সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কোথায় গেল আটলান্টিস ?

  অতীতের স্মৃতিতে  বিভোর হয়ে থাকার মধ্যে  এক ধরণের মাদকতা আছে ।

কেউ কেউ  জানে । সবাই না ।

অকস্মাৎ মনটা কেমন যেন হারিয়ে যায় ।

 বেলা অবেলায় ।  কক্ষনো কক্ষণো মনে হয়ে মগজের অর্ধেক  বাস করছে অতীতে । সেটা ছিল সোনালী । নেশা মাখানো । কে না জানে,  স্মৃতির গায়ে কোন গরল থাকে না। স্মৃতি সব সময় মগজের  কোষে কোষে আনন্দ দেয় ।

আর মানুষের মস্তিষ্ক এক বিচিত্র পাত্র ।  এত তুচ্ছ সহজ অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি মনে রাখে !

অদ্ভুত ।   

পৃথিবীর নানান মহাদেশে উড়ে উড়ে সময় কাটিয়েছি । ইচ্ছা ছিল না। হয়ে গেছে । বিধাতার অভিশাপ । অথচ  সদ্য কৈশোর শেষ করে তারুন্যে কাটাচ্ছিলাম তখন ।

কেউ জানত না অমন আচমকা বদলে যাবে দিনলিপি ।

কত স্মৃতি !

দেশে শীতের সন্ধ্যায় গুলশান সিনেমা হলের সামনের বুড়োর  কাছ থেকে বই কিনে বাড়ি ফেরা ।  পারসিমন ফলের মত কমলা রোদ মেখে আছে আমার শহরটা ।

 পৌর  পাঠাগারের পিছনে লটকে আছে  সূর্যটা ।কাঁচা  মুসুরি ডালের মত দেখতে ওটা।

মারিয়ানা আইল্যান্ডের দিনগুলো কি সম্মোহন   করেও ভোলা যাবে ?

সেই সামুদ্রিক ঝড় ! সৈকতের হাঙর ! জঙ্গলে ক্যাম্পফায়ার !  

আফ্রিকার নিঝুম গ্রাম কাবালে । দূরে কঙ্গোর সীমান্ত ।  রাস্তার পাশের ভুট্টার দানার জাউ আর পোড়া  তেলে ভাঁজা  তেলাপিয়া । শুধু লবণ , রসুন আর পেয়াজ দিয়ে সেদ্দ করা শূয়রের মাংস মাত্র আড়াই হাজার সিলিঙ ।

গ্রামের সবচেয়ে বুড়োটা বসে বলল , ' বাওয়ানা মিলুনি আপনি জাদুকর হাতির গল্প শুনবেন ? কত শিকারি  ঝরে গেল নক্ষত্রের মত !  

হারানো সব স্মৃতি আমাকে বাউন্টি হান্টার্সের মত ধাওয়া করে বেড়ায় ।

বৈশাখের প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা  তেতে উঠা মাটির মধ্যে  পড়লে  যেমন অচেনা গুল্মের সৌরভ পাই,  তেমন  মায়াবী লাগে সব ।

স্মৃতি আমাদের মানুষ বানিয়েছে ।  টিকে আছি এই জন্যই । স্মৃতি আমাদের আইডেনটি রক্ষা করে ।  

কেমন হবে কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি  দেখেন,  মনে করতে পারছেন না আপনি কে ? কি করেন , কি আপনার পরিচয় ?  থাকেন কোথায় ?

কেমন হবে তখন ?

বেশ কিছু থ্রিলার মুভি বা  উপন্যাস আছে যাতে কাহিনির নায়ক নিজের  স্মৃতি হারিয়ে ফেলে ।  ধুম ধারাক্কা ঘটনা ঘটে তখন ।

স্মৃতি আমাদের সমস্যা  সমাধান  করতে  সাহায়্য করে ।  বিবর্তনের কারনেই এই  গুণটা  রপ্ত করেছে আমাদের মগজ ।

টিকে আছি আমরা ।  হাজার হাজার বছর ধরে । পূর্বপুরুষদের অর্জিত  জ্ঞান আমরা ধরে রাখি  স্মৃতির  সাহায়্যে ।

অত জটিল কথা না। সহজ ভাবে চিন্তা করুন । বাইরে থেকে এসেছেন দরজা খুলতে গিয়ে দেখেন পকেটে চাবি  নেই । কোথায় রেখেছেন কিচ্ছু মনে নেই । হয় না অমন ?

কেমন লাগে তখন ?

এর বাইরে অদ্ভুত একটা ব্যাপার আছে কিছু মানুষ সব সময় ছন্নছাড়া বোধ করে । অতীত ওদের পিছু  ডাকে সব সময় ।

তেপান্তরের ঘাসের মত ফিসফিস করে ডাকে ।

অমন মানুষ আছে না ?

প্রচুর আছে ।

আমি নিজে ।

কেন অমন হয় ?

বিজ্ঞানীরা কি ব্যাখ্যা দেবেন জানি না। তবে প্যারানরমাল ব্যাখ্যা আছে ।

যারা অতীতের স্মৃতিতে ডুবে থাকতে  ভালবাসে তারা আসলে হারিয়ে যাওয়া সেই আটলান্টিসের বংশধর !

আটলান্টিস।

সেই হারানো আটলান্টিস ।  প্লেটোর বর্ণনা দেয়া পৃথিবীর  স্বর্গ । যারা সেই সময়ের জ্ঞানে বিজ্ঞানে হাজার গুন বেশি  উন্নত ছিল ।  ছিল দারুন সমাজ ব্যবস্থা আর আধুনিক টেকনোলজির ব্যবহার ।

এই কিংবদন্তী কাহিনির চল হয়েছিল প্লেটোর  ডায়ালগ থেকেই ।  যীশুর জন্মের ৩৩০ বছর আগে লেখা হয়েছিল প্লেটোর সংলাপগুলো । প্লেটো নিজে লিখতেন না । তার শিস্যগণ লিখে রাখতো ।

প্লেটোর বর্ণনায় কোন আহামরি খাপছাড়া কথা  পাওয়া যায়নি । সে নিচের চোখে দেখেনি।  কিন্তু সমুদ্রগামী এবং বহুদেশ  ভ্রমণকারি একজন নাবিকের কাছে শুনেছিলেন । বন্দরে যার সাথে প্লেটোর পরিচয় হয়েছিল ।

প্লেটোর বর্ণনা মতে - আটলান্টিস দেখতে সুন্দর । বড় বড় দালানবাড়ি ভর্তি । প্রাচুর্য ছিল । জনগণ ছিল সুখী । একদল দক্ষ সেনাবাহিনী ছিল রাজ্য শাসন করার জন্য ।

কিন্তু লোভ,  পাপ আর অপরাধ ছিল সবার মধ্যেই ।

সমস্যা হচ্ছে,  বাস্তবে অমন একটা দ্বীপরাজ্য থাকলে সেই সময়ের  আর  সব গ্রিক সাহিত্য বা অন্য লেখকের বর্ণনায় আটলান্টিসের কথা আসবে । তাই না ?

তেমন কিছু হয়নি ।

সেই যুগের অন্য কারও লেখায় আটলান্টিসের কোন বর্ণনা নেই ।

সাধারণ মানুষের কাছে আটলান্টিসের কথা বেশি প্রচার পায় ১৮৮২ সালে ।  ইগনাটিয়াস লোয়লা ডোনেলি  নামে  এক ভদ্রলোক  সেই বছর   '  আটলান্টিস: দ্যা এন্টেদিলুভিয়ান ওয়ার্ল্ড" (আটলান্টিস, একটি হারানো মহাদেশ) নামে একটা বই লিখেন ।

উনার বিশ্বাস,  ঐসব সত্য ঘটনা । এবং সেই সমৃদ্ধ  সংস্কৃতি আবার ফিরিয়ে আনা উচিৎ । খুঁজে বের করা দরকার হারানো সেই মহাদেশ ।

সমস্যা হল ভদ্রলোক লেখার ভেতরে ইচ্ছামত নিজের গল্প আর  তথ্য ঢুকিয়ে দিয়েছেন ।

সেইসব বিশ্বাস করার কোন মানে নেই ।

 তবে ,  আধুনিক দুনিয়ায় সেই সময়  আটলান্টিসের  জনপ্রিয়তার বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল ।

যা পরে  পপ কালচার , বিদ্যা ,  গবেষণার বিষয় আর  ফ্যান্টাসির জগত হয়ে গেছে ।

উনি উনার বইয়ের এক কপি চার্লস ডারউইনের কাছেও পাঠিয়েছিলেন । এবং ডারউইন সাহেব এই গাল গল্প মোটেও  বিশ্বাস করতেন না ।

বাদবাকি জনগণ বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝে দোল খেত ।

অনেকেই বিশ্বাস করতো , আরে নাহ , সত্যিই অমন কিছু আছে ।

এখন তো আটলান্টিস বিশেষজ্ঞ ও তৈরি হয়েছে দুনিয়ার নানান দেশে ।  আমি নিজেই কয়েক ডজন ইটের মত মোটা বই পেয়েছি । সেইসব লেখকেরা বছরের পর বছর খেটে পিটে আদা জল খেয়ে সেইসব কিতাব লিখেছেন ।

প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন,  আটলান্টিস ছিল । আবার কেউ কেউ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন -সকলই গরল  ভেল ।

 তো  কোথায় ছিল সেই মহাদেশ  ?

কেউ বলেন সেটা - আটলানটিক    মহাসাগরে ছিল  ।  বারমুডার বিমিনি দ্বীপের কাছে  সাগরের তলায় যে বিমিনি রোড খুঁজে পাওয়া  গেছে সেটাই ।

বাহামা দ্বীপপুঞ্জের বিমিনি দ্বীপ ।

নানান কারনে বিখ্যাত এই দ্বীপটা । নির্জন সৈকত , মন মাতান  লেগুন , আদিবাসীদের রাতের উৎসবের জন্য  হাজারে বিজারে টুরিস্ট ছুটে  আসে এখানে  ।

 শৌখিন মৎস্যশিকারিদের স্বর্গ বলা যায় ।  ফিকে হলুদ   লেমন শার্ক আর  বোন ফিশের  জন্য বিখ্যাত ।  

    ' আইল্যান্ডস ইন দ্য স্ট্রিম'   বইটা লেখার সময়  নোবেল বিজয়ী আরনেসট  হেমিংওয়ে বাস করতেন এখানে ।  

এত ব্যাখান করার  দরকার নেই , আসল কথায় আসি ।

 ১৯৬৮ সালে  জোসেফ ম্যানসন ভ্যালেন্টাইন নামে এক ডুবুরি তার  দুইজন সঙ্গী নিয়ে ডুব দেয়  বিমিনি  দ্বীপের কাছাকাছি জলের তলায় ।

সেই সময় জলের তলায় অদ্ভুত একটা পথ আবিস্কার করে তারা । বড় বড় চুনা পাথরের ব্লকের তৈরি এক রাস্তার দৈঘ্য  আধা মাইল আর চড়ায় ২৯০ ফুট ।  পথের আকৃতি ইংরেজি হরফ   J  এর মত ।

জলের তলার এই পথের নাম রাখা হয় বিমিনি রোড , কেউ কেউ বিমিনি দেয়াল নামেও ডাকে ।

সারা দুনিয়ার ডুবুরি আর প্রত্নতাত্ত্বিক ছুটে আসে এই এলাকায় ।

স্থানীয় কিংবদন্তী বলে ,  বিমিনি রোড আটলান্টিসের বাসিন্দাদের বানানো পথ ।

চলল   গবেষণা ।

বের হয় নতুন নতুন থিউরি ।

 কেউ কেউ বলেন,   প্রকৃতিক ভাবে তৈরি হয়েছিল এই পথ । ভূগর্ভ আর সমুদ্রের চাপে এ রকম  ছক ছক  আকার  ধারন করেছে চুনা পাথরগুলো । দেখতে পাথরের ব্লকের মত লাগে ।

আবার অনেকেই বলে  মানুষের হাতে বানানো হয়েছিল । হয়তো কোন পথ । সমুদ্র বন্দর কিংবা দেয়াল ।

বয়স কত এই দেয়ালের ?

মনে করা হত পাঁচ থেকে সাত হাজার বছর পুরানো ।

মজার ব্যাপার হচ্ছে এই বিমিনি রোড আবিস্কারের প্রায় ত্রিশ বছর আগে  এডগার কেসি নামের এক সাইকিক  হিলার,  ভবিষ্যদ্বাণী  করেছিলেন  বিমিনি দ্বীপের ওই খানে আটলান্টিসের বসতি পাওয়া যাবে !

এডগার কেসি কে ?

আমেরিকার নাম করা সাইকিক হিলার ।  জন্ম ১৮৭৭ মৃত্যু  ১৯৪৫ ।

সারাজীবন প্যারানরমাল বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন।  ভবিষ্যদ্বাণী  করতে পারতেন ।

জীবনে চৌদ্দ হাজার লোককে সম্মোহিত করে তাদের চিকিৎসা করিয়েছিলেন কেসি । সবার রেকর্ড রাখা আছে ।

মজার ব্যাপার সম্মোহিত অবস্থায় বিরাট সংখ্যক মানুষ দাবী করেছে -   তারা আটলান্টিসের বাসিন্দা ছিল !

কেসির দাবী অনুসারে - আটলান্টিসের বাসিন্দারা ছড়িয়ে গেছে সারা দুনিয়ায় ।

উনার কথা  অনুসারে  আটলান্টিসের  রহস্যের চাবিকাঠি পৃথিবীর তিনটে  জায়গায় আছে ।

মিসরের  স্ফিংক্সের কাছে । বাহামা দ্বীপের জলের তলায় । ইউকাটান উপদ্বীপ।

হারানো ইতিহাসের পাজলের শেষ তিনতে টুকরো রয়ে গেছে  এই তিন জায়গায় ।  সেগুলো পেলে আবার নতুন করে লেখা হবে সভ্যতার ইতিহাস ।

কেসি তার লেখায় আরেকটা ব্যাপার  উল্লেখ করে গেছেন।

পৃথিবীর মেরুর  স্থানান্তর । প্রতি চার লক্ষ  পঞ্চাশ হাজার বছর পর পর পৃথিবীর মেরু বদলে যায় । একদম উল্টা পাল্টা হয়ে যায় পৃথিবীর অবস্থান ।

অমন হবার ফলে ধ্বংস হয়ে যায়  অতীতের সব সভ্যতা । একদম মুছে যায় সব কিছু ।  ঠিক অমন একটা পরিস্থিতি অচিরেই আসবে পৃথিবীর বুকে ।

বড় কোন  ধুমকেতুর আঘাতে বদলে  যেতে পারে পৃথিবীর অক্ষ । বা সামান্য নড়ে যেতে  পারে ।

তখন সমুদ্র  উথাল হয়ে গিলে ফেলবে সমস্ত নগর বন্দর ।

অনেকেই মনে করে হারানো সেই আটলান্টিস খুঁজে বের করা দরকার । তাদের ভুল থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে ।

একটা কথা পরিষ্কার , আমরাই সভ্যতার শিখরে উঠেছি অমনটা মনে করার কোন কারণ নেই ।

অতীতে হাজার হাজার সভ্যতা গড়ে উঠেছিল । আবার মুছে গেছে  ।

 

কারও মতে  আটলান্টিস  পাওয়া যেতে পারে     অ্যানটারটিকার বরফের তলায়  । হতে পারে বলিভিয়ায় ,  অথবা  তুরস্কে , মাল্টায় বা ক্যারাবিয়ানেও ।

অমন কি,  সাহার মরুভূমির সেই  বৃত্তাকার পাথরের দেয়াল,   যেটা আই অভ সাহারা নামে পরিচিত । ওটা   দেখিয়ে সেটাও হারানো আটলান্টিসের অংশ বলে দাবি করছে কেউ কেউ ।

প্লেটোর বর্ণনা মতে শহরটা ঘিরে ছিল বড় বড়  পাথরের স্তম্ভ । যেটাকে উনি - পিলার অভ হারকিউলিস বলেছিলেন ।

তেমন কিছু আজও কোথাও পাওয়া যায়নি !

 অনেকে বলে ,  আটলান্টিস খুঁজে না পাবার  আরেকটা বড় কারন হচ্ছে ওটা লুকিয়ে আছে অ্যান্টার্কটিকায় । গহন বরফের তলায় !

কিন্তু কি ভাবে সেটা সম্ভব !

বর্ণনা মতে আটলান্টিস ছিল উষ্ণ আবহাওয়ার জায়গা ।  যেমনটা মেডিটেরিয়ান অঞ্চল হয় ।

কিন্তু  আমেরিকান ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা অন্য রকম কথা বলেন ।  

অধ্যাপক    চার্লস    এ হেপগুড দাবি করেন কিংবদন্তী এই  দ্বীপটা আসলে ছিল অ্যান্টার্কটিকার অংশ ।

এই ঘটনার জন্য  দায়ী পৃথিবীর ক্রাস্টাল স্থানচ্যুতি  ।

পৃথিবীর উপরের ভাগের  ভূমি  নড়াচড়া করে ।

 খুব ধীরে । প্রতি বিশ থেকে ত্রিশ হাজার বছর পর পর  ভুমির প্রকৃতি বদলে যায় ।  পাল্টে  যায়  দেশের   ভৌগলিক   অবস্থান ।   যে কোন আধুনিক সভ্যতার জন্য এই ক্রাস্টাল স্থানচ্যুতি একটা দুঃসংবাদ ।

আজ যেখানে  অ্যান্টার্কটিকা । মাইলের পর মাইল শাদা বরফ।  সেখানে এক সময় সবুজ দীঘল ঘাস ছিল । এক মুঠো বরফ ছিল না।

আজ থেকে ৫০০ বছর আগের  পিরি রিসের সেই বিখ্যাত মানচিত্র দেখলে অবাক হতে হয় ।

পিরি রিস ছিলেন তুরস্কের নৌবাহিনীর প্রধান । পৃথিবীর প্রথম পূর্ণ মানচিত্র তিনিই আঁকেন । হরিণের চামড়ার উপরে আঁকা এই  মানচিত্রের  ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক ।  পৃথিবীর অনেক দেশ আবিস্কারের ৫০০ বছর আগেই এই ম্যাপে সেইসব  দেশ আঁকা হয়েছে।

 এমন কি অ্যান্টার্কটিকা ও। আমরা অ্যান্টার্কটিকা আবিস্কার করেছি ১৮২০ সালে ।

 পিরি রিসের ম্যাপে  অ্যান্টার্কটিকাকে দেখান হয়েছে বরফশূন্য বাসযোগ্য ভুমি    হিসাবে ।

 আজকের বিজ্ঞানিরা একমত, এখন যে   অ্যান্টার্কটিকা বরফে ঢাকা রয়েছে আজ থেকে ১২ হাজার বছর আগে মানুষ বসবাস করতো সেখানে  ।

অনেক বছর ধরে সেইসব শুধু বিজ্ঞানিদের  অনুমান ছিল । কিন্তু কয়েক বছর আগে নাসার স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া চিত্র প্রমাণ দেয়,  ওখানের বরফের তলায়  মানুষে বসতির বাতিল চিহ্ন রয়ে গেছে ।

 আজও ।

অধ্যাপক  চার্লস এ হেপগুড দাবি করেন,  আজ বা কাল আমরা সেই বরফের তলায়  হারানো আটলান্টিস খুঁজে পাব ।

ফিকশন কাহিনিতে প্রথম আটলান্টিস আসে, সি ,জে , কাটক্লিফ হাইনে সাহেবের লেখা - ' দ্যা  লস্ট  কনটিনেনট ' বইতে ।  ১৮৯৯ সালে বের  হয়েছিল বইটা ।

সেই থেকে আটলান্টিস ব্যবহার হয়ে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে । গল্প , কমিক্স ,  টিভি সিরিজ ' দ্যা ম্যান ফ্রম আটলান্টিস , আর মুভির কথা বলার তো দরকার দেখি না। ।

প্রথম চারটে মুভি বানানো হয়েছিল ১৯১৯ সালের  প্রকাশিত উপন্যাস  ' আটলানটিডিয়া'   বইটার কাহিনি চুরি করে ।  ফরাসী লেখক পিয়ের বেনোইট  লিখেছিলেন চনমন করা সেই কাহিনীটা ।

কাহিনির সবচেয়ে বড় টুইস্ট হচ্ছে হারানো আটলান্টিস আছে সাহারা মরুভূমির ঠিক মাঝখানে   ।

সেই আইডিয়া চুরি করেই পরের অনেক কাহিনি হয়েছে ।  আধুনিক অ্যাকুয়াম্যান মুভি পর্যন্ত ।  

কাহিনির সব চরিত্র  ঘটনাচক্রে  হারানো সেই আটলান্টিস খুঁজে পায়  ।  সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল  ১৯৯৪ সালে টিভি সিরিজের নায়ক ম্যাক গাইভার আটলান্টিস খুঁজে পায় । সেই তুলনায় ক্লাইভ ক্লাসলারের   ' আটলান্টিস ফাউনড' অনেক বেশি পানসে । আমার কাছে ।

  আটলান্টিস হান্টার  নামে  ট্রেজার হান্টারের মত একটা দল গজিয়েছে সারা দুনিয়ায় ।

বছরের পর বছর ধরে ওরা খুঁজে চলছে  কিংবদন্তী সেই হারানো সভ্যতার । যার বর্ণনা কম,  গল্প বেশি ।

প্লেটো কিন্তু  আটলান্টিসের বেশ নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছিলেন ।

প্লেটোর বর্ণনা মতে - দ্বীপে বড় বড় দুটোও ঝর্না ছিল । একটা দিয়ে গরম আরেকটা দিয়ে ঠাণ্ডা জল প্রবাহিত হত ।

মাটি ভাল । সব রকমের ফসল ফলতো ।  কিছু ফল ফসল বাইরে থেকে জাহাজ ভর্তি করে আসতো ।  স্বর্ণের ব্যবহার করতো সবাই ।  ছিল গ্রাম , মফস্বল আর শহর ।

 বনভূমি ছিল অনেক । নির্বাচিত কাঠ মিস্তিরা  গাছ  কেটে আসবাব  বানানোর কাজ করতো ।

জীব জন্তুর বৈচিত্র ছিল ,  বনে পাহাড়ে নদীতে চড়ে বেড়াতো সেইসব ।   বেশি পাওয়া  যেত হাতি । সব ধরণের প্রাণীর জন্য প্রচুর খাবার ছিল ।

ফল , শস্য , ফসল  প্রচুর ফলত । চেসনাট পাওয়া যেত প্রচুর ।

দক্ষ রাজমিস্ত্রি ছিল একদল  । মন্দির , প্রাসাদ , বাড়িঘর আর বন্দর বানাত ।  আটলান্টিস ছিল রোদেলা ভূমি । সূর্যের আলোয়   সোনা রুপা দিয়ে তৈরি  মন্দির আর প্রসাদ চকচক করতো ।  মন্দিরের সব দেবমূর্তি সোনার তৈরি ।

হাতি পুষতো  সেই সভ্যতার লোকজন ।

 বুনো মোষ পুজা করতো ।  নারকেল গাছ ছিল প্রচুর ।   আমোদ প্রিয় মস্তিবাজ জনগণ ।

কিন্তু অত্যাচারি , লোভী  তারা । ঈশ্বরের  ক্রোধের কারণ হয়েছিল । শেষে এক রাতে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি আর সামুদ্রিক ঢেউ উঠে গভীর সাগরের তলায় ডুবে গেল ।

আটলান্টিস হান্টাররা  স্বেচ্ছায়  দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে । একদল খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই হারানো  সভ্যতার চিহ্ন ।  ধ্বংসাবশেষ ।

আরেকদল খুঁজছে  বেঁচে যাওয়া আটলান্টিসের মানুষজন  কোথায়   কোথায়  তাদের চিহ্ন রেখে গেছে ।

আমরা যাতে জানতে পারি ওদের ব্যাপারে ।

এত বিশাল কাহিনি শুরু  হয়েছিল প্লেটোর বিখ্যাত সেই সংলাপ Timaeus  এবং  Critias  থেকে ।

এই দুই  বর্ণনা থেকেই  মনের চোখে ম্যাপ বানিয়ে  পরের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম  খুঁজে চলেছে আটলান্টিস ।

প্লেটোর বর্ণনার সবচেয়ে বড় খুঁত,  উনি নিদিষ্ট  করে বলেননি কোথায় এই স্বর্গভূমি ।

যে দুই পিলারের কথা বলেছিলেন তার সাথে দুনিয়ার ম্যাপের হাজার জায়গার মিল  চোখে  পড়ে ।

 জিব্রালটা প্রণালীর  প্রবেশ পথ ,  ক্যানারি আর অ্যাজর  দ্বীপ , অ্যানটারটিকা , চিন সাগরের কিছু দ্বীপ , আয়ারল্যান্ড ,  স্পেন ,  আমেরিকা , আন্দিজ পর্বত ,  অমন ডজন খানেক জায়গার সাথে প্লেটোর বর্ণনার  আটলান্টিসের মিল পাওয়া যায় অদ্ভুত ভাবে ।

কিন্তু উনার বর্ণনা বড্ড বেশি নিখুঁত । শহরের বাড়িঘর । নৌযান , বন্দর । চারিদিকে বৃত্তাকার  জলাভুমি । চক্রের ঠিক মাঝখানে  গোলাকার ভূমি । সেখানে রাজপ্রাসাদ ।

এত কিছুর পরও কিছুই খুঁজে পাইনি আমরা ।

সাগর তলায় সভ্যতা ডুবে যাওয়া নতুন কোন কাহিনি  নয় । মহাভারতের 'দ্বারকা '  আমাদের সবার কাছে একটা চেনা কাহিনি    । ' টেকনোলজি অভ দ্যা গড ' বইয়ের লেখক  ডেভিড চাইল্ড্রেস  - এর মতে  মেডিটেরিয়ান সাগরের তলায়  দুইশোর  বেশি ডুবন্ত নগর আবিস্কৃত  হয়েছে ।

কল্পনা করতে পারেন ? দুইশোর  বেশি !

বন্যা , প্রাকৃতিক দুর্যোগ , ভূমিকম্পে হারিয়ে গেছে ওরা । কেমন ছিল সেই শহরের বাসিন্দারা ? কেমন ভাষা ? কি খেত ? কেমন চিন্তা ভাবনা করতো ? ভালবাসত ? মাতাল হত প্রিয়তমার হাতের মদিরা গিলে ?

বাচ্চারা খেলত খেলার মাঠে ? ইস্কুলে যেত ?

আহা !

সেইসব নগরীর নির্মাণ  শৈলী দেখে অবাক হয়ে যাই । পাথরের ব্লকের রাস্তা । নিখুঁত ধূসর দেয়াল ।

তো , আটলান্টিস ।   হাজার বছরের সভ্যতা হারিয়ে গেল মাত্র এক রাতেই  ?

দুই একজন কি বেঁচে ছিল না ?

বিজ্ঞানীরা তেমনটা মনে করেন ।

সবাই মারা যায়নি সেই বিপর্যয়ে ।  ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা দুনিয়ায় । মিসরে । ইস্টার দ্বীপে । ভারতবর্ষে , এমন কি দক্ষিণ আমেরিকায় ।

আগেই বলেছি , বিশ্বাসীরা এও বিশ্বাস করে আটলান্টিসের  বাসিন্দারা একদম হারিয়ে যায়নি ।  সেই প্রলয়ের পরও বেঁচে ছিল । ছড়িয়ে গিয়েছিল দুনিয়ার সব প্রান্তে ।

নানান আদিবাসি গোত্র তাদের দেখা পেয়ে দেবতা ভেবে নিয়েছিল ।

সেই সময় দুনিয়ার সব  জায়গায় গড়ে উঠেছিল মহান সব নতুন  সভ্যতা। আরেক জায়গায় মায়ানরা বানিয়ে ফেলল তাদের বিশাল মন্দির ।  ধু ধু বালির মধ্যে পিরামিড ।

আচমকা কোত্থেকে হাজির হল এই মিসরীয় লোকজন ? বানিয়ে ফেলল পিরামিডের মত  বিস্ময়কর দালান । কোথায় পেল তারা নিখুঁত জ্যামিতিক জ্ঞান । পাথরের ব্লক বানানো শিখল কি ভাবে ?

কাঠের রোলায় গড়িয়ে কপিকল দিয়ে তুলে কিভাবে বানাল পেল্লাই এক একটা পিরামিড ?

পিরামিডের গায়ে লেখা আছে অতীতের কোন এক ঐশ্বর্যশালী রাজ্য ডুবে গেছে  কোন এক ঝড়ের রাতে ।

মায়ানদের কিংবদন্তী বলে ওদের পূর্বপুরুষরা পূর্ব সমুদ্রের এক বিশাল দেশ থেকে এসেছিল। যেটা কিনা মহাপ্লাবনে সমুদ্রের বুকে হারিয়ে গেছে। সেই দেশের নাম ছিল -

আযটালান।

শব্দটা কেমন যেন আটলান্টিসের কথা মনে করিয়ে দেয় না  ?

তো বিশ্বাসীরা অমন বলেন , সেই আটলান্টিসের বাসিন্দারা  তখনই অদ্ভুত সব ক্ষমতার অধিকারি হয়ে গিয়েছিল ।  বড় বড়  পাথরের ব্লক শূন্যে উড়িয়ে আনতে পারতো ।  পারতো জিনেটিক মোটিফিকেশন এবং  নিজেদের  ক্লোনিঙ করাও ।

প্রকৃতি নিয়ন্ত্রন সহ আরও সহ আজব বিদ্যা ।

পরবর্তীতে সেইসব জাদুবিদ্যা হিসাবে চেনা শুরু করেছি আমরা ।

সেই মায়ান আর মিসরীয়রা ছিল আটলান্টিসের বাসিন্দা ।   গড়ে তুলেছিল মায়ান মন্দির সহ পিরামিড । সূর্যের উপাসনা করতো ।

মনের শক্তি নিয়ন্ত্রন করে পাথরের ব্লক উড়িয়ে আনতো ।  প্রশান্ত মহাসাগরের  দ্বীপ পোনাপেতে  বানিয়েছিল মস্ত পাথরের দুর্গ । অমন পাথর সেই দ্বীপে আগে বা পরে কক্ষনই পাওয়া যেত না ।

বানিয়েছিল পাঁচ হাজার বছর চলে অমন ক্যালেন্ডার । নিজেদের মধ্যে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে যোগাযোগ করতো ।

কালক্রমে সবাই হারিয়ে গেছে ।

আজও আধুনিক মানুষের ভিড়ে রয়ে গেছে আটলান্টিসের বাসিন্দাদের বংশধর । এদের কারও কারও মধ্যে অতীতের গুণাবলীর কিছু কিছু রয়ে গেছে । সেই সব অলৌকিক গুণ , জাদু বা   অতিইন্দ্রিয় ক্ষমতার কথা আমরা জানি না। খবরও রাখি না।

তবে ওদের অনেকের কোন ক্ষমতাই নেই ।

শুধু ভর বর্ষার দিনে , যখন গহন কালো মেঘে  আকাশ ছেয়ে যায় ।  টিপটিপ বৃষ্টি পরে তখন অকারণেই ওদের মন খারাপ হয়ে যায় । ফেলে আসা দিনের কথা বারে বারে মনে পড়ে ওদের ।

ঝড়ের রাত আর ব্জ্র্যপাত ভয় পায় ।

অমন এক রাতে সব হারিয়ে গিয়েছিল যে তাই ।

মিলিয়ে দেখুন ...

আপনি ওদের একজন না তো ?

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...