সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমাদের যত ফেরিওয়ালা

 ওদের আমার ভাল লাগতো । বেশ অনেকটাই ভাল লাগত    

 কারন সারাদিন ওরা টইটই করে ঘুরে বেড়াতে পারতো ।  যেখানে মর্জি  চলে যেত । বাড়িও নিশ্চয়ই অনেক দূরে ?

 ঈর্ষা করতাম ।

প্রথম যে ফেরিওয়ালার সাথে পরিচয় সে আসতো একদম সকাল বেলা ।  

আমি খুব  পিচ্চি তখন । টালুমালু করে হাঁটি । তখনও ক্ষুদে তিমি শিকারি হইনি । পড়াশোনা ধরতে আরও অনেক দেরি।      

লোকটা   উঠানে দাড়িয়ে চিল্লানি দিত - মিষ্টি বাকরখানিইইইই ।  

বিচ্ছিরি একটা সুরে । কাঁদো কাঁদো ।

যেন কেউ মারধর করেছে তাকে ।

টিনের ঘরের মত একটা ঘর মাথায় বয়ে বেড়াতো । কাঠ আর নীল  প্ল্যাসটিকের বানানো সেটা । ভেতরে  কালাই করা  মাখন রঙ্গা   হলুদ টিনের বাউল ভর্তি রসগোল্লা । কালো জাম । মাখন ।  বাকরখানি ।  আরও কি কি যেন ।

সাইকেলের বাতিল স্পোক বেঁকিয়ে কেমন একটা চিমটা বানিয়ে নিয়েছিল । সেটা দিয়েই কায়দা করে রসগোল্লা তুলে দিত খদ্দেরের হাত ।

তখন কিন্তু  আমি একদম পিচ্চি।

কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে,  আমার জন্য রোজ একটা করে রসগোল্লা আর ছানার সন্দেশ বরাদ্দ করা ছিল । মাসিক চুক্তি ।

বাবা মাঠা খেত  এক গ্লাস । খাওয়ার পর সেটা গোঁফের উপর সুন্দর ভাবে লেগে থাকতো ।   বালটিক সাগরে শীতল স্রোতে ভেসে যাওয়া   বরফের মত । মাথার চুল কালো কিন্তু গোঁফ  শাদা ।  দেখার মত দৃশ্য ।

কি যে হাসি পেত !কিন্তু হাসার উপায় নেই।  

খানিক  পরে, মানে বছর দুইয়েকের পর  আর কাউকে বাড়ি বাড়ি ফেরি করে অমন মিষ্টি বাকরখানি বিক্রি করতে দেখিনি ।

দুপুরবেলা কালো কুচকুচে মাটির একটা জালা নিয়ে আসতো এক লোক ।  প্রায় একই রকম দেখতে  ওরা । মানে মাটির জালা আর লোকটা । যেন যমজ দুই ভাই । দুষ্ট জাদুকরের অভিশাপে এক ভাই মাটির জালা হয়ে গেছে । অন্য ভাই জালা ভাইকে মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  

হায় হায় !

 কালো লোকটা   চেঁচাত - কাসুন্দি রাখবেন না কি , মা জননীরা ? কাসুন্দি আছে কাসুন্দি । টাটকা কাসুন্দি । ও মা জননীরা।

জননী মানেই মা। তারপরও উনি ডাবল শব্দ ব্যবহার করতেন।কেন,  সেটা বাংলা ব্যাকরণ স্যার ভাল বলতে পারবেন।   

সবাই গিয়ে কালো লোকটার সামনে  ভিড় করলেই নারকেলের মালা দিয়ে বানানো এক অদ্ভুত রকমের গোল চামচ দিয়ে জালার ভেতরের জিনিসগুলো ঘুঁটে দিত  সে ।

কেমন একটা  বিটকেলে ঘ্রাণ বের হত ।  টক টক ।

যেন তিব্বতি সাধুদের বানান গোপন কোন  তন্ত্র মন্ত্রের জিনিস  । খেলে আধি ব্যধি সব  পালিয়ে যাবে ।   

মানুষ কিনত বেশ ।

 শিশি  আর  ত্রিশিরা কাচের মত বয়াম ভর্তি করে  বাড়ির মেয়েছেলেরা কাসুন্দি কিনে নিত ।  আচার টাচার বানাবে ।

সেই সময় বড়দের আড্ডায় দুই একজন পুরানো কথা বা আলোচনার  বিপক্ষে যুক্তি দিত - ' আরে পুরানো কাসুন্দি ঘেঁটে কী   লাভ ? নতুন কিছু  বল ।'

বুঝতে পারলাম পুরানো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই ।ঘাঁটলে নতুন কাসুন্দি ঘাঁটতে হবে।

আরেকজন আসতো ।

গাবের কষের মত  কালো কুচকুচে গায়ের রঙ । মাথার চুলে প্রচুর শর্ষের তেল দিয়ে শজারুর কাঁটার মত করা । খালি গা । মলিন লুঙ্গিটা কায়দা করে  হাফপ্যান্টের মত করে রেখেছে । গলায়  লাল রঙের কেমন অচেনা  দানার  মালা ।  বাম হাতের বাহুতে পেল্লাই চ্যাপটা   তাবিজ।  রোদ পরে আলুমিনিয়ামের তাবিজটা রুপালি চান্দা মাছের মত  ঝিকিমিকি করে  ।  বগলে বেতের একটা  বিটকেলে   ঝুড়ি ।

সে হাঁক দিত -

' জলে পড়া পানিতে ডুবা জিনিস খুইজ্জা দেই । হারানো জিনিস খুইজ্জা দেই ।'

 অদ্ভুত না ?

মানে কী  এই সংলাপের ?

হাঁক ডাক করে কি বলতে চাইছে সে ? জল আর পানি একই জিনিস তারপরেও সে মঞ্চ নাটকের সংলাপের মত ঘন আর ভারি  বাক্য  দেয়ার জন্য এই দুই শব্দ এক সাথে ব্যবহার করছে  ।

হারানো জিনিস খুঁজে কি ভাবে ?

ব্যাপারটা জানতে পারলাম ।

তখন সব পাড়ায় মহল্লায় পুকুর ছিল । ঘাটলায় বসে থালা বাসন মাজত মা  গিন্নি আর মেয়েরা । হাত ফস্কে বা তাড়াহুড়ায়  জলে পরে হারিয়ে যেত পিতলের থালা । লোহার কড়াই । কাঁসার ঘটি ।

হয়তো তেমন দামী না । কিন্তু জিনিসগুলোর সাথে স্মৃতি মাখামাখি করে আছে তরকারীর ঝোলের মত । ফিরে পেতে চায় সেই সব । প্রিয় জিনিস কেউ কি আর হারাতে চায় ?  লোকটাকে এক টাকা মজুরি দিলে সে যে কোন পুকুরে  নেমে যাবে  আটলানটিসের  মানুষের মত । বা আলেকজান্ডার বেয়ায়েভ - এর উভচর মানুষের মত । খুঁজে দেবে ।

সেইবার প্রিয় বালাদের পুকুরে স্নান করতে গিয়ে মহুয়া দিদি এক পায়ের নুপুর হারিয়ে ফেলেছিল । রূপার নূপুর।  

তখনই ঐ উভচর লোকটাকে এনে উদ্ধার করা হয়েছিল ।

আফসোস,  আমি তখন ইস্কুলে । জমজমাট এই উদ্ধার পর্ব দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম । ইশকুল জিনিসটাই খারাপ ! কত কিছু যে মিস হয় জীবন থেকে !

অবাক হতাম এই ভেবে  , এই লোক গুপ্তধন খুঁজতে যায় না কেন ? এক টাকা মজুরিতে কী   আর হয় ? যদিও গয়না তোলার মজুরি দশ থেকে পনের টাকা নেয় । আবার কক্ষনো কখন গয়না পেলে লুকিয়ে ফেলে লুঙ্গির কোমরে । উঠে এসে  হতাশ গলায় বলে - কিচ্ছু পাই নাই ।  

তো মানুষের সব আশাই পূর্ণ হয় । কয়েকদিন পর আমার ছোট ভাইটা যেটা কিনা মাত্র কচ্ছপের মত হাঁটাহাঁটি করে , ও করলো কি ,  পেতলের চামচটা পাটাতন ঘরের ফাঁক দিয়ে জলে ফেলে দিল ।

কিছু ফেলে দিলে চুবুস করে শব্দ হয়,  শব্দটা  ওর ভাল লাগে । ফেলে তাকিয়ে থাকে অনেক সময় । একা একাই হাসে।  মুভি দেখার আনন্দ পায়  হয়তো ।

 প্রায় এক হাত লম্বা সেই পিতলের চামচটা । মায়ের ঠাকুরমার জিনিস । বিয়েতে দিয়েছিল । সেই বুড়িও স্বর্গে চলে গেছে ।

মোদ্দা কথা ভীষণ স্মৃতিমাখা জিনিস । লাগবেই ।

তখন এক দুপুরে সেই কালো হিঙলাজ মার্কা লোকটা এলো । এক টাকা মজুরি । জলে নেমে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করলো । কিন্তু চামচ পাওয়া গেল না।

ব্যাপারটা দুঃখজনক ।

এইসব ফেরিওয়ালাদের  আমাদের কাছে কখনও  উপদ্রব  মনে  হত না।  খুব দরকারি লোক মনে হত ।

খাঁ খাঁ করা  জর্দা  রঙা দুপুরে লোহার একটা রিঙের মধ্যে কয়েক ডজন চাবি ঝুলিয়ে ঝমঝম শব্দ করে আসতো - চাবি বানাই , চাবি । সব দুয়ারের চাবি । বন্ধ কপাটের চাবি ।

কারও তালার চাবি হারিয়ে গেলে তালা খোলা মুস্কিল হয়ে  যেত । লোকটা এক টুকরো  পাতলা লোহার পাত উখো দিয়ে ঘষে ঘষে চাবি বানিয়ে টুক করে খুলে ফেলত সেটা ।

কেউ কেউ টর্চ মেরামত  করতো । তখন টর্চ ভীষণ  দরকারি জিনিস । যখন তখন বিজলি চলে যেত । হ্যারিকেনে তেল ভরে জ্বালাতে জ্বালতে সময় লাগতো । বাড়ির কর্তা চেঁচিয়ে উঠলো - এই ন্যাপলা আমার টর্চটা কই রে ?

বেশ কাজের জিনিস ।

আমার বন্ধু আনন্দের বাবা বিজলি চলে গেলে মাথার উপর টর্চ বেঁধে দিয়ে সেই আলোতে বাচ্চাদের পড়াতে বসাতেন । মাথা  নেড়ে  গম্ভীর মুখে বলতেন - ' হু হু কারেন্ট নাই সেই অজুহাত চলবে না বাবা । বিদ্যাসাগর ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে পড়েছেন ।  কাজেই নো ফাঁকি ঝুকি ।'   

বুঝাই যাচ্ছে ভীষণ কঠিন পদার্থ এই আনন্দের বাপ ।

'শীল পাটা খোঁদাই করাইবেন নি । শীল পাটা ।'

আরেক কারিগর আসতো ।

ধুলামাখা  ঝোলার মধ্যে ক্ষুদে হাতুরি বাটাল ।

আসলে রোজ রোজ মসলা বাটতে বাটতে শীল পাটা কেমন মসৃণ হয়ে যেত । পুঁতা যেত হড়কে । তখন এই পাথুরে শিল্পী হাতুরি  বাটাল দিয়ে সুন্দর সারি সারি ক্ষত করে দিত পাটার গায়ে । আবার  ঝম ঝমা ঝম করে  মসলা বাটা যেত ।

কেউ কেউ মিস্তিকে অনুরোধ করত , পাটার গায়ে ফুল লতা নকশা   করে দিতে । ইলিশ মাছের ছবি খোঁদাই করে দিতে দেখেছি । প্রতিবেশী দফাদার সাহেবের গিন্নি পাটার গায়ে উনার নাম খোঁদাই করে নিয়েছেন । যাতে পাটা কেউ চুরি করে নিয়ে গেলে প্রমাণ  রয়ে যাবে এটা উনার পাটা ।

কতদিন কল্পনা করেছি - একটা কালো মত চোর আধমনী ওজনের সেই পাটা বগলে নিয়ে  দৌড়াচ্ছে ।

সম্ভব না কি অমন ?

ওত ওজনের জিনিস কে চুরি করতে যাবে ?

 বেতের ঝুড়ি করে কালো কুচকুচে গোল্লা গোল্লা আজব ছমছমে জিনিস নিয়ে আসতো  মধ্যবয়স্কা মহিলা   বা যুবতী রাধে ।

সুরেলা গলায় ডাক দিত , ' কালা সাবান রাখবেন নি  গো কালা সাবান  ?'

এই জিনিস ১৯৮৮ সালের পর আর দেখিনি ।

 ছোটবেলায় সস্তাপুরের ওখানে চানমারিতে হাঁটতে গিয়ে বেশ কয়েকটা কালাসাবান বানানোর দোকান দেখিছিলাম ।

এক একটা গোল্লার দাম ছিল চারআনা । মানে পচিশ পয়সা ।  মাছের আঁশের চেয়ে বড় একটা মুদ্রা ছিল । এক পিঠে শাপলা আরেক পিঠে  বাঘের ছবি । তো সেই মুদ্রায় বিনিময় হত ।

কাজ কি এই কালাসাবানের ?

তখন কিন্তু স্যম্পুর মত দেখতে এত সব ডিশওয়াসার ছিল না।  ছাই দিয়ে বাসন মাজত বেশির ভাগ মানুষ । আরেক জিনিস ছিল এই কালা সাবান । ক্ষার ,  হলুদ মাটি ,  অ্যামোনিয়া আরও হাবিজাবি জিনিস জ্বাল দিয়ে অর্ধেক গোল্লা ছাঁচের মধ্যে ঢেলে দিলেই পরদিন সকালে পুডিঙের মত দেখতে এই কালা সাবান রেডি । বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফেরি করে দুই চার পয়সা কামাত এরা ।

পরে উঠে গেছে । বানানোর খরচ বেড়ে যাওয়া সাথে লাভের হারও অনেক কমে যাওয়াই অন্যতম কারন ।

দুপুরের দিকে লেইসফিতা আসতো । এদের পরিচয়  করিয়ে  দেয়ার কোন মানে নেই ।

লেইসফিতা হচ্ছে দুনিয়ার সবচেয়ে চিত্তহরণ করা জিনিস ।

সারা পাড়ার আবাল বৃদ্ধ বনিতা এসে ঝাঁপিয়ে পড়তো লেইসফিতা বিক্রেতার উপর । এক টুকরো গুড়ের উপর যেমন করে পিঁপড়ে  আক্রমণ করে, তেমনি ।

বিক্রেতার পিঠের উপর পেল্লাই একটা বোচকা । হাতে কাঠের সুটকেস মার্কা জিনিস । সুটকেসের  উপরটা কাচের । ভেতরের জিনিস দেখা যায় ।  হরেক পদের কানের দুল , ফিতা , টিপের পাতা , কুমকুম , চুমকি ।

বাপরে !  দেবীদের জন্য কত কী  লাগে !

বিকেলে  যখন রোদ কমে কাঞ্চন রঙা হয়ে যেত । সূর্যটা পশ্চিম দিকের অভিজাত  এক বাড়ির জলের টাঙ্কির কাছে গিয়ে ল্যাগব্যাগ করে ঝুলত তখন পান মুখে দিয়ে দুই বুড়ি আসতো । মাথার চুল গুণে গুণে অর্ধেক শাদা অর্ধেক কালো ।  কাঁচা আর পাকা চুলের  লড়াই হচ্ছে । কাঁচা চুলেররা হেরে যাচ্ছে  ধীরে ধীরে  ।

তো, এই দুই বুড়ির হাতে কেমন রহস্যময়  বেতের ঝুড়ি ।

উনারা জানালার পাশে দাড়িয়ে  মিহি আর আবেগি  গলায়  জানতে চাইতেন -  আলতা সুনু নিবা গো মা ?

সুনু মানে স্নো । তুষার ?

আরে নাহ । তখন তিব্বত বা অমন নামে পিচ্চি বয়ামে স্নো বিক্রি হত ।

স্নো আর পাউডার  রূপচর্চার  খুব  সাধারণ জিনিস  হিসাবে ঘরে ঘরে থাকতো ।

অমন কি ইস্কুলের যাবার সময় মা আমাকে ধরে জোর করে গলায় , ঘাড়ে এত বেশি পাউডার ঘষে দিত যে ক্লাসে স্যার ঢুকেই চেঁচিয়ে উঠতো, কি রে তর গলায় ঘাড়ে দেখি ফ্যাঙ্গাস পরে গেছে  ।  নাকি ক্যারাম বোর্ড খেলে এসেছিস ?

বলেই  খ্যাক খ্যাক করে বিচ্ছিরি একটা ভঙ্গিতে হেসে ফেলতেন। যেন হাসির অ্যাটম বোম মার্কা বই থেকে বেছে সব চেয়ে সেরা কৌতুকটা বলে ফেলেছেন। না হাসলে মহাপাপ হবে।  

পাঞ্জাবি পায়জামা পরে অনেকেই ঘাড়ে পাউডারের স্তূপ মেখে বেশ বাবুয়ানা করে ঘুরে বেড়াত । তিব্বত  স্নো তখনও টিউবে বের হয় নি। ক্ষুদে বয়াম । ছিপিটা ছিল অ্যালুমিনিয়ামের ।

দাম কত ছিল মনে নেই । তবে সেই বুড়িরা ধাউস  এক  অ্যালুমিনিয়ামের লম্বা পাত্র ভর্তি ঘরে বানানো স্নো নিয়ে বিক্রি করতে আসতো । দলা দলা পোয়া পোয়া স্নো জলের দামে দিয়ে যেত । সবাই কিনে সেটাই আগের খালি বয়ামে ভরে ব্যবহার করত । বাদবাকি রেখে দিত শিশি, বয়াম আর  বোতলে   বন্দি করে ।

আলতা বিক্রি করত কেমন চ্যাপ্তা বোতলে করে ।

কলের ঘাটলায় পায়ের ঘোরালি ঘষে পরিষ্কার করে আলতা দিত   জোসনার   যুবতীরা। বেশ মা- লক্ষ্মী মার্কা ভাব এসে যেত ।

আমার স্পষ্ট মনে আছে । সেই দুই বুড়ির একজনের বাহুতে নীল রঙা উল্কি ছিল । মৎস্যকুমারী । বুড়ি নাকি বিহারী । নিউ মেট্রো সিনেমা হলের ওখানে থাকে ।

উল্কি মাত্রই আমার কাছে বেশ ছমছমে  রহস্যময় ব্যাপার । ঠিক করলাম বড় হয়ে আমিও বাহুতে উল্কি করব । জাহাজি পাপাইয়ের মত ।  গাবলুর   সাথে মারামারি লাগলে পালং শাক খেয়ে গদাম করে ঘুষি মেরে ওর নাক ফাটিয়ে দেব ।

কিন্তু  উল্কি করা নাকি বেশ কষ্টের ।

বুড়ি নিজেই মাকে বলছিল - বুমা আর কহিও না । ছুই দিয়া খুচাইয়া খুচাইয়া এই নকছা   করতে হয় । বেথায় মনে হয় আমার আত খুইল্লা পইড়া জাইব । তিন দিন ছিল ছেই  বেথা ।'

যাই হোক,  বড় হয়ে উল্কিটা আর  করা হয়নি ।

জীবন এত ব্যস্ত কেন ?

মিষ্টি খেলে দাঁত নষ্ট হয়ে যায়- অমন একটা  গুজব ছড়াত অসাধু কিছু মুরুব্বী ।

ডাহা মিথ্যা ।

নানা রকম মিষ্টি মার্কা খাবার আসতো । খুব কমন হচ্ছে হাওয়াই মেঠাই । টিনের একটা ক্যানেস্তারা । সেটার এক দিক কাচের । যাতে ভেতরটা দেখা যায় ।  ক্যানেস্তারার   ভেতরে  ফিকে গোলাপি রঙের  তুলতুলে  উলের বলের মত গোল্লা গোল্লা হাওয়াই মেঠাই নিয়ে আসতো এক লোক । এটাও চার আনা।

মানে পচিশ পয়সা ।

এখন এই পয়সা আর আনা এই নাটকগুলো আসলে কি ?

বুঝিয়ে বলছি ।

 এই পৃথিবীর বাজে একটা জিনিস হচ্ছে,   কিছু কিছু জিনিস কালের নিয়মে হারিয়ে যায় । কেন ?

 ঐ যে নিয়ম !

তোমরা হয়তো কাগজের নোট আর কয়েন দেখেছ শুধু । আমাদের সময় পয়সা ছিল ।  একশো পয়সায় এক টাকা কে না জানে ? এক পয়সার ব্যবহার আমি পাইনি । বাসায় কতগুলো ছিল বটে ।মা রেখে দিয়েছিল স্মৃতি হিসাবে।  অ্যালুমিনিয়ামের চারকোনা পয়সাটা ছিল পাঁচ পয়সার । ১৯৭৩ সালে চালু হয়েছিল এটা । লাঙল আর শাপলার ছবি দেয়া ।  ১৯৭৭ সালে আবার বানানো হয়  লাঙলের  বদলে ট্রাক্টরের ছবি  দিয়ে  ।  দশ পয়সাটা ছিল একেবারে নয়নতারা ফুলের মত । সেইজন্য অনেক জায়গায় নয়নতারা  ফুলকে  পয়সা  ফুল বলে।

পচিশ আর পঞ্চাশ পয়সা দুটোই ছিল স্টিলের গোলাকার মুদ্রা । ছোট আর বড় ।

 পচিশ পয়সাকে বলতাম সিকি আর পঞ্চাশ পয়সাকে আধুলি ।  আবার পচিশ পয়সাকে বলতাম চারআনা । আর পঞ্চাশ পয়সা হচ্ছে আটআনা ।

মায়ের মুখে হিসাব শুনেছি ,  হিসাবটা অমন -

৪ পয়সায় নাকি ১ আনা  ।

৮ পয়সায়  ২ আনি ।

৪ আনায় ১ সিকি   বা ২৫ পয়সা ।

৮ আনায় ১ আধুলি বা  ৫০ পয়সা ।

১৬ আনায় ১ টাকা ।

এই হল হিসাব ।

সুলতানি আমলে ১৬ টাকায় ১ মোহর হত ।

আমি সুলতানি আমলে ছিলাম না। তাই মোহর দিয়ে কেনাকাটা করিনি । কিন্তু রেডিওতে আনা দিয়ে গান শুনেছি ।

যেমন - আনা আনা  ষোল আনা,  ভাগ না হলে প্রেম মিলে না ... হেন তেন।

গানের কথাগুলো কিম্ভূত !

হাওয়াই মিঠাই তেমন লাভ হত না । দেখতে যতই ইয়েতি মার্কা সাইজ হলেও মুখে দেয়া  ফুউস করে  গলে গালের সাথে লেপটে যেত । পোষাত না।  

চিনি দিয়ে বানানো গোলাপি হলুদ রঙের ক্ষুদে বাউল আর আম বিক্রি করত আরেকজন । কাঠের একটা তক্তা  গামছা দিয়ে  বেঁধে গলার সামনে  ঝুলিয়ে নিত । ওখানেই সাজানো থাকতো বাউল  । আর গাছের একটা ডাল পুঁতে ঐ ডালে চিনির আম ঝুলিয়ে রাখত ।

খদ্দের ধরার জন্য  পিতলের একটা ঘণ্টা লাগাতার বাজিয়ে যেত ঠন ঠন করে ।

বোম্বাই মিঠাই আসতো বিকেলের দিকে । দূর থেকেই বিচ্ছিরি সুরে গানের মত শোনা যেত -

বোম্বাই মিঠাই খাইলানা ।

বেশি পয়সা লাগে না ।

মাত্র লাগে চাইর আনা ।

তোমরা দেখি লইলা না ।

মাইঙ্কার  মা গো চাইঙ্কার মা ।

মাত্র লাগে চাইর আনা ।'

গানের শেষে সাথে হাঁক দিয়ে    যোগ করত -  ঘড়ি বানাই , আংটি বানাই , মালা বানাই ,  চেয়ার বানাই ,  দরবেশ  বানাই ,  বেদের মেয়ে  জোসনা বানাই ।

  পিচ্চির দল দৌড়ে যেত ।

লুঙ্গি আর হাফ হাতা  রঙ জ্বলা জামা পরে লোকটা কাঁধের সাথে তেল চকচকে একটা বাঁশ বয়ে বেড়াচ্ছে । বাঁশের উপরের দিকে লেপটে    আছে লাল- হলুদ , গোলাপি ,শাদা অমন কয়েক রঙের ডোরা কাটা নরম ক্যান্ডি  ।

চার আনা পয়সা দিয়ে ফরমায়েশ  করা   মাত্র লোকটা টেনে নিত খানিক ক্যান্ডি । চোখের পলকে সেটা দিয়ে খদ্দেরের হাতে আংটি বা  ঘড়ি বানিয়ে দিচ্ছে ।

আর বেদের মেয়ে জোসনার নামে যা বানাচ্ছে সেটা কাঠি দিয়ে রোগা পটকা কেমন একটা জিনিস উপরে ক্যান্ডি প্যাচান । চাইলে সেটা একটা মেয়ে মানুষ হিসাবে কল্পনা করা যেতে পারে । তবে অনেক বেশি কল্পনা করতে হবে।

 এক বুড়ো   আসতো ধপধপে পাঞ্জাবি  পায়জামা পরে । মাথায় ইবনে বতুতার মত টুপি । পাগড়ী । পাঞ্জাবির  উপর জরি আর  চুমকিওয়ালা কেমন একটা হাতা কাটা ব্লাউজ ।  সিনেমায়  দেখা   রাজকুমারদের পোশাকের মত ।

লোকটা যেন বাগদাদ বা তুরস্ক থেকে এসেছে ।

সে বেচত  আতর , সুরমা , তসবি আর জায়নামাজ ।

আতর তসবি বিক্রেতার নাম জানা হয়নি ।

দেখতাম উনার হাতে , আমলকীর  রঙের মত   সুন্দর তসবি । কাবা শরীফের ছবিওয়ালা জায়নামাজ । বাঁটুল সাইজের শিশি । সেইসব  শিশি   ভর্তি জাফরানি রঙের তরল । উনি হেঁটে গেলেই মিষ্টি খোশবু চলে যেত উনার  সাথে সাথে ।

মুখের  ভাষা ছিল বিচিত্র ।

 গায়েব , কেয়ামত , দফতর , মর্জি , ইনসাফ ,  তনখা , আক্কেল ,  আন্দাজ , খোদা কি অয়াস্তে , কোর্মা, লবণের টোপা ,  আদাব , ওয়ারিশ , বেততমিজ , আমানত , আরজি , আহম্মক , ইনাম , এখতিয়ার ,  ওয়ারিশ , কবজা ।

তালিকাটা অনেক বড় ।

মজা লাগতো বেশ। তবে ইশকুলে উঠে জেনেছি ঐ সব বেশির ভাগ আরবি আর ফার্সি শব্দ ।

কোত্থেকে আসতো লোকটা ? বড্ড ইচ্ছা হত কথা বলি । বলা হয়নি ।   অজানা সংকোচ ।

তারপর হারিয়ে গেল । যেমন যায় ।

সন্ধ্যার নীল অন্ধকারে বুড়ো খুনখুনে এক লোক কফ ভরা গলায় হাঁক দিতে দিতে চলে যেত - ভিম আছে ভিম ? ভিম । ভিম আছে ?

বেশ অবাক হতাম । সপ্তাহে একদিন এই বুড়ো ভিমকে খুঁজে কেন ?

ভিমকে আমি চিনি তো । মহাভারতের দ্বিতীয় পাণ্ডব ।  নাগলোকে গিয়ে অমৃতকুণ্ড খেয়ে হাজার হাতির বল হয়েছিল শরীরে ।

এঁকে খুঁজছে কেন বুড়ো ?

কোন বিপদে পড়েছে ? ভিমের সাহায়্য লাগবে ?  আমাকে বললে আমি সাহায়্য করতে পারব ?

এক সন্ধ্যায় জানালার ঝিলিমিলি খুলে বাইরে তাকালাম । বয়সের ভারে ব্যাকা হয়ে যাওয়া এক বুড়ো ।   ব্যাকা হতে হতে চিংড়ি মাছের মত হয়ে গেছে  ।  লুঙ্গি পাঞ্জাবি পরা । চুল দাঁড়ি সব  দূর বালটিক   সাগরের ফেনার মত শাদা । হাতে বেতের গোল ডুলা । ভেতরে নরম সোনালি  খড়ের  মধ্যে যত্ন করে রেখেছে কয়েক ডজন শাদা   ডিম ।

তাই বিক্রি করছে ।

একদম সন্ধ্যায় আসে কেন ? চোখেও উনার নাকি ছানি পড়েছে । ভাল দেখে না ।

কেউ কিনত না বুড়োর ডিম । বেশির ভাগ না কি পচা হত ।

আহা ।

পরে আর দেখিনি । মন বলতো - মারা গেছে । কষ্ট করে ডিম বেচতে হচ্ছে না ।

  ঝুম বৃষ্টির মধ্যে  এক বুড়ি আসতো ।

মরিয়া গলায় ডাকতো - ' বাদাম আছে । ঝাল বাদাম ।'

সবচেয়ে বেশি মায়া লাগতো এই বুড়ির জন্য ।

সাধারণ দিনে কক্ষনই আসতো না ।  

তখন  আমাদের দেশের জলবায়ু ছিল খুব মিষ্টি ।

আষাঢ় শ্রাবণ মাসের  প্রায় বিকেলেই আকাশ হয়ে যেত কাকের পালকের মত । তারপর কবিতার মত বৃষ্টি । বৃষ্টির চোখে জল ।

 বিকেল পাঁচটায় মনে হত না জানি কত রাত ।

তেমন বিকেল হলেই জানতাম,  আজ আসবে বাদাম বুড়ি ।

 ঠিক তাই , একদম  নিটোল বৃষ্টির মধ্যে হাজির সে।

আমাদের ধারনা,   আকাশ মেঘলা হলেই সে মাটির চুলায় আগুন জ্বেলে বসে যেত ।  চুলার ভেতরে রুবি  রঙ্গা জ্বলন্ত  কয়লা।     সোনালী   বালি দিয়ে  খাকি রঙের  বাদাম ভাঁজত । শাদা   লবণের সাথে  লাল  মরিচের গুঁড়ো মেশাত কায়দা করে । এ   লবণটাই   বুড়ির স্পেশাল ।

এক বৃষ্টির  বিকেলে     দরজা খুলে আমার মা  ডাক  দিল বুড়িকে ।

বয়সের গাছ পাথর নেই  । একদম পিচ্চি হয়ে গেছে বুড়ি হতে হতে  । কানে ভাল শুনে না। জল কাঁদা বৃষ্টিতে মাখামাখি । মাথার পাথির মাল  সামান  মোটা প্ল্যাস্টিক দিয়ে  মোড়া ।

মাকে দেখে ফোকলা মুখে হেসে বলল , ' বাদাম  কিনবা মা ? ভিজে নাই কইলাম ।  একদম  টন টনা শুকনা ।   '

বাদাম নিলাম ।

বুড়ির কাছে বাচ্চাদের হাতের তালুর সাইজের পাল্লা আছে । বাটখারার বদলে লোহার নাট আর  বল্টু  ।  আর  কয়েকটা মসৃণ গোলাকার পাথর ।

সেইসব দিয়েই পণ্য মাপে ।   

যত্ন করে মেপে দিল  আমাদের পাওনা  ।

 দুঃখের  বিষয় এত মহাপ্রলয়ের মধ্যে উনার লবণের কৌটা ভিজে জল হয়ে গেছে । কৌটা ভর্তি এক সাগর নোনা জল ।  যেন বুড়ির সারাজীবনের    চোখের জল  আছে এই  টিনের কৌটায় ।

 ঝাল লবণ দিতে না  পেরে  খুব আফসোস করলো ।

বৃষ্টিতে ভিজে হি হি করে কাঁপছে বুড়ি ।

মা বলল -বারান্দায় বসে খানিক জিরিয়ে নাও বুড়ি মা ।

বুড়ি ঠকাস করে  নিজের কপালে  থাপড় মেরে বলল - ' না গো মা ।  বিষ্টি শেষ হইয়া গেলে মাইনসে আর বাদাম কিনব না গো । গাহেক কম অইব।'

মায়া লাগতো বুড়ির  জন্য ।

শুনেছি ঐ অবস্থায়ও বুড়ির সাথে বাদামের মূল্য  নিয়ে দামাদামি করত অনেকে । মেপে বাদাম দেয়ার পর আরও বেশি বাদাম দেয়ার জন্য চাপচাপি করত । বেশি করে লবণ  খাবলা মেরে রেখে দিত ।  বলতো আজ পয়সা নেই । আরেকদিন পয়সা  নিও বুড়ি ।

মানুষ অমন চিজ , শয়তানের উনিশ আর বিশ ।

খুব মিস করি বাদাম  বুড়িকে ।  জানি বেঁচে নেই । স্বর্গে বসে যখন পৃথিবীর বৃষ্টির শব্দ শোনে তখনই নিশ্চয়ই মহারানির মত হাসে ?

কেমন আছে বাদাম বুড়ি ?

আরেক ছোকরা আসতো চিনাবাদাম  , মুরালি ভাঁজা  আর তক্তি বিস্কুট নিয়ে ।

কেন জানি না ছোকরা খুব জনপ্রিয় ছিল না কারও কাছেই ।  গান গেয়ে খদ্দের ধরার চেষ্টা করত । গানের গলা খারাপ । সুর বিচ্ছিরি । কথাগুলোও স্থুল ।  ছোকরার মুখে মস্ত এক জড়ুল থাকায় পুরানো দিনের সিনেমার দুষ্টু মন্ত্রীর মত লাগতো  , যে কি না রাজার  বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে   সিংহাসন দখলের  জন্য ।

অথবা যাত্রার  সেনাপতিদের মত দেখাত । আচমকা যে মঞ্চে এসে বলবে- ' মহারাজ  চন্দনগড় আক্রমণের জন্য বিশ হাজার সৈনিক আর চৌদ্দ হাজার হাতি  নিয়ে আমি প্রস্তুত । আদেশ করুন ।'  

তিলের  খাজা  আর শনপাপড়ি   নিয়ে আসতো আরেক মধ্যবয়স্ক ফেরিওয়ালা ।  টিনের ঠেলা গাড়িতে  করে ঠেলে নিয়ে যেত ।  আধা হাত লম্বা একটা টুইনওয়ান ছিল ঠেলাগাড়ির ভেতরে । ক্যাসেটে গান বাজত ।

বেশির ভাগ  বাংলা সিনেমার হিট গান ।

যেমন - চুমকি চলেছে একা পথে ।  বা,  ওরে মনচোরা তুমি পরে গেছ ধরা । বা,  রুপে আমার আগুন জ্বলে  ।

 অদ্ভুত সব গান ! বিদঘুটে।

আমরা খামখাই সেই লোকের সাথে হেঁটে হেঁটে অনেকদূর পর্যন্ত যেতাম ।

একদম খামখাই ।

গরমের দুপুরে  মাটির একটা কালো কুচকুচে ঘড়া নিয়ে আসতো কুলফিওয়ালা ।

লোকটার মুখে পেল্লাই গোঁফ । প্রথম জীবনে জল্লাদ ছিল সম্ভবত। এখন ভাল হয়ে কুলফি বিক্রেতা  হয়ে গেছে । কে না জানে হৃদয় ঠাণ্ডা না হলে কেউ ঠাণ্ডা জিনিস বিক্রি করতে পারে না। নিতান্ত ভদ্রলোক এই কুলফিওয়ালা । শিশি বোতল পুরানো বই খাতা দিলেই  আস্ত একটা  কুলফি দিয়ে দিত  উদার ভাবে ।

মাটির ঘড়ার ভেতরে এক রাশ বরফের  টুকরোর  মধ্যে  টিনের চোঙে থাকতো কুলফি ।  সরু একটা কাঠি গেঁথে ধরিয়ে দিত আমাদের হাত ।

এই লোক মহল্লায় আসলেই রহস্যময় ভাবে আমাদের ঘরের শিশি বোতল কমে যেত ।

বাবা বিরক্ত হয়ে বলতো - কাশির সিরাপের বোতলটা  আঁতিপাঁতি করেও পেলাম না ।  নিল কোন সুইরের বাচ্চায় ?

আমি তখন  জোড়ে জোড়ে শব্দ করে নামতা পড়তে থাকতাম । দুনিয়ার কোন খোঁজ নেই ।

 এখন মহল্লার ভেতরে মাছ বিক্রেতা ঢুকে পরে । সার্ডিন কিংবা চৌক্কা মাছ  ইলিশ হিসাবে গছিয়ে দিয়ে যায় সরল সরল মানুষের কাছে ।

তখন আসতো না ।

তবে একজন শুটকি বিক্রেতা আসতো ।

ডাকতো - শুটকি রাখবেন ?  গইন্না শুটকি ।

উনার পাথির মধ্যে চটের ব্যাগের মধ্যে যত্ন করে সাজানো থাকতো পেট ফাঁড়া ফালি করা অচেনা সামুদ্রিক মাছ । পিচ্চি চান্দা মাছের শুটকি দেখে মনে হত প্রাগৈতিহাসিক কোন মাছের ফসিল নিয়ে এসেছে ।  লাল কুঁচো চিংড়ী দেখে অবাক হয়ে যেতাম ।

কখনও  সে মাটির কলসি ভর্তি নোনা ইলিশ নিয়ে আসতো । তেল চপচপ করছে । যত্ন করে মাখিয়ে রেখেছে হলুদ আর লবণ । কাঁচাই খেয়ে ফেলা যাবে এমন একটা ভাব ।

নিয়মিত খদ্দের ছিল তার । সবাই রাখত না । কেউ কেউ । কবি বলেছেন না, সবাই শুটকি খায় না , কেউ কেউ খায়।

দড়ির শিকায় বেঁধে দই নিয়ে আসতো খ্যাঙরা মত এক লোক ।  চেঁচাত- দই আছে ঘরে পাতা দই ।

অবাক হতাম সব দই তো ঘরেই পাতে । বাগানে মাঠে কি আর দই পাতে  ?

কখন আনত ক্ষীরা ।

বেশ সস্তায় দিত তারপরও কে জানি না তেমন  বিক্রি ভাটটা হত না উনার ।     

সন্ধ্যার পর আসতো - হট প্যাঁটিস ।  কালো রোগা এক ছোকরা । হাতে টিনের দৈত্য সুলভ  একটা বাক্স । নিচে গোপন খোপ । ওখানে ইস্কুলের স্যারের লাল চোখের মত জ্বলজ্বল করছে কয়লা ।

কে যেন গুজব ছড়িয়েছিল প্যাটিসে গরুর মাংস দেয় । আর কয়লাগুলো শ্মশানের চিতার কয়লা ।

সাংঘাতিক ব্যাপার !

 রাতের বেলা  রাস্তার শেষ মাথায় ল্যাম্পপোস্টের নিয়ে ঠেলা নিয়ে দাঁড়াত  চটপটিওয়ালা   । ঘণ্টাখানেক থাকতো । উনার ধনিয়ার গুঁড়ো আর তেঁতুলের টক ছিল বিখ্যাত ।

এত কিছুর পরও দামের তুলনায় মাল পরিমাণে হাস্যকর রকম কম দেয়ায় উনার জনপ্রিয়তা কমতে কমতে শূন্যে গিয়ে ঠেকেছিল ।

এক টাকায় ষোলটা  সুঁই  ।

অমন হাঁক দিয়ে এক সুঁইওয়ালা আসতো । কাগজের  মধ্যে গেঁথে রাখতো বিভিন্ন  সাইজের ষোলটা সুই । এর বেশ চাহিদা ছিল ।  দোকানে একটা সুঁই   চার আনা মানে পচিশ পয়সা করে । কাজেই এই লোক অনেক সস্তায় দিচ্ছে।

আমরা দৌড়ে এসে বাসায় খবর দিতাম- সুঁইওয়ালা আসছে।

মউসুমি ফেরিওয়ালাদের মধ্যে সবচেয়ে পছন্দের লোকটা শীতের উল  বিক্রেতা ।

মাঝাঁরি গড়নের শ্যামলা মত লোক । পায়ে চপ্পল । কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ । হাতে উলের গোছা । বরবটির আঁটির মত । রঙের কি বাহার ।

রক্তের মত লাল । পীত সাগরের  শ্যাওলার মত সবুজ । গাঁদা ফুলের পাপড়ির মত  টকটকে হলুদ , শিমফুলের ফিকে গোলাপি , অপরাজিতা ফুলের  মত নীল । জোহানবারগের খনির কয়লার মত কালো ।

একগুচ্ছ রঙিন উল নিয়ে লোকটা হেঁটে গেলে কেমন মায়াবী লাগত বলে বোঝাতে পারব না।

মা আর প্রতিবেশী পিসিরা দৌড়ে আসতো । উল বিক্রি হত আউন্স হিসাবে ।  হিসাবটা বুঝতাম না । তবে টন শব্দটা ভাল চিনতাম । ট্রাকের পিছনে লেখা - সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টন ।

ভাবতাম পুরো বাংলাদেশের ওজন বোধহয় পাঁচ টন !

পরে পাঠ্য বইতে  গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে ওজনের আরও শব্দ  পেয়েছিলাম - আউন্স , পাউন্ড , কোয়ার্টার ,  হন্দর ,  বৃটিশ টন।

সাগরের দূরত্ব আর গভীরতা মাপার জন্য ফ্যাদম আর লীগ শব্দটা ব্যবহার হত । বেশ ভাল লাগতো শব্দগুলো । কারন ততদিনে - টুয়েন্টি থাউজ্যানড   লিগস আন্ডার দ্যা সি , সি উলফ , রবিনসন ক্রুসো এইসব বই পড়ে ফেলেছি ।

আমি আর গাবলু লিগস আর ফ্যাদম শব্দগুলো প্রয়োজন না থাকলেও অহ রহ ব্যবহার করতাম ।

যেমন - বৃষ্টির জন্য রামবাবুর পুকুরের জল তো এক রাত্রেই তিন ফ্যাদম বেড়ে গেছে ।

অমন করে বললে বেশ একটা ভাব আসে । লোকজন ফিরে তাকায় ।

তো উলওয়ালার কাছ থেকে উল কিনলেই আমাদের জন্য সোয়েটার আর মাফলার বানানো শুরু করতো মা ।

আহা কি সব দিন গেছে ।

আর রমজানের মাসে বিকেল দিকে বরফ বিক্রি করতে আসতো কিছু চ্যাঙা ব্যাঙ্গা মার্কা বাচ্চা কাচ্চা ।

চেঁচিয়ে ডাকতো - বরাফ ,   বরাফ   ।  পাহাইরা বরাফ ।

মানে ও বলতে চাচ্ছে পাহাড়ের বরফ ।

এনেছে শীতলক্ষ্যার ওখানের বরফ কল থেকে । কিন্তু পাহাড়ের কথা বললে বেশ একটা বিজ্ঞাপন হয় । এখন বলতে তো  পারে  না এস্কিমোদের বরফ ।   বা উত্তর মেরুর বরফ ।

একটা ঠেলায় করে বরফ আনতো ।  গলে যাতে না যায় সেইজন্য কাঠের গুঁড়োর ঘন প্রলেপ মাখানো থাকতো । সেটা আবার ভেজা চট দিয়ে মুড়ে রাখতো ।

বরফের দাম পচিশ পয়সা থেকে এক টাকা ।

খুব গরম পড়তো রমজান মাসে । রোজায় গরম পড়া ভাল । রোজাদারদের ইমানের পরীক্ষা নেন আল্লাহ ।

মা পঞ্চাশ পয়সা দিয়ে কখনও কক্ষনো আমাকে পাঠাত ।

বিক্রিতাকে পয়সা দিলেই হাতুরি বাটাল দিয়ে থুন থান করে পেল্লাই এক  চাঙড় বরফ  ভেঙ্গে ধরিয়ে দিত হাতে । ঠিক যেন মিনি আইসবারগ । অ্যালুমিনিয়ামের মগ নিয়ে যেতাম । সেটায়   বরফখণ্ড নিয়ে ফিরতাম ।  নইলে হাত অবশ হয়ে যেত ।

বাসায় ফেরা মাত্র শরবৎ বানাত মা।

আজকাল প্রায় সবার বাসায় ফ্রিজ আছে । রোজার মাসে সেই  আইসবারগ বিক্রতাদের দেখি না আগের মত ।

ওরা কি আসে ?

এখন নানা রকম বিক্রির  কায়দা বের হয়ে গেছে । অনলাইন অফলাইন । কিন্তু শৈশবের এই ফেরিওয়ালা  ক্লাসিক । পাড়া মহল্লার অংশ । চেনা মুখ ।

কেন যেন সবাইকেই মনে পড়ে ।

গরমের দুপুরে , শীতের সকালে বা বর্ষার বিকেলে । খুব মনে পড়ে।


 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...