মোট আট ভাই বোন।
বসু বাবুর বাড়ির গোলাপি রঙের বারান্দায় জন্ম নিয়েছিল ওরা।
বসুবাবু থাকলে সমস্যা হত না। উনার মন বড়।
উনি নেই। কোলকাতায় চলে গেছেন। বাড়ি খালি। সেই বাড়ি দখল করে নিয়েছে চেয়ারম্যানের ছেলে। ওটা ক্লাব ঘর এখন । আড্ডা। তাস। এবং বিচ্ছিরি সব বোতল খোলা হয়।
ক্লাবের ছেলেপিলেরা ওদের রাস্তার পাশে ফেলে দিল।
তাও পারতো না, যদি ওদের মা থাকতো। মা গিয়েছিল উকিলপাড়ার মিষ্টির দোকানের সামনে। ওখানে বেশ কয়েকটা মিষ্টির দোকান আর একটা বেকারি আছে। খানিক দাঁড়িয়ে থাকলেই কেউ না কেউ লাথি দেয়। কিন্তু দোকানের মালিক থাকলে বাসি খাবার ছুড়ে দেয়।
এক দুই চক্কর দিলে খানিক খাবার হয়ে যাবে। বেচারি মাত্র বসেছে । কোত্থেকে সরকারি লোক এসে লোহার শিক দিয়ে ওর গলা চেপে ধরল। মা বার বার চেঁচিয়ে বলতে লাগল, আমার বাচ্চারা না খেয়ে আছে। আমি পাগল না।'
কিন্তু কি একটা ইনজেকশন দিতেই আথালি পাথালি করে ওদের মা মরে গেল।
লাশটা ট্রাকের উপর ফেলে সরকারি লোকদুইজন বিড়ি টানতে টানতে চলে গেল গাড়ি চালিয়ে।
আট ভাই বোন জানে না মা নেই। ওদের পেট ভর্তি খিদে । কাঁদছিল কুই কুই করে । তখন বিরক্ত হয়ে ক্লাবঘরের ছেলেরা রাস্তার পাশে ফেলে গেল ওদের।
বাপরে এ কেমন জায়গা !
ভীষণ গোলমাল। দানবের মত লোকজন হেঁটে যাচ্ছে। বড় বড় যান্ত্রিক দানব চারচাক্কার উপর দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ভীষণ বাজে জায়গা। ওরা খিদেয় কাঁদছিল। কোত্থেকে দুইজন লোক এসে ওদের মধ্য থেকে দুইজনকে তুলে কাপড়ের ব্যাগে ভরে নিয়ে হাঁটা ধরল।
রইল ছয়।
রাস্তার উল্টাপাশের খাবারের দোকানের ঘ্রাণ পেয়ে পিচ্চি বোনটা হাঁটা ধরল কি মনে করে।
বড় একটা ট্রাক পিষে দিল বোনকে। হেল্পার খুশি গলায় ড্রাইভারকে বলল, ' কামের কাম করছেন ওস্তাদ। আপ্নের টার্গেট জীবনেও মিছ অয় নাই, হে হে। '
পাঁচ ভাই বোন তখনও খেলছিল।
ওরা দেখতে বেশ নাদুস নুদুস। ফর্শা। ভাল জাতের। সন্ধ্যার আগে আগে বাকি চারজনকে কে, কে তুলে নিয়ে গেল। শেষ ভাইটা একা একা কাঁদছিল। কাঁদছিল মায়ের জন্য। অন্য ভাই বোনের জন্য। খাবারের জন্য। নিষ্ঠুর পৃথিবীর হৃদয়হীনতার জন্য ।
তখন সেই পথ দিয়ে আসছিল গাট্টাগোঁটটা গোঁফওয়ালা ডাকাতদের মত দেখতে এক ভদ্রলোক । আমার বাবা।
কয়েক দিন আগেই আমি ' তেরি মেহরি বানিয়া' মুভি দেখে হাউমাউ করে কেঁদেছি। নায়ককে ভিলেন খুন করে ফেলে। তখন নায়কের পোষা কুকুর প্রতিশোধ নেয়। একটা কুকুর লাগবেই ।আমাকে যদি কেউ খুন করে ?
বাবাকে বললাম, ' বাবা একটা কুকুর পালব ।'
বাবা বললেন, ‘কুত্তা পাল্বি ? তরে পালে কে ? তর পিছে আমি টাকা পয়সা নষ্ট করছি। তর হাত পা ভাইঙ্গা লুলা বানাইয়া দিমু। হেন তেন...।'
কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় আশ্চর্য রকমের সুন্দর তুলতুলে একটা কুকুর নিয়ে ফিরে এলো বাবা।
শাদা উলের বলের মত কুকুরটা দেখে মা বলে উঠলো, ' ওর খিদে পেয়েছে রে।'
এত পিচ্চি ! কি খাবে ?
দুধ গরম করা হল। বাতিল একটা দইয়ের পাতিলে করে সেই হালকা গরম দুধ দেয়া হল পিচ্চিকে। দই খাওয়া শেষ হলে মাটির এই চ্যাপ্টা পাতিলটা কখনই ফেলে না মা। কাঁঠালের দানা ভাঁজার কড়াই হিসাবে কাজে লাগায়। গুল্ম জাতীয় গাছ বুনে। মাছ কাঁটার ছাই রাখে । একটা ছিল তখনও । সেটা এখন পিচ্চির দুধের বাটি হল ।
কতদিন না খেয়ে ছিল কুকুরটা কে বলবে !
অনেকক্ষণ ধরে খেল চুকচুক করে।
আমরা ভেবেছি খাওয়া শেষে আমাদের সাথে খেলবে। কি কাণ্ড। খাওয়ার পর দেখি ঘুমে ওর চোখ জড়িয়ে আসছে।
কোথায় ঘুমাবে ? জুতার বাক্স ছিল কয়েকটা। বাবার জুতার বাক্স নিলাম। উনার পায়ের সাইজ রাক্ষসের পায়ের সাইজের মত। বাক্সটা সঙ্গত কারনেই বড়। ভেতরে পুরানো ছালার কার্পেট ভরলাম।
ছালার কার্পেট জিনিসটা মায়ের বানানো জিনিস। চালের বস্তার সেই চটের ব্যাগটা কেটে সুন্দর করে সেলাই করে পুরানো উল দিয়ে ফুল লতা এঁকে কেমন একটা তুরস্কের জিনিস বানিয়ে ফেলে মা। মেঝেতে বিছিয়ে রাখলে কার্পেট কার্পেট দেখায় । শীতকালে বেশ উম লাগে।
আমাদের অত টাকা কই কার্পেট কিনব ?
মায়ের বানানো কার্পেটে আবার লেখা থাকে -
তুমি থাক গাছের ডালে
আমি থাকি জলে।
তোমার আমার দেখা হবে
মরণের কালে।
এটা নাকি মাছ আর মরিচের কথা বলা হয়েছে। হায় হায়। আমরা জানব কেমন করে ?
তো, বাক্সের ভেতরের আরামদায়ক পরিবেশ পেয়ে কুকুরছানাটা ঘুমিয়ে পড়লো ।পরদিন ঘুম ভাংতেই আবার খিদের জন্য কান্না করতে লাগল।
দইয়ের পাতিলে গরম দুধ দেয়া হল। অনেক সময় নিয়ে খেল। মাঝে মাঝে আমাদের দিকে কৃতজ্ঞ চোখে তাকাচ্ছিল। চেহারায় বেশ খুশির ছাপ। খাবারের সমস্যা হবে না বুঝতে পেরেছে। সম্ভবত আমাদের বাড়ি ও পছন্দ হয়েছে।
খেয়ে একটা হাই দিয়ে বারান্দার রোদে ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমের মধ্যে খানিক ন্যাজ নাড়ছিল , মাঝে মাঝে ।
ওর নাম কি রাখব ? কুকুরদের জন্য তো আর শিশুর সুন্দর নাম টাইপের বই পাওয়া যায় না। আমরা ওর নাম রাখলাম - টমি। ওটা কুকুরদের বেশ কমন নাম। ও আপত্তি করবে না আশা করছি।
মানুষের মধ্যেও কমন নাম থাকে। যেমন, ভারতে হলে- রাম, শাম ,যদু, মধু ,নেপা, ভ্যাপা, হরি ।
বাংলাদেশ হলে- আবুল, বাবুল, কাবুল , কাদের, শুকুর, রহিম, করিম, ইদ্রিস।
চীন হলে- চ্যাঙ, ব্যাঙ, ম্যাং, ঠ্যাং, মিং, বিং, ঝিং ।
নেপাল হলে- জং বাহাদুর তামাং,কুকরি ।
রাশিয়া হলে- তাতাভস্কি, মাতাভস্কি, অস্ত্রভস্কি, হাতুড়িভস্কি, পাউরুতি ভস্কি, সুচিত্রা দিমিত্র ।
আফগানিস্থান হলে - পায়েস খান, হালুয়া খান, জিলিপি খান, মোগলাই পরোটা খান, ধুন্ধুমার খান ।
পাঁচ দিন ধরে টমি শুধু খেয়ে খেয়ে ঘুমাল। বেশ নাদুস নুদুস হয়ে গেল। এখন বুঝে গেছে এই পরিবারে ও একজন।
নিজেই দায়িত্ব বেছে নিল। অচেনা কেউ বারান্দায় আসলেই কেমন পটল পটল ভঙ্গিতে দৌড়ে যেত। তাউ তাউ তাউ করে চিৎকার করতো। আমাদের সাথে খেলত। তখন আমরা মাত্র একটা জাদুবিদ্যার মন্ত্র জানতাম।
ছু- মন্তর ছু ।
কালা কুত্তার...।
কিন্তু টমি আসার পর থেকে এই বাজে মন্ত্রটা বাদ দিলাম । ওর সম্মানেই।
কাজ না থাকলে আমাদের জুতা চিবিয়ে দেখত স্বাদ কেমন। বিকেলে আর সব বাচ্চাদের সাথে যখন ফুটবল খেলতাম তখন ও দুই পক্ষের হয়েই খেলত। বল পেত না। গোল ও করতে পারতো না। কিন্তু পুরো উঠান জুড়ে কেমন একটা ব্যস্ত ভঙ্গিতে দৌড়াতো। সাথে চিৎকার।
টমি বারান্দা ছেড়ে অন্য কোথাও যেত না। এটাই ওর রাজ্য।
ওর দইয়ের পাতিলে খাবার দেয়া হত তিনবেলা। প্রতিদিন পাতিল পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হত। ভাত, মাছ, মাংস দেয়া হত , আমরা যা খেতাম। বাজার থেকে মাংসের ছাটি কিনে হলুদ লবণ দিয়ে সেদ্দ করে টমিকে দেয়া হত।
প্রতিদিন কেউ না কেউ বাথরুমে নিয়ে আচ্ছা করে সাবান ঘষে ওকে স্নান করিয়ে দিত।
আমরা যখন বিকেলে চা বিস্কুট খেতাম তখন আধ হাত লম্বা লাঠি বিস্কুট দেয়া হত ওকে। সেটা নিয়ে খেলবে না খাবে তাই বুঝে উঠতে পারতো না টমি।
একা একাই নিজের বিস্কুট নিয়ে উথাল পাথাল করতো। ভাব দেখে মনে হত আমাদের বিস্কুট শেষ হলে ওর ভাগেরটা খেয়ে ফেলব। অমন হয় নাকি ?
প্রায় আধ ঘণ্টা লাগতো নিজের বিস্কুট শেষ করতে।
আমরা টমিকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম । অন্য কোন জন্তু পাত্তা দিতাম না। প্রতিবেশীদের বিড়ালের বাচ্চা চলে আসলে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বলতাম-
বিলাই ম্যাও।
কাঁটা খাও ?
পয়সা দিলে
দুঃখ পাও ?
বিড়ালটা কেমন মিহি সুরে ম্যাও বলে অপমানিত হয়ে চলে যেত ।
একদিন পাশের মহল্লার বন্ধু গাবলু এসে বলল, ' কুত্তাটা বেচবি নাকি ? তিন টাকা দেব।’
গাবলু সেই অর্থে আমার ভাল বন্ধু না। বেশ হিংসুটে। ওর আসল নাম জানি না। মাথা সারা বছর ন্যাড়া। সেই ন্যাড়া মাথায় ফোঁড়া ভর্তি। মনে হয় মাথাটা ভুগোলক। ফোঁড়া গুলো এক একটা দেশ। কয়েকটা ফোঁড়া আধা পাকা। সব মিলিয়ে বিচ্ছিরি। ওকে কেউ খেলায় নেয় না। কারন খেলতে গেলেই ফোঁড়ায় ব্যাথা পায়। ওর মা বিশাল এক ঝাড়ু নিয়ে ঝগড়া করতে আসে। সবাইকে গোলামের পুত বলেন।
যেমন - ওই গোলামের পুতেরা তরা আমার পুতেরে ব্যাথা দিছস ক্যান ?
এই গোলামটা আসলে কে ?
ইশকুলের গোলাম মাওলা স্যারের কেউ ?
বিরক্ত হয়ে গাবলুকে সাফ সাফ জানালাম , টমিকে বিক্রি করব না।
কেমন একটা হাসি হাসল গাবলু। বলল, ‘আচ্ছা যা তিন টাকা, একটা মার্বেল, পুরানো একটা ব্লেড আর খালি একটা দেশলাইয়ের বাক্স দেব ।‘
আরও বেশি বিরক্ত হলাম। টাকার কাছে আমি বিক্রি হই নাকি ?
শেষে গাবলু মুচকি হেসে চলে গেল।
অমন হাসি সিনেমার ভিলেনদের মুখে দেখা যায়। তারপর তো বিরতির পর নায়কের জীবনে হাজার সমস্যা শুরু হয়।
পরদিন ইস্কুল থেকে ফিরে শুনি টমিকে পাওয়া যাচ্ছে না।
বারান্দায় ছিল।
সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম কি হয়েছে। ছোট দুই ভাইকে নিয়ে রওনা হলাম গাবলুর বাসার দিকে। ছোট ভাই মনে করে ইয়া বড় একটা লাঠি নিয়ে নিল হাতে। লাঠি ওর চেয়ে ছয়গুন বড়। ওকে দেখাচ্ছিল মোসেজের মত। এই লাঠি দিয়েই সাগরের জল আলাদা করে ঐ পারে নিয়ে যাবে পুণ্যবানদের ।
গাবলুকে দেখলাম।
টমিকে বেঁধে রেখে পোড়া রুটি খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। টমি মুখেও তুলছে না।
আমাদের দেখে ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার শুরু করলো টমি। তিনজনকে আসতে দেখে প্রাণটা হাতে নিয়ে গাবলু ভেগে গেল। এত জোরে দৌড়াতে পারে জানলে ওকে আমরা খেলায় নিতে পারতাম।
এখন জানলাম। কি লাভ ! ও তো আমাদের শত্রু ।
টমিকে উদ্ধার করে আমরা বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। ছোট ভাই কি মনে করে গাবলুদের বাড়ির উঠানের মাটির কলসিটা লাঠির বাড়ি দিয়ে ভেঙ্গে ফেলল। উঠানে এক জোড়া তাপ্পিমারা স্যান্ডেল আর ক্ষয় হতে হতে ছোট হয়ে যাওয়া একটা ঝাড়ু ছিল । সেইগুলো ড্রেনে ফেলে দিল।
নইলে নাকি ওর রাগ কমছিল না। আরও কি কি করতো কে জানে ! ভেতর থেকে গাবলুর মা ভেজিটেবল চুন্নি মানে শাকচুন্নির মত চিৎকার করে উঠলো, ' ঐ গোলামে পুতেরা...।'
চলে এলাম।
বাসায় ফিরে মা কে অনেক তিরস্কার করলাম। তুমি থাকতে টমি চুরি হল কেমন করে ?
মা লজ্জিত মুখে বলল ,তর বাবা তিনপদের মাছ এনেছে আজকে ।কাকে কাকে নাকি নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবে।'
আমরা বিরক্ত। টাকা পেলেই বাবা মাছ কিনে উনার বন্ধুদের ডেকে এনে খাওয়ায়। উনার ইয়ার দোস্তরা প্রায় পিশাচের মত খায়। বাবা হেসে বলেন , কইছি না তর বৌদির হাতের রান্না ভাল।’
ব্যাপারটা বিরক্তকর। ঠিক করলাম বড় হয়ে বাবাকে হাঙরের মুখে ফেলে দেব। হাঙ্গর না পেলে সামনের খাল কেটে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসব। খাল কাটলেই কুমির আসবে।
প্রায় আধা কেজি সাবান ঘষে টমিকে আচ্ছা করে স্নান করিয়ে দিলাম।
মানুষ হলে ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হয়ে যেত। কাই কুই করে অনেক কথাই বলল টমি। ওদের ভাষাটা জানলে ভাল হত। মনে হচ্ছে মোস কোডের মত কোন সাঙ্কেতিক ভাষা। বিজ্ঞানীরা কেন যে আজও জীবজন্তুর ভাষা বুঝে উঠার মত যন্ত্র বানাতে পারলো না সেটাই অবাক লাগে আমার কাছে !
আসলে জগদীশ বাবুর মত কোন ভদ্রলোক থাকলে ঠিকই বের করে ফেলত। উনিই তো গাছের প্রানের ব্যাপারটা বের করেছেন। কাণ্ড দেখেছ !
টমিকে আর চোখের আড়াল করতাম না। গাবলু অনেক দিন পালিয়ে পালিয়ে রইল। প্রায় আধা মাইল দূরে আমাদের দেখলেও বেচারা দৌড় দিত। ওর মাথার ফোঁড়া আরও বেড়েছে। পাপের শাস্তি।
দিন যেতে লাগল। ঝরে পড়া রাতের শিশিরের মত। টাইম ফুলের মত বাতিল হয়ে যায় এক একটা দিন ।
টমি বড় হতে লাগল। রোমানিয়ার শালগমের মত শাদা ওর সারা গায়ের পশম। কিন্তু একটা চোখ আর কান কালো। আমরা নিশ্চিত আগের জন্মে টমি জলদস্যু ছিল। পাপের ফলে এই জন্মে কুকুর হয়ে জন্মেছে। আমরা ওকে ভালবাসি। কারন কবি বলেছেন- পাপকে ঘৃনা কর কুত্তাকে নয়।
ফকির মিসকিনের ছন্মবেশে দুপুর বেলায় চোর আসতো আগে। বারান্দা থেকে জামা কাপড় জুতা চুরি করে নিয়ে যেত।
টমির ভয়ে ওরা আসে না।
মূল ফটকের সামনে কেউ দাঁড়ালেই টমি সিটাকোসরাসের মত চিৎকার করতে থাকতো।
দিনগুলো ওমনিতেই যেত।
আচমকা আমাদের মহল্লায় চুরি বেড়ে গেল।প্রায় সব বাড়িতে চুরি হতে লাগল। আমাদেরটা বাদে। কিন্তু জানি তস্কররা আমাদের বাড়িতে নজর রেখেছে।
সবাই মিলে চাঁদা তুলে মহল্লায় একটা দারোয়ান রাখল। প্যাঁকাটি মত লোক, গলাটা ধনেশ পাখির মত। ছোট মসজিদ থেকে মহল্লার শেষ মাথার কৃষ্ণচূড়া গাছটা পর্যন্ত হেঁটে যায়। আচমকা চিৎকার করে উঠে - বস্তিবাসি জাগো।
কষে ধমক দেয়া হল উনাকে। বোঝান হল, এটা তো বস্তি না। অভিজাত একটা মহল্লা। বস্তি বলছে কেন ?
সেইরাত থেকে চিৎকার দিত- মহল্লাবাসি জাগো।
মাত্র এক সপ্তাহ পাহারা দিল ধনেশ পাখি।
কাজ ছেড়ে চলে গেল। অনেক অনুরোধ করার পরও ফিরল না। তবে জানা গেল চোর নাকি এই মহল্লার কয়েকজন বখাটে ছেলে। ওরা নেশার টাকা যোগাড় করার জন্য চুরি করে। ওদের সে চিনে ফেলেছে। এবং তস্কররা ধনেশকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। ব্যাপারটা আসলেও ভয়ংকর।
টমি ততদিনে বারান্দায় ঘুমান শুরু করেছে। সারারাত বাড়ি পাহারা দিত। দিনের বেলায় বারান্দায় অলস ভাবে দুই হাতের উপর থুতুনি রেখে সাধু সন্ন্যাসীদের মত আলফা স্তরে গিয়ে ঘুম দিত।
সেটা ছিল বাদলার রাত। মিহি বৃষ্টি হচ্ছিল। উগান্ডার কাবালে নামের গ্রামে প্রায় রাতেই অমন মিহি বৃষ্টি হয়। আমরা ঘুমে মাটি হয়ে গেছি। আচমকা বাইরে ভীষণ গোলযোগ। হল্লা মল্লা ভীষণ। সেই সাথে আকাশ বাতাস কাপিয়ে টমির চিৎকার।
কে যাবে বাইরে ?
বিছানার পাশের জানালা খুলতেই বারান্দায় টিনের শেডের ভেতরে ঝুলে থাকা বিজলি বাতির আলোতে দেখলাম চার- পাঁচ জন লোক লাঠি আর লোহার রড দিয়ে টমিকে মারছে। মার খেতে খেতে পিচ্চি টমি ওদের সাথে লড়াইয়ের চেষ্টা করছে। সেই সাথে চিৎকার করে আমাদের ডাকছে।
আমরা জেগে যাওয়ায় লোকগুলো ভেগে গেল। মুখে গামছা ছিল ওদের। চিনতে পারিনি। কিন্তু দৌড়ে যাওয়ার ভঙ্গি দেখে মনে হল একজনকে চিনি।
সবাই বাইরে গেলাম।
মার খেয়ে টমির মাথা কেটে গেছে দুই তিন জায়গায়। রাস্পবেরি ফলের মত রক্ত সেখানে। পাঁজরের এক জায়গায় বড় ক্ষত। জিভ বের করে ফ্যা ফ্যা করে হাঁপাচ্ছিল।
করুন চোখে আমাদের দিকে চেয়ে যেন বলছে, ' এত দেরি করলে তোমরা ? কত ডাকলাম। আরেকটু আগে এলে এত মার খেতে হত না।'
সারারাত ব্যাথ্যায় কাঁদল টমি।
মা ওর মাথায় স্যাভলন ক্রিম মাখিয়ে দিল।
সকালে রিক্সায় করে ওকে ভিকটোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে গেল বাবা। বেশ দূরে। নিতাইগঞ্জের কাছে। উল্টোদিকে একটা দমকল আপিস আছে। সাথে একটা রেডিও মেরামত করার দোকান।
এক বিহারী বুড়ি বাবাকে চিনত। উনি হাসপাতালের আয়া। পরিচিত ডাক্তার ডেকে টমির মাথায় সুন্দর করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। একটা পা ভেঙ্গে গেছে ওর। সেটাও মুড়িয়ে দিল।
বাসায় ফিরে এলো টমি ।
চেহারা দেখেই বুঝা যায় মড়ার হাত থেকে ফিরে এসেছে।
দিনরাত বারান্দায় শুয়ে থাকে। চোখ লাল। হাঁটতে পারে না ভাল করে। মা বলল ওর জ্বর হয়েছে।
ডাক্তার তো ওষুধ দেয়নি। মা গরম দুধে হলুদ মিশিয়ে খেতে দিল ওকে।
খায় কি খায় না। সারাদিন আলস্য মাখা শরীরে শুয়ে থাকে। এত কিছুর পরও অপরিচিত কাউকে দেখলে পড়িমরি করে উঠে দাঁড়াতে চায়। দুর্বল গলায় চেঁচায়।
আমাদের মায়া লাগে খুব।
প্রায় পনের দিন ভুগল টমি। ভাল হয়ে গেল। কিন্তু খুব দুর্বল। হালকা খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটে। আগের মত দৌড় ঝাঁপ করতে পারে না।
মাথায় তিনটে শুকনো ক্ষত সাক্ষী দেয় কিছু মানুষ ওর সাথে মানুষের মতই ব্যবহার করেছিল।
আমরা আবিষ্কার করলাম দুই চারজনকে দেখলে টমি ভীষণ ভাবে চিৎকার করে। কেন যেন মনে হচ্ছে ওরাই মেরেছিল টমিকে। বাজে ধরনের ছেলেপিলে ওরা। মনির ভাইয়ের দোকানের পাশের সিঁড়িতে বসে দিনরাত আড্ডা দেয়। একজনের পকেটে মাছ মার্কা চাকু আছে। ফলাটা চকচকে কিন্তু পিতলের হাতলটা মাছের লেজের মত। সেইরকম জিনিস।
শরীর খারাপ হবার পর টমি একবার বাড়ির মূল ফটকের বাইরে টয়লেট করলো। বাড়িওয়ালীর সে কি তম্বি।
সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,' ' ফকিন্নির পুতের নাম মিয়া খাঁ। দুপুর বেলায় খায় গরম চা । নিজেরাই থাকে ভাড়া বাসায়। আবার কুত্তা পালে। দুইদিনে বৈরাগী ভাতেরে কয় অন্ন। মায়ের জোটে না শাড়ি সেলাইয়ের সুতা।ছেলের পায়ে আডিডাসের জুতা। '
হেন তেন ।
সকালে সবাই ইশকুলে চলে যাই।
টমি বারান্দায় একা থাকে। বাবা বলল আমি ওকে দোকানে নিয়ে যাই। ওখানে ও ভাল থাকবে।
বঙ্গবন্ধু সড়কে আমাদের দোকান। পুরানো গাড়ি কিনে বিক্রি করে বাবা। টমিকে নিয়ে গেল সাথে করে। দুপুর বেলা বাবা যখন ভাত খেতে বাসায় এলো টমিও পিছন পিছন চলে এলো।
এত দূর পথ চলে এসেছে !
রাতের বেলাও চলে আসতে চায়। তখন বাধ্য হয়ে বেঁধে রেখে আসতো।
মাসখানেক পর টমি অভ্যস্ত হয়ে গেল নতুন জায়গায়। তার অন্য একটা কারন হচ্ছে । ওখানে রাস্তার একটা মেয়ে কুকুরের সাথে ওর বেশ ভাব হয়ে গেল। দুইজনে পাউরুটি ভাগ করে খায়।
আমাদের রাগ করার কোন কারন নেই। সবার জীবন আর পছন্দ অপছন্দ আছে। আমরা বলতে পারি না, গাঙ্গুলী বাড়ির কুকুর হয়ে তুই রাস্তার...হেন তেন।
একদিন শুনলাম টমির বান্ধবীর বাচ্চা হবে।
তখন ভীষণ রকমের ঘটনাটা ঘটে গেল।
রাতের বেলা ভাত খেতে বসে বাবা মন খারাপ করা গলায় বললেন , টমি আর ফেরত আসবে না । বিকেলে টমিকে কবর দিয়ে এসেছেন।
টমির মৃত্যুর জন্য অনেক দিন বাবাকে দোষ দেয়া হয়েছে। আসলে তেমন না। বাবা কোথাও গেলে টমি ও পিছন পিছন যেত। ধমক দিলেও কাজ হত না। খানিকটা বেহায়ার মত হাসি দিয়ে আবার অনুসরণ করতো। সেইদিন বিকেলে রাস্তার উল্টোদিকের দোকানে যাচ্ছিল বাবা। ভাল বিস্কুট পাওয়া যায় ওখানে। টমিও পিছন পিছন যাচ্ছিল। দোকানটা ও ভাল করে চেনে। মানে দু - চারটে বিস্কুট পাবে।
পিচের রাস্তার ঠিক মাঝে আসতেই কেউ ডাক দিল বাবাকে। ফিরে দেখেন উনার এক বন্ধু। অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল তখন কোত্থেকে তেড়ে এলো একটা বিশাল ট্রাক। ঘেউ ঘেউ করে উঠলো টমি। বাবাকে সাবধান করে দিচ্ছিল হয়তো। দৌড়ে এসে বাবার প্যান্ট কামড়ে ধরে টানতে লাগল।
ব্যপারটা বুঝে লাফ দিল বাবা।
ট্রাক তার কানের পাশ দিয়ে চলে গেল।
আইল্যান্ডে উঠে গেছে বাবা। বোকা টমি রাস্তার মাঝে। রক্ত মাখা। ভিড় জমে গেল। ট্রাক পালিয়ে গেছে কবে।
দোকানে বেলচা ছিল। সেটা দিয়ে তুলে নিয়ে দোকানে কবর দেয়া হল ওকে। যেখানে সব সময় বসে থাকতো সেই জায়গায়।
অনেক দিন দোকানে যাইনি আমি। ইচ্ছে করেনি।
যখন গেলাম পিচ্চি মতন উঁচু জায়গা দেখে বুঝলাম টমির কবর। উপরে শ্যামা ঘাস গজিয়েছে কয়েকটা। ওর হাসি হাসি মুখটা মনে পড়লো। যেন বলছে- আমি বিস্কুটের লোভে পিছে পিছে যাইনি।
চৈতালি হাওয়ায় মনটা খারাপ হয়ে গেল। সামান্য সময়ের জন্য নিষ্ঠুর দুনিয়ায় এসেছিল বেচারা । সব হিসাব চুকিয়ে চলে গেছে। যে ওকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছিল তাকে বাঁচাতে গিয়ে মরে ঋণ শোধ করলো।
টমি মারা যাবার পর আমরা আর কোন জীবজন্তু লালন পালন করিনি। হয়তো আর করবও না।
টমির বান্ধবীর বেশ কয়েকটা বাচ্চা হয়েছিল। ঐ মালিক বাচ্চাগুলো বিক্রি করে দিয়েছে। আজ ৩৬ বছর হয়েছে। আমার শহরে হাঁটতে গেলে যখন কোন কুকুর দেখি মনে হয় ওরা কি টমির বংশধর ?
অমনটা হতে পারে না ?
ভাবতে ভাল লাগে।
শুধু একটা সমস্যা রয়ে গেছে।
জ্যাক লন্ডন সাহেবের 'হোয়াইট ফ্যাং' আর ' দ্যা কল অভ দ্যা ওয়াইল্ড' বই দুটো যখন পড়ি চোখদুটো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যায়। মনে হয় চোখের কোন সমস্যা দেখা দিয়েছে।
আমার বিশ্বাস একদিন আমার এই দুই চোখ ভাল হয়ে যাবে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন