বৃষ্টি ! বৃষ্টি ! বৃষ্টি !
শহর, বন্দর, নগর ভিজে যায়। ভিজে যায় দালানবাড়ি। ঘাস, পাথর। সব।
বৃষ্টি আমার প্রিয়। বৃষ্টি মানেই ছুটি। বই পড়া। অবসর। বারন্দায় বসে দুরের পাহাড়কে স্নান করতে দেখা।
সারা জীবন যত মধুর স্মৃতি পেয়েছি ওদের সাথে বৃষ্টি ছিল বেশ।
একদম পিচ্চিবেলায় কাঠের একটা বাড়িতে থাকতাম। বাড়ির সামনে ছিল চারটে বড় বড় নারকেল গাছ। নীচে কালো পুকুর। বৃষ্টি এলে গাছগুলো পাগল হয়ে যেত। সাই সাই করে ওদের পাতা দিয়ে বারি দিত টিনের চালে। নীচে পুকুরের ঠাণ্ডা ফুটন্ত জল। টগবগ করছে বৃষ্টির জন্য। আতঙ্কিত স্মৃতি। আধো ঘুমে মনে হত বাড়িটা উড়ে যাবে না তো ? উইজারড অব দ্যা অয কাহিনির ডরোথী নামের ছোট্ট মেয়েটার বাড়ি যেমন হয়েছিল।
এক বাদলার দিনে মা আমাদের চার ভাই বোনকে নিয়ে দৌড়ে পাশের বাড়ির শক্ত দালানের বারান্দায় দাড়িয়ে রইল। কালবৈশাখীতে আমাদের পাটাতন ঘরটা দুলছিল । রাগি কোন দানব হাতের তালুতে নিয়ে ঝাঁকাচ্ছিল যেন।
কত ছোট আমরা। মায়ের ভীত চেহারা মনে আছে। শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছিল আমাদের। রাজ্যহারা পাণ্ডবদের মত ।
পাশের পিচ্চি একটা বাড়িতে চলে এলাম আমরা। পিচ্চি কিন্তু সুন্দর। দারুন একটা ব্যাপার হচ্ছে এই বাড়ির সামনের বারান্দা লাল টালির। লালটালির বাসা মানে ইংল্যান্ডের বাসা ।
আমার কামরা পড়ার টেবিলের বাইরে পুকুর দেখা। কচুরি আর জলজ ঘাসে ভর্তি। একটা মৌসুমে টিয়া পাখির পালকের রঙের গঙ্গা ফড়িঙে ভরে যায়। ওরা কয়েকটা চলে আসে পড়ার টেবিলে।
সেইবার প্রথম বর্ষার মৌসুম পেলাম। ক্লাস ফোরে পড়ি।
কাঠের পিচ্চি একটা মিটসেফ ছিল মায়ের। বিয়ের পরপর কেনা হয়েছিল। উপরের অংশ কাচের। আগে পেয়ালা তশতরি সাজিয়ে রেখেছিল মা। সাদা পেয়ালা । গোলাপি রঙের বুনো ফুলের ছবি। আবার তশতরিতে বেগুনি রঙের অপূর্ব ফুলের ছবি। পথের ধারে অমন ফুল দেখতাম। আজকাল হারিয়ে গেছে।
মিটসেফে সরু বালার মত পিতলের দুই কড়া ছিল। তালা দেয়ার জন্য।
ওটা আমাকে দেয়া হল বই রাখার জন্য। বিচিত্র স্বাদের সব বই কিনে দিয়েছিল মা। উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর- টুনটুনির বই, রামায়ণ, মহাভারত । ইয়া মোটা একটা লাল রঙের অক্সফোরড ডিকশনারি। বাঘের মন্ত্রর। রবিনসন ক্রুসো।
শিশু একাডেমীর পাতলা কিছু বই। যার পাতায় পাতায় রঙ বেরঙের ছবি। মুতি সাহেবের বিজ্ঞানের বই। মুক্তধারার- ক্ষুদে বিজ্ঞানীর প্রজেক্ট।
বারান্দার অংশে লাল টালি থাকলেও বাকি অংশ ছিল টিনের। সেই জন্য বৃষ্টির দারুণ একটা রুম ঝুম - রুম ঝুম শব্দ শুনতে পেতাম
এটা তখন খুব সাধারণ কিছু ছিল।
যদিও এর অনেক পরে কোন এক সফল লেখক টিনের চালের ঘরে থাকবে আর মানুষ তাকেই এক মাত্র বৃষ্টি পছন্দ করা ব্যক্তি হিসাবে গুণ গান গাইবে।
ব্যাপারটা অন্য রকম।
এই বাড়িতে আমরা ছিলাম ছয় বছর । ছয় বর্ষা।
বললে বিশ্বাস করবে না তখন এক একটা বর্ষাকালে টানা আঠার দিন পর্যন্ত বৃষ্টির রেকর্ড ছিল।
পিচ্চি পুকুরগুলো হয়ে যত ক্ষুদে অ্যাটল্যান্টিক।
গাছেরা টানা লম্বা স্নান করে বেশ সবুজ আর টাটকা হয়ে যত। কে না জানে স্নান করা ভাল। স্নান করার পর এক গাছ আরেক গাছকে বলে- মনে রাখবি সবুজ মানেই তর শরীর ভাল।
বর্ষায় ফোটা ফুলগুলোর মধ্যে - কদম, বকুল, স্পাইডার লিলি, দোলনচাঁপা, সুখদর্শন, ঘাসফুল, শাপলা, সন্ধ্যামালতি, কামিনী, গুলনার্গিস, দোপাটি ও অলকানন্দ নাম বলতেই হবে।
বেশ কয়েকটা কদম আলী মানে কদম গাছ ছিল আমার শহরে।
ওদের সামনে দিয়ে যাবার সময় মিষ্টি সৌরভে মাথা ঝিমিয়ে উঠত । কে জানে কাঠবিড়ালী আর বাদুরেরা কদম খেয়ে বাদলার দিনে চোস্ত একটা ঘুম দেয় কি না?
ওরা ওদের ব্যক্তিগত কথা আমাদের কেন বলতে যাবে ?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন