সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আবার বারমুডা ট্রায়াঙ্গল - ৩

তিন 

 

 

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে জাহাজ   হারিয়ে যাচ্ছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই 

 

 তবে তখন মানুষজন  ব্যাপারটা  তত বেশি ধরতে পারেনি

 পালতোলা জাহাজের আমল থেকে জাহাজ হারাতো,  ওখানে

 

 আজও পুরনো দিনের জাহাজের  রেকর্ড ঘাঁটলে অবাক হতে হয় প্রতি বছর   নতুন নতুন জাহাজের নাম বের হয়ে আসছে যারা  বন্দর ছেড়েছিল   নাবিক আর  যাত্রী নিয়ে  কিন্তু ফিরে আসেননি  বা কোনও বন্দরে গিয়ে নোঙর করেনি 

 

 

বেশির ভাগ জাহাজ থেকে কোনও রকমের রেডিও মেসেজ  আসেনি

আসলে  নিজেদের লোকেশন  কোথায় সেটাই জানত না ওরা   ফলে  কোথায়  ডুবে গেছে সেটা আর  জানা যায়নি 

 

বহুকাল ধরে সাগরের ওই  অংশটাকে আটলান্টিকের গোরস্থান ,  ভূতুরে  শৈবাল সাগর, নিয়তির সাগর  এমন সব গাল ভরা নামে ডাকা হত  খেতাবগুলো  দিয়েছিল পোড়খাওয়া পুরনো দিনে নাবিকেরা 

 

 কালক্রমে সেটিই  এখন বারমুডা ট্রায়াঙ্গল

 

শৈবাল সাগর হিসাবে পরিচিত সারগাসো  (Sargasso) সি শব্দটি পর্তুগিজ শব্দ "সারগাসাম" (Sargassum) থেকে এসেছে, যার অর্থ সামুদ্রিক আগাছা  

এই সাগর সেই প্রাচীন কাল থেকেই রহস্যময় আর ভয়ংকর  এটাও কুখ্যাত বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতরে  ১৫ শতাব্দীতে পর্তুগীজ নাবিকদের মুখে মুখে এই সাগরের গল্প ছড়িয়ে যায় জায়গাটা ৩০ এবং ৩৮ ডিগ্রি উত্তর এবং দক্ষিণ  অক্ষাংশে 

  সারগাসো    সাগরের এই জায়গাতে গরমের দিনগুলিতে বাতাসে  বেগ একদম কমে যেতশুনেছি,  রাতের বেলা জাহাজের ডেকের উপর মোমবাতি জ্বেলে রাখলে সেই মোমবাতির শিখা একটু ও কাঁপত না। অচঞ্চল, স্থির মোমের আলোর বই পড়া যেত।

 

 

 

 প্রচুর স্প্যানিশ জাহাজ এখান  দিয়ে  যাতায়াত করত পালতোলা জাহাজের আমলে  জাহাজ ভর্তি ঘোড়া। বিক্রির জন্য দুনিয়ার নানান দেশে নেয়া হত । এই এলাকায়   আসলেই   বাতাসের বেগ কমে যাওয়ায় জাহাজগুলো   এগোত না একটুও 

  তখন জাহাজিরা বাধ্য হয়ে ওজন কমানোর জন্য জাহাজ থেকে ওদের সাথে নেওয়া   ঘোড়াগুলো   সমুদ্রে ফেলে দিত জল তেষ্টায় কাতর হয়ে ঘোড়া অনেক সময় নিজেই  দৌড়ে সাগরে ঝাঁপ দিত।

 

 ফুলে  ফেঁপে ওঠা ঘোড়ার লাশ ভেসে বেড়াত  চারিদিকে 

 

 সেই থেকেই  এই জায়গাটা   অশ্ব অক্ষাংশ  নামে পরিচিত   শ্যাওলার স্তূপ   এত ঘন যে জাহাজ সহজে চলতে পারত না ক্রিস্টোফার কলম্বাস পর্যন্ত এই এলাকাতে এসে বিপদে পড়েছিলেন কলম্বাসের নোট বইতে   বিশদ বর্ণনা রয়েছে

 

 

 বারমুডা ট্রায়াঙ্গল  নামটা বিখ্যাত হবার আগে সারগাসো সাগর    বেশি বিখ্যাত ছিল  পালতোলা জাহাজের আমলে  এই সাগর  ছিল  সত্যিই এক  বিভীষিকা  জাহাজীরা সবাই    দাবি করেছে,  রাতের বেলা ওই এলাকাতে  ভৌতিক  অভিজ্ঞতা হয়েছে  খোলা  ডেকে  দাঁড়িয়ে থাকলে গা ছমছম করে মাঝ সমুদ্রে ঘোড়া  ডাক  শোনা যায় আচমকা

 

 

কবে থেকে লোকজন বুঝতে পারল বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে  জাহাজ  হারায় ?

 

 সম্ভবত সবচেয়ে তথ্যনির্ভর  রেকর্ড হচ্ছে  আঠারো শতাব্দীতে প্রথম   রেকর্ড হচ্ছে অ্যামেরিকান যুদ্ধ জাহাজ হারানো  ১৭৮০  সালে  দ্যা  জেনারেল গেট নামে আমেরিকার সবচেয়ে চৌকষ আর দুর্দান্ত যুদ্ধজাহাজটা রহস্যময় ভাবে হারিয়ে যায়

 

 

 ধারণা করা হয়েছিল, সম্ভবত কোনও ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ  কায়দা মত পেয়ে জেনারেল গেটকে ডুবিয়ে দিয়েছে কিন্তু কোনও রকম রেকর্ড পাওয়া যায়নি কোনও যুদ্ধজাহাজ দাবিও করেনি ,  ওরা এমনটা করেছে 

 

সতেরশো নিরানব্বই  সালের সেপ্টেম্বরে হারিয়ে গেল যুদ্ধজাহাজ USS  ইনসার্জেন্ট ফ্রান্সের এই জাহাজটা বেশ যুদ্ধবাজ   ছিল  চল্লিশটা কামান  নিয়ে তেড়ে লড়াই করত 

 

১৮০০  সালে তিনশ চল্লিশ  জন  ক্রু নিয়ে  যুদ্ধজাহাজ পিকারিং হারিয়ে গেল

 

 

১৮১৪ সালের  অক্টোবরে হারিয়ে গেল  আমেরিকান   বিখ্যাত  যুদ্ধ জাহাজ  ওয়াপস   একই বছরে দুই মান্তুলওয়ালা  বৃটিশ জাহাজ আটলান্টা বন্দর  ছাড়ল  এক দল দক্ষ নাবিক নিয়ে 

দুনিয়ার কোন বন্দরে ভিড়ল না আটলান্টা

 

 

১৮১৫ সালে যুদ্ধজাহাজ এপাভেয়ার নিজের ট্রিপ শেষ করে ফিরছিলআলজেরিয়ার বন্দর ছেড়ে নরফোলকসেখান থেকে ভার্জিনিয়া ফেরার সময় মাঝ সমুদ্রে হারিয়ে গেলকোন রকম সংকেত না দিয়েই

 

যুদ্ধজাহাজ ওয়াইল্ড ক্যাট৩১ জন নাবিক সহ৪০ জন যাত্রীসহ স্কুনার লিনেক্স এবং স্কুনার হুরনেট হারিয়ে গেল ১৮২৪ সালে

 

মোট তিনটি গেলে এই বছর

 

স্কুনার হল এক ধরনের পালতোলা জাহাজদুইটার বেশি মাস্তুল থাকে এই ধরনের জাহাজেস্কুনারগুলি মূলত পণ্যসম্ভার, যাত্রী এবং মাছ ধরার জন্য নির্মিত হয়েছিল

 

এত ক্ষণ যুদ্ধজাহাজগুলি কথা বললামবাণিজ্যিক জাহাজগুলির মধ্যে রোজলি নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রথম পাওয়া গেছেরোজলি মালবাহী ফরাসি জাহাজ  একদম নতুন ছিল জাহাজটামাত্র দুবছর আগে তৈরি করা হয়েছিলকার্গো যাত্রী আর কিছু জীবজন্তু নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছিলবারমুডায় গিয়ে হারিয়ে যায়

 

লন্ডন টাইমসে ১৮৪০ সালের ছয় নভেম্বর অদ্ভুত রকমের একটা রিপোর্ট ছাপা

 

হামবুর্গ থেকে হাভানা যাবার পথে সমুদ্রের বুকে নিঃসঙ্গ একটা জাহাজ ভাসছিলকাছে গিয়ে দেখা গেল জাহাজটা জনমানবশূন্যজাহাজের মূল পাল খাটানো আছেকোনও রকম ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন নেইজাহাজটার নাম রোজলিজাহাজের প্রত্যেকটা কার্গো জায়গা মত আছেওয়াইন, ফল, সিল্ক সহ যাবতীয় মূল্যবান জিনিস সুন্দর অবস্থায় আছে, হাত দেওয়া হয়নি

 

 

ক্যাপ্টেনের ক্যাবিনে যাবতীয় দরকারি কাগজপত্র সযত্নে ধরে রাখাপুরো জাহাজে জীবন্ত প্রাণী বলতে আছে একটা বিড়াল কয়েকটা মুরগী আর হলুদ রঙের কয়েকটা ক্যানারি পাখি কয়েকটা মারা গেছে খিদের জ্বালায়

যাত্রী এবং অফিসারদের কামরায় প্রত্যেকটা আসবাবপত্র ঠিকঠাক জায়গা মতো ছিলমনে হচ্ছে, কোনও কারণে রোজলিজাহাজের যাত্রীরা হঠাৎ করেই নেমে পড়েছিল মাঝ সাগরে

 

কিন্তু কেন?

 

মালপত্র গুলো হ্যাভানা যেতকয়েক জন ব্যবসায়ীর ঠিকানা পাওয়া গেছে মালে  নথির সাথে

খবরটা বেশ আলোড়ন তুলেছিল সেসময়মধ্য সাগরে জনশূন্য জাহাজ ভাসছেমানুষগুলোর কি হল ? বারমুডা ট্রায়াঙ্গল শুধু মানুষগুলি রেখে খালি জাহাজ ফেরত দিল ?

 

 

এই টপিক আবার ব্রাম স্টোকার সাহেব উনার ড্রাকুলা উপন্যাসে কায়দা করে লিখে ফেলেছিলেনডিমিটার নামের জনশূন্য সেই ভৌতিক জাহাজ ! ভদ্রলোকের মগজ ছিল বটে

 

 

তদন্ত করার জন্য পরিত্যক্ত রোজলি জাহাজটা বন্দরে আনা হল

 

লেখক, চার্লস ফোরড ১৯৩১ সালে প্রকাশিত তাঁর লো (Lo)   বইতে এই ব্যাপারটা বিস্তারিত লিখেছিলেন লো বইটা তার লেখা তিন নম্বর ননফিকশন বই। সারা দুনিয়ার অব্যাখ্যাত ঘটনার বিবরণ দেয়া।

 

ভদ্রলোক সারাটা জীবন ধরে পত্রিকায় প্রকাশিত অদ্ভুত ঘটনাগুলিকে সংগ্রহ করতেনশখ 

এখন এই পরিত্যক্ত জাহাজটা যে হারিয়ে যাওয়া জাহাজ রোজলি সেটা প্রমাণ করা কষ্টকর হয়ে পড়ল

ব্রিটিশ লাইব্রেরি আর লাইব্রেরি অব কংগ্রেস - দুই জায়গাতেই ১৮৪০ সালে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোতে রোজলি নামের জাহাজের এই ঘটনার কোনও রেকর্ড নেই

 

তবে রসিনি নামে একটা জাহাজে কথা লেখা আছেবিভিন্ন ফাইল

 

১৯৪০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রসিনি জাহজটা হামব্রো থেকে বাহামা আসছিলবাহামা উপকূলের কাছে জাহাজটা চওড়া আটকে যায়অন্য একটা জাহাজে করে নাবিক আর যাত্রীদের নিরাপদে বন্দরে আনা হয়েছিল

 

এই আর রোজলি আর রসিনি দুই জাহাজ দেখতে হুবহু একইরকমদেখলে বোঝা কষ্ট কোনটা কোন জাহাজনামদুটো ও প্রায় এক

 

 

কুসচে তার বারমুডা ট্রায়াঙ্গল মিসট্রি সলভ বইতে অনেক তদন্ত করে লিখেন -

 

‘...আর একটা ব্যাপার সেই সময় অর্থাৎ ১৮৪০ সালে সংবাদপত্রের সব রিপোর্ট হাতে লেখা হতসাউ-এর সংবাদদাতা হয়তো রোসিনি লিখেছে , আর লন্ডনের সম্পাদক হয়তো ভুলে রোজালি পড়েছে ছেপেছেও তাইতা ছাড়া দুই জাহাজের যাত্রাপথ ছিল এক

 

ব্রিটিশ মেরিটাইম মিউজিয়ামের রেকর্ড যা প্রমাণ করে তা হল রোজালি নামক একটি জাহাজের অস্তিত্ব সত্যিই ছিল

অর্থাৎ সকলই গরল ভেল

রোজলি কখনই বারমুডায় হারিয়ে যায়নিঅথচ সব লেখক ইচ্ছা করে এটা লিখেছে রহস্য ঘন করার জন্য

 

 

১৮৩৪ সালের মার্চে হারিয়ে গেল যুদ্ধজাহাজ গ্রাম্পাসক্যারিলোনিয়া থেকে ফিরছিলফেরার মাঝে বারমুডায় গিয়েছিলআর ফেরেনি

 

 সিটি অব গ্লাসকোযাত্রীবাহী জাহাজনিউ ইয়র্ক থেকে ফিরছিল ৪৫০ জন যাত্রী নিয়ে১৮৫৪ সালের কথালিভারপুল যাবেহারিয়ে গেলকোনও খোঁজ পাওয়া গেল না

 

দুই মাস্তুল আর চৌকো পালওয়ালা ব্রিটিশ জাহাজ আটলান্টা হারিয়ে গেল১৮৮০ সালেদুইশ নব্বই জন ক্যাডেট নিয়ে ফিরছিলবন্দরের ছিল না কোনদিন কোনরকম খোঁজ পাওয়া গেল না আর

 

হিউ ব্রাউন একজন প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তাইংল্যান্ডে ছিলেনতিনি বর্তমানে কানাডাতে আছেনপুরনো জাহাজ বিশেষজ্ঞ ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রি অব সিঙ্কিং শিপ নামে প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড এবং ডাটাবেজ সংরক্ষণ করেন

 

দীর্ঘদিন গবেষণা করে উনি আবিস্কার করেছেন, প্রাচীন কালে সেই পালতোলা জাহাজের যুগে প্রচুর স্প্যানিশ জাহাজ বহু মূল্যবান ধনরত্ন নিয়ে হারিয়ে গেছে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতর

 

যেমন ১৫০২ সালে এল ডোরাডো ফিরছিল সান্টো ডোমিঙ্গো, হিস্পানিওলা থেকেসাথে আরও একত্রিশটা অন্য জাহাজসবগুলি জাহাজ ভর্তি সোনা এবং মূল্যবান ধন সম্পদে ঠাসা

জুলাই মাসের ঘটনা জাহাজগুলির সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়ে হারিয়ে যায় অনেক পরে পুয়ের্তো রিকোর কাছাকাছি মোনা প্যাসেজে পাঁচটা জাহাজ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলএর পর অনেক খোঁজাখুঁজির পর আরও দশটা জাহাজের লোকেশন পাওয়া গেছে

 

 

কিন্তু এল ডোরাডো সহ বাকি সতেরোটা জাহাজের কোনও খোঁজ নেইহারিয়ে গেছে ওরাবারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতরে কোথাও

 

কাগজপত্র হিসাবে দেখা গেছে হাফ টন ওজনের স্বর্ণের একটা টেবিল বহন করছিল এল ডোরাডো জাহাজটা

 

একদম উইলভার স্মিথের রোমাঞ্চ উপন্যাসের মত

 

হিউ ব্রাউন দিনের পর দিন কাজ করে , হারানো জাহাজের খোঁজ তুলে ধরেছেন সবার সামনেসংখ্যাটা দিন দিন বাড়ছেনতুন সব জাহাজের নাম জানতে পারছি আমরা প্রত্যেক বছরযেগুলি হারিয়ে গিয়েছিল রহস্যময় ভাবে বহুকাল আগে

 

 

যেমন - জামাইকা থেকে নিউইয়র্ক ফিরছিল দুই মাস্তুলের ৩৮৫ টনের কানাডিয়ান জাহাজ আরবুটাস (arbutus) ১৮৯৯ সালের জানুয়ারির এক তারিখে হারিয়ে গেছে সেটা

৫৫ টনের স্কুনার চিপকি , গলফ অভ মেক্সিকো থেকে ফিরছিলহারিয়ে গেল ১৯১৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরবারমুডার কোথাও

 

 

 ৩৮২ টনের স্কুনার ডোরিস শেষ দেখা গিয়েছিল ১৯১৫ সালের  আগস্ট   গল্ফ অফ মেক্সিকোতে  তারপর হারিয়ে গেছে

জাহাজের নাম মাউন্তেন গার্ল  শেষ রিপোর্ট দিয়েছিল ১৮৯৬ সালের  মে  গল্ফ অফ মেক্সিকোতে   নেই হয়ে গেছে 

১৯২১ সালের ২০ অক্টোবর 

৫২৮৩ টনের সান্তারিটা নিউ অরলিন্স থেকে  নিউ ইয়র্ক ফিরছিল  নেই

নিউডোর নরওয়ের জাহাজ, ২৬৩৮  টনের  ফ্লোরিডা থেকে জাপানের ইওকোহামা যাচ্ছিল ১৯০৬ সালের মার্চ ২১

অ্যানি হেনডি কার্গো স্কুনার তুরস্কের দ্বীপ থেকে লবণ ভর্তি কার্গো নিয়ে ফিরছিল  ১৯১১ সালের ডিসেম্বর ১৬

স্পেন থেকে ১৮০৮ সালে আরডেলা জাহাজটা  ফিরছিল রূপা বোঝাই করে লুইজিয়ানা যাবার কথা ছিল 

 

 

হারিয়ে যাওয়া জাহাজের তালিকাটা বিশাল অভাব নেই কত জাহাজ হারিয়ে গেছে কোন রকম  হদিস রেখে যায়নি  

সমুদ্রের রহস্যের শেষ নেই  কোথায় কবে সে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে  এই জাহাজগুলোকে  কেউ জানে না 

সবগুলো হারিয়ে যাওয়া জাহাজের তালিকা আপনার সামনে তুলে ধরতে হলে আরও একটা বই লিখতে হবে 

শুধু আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাগুলোর কথা বললেও  সংখ্যাটা অনেক 

            যেমন জশুয়া  স্লোকামের কথা বলি সারা দুনিয়ার সবাই তাকে চিনত পালতোলা  এক মাস্তুলের ছোট্ট  জাহাজে করে  সারা দুনিয়া ঘুরে  এসেছিলেন তিনি একা

১৮৯৫ সালের ২৪ এপ্রিল  যাত্রা শুরু করেছিলেন   ৪৬ হাজার মাইল সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে  জুন ২৭ ,  ১৮৯৮  ফিরে এসেছিলেন

 

 বলা হয়,  সমুদ্রকে ভাল করে তার মত আর কেউ চেনে না তার এই রোমাঞ্চকর অভিযানের কাহিনি নিয়ে নিজেই লিখেছিলেন একটা বই - সেইলিং এরাউনড দ্যা ওয়ালড 

১৯০৯ সালের ১৪ নভেম্বর তার সেই পালতোলা বিখ্যাত  ৩৬ ফুট  ইঞ্চি  জাহাজ      স্প্রে   নিয়ে আবার যাত্রা করেন মায়ামি বন্দর থেকে 

 

এর পরে আর কেউ কখনই দেখেনি তাকে একদম হারিয়ে গেল বিখ্যাত জশুয়া  স্লোকাম 

কি হয়েছিল তার ভাগ্যে কেউ জানে না

 

আজও রহস্য

 

শুধু  জশুয়া  স্লোকাম জানে কিন্তু সে আমাদের বলতে পারবে না

 

 

অনেকে ব্যাখ্যা দিয়েছে, রাতের আঁধারে মালবাহী জাহাজের তলায় পড়ে গিয়েছিল জোশুয়ার পিচ্চি পালতোলা জাহাজটা ডুবে মারা গেছে 

 কোন জাহাজ সেই অপকর্মের দায় স্বীকার করেনি

এই ব্যাখ্যাও অনেকে মেনে নিতে চায় না  অন্তত আমি না   জশুয়া স্লোকামের মতো লোক ডুবে মারা যেতে পারে না লাইফ জ্যাকেট তার সাথেই  ছিল  

 

 

সমস্যা একটাই 

 

স্লোকাম  সেইসময় বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন আর ওখানে জাহাজগুলি হারিয়ে যায় বড্ড  অদ্ভুত ভাবে  ডুবে গেলে সমুদ্রের তলায় জাহাজের কাঠামো থাকবে লাইফবোট ভেসে উঠবে   যাত্রীদের  মৃতদেহ,  কাঠের অংশ, বা  জাহাজের তেল কিছু তো ভাসবেই   সমুদ্রে এখানে কিছুই হয় না

 

 আটলান্টিকের  এই অংশটা অনেক ভয়ঙ্কর ছিল  পুরনো দিনে নাবিকদের কাছে  মার্কোনি   রেডিও আবিস্কারের পর সেই ভয়টা অনেক কেটে গিয়েছিল তারপর   শুধু এই এলাকাতেই রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত রহস্যময় ভাবে 

 

আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার এই রেডিও কোনও রকম সাহায্য করতে পারত না,  বিপদে পড়া জাহাজের নাবিকদের  জাহাজগুলো   একদম ভ্যানিশ হয়ে  গেছে   কোনও রকমে রেডিও মেসেজ বা এসএমএস সঙ্কেত পাঠাননি  চুপচাপ নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে ওরা 

 

১৯১৭  সালে মার্চের ছয় তারিখে ১৫৭৮  টনের মালবাহী জাহাজ  টামানডা   , বুয়েন্স আইরেস  থেকে কয়লা বোঝাই করে ভার্জিনিয়া ফিরছিল  ক্যাপ্টেন লি- অধীনে  একুশ জন ক্রু সহ  হারিয়ে গেছে কোন রকম রেডিও মেসেজ  পাঠায়নি যেন রেডিও ছিলই না ওই জাহাজে

 

আমেরিকান নেভির জাহাজ সাইক্লপস হারিয়ে যাওয়ার আগে কোন রকম মেসেজ পাঠায়নি

আজও আমেরিকার নেভির অমীমাংসিত ফাইল হিসাবে সাইক্লপস হারিয়ে যাবার কেসটা রয়ে গেছে

জাহাজটা কয়লা বহন করতো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে এসে হারিয়ে যায় সাইক্লপস জানুয়ারি ১৮, ১৯১৮ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বারবেডস বন্দর থেকে এক হাজার টন আকরিক ম্যাঙ্গানিজ বোঝাই করে ফিরছিল

বাল্টিমোরে ফেরার কথানেভি ক্রু ছিল তিনশ নয় জন

 

 

শেষ মেসেজ ছিল- অল ইজ ওয়েল

 

পরবর্তী দুই দিন সমুদ্রের বুকে সাইক্লপসকে দেখেছে ব্রিটিশ পেট্রোল বোর্ডের জাহাজ অফিসাররাতারপর আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি

 

আমেরিকা নেভির যত জাহাজ হারিয়েছে, সবচেয়ে রহস্যময় ভাবে হারিয়েছে সাইক্লপ্স

 

কী হয়েছিল আসলে সাইক্লপসের, সেই নিয়ে অসংখ্য থিউরির জন্ম হয়েছিলউপযুক্ত তথ্যের অভাবে প্রমাণ হয়নি কোনওটাইমোটামুটি একটা ধারণা বেশ পোক্ত, তা হল সাইক্লোপস এর ক্যাপ্টেন ওরলি জার্মানিতে জন্মেছিলেনমনে প্রাণে তিনি হয়তো জার্মানদের সমর্থন করতেনতাই গোপনে জাহাজটাকে জার্মানদের হাতে তুলে দিয়েছেনবা সাবোটাজ করে জার্মানির কোন বন্দরে নিয়ে গিয়েছিলেন জাহাজটাকে

 

 

আরেকটা  রিপোর্টে দেখা যায়,  অতিরিক্ত  ম্যাঙ্গানিজ আর ফুয়েল নিয়ে  সাইক্লপস অভারলোড হয়ে গিয়েছিল এত মাল বহন করা সম্ভব না  জাহাজটা  জেভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল সেই মাল  তোলা হয়েছিল অনেক বেশি   সেক্ষেত্রে কোন ভাবে উল্টে যেতে পাড়ে সাইক্লপস তারপর সহজ নিয়মে ডুবে গেছে সাগরের তলায় 

 

এখানে মস্ত রহস্যময় একটা ঘটনা ঘটে গেছে 

 

সেটা হল, সাইক্লপস বন্দরে যেই দিন পৌঁছবে বলে অনুমান করা হয়েছিল তারই আগে রিও বন্দরের কোন একটা খবরের কাগজে ছাপা হয় , সাইক্লপস সমুদ্রে ডুবে গেছে

 

 

অগ্রিম খবর ওরা পেয়েছিল কিভাবে ?

 

জাহাজের আরেক যাত্রী গুস্তাক ছিলেন রিও ডি জেনারিয়োর মার্কিন কনসাল জেনারেল একদম নতুন ৭৩ জন নাবিক নিয়ে জাহাজে উঠেছিলেন তিনি    গুস্তাক আমেরিকান হলেও জার্মানদের সমর্থক ছিলেন  ব্রাজিলের জার্মান কমিনিউটির মধ্যে উনি বেশ জনপ্রিয়ও ছিলেন 

এখন জাহাজের ক্যাপ্টেন  আর সেই সম্মানিত যাত্রী গুস্তাক দুইজনে মিলে  নতুন ৭৩ জন নাবিকের সহায়তায় জাহজটা দখল করে জার্মানিতে নিয়ে গিয়েছিল ?  

 

  বা মাঝ সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছিল ?  

 

 

জাহাজের যাত্রীদের  তালিকা খোঁজ নেয়া হল   অদ্ভুত নতুন একটা তথ্য পাওয়া গেল যেটা আগে কারও চোখে পড়েনি তিনজন দাগি আসামিকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল সাইক্লপস একজন একুশ বছরের কারাদণ্ড প্রাপ্ত  আরেকজন যাবজ্জীবন  আর শেষের জন তো ফাঁসির আসামি

 

তো এই তিন আসামি কি কোন ভাবে নিজেদের মুক্ত করে জাহাজ দখল করে নিয়েছিল ? কারণ জানত , বন্দরে পৌঁছা মাত্র তাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে

 

 

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর আরও গভীর হয়  সাইক্লপস হারানোর     রহস্য   যুদ্ধের কাগজ পত্র ঘেঁটে দেখা গেল সাইক্লপস জার্মানিদের হাতে ধরা পড়েনি বা স্যাবোটাজের শিকারও হয়নি জার্মান কোন   যুদ্ধ জাহাজ  টর্পেডো মেরে  সাইক্লপসকে ডুবিয়েও দেয়নি  

  জার্মানিদের  কাছেও   সাইক্লপস     নিয়ে  কোনও তথ্য নেই৷

 

 

 ওঁরা কোনরকম দায় স্বীকার করেনি কখনও

 আজও সাইক্লপসের  আসল ঘটনা জানা যায় নি  গ্রেটেস্ট মিস্ট্রি অব দ্য  সী   ট্যাগ নিয়ে রয়ে গেছে সে 

 

শৌখিন ইয়ট,  পালতোলা জাহাজ, স্কুনার  আর আর মাছ ধরার স্থানীয় জাহাজ কতো যে হারিয়ে গেছে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতর তার কোন হিসাব নেই  

গত বিশ  বছরে প্রযুক্তি অনেক উন্নত হয়েছে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং,  জিএসপি,  অটোম্যাটিক ডিসট্রেস সিগন্যাল সহ নতুন সব প্রযুক্তি এসে গেছে  আমাদের হাতের মুঠোয় সে জন্য হয়তো আগের মতো জাহাজ আর বিমান হারিয়ে যায় না  বারমুডার    ভেতরে 

 

 

সমুদ্রের তলার   প্রকৃতি একই রকম থাকে না সব সময়  বদল হয়  স্রোতের টানে নড়াচড়া করে সমুদ্রের তলার  বালি তারপরও মেরিন বায়োলজিস্টরা   সমুদ্র তলায় ভাঙা প্রবাল প্রাচীর দেখে বুঝতে পারে,  ওখানে অতীতে কোনও জাহাজ ডুবে গিয়েছিল কি না 

এত খুজেও  বারমুডায়  ,  আজও তেমন কিছু পাওয়া যায়নি

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...