অনেকেই শিকার কাহিনি পছন্দ করে না।
একঘেয়ে, বিরক্তকর মনে করে।
শৌখিন আড্ডায়, পরিচিত একজন বলেছিল --দুনিয়ায় যত ধরণের শিকার কাহিনি লেখা হয়েছে , সবগুলোর ছক একই রকমের ।
শিকারি কাঁধে একটা বন্দুক নিয়ে মানুষখেকো চিতা, বাঘ বা পাগলা হাতির পিছনে দিনের পর পর অনুসরণ করে । মরা গরু টোপ দিয়ে মাচায় বসে থাকে। সাথে ফ্ল্যাস্ক ভর্তি চা থাকে। জোছনা ভরা গভীর রাত। ঝোপটা আচমকা নড়ে উঠে। পৈশাচিক হলুদ এক জোড়া চোখ দেখা যায়। শিকারি ঠুস করে গুলি করে। ভয়াল গর্জন করে বাঘটা মরে যায়। গ্রামের বাসিন্দারা দৌড়ে চলে আসে আনন্দ করতে করতে।
সব মিলিয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার।
আমি উনার সাথে তর্কে যাইনি। কি দরকার ?
শিকার কাহিনিকে অনেকে সাহিত্যের মধ্যে ধরতে চায় না। আসলে ধরার দরকারও নেই।
পৃথিবীর সব দেশেই শিকার কাহিনির পাঠক খুবই কম।
আর এই বিষয়ে কিন্তু আজকাল নতুন বই লেখা ও হচ্ছে না। আসল কারন আর কিছুই না , পৃথিবীর সব দেশেই আইন করে শিকার করা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন সারা দুনিয়ার বস্তা ভর্তি বইয়ের মধ্যে সামান্য কিছু বই আছে , বুনো প্রাণী আর সতর্ক শিকারিদের মধ্যেকার দলিল হিসাবে। বলতে গেলে বইগুলো সহজে আবার পাওয়াও যায় না। মুসিবত।
শিকার কাহিনি পড়ার নিয়ম আছে।
পড়তে হবে শীতের দুপুরে। যখন রোদের রঙ হবে কমলার খোসার মত। হন হন হাওয়া বারান্দার ঘুলঘুলিতে খেলা করবে ।
বৃষ্টি ভেজা বাদলার দিনগুলোতেও চলবে। সাথে লাগবে পেয়ালা ভর্তি চা । আমি যখন পড়ি , তখন গায়ে শিকারিদের জ্যাকেট চাপিয়ে নিই। বেশ একটা ভাব চলে আসে।
আর শিকার কাহিনির বইয়ের প্রচ্ছদটা হতে হবে সুন্দর। হলুদ কালো বুটিওয়ালা চিতাবাঘের ছবি। বা দীঘল ঘাসের সামনে পেল্লাই এক কালো মোষের ছবি । কমলালেবুর মত সূর্য অস্ত যাচ্ছে ওর বাঁকা শিঙের কাছে । নিঃসঙ্গ দাঁতাল হাতি দাঁড়িয়ে আছে। আসমানি ফিরোজা রঙের আকাশ। দূরে কিলিমাঞ্জারো পাহাড়।
ঐসব বইতে শিকার করার ফাঁকে ফাঁকে বুনো জানোয়ারের জীবন, ওদের দেশান্তরী , প্রকৃতির গহন বর্ণনা, সহজ সরল আদিবাসিদের কথা এসে যায় বিরিয়ানির সাথে আলুর মত । সেটাও ভাল লাগে।
চম্বলের মানুষখেকো বা ময়াল উপত্যাকার কালো হাতি নামগুলোই কেমন শিহরণ জাগিয়ে দেয়।
জেরাল্ড ডুয়েলের বই নিয়ে বাইরে কত মাতামাতি হয়, কিন্তু এর চেয়ে সুন্দর বই লেখা হয়েছে বাংলায় । অভাব নেই । বিশেষ করে রামেন্দ্র দেশমুখ্যর ' বাঘের আত্নহত্যা' আর অর্ধেন্দু দত্তের ‘শিকারের গপ্পো’ বই দুটো পেলেই পড়ে ফেলবে। মাখনের মত দুটো বই ।
তখন শিকার কাহিনি পেলেই কিনতাম।
দিগুবাবুর বাজারের বাইরে প্রায় কফিনের সাইজের একটা বইয়ের দোকান ছিল। ফিরোজা রঙের পিচ্চি এই দোকানটা দূর থেকে বেশ মায়াবী লাগতো। ভেতরটা বইয়ে ঠাসা । কোন মতে কষ্ট করে দোকানদার ভেতরে বসতে পারে। দোকানি জানতো আমাকে ছোটবেলা থেকে। শিকার কাহিনি পেলেই ফোন দিয়ে বলতো , মিয়াবাই আপ্নের বাগের বই আইছে।'
পুরানো বইয়ের দোকান, এক অদ্ভুত জায়গা ।
কোন ভাবে ব্যাখ্যা করেই বোঝান যাবে না আসলে কিসের সাথে তুলনা করা যায়। কত বিচিত্র রুচি অরুচিকর বই মন খারাপ করে পরে আছে খোলা আকাশের নীচে। সারাদিন হাজার পদের মানুষজন ঘেঁটে দেখছে ওদের।
ওখানে তুমি এমন সব বই আবিষ্কার করবে, যেগুলো মাত্র একবার ছাপা হয়েছিল। আর কখনই রিপ্রিনট করা হয়নি। লেখকের মেধা, প্রকাশকের মধ্যস্থতা, ছাপাখানার শ্রম সব মিলিয়ে বইটা দুনিয়ায় এসেছিল ষাট- পঞ্চাশ বছর আগে।
দুর্দান্ত লেখনি , মনোলোভা কাহিনি, চিত্তহরণ করা প্রচ্ছদ। তারপর ও বইটা আর কখনও নতুন করে জন্ম নেয়নি।
কোথায় হারিয়ে গেল লেখকটা ?
নতুন ব্যবসায়ী প্রকাশক কেন আর আগ্রহ দেখাল না ?
নতুন দিনের কোন পাঠক কেন আর খুজল না ?
যেন বিশাল এক গাছ । সেটা থেকে পাতা খসে খসে পড়ছে । বেশির ভাগ পাতা রাস্তায় পরে থাকে। কিছু বাউকুড়ানি হাওয়ায় গিয়ে পরে নর্দমায়। ঘুঁটে কুড়ানিরা নিয়ে যায় কিছু, জ্বালানি বানাতে।
ক্লান্ত সফেদ প্রাণ কোন প্রকৃতি প্রেমিক আচমকা পথ থেকে তুলে নেয় দুই একটা পাতা।
ভাবে, বাহ ! দারুন সুন্দর পাতা তো ! নিয়ে সাজিয়ে রাখে বসার ঘরে।
বইগুলো তেমনই মনে হয় !
পুরানো বইয়ের দুর্দান্ত ব্যাপার হচ্ছে এর গায়ে রহস্যময় হারানো দিনের একটা ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
পৌর পাঠাগারে বই পড়তে গিয়ে ব্যাপারটা প্রথম টের পেলাম। ওদের বইয়ের অবস্থা ছিল কাহিল। সব পুরানো। নিয়মিত বাঁধাই হত। সেইসব বই পড়তে গিয়ে মনে হত সময়টা যেন আটকে গেছে। আমি বসে আছি অতীতে।
একবার বর্ষাকালে টানা আঠারো দিন বৃষ্টি হয়েছিল। কাঠের আলমারির বই ঘাঁটতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম বইয়ের ভেতর থেকে কেমন একটা সোঁদা ঘ্রাণ ভেসে আসছে।
যেন প্রাচীন রহস্যময় জাদুর লতা ম্যানড্রেক রেখে দিয়েছে কেউ বইয়ের সাথে।
পুরানো বইয়ের দোকানে ঢুকলে কি ধরনের ঘ্রাণ পাওয়া যায় সেই ব্যাপারটা নিয়ে লন্ডনের একদল গবেষক কাজ করেছে । জরিপে দেখা গেছে কেউ চকোলেটের ঘ্রাণ পায়। কেউ ভ্যানিলার। কফি বা ময়লা লিলেন কাপড়ের ঘ্রানের কথাও বলেছে কেউ কেউ।
বই ছাপা হয় কাগজে। এই কাগজ বানানো হয় বিভিন্ন কাঠের মণ্ড দিয়ে। সময়ের সাথে আলো, তাপ, ছায়া, জল সব মিলে কাগজের মধ্যে হরেক রকম রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। জন্ম নেয় অন্য রকম একটা ঘ্রাণ। আমাদের মগজ সেটাই নানান ধরনের পরিচিত জিনিসের সাথে মিল খুঁজে নেয়।
তবে বিরাট অংশের লোকজন বলে পুরানো বইয়ে পুরানো দিনের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
পুরানো দিনের ঘ্রাণ !
কি মিষ্টি না কথাটা ?
রহস্যময়ও বটে।
দোকানদার ফোন দিলেই রেললাইন ধরে হেঁটে চলে যেতাম। ওখানে অনেক আকন্দ পাতার দঙ্গল। সূর্যকন্যা ফুল দেখতাম প্রচুর। কুকশিম। ময়ূরের পালকের মত কচুরি ফুল ভর্তি ডোবা। একটা কদম গাছ।
বই নিয়ে খানিক আড্ডা মেরে বস্তাপচা গুড়োদুধের বীভৎস চা খেয়ে ফেরত আসতাম একই পথে।
পড়া শেষে যত্ন করে বইটা সাজিয়ে রাখতাম পারিবারিক লাইব্রেরীতে। পরের বছর শীতের মৌসুম এলে আবার বইগুলো নামিয়ে পড়তাম। গায়ে জড়িয়ে নিতাম মাসাই চাদর। বেশ একটা চনমন করা ভাব চলে আসতো ।
শিকারি সাহেবের সাথে আমিও চলে যেতাম নৈনিতাল , কালাধুঙ্গি, বদ্রি উপত্যাকায়, কুমায়ুনের গ্রামে , আর গাড়োয়ালের পথে পথে।
বিচ্ছিন জায়গায় এক একটা মন্দির। সন্ধ্যার আকাশে আবিরের রঙ। বাংলোর বারান্দায় হারিকেল জ্বলে। হারিকেন বা হ্যাজাকের ত্রিশিরা কাঁচের ভেতর থেকে চুইয়ে আসে ভুট্টার দানার রঙের আলো ।
গ্রামের লোক শিকারি সাহেবকে সম্মান করে কলাপাতায় সাগুদানা আর আখের গুড় খেতে দেয়। কখনও পাকা কলা আর মাখন । পুরো গ্রামে শুধু মোড়লের বাসায় চা পাওয়া যায়। প্রচুর দুধ দেয়া বিস্বাদ চা ক্লান্ত শরীরে অমৃতের স্বাদ লাভ হয়।
আহা, কি বর্ণনা।
তখন আমি পিটার বেঞ্চিলির ' জস ' আর ' দ্যা বিস্ট' ও পড়ে ফেলেছি। এগুলো শিকার কাহিনি না। এগুলোকে বলে ' ক্রিয়েচার হান্টিং থ্রিলার। বেশ স্বাদু লেখা। সময় পেলে তোমরাও পড়ে ফেলবে। ক্রিয়েচার হান্টিং থ্রিলারের মধ্যে ' জস ' আজও বেস্ট সেলার। লেখক পিটার বেঞ্চলি বইটা লেখার আগে তিন বছর ধরে হাঙর নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। বাংলাদেশি প্রকাশক হলে বলতো- ভাই সামান্য একটা মাছ মারার গল্প লিখতে ২৭৮ পৃষ্ঠার বই লিখতে হয় ? যতসব ইয়ে।
বইটা ১৯৭৫ সালেই ২০ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছিল।
তো , যা বলছিলাম । ব্যস্ত জীবনের গোলচক্করের মধ্যেও আবিষ্কার করলাম, বুনো জানোয়ারদের প্রতি আমার মনে বেশ নরম জায়গা আছে।
এর কারন আমার মা । জীবজন্তু ভীষণ পছন্দ করে । বারান্দার ঘুলঘুলিতে পাটকিলে চড়াই এসে বাসা বানালেও মা খুশি হয় ভীষণ। মায়াবী বিকেলে সোনার কুঁচির রঙের অচেনা কোন পোকা যখন চলে আসে আমাদের কামরার, মা তখন অবাক হয়ে বলে, ওর নাম কি রে বাবা ?
শাদা কালো বল প্রিন্টের মত প্রজাপতি দেখে মা বলে , দেখ একদম শাড়ির টুকরোর মত না ?
একদম পিচ্চি বেলায় পুকুর থেকে টাকি বা গজারের একটা বাচ্চা ধরে বাড়ি ফিরেছি। মা বলেছিল, বাবা ওকে ছেড়ে দাও। ওর বাপ মা ওকে খুঁজছে। ও বিপদে তুমি ওকে বাঁচিয়ে দিলে ও একদিন তোমাকে বাঁচিয়ে দেবে।
বোকা মায়ের বোকা ছেলে আমি।
বিচ্ছিরির দুনিয়ার বড্ড বেমানান আমরা দুইজন ।
নীল রঙের অন্ধকার মাখা সন্ধ্যায় পুকুরের ঠাণ্ডা জলে মাছটা ছেড়ে দিয়ে মনের ভেতরে অদ্ভুত রকমের এক প্রশান্তির অনুভব হয়েছিল।
ঘন বাদলার তুমুল বৃষ্টির দিনগুলোতে ডোবা, পুকুর থেকে লাফ দিয়ে মাগুর, কৈ উঠে যায় উপরে। পাগলের মত কোথায় যেন যেতে চায় ওরা । প্রকৃতির এক বিস্ময় মনে হয় আমার কাছে। নিজের চোখে দেখেছি । দৃশ্যটা বেশ রহস্যময়। মনে হচ্ছে মহাপ্রলয়ের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক কোন প্রাণী।
কোটি কোটি বছর আগের স্মৃতি ওরা বয়ে চলছে নিজেরদের মধ্য । কি হয়েছিল তখন ? আজও কেন ওরা অমন উম্মাদ হয়ে যায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়লে ?
আব্দুল্লাহ-আল-মুতী সাহেব তার ' রহস্যের শেষ নেই' বইতে এই প্রসঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ইলিশ মাছ কেন রিমিঝিমি বৃষ্টির মধ্যে সাগর থেকে নদীতে চলে আসে, স্যামন মাছ কেন হাজার হাজার মাইল সাঁতরে নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যায় তার ও ব্যাখ্যা আছে।
কিন্তু অমীমাংসিত ব্যাখা।
শুধু ওরাই বলতে পারবে আসল সত্য।
আমার মনের ভেতরে বুনো প্রাণীদের জন্য ভালবাসা জন্মে দিয়েছে মা।
তাই চিড়িয়াখানায় না খেয়ে থাকা জন্তুদের দেখলে মন খারাপ হয়। বেকারির পাশে সাধুদের মত ধৈর্য নিয়ে বসে থাকা ক্ষুধার্ত কুকুর দেখলে মন কেমন কেমন করে। সার্কাসের মা হাতি মারা যাবার পর বাচ্চা হাতিটা যখন এক সপ্তাহ ধরে না খেয়ে থাকে আর শুয়ে শুয়ে কাঁদে তখন বাচ্চাটার জন্য হাহাকার জন্ম নেয় আমার বুকের ভেতরে।
ওদের খবর পেলে খবরের কাগজ কেটে জমাই।
ওদের নিয়ে মজার মিশ্র খবর পাই। কখনও হাসি, মন খারাপ করি বা কষ্ট পাই।
ভারতের এক গ্রামে, ছোট্ট এক চায়ের দোকানে রোজ বিকেল বেলা একটা বানর চলে আসে। বানরটাকে কলা পাউরুটি দেয় দোকানদার । খেয়ে বানরটা বাসি খবরের কাগজ নিয়ে অনেক সময় ধরে পড়ার ভান করে। তারপর দোকানীকে সেটা ফেরত দিয়ে ল্যাগ ব্যাগ করে হেঁটে চলে যায়।
কি কাণ্ড !
সুন্দরবনে এক জেলে মাছ ধরতে গিয়ে পিচ্চি একটা কচ্ছপ নিয়ে বাড়ি ফেরে। পরিবারের সবাই ঠিক করে এই বাবু কচ্ছপটাকে বাজারে বিক্রি করবে না। রেখে দেয় ওরা।
জেলে পরিবারের একজন সদস্য হিসাবে বেড়ে উঠে কচ্ছপটা।
সারাদিন এইঘর থেকে ঐ ঘর ঘুরে বেড়ায়। খাবার খায়। থাকে । কেটে যায় ষোল বছর।
একদিন ভিলেনের মত হাজির হয় বনবিভাগের লোকজন। কচ্ছপটা নাকি বিরল প্রজাতির। উনাদের দিয়ে দিতে হবে। ভাওয়াল ন্যাশনাল পার্কে নিয়ে রাখা হবে ওকে। জেলে পরিবার কি আর দিতে চায়?
কিন্তু আইনের হাত গরিবের জন্য অনেক লম্বা। তাছাড়া তাদের বোঝান হল পরিবেশ রক্ষার জন্য উনাদের হাতে দেয়া উচিৎ কচ্ছপটাকে। শেষে সামান্য টাকা দেয়া হল গরীব পরিবারটাকে।
খবরের কাগজে ছবি ছাপা হল ।
বিদায়ের দিনে বুড়ি এক মহিলা কচ্ছপের মাথায় হাত বুলিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন। ছবি দেখে মনে হল - কচ্ছপটারও মন খারাপ।
কেমন আছে ও ?
প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি ওরা। ওদের জগৎ আলাদা। ভালবাসা, প্রেম, কষ্ট , খিদে সব আছে ওদের ভেতরে। আমরা জানি না।
জানতে চাই না।
খামাখাই কষ্ট দেই ওদের। কুকুর দেখলে ওর শরীরে ইচ্ছে করে গরম ভাতের মাড় ফেলে দেয়, অমন মানুষ আজও আছে।জীবজন্তুর প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখানো একটা ডাল ভাতের মত ব্যাপার হয়ে গেছে।
যেটা আমাদের অসুস্থ এবং নীচু মানসিকতা প্রকাশ করছে।
ভরা জোয়ারে নদীর তীরের কাছাকাছি চলে আসে ডলফিন । ভাঁটার টানে আটকে যায়। ফিরে যেতে পারে না গাঙ্গের জলে। গ্রামের মানুষ ওদের পিটিয়ে মারে। কখনও জেলেরা ও করে কাজটা।
অনেক বছর পর্যন্ত দাঁত বের করে হেসে বলে- ' আমাগ গেরামে একবার তিনন্দা ডলফিন আইছিল। আমরা মাইরা ফেলাইছি। হালার ডলফিন যাবি কই? '
পোনা আর শিশু মাছ কেনা- বেচা- খাওয়া কখনই অপরাধ বলে মনে করা হয় না আমাদের দেশে, সমাজে। বরং অনেক অসুস্থ মানুষ বুক ফুলিয়ে বলে, অমুক মাছের পোনা দিয়ে তমুক ভুনা তার প্রিয়।
বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বনবিড়াল ফাঁদ পেতে ধরে, ফাঁসিতে লটকে খুন করা হয় ওদের। হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে দেখে। উপভোগ করে। কেউ বাঁধা দেয় না।
সুন্দরবনের এক বন কর্মকর্তা নিজের বাড়ির উঠানে ঘাস খাওয়ারত হরিণের মাথায় গুলি করে । মাত্র দুই হাত দূর থেকে। হরিণটা হয়তো ভাবতেও পারেনি সাহেব তাকে গুলি করবে। সাহেব না বনরক্ষক !
নিজেকে মস্ত শিকারি প্রমাণ করেছেন সেই কর্মকর্তা। কে জানে বাকি জীবন আড্ডা আসরে হয়তো বলেছেন- হেই ম্যান, প্রচুর হরিণ শিকার করেছি আমি।
বন বিভাগের লোকেদের 'পশুপতি' হওয়া উচিৎ । ওরাই হয়েছে জঙ্গলের জ্যান্ত শয়তান।
বাচ্চা পেটে নিয়ে ক্ষুধার্ত মা হাতি চলে আসে ভারতের কোন এক গ্রামের লোকালয়ের কাছে। গ্রামের মানুষ আনারসের ভেতরে বোমা রেখে খেতে দেয় জংলের প্রাচীন মা-কে। বিস্ফোরণে মা আর গর্ভের বাচ্চা মারা যায়।
আর আমরা আশা করি, ঈশ্বর আমাদের সন্তানকে দুধে ভাতে রাখবে ?
সত্যি কথা বলতে কি, মানুষ এড়িয়ে দূরে থাকতেই পছন্দ করে ওরা । এটাই ওদের নীতি। তবে কষ্ট পেলে প্রতিশোধ নিতে চায় ।
২০১৬ সালের একটা ঘটনা পড়লাম । ভারতের কেলারা রাজ্যে সীতাথুডু নামে জায়গার কাহিনি।
গভীর বনের ভেতরে একদল দুষ্টুলোক গোপনে চোলাই মদ বানিয়ে বিক্রি করে। এটাই ওদের পেশা। একদিন ওরা যখন মদ বানাচ্ছিল তখন এক বাঘিনী তার বাচ্চা নিয়ে সেই পথ দিয়েই যাচ্ছিল। চোলাই মদ বানানোর দলের নেতা গুলী করে বাঘিনীকে আর পিচ্চি বাচ্চাটাকে মেরে ফেলে । তারপর চামড়া ছড়িয়ে নিয়ে যায় । বাচ্চাটার মৃতদেহ টুকরো টুকরো করে ফেলে। কাজ শেষ করে হাসতে হাসতে গ্যালন ভর্তি চোলাই মদ নিয়ে গ্রামে ফিরে যায় ওরা।
তিনদিন পর বনের ভেতরে আবার ফিরে আসতেই দলের নেতার উপর ঝাঁপিয়ে পরে বিশাল এক বাঘ।
পিচ্চিটার বাবা ।
কামড়ে ধরে নিয়ে যায় নেতাকে। নেতা কোনভাবে নিজেকে ছড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে ভেগে যায়।
পালিয়ে ঢুকে পরে গ্রামে।
গ্রামের বাইরের ধূলামাখা পথে রাগী বাঘটা ঘুরে বেড়াতে থাকে আর চিৎকার করতে থাকে।
দলের নেতাকে হাসপাতালে নেয়া হয় । বাঘের কামড় আর আঁচড়ে অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় মারা যায় শয়তানটা। বাবা বাঘটা টানা দুই মাস গ্রামের চারিদিকে ঘুরতে থাকে আর গর্জন করতে থাকে। এই সময় যাকে পায় তাকেই আক্রমণ করে বসে।
এক ফরেস্ট অফিসার তখন ব্যাপারটা অনুমান করে নেতার ডানহাত থাম্বি নামের দুষ্টুটাকে গ্রেফতার করে। থাম্বিকে হালকা পাতলা লাঠির গুঁতা দিতেই বেচারা ভেউ ভেউ করে সব বলে দেয়।
ফরেস্ট অফিসারদের সহায়তায় মদের কারিগর সবাই ধরা পরে। বিশাল এক দল।
বাবা বাঘটা শান্ত হয়ে ফিরে যায় অরণ্যের ভেতর। এটাই বাঘের বাচ্চা। কে জানে বাবা বাঘটা এখনও বুকের ভেতরে কষ্ট পুষে রেখেছে কি না ? পিচ্চি খোকার তুলতুলে চেহারা মনে করে কষ্ট পায় হয়তো আজ ও।
মারিয়ানা আইল্যান্ডে বুনো শুয়োর, হরিণ , নারকেল কাঁকড়া আর জঙ্গলের লাল মরগ দেখেছি অনেক বার।
লেগুনের বাইরে সতর্ক ভাবে ঘুরে বেড়াত হাঙ্গর। আদিবাসীদের দেখতাম লোহার বাঁকানো শিক দিয়ে কি এক কায়দা করে অক্টোপাস ধরে।
একবার গভীর বনের ভেতরে গিয়েছিলাম কাঠ কুড়াতে। ক্যাম্পফায়ার করব। আচমকা দেখি গাছের ছায়ায় ছায়ায় দাড়িয়ে আছে বিশাল এক প্রাণী। বড় বড় চোখ । রোদ পড়ে শিং চকচক করছে।আশেপাশে মাইল চারেকের মধ্যে কোন জনবসতি নেই। ও এলো কোত্থেকে ?
আমি ভাবলাম, টারবাড়ো না তো ?সেই বুনো মহিষের দেবতা।
ধীরে ধীরে নিঃশব্দে ফিরে এলাম ।
পরে জানলাম, বুনো গরু । স্প্যানিশদের আমলে জাহাজ ডুবির পর এসেছিল দ্বীপে । তখন থেকেই আছে ওরা । কি যে ভাল লাগল। দ্বীপের একটা জায়গার নামই হয়ে গেছে কাউ টাউন। একদম বিরান জায়গা। অতীতে প্রচুর গরু ছিল ।
ফিনল্যান্ডের মিকেলি গ্রামে থাকার সময় এক সন্ধ্যায় দেখি, এক ডজন খরগোস লাফাতে লাফাতে চলে যাচ্ছে ঘাসের বনে। আমাকে পাত্তাই দিল না। যখন চারিদিকে বরফ পড়ে ওরা কি খায় ?
একবার দেখি, কাঠবিড়ালী দৌড়ে রাস্তা পাড় হচ্ছে । ময়লা পিতলের মত ওর গায়ের রঙ ।
আমাদের দেশে পথে ঘাটে আচমকা কোন প্রাণী চোখে পড়ে না আগের মত। ঘাসের মত সবুজ পালকের টিয়ে দেখি না কত বছর। পুকুরের ধারে রোগা বাচ্চারা আগে ছিপ দিয়ে মাছ ধরত । টোপ ফেলা মাত্র উঠে আসতো কমলা রঙের পুঁটি মাছ । অনেকে বউরানি বলত এটাকে , বর্ষায় পুকুরে হলুদ রঙের গজার পোণা গিজগিজ করতো।
কোথায় গেল সব ?
অলস দুপুরে শুনি না নিমপাখির ডাক । সন্ধ্যা বেলায় বাগানে পাকা ফলের লোভে বাদুর আসতে দেখতাম। বলতাম কাউণ্ট ড্রাকুলা এসেছে। প্রকৃতি থেকে যেন হারিয়ে যাচ্ছে ওরা ।
সিডনিতে ক্লিভল্যান্ড স্ট্রীটের ৯/ ২০৯ বাড়িটার কথা মনে নেই ? কত বার না বললাম ? নানান সময়ে, নানান গল্পে । ওই বাড়িটায় উঠে এলাম ২০০৫ সালের একদম শুরুর দিকে।
বাড়িটা আজও আমার স্মৃতিতে চুমকির মত ঝিকিমিকি করে।
ওটা বাড়ি না। প্যারালাল জগতের দরজা।
ভেতরে গেলেই পাওয়া যায় আরামদায়ক আশ্রয়। কাঠের বারান্দা। আড্ডা দেয়ার রুম। কয়েক শো পেইন্টিং। আর রাজ্যের বই।
বাড়িওয়ালা মাইকেল আর আমি প্রচুর ঝগড়া করতাম। একদিন ভেন্ডারে করে মরিচ আর বনতুলসি ঘুঁটে পেস্ত সস বানাচ্ছিলাম। মাইকেল বসে ছিল খাওয়ার লোভে। আচমকা বেচারা ঢাকনা খুলে দেখতে গেল ঘুঁটা কতদূর হয়েছে। সবুজ থিক থিকে মিকচারটা মাখামাখি হয়ে গেল ওর চেহারাতে। দাঁড়িগোঁফের কারনে মাইকেলকে দেখাচ্ছিল প্রাচীন উপকথার সেই দানবের মত। যার শরীর মানুষের মত কিন্তু চেহারাটা অক্টোপাসের।
এক সপ্তাহ কথা বলেনি আমার সাথে।
শেষে যখন বাড়ি ভাড়া দিতে গেলাম এক গাদা পত্রিকা ধরিয়ে দিল আমার হাতে। হলুদ রঙা এই পত্রিকার নাম - ন্যাশনাল জিওগ্রাফি । যৌবনে এই পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিল মাইকেল। আজ বিলিয়ে দিল সব।
কাজ থেকে রোজ ফিরেই ডুবে যাই পত্রিকার পাতায়। পত্রিকায় নিয়মিত বিভিন্ন জীব জানোয়ার নিয়ে ফিচার ছাপা হয়, এটাই আমার আকর্ষণের মূল উপাদান। সাথে থাকে রঙ বেরঙ্গের সুন্দর সব ছবি। একদম জ্যান্ত।
তখন আমিও ন্যাশনাল জিওগ্রাফির সদস্য হয়ে গেলাম।
প্রতি মাসে, বাড়ির সামনের টিনের বাক্সে পত্রিকাটা দিয়ে যেত পোস্ট আপিসের লোকজন। মনে হত শৈশবে ফিরে গেছি। তখন আমাদের বাসায় শিশু নামে একটা শিশুদের পত্রিকা আসতো। সাথে আনন্দমেলা।
আমার মনে হয় দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা ফটোগ্রাফারগুলো কাজ করে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি পত্রিকায় । নিশ্চয়ই ওদের কাছে ছবি তোলার দারুণ সব যন্ত্রপাতি আছে ? কাজেও দক্ষ।
এক সংখ্যার ভেতরের পাতায় দেখি , গহন সবুজ চাদরের উপরে ছড়িয়ে আছে বেশ কিছু বাদাম। খোসা সহ , আস্ত ।অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম বাদামগুলো আসলে হাতি। বিজন ঘাসের বনে চড়ে বেড়াচ্ছে । আকাশ থেকে তোলা ছবিটা ।
আরেকটা ছবি মহাকাশের । নাকি ভিন্ন কোন গ্রহের ? বাদামি হলদে অচিন আলো আকাশ ভর্তি । আকাশ থেকে নেমে এসেছে বড় বড় কিসের গুড়ি । নাকি আলোর বীম ? এক ঝাঁক বিচিত্র স্পেসশিপ চলে যাচ্ছে ধেয়ে । কে জানে কোথায় ?
হয়তো ওরা দিচ্ছে কোন মহাকাশ যাত্রা । গন্তব্য অজানা আকাশগঙ্গা । যেখান থেকে শুরু করবে নতুন নক্ষত্র সভ্যতা।
ওমা, ভাল করে খেয়াল করতেই দেখি - স্পেসশিপগুলো আসলে ব্যাঙ্গাচি । ডোবার জলে সাঁতার কাটছে । চারিপাশে ডুবে আছে নলখাগরা দঙ্গল।
শীতের শেষেই নদী , শাখা নদী শুকিয়ে রোগা হতে থাকে।
মনে হতে পারে অসুখে ভুগছে নদী। আসলে নিয়ম। সারা বছর দৌড়া দৌড়ি করে অমন একটু রোগা হতেই পারে।
তারপর গরম।
চৈতালি আর বৈশাখী গরমে শাখা নদী বা মূল নদী শুকিয়ে যায়। নদীর উপরে জীব জন্তুর বেঁচে থাকা যে কত ভাবে নির্ভর করে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।জলের খোঁজেও অনেক জীব পাখি দেশান্তরী হয়।
গরমের শেষে দেখা যায় নদীর মধ্যে জল নেমে গেছে । যা আছে সেটা কাঁদার সূপ।
দেখতে তরল চকলেট মনে হলেও বিচ্ছিরি জিনিস। তখন শূয়রদের জন্য বেশ একটা আনন্দের ব্যাপার। সময় সুযোগ পেলেই ওরা এই কাঁদায় এসে গড়াগড়ি খেয়ে মাড শাওয়ার করে ফেলে।
কিন্তু খাবার পাওয়া যায় না।
জল আরও শুকিয়ে কাঁদা আরও গহন ঘন হয় ।
চিতাবাঘের খিদে পেলে চলে আসে অমন কাঁদা কাঁদা জায়গায়। অথবা চিতা জানে এখানে আগে নদী ছিল।ওর মগজ জানিয়ে দেয়। হাজার বছরের অভিজ্ঞতা। থাবা দিয়ে কাঁদা মাটি খুঁড়ে বের করে আনে মাগুর মাছ।
জল শুকিয়ে যাওয়ায় মাটির তলায় লুকিয়ে ছিল মাছেরা।
নিজে খেয়ে অন্য মাছ মুখে কামড়ে বাড়ির পথ ধরে হলুদ কালো চিতা।
পত্রিকায় জানতে পারলাম- আজকাল নাকি আফ্রিকান হাতির দাঁত আর আগের মত বড় হয় না।
বিজ্ঞানীরা হিসেব কষে বলেছেন ওটা হয়তো বিবর্তনের একটা চাল। কারন বড় দাঁতের হাতিগুলোই চোরাশিকারিদের প্রথম টার্গেট হয়।
আমার কল্পনায় চোখের সামনে যেন সব দেখতে পেলাম-
আফ্রিকার যে কোন জায়গায় হতে পারে। বতসোয়ানা, বা কেনিয়ায়। বা অন্য কোথাও।
চারিদিকে ঠাসা গাছপালা। আকাইসা আর ব্যাওবাব গাছ বেশি। বুনো কিছু লতা। ঝোপ ঝাড়। মাথার উপরে গনগনে রোদ। এক দল লোক গোপনে পথ চলছে। কালো বেশি। শ্বেতাঙ্গ আছে দুই একজন।
আবার না ও থাকতে পারে।
সবার হাতে AK - 47 বা ম্যাচেটি। আর সবাই বহন করছে এক একটা বিশাল সাইজের হাতির দাঁত।
মাত্র এক বা দুই বুলেট খরচ করে পেয়ে গেছে ওটা। সীমান্ত পাড়ি দিলেই এক একটা দাঁত সোনার দরে বিক্রি হবে। লাভের পরিমাণ কয়েক শো গুন।
সাধারণত জলহস্তির দাঁত, সিন্ধু ঘোটকের দাঁত, তিমি মাছের দাঁত, সবই আইভরি।
কিন্তু আইভরি বলতেই আমাদের চোখের সামনে আফ্রিকা বা এশিয়ান হাতির দাঁতের কথাই ভেসে উঠে।
এর মধ্যে আফ্রিকান হাতির দাঁত সারা দুনিয়ায় সেরা। লোভনীয় ।
সেই পুরানো আমল থেকেই সাইবেরিয়া, আলাস্কা আর গ্রিনল্যান্ডের লোকজন তিমি বা সিন্ধু ঘোটকের দাঁত ব্যবহার করে আসছে। জীবন আর জীবিকার জন্য।
খাবারের জন্য এই দুই প্রাণী মারে ওরা। দাঁত আর হাড় রেখে দেয়। যখন চারিদিকে বরফের স্তূপ হয়ে যায়। বাইরে বের হবার উপায় থাকে না। তখন ঘরে বসে থেকে সব শিকারী হয়ে যায় এক একজন দক্ষ শিল্পী।
হাড় আর দাঁত খোদাই করে দারুন সব শিল্প কর্ম তৈরি করে ওরা।
আফ্রিকা থেকে আইভরি কবে নাগাদ সারা দুনিয়ায় ছড়ানো শুরু করেছিল বলা মুশকিল। তবে যীশুর জন্মের আগে থেকেই নাকি এখান থেকে আইভরি যেত সব জায়গায়। কালো ক্রীতদাসরা বহন করে নিয়ে যেত এই সব আইভরি। বানানো হত পিয়ানোর চাবি, বিলিয়াড বল আর দামি সৌখিন জিনিসপত্র।হাতি মেরে দাঁত বিক্রি করা পেশা হিসাবে নেয়া হয়েছিল প্রায় এক হাজার বছর আগে।
উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়া, লিবিয়া আর সুদানের মত দেশগুলোয় শুরু হয়েছিল। ।
ইউরোপের দেশগুলো যখন থেকে আফ্রিকায় কলোনি বানানো শুরু করে তখন থেকেই জাহাজ ভর্তি আইভতি পাচার হতে থাকে ।
শুধু ইউরোপেই গেছে এক হাজার টন আইভরি।
ইউরোপের বাইরে বড় ক্রেতা ছিল জাপান। আইভরি দিয়ে ওরা হাঙ্ককোশ মানে নামের সিল মোহর বানাত। আইভরিতে ব্যাক্তির নাম খোদাই করে সিল মোহর বানিয়ে ব্যবসা বানিজ্য বা সরকারী কাগজে ছাপ দেয়া হত। বাকি আইভরি দিয়ে অলঙ্কার বা সুভেনিয়র বানানো হত। হিসাবে ১৯৮০ সালে
৪০% আইভরি ক্রেতা ছিল জাপান। আইভরি খোদাই করা শিল্পীদের মধ্যে হংকং -এর শিল্পীদের নাম ডাক ছিল দারুন।
সারা দুনিয়ায় এখন নাকি মাত্র চার লক্ষ হাতি বেঁচেবর্তে আছে। কমে যাচ্ছে দিন দিন। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
কল্পনায় ওদের দেখতে পাই আমি।
হাতি প্রথম দেখেছিলাম শীতলক্ষ্যার পাড়ে ।
কোন এক মাহুত ওর পিঠে চড়ে নদীর জলে স্নান করানোর জন্য এনেছিল ।
প্রচুর লোক ভিড় করে দেখছে । আমি পিচ্চি । কাছে যেতে ভয় পাচ্ছিলাম । মনে হচ্ছিল যদি ধাওয়ানি দেয় ? দূর থেকে দেখে খুব একটা ভাল লাগল না । মনে হচ্ছে, মরচে ধরা বড় একটা টিনের কেতলি । শরীর ভর্তি ময়লা । ইস্ত্রিবিহীন জামার মত ওর গায়ের চামড়া ।
গলায় পিতলের ঘণ্টা । সামান্য নড়তে চড়তেই কেমন ঠুং ঠ্যাং করে শব্দ হচ্ছে ।
হাতির চোখের কোনায় জল ।
মনে হয় প্রায়ই কাঁদে ওটা । হয়তো মাহুত খামাখাই মারধোর করে ।
অথবা বন্দি থাকার সময় জংলের কথা মনে পড়ে ওর । বাবা মা আর ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভেবে কাঁদে ।
হতে পারে না ?
ন্যাশনাল জিওগ্রাফী পত্রিকার সদস্য হবার পর ওদের নিয়ে একটা সংখ্যা পেয়েছিলাম । জানলাম - ওরা আসলে বনের দেবতা ।
হাতি হচ্ছে পরিবেশ টিকিয়ে রাখার জন্য জ্যান্ত এক বাস্তসংস্থান ।
হরেক পদের ফল আর গাছ খায় হাতি । সেই বীজ ছড়িয়ে দেয় মাইল মাইল দূর পর্যন্ত । হাতির গোবর সার হিসাবে সবচেয়ে সেরা । সেই গোবরে সাথে ওর পেটের ভেতর থেকে যে দানা , ঘাসের বীজ বের হয়ে আসে সেটা একদম অনুকূল পরিবেশ পায় - কিশোলয় থেকে গাছ হবার জন্য ।
এক দিনে পঞ্চাশ মাইল দূর পর্যন্ত হাতি অমন ভাবে বীজ ছড়িয়ে দিতে পারে ।
হাতির গোবর থেকে গোবরে পোকা , মেঠো ইঁদুর আর র্যাটেল টাইপের প্রাণী খাবার জোগাড় করে বেঁচে থাকে ।
হাতি চলতি পথে যে সব গাছপালা ভেঙ্গে খায় সেই সব ফেলে যাওয়া গাছ থেকে ক্ষুদে পোকা মাকড় আর জীবজন্তু খাবার পায় । যারা হয়তো বড় বড় গাছের উঁচু ডালের নাগাল পেত না ।
জলের খবর জানে ওরা ।
অমন কি মাটির তলায় জল থাকলেও দাঁত দিয়ে খুঁড়ে বের করে আনে । ওদের পায়ের ছাপে যে গর্ত হয় সেখানে শুকনা মউসুমে ও বৃষ্টির জল জমে থাকে ।
পাখি , কচ্ছপ , ব্যাঙ সেখান থেকে জল পায় ।
বনে হাতি থাকলে সেই বন জ্যান্ত হয়ে যায় ।
শীতের দিনে বাসায় বসা ।
ভিডিও টেপে প্রামাণ্যচিত্রে দেখলাম-চারিদিকে সাদা বরফের স্তূপ। অমন শীতে থাকতে কয়টা জ্যাকেট লাগবে কে জানে।
বরফের সাদা পথ বেয়ে বিশাল শরীর নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে এক মেরু ভাল্লুক। সাথে ওর খোকা। ওদের গায়ের শাদা রঙ সুন্দর ভাবে মিশে গেছে চারিদিকের বরফের সাথে। আচমকা বুঝা যাবে না কেউ হেঁটে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ প্রান্তর দিয়ে।
অনেক খুঁজে একটা গর্ত পেল সে। এটাই ওর বাজার করার জায়গা। গর্তের কাছে গিয়ে চুপচাপ বসে রইল । খোকাকে বেশ খানিক দূরে বসিয়ে রাখল বাবা । সময় কেটে যেতে লাগল। বিরক্ত খোকা বাবার দিকে তাকাতে লাগল ঘনঘন । খিদে পেয়েছে ওর।
এক সময় কি বুঝে যেন থাবা দিল বাবা ভাল্লুক। নখের সাথে বিঁধে উঠে এলো চকচকে রুপালি রঙের মাছ।
রূপার পাতের মত মাছটা দেখেই দৌড়ে এলো খোকা । বাবার কাছ থেকে নিয়ে খেতে বসে গেল। খুশি। গতকাল শ্যাওলা খেয়েছিল। মাছ ওর বেশি ভাল লাগে।
স্নেহ মাখা চোখে খোকাকে কিছুক্ষণ দেখে আবারও ঘাপটি মেরে বসে রইল বাবা ভাল্লুক। রোজ খোকাকে নিয়ে আসে সঙ্গী করে। যাতে, শিকার করা শিখতে পারে। ভবিষ্যতে নিজের খাবার নিজে যোগাড় করতে পারবে খোকা।
খানিক সময় পর থাবা চালালো । উঠে এলো আরেকটা রুপালি মাছ ।
মাছটা মুখে নিয়ে মেরুভাল্লুক হাঁটতে লাগল। পিছন পিছন খোকা। বাড়ি ফিরবে । মা অপেক্ষা করছে।
টিভিতে দৃশ্যটা দেখে মনে হল, হাট থেকে বাড়ি ফিরছে কোন ভদ্রলোক। হাতে পাটের সূতলিতে বাধা পেল্লাই ইলিশ মাছ। বাড়ি ফিরে গিন্নিকে বলবে, 'খাসা করে রান্না কর দেখি। শর্ষে আছে না বাসায় ?'
পশুদের নিজস্ব ভুবনটা সব সময় আমাদের নজরের বাইরে থাকবে। আমরা ওদের নিয়ে ভাবি না। আগ্রহ বোধ করি না। কিন্তু বিশ্বাস কর, জলের উপর ভেসে থাকা কাচপোকাদের দেখতে দেখতেও জীবনের অনেক প্রহর পার করে দেয়া যায়।
ওদের খবর রাখতে গিয়ে আরেকটা মজার খবর পেলাম।
চিনের কোন এক গ্রামের ভেতরে হাতির এক পাল ঢুকে পড়েছিল। সংখ্যায় চৌদ্দ জন । খাবার খুঁজতে গিয়ে ওরা পেয়ে গেল বিশাল এক মদের ভাণ্ডার। ভুট্টা দিয়ে বানানো প্রায় ত্রিশ লিটার মদ রাখা ছিল এক জায়গায়। সবটাই চেটেপুটে খেয়ে ফেলে সেই হাতির পাল। খাওয়া শেষ করে ওদের যেন কেমন লাগতে থাকে। পাগুলো টালুমালু হয়ে যায়। সঙ্গীরা হয়ে যায় ঝাপসা। শেষে পাশের চা বাগানে গিয়ে নাক ডেকে ঘুম দেয় একটা।
সেই ছবি ছাপা হয় নানান পত্রিকায়। সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে ওদের এই কাণ্ড।
খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি পুরা খবরটাই ভুয়া। মানুষের মনরঞ্জনের জন্য খবরের কাগজের ফচকে কিছু লোক ছেপেছে অমন খবর।
যদিও দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় কিংবদন্তি মতে , হাতিরা মাতাল হতে পছন্দ করে। মারুলা গাছ খুঁজে বের করে ওরা । মারুলার মিষ্টি ফল খেয়ে নেশার মৌতাত উপভোগ করে।
ভাবতে লাগলাম, সত্যি কি তাই ? জীবজন্তু ও কি অমন বিচ্ছিরি পানীয় পছন্দ করে ?
বিজ্ঞানীরা কিন্তু স্বীকার করেছেন ব্যাপারটা। কিছু দুষ্টু প্রাণী আছে, যারা বিভিন্ন ফল বা শস্য থেকে কায়দা করে নেশা জাতীয় জিনিস সংগ্রহ করে খায়। এবং মাতাল হবার অনুভূতি বেশ উপভোগ করে।
কি সর্বনাশ !
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্যাটি প্রুডিক বলেছেন, বেশ কিছু ধরনের প্রজাপতি বিয়ারের স্বাদ উপভোগ করে। আমি এর আগে বিয়ারের টিন খোলা রেখে খেয়াল করেছি , প্রজাপতি বিয়ারের স্বাদটা দারুন পছন্দ করে। বার বার ঘুরে ঘুরে উড়ে উড়ে এসে বসছে বিয়ারের টিনের উপর।
শুধু প্রজাপতিই না । আরও অনেক পোকামাকড় ও বিয়ার বা ওয়াইনের স্বাদ পছন্দ করে।
পতঙ্গবিজ্ঞানীরা অনেক সময় এইসব জিনিসের লোভ দিয়েই পোকামাকড়দের ফাঁদে ফেলে।
কাঠবিড়াল আর মুয হরিণ এমনিতে সৎ এবং সাদাসিধে প্রাণী। কিন্তু প্রায়ই আধপচা গ্যাঁজানো ফল বা অতিরিক্ত রস খেয়ে মাতাল হয়ে যায়।
ওদের কোন দোষ নেই। এটা একটা দুর্ঘটনা ছাড়া অন্য কিছু না।
ডন মুর , ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান জাতীয় চিড়িয়াখানার সহযোগী পরিচালক । তিনি অনেক বছর আর লম্বা সময় ধরে জরিপ চালিয়ে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত পাকা ফল খেয়ে জীবজন্তু সামান্য পাকামো করে।
উনি বলেছেন, ' white tail deer, মানে সাদা লেজের হরিণগুলো, আপেলের বাগান ঘুরে বেছে বেছে অতিরিক্ত পাকা আপেলগুলো খায়। আর পরদিন সারাক্ষণ ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সময় কাটায়।
উজ্জ্বল লাল সাদা বল প্রিন্টের ছাপওয়ালা মাশরুমের নাম অ্যামানিটা মুসকরিয়া।
দেখতে সুন্দর হলেও বিষাক্ত। বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু হেইনস লিখেছেন, “পূর্ব ইউরোপের রেইনডিয়ার
হরিণগুলো ইচ্ছা করেই খুঁজে খুঁজে এই মাশরুমগুলো খায়। খেয়ে বেশ একটা ভাবালু অবস্থায় থাকতে পছন্দ করে।
জীবজন্তুর মধ্যে পিতেলা মানে মদপ্রিয় প্রাণী হচ্ছে এক ধরনের পোকাখেকো পিচ্চি চোখের ইঁদুর আকৃতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। নাম- পেন টেইল্ড ট্রিশ্রু (pen-tailed treeshrew ) । এর লেজটা যেন হুবহু পালকের কলম। আচমকা মনে হতে পারে সুকুমার রায়ের আঁকা হযবরল কোন প্রাণী।
আমি নাম দিয়েছি, শেক্সপীয়র ইঁদুর।
তো এই কলমওয়ালা ইঁদুরগুলো প্রতিরাতেই মাতাল হতে পছন্দ করে।
এখন ওদের জন্য তো বার বা শুড়িখানা নেই। ওরা সারারাত খুঁজে খুঁজে এক ধরনের তালের রস খায় । খেয়ে মাতাল হয়ে বেশ একটা মৌতাতে সময়টা কাটায়।এদের শরীরের তুলনায় অ্যালকোহলের পরিমাণ বেশিই গিলে ফেলে। একজন মানুষ এক বসায় আটটা বিয়ার পান করার মত, একই পরিমাণ অ্যালকোহল গিলেও এদের কিচ্ছু হয় না।
তবে, কয়েকটা ব্যাপার বিজ্ঞানীদের কাছে বেশ অস্পষ্ট । যেমন - এই প্রচুর পরিমাণের অ্যালকোহল গেলার পরও ইঁদুরগুলোর মধ্যে কেন কোন কিছু হয় না ? অ্যালকোহলে কীভাবে উপকৃত হয় বা তাদের শরীর কেন অমন চনমন করে সেইসব।
একদল বিজ্ঞানী বেশ অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছেন বাদুরের শরীরে অ্যালকোহলের পরিমাণ যাই থাকুক না কেন উড়ে যেতে কোন রকম সমস্যা হয় না। কিছু ক্ষেত্রে মাতাল বাদুর আরও ভাল উড়ে !
মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার বাদুর সারাবছর জুড়েই পাকা ফল বা ফলের রস পান করে। ওদের রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা বিপদজনক ভাবে বেড়ে গেলেও এরা বেশ ভদ্রলোকের মত উড়ে উড়ে সুন্দর করে বাড়ি ফিরতে পারে।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন অন্টারিওর জীববিজ্ঞানী সহ-লেখক ব্রক ফেন্টন বলেছেন, ' আমরা ধরেই নিয়েছিলাম কিছু প্রাণী অ্যালকোহলের ফলে ভাবালু বা তন্দ্রালু আচরণ করবে। মাতলামো করবে । কিন্তু বাদুর আমাদের একদম হতাশ করেছে।'
২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে মজার একটা পরীক্ষা করা হল।
ব্রাজিলের গভীর বনভূমির ছয় জায়গা থেকে বিভিন্ন প্রজাতির ১০৬টা বাদুর ধরা হল। কায়দা করে ওদের শরীরে দেয়া হল ইথানল, চিনির সিরা, সাথে মাদক দ্রব্য। পরিমাণটা দেয়া হল মেপে। বাদুরের আকৃতি আর ওজনের সাথে ভারসাম্য রেখে।
রক্তে অ্যালকোহলের পরিমাণ ০.৩ পারসেনট। আমেরিকায় গাড়ি ড্রাইভ করার সময় যদি কারও রক্তে অ্যালকোহলের পরিমাণ ০.০৮ পাওয়া যায় তবে পুলিশ ক্যাক করে ধরে ফেলবে।
এবার বাদুরগুলোকে ছেড়ে দেয়া হল বনভূমির নির্দিষ্ট একটা অংশে। চালাকি করে ওদের উড়ার পথে প্লাস্টিকের শিকল ঝুলিয়ে দেয়া হল হিজিবিজি করে।
কোন শিকলে একটুও ধাক্কা না খেয়ে মাতাল বাদুরগুলো সুন্দর মিহি একটা ভঙ্গিতে উড়ে বেড়াতে লাগল।
আসলে মদ খেয়ে গাড়ি চালাবেন না আইনটা মানুষদের জন্য ঠিক । কিন্তু মদ খেয়ে উড়াউড়ি করবেন না, এটা বাদুর সমাজের জন্য ব্যর্থ একটা আইন। কোন বাদুর মেনে নেবে না।
ওরা পাকা ফল খেতে খেতে একদম পেকে গেছে।
বোহেমিয়ান ওয়াক্সউইং পাখি। দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে থাকে। অতিশয় নিরীহ ভদ্রলোক ইয়ে... ভদ্রপাখি । দেখতে বেশ চুপচাপ। ডানার দৈর্ঘ্য সাড়ে সাত থেকে নয় ইঞ্চি । গড় ওজন ৫৫ গ্রাম। পালক বাদামী-ধূসর এবং মাথায় ঝুটি আছে। ডানার মধ্যে হলুদ, শাদা, লাল রঙ মাখানো। যেন মোম রঙ।
ডিমটা দেখতে বেশ সুন্দর ছিট পরা।
তো ওদের সমস্যা কি ? না কোন সমস্যা নেই। এরা শীত পড়লে মদ খেতে চায় ? পাবে কোথায় ?
রেউন (Rowan) নামে পাহাড়ি গুল্ম আছে। জামরুলের মত লোভনীয় একটা ফল ধরে। পেকে গেলে লাল টুকটুকে দেখায়।
তো বোহেমিয়ান পাখিরা পেট ভর্তি করে সেই ফল খেয়ে মাতাল অবস্থায় উড়াউড়ি করে। কতটুকু খেলে সুন্দর ভাবে বাড়ি ফিরতে পারবে সেই জ্ঞান থাকে না। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির হিসাবে বছরে দুটো করে মাতাল পাখি এসে ধাক্কা খায় শহরের দালানবাড়ি গুলোতে।
মাতাল পাখিগুলোকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালে নিতে হয়।
কি একটা অবস্থা !
ওদের পরিবার কি কিছুই বলে না ?
ভার্ভেট বানরের পুরানো বাড়ি আফ্রিকায়। ময়লাটে ধূসর গায়ের রঙ। মুখটা কুচকুচে কালো। যেন পাতিলের তলার কালি ইচ্ছা করেই নিজেরদের মুখে মাখিয়ে নিয়েছে ওরা।
গ্যাঁজানো আখ খেয়ে ওরা মাতাল হবার অনুভূতি আবিষ্কার করে ফেলেছে প্রায় তিনশো বছর আগে।
বিজ্ঞানীদের হিসাবে ভার্ভেট বানরের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন জলের চেয়ে মদ পছন্দ করে।
চরিত্র এদের কাছে অমুল্য সম্পদ না।
শীর্ষস্থানীয় সহ-লেখক জোর্জে জুয়ারেজ বিবিসিকে বলেছেন , কিশোর- তরুণ বানরগুলো বয়স্কদের চেয়ে বেশি মদ পছন্দ করে। আরও বেশি সতর্ক থাকার জন্য এবং দলের প্রতি দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রাপ্তবয়স্করা কম পান করে।
সবচেয়ে আজব ব্যাপার হচ্ছে , মদের দরকার হলে, রাতের বেলা ভার্ভেট বানরেরা সৈকতের ধারের বার বা ক্লাবে গিয়ে মদের বোতল চুরি করে নিয়ে আসে। টুরিস্টদের মদের বোতল চুরি হওয়া স্বাভাবিক একটা ঘটনা।
ভার্ভেট বানরের ব্যাপারে ব্যক্তিগত ভাবে আমি পুরাই হতাশ।
ডলফিনদের একটা প্রজাতি আছে নাম রাফ টুউথ (Rough-toothed) ডলফিন। এদের মুখ ভর্তি আঁকাবাঁকা প্রচুর দাঁত। মনে হয় বেহায়ার মত হাসছে। নামকরণের কারন বোধহয় এটাই। সামাজিক নিরীহ প্রাণী। দশ থেকে বিশজনের দল বানিয়ে চলে। আর সব ডলফিনের মতই।
মাছ, বাচ্চা স্কুইড ,শামুক, ঝিনুক খেয়ে বাঁচে।
বিশ্বাস করবে না মানুষের মতই এদের মগজ। বিজ্ঞানীদের মতে মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান।
তো এরা যে বিচিত্র ব্যাপার ঘটাবে তাতে আর সন্দেহ কি ? এরা বিষাক্ত পাফার মাছ খায়। ডিসকভার ম্যাগাজিনের মতে, পাফার হচ্ছে বাংলার সেই পটকা মাছ যা কি না কোকেনের চেয়ে একলক্ষ বিশ হাজার গুন বেশি বিষাক্ত । মাদকদ্রব্য মেথামফেটামিন চেয়ে চল্লিশ হাজার গুন বেশি বিপদজনক। এছাড়াও রয়েছে টেট্রোডোটক্সিন নামে পরিচিত বিষ। এই বিষের এক ডোজ ডলফিন এবং মানুষ হত্যা করতে পারে। বেঁচে থাকলেও পক্ষাঘাত করে ফেলবে। একদম নড়াচড়া করতে পারবে না।
বিবিসির প্রাণিবিজ্ঞানী এবং প্রযোজক রব পিলি সানডে টাইমসকে বলেছিলেন , এই ডলফিনগুলো বিষাক্ত পাফার মাছ দেখতে পেলেই দ্রুত গিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। তারপর কেমন সুখী একটা ভঙ্গিতে সাঁতার কাটে।
বিজ্ঞানীদের সন্দেহ করছেন, এই ডলফিনগুলো কোন ভাবে আবিষ্কার করে ফেলেছে এমন কায়দা করে তারা বেশ খানিকটা নেশাদ্রব্য সংগ্রহ করতে পারে।
তাই হয়তো দেখা যায় পাফার মাছ চিবিয়ে খাওয়ার পর ওরা অগভীর সৈকতে গিয়ে রোদে পিঠ দিয়ে কেমন অলস ভঙ্গিতে শুয়ে থাকে।
কে জানে !
শুঁয়াপোকা চেনো তো ?
ওদের অনেকগুলো কিন্তু দেখতে মারাত্নক সুন্দর হয়। সবুজের মধ্যে হলুদ ফোঁটা। হলুদের মধ্যে কালো ফোঁটা। মনে হয় পিচ্চি একটা রেলগাড়ি কোন ভাবে প্রাণ পেয়ে গেছে। ওর চাকার বদলে কয়েক গণ্ডা পা গজিয়েছে। ও ধীরে সুস্থে হেঁটে ওর নিজের খাবার যোগাড় করে। খেয়ে পাতার আড়ালেই গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন উঠে আবার সালাদ খাওয়ার জন্য হাঁটা ধরছে। ওর ভাবটা- যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।
বা ভোজনং যত্র তত্র , শয়নং পাতার মন্দির।
ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক , দশ বছর ধরে পেরু এবং কলোম্বিয়ার এক ধরনের শুঁয়োপোকা পরীক্ষা করে জানতে পারলেন, এই পোকাগুলো কোকা গাছের পাতা দিনের পর দিন খেয়েও কোন রকম হোলদোল দেখা যায় না ওদের মধ্যে।
অর্থাৎ মাদক সারা ফেলে না ওদের উপর।
কোন একটা কারনে তাদের এই গবেষণা বেআইনি ঘোষণা করা হয়। সেই সময়ে অর্থাৎ ১৯৯০ সালে আমেরিকার প্রশাসন চেয়েছিল এই ধরনের শুঁয়াপোকার খামার বানিয়ে ওদের ছেড়ে দেয়া হবে । যাতে সব কোকা গাছ খেয়ে নষ্ট করে ফেলে ওরা। আর মাদক ব্যবসা লাটে উঠে ।
কিন্তু অজানা কোন কারনে করা হয়নি।
হয়তো ভেবেছে বেকার মাদক ব্যবসায়ীরা কি করে ডাল ভাত খাবে ! কোথায় যাবে। জীবিকার জন্য কি করবে ?
মৌমাছি কি মাতাল হয় ?
বিজ্ঞানীরা বলেন, হয়। বেশ কিছু মৌমাছি মধু যোগাড় করতে গিয়ে মাতাল হয়ে যায়। উড়তে গিয়ে ব্যাথা পায় ! এমন কি বাড়ি ফেরার রাস্তাও ভুলে যায়। অনেক কষ্টে যখন বাড়ি মানে মৌচাকে ফেরে তখন শাস্তি হিসাবে ওদের আলাদা খোপে রাখা হয়। এবং ওদের পায়ে কামড় দিয়ে শিক্ষা দেয়া হয়।
মৌমাছি সমাজের আইন আমাদের জন্য বেশ খাসা উদাহরণ।
ওহিও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চার্লস অ্যাব্রামসন বলেন, অ্যালকোহল মৌমাছির শরীরে মানব দেহের মতই প্রভাব ফেলে।
তো , প্রাণী জগতের মজার একটা অংশ নিয়ে তোমাদের সাথে আড্ডা দিলাম আজ ।ওদের জগৎ অনেক বিচিত্র। সেইসব নিয়ে তোমরা প্রচুর বই পাবে। পড়বে। ভালবাসতে শিখবে ওদের। ওরা কষ্টে আছে ।
সবচেয়ে মজার জিনিস হচ্ছে ভরা জোসনার রাতে বনভূমির দৃশ্য নিজের চোখে দেখা। যে না দেখেছে সে মস্ত জিনিস মিস করেছে।
পুরো বনভুমিই যেন মাতাল হয়ে যায় সেই সব রাত্রে।
নিজের চোখে দেখবে তোমরা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন