গাড়িটা এমন জায়গাতে নষ্ট হলাে যে রাগে দুঃখে নিজের পাছায় নিজেরই লাথি মারতে ইচ্ছে করল ইউসুফের। ব্যাপারটা সম্ভব না তাই বিরত থাকল।
কী করা যায় এখন?
গাড়িটার উপর নিজের সব বিদ্যা প্রয়ােগ করল। না, গাড়িটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিছুতেই স্টার্ট নেবে না। ইউসুফের উপর কোনও পুরানাে রাগ আছে বােধহয় !
চারদিকে পাহাড় আর অচেনা গাছপালা। কোনও বসতি নেই। থাকার কথাও না। আরও মাইল পাচেক যাবার পর লােকালয় পড়বে। সেটাই রুমানিয়ার প্রথম গ্রাম।
শীত লাগছে দারুণ। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। গাছপালাগুলাে জবুথুবু হয়ে দাড়িয়ে আছে। ওদেরও কিছু করার নেই। চারদিকে অন্ধকার। আকাশে কয়েকটা তারা। তাতে আবছা দেখা যাচ্ছে চারপাশটা। কোথাও কেউ নেই। শুধু শীতের হাওয়ায় টুপটাপ করে গাছের শুকনাে পাতা ঝরে পড়ছে। একটা বা দুটো।
ভেউ ভেউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ইউসুফের। হয়তাে তাই করত। এমন সময় আলােটা দেখতে পেল। ডুবন্ত মানুষ হাতের কাছে পেল্লায় কাঠের একটা তক্তা পেলে বােধহয় এমন খুশিই হয়। কিংবা, রাস্তার ভিক্ষুক যখন ডাস্টবিনের মধ্যে পেয়ে যায় এক লক্ষ টাকা।
আনন্দে চিৎকার করে ফেলল ইউসুফ। ওই তাে সামনেই দেখা যাচ্ছে, মিটিমিটি হলুদ রঙের আলােটা বেশি দূরে নয়। আবছা বাড়ির কাঠামােটাও দেখা যাচ্ছে। এতক্ষণ দেখতে পায়নি কেন কে জানে। উত্তেজনার চোটেই হয়তাে !
গাড়িটা থাকুক এখানেই, ভাবল ইউসুফ। তারপর দ্রুত হাতে ব্যাক প্যাকারটা তুলে নিল গাড়ির ভেতর থেকে। দরকারি সব জিনিসপত্র আছে ব্যাগে।
পাসপাের্ট, ট্রাভেলারস চেক, টাকা পয়সা। কাগজ-কলম। আরও দরকারি জিনিসপত্র। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটা ধরল আলাে বরাবর। কিছুক্ষণ হাঁটার পরই আরও পষ্ট হয়ে গেল বাড়ির কাঠমােটা। পাথরের বীম আর কাঠের তৈরি বাড়ি। ডিজাইনটা পুরানাে, ইউরােপের আর সব সাধারণ বাড়ি-ঘরগুলাের মতই।
বাড়ির বাইরে একটা কাচের লণ্ঠন ঝুলছে। সেটাই দূর থেকে দেখতে পেয়েছে ইউসুফ। দরজার উপরে একটা সাইনবাের্ডও ঝুলছে। কাঠের বাের্ড। রঙ চটে গেছে। তারপরও ক্যাফে এন্ড বার’ লেখাট পড়তে পারল সে। কী ক্যাফে অ্যাও বার সেটা পরিষ্কার বােঝা গেল না। রঙ চটে গেছে কবে কে জানে !
‘মেঘ না চাইতেই জল।’ এই সব বাগধারা যেই বানিয়ে থাকুক বড় বেশি জ্ঞানগর্ভ বাক্য এটা। সারারাত পাহাড়ী পথে, অন্ধকারে, গাড়ির মধ্যে বসে থাকার চেয়ে একটা ক্যাফে এন্ড বারে বসে রাত কাটানাে অনেক ভাল। ভেতরে নিশ্চয় আরও মানুষজন থাকবে। একজন মােটর মেকানিকও পাওয়া যেতে পারে। উফ। ভাগ্য বােধহয় এটাই। এখন দরকার গরম কোনও পানীয়। যা ঠাণ্ডা বাইরে।
শক্ত পাথুরে পথ বেয়ে উঠে গেল ক্যাফেটার সামনে। কাঠের বিশাল দরজা। বন্ধ। কাচের অস্বচ্ছ ঘােলাটে জানালার ভেতরে আলাে দেখা যাচ্ছে। পনিরের মত আলাে। বারান্দাতে দুটো চেয়ার আছে। শূন্য। শীত কম থাকলে লােকজন হয়তাে বসে এখানে। নীচের দিকে ফিরে তাকাল ইউসুফ। দূরে ওর গাড়িটা দেখা যাচ্ছে ছােট্ট একটা গুবরে পােকার মত।
হাতের তালু দিয়ে ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল।
মাঝারি আকৃতির একটা কামরা। বড় জোর ছয়টা টেবিল। প্রতিটা টেবিলের সামনে চারটা করে চেয়ার। টেবিলের উপর রূপালী রঙের মােমদানি। তাতে মােম জ্বলছে। চেয়ার টেবিলগুলাে সবই কালাে রঙের। ভিক্টোরিয়ান যুগের। বেশ কয়েকজন খদ্দের বসে আছে। সামনে পেতলের পানপাত্র। একপাশে দেয়াল জোড়া বার। হাজার পদের বােতল ভর্তি। একজন রােগা মধ্যবয়স্ক লােক ন্যাকড়া দিয়ে পরিষ্কার করছে বারের কাউন্টারটা।
দরজা খুলে যাওয়ায় সবাই ফিরে তাকাল ইউসুফের দিকে। শান্ত একঘেয়ে দৃষ্টি ! কারও চোখে কোনও কৌতুহল নেই। কী করবে ঠিক বুঝতে না পেরে বােকার মত হাসল সে। মুখে বলল, শুভ সন্ধ্যা।’
উত্তরে দু’একজন মাথা ঝাকাল। ব্যস এই-ই। তারপর সবাই মুখ ফিরিয়ে যার যার মত ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
খুব একটা অবাক হলাে না ইউসুফ। ইউরােপের প্রত্যন্ত এলাকায় অনেক গ্রামের মানুষই এরকম। নতুন লােকজনের সাথে প্রথম পরিচয়ে সহজ হতে চায় না। কেন কে জানে ! অবশ্য কুসংস্কারপূর্ণ এই মানুষগুলােকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। হাজার বছর ধরে বিদঘুটে সব লােকগাথা, কাহিনি আর রক্ত হিম করা উপাখ্যান ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই জনপদগুলােতে। অচেনা লােক মাত্রই আগন্তুক। রহস্যময় ! বিপজ্জনক।
শুধু রোগা বারটেন্ডার লােকটা ওর দিকে তাকিয়ে হাসির মত একটা ভঙ্গি করল। তাও ভাল। সােজা বারের সামনে এগিয়ে গেল ইউসুফ। কাঠের লম্বা কয়েকটা টুল রয়েছে সামনে। সবগুলােই খালি। একটা টেনে নিয়ে বসল সে …
‘বাইরে খুব ঠাণ্ডা।’ পেশাদারি ভঙ্গিতে আলাপ জমানাের চেষ্টা করল বারটেণ্ডার।
‘হ্যা।’ সায় দিল ইউসুফ। ভাগ্য খারাপ ! আমার গাড়িটা হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেছে।’
‘এই এলাকায় আগে দেখিনি আপনাকে কখনও।’
“হ্যা। আমি টুরিস্ট।’ ব্যাখ্যা করল ইউসুফ। ঠিক টুরিস্টও না। আমি একজন লেখক। ইউরােপের প্রত্যন্ত গ্রামগুলােতে যে সব ভয়াল কিংবদন্তী ছড়িয়ে আছে সেগুলাে সগ্রহ করে লিখছি আমি। আসলে আমি একজন হরর গল্প লেখক। তিনটে বই বেরিয়েছে আমার। সবই হরর গল্পের। এবার প্রচলিত ঘটনাগুলাে অবলম্বন করে লিখতে চাই।’ ..
‘যেমন? অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বারটেণ্ডার। কেমন বােকা বােকা দেখাচ্ছে বেচারার চেহারা। রােগা মুখটাতে গোঁফজোড়া ঝুলে আছে।
হাসল ইউসুফ। বলল, “রুমানিয়া আর তার আশপাশের গ্রামগুলাের বাসিন্দারা নাকি আজও ভ্যাম্পায়ারের অস্তিত্ব বিশ্বাস করে, সত্যি নাকি?’
মাথা নাড়ল বারটেণ্ডার। চেহারাতে বিরক্তির ছাপ।
‘আরে ধ্যাত !’ বলল সে। এসব আবার আছে নাকি? ভ্যাম্পায়ার, রক্তচোষা, সারাদিন মরে থাকে, সন্ধ্যার পর কবরস্থানের কফিন খুলে বেরিয়ে আসে ! যত সব ফালতু গল্প।’
‘তাই নাকি !’ অবাক হলাে ইউসুফ। ‘আমি তাে শুনেছি, এই এলাকার মানুষজন আজও কাঁচা রসুন খায় ভ্যাম্পায়ারের হাত থেকে বাঁচার জন্য। আমি নিজেও সের তিনেক রসুন নিয়ে এসেছি। গাড়িতে রয়ে গেছে অবশ্য।’
বিরস মুখে ইউসুফের কথাগুলাে শুনল বারটেণ্ডার। সম্ভবত ইউসুফকে পাগল ভাবছে। আশপাশের টেবিলের নর-নারীগুলাে পর্যন্ত কান খাড়া করে বসে আছে। শুনছে ওরা ইউসুফের কথাগুলাে।
‘ভ্যাম্পায়ারের গল্প আমরাও শুনেছি ।’ বলল বারটেণ্ডার। তবে ওরা যদি থাকেও আমাদের কোনও ক্ষতি করেনি কখনও। কাজেই ওরা থাকলেও আমাদের কিছু যায় আসে না। আমাদের পাশের গ্রামের মানুষ মাঝেমধ্যেই তাদের মৃত-আত্মীয়-স্বজনদের কফিন খুলে হৃৎপিণ্ডের মধ্যে কাঠের ক্রুস ঠুকে দেয়, যাতে ভ্যাম্পায়ার না হতে পারে । যত্তোসব ফালতু কুসংস্কার। মানুষ মঙ্গলগ্রহে কুমড়ার চাষবাস করার চিন্তা-ভাবনা করছে আর এরা কী না…!
কথাটা শেষ করল না বারটেণ্ডার। পাছে ইউসুফ মনে দুঃখ পায়।
সমঝদারের মত মাথা নাড়ল ইউসুফ। নাহ। বারটেণ্ডারটাকে পছন্দ হলাে তার। বেশ যুক্তিবাদী মানুষ। অজ পাড়াগাঁয়ে থেকে থেকে মনটাকে কুসংস্কারের খামার বানিয়ে ফেলেনি। শুধু অবাক হলাে এই ভেবে এখনও লােকটা ওকে কোনও পানীয় পরিবেশন করেনি কেন? এমন কী জানতেও চায়নি কিছু লাগবে কিনা ! আজব তাে।
‘আপনার এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে?’ বাধ্য হয়ে জিজ্ঞেস করল ইউসুফ।
না, আগে ছিল। এখন নেই। খদের পাই তেমন। সবাই শুধু পান করতেই আসে।’
দিন তা হলে কোনও পানীয়। যেটা এই এলাকায় বিখ্যাত। আপনি বারটেণ্ডার, আপনি বােধহয় জানেন, সব জায়গাতেই বিখ্যাত পানীয় থাকে, যা ওই দেশের বা এলাকার ঐতিহ্য…বা ব্র্যাণ্ড নেমের মত। আমাদের দেশের মানুষ ভাত পচিয়ে মদ বানায়। ওইটাই ঐতিহ্য। ক্যারিবীয়ান দ্বীপগুলােতে নারকেলের মদ বা আফ্রিকাতে আখ পচিয়ে মদ…জানেন বােধহয় এসব।’
হাসল বারটেন্ডার। এরকম জ্ঞানী খদ্দের পেলে কার না ভাল লাগে। তার উপর লেখক মানুষ !
মাটির একটা সুরাই থেকে পেতলের পান পাত্রের মধ্যে লাল রঙের মদ ঢালল বারটেণ্ডার। তারপর সেটা যত্নের সাথে এগিয়ে দিল ইউসুফের দিকে। মুখে হাসি । “নিন, স্যর। আপনার ভাল লাগবে।’ বলল।
পেতলের পাত্রটা হাসি মুখে হাত বাড়িয়ে নিল ইউসুফ। ইউরােপের এই নিঝুম এলাকাগুলােতে এখনও কাচের পাত্র জনপ্রিয় হয়নি। ভাবতেই হাসি পেল। গ্লাসের ভিতরে কালচে লাল রঙের পানীয় আঙুরের মদ। ঠাণ্ডা পাহাড়ি এই জায়গাগুলােতে আঙুরও হয়। অগুনতি।
পানপাত্রটা হাতে নিয়ে ভাবল ইউসুফ বারটা এত ময়লা কেন। এত ধূলার তৃপ। মাকড়সার জাল । এত কম খদ্দের হলে টিকে আছে কীভাবে?
এক চুমুক মদ মুখে দিয়ে টুপ করে গিলে ফেলল ইউসুফ। সাথে সাথেই চমকে উঠল। ওয়াক থুঃ করে বমি করার দশা হলাে ওর। তড়াক করে উঠে দাঁড়াল টুল থেকে। ঘেন্নায় বিকৃত হয়ে গেছে চেহারা। রাগে কাঁপছে থর থর করে। হাতের ধাক্কায় উল্টে পড়ে গেছে পেতলের পানপাত্রটা।
‘এটা কী ধরনের রসিকতা?’ গম গম করে উঠল ইউসুফের কণ্ঠস্বর । মানে কী এসবের?
কাঠের বারের উপর সুন্দর তৈলচিত্রের মত ডিজাইন করে ছড়িয়ে পড়েছে তরলগুলাে যেটা দিয়ে ভর্তি ছিল ইউসুফের পানপাত্রটা। আঙুরের মদ নয়। তাজা রক্ত। তরমুজের রসের মত তরল লাল রক্ত। আঁশটে । ঘিনঘিনে।
‘কী মানে এই ফাজলামাের?’ আবার চিৎকার করে উঠল ইউসুফ। ঘেন্নায় বমি – আসছে ওর।
হঠাৎ খেয়াল করল ইউসুফ কামরার ভিতরের সবাই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সবাই যেন দেখছে কোমও মঞ্চ নাটক। শুধু তাই নয়, সবাই যেন কীসের জন্য অপেক্ষাও করছে। রােমহর্ষক কোনও শেষ পরিণতির জন্য অপেক্ষা করছে ওরা সবাই ।
‘দুঃখিত, স্যর।’ দুঃখীমানুষের মত গলায় বলল বারটেণ্ডার রােগা লােকটা। সত্যি বড় করুণ লাগছে বেচারার চেহারা ।
‘কিন্তু…’ একটু থেমে হতাশ গলায় আবার বলল বারটেণ্ডার, আমাদের আর কোনও উপায় নেই, ‘স্যর। এই একটা জিনিসই আমরা পান করতে পারি। রক্ত । এটা খেয়েই বেঁচে আছি আমরা।’
এই প্রথম হাসল লোকটা। কামরার ভিতরের কমলা রঙের লণ্ঠনের আলােতে ঝিক করে উঠল তার মুখের দুই পাশের বড় বড় দাত দুটো। তীক্ষ্ণ, সাদা, সূচাল, যা শুধু পশুদের থাকে।
আতংকে এক পা পিছিয়ে এল ইউসুফ। পায়ের সাথে টুল বেধে চিৎ হয়ে পড়ে গেল সে শক্ত পাথরের মেঝেতে। তাকিয়ে দেখল কামরার ভেতরে বসে থাকা নারী-পুরুষগুলাে সবাই ওর দুরবস্থা দেখে হাসছে। সবার মুখের দুই কোণ দিয়ে ঠেলে বেরিয়ে এসেছে সাদা বড় বড় শব্দান্ত । ভয়াল। বীভৎস !

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন