" উল্কি আছে অমন একটা মানুষ আমাকে দেখান , আমি আপনাকে আকর্ষণীয় অতীতের মানুষ দেখাব।" - জ্যাক লন্ডন।
আমি প্রথম যে জাহাজি পেয়েছিলাম সে ছিল বুড়ো এক মাতাল।
কিশোর জিম তার বাবার সাথে সরাইখানা ‘অ্যাডমিলার বেইনবো ‘ চালাত ।
সেখানেই উঠে এলো বুড়ো। জামাকাপড়ের অবস্থা খুব কাহিল । গালে আবার একটা কাটা দাগ। পেছনে পেছনে ঠেলে নিয়ে আসছে একটা সিন্দুক।
লোকটা জানাল কিছুদিন থাকবে । শুয়োরের মাংস, ডিম আর রাম হলেই চলবে । উনাকে ক্যাপ্টেন বলে ডাকতে হবে । এভাবেই শুরু হয়েছিল রবার্ট লুই স্টিভেনসন - আর ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ বইটা। আর এই ক্যপ্তেন ছিল আমার পাওয়া প্রথম জাহাজি । তবে বইতে বিলি বোনস, স্কয়ার ট্রেনলি, ডঃ লিভসী, ক্যাপ্টেন স্মলেট, লং জন সিলভার ওদের পেয়েছিলাম । কিন্তু কাহিনি শুরু তো এই রগচটা জাহাজিকে দিয়েই ।
পরে মারিয়ানা আইল্যান্ডে গিয়ে কত , কত নাবিকের সাথে পরিচয় হলাম ।
সবার গায়ে উল্কি দেখেছি ।
ষোল শো শতাব্দীর দিকেই জাহাজীদের মধ্যে উল্কি আঁকার একটা চল ছড়িয়ে পড়ে, তখন এটা কে ওরা বলতো ট্যাঁটুস "tatus ট্যাটু শব্দটা ইংরেজি না, পলিনেশিয়ান ভাষা। ১৬ আর ১৭ শতাব্দীর শেষ দিকে যেই সব নাবিক প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ফিরত তারাই যাত্রা পথের স্মৃতি চিহ্ন হিসাবে গায়ে উল্কি আঁকিয়ে ফিরত।
এইভাবেই নাবিকের উল্কি শুরু হয়েছিল।
শোনা যায় সেই সময় উল্কির কালি হিসাবে গান পাউডার ব্যবহার করতো ।
উল্কি ছাড়া জাহাজি একদম বেমানান।
উল্কি ছাড়া কোন নাবিক ? আমি মোটেও কল্পনা করতে পারিনা ।
এদের হাতে ,বাহুতে বা পিঠে নানা জায়গায় বিচিত্র মজাদার সব উল্কি থাকে । প্রথমে মনে হতো ইচ্ছে মতন উল্কি আঁকায় ওরা । পরে জানতে পারলাম এই উল্কি দেখেই সেই নাবিক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করতে পারবে তুমি।
যেমন, কোন নাবিকের শরীরের যদি দুই -তিন মাস্তুল ওয়ালা জাহাজের উল্কি দেখো , তবে বুঝে নেবে সেই নাবিক কেপ হর্নের কাছাকাছি গিয়েছিল।
কেপ হর্ন নাবিকদের জন্য বিপদজনক জায়গা । সারাক্ষণ উত্তাল থাকে সেখানের সাগর । বড় বড় ঢেউ । দমকা বাতাস হা হা করে তেড়ে আসে । রয়েছে শক্তিশালী সাগরের স্রোত । পেল্লাই সাইজের আইসবারগ ।
এই নাবিক পার হয়েছে দক্ষিন সাগর । সামুদ্রিক ঝড় আর উত্তাল সাগর দেখেছে অনেক বার , সে একজন অভিজ্ঞ নাবিক।
নটিক্যাল স্টার। এই উল্কি দেখতে তারার মত। পাঁচ কোন ওয়ালা তারা অনেকটা কম্পাসের ভেতরের ডায়ালের মতই দেখায় । অনেক আদর করে কম্পাস রোজ বলে।
আসলে এই উল্কি ধ্রুবতারা বা নর্থস্টারের প্রতীক । সেই প্রাচীনকাল থেকেই দিক নির্ণয়ের জন্য পুরানো দিনের নাবিকেরা ধ্রুবতারা দেখে পথ চলতো । গায়ে এই উল্কি এঁকে নাবিক আশা করে, তারাটি রাতের অন্ধকারে তাদের পথ দেখাতে সাহায্য করবে , তাদের নিরাপদে বাড়ি ফিরিয়ে আনবে। এই উল্কি সুরক্ষা, নির্দেশনা এবং সৌভাগ্যের প্রতীক।
নাবিকের শরীরে এই উল্কি থাকলে আরও বুঝতে পারবে , সে কখনোই সাগরের দিক হারিয়ে দিশাহারা হয়নি । সবসময় পথ খুঁজে বন্দরে ফিরেছে। মায়ের কোলে । দিশেহারা নাবিক নয় সে ।
নটিক্যাল স্টার উল্কি নাবিকদের মধ্যে খুব প্রিয় ।
আজও ।
যদি কচ্ছপ থাকে ?
ভাল করে লক্ষ্য করবে সাধারণ কচ্ছপ না, ওরা শেলব্যাক কচ্ছপ আঁকার চেষ্টা করে। অবশ্য শিল্পীর আঁকার দোষে সেটা দেখতে আর দশটা স্বাভাবিক কচ্ছপের মত মনে হলেও এই উল্কির অর্থ নাবিক বিষুব রেখা পার হয়ে সারাদুনিয়ার সব সাগর পাড়ি দিয়ে তোমার সামনে এসে বসে আছে।
তাকে একটা স্যালুট দেবে । এটা উনার পাওনা ।
কখনো জোড়া কামান দেখতে পাবে উল্কি হিসেবে। এর অর্থ সে একসময় নৌবাহিনীতে ছিল।
ডলফিন থাকলে বুঝবে নেভিতে ছিল । শুধু তাই না, ভদ্রলোকের জীবন কেটেছে সাবমেরিনের ভেতরে । কী রোমাঞ্চকর ! ঠিক যেন আলিস্টেয়ার ম্যাকলিন সাহেবের ‘ আইস স্টেশন জেব্রা ‘ বইয়ের নায়কের মত ।
খুঁজে ফিরে দুই এক জন নাবিক পাবে, যাদের শরীরে মেরু ভাল্লুকের উল্কি । এর অর্থ এই ভদ্রলোক বরফের স্তূপ ভেঙ্গে মেরু সাগর পাড়ি দিয়ে উত্তর মেরুতে গিয়েছিল, এটা একটা সম্মানের ব্যাপার। যা তা ব্যাপার না মোটেই ।
সোয়াল পাখি আঁকা থাকলে বুঝবে নাবিক সাগরে মোট পাঁচ হাজার নটিক্যাল মাইল ভ্রমণ করেছে । যেটা ডাঙ্গার হিসাবে ৫৭৫৪ মাইল । মানে মোটামুটি পড়া শিখে এনেছে অমন ছাত্র ।
চার বা পাঁচ সোয়াল পাখি মানে ২১৬৩৯ নটিক্যাল মাইল ।
সারা দুনিয়ার সব সাগর দেখেছে ভদ্রলোক ।
সাবাস ।
ভাল কথা সোয়াল আর চড়ুই কিন্তু আলাদা পাখি ।দেখতে বেশ মিল পেলেও আলাদা । পাখির রঙ নীল , উল্কি সেইজন্য নীল কালি দিয়ে আঁকা হয় । আরও কথা আছে দেশান্তরী পাখিদের মধ্যে সোয়াল সেরা । ও বাড়ি ফিরবেই।
তোমরা যারা পাপাই দা সেইলর ম্যান' কাটুন দেখেছো তারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ , পাপাই এর হাতে নোঙ্গর এর উল্কি আছে ।
এর অর্থ এই নাবিক আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছে। শুধু তাইনা যুদ্ধ চলাকালীন সময় সৈনিক , খাদ্যদ্রব্য আর দরকারি জিনিস নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়েছে । বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ ।
কোন নাবিকের কব্জিতে যদি গিঁটওয়ালা দড়ির উল্কি থাকে তবে বুঝবে সে ডেকহ্যান্ড হিসেবে কাজ করতো । ডেক হ্যান্ড হচ্ছে উঁচু মানের খালাসি । অমন কাজ পেলে আমিও করতাম ।
নাবিকদের উল্কিতে মেয়ে মানুষ থাকবে না অমন হতে পারেই না। বেশ সুন্দরী মনোহরা কিছু মেয়ের ছবি থাকে । ওরা নাবিকের একান্ত আপন । গিন্নি বা পছন্দের কেউ। অপেক্ষায় আছে কখন দুর্দান্ত জাহাজি বাড়ি ফিরবে । অথবা এই মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল কোন সরাইখানায় ।
নাবিক ওকে মনে রেখেছে । স্মৃতির সাগরে হারিয়ে ফেলেনি ।
মৎস্যকুমারীর উল্কি আসলে একটা রুপক উল্কি। সাগরের স্মৃতি । তুমি যেন তাকে দেখেই বুঝতে পার, সমুদ্র এই নাবিকের কাছে কত লোভনীয় ছিল । আজও সমুদ্রকে ভালবাসে সে। কে না জানে মৎস্যকুমারী গান গেয়ে নাবিককে দিশেহারা করে ফেলে ।
নাবিক ছুটে যায় ভুল স্রোতে।
আমি জাহাজি হলে নিশ্চয়ই মৎস্যকুমারীর একটা উল্কি বানাতাম ।
এবার যদি দেখো কোন নাবিকের উল্কিতে নৃত্যরত মেয়ে দেখা যাচ্ছে ? মেয়েটার মাথায় ফুলের মুকট । হাতে গলায় কাঠগোলাপ আর জবা ফুলের মালা, নারকেলের লতা পাতার পোশাক। তবে এটা হচ্ছে, হলা গার্ল । হাওয়াই দ্বীপের মেয়ে। নাবিক হাওয়াই গিয়েছিল ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দুটো অদ্ভুত ধরনের উল্কি দেখা যেত নাবিকদের পায়ের পাতায় উপরের দিকে ।
মোরগ- আর শূয়র । আজকাল দেখা যায় না অমন ।
তখনকার নাবিকেরা বিশ্বাস করতো এই উল্কি থাকলে জাহাজ ডুবে গেলেও নাবিক ভেসে উঠবে , ডুবে মারা যাবে না সে ।
কারন কি জানো ?
সব সময় জাহাজডুবিতে আর যাই হোক মোরগ-মুরগি বা শূয়র ঠিকই কোন ভাবে সাঁতরে তীরে উঠে যায়। প্রথমে কোন ভাবে সাঁতরে গিয়ে উঠে ভাসমান তক্তার উপর। তারপর ভাসতে ভাসতে ঠিকই পেয়ে যায় ডাঙ্গা।
প্রশান্ত মহাসাগরে প্রচুর দ্বীপ আছে যেখানে কেউ না থাকলেও বনমোরগ আর শূয়র আছে । কারণ ,
সেই প্রাচীনকালে নানারকম জাহাজডুবির পর ওরা এসে উঠেছে ।
ব্যাপারটা মজার না ?
মারিয়ানা আইল্যান্ডের জঙ্গলে অমন প্রচুর বনমোরগ পেয়েছি আমি।
কম্পাসের ফুল আঁকে কেউ। বিশ্বাস এই উল্কি সৌভাগ্য হয়ে পাশে থাকবে নাবিকের। কখনই দিশে হারাবে না বিশাল সাগরের বুকে। ঠিকঠাক বাড়ি ফিরতে পারবে।
বিশ্বাস !
এই বিশ্বাস থেকেই পায়ের পাতার উপর ক্রস চিহ্ন আঁকে । হাঙরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে , আশা করে ।
আঁকে জোড়া প্রপেলারের ছবি । ভাবে সাগরে ডুবে যাবে না পাথরের টুকরোর মত ।
গোলাপ ফুলের উপর ড্যাগার মানে চ্যাপ্তা ফলাওয়ালা চাকু ছবি থাকে যদি ?
এর অর্থ নাবিক খুব বিশ্বস্ত এবং একই সাথে তার কোমল একটা মন আছে সেই সাথে সারাক্ষণই বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত ।
খাসা নাবিক ।
ড্রাগনের উল্কি থাকার অর্থ , নাবিক চিনা সাগর পাড়ি দিয়ে চীন দেশে গিয়েছিল । থেকেছিল কিছু সময় সেই চৈনিক বন্দরে। ভাল লেগেছিল তার ।
হারপুন থাকার অর্থ অতীতে সে তিমি শিকার করত। আজকাল তিমি শিকার হয় না । আইনগত নিষেধ । তাই হারপুন থাকার অর্থ , লোকটা মাছ ধরতে খুব পছন্দ করে।
বেশ কিন্তু !
নারকেল গাছের ছবি থাকার অর্থ রয়েল নেভিতে যুক্ত ছিল । বা হাওয়াই দ্বীপে গিয়ে ছিল বদলি হয়ে । অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার নাবিক । পুরানো নাবিক ।
লাইটহাউজ । বাতিঘর । নাবিকদের প্রিয় একটা উল্কি ।
কারণ নিশ্চয়ই জানো , মহাসাগরের বুকে দিশা হারিয়ে ফেলে নাবিক দিগন্তের দিকে চেয়ে থাকে। নীল অন্ধকারের রাতে লাইটহাউজের উজ্জ্বল আলো তার বুকে প্রাণ ফিরিয়ে দেয় ।
লাইট হাউজ পথের দিশা দেখায় । সামনেই বন্দর । মানুষ , খাবার , আশ্রয় সব কিছুর প্রতীক এই লাইটহাউজ ।
সৌভাগ্যের জন্য এই উল্কি আঁকে নাবিক। সে নিরাপদ ফিরে যেতে চায় বাড়ি। বাড়ির নিরাপদ কামরা মিস করে সে। হতাশার সময় এই উল্কি আশা দেয় মনে ।
উল্কি হিসাবে অক্টোপাস বা স্কুইড আঁকে অনেক নাবিক।
মূলত সাগরের প্রতি ভালবাসা প্রকাশের জন্য অমন ছবি বেছে নেয়। কে না জানে এই দুই সাগরবাসি জীব আসলেই বিচিত্র, দেখতে এবং চরিত্রে । সাগরের প্রতীক হিসাবে সেই প্রাচীন কাল থেকে এই দুই প্রাণী বিখ্যাত ।
তো আজকাল যদি কোন জাহাজির সাথে দেখা হয় তোমার , আলাপ করতে বেশ সুবিধে হবে তাই না ?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন