১
বড় একটা কটনউড গাছের নিচে পাওয়া গেল তাকে ।
এমনিতে হয়তো চোখে পড়তো না।
কিন্তু বুড়োর গায়ে লিভাইসের জ্যাকেট আর প্যান্ট ছিল । কাপড়গুলো বহুকালের পুরানো । রঙ জ্বলে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে । জামা কাপড় না থাকলে সহজে চোখে পড়তো না ।
কটনউড গাছের চারিদিকে বেশ ঝোপ ঝাঁপ থাকায় জায়গাটা ছায়াময় । ওখানের বালি চিনির দানার মত । চিকচিক করছে ।
গতকাল মারা গেছে বুড়ো । অথবা তার আগের দিন।
মাত্র ছয়টা ভেড়া সম্বল করে বেঁচে ছিল বুড়ো । এই বিজন প্রান্তরে এসে পৌঁছেছিল ভেড়া চড়াতে চড়াতে । মালিক মারা যাবার পর দিশেহারা ভেড়াগুলো খানিক দূরেই ঘুরঘুর করছে । হয়তো বুঝতে পারছে না কি করবে । মালিক এত লম্বা ঘুম দিচ্ছে কেন সেটাও ওদের ধারনার বাইরে।
ঘোড়া থেকে নেমে এলো লিয়ন আর ওর ছোট ভাই কেইন ।
ভেড়াগুলো বের করে এনে খোলা প্রান্তরে ছেড়ে দিলো । এই ভেড়া নেবে না ওরা । মিশে যাক বুনো প্রান্তরে । বেড়ে উঠুক বুনো ভেড়া হিসাবে। বুড়োর আত্মা শান্তি পাবে।
কাজটা শেষ করে আবার ফিরে এলো কটনউড গাছের তলায় ।
সামান্য কাজ । কিন্তু ঘেমে গেছে দুইজন । বছরের এই সময়টায় বেশ গরম পড়ে । এইবার যেন নরকের কুণ্ড হয়ে গেছে । জ্যাকেটের উপরের বোতাম খুলতে খুলতে টেঁসরা চোখে সূর্যের দিকে চাইল লিয়ন ।
যদিও ওরা শুনেছে দক্ষিণ পশ্চিমের নীল পাহাড়গুলোর মাথায় বরফ জমে আছে এখনও।
তাতে কি লাভ ? শোনা কথা গোনায় ধরতে নেই ।
ওয়াগন থেকে লাল কম্বলটা নিয়ে এলো কেইন ।
বুড়োর শরীরটা কম্বল দিয়ে প্যাচিয়ে রাখার সময় খেয়াল করলো বুড়োর লম্বা চুলের সাথে একটা ঈগলের পালক ঝুলে আছে । লাল সুতো দিয়ে বাঁধা । রেড ইনডিয়ানদের ওঝা ছিল বুড়ো ।
বুড়োর মুখে রঙ মাখিয়ে দিল কেইন । কুঁচকানো কপালে লম্বা করে শাদা রঙ দিল । আর উচু চোয়ালে দিল নীল রঙ । কাজ শেষ করে ভুট্টার মিহি গুড়ো ছড়িয়ে দিল ঈগলের পালকের উপর । বিড়বিড় করে কি সব বলল ।বুড়োর টানা চওড়া নাকের নিচে হলুদ রঙ মাখিয়ে দিল লিয়ন । চিবুকে সবুজ রঙ মাখিয়ে থামল সে । হাসল ।
'আমাদের জন্য বৃষ্টি আর মেঘ পাঠিয়ে দিও বুড়ো সর্দার ।' বিড়বিড় করে বলল লিয়ন ।
লাশটা সুন্দর করে মুড়ে ওয়াগনের পিছনে তুলে কলোরাডোর দিকে চলল ওরা ।
ধুলিমাখা পথ ফেলে উঠলো বড় রাস্তায় ।
বড় রাস্তাটা মাত্র কিছুদিন ধরে হয়েছে । আগের মত নেই কোন কিছুই । জনপদ বদলাচ্ছে । আরও নতুন নতুন মানুষ বসতি গড়ার জন্য পশ্চিমে আসছে । হররোজ । পোস্ট আপিস আর মুদির দোকান পিছনে ফেলে ওদের ওয়াগন সামনে যেতে লাগল ।
ঘোড়ায় চেপে ফাদার পলকে আসতে দেখল দুই ভাই । ফাদার পল যখন ওদের চিনতে পারল ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিয়ে হাত তুলে দেখাল ।
তরুণ এই পাদ্রী এলাকার সবাইকে চেনে।
' বুড়ো টিওফিলোকে পেয়েছ নাকি তোমরা ?' চেঁচিয়ে জানতে চাইলেন তিনি ।
' শুভ সকাল ফাদার ।' ওয়াগন থামিয়ে বলল লিয়ন । ' পেয়েছি । বুড়োর ভেড়াগুলো ছেড়ে দিয়েছি আমরা ।'
'ভাল করেছ । টিওফিলোর অনেক বয়স হয়েছিল । কতবার বললাম চাইলে গির্জায় এসে থাকতে পারে। রাজিই হল না। বলল খোলা আকাশের তলায় মরতে চায় সব ওঝা ।ওকে ওরকম জায়গায় একা দেখলে খারাপই লাগত। '
'আর থাকবে না ওখানে ।'
'খুব ভাল ।' খুশি খুশি গলায় বলল ফাদার ।' আমি যাই । গত রোববার কিন্তু তোমরা গির্জায় আসোনি । সামনের রোববার চলে আসবে । পারলে টিওফিলোকে নিয়ে আসবে ।'
চলে গেলেন ফাদার পল ।
আজব কাণ্ড!
এতক ক্ষণ কি শুনলেন কে জানে ।
২
লুসি আর তেরেসা বসে আছে । ওদের দুই ভাইয়ের গিন্নি । সামনের টেবিল ভর্তি দুপুরের খাবার । লোহার তেপায়া চুলার উপর কেটলিতে কফি ফুটছে ।
বার কয়েক ওদের দুইজনের মুখের দিকে তাকিয়ে লিয়ন বলতে লাগল , ' তৃনভূমির মধ্যে কটনউড গাছের নিচে বুড়োকে পেয়েছি আমরা । মনে হয় বিশ্রাম করার জন্য বসেছিল । আর উঠতে পারেনি ।'
বলা শেষ করে লোহার বাইরে বিছনার কাছে গেল লিয়ন । বুড়ো শুয়ে আছে । লাল মোটা কম্বলে শরীর ঢাকা । পাশেই নতুন বাদামি রঙের একটা পশমি কাপড়ের জামা আর নীল জিন্সের প্যান্ট পরিপাটি করে রাখা। নতুন পোশাক পড়িয়ে কবর দেবে ওরা বুড়ো সর্দারকে ।
বাইরে গনগনে দুপুর । ওরা শিমের দানা আর গরম গরম রুটি খেয়েছে। অপেক্ষা করছে তেরেসা কখন কফি দেবে।
পেয়ালা সামনে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো কেইন । গায়ে জ্যাকেট চাপাতে চাপাতে বলল , ' কবর খোঁড়া হচ্ছে। মাটি শক্ত । বিকেলের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে আশা করছি ।'
পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে মাথা নাড়ল লিয়ন । প্রতিবেশীরা দুই একজন আসছে । টেবিলের উপর খাবার রেখে যাছে যার যার মত ।
সন্ধ্যায় গোরখোদকরা এসে খেতে পারবে ঐসব খাবার ।
পশ্চিমে সূর্য । পাণ্ডুর হলুদ রঙ ।
বাইরে দাড়িয়ে আছে লুসি । সবুজ আর্মি জ্যাকেটের পকেটে হাত ভরে অপেক্ষা করছে লিয়নের জন্য । এটা ওর জ্যাকেট না। লিয়নের । খানিক ঢলঢল করছে গায়ে ।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হয়ে গেছে । বুড়ো কবরে চলে যাবে খানিক পর , সাথে কাপড়ের এক ব্যাগ ভর্তি লতা গুল্ম দেয়া হয়েছে । বুড়োর কাছেই ছিল জিনিসগুলো । কি কাজে লাগত কে বলবে ?
হেঁটে গিয়ে লিয়নের পাশে দাঁড়ালো লুসি । হাত রাখল লিয়নের কাধে । আবিস্কার করলো এখনও লুসির আঙ্গুলে ভুট্টার মিহিগুড়ো লেগে আছে । বুড়োর লাশের পাশে ছড়িয়ে দিয়েছিল ।
অন্যমনস্ক থাকায় ওর কথা শুনতে পেল না লিয়ন।
'কি বললে ? শুনতে পাইনি ।'
'একটা কথা ভাবছিলাম ।'
‘ কি সেটা?'
'পাদ্রীর কাছ থেকে খানিক হলি ওয়াটার আনতে পারবে ? বুড়োর কবরে দিতে পারতাম । বেচারার যাতে তেষ্টা না পায় ।'
লিয়ন ফিরে চাইল বারান্দার দিকে । ওখানে রয়ে গেছে একজোড়া মোকাসিন ( নরম চামড়ার জুতা, এই জুতায় হিল উচু হয় না।) গত বছর ওকে বানিয়ে দিয়েছিল বুড়ো টিওফিলো ।
ঠাণ্ডা নেমে আসছে । কড়া বাতাস দূরের পথ থেকে ধাক্কা দিয়ে ধূসর ধুলা উড়িয়ে আনছে । দিগন্তের মেসার কাছে সূর্যটা ঝুলে আছে ( মেসা -খাড়া উচু পাহাড়। কিন্তু উপরটা সমতল । মনে হয় ছুরি দিয়ে কেটে সমান করে ফেলেছে কেউ)। শীতকালে সূর্যটা বেশির ভাগ সময় অইগুলোর আড়ালেই থাকে ।
'নিয়ে আসব ।' জবাব দিল লিয়ন ।
৩
গির্জার বাইরে ঘোড়া রেখে এগিয়ে গেল লিয়ন ।নক করলো পুরানো কাঠের দরজায় । দরজার গায়ে ভেড়ার ছবি খোদাই করা । ভেড়ার খামারে যীশু জন্মেছিল সেইজন্য ?
দরজা খুলে ওকে দেখেই হাসলেন পাদ্রী , ' সন্ধ্যাবেলা কি মনে করে ?'
ভেতরে গেল দুইজনে । বাদামী সোফা, সবুজ রঙের কাঠের আরাম কেদারা । পিতলের একটা ল্যাম্প লোহার শিকলের সাথে উপর থেকে ঝুলছে । নরম আলো ।
রান্না ঘরের দিকে ইঙ্গিত করলেন পাদ্রী ।
'বসার জন্য আসিনি ফাদার। খানিক হলিওয়াটার দরকার ছিল ।' বলল লিয়ন ।
খানিক চুপ করে রইলেন পাদ্রী । জানালা দিয়ে কিচেনের উল্টাদিকের বারান্দার দিকে চেয়ে রইলেন। কালো ভারি পর্দা ঝুলছে । বোঝার উপায় নেই ওখানে বসে নিঃশব্দে খাওয়া দাওয়া সারছে দুইজন নান ।
'তুমি আমাকে কেন বলনি বুড়ো মারা গেছে ? ওর শেষ অনুষ্ঠানটা আমি করতে পারতাম ।'
লিয়ন হাসল । 'খুব দরকারি কিছু না ফাদার ।'
পায়ে চামড়ার লোফার গলিয়ে আলখেল্লা গায়ে চাপাতে চাপাতে পাদ্রী বললেন, ' একজন খৃষ্টানের জন্য শেষ অনুষ্ঠান অবশ্যই দরকারি একটা জিনিস।'
মনে হল অনেক দূর থেকে তার কথা ভেসে আসছে । লিয়ন আবিস্কার করলো লোকটার নীল চোখ জোড়া ক্লান্ত ।
' ও খৃসটান ছিল না । হতে চাইতও না । আপনি ওর ধর্ম বদলাতে চেষ্টা করেছেন । কিন্তু ও ছিল খোলা আকাশের সন্তান । ওর দেবতা আছে । ঠিক আছে ফাদার , বাদ দিন এইসব কথা । আমরা শুধু ওর জন্য প্রচুর জল চাই ।'
সবুজ আরাম কেদারায় বসে পড়লেন ফাদার । ধূসর হয়ে যাওয়া একটা পত্রিকা তুলে নিলেন হাতে । ধর্ম প্রচারকদের কাগজ । কি কি ছাপা হয় কে জানে ! ওটা উল্টাতে উল্টাতেই ওর দিকে না চেয়ে বললেন , 'তুমি ভাল করেই জানো আমি দিতে পারব না। মরার পর অবশ্যই একটা অনুষ্ঠান হবে। প্রাথনাও দরকার ছিল । অমনি অমনি কাউকে কবর দেয়া যায় না।'
পকেট থেকে সবুজ রঙের বোতলটা বের করে টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল লিয়ন , 'আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে ফাদার ।'
ফাদার তখনও কিছু বলছে না দেখে বিরক্ত হয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল লিয়ন ।
'দাড়াও।' পিছন থেকে বলে উঠলেন ফাদার । টান দিয়ে লম্বা ওভারকোটটা গায়ে চাপাতে চাপাতে সামনে এসে বলল , ' আমি যাব তোমার সাথে ।
খুশি হল লিয়ন ।
দুইজনে মিলে ঘোড়ায় চেপে যখন গোরস্থানের দিকে চলল তখন দুরের মেসার কাছে সূর্যটা খুব সামান্যই ঝুলে আছে। যে কোন সময় টুপ করে হারিয়ে যাবে ।
গোরস্থানের কাছে এসে অবাক হলেন পাদ্রী । এখানের মাটি খুবই শক্ত । গোরখোদকেররা অমানুষিক পরিশ্রম করেছে সন্দেহ নেই ।
কিন্তু আর সব রেড ইনডিয়ানদের মত অমন জায়গাই পছন্দ করেছিল বুড়ো টিওফিলো ।
প্রায় গোলাকার বলের মত ঝোপ , নাম - টাম্বেলউইড , ওটার নিচে কবর দেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে বুড়োকে । লাল কম্বলে প্যাচিয়ে শুয়ে আছে বুড়ো ।
সেইদিকে চেয়ে ভাবতে লাগলেন ফাদার , সারাটা জীবন নিজের গোত্র ছেড়ে অমন বিজনপুরিতে একা পড়ে থাকতো কেন বুড়ো ? কালো জাদু জানত সে ? সত্যি ছিল অলৌকিক ক্ষমতা ? আর সব রেডইনডিইয়ান সর্দারদের যেমন থাকে । প্রকৃতিকে বশ মানানোর কায়দা ওরা শিখে কি ভাবে ? শুনেছে , মার্চ মাসে মন্ত্র পড়ে বৃষ্টি নামাতে পারতো বুড়ো ।
এই বুড়ো কি কাউকে সেইসব বিদ্যা শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিল ? শাদা মানুষেরা আসার আগে কত ভাল ছিল ওরা । কেন আসলো শাদা মানুষেরা ?
শুনেছে টিওফিলো ডাক দিলে বনের ভেতর থেকে হারিয়ে যাওয়া ভেড়া চলে আসতো । তারার দেশে যেই সব আদিম দেবতারা থাকে তাদের সাথে কথা বলতে পারতো বুড়ো ।
সব গল্প ?
এখন প্রমান করার কোন উপায় নেই । শক্ত ঠাণ্ডা মাটিতে পড়ে আছে বুড়ো । খানিক পর চলে যাবে মাটির তলায় ।
সব লেনদেন শেষ ।
মমতা দিয়ে বুড়োর সারা শরীরে পবিত্র জল ঢেলে দিলেন ফাদার ।প্রায় ভিজিয়ে ফেললেন কম্বলটা । কুঁচকানো হাতের চামড়ায় মলম মাখানোর মত করে জলের প্রলেপ দিলেন ।
হাতের বোতলটা খালি করে ফেললেন । জল পড়লো ঠিক আগস্ট মাসের বৃষ্টির মত । যেই বৃষ্টি মাটির কুমড়ো ফুলের উপর পড়ার আগেই উবে যায় আবার ।
দমকা বাতাসে লাশের উপর ছড়িয়ে দেয়া ভুট্টার গুড়ো কেমন বাওকুড়ানির মত উড়তে লাগলো ।
শক্ত দড়ি দিয়ে কম্বল সহ টিওফিলোর লাশ বেঁধে নামিয়ে দেয়া হল কবরে।
তখনই সূর্যটা চলে গেল সেইদিনের মত ।
কোন কথা না হলে ফিরে চললেন ফাদার ।
লিয়ন দেখল পাহাড়ের উপর দিয়ে ঘোড়ায় চেপে চলে যাচ্ছেন ফাদার । যতক্ষণ ছিলেন একটা কথাও বলেননি ।
দূরের নীল পাহাড়গুলোর দিকে তাকাল লিয়ন । পশ্চিমের দুর্বল লাল আলো পাহাড়ের উপর জমে থাকা বরফে পড়ে কেমন বিভ্রম জাগাচ্ছে ওর চোখে । যেন লুকানো সোনা রয়ে গেছে ওখানে ।
মনটা ভাল হয়ে গেল ওর ।
কারন, কাজটা সুন্দর ভাবে শেষ করেছে । আরও খুশি বুড়োর শরীরে পবিত্র জল ছিটিয়ে দিয়েছে ওরা ।
বুড়ো আর কখনই ফিরে আসতে পারবে না কবরের উপর। যেহেতু হলিওয়াটার দেয়া হয়েছে ওর আত্মা তৃষ্ণার্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে না বিরান প্রান্তরে। আর গরমের মৌসুমে ওদের জন্য ঠিকই প্রচুর বৃষ্টি পাঠাবে বুড়ো ।
( বুনো পশ্চিমের রেড ইনডিয়ানদের কিংবদন্তী অবলম্বনে )

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন