বলা তো যায় না কতদিন সাগরে ভেসে থাকতে হয়। জলও মেপে খাচ্ছিলাম।
রোদের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালের ছায়ায় বসে থাকার চেষ্টা করতাম। রাতে খোলা আকাসের নীচে বসে তারা দেখতাম। আকাশ ভর্তি কত তারা। ঠিক যেন নীল শার্টিনের চাদরে মুঠো মুঠো চুমকি বসান ।
ডিঙিতে ছোট একটা মাছ ধরার জাল ছিল। অনেকটা ব্যাডমিনটন খেলার ব্যাটের মত। মাঝে মশারির মত জাল। ওটা দিয়ে কয়েক খাবলা কুচোঁ চিংড়ি ধরলেন ভবানী বাবু। আদর করে কাচের জারের ভেতরের মাছটাকে খেতে দিলেন কুঁচো চিংড়ি।
ছুয়েও দেখল না মাছটা। আগের মতই ঘুরে বেড়াতে লাগল জারের ভেতরে। খুব ধীরে ধীরে নড়াচড়া করছে। মনে হচ্ছে দুর্বল হয়ে গেছে বেচারা। চোখদুটোও বেশ ছোট ছোট লাগছে।
‘ব্যাটা কি খায় কে জানে ।’ হতাশ হয়ে বললেন ভবানী বাবু। ‘ অমন মাছ জীবনেও দেখিনি। উপবাস রেখেছে কি না কে জানে ? না খেয়ে মারা যাবে বোধ হয় ।’
আমরা ডিঙ্গির উপরে বসে থাকি।
করা রোদে চামড়া পুড়ে পাউরুটির কিনারার মত বাদামি হয়ে গেল। সাগরের বাতাস থেকে লবণ এসে জমা হল চোখের পাপড়ি আর ভ্রু-তে। সারাক্ষণ সাগরের দিকে চেয়ে থাকতে থাকে আমরা প্রায় কানা হয়ে গেলাম।
এক রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল।
গভীর ঘুমের মধ্যে মনে হল বাঁশী বাজাচ্ছে কেউ । বা সুরেলা গলায় শিস দিচ্ছে কেউ। অদ্ভুত এক ছন্দে। খানিক বিরতির পর পর। ভয় পেয়ে গেলাম। মাঝ সাগরে নাকি অমন অনেক ভৌতিক ব্যাপার হয়। জাহাজে থাকতে মেটদের মুখে শুনেছি । আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝে বারমুডা দ্বীপের কাছে অমন একটা জায়গা আছে। ওখানে প্রায়ই ভৌতিক সব ঘটনা ঘটে।
অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম , কাচের জারের ভেতরে রাখা সেই বিদঘুঁটে মাছটা দ্রুত সাঁতার কাটছে। মাছের চোখদুটো ফসফরাসের মত জ্বলছে। মুখ দিয়ে অদ্ভুত রকমের শব্দ করছে ।
ধাক্কা মেরে ঘুম থেকে তুলে দিলাম ভবানিবাবুকে। ঘুম জড়ানো গলায় বললেন , কি হয়েছে ? অ্যাঁ ? “
ঠিক তখনই আমাদের ডিঙির খানিক দূরে ভুউস করে ভেসে উঠলো মস্ত একটা তিমি মাছ। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলাম দুইজনেই। সাধারন তিমি হলে হয়তো বেঁচে যাব। কিন্তু কিলার হয়েল বা খুনে তিমি হলে শেষ । ওরা কারন ছাড়াই আক্রমণ করে । লেজের ঝাঁপটায় ডিঙ্গিটা বাদামের খসার মত উল্টে যাবে।
তিমিটা দূরেই ভেসে রইল । চুপচাপ। আক্রমণ করছে না।
‘ মাছটা অমন করছে কেন ?’ ফিসফিস করে বললেন ভবানী বাবু।
আচমকা বুঝতে পেরে হৃৎপিণ্ড লাফ দিয়ে উঠলো। ততক্ষণে তিমি পিঠের খানিক অংশ ফাকা হয়ে অখান থেকে লম্বামত একটা লোক বের হয় এলো।
‘ হ্যালো , কেমন আছেন আপনারা ?’ খনখনে গলায় জানতে চাইল লোকটা । গলার স্বর কেমন যেন যান্ত্রিক।
‘ এটা আবার কেমন অশৈলী জিনিস ?’ ভয় পাওয়া গলায় বললেন ভবানী বাবু।
‘ এটা সাবমেরিন। এক ধরনের জাহাজ । জলের নীচ দিয়ে চলে। জবাব দিলাম।
‘ আরে এই জিনিসের কথাই তো নস্ত্রাডামুস কত শত বছর আগে লিখে গেছেন।মাছের পেটের ভেতরে সৈনিক থাকবে। সাগর পারি দেবে ওরা। কি কাণ্ড ।’ অবাক হলেন ভবানী বাবু।
‘ শুনুন আপনার ঐ মাছটা সাগরে ছেড়ে দিন।’ সাবমেরিনের উপর থেকে বলল লোকটা। অন্ধকারে অবশ্য ভদ্রলোকের চেহারা দেখা যাচ্ছে না।
‘কেন ? ‘ প্রশ্ন করলাম। ‘ মাছটা আমরা ধরেছি । খিদে পেলে খাব।’
‘ ওটা খেতে পারবেন না।’
‘কেন , বিষাক্ত ?’
‘ না ওটা আসলে কোন মাছই না।’
‘ ইয়ার্কি করছেন নাকি ? ‘ রেগে গেলেন ভবানী বাবু। ‘ বললেন মাছটা সাগরে ছেড়ে দিতে। আবার বলছেন ওটা মাছ না।। হোয়াট এ ফাজলামি ?’
ওটা আসলেও কোন মাছ না। ওটা একটা রোবট ।
‘ কি বট ?’
‘ রোবট ।’
‘ চরস না কিসের রস মনে হয় সেবন করেছে লোকটা।’ হতাশ গলায় বললেন ভবানী বাবু।
‘ বিশ্বাস করুন আমার কথা।’ কাতর গলায় বলল লোকটা। ‘ আমাদের হাতে সময় নেই। জলদি মাছ রোবটটা সাগরে ফেলে দিন। ওটা আসলেও রোবট। বিশ্বাস না করলে মাছটার চোখে চাপ দিয়ে দেখুন। তা হলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। ও রকম তিন হাজার মাছ রোবট আছে আমাদের। মাছগুলো ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর সব সাগর আর মহাসাগরে। ওদের জন্যই ডাঙ্গার সব খবর রাখতে পারি।’
‘ আপনারা আসলে কারা ?’
‘ আমরা সেই হারানো আটলানটিসের মানুষ। শুনেছেন আটলান্টিসের কথা ? অনেক বড় একটা দেশ ছিল সাগরের বুকে । পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতি ছিলাম আমরা। এক রাতে প্রচণ্ড ঝড়ে অতল সমুদ্রে ডুবে গিয়েছিল দেশটা।’
‘ হ্যাঁ, বইতে পড়েছিলাম। প্লেটো সাহেব বলেছিলেন তার ছাত্রদের। তারা লিখে গেছে। আমি তো ভেবেছিলাম পুর ব্যাপারতাই গাল গল্প। বানানো।’
‘ আরে না না, লজ্জিত ভাবে বলল লোকটা। ‘ সব সত্য। মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না। এই যা।’
কাচের জারের ভেতর থেকে মাছটা তুলে আস্তে করে চাপ দিলাম ওটার নীচ চোখে। চোখদুটো রুবির মত। ক্লিক ক্লিক শব্দ করে মাছটা স্মান দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। ভেতরটা হরেক রকমের বিঁদঘুঁটে যন্ত্রপাতি দিয়ে ভর্তি। কয়েক রকমের গিয়ার চিনতে পারলাম । নিজে থেকেই আবার জোড়া লেগে গেল আস্তে আস্তে করে। আলতো করে ওটাকে সাগরের বুকে ছেড়ে দিলাম। এক টুকরো নীল আলর মত ভাসতে ভাসতে চলে গেল মাছটা। সাবমেরিনের দিকে।
‘ আপনারা সাগরের তলায় থাকেন কেমন করে ?’ জাঞ্চে চাইলাম।
‘ সাগরের তলায় আমাদের বসতি বানিয়ে নিয়েছি। কোন রকম সমস্যা হয় না। তবে উপরের খবর জানতে ইচ্ছা করে। সেইজন্য তো এই মাছগুলো বানিয়েছি। ধন্যবাদ ভাই মাছটা ফেরত দেয়ার জন্য। আপনাদের কোন উপকার করতে পারি ? ? মনে হয় না শুধু মাছ ধরার জন্য এই জায়গায় চলে এসেছেন। জাহাজ ডুবি হয়েছিল ?’
সংক্ষেপে বললাম কাহিনি।
চুক চুক করে দুঃখ প্রকাশ করলো লোকটা। ততক্ষণে হাত বাড়িয়ে সাগর থেকে রোবট মাছটা তুলে নিয়েছে সে।
‘ আপনারা বাড়ি ফিরে যেতে চান এই তো ?’ জানতে চাইল লোকটা।
‘ নিশ্চয়ই।’ এক সাথে চিৎকার করে উঠলাম ।
‘ ঠিক আছে চিন্তার কোন কারন দেখি না।’ বলল লোকটা যে নিজেকে হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিকের মানুষ বলে দাবি করছে।। আপনাদের দেশ কোথায় ?’
বললাম ।
সবজান্তার মত মাথা নাড়লো সে। ‘ আমি আপনাদের ডিঙিতে একটা রোবট লাগিয়ে দিচ্ছি । ওটাই আপনাদের জায়গা মত পৌঁছে দেবে।প্রথমে কক্সবাজার নামবে , পরে আঙ্কেলের দেশ ভারতবর্ষে। ঠিক আছে ? এই নিন ।’
কথা শেষ করে লোকটা তার জামার বুক পকেট থেকে টিনের একটা খেলনা পাখি বের করে ছুড়ে দিল আমাদের দিকে। পাখিটা দারুন করে উড়তে উড়তে চলে এসে ডিঙির সামনে বসে পড়লো ।
‘ বিদায় স্থলের মানুষেরা। ভাল থাকবেন।’ হাত নেড়ে বিদায় নিল রহস্যময় লোকটা। সঙ্গে সঙ্গেই ভুউস করে কালো ঠাণ্ডা জলে দুবে গেল তিমিমাছের মত সাবমেরিনটা । আমাদের ডিঙিটা স্পিড বোটের গতিতে চলতে লাগল। পাখিটার দুই চোখ দিয়ে সবুজ এলো বের হচ্ছিল। সেই আলর সামনে একই রঙের গোলাকার ছায়া ছায়া ছবি ফুটে উঠছিল । তাতে সাগরের ম্যাপ, ডুবো পাহাড় , স্রোতের গতিপথ সব দেখা যাচ্ছিল।
দারুন জিনিস তো ! চোখ গোল্লা গোল্লা করে বললেন ভবানী বাবু।
কাহিনি টেনে লম্বা করার দরকার দেখি না।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমুদ্র সৈকতে এসে ভিড়লো আমাদের ডিঙ্গিটা।
পাখিটা যান্ত্রিক গলায় বলল,’ কক্সবাজার এসে গেছে কে নামবেন এখানে নেমে পড়ুন। ধন্যবাদ।
আবার বিদায় নেয়ার পালা।
হাউমাউ করে ভবানীকাঁদলেন বাবু। কান্নার জন্য নাক দিয়ে শিকনি বের হয়ে আমার জামা ভিজিয়ে দিল।
কাঠের বাক্স থেকে মুঠো ভর্তি করে ডাবলুন বের করে বড় একটা পোঁটলায় বেঁধে তুলে দিলেন আমার হাতে। আমার ভাগের মোহর।
বিদায় পিচ্চি মেট। ছলছল গলায় বললেন।
সৈকতে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। রাত কত হবে কে জানে। দূরে আমার শহরের পরিচিত দালানবাড়ি গুলো দেখা যাচ্ছে। আলো মিটমিট করছে ।
মুখ ফিরিয়ে সাগরের দিকে তাকালাম। ডিঙিটা নেই।
হঠাৎ করেই শন শন ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে গেল । এই বাতাস আমার পরিচিত। আকাশ কালো হয়ে গেছে। কয়েক মুহূর্ত অমন রইল। ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গেল ।
মেঘ চলে যেতেই দেখি উজ্জ্বল রোদ।
সৈকতের এক পাশে নরম বালিতে পড়ে আছে প্ল্যাসটিকের বালতি আর বেলচা। জিনিসগুলো আমারই। মাস তিনেক আগে আমিই বালি খুঁড়ে ঝিনুক বের করছিলাম। তারপরই তো ক্যাপ্টেন পাইন্ট বন্দি করে নিয়ে গিয়েছিল আমাকে।
বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম। পথে অনেকেই অবাক হয়ে দেখছিল আমাকে। আমার গায়ে ঢল ঢলে প্যান্ট। কোমরে ইয়া মোটা চামড়ার বেল্ট। বেলটের বকলস ভারি পিতলের। ওজন কমপক্ষে এক কেজি। গায়ে চামড়ার জামা। মাথায় তেকোনা বিচ্ছিরি টুপি। কাধে কাপড়ের বোঁচকা ।
যেমন খুশি তেমন সাজ অনুষ্ঠানে যাবে বুঝি ? জানতে চাইল ভাল মানুষ এক বুড়ো লোক।
জবাব না দিয়ে হন হন করে চলে এলাম।
শেষ কথা
আমার গল্প বাড়ির কেউ বিশ্বাস করেনি। কেউ না। পোঁটলা থেকে কয়েকটা মোহর বের করে জেঠু নিয়ে গিয়েছিল স্বর্ণকারের কাছে। হাসতে হাসতে ফিরে এসেছেন। মোহরগুলো আসল। অনেক দাম।
লোকজন জানল সৈকতে গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছি আমি। সঙ্গে সঙ্গে পাড়া প্রতিবেশি সবাই গাইতি বেলচা নিয়ে দৌড়ে গেল সৈকতে। মাস খানেক সমুদ্রের বালি তন্ন তন্ন করে উড়িয়ে ফেলল । শেষে রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি ফিরে গেল সবাই।
আমি নতুন ক্লাসে উঠেছি । পড়াশুনা করছি ভালমতই । সময় পেলেই জলদস্যুদের কথা ভাবি। কি হয়েছিল ওদের ? ভবানী বাবু বাড়ি গেছে ?
সময় পেলেই সৈকতে হাঁটি। রাতের বেলা নীল রঙের অদ্ভুত একটা মাছ দেখি , যখন একা থাকি।
তীক্ষ্ণ সিসের মত শব্দ করে ওটা। সুরেলা। ডুবে যায় তারপর।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন