এক
কারও কারও কাছে নিরিবিলি জীবন বেশ পছন্দের।
জামশেদের কাছেও । এই রকম জীবনই চেয়েছিল সে । সব সময় ।
হই হল্লা থেকে দূরে থাকা।
আটটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত কাজ কর। আপিস বা যার যেটা কাজ থাকে, কর। রুটি রোজগারের জন্য আর কী । কাজ শেষ হলে নিজের ব্যাক্তিগত বালি শকটে চড়ে বস। নিজেও ড্রাইভ করতে পার।
টাকা পয়সা যৎপরোনস্তি মানে যথেষ্ট হলে একটা রোবট ড্রাইভার থাকতে পারে।
সেই রোবট ড্রাইভার তোমাকে নিয়ে আরামসে ড্রাইভ করে বাড়িতে নিয়ে আসবে। আসার আগে মাটির তলার সুপার মার্কেট থেকে কৌটার কিছু খাবার , শ্যাওলার সুপ, আর জমাট বাঁধা নীল জেলিফিসের পুডিং কিনতে পারো।
যদি পরদিন আপিস বন্ধ থাকে , তবে মাঝখানের কোন একটা বন্দরে যানটা থামতে পারে। সব জায়গা থেকে মানুষ জন এসে আড্ডা দেয় । মঙ্গল গ্রহ তো বটেই , চাঁদের উপনিবেশ থেকেও অনেকে আসে। সেই আদিম বাসভূমি পৃথিবী থেকেও আসে অনেকে।
বেশ একটা হাউ কাউ আর গুল তাপ্পি হয় সেখানে।
গোল হয়ে বারে বস। ভাল বিয়ার পাওয়া যায়। সোনালি যব আর হলুদ ভুট্টা দিয়ে বানানো। ফেনা আর বুদবুদ ভর্তি। মঙ্গলে যে গরম , জিনিসটা ভালই লাগে।
চাঁদের মাটির নীচে প্ল্যাস্টিকের বড় বড় টিউবের ভেতরে কমলা রঙের মাশরুম হয়। সেইগুলো দিয়েও ভাল বিয়ার হচ্ছে আজকাল।
দু-এক পাত্র গিলতে পারো। সাথে মাছ ভাঁজা। অচেনা মশলা আর গুল্ম দেয়া।
আড্ডা মারতে পার। যারা পৃথিবী থেকে নতুন এসেছে তারা তো বকবক করে কানের পোকা মাথার মগজ গরম করে ফেলবে।
এবার বাড়ি ফিরতে পার।
চারিদিকে একঘেয়ে দৃশ্য।
লাল মাটি । লাল পাথর। লাল পাহাড়। সূর্যটা পাকা একটা কমলালেবুর মত ঝুলে আছে আকাশে। অথবা প্রায় দিগন্তের কাছে। বালি ঝড় হয় প্রায়ই। কুণ্ডলী পাকিয়ে ধেয়ে আসে।
চিন্তার কিছু নেই শকটের ভেতরে বাতাস নিয়ন্ত্রিত। ঠাণ্ডা - গরম কোনটাই গায়ে লাগবে না। লাগার কথাও না।
মাইলের পর মাইল ড্রাইভ করে যাও তোমার শকট। যেগুলোকে পৃথিবীতে গাড়ি বলতো এক সময়। এখন গাড়ি ...বলা ঠিক হবে না। শূন্যে ভাসে যে।
এক সময় বাড়ি পৌঁছে যাবে।
ফাঁকা নিঃসঙ্গ এক একটা বাড়ি। বহু দূর দূর পর্যন্ত কোন প্রতিবেশী নেই। থাকা উচিৎ ও না। মানুষের জীবনে ঝামেলা আনার জন্য একজন প্রতিবেশীই যথেষ্ট।
আর প্রতিবেশী যদি থাকবেই তবে আর মঙ্গলে এসেছ কেন ? চলে যাও পৃথিবীতে। সেখানে গিজগিজ করছে মানুষ। নিজের বাড়ির বারান্দায় বসে নাকের সিকনি ফেললে প্রতিবেশী বুড়োটার টাক মাথার উপর গিয়ে পড়বে।
আজব এক জায়গা!
এ ভাবে থাকা যায় ?
পৃথিবীতে মানুষ বাড়তে বাড়তে এখন তো শ্বাসটাও ঠিক মত নেয়া যায় না।
২০৪৩ সালে চাঁদে বসতি শুরু হয়েছে । দেখতে দেখতে ওটাও গিজগিজে হয়ে গেছে। পরের বছর মঙ্গলে বসতি শুরু হল।
তবে ততদিনে আবাসন আইন কঠিন করা হল।
চাঁদে তো পৃথিবী থেকে এমন ভাবে মানুষ নেয়া হয়েছে যেন বাজার থেকে ভাগা হিসাবে চাপিলা মাছ নেয়া হয়েছিল।
মঙ্গলে নিয়ম করা হল প্রতি বিশ মাইলে একজন করে থাকবে।
আর রাম শ্যাম যদু মধু চাইলেই আসতে পারবে না।আবেদন করার বিশ বা ত্রিশ বছর পর হয়তো বা বাড়ি মিলবে।
আবেদন করেছিল জামশেদের বাপ। সেই কাগজ যখন কোর্টে উঠলো বুড়ো বাপ তখন মরে তো গেছেই জামশেদের বয়স ও হয়েছে ত্রিশ। যাকগে গিন্নিকে নিয়ে এখানে এসে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে । আজ পাঁচ বছর হল। ওদের বাচ্চাটা হয়েছে এখানেই।
জামশেদ সুখী ।
দুই
ওদের বাড়িটা প্রায় পাঁচ একর জায়গা জুড়ে।
আধুনিক তো বটেই। পৃথিবীর বাড়িঘরগুলোর মত ঠুনকো নয়। কামরাগুলো সুন্দর। আলো বাতাস সবই নিয়ন্ত্রন করা যায়। সোলার প্যানেল আছে। শক্তি উৎপন্ন হয় ওটা দিয়েই। সেই শক্তিতে বাড়ি ঘরের সব কাজ চলে। জল গরম করা হতে শুরু করে রোবট দুটোর ব্যাটারি চার্জ দেয়া পর্যন্ত।
রোবট দুটো ঘরের সব কাজে গিন্নিকে সাহায়্য করে।
বাড়ির সামনে বাগান। ওখানে কিছু সবজির চাষ করে জামশেদের গিন্নি। সহজে ফলে অমন কিছু সবজি। গাজর- মুলা- শালগম- পালং শাক- আলু এই সব আর কী ।
শখের চাষ। কিন্তু বাজার খরচের উপর চাপ কমে যায়।
খাঁচার মধ্যে মুরগি পালে কয়েকটা। সাথে পিচ্চি একটা চৌবাচ্চাতে কিছু তেলাপিয়া। খুব বেশি যত্ন নিতে হয় না । দ্রুত বড় হয়। কৌটার মাছ খেতে খেতে যখন অরুচি ধরে যায় তখন মুখের স্বাদ বদলানোর জন্য গিন্নি এগুলো ব্যবহার করে।
ডিনার টেবিলটা জমে উঠে ছুটির দিনে।
সাদা ধবধবে ডিনার ক্লথের উপর - চিনামাটির তশতরীতে নতুন খাবার। টাটকা।
খোকাটা সারাদিন বাড়িতেই থাকে। ইস্কুলে যেতে হয় না। বাসায় থ্রিডি ক্লাসে পড়াশোনা করে। পরীক্ষাও দেয় থ্রিডি ক্লাসে। সমবয়সী বন্ধু বান্ধব নেই। তো কি ? অনলাইনে বন্ধু আছে। ভিডিও গেইম, মুভি আর রাজ্যের সব বই তো আছেই।
মাঝে সাঝে হাঁফ ধরে গেলে বাগানে গিয়ে রোবটটার সাথে খেলাধূলা করে কিছুক্ষণের জন্য।
নিজের এই জীবন নিয়ে জমাশেদ খুব খুশি। খুশি হবে না কেন ? টিভিতে যখন পৃথিবীর দৃশ্য দেখে তখন ওর শরীর শিউরে উঠে। সন্দেহ নেই, চরম দুর্ভাগারাই এখন পৃথিবীতে থাকে।
নোংরা, ধূলা ভর্তি। শীত- গরম দুটোই বেশি। অজানা সব রোগ জীবাণু। বাস ট্রাম ভর্তি মানুষ। সকাল হতে না হতেই ওরা ছোটে। সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসে। ক্লান্ত । এত ছোট ছোট বাসা বাড়ি, জুতার বাক্সের মত।
স্নান করার সময় একজন হেঁড়ে গলায় গান গাইলে অন্য জনের ঘুমের ব্যাঘাত হয়।
জামশেদ ভাল করেই জানে পৃথিবীর ওরা সবাই সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে মঙ্গলে আসতে চায়। সেটা সম্ভব না। সামনের বছর শনি গ্রহে নতুন বসতি শুরু হতে পারে। তখন আবার সেখানে নেয়া হবে। শুধু মাত্র ভাগ্যবানদের।
আত্নতৃপ্তি নিয়ে এইভাবেই দিনগুলো কাটছিল জামশেদের ।
তিন সদস্যের পরিবার নিয়ে। প্রতিবেশী ছাড়া। সুখী।
সকালে উঠো। আপিস যাও। বাড়ি ফেরো। বউ বাচ্চাকে সময় দাও। টিভি দেখ, বই পড়। রোবটের সাথে দাবা খেল। সপ্তাহে একদিন স্টেশনের সেই বারে বসো। এক পাত্র বিয়ার নিয়ে আড্ডা দাও।
শেষ।
আহ, জীবন!
সুন্দর !
মাঝে মাঝে মিউজিক প্লেয়ারে বৃষ্টির শব্দ ছেড়ে দেয় জামশেদ। কেন জানে না, নির্জনতা সব সময় ভাল লাগে না। মঙ্গলে বৃষ্টি হয় না। মাঝে সাঝে বৃষ্টির শব্দ শুনলে ক্ষতি কী ?
এইভাবেই হয়তো চলে যেত বাকি দিনগুলো।
শুধু একদিন কাজ থেকে ফেরার পর গিন্নি বলল, ‘শোন । বাড়ির নীচ তলায় কিসের যেন একটা শব্দ শুনতে পেয়েছি। এই একটু আগে।’
‘কোত্থেকে ?’ টাইয়ের নটটা খুলতে গিয়েও থেমে গেল জামসেদ।
‘নীচ তলায় ।’ আবারও বলল গিন্নি। ওকে এই মুহূর্তে বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছে।
‘মানে সেলারের নীচে ?’
‘না। আরও নীচে। আপাতত মনে হচ্ছে সেলারের নীচে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আরও নীচে।’
‘সেকি ? অমন তো হবার কথা না।’ অবাক হল জামশেদ। ‘ ভুল টুল শোননি তো ? নাকি যন্ত্রপাতি কোনটা বিগড়ে গেছে। জল গরম করার হিটারটা হতে পারে না ?’
‘না। শব্দটা তেমন না।’
‘রোবট দুটো কাজ করে সারাদিন। ওরা করেনি তো?’
‘মনে হয় না।’
‘ঠিক আছে। চল , সেলার রুমটা দেখে আসি।’
গিন্নিকে নিয়ে সেলারে চলে গেল জামশেদ। অনেক ক্ষণ ধরে পরীক্ষা নিরীক্ষা করল। সন্দেহজনক কিছুই পেল না।
‘ঠিক বুঝতে পারছি না।’ চোখ মুখ কুঁচকে সত্যি কথাই বলল জামশেদ। ‘তোমার কী মনে হয় ?’
‘ভূত তুত না তো ?’’ চোখ বড় বড় করে বলল গিন্নি।
জামশেদ না হেসে পারল না।
‘ নাহ, তুমিও । ভূত আবার আছে নাকি ? ওটা তো পুরানো দিনের গল্প। পক্ষীরাজ ঘোড়ার মত। মনে হয় রোবট দুটোর কোন একটা এসেছিল সেলার রুমে। যাই হোক, ছুটির দিনে মিস্ত্রির কাছে নিয়ে যাব দুটোকেই। দেখি ব্যাটারির কোন সমস্যা থাকতে পারে।’
গিন্নি আর কিছু বলল না।
সে রাতে আবার ঘুম ভেঙ্গে গেল।
গিন্নি ডেকে তুলেছে জামশেদকে। ফিসফিস করে বলল, ‘শুনতে পারছ ?’
নীচের সেলার রুমে শব্দ ভেসে আসছে। হালকা। অস্পষ্ট।
খুব সাবধানে নীচে চলে এলো জামশেদ।
কান পাতল। শব্দটা আসলে সেলারে হচ্ছিল না। আরও নীচে। মাটির নীচে।
‘কী মনে হয় ?’ বোকা বোকা ভাবে বলল জামশেদ। নিজেও শুনতে পারছে এখন।
‘ভূতই হবে। মানুষ হতেই পারে না।’ ফিসফিস করে বলল গিন্নি। ‘ চল্লিশ মাইলের মধ্যে কোন প্রতিবেশী নেই। কিন্তু আমি জানি এই বাড়িতে আমরা একা নই। আরও কিছু আছে। আগেও টের পেয়েছি।’
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল জামশেদ।
কাল হাউজিং কোম্পানির কাছে যাবে। ওদের জানাতে হবে ব্যাপারটা।
তিন
হাউজিং কোম্পানির প্রধান লোকটার নাম নিবারণ চন্দ্র সাহা।
মোটা। কালো। ভুঁড়িওয়ালা। কুৎসিত ভলিউম এক কথায়। মাথায় টাক। অল্প কিছু চুল আছে। না থাকলেই ভাল হত। আছে যখন, এখন সেইগুলোই উল্টা দিকে লেপটে আঁচড়ে মাথা ঢাকার একটা বিদঘুঁটে চেষ্টা চালাচ্ছে।
জামশেদকে দেখে মারাত্নক রকমের খুশি হয়েছে নিবারণ , অমন একটা ভাব দেখালেন। মোটা শরীর নিয়ে সোফা থেকে দ্রুত উঠার একটা ব্যর্থ চেষ্টাও চালালেন।
‘আরে কী ভাগ্য আমার।’ ফাটা গলা নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। ‘ কী মনে করে পদধূলি দিলেন স্যার ?’
‘দেখুন এইসব তেলতেলে কথা বলার কোন দরকার দেখি না।’ বিরক্ত হয়ে বলল জামশেদ। ‘ আমি আমার প্রাইভেট শিপে করে এসেছি। পায়ে ধূলা থাকার কোন চান্সই নেই। থাকলেও আপনার আপিসে সেগুলো ঝাড়তে আসিনি।’
কী বুঝলেন নিবারণ কে জানে। ফাটা বাঙ্গির মত একটা হাসি দেখা গেল তার চেহারাতে।
‘ বলুন কী খেদমত করতে পারি ?’ বিনয়ের অবতার সাজলেন সাথে সাথেই।
‘ পুরো মঙ্গল গ্রহে কয়টা বাড়ি আছে ?’
‘ তা ধরুন গিয়ে আপনার পঞ্চাশ থেকে ষাটটা।’ কম্পিউটরের পর্দায় চোখ রেখে পেশাদারী একটা ভাব চক্কর ধরে বললেন নিবারণ চন্দ্র। ‘ আসলে বাষট্টিটা বাড়ি। মানে বাষট্টি পরিবার। একটা স্টেশন। একটা আপিস। একটা সুপার মার্কেট। শেষ।’
‘নতুন কোন পরিবার বাড়ি পাবে এখন ?’
‘মোটেই না, মোটেই না।’ দুই হাত দিয়ে গাড়ির সামনের কাচ পরিষ্কার করার মত একটা ভঙ্গি করে বললেন নিবারণ।
‘আমার তো মনে হয় আমার বাড়ির খুব কাছেই নতুন আরেকটা বাড়ি বানানো হচ্ছে। তাও আমার অনুমতি না নিয়ে। আমাকে না জানিয়েই।’
কয়েকটা মুহূর্ত হা করে রইলেন নিবারণ বাবু। যেন দম নিতে ভুলে গেছেন।
তারপর প্রায় চিৎকার করে বললেন, ‘ স্যার এইসব কী বলছেন ? এ হতেই পারে না। বাষট্টিটা পরিবার। পরিষ্কার বাষট্টিটা বাড়ি। শেষ। এখন শনি বা নতুন গ্রহে বাসভূমি বানানো হবে। সেখানে পৃথিবী থেকে লোকজন নেয়া হবে দক্ষতার ভিত্তিতে। বাসভূমির সমস্যা আমাদের কবেই মিটে গেছে। এখন প্রত্যেক মাসেই নতুন নতুন গ্রহ আবিস্কার হচ্ছে স্যার। এমন একটা সময় আসবে স্যার, একটা পরিবারের জন্য একটা আস্ত গ্রহ বরাদ্দ থাকবে । এটা আমাদের অঙ্গীকার। আগামী এক বছরের মধ্যেই এটা হবে।’
জোর গলায় কথাগুলো বললেন নিবারণ চন্দ্র। এই ফাঁকে কোম্পানির বিজ্ঞাপনটাও দিয়ে দিলেন কায়দা করে। এই হাউজিং কোম্পানির শ্লোগানই এটা। এক পরিবারের জন্য একটা গ্রহ। সুখী প্ল্যানেট।
‘ দেখুন আপনার কোম্পানির শ্লোগান শোনার জন্য এতদূর আসিনি আমি।’ খানিক রুক্ষ গলায় বলল জামশেদ। ‘ অথবা আপনার সাথে চমকপ্রদ একটু গল্প গাথা অথবা পংতিমালা শোনার জন্যও এত দূর আসিনি। কিংবা আপনার অতিরিক্ত চিনি দেয়া ফালতু কফি গেলার জন্যও আসিনি। আমি আমার সমস্যার সমাধান চাই।’
‘ বলুন স্যার। সমস্যাটা বলেই দেখুন।’ ধাতানি খেয়ে চটপটে একটা ভাব দেখাচ্ছেন নিবারণ চন্দ্র। অকারনেই সুট টাই ঠিক করছেন বারবার।
সব বলে গেল জামশেদ।
শুটকি মাছের মত চেহারা করে সব শুনলেন নিবারণ বাবু।
‘সে কি স্যার ?’ অবাক একটা ভঙ্গি করে বললেন তিনি। ‘ আজব ব্যাপার স্যার। আপনার কী মনে হয় ?’
‘আমার কিছু মনে হয় না। তবে আমার গিন্নি মনে করে বাড়ির নীচে ভূত আছে।’
‘কী আছে ?’ চোখ বড় বড় করে বললেন নিবারণ বাবু। ‘ভূত ?’
তারপর খ্যাক খ্যাক করে অদ্ভুত বিচ্ছিরি একটা ভঙ্গি করে হেসে ফেললেন ভদ্রলোক।
টানা মিনিট খানিক হেসে দম নিয়ে বললেন , ‘ আমার মনে হয় আপনার মিসেস পুরানো দিনের ভৌতিক সিনেমাগুলো ডাউনলোড করে দিন রাত্র সেগুলো দেখেন। আমিও দেখি মাঝে সাঝে । গত মাসে দেখেছিলাম - কবরের প্রথম রাত। একদম ফালতু টাইপের মুভি। ভয় তো পাইনি উল্টা হাসতে হাসতে শেষ।
‘তবে একটা দৃশ্য ভাল লেগেছিল। একটা মেয়ের শরীরে প্রেত ভর করেছিল। প্রেতে ভর করে থাকা ছোট্ট মেয়েটা যখন বমি করে , সবুজ রঙের বমি হর হর করে বেড়িয়ে আসে - আহ কী দৃশ্য। দেখার পর কয়েক দিন পালং শাকের ঝোল খেতে পারিনি। আমার মিসেস আবার সেই সময়ই পালং আর ডাল দিয়ে র ঝোল রান্না করেছিল। কাণ্ড দেখুন। হ্যাহ হ্যাহ হ্যাহ।’
‘ভাই ফাজলামোর একটা সীমা থাকা দরকার।’ বিরক্ত হয়ে বলল জামশেদ । ‘ আমি জরুরি একটা সমস্যার সমাধানের জন্য এসেছিলাম। আর আপনি তো হাসির অ্যাটম বম খুলে বসে আছেন।’
‘ সরি, মানে দুঃখিত স্যার।’ তারাতারি চেহারাতে দুঃখ বোধ এনে ফেললেন নিবারণ বাবু। ‘ আচ্ছা জামশেদ বাবু মানে জামশেদ স্যার , আপনি মঙ্গল গ্রহে কতদিন ধরে আছেন ?’
‘ এই তো প্রায় পাঁচ বছর।’
‘ তাহলে বলুন আগে কী কক্ষনও এ রকম শব্দ শুনেছেন ?’
‘ না তা অবশ্য শুনিনি।’ স্বীকার করতে বাধ্য হল জামসেদ।
‘ তবে দেখুন।’ বেশ খানিকটা জয়ী হয়েছেন অমন একটা ভাব ভঙ্গি করে বললেন নিবারণ বাবু। ‘ব্যাপারটা কিন্তু প্রাকৃতিক ও হতে পারে।’
‘কী রকম প্রকৃতিক ?’
‘ মানে ধরুন মাটির নীচে কোথাও পাথর নড়তে পারে। গ্যাসও নড়াচড়া করতে পারে। মঙ্গলের মেরুর বরফ ও গলছে অল্প বিস্তর। তো সেগুলোর ও তো নহর ধারা না ঝর্না ধারা কি যেন বলে ?- বয়ে যেতে পারে অল্প বিস্তর।’
‘ঠিক আমার বাড়ির নিচেই ?’
‘হতেও পারে স্যার।’
‘এও হতে পারে… শুনতে তো আমি আসিনি নিবারণ বাবু। আমি সম্মানিত নাগরিক। আমার বাবার ডিজাইন করা স্পেসশিপ বানানো হত নাসাতে। আর আপনি কি না আমাকে হাতি ঘোড়া বুঝ দিচ্ছেন ?’
‘ না স্যার।’ খরগোশের মত ব্যস্ত হয়ে উঠলেন নিবারণ বাবু। ‘কাল বিকেলের আগেই আমি আপনার বাসায় পৌঁছে যাব। ঠিক আছে ? পাক্কা কথা দিলাম স্যার। আসলে হয়তো দেখবেন ব্যাপারটা সিরিয়াস কিছু না।’
‘ আপনার অমন ধারনার কারণ ? হতে পারে না ওখানের মাটির নীচে কোন জীবন্ত প্রাণী আছে ?’
‘ না স্যার। হতে পারে না। মঙ্গল গ্রহে বাতাসের ৯৬ শতাংশ কার্বন-ডাই-অক্সাইড! এছাড়া মঙ্গলের বাতাসে অক্সিজেন নেই বললেই চলে। বাতাসের এক শতাংশের মাত্র এক-দশমাংশ অক্সিজেন। কাজেই প্রাণ থাকতেই পারে না। অতীতে মঙ্গলের বুকে কোন সভ্যতা ছিল পাগলেও বিশ্বাস করবে না। হয়তো বা জীবাণু ফিবানু ছিল। আজ আর কিচ্ছু নেই।’
‘কিন্তু অমন কোন প্রাণ জন্মাতে পারে না যেটা কার্বন-ডাই-অক্সাইড দিয়েও বেঁচে থাকতে পারে ?’
‘না স্যার, পারে না।’
‘আপনার মাথা আর আমার মুণ্ডু। মহাবিশ্বে সব কিছুই সম্ভব।’
‘তা সম্ভব হতে পারে স্যার।’ অসহায় ভাবে মাথা ঝাঁকালেন নিবারণ চন্দ্র।
‘তো ?’
‘স্যার কালকে আপনার বাসায় অনুসন্ধানী টীম পৌঁছে যাবে। দুটো রোবটও নেব। ওরা মাটি খুড়ে দেখবে। ঠিক আছে ? চা খাবেন এক কাপ ? আদা আর তেজপাতা ফেজপাতা সহ ?’
চার
পরদিন একদম দুপুর বেলাতেই নিবারণ বাবু পৌঁছে গেলেন ।
‘যাই বলুন স্যার, বাড়িটা কিন্তু দারুণ।’ গদ্গদ চিত্তে বললেন নিবারণ বাবু।
‘বাগানটাও দারুন।বাহ বউদি দেখি নয়নতারা ফুলও লাগিয়েছেন। দারুণ তো। আমার ঠাকুর মায়ের নাম ছিল নয়নতারা। কোলকাতায় থাকতেন । লাউয়ের ঘণ্টা না ঘণ্ট আর ডালের বড়া...।’
‘আপনি আপনার কাজ করুন দয়া করে।’ নিরাসক্ত ভাবে বলল জামশেদ। ব্যাটাকে চা-ও অফার করবে না। ভাবল মনে মনে।
নিবারণ বাবুর সাথে আবাসন কোম্পানির গাড়ি এসেছে। সাথে দুইজন লোক। আর দুটো শ্রমিক রোবট।
গাড়ির ভেতর থেকে বিদঘুটে কিছু যন্ত্রপাতি বের করল নিবারণ বাবুর লোকেরা ।
তারপর সেই সব যন্ত্রপাতি বাগানের কয়েক যায়গায় ফিট করতে লাগল বেশ ব্যস্ত একটা ভাব ভঙ্গি করে।
সেলার রুমটা ভাল করে পরীক্ষা করলেন নিবারণ বাবু।
‘নাহ। তেমন কিছই তো দেখছি না।’ বিশেষজ্ঞদের মত মুখের একটা ভাব করে বললেন নিবারণ চন্দ্র।
‘শুনতে পারছেন ?’ ফিসফিস করে বলল জামসেদ।
আমলকী শুকিয়ে গেলে যেমন হরতকি হয়ে যায় , তেমনই মুহূর্তেই মুখটা শুকিয়ে গেল নিবারণ বাবুর।
সন্দেহ নেই।
শব্দটা পরিষ্কার।
তিনি নিজেও শুনতে পেয়েছেন।
‘ বাইরে চলুন।’ ফিসফিস করেই জবাব দিলেন নিবারণ বাবু।
দুইজনেই বেশ তড়িঘড়ি করে বের হয়ে এলো সেলার রুম থেকে।
‘যন্ত্রপাতি কী বলছে হে ?’ হাঁক ছাড়লেন নিবারণ বাবু।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা রোবট।
‘ স্যার মাটির নীচে অদ্ভুত কিছুর কম্পন পাচ্ছি আমরা।’ মিহি যান্ত্রিক স্বরে জবাব দিল রোবটটা।
‘সেকি ?’ এইবার বোধহয় ভয় পেয়েছেন নিবারণ বাবু। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাগানে দাড়িয়েও সামান্য ঘেমে গেছে যেন।
‘হ্যাঁ। স্যার। জীবন্ত কিছু আছে। হিট ওয়েভ ও পাচ্ছি।’ তথ্য দিল রোবটটা।
‘হুম। মাটি খোঁড়া শুরু কর।’ বললেন নিবারণ বাবু। ‘ পুলিশে খবর দাও। কয়েকজন বিজ্ঞানীকে ডাকো। ঐ যে যারা মাটির নীচের জিনিস পত্র নিয়ে গবেষণা ফবেষনা করে আরকি ।’
কয়েক মুহূর্তেই পরিবেশটা গরম হয়ে গেল।
মাটি খোঁড়া শুরু হল। শুকনো লাল মাটি উঠতে লাগল ঝুড়ি ঝুড়ি।
এরই মধ্যে আরও ছয়জন চলে এসেছে।
চারজন পুলিশ। পুরো মঙ্গলে মাত্র চারজন পুলিশই আছে। অপরাধের হার এখানে শূন্য। এই চার পুলিশ সারাদিন থানায় বসে ষোল গুঁটি মার্কা পুরানো দিনের খেলা খেলে।
মাটি খোঁড়ার পর যখন সুড়ঙ্গটা দেখা গেল তখন একটু ও অবাক হল না জামশেদ।
এ রকম একটা কিছুরই আশা করছিল মনে মনে।
বিজ্ঞানী দুইজন উত্তেজিত।
ওদের একজন দাবি করছে এটা মঙ্গলের হারানো সভ্যতা। আরেকজন দাবী করছে অজানা কোন প্রাণী ঘাপটি মেরে আছে নীচে।
বিজ্ঞানী দুইজনকে বাইরে রেখে চার পুলিশ নেমে পড়ল গুহার ভেতরে।
হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র। দাঁড়িয়ে থাকলে মান সম্মান চলে যায় তাই নিবারণ বাবুও নেমে পড়লেন।
‘আপনি আসবেন ?’ জানতে চাইল ভদ্রলোক। তাকিয়ে আছে জামশেদের মুখের দিকে।
‘অবশ্যই। এটা আমার বাড়ি। নিরাপত্তার জন্য আমাকে জানতে হবে কী হচ্ছে ওখানে ।’ কথাগুলো বলে নেমে পড়ল জামশেদ।
ঠিক গুহা বলা যাবে না।
লম্বা একটা টানেল। অনেক যত্ন করে বানানো হয়েছে। উপরে নীচে পালিশ করা। মসৃণ।
‘কোন বুদ্ধিমান প্রাণীর কাজ।’ ফিসফিস করে বলল জামশেদ।
মাথা ঝাঁকালেন নিবারণ চন্দ্র।
আরও এগিয়ে যেতে লাগল দলটা। দুই পাশের দেয়ালে নানান নকশা আঁকা। হিজিবিজি। তারপরও ওদের মধ্য একটা ছক আছে। যত্ন করে কেউ যেন কি সব লিখেছে। এঁকেছে।
অবাক হয়ে দেখছে সবাই।
জামশেদের কাছে বেশ চেনে চেনা লাগছে এই চিহ্নগুলো। এমন সময় শব্দটা শোনা গেল আবার। টানেলের ভেতরেই খুব গোপনে সতর্কতার সাথে কাজ করছে কেউ যেন।
বাতাস নেই টানেলের ভেতরে। তাহলে ?
সাবধানে এগিয়ে গেল দলটা।
টানেলটা সামনে হঠাৎ করেই মোড় নিয়েছে।
মোড়টা ঘুরতেই লোকটার মুখমুখি হয়ে গেল দলের সবাই।
মানুষই। বুড়ো মত। একা। কাজ করছিল । স্পেসস্যুট পরনের। মাস্ক ও আছে। সেইজন্যই শ্বাস নিতে পারছে। তবে মাস্ক আর স্পেসসুটটা ওদের সবার মত অত্যাধুনিক না।
পুরানো। প্রাচীন।
পুলিশ চারজন সাথে সাথেই চিৎকার করে হ্যান্ডস আপ হতে শুরু করে আধ ডজন বিচ্ছিরি গালিও ছিল সাথে।
পুলিশ তো !
লোকটার হাতে, খনিতে কাজ করার উপযোগী এক রকম হাতুড়ি ছাড়া আর কিছু ছিল না।
মেঝেতে অবশ্য একটা লণ্ঠন ছিল। প্রাচিন আমলের রত্ন সন্ধানীরা ব্যবহার করতো এ রকম লণ্ঠন।
হাতুড়িটা ফেলে দিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলল বুড়ো লোকটা।
চমকে উঠলো জামশেদ।
দ্রুত সামনে চলে গেল। বিচিত্র একটা ভাষায় জবাব দিল ও।
জামশেদের মুখের কথা শুনে লোকটা হাউ মাউ করে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কি সব বলতে লাগল গড় গড় করে।
জামশেদ ও প্রশ্ন করতে লাগল মাঝে সাজে। প্রশ্ন শুনে থেমে থেমে আবার উত্তর দিতে লাগল বুড়ো।
চার পুলিশ বারবার পালা করে একবার জামশেদ আরেকবার বুড়োর দিকে তাকাচ্ছে। বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে।
‘ও কি বলছে আপনাকে ?’ শেষ পর্যন্ত ধৈর্য হারিয়ে ফেললেন নিবারণ বাবু।
‘এক মিনিট।’ খামখাই রেগে গেল জামশেদ। ‘কথা শেষ করতে দিন।’
তারপর আবার বুড়োর দিকে ফিরে কথা বলা শুরু করল।
বুড়োর ভয় কেটে গেছে। তারপরও বুনো পশুর মত এদিক ওদিক তাকাচ্ছে ঘন ঘন । হয়তো এখনও ভয় পাচ্ছে। ক্ষতির আশংকা উড়িয়ে দিতে পারছে না।
টানা তিন মিনিটের মত কথা বলল দুইজন। তারপর নিবারণ বাবুর দিকে ফিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল জামশেদ।
‘ভেতরে আরও অনেকেই আছে।’ বলল জামসেদ। ‘ বুড়ো একা না। বিরাট একটা পরিবার আছে ভেতরে। মঙ্গলের মাটির নীচে বসবাস করে ওরা। আমাদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ।’
‘কোন ভাষায় কথা বললেন আপনারা ?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন নিবারণ চন্দ্র।
‘ জার্মান ভাষা। তবে খুবই প্রাচীন। আজকাল এ ভাষা চলে না। ভাগ্যিস শখের বসে শিখেছিলাম ভাষাটা। তাই কথাবার্তা চালাতে পেরেছি। অন্য কেউ থাকলে এতক্ষণে বিরাট কেলেঙ্কারি হয়ে যেত।’
‘জার্মান ভাষা ? ওরা পৃথিবীর মানুষ ?’
‘অবশ্যই। কেন আপনি কি ওদের মঙ্গলের মানুষ ভেবেছিলেন ?’
‘কবে এলো ওরা ? আমাদের সিস্টেম ফাঁকি দিয়ে কিভাবে এসে মাটির নীচে বসতি বানাল। ওদের যন্ত্রপাতি এত প্রাচীন কেন ?’
এক নাগাড়ে বকবক করেই যাচ্ছেন নিবারণ বাবু।
তার বিস্ময় কাটছেই না।
পাঁচ
আপিসের ভেতরে বসে আছে জামশেদ।
সামনে বসা ভদ্রলোক খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। মঙ্গলের হোমল্যান্ড ব্যুরোর প্রধান। পৃথিবী থেকে মঙ্গলের মাইগ্রেশনের প্রক্রিয়াটা এই ভদ্রলোকই নিয়ন্ত্রন করেন।
‘তো ওরা জার্মান ?’ জিজ্ঞেস করলেন প্রধান।
‘জি স্যার।’ জবাব দিল জামশেদ।
‘ভাগ্য ভাল ভাষাটা আপনি জানতেন। কবে এসেছে ওরা এখানে ?’
‘ওটা স্যার উনিশো পয়তাল্লিশ সালের কথা।’
‘এত আগে ?’ প্রায় চিৎকার করে উঠলেন প্রধান। ‘ওদের নেতা কে ? কি বলে ওরা ?’
‘ওদের নেতার নাম হিটলার।’
‘হিটলার ? উনি আবার কে ?’
‘খুবই প্রাচীন জার্মান নেতা স্যার। যতদূর জানি সেই ভদ্রলোক মানে সেই লোকটার আমলেই পৃথিবীতে আণবিক বোমার ব্যবহার শুরু হয়েছিল। প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল পৃথিবীটা।’
‘তো হিটলারের নিশ্চয়ই পরাজয় হয়েছিল ? নইলে তো ইতিহাস অন্য রকম হত। আমরা উনার নাম জানতাম ।তাই না ?’
‘নিশ্চিন্ত করেই সেটা বলা যায়। নইলে পৃথিবীতে শুধু জার্মান ভাষাই চলত। অন্য কোন ভাষা টিকে থাকতে পারত না।’
‘ওরা এসেছে কী ভাবে ?’
‘ঐ তো সেই সময়েই পৃথিবীর ভয়ংকর সব জিনিসপত্র আবিস্কার হয়েছিল। যা পরে আর জানা যায়নি। হারিয়ে গেছে লোক চক্ষুর আড়ালে। আর সমস্ত নথি পত্রও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। ইতিহসের সবচেয়ে বড় মিসিং লিঙ্ক হচ্ছে সেই সময়টা। কি কি হয়েছিল পরে আর কিছুই জানতে পারিনি আমরা। তখন থেকেই অনেকগুলো অমীমাংসিত রহস্য রয়ে গেছে পৃথিবীতে ।
‘হিটলারের গোপন গবেষণাগারে তখনই স্পেসশিপ তৈরি হয়েছিল। এটা কিন্তু সত্য। পরে অনেকেই ব্যাপারটা সন্দেহ করেছিল। হিটলারের ইচ্ছা কি ছিল বলা মুশকিল। হয়তো ইচ্ছা ছিল বিপদ দেখলে স্পেসশিপে করে পালিয়ে যাবেন।
‘কিন্তু তার আগেই একদিন তারই কিছু বিদ্রোহী বিজ্ঞানী স্পেসশিপটা নিয়ে মঙ্গল গ্রহে চলে আসে।
এত দূর আসার পরও ওদের মনে ভয় ছিল। বুঝতে পারছিল না পৃথিবীতে কি হচ্ছে। হয়তো হিটলারই জয়ী হয়েছে। আর যদি হিটলার জয়ী হয়, তবে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের জড়ো করে আরও আধুনিক আর ভয়ংকর স্পেসশিপ বানিয়ে পালিয়ে যাওয়া এই বিজ্ঞানীদের খুঁজে বের করবে। আর এমন শাস্তি দেবে যা শয়তানও কল্পনা করতে পারবে না।’
‘ আর এই ভয়ে ওরা মাটির নীচে বসতি স্থাপন শুরু করেছিল ?’
এতক্ষণ পরে প্রশ্ন করলেন প্রধান।
‘ঠিক তাই। ওরা সবাই ছিল দক্ষ বিজ্ঞানীদের একটা দল। নারী পুরুষ উভয়ই ছিল এই দলে। এমন কি আস্ত স্পেসশিপটা পর্যন্ত ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে মাটির নীচে নিয়ে গেছে ওরা।’ বলল জামশেদ।
‘ আমরা যখন মঙ্গলে এলাম। বসতি শুরু করলাম, তখন ওরা বোধ হয় ভীষণ রকমের ভয় পেয়ে গিয়েছিল ?’ প্রধানের গলায় দুঃখী মানুষের সুর। খানিক বেদনা।
‘সে আর বলতে। ওরা ভেবেছিল হিটলারের লোকজন চলে এসেছে ওদের খুঁজতে।’
‘খাওয়া দাওয়া কি করেছে এতগুলো বছর ?’
‘শ্যাওলা। টম্যাটো,পালং শাক। আলু।’
সবজান্তার একটা ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন প্রধান। ‘পরের জেনারেশনের ওরা সবাই মাটির নীচে থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল? তাই না ?’
‘জি স্যার।’
চুপচাপ রইল দুইজন।
অচেনা একজন কামরার ভেতরে এসে এক পেয়ালা চা দিয়ে গেল। জামশেদের জন্য।
‘আমি এই সময় চা খাই না স্যার।’ আপত্তি জানাল জামশেদ।
‘আরে খান।’ রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলেন প্রধান। ‘না খেলে পরে আফসোস করবেন।’
বিরক্ত হলেও পেয়ালাটা তুলে চুমুক দিল জামশেদ।
‘ আমার বাড়ির কী হবে ?’ খানিকটা বিরক্ত গলায় জানতে চাইল জামশেদ। এতক্ষণ কথা বলে মেজাজ খিচড়ে গেছে। ‘আপনি নিশ্চয়ই আশা করেন না এত টাকা ভাড়া দিয়ে আমি ঐ বাড়িতে থাকব ? আর আমার বাড়ির নীচে আরও একটা কলোনি থাকবে। আমি নির্জন জায়গাতে থাকতে চাই। ব্যবস্থা আপনারা করবেন। কী ভাবে করবেন সেটা আপনারা জানেন।’
‘তা তো বটেই।’ রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলেন প্রধান। ‘ সব সমস্যারই সমাধান থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে অনেকগুলো সমাধান থাকে।’
কিছু বলতে গিয়ে ও থেমে গেল জামশেদ। শরীর ভেঙ্গে ঘুম আসছে ওর। ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়তে চাইছে শরীরের সবগুলো কোষ। জ্ঞান হারানোর আগে দেখলে ব্যুরো প্রধান লোকটা মিটিমিটি হাসছেন।
জামশেদ জ্ঞান হারানোর সাথে সাথেই কামরার ভেতরে ঢুকলেন নিবারণ বাবু। মোটা শরীর নিয়েও যে এত দ্রুত আর নিঃশব্দে কেউ নড়াচড়া করতে পারে, না দেখলে বিশ্বাসই হবে না।
‘সব ঠিক আছে তো ?’ জানতে চাইলেন ব্যুরোর প্রধান।
‘ জি স্যার।’ বাম হাত উঁচু করে শূন্যে ধরলেন নিবারণ চন্দ্র। স্যালুট করার ভঙ্গিতে কিন্তু স্যালুট না। অতি বিচিত্র একটা ভঙ্গি।
‘নাৎসি বিজ্ঞানীদের আণ্ডা বাচ্চাগুলো কই ?’
‘সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে স্যার। হাইরিক হিটলারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি একটাই।’
‘দারুণ। এক কথায় চমৎকার।’ মিটি মিটি হাসলেন ব্যুরোর প্রধান। ‘কাক পক্ষী ও টের পাবে না।’
‘একে নিয়ে কী করব স্যার ?’ ইঙ্গিতে জামশেদকে দেখালেন নিবারণ বাবু।
‘চিন্তার কিছু নেই। ঘুম ভাঙ্গার পর কিছুই মনে থাকবে না ওর। ওর স্মৃতির কিছু অংশ মুছে যাবে। যাও। বাড়ি নিয়ে যাও। ওর স্ত্রী আর বাচ্চা বাড়ি ফেরার আগেই করতে হবে। ওর স্ত্রীকে ইস্কুলের মীটিঙের আটকে রাখা হয়েছে কায়দা করে।’
‘জি স্যার। মহান হিটলার দীর্ঘজীবী হোন।’
ছয়
ঘুম ভাংতেই বিরক্ত হল জামশেদ।
সোফায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
অচেনা দুটো রোবট আর লোকজন আবাসন কোম্পানির গাড়িতে উঠছে। একজন একজন করে। একটা একটা করে।
কামরার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন নিবারণ বাবু।
‘কী ব্যাপার ? নীচের সমস্যার সমাধান হল ?’
‘আজ্ঞে স্যার হ্যাঁ।’ ঘাম মুছতে মুছতে বললেন নিবারণ বাবু। ‘ তেমন কিছু না। মাটির নীচের স্তরের কয়েকটা শিলার নড়াচড়া হয়ে গিয়েছিল স্যার। সেইজন্য এত ভোগাত্তি হল আপনার। আমরা আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। কোম্পানি কিছু ক্ষতিপুরনও দেবে আপনাকে। আর কিছু হলে জানাবেন।’
হাসল জামশেদ।
নিবারণ বাবু ও হাসলেন। আন্তরিক হাসি।
‘এখন তবে যাই ?’ বিনয়ের অবতার নিবারণ বাবু।
‘হ্যাঁ , ভাল থাকবেন।’
জানালা দিয়ে তাকাল জামশেদ। দূরে গাড়িটা দেখা যাচ্ছে। গিন্নি আর বাচ্চাটা মার্কেট থেকে ফিরে আসছে।
হোম। সুইট হোম।
মনটা ভাল হয়ে গেল জামশেদের।
বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন