অতীতের স্মৃতিতে বিভোর হয়ে থাকার মধ্যে এক ধরণের মাদকতা আছে ।
কেউ কেউ জানে । সবাই না ।
অকস্মাৎ মনটা কেমন যেন হারিয়ে যায় ।
বেলা অবেলায় । কক্ষনো কক্ষণো মনে হয়ে মগজের অর্ধেক বাস করছে অতীতে । সেটা ছিল সোনালী । নেশা মাখানো । কে না জানে, স্মৃতির গায়ে কোন গরল থাকে না। স্মৃতি সব সময় মগজের কোষে কোষে আনন্দ দেয় ।
আর মানুষের মস্তিষ্ক এক বিচিত্র পাত্র । এত তুচ্ছ সহজ অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি মনে রাখে !
অদ্ভুত ।
পৃথিবীর নানান মহাদেশে উড়ে উড়ে সময় কাটিয়েছি । ইচ্ছা ছিল না। হয়ে গেছে । বিধাতার অভিশাপ । অথচ সদ্য কৈশোর শেষ করে তারুন্যে কাটাচ্ছিলাম তখন ।
কেউ জানত না অমন আচমকা বদলে যাবে দিনলিপি ।
কত স্মৃতি !
দেশে শীতের সন্ধ্যায় গুলশান সিনেমা হলের সামনের বুড়োর কাছ থেকে বই কিনে বাড়ি ফেরা । পারসিমন ফলের মত কমলা রোদ মেখে আছে আমার শহরটা ।
পৌর পাঠাগারের পিছনে লটকে আছে সূর্যটা ।কাঁচা মুসুরি ডালের মত দেখতে ওটা।
মারিয়ানা আইল্যান্ডের দিনগুলো কি সম্মোহন করেও ভোলা যাবে ?
সেই সামুদ্রিক ঝড় ! সৈকতের হাঙর ! জঙ্গলে ক্যাম্পফায়ার !
আফ্রিকার নিঝুম গ্রাম কাবালে । দূরে কঙ্গোর সীমান্ত । রাস্তার পাশের ভুট্টার দানার জাউ আর পোড়া তেলে ভাঁজা তেলাপিয়া । শুধু লবণ , রসুন আর পেয়াজ দিয়ে সেদ্দ করা শূয়রের মাংস মাত্র আড়াই হাজার সিলিঙ ।
গ্রামের সবচেয়ে বুড়োটা বসে বলল , ' বাওয়ানা মিলুনি আপনি জাদুকর হাতির গল্প শুনবেন ? কত শিকারি ঝরে গেল নক্ষত্রের মত !
হারানো সব স্মৃতি আমাকে বাউন্টি হান্টার্সের মত ধাওয়া করে বেড়ায় ।
বৈশাখের প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা তেতে উঠা মাটির মধ্যে পড়লে যেমন অচেনা গুল্মের সৌরভ পাই, তেমন মায়াবী লাগে সব ।
স্মৃতি আমাদের মানুষ বানিয়েছে । টিকে আছি এই জন্যই । স্মৃতি আমাদের আইডেনটি রক্ষা করে ।
কেমন হবে কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখেন, মনে করতে পারছেন না আপনি কে ? কি করেন , কি আপনার পরিচয় ? থাকেন কোথায় ?
কেমন হবে তখন ?
বেশ কিছু থ্রিলার মুভি বা উপন্যাস আছে যাতে কাহিনির নায়ক নিজের স্মৃতি হারিয়ে ফেলে । ধুম ধারাক্কা ঘটনা ঘটে তখন ।
স্মৃতি আমাদের সমস্যা সমাধান করতে সাহায়্য করে । বিবর্তনের কারনেই এই গুণটা রপ্ত করেছে আমাদের মগজ ।
টিকে আছি আমরা । হাজার হাজার বছর ধরে । পূর্বপুরুষদের অর্জিত জ্ঞান আমরা ধরে রাখি স্মৃতির সাহায়্যে ।
অত জটিল কথা না। সহজ ভাবে চিন্তা করুন । বাইরে থেকে এসেছেন দরজা খুলতে গিয়ে দেখেন পকেটে চাবি নেই । কোথায় রেখেছেন কিচ্ছু মনে নেই । হয় না অমন ?
কেমন লাগে তখন ?
এর বাইরে অদ্ভুত একটা ব্যাপার আছে কিছু মানুষ সব সময় ছন্নছাড়া বোধ করে । অতীত ওদের পিছু ডাকে সব সময় ।
তেপান্তরের ঘাসের মত ফিসফিস করে ডাকে ।
অমন মানুষ আছে না ?
প্রচুর আছে ।
আমি নিজে ।
কেন অমন হয় ?
বিজ্ঞানীরা কি ব্যাখ্যা দেবেন জানি না। তবে প্যারানরমাল ব্যাখ্যা আছে ।
যারা অতীতের স্মৃতিতে ডুবে থাকতে ভালবাসে তারা আসলে হারিয়ে যাওয়া সেই আটলান্টিসের বংশধর !
আটলান্টিস।
সেই হারানো আটলান্টিস । প্লেটোর বর্ণনা দেয়া পৃথিবীর স্বর্গ । যারা সেই সময়ের জ্ঞানে বিজ্ঞানে হাজার গুন বেশি উন্নত ছিল । ছিল দারুন সমাজ ব্যবস্থা আর আধুনিক টেকনোলজির ব্যবহার ।
এই কিংবদন্তী কাহিনির চল হয়েছিল প্লেটোর ডায়ালগ থেকেই । যীশুর জন্মের ৩৩০ বছর আগে লেখা হয়েছিল প্লেটোর সংলাপগুলো । প্লেটো নিজে লিখতেন না । তার শিস্যগণ লিখে রাখতো ।
প্লেটোর বর্ণনায় কোন আহামরি খাপছাড়া কথা পাওয়া যায়নি । সে নিচের চোখে দেখেনি। কিন্তু সমুদ্রগামী এবং বহুদেশ ভ্রমণকারি একজন নাবিকের কাছে শুনেছিলেন । বন্দরে যার সাথে প্লেটোর পরিচয় হয়েছিল ।
প্লেটোর বর্ণনা মতে - আটলান্টিস দেখতে সুন্দর । বড় বড় দালানবাড়ি ভর্তি । প্রাচুর্য ছিল । জনগণ ছিল সুখী । একদল দক্ষ সেনাবাহিনী ছিল রাজ্য শাসন করার জন্য ।
কিন্তু লোভ, পাপ আর অপরাধ ছিল সবার মধ্যেই ।
সমস্যা হচ্ছে, বাস্তবে অমন একটা দ্বীপরাজ্য থাকলে সেই সময়ের আর সব গ্রিক সাহিত্য বা অন্য লেখকের বর্ণনায় আটলান্টিসের কথা আসবে । তাই না ?
তেমন কিছু হয়নি ।
সেই যুগের অন্য কারও লেখায় আটলান্টিসের কোন বর্ণনা নেই ।
সাধারণ মানুষের কাছে আটলান্টিসের কথা বেশি প্রচার পায় ১৮৮২ সালে । ইগনাটিয়াস লোয়লা ডোনেলি নামে এক ভদ্রলোক সেই বছর ' আটলান্টিস: দ্যা এন্টেদিলুভিয়ান ওয়ার্ল্ড" (আটলান্টিস, একটি হারানো মহাদেশ) নামে একটা বই লিখেন ।
উনার বিশ্বাস, ঐসব সত্য ঘটনা । এবং সেই সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আবার ফিরিয়ে আনা উচিৎ । খুঁজে বের করা দরকার হারানো সেই মহাদেশ ।
সমস্যা হল ভদ্রলোক লেখার ভেতরে ইচ্ছামত নিজের গল্প আর তথ্য ঢুকিয়ে দিয়েছেন ।
সেইসব বিশ্বাস করার কোন মানে নেই ।
তবে , আধুনিক দুনিয়ায় সেই সময় আটলান্টিসের জনপ্রিয়তার বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল ।
যা পরে পপ কালচার , বিদ্যা , গবেষণার বিষয় আর ফ্যান্টাসির জগত হয়ে গেছে ।
উনি উনার বইয়ের এক কপি চার্লস ডারউইনের কাছেও পাঠিয়েছিলেন । এবং ডারউইন সাহেব এই গাল গল্প মোটেও বিশ্বাস করতেন না ।
বাদবাকি জনগণ বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝে দোল খেত ।
অনেকেই বিশ্বাস করতো , আরে নাহ , সত্যিই অমন কিছু আছে ।
এখন তো আটলান্টিস বিশেষজ্ঞ ও তৈরি হয়েছে দুনিয়ার নানান দেশে । আমি নিজেই কয়েক ডজন ইটের মত মোটা বই পেয়েছি । সেইসব লেখকেরা বছরের পর বছর খেটে পিটে আদা জল খেয়ে সেইসব কিতাব লিখেছেন ।
প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, আটলান্টিস ছিল । আবার কেউ কেউ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন -সকলই গরল ভেল ।
তো কোথায় ছিল সেই মহাদেশ ?
কেউ বলেন সেটা - আটলানটিক মহাসাগরে ছিল । বারমুডার বিমিনি দ্বীপের কাছে সাগরের তলায় যে বিমিনি রোড খুঁজে পাওয়া গেছে সেটাই ।
বাহামা দ্বীপপুঞ্জের বিমিনি দ্বীপ ।
নানান কারনে বিখ্যাত এই দ্বীপটা । নির্জন সৈকত , মন মাতান লেগুন , আদিবাসীদের রাতের উৎসবের জন্য হাজারে বিজারে টুরিস্ট ছুটে আসে এখানে ।
শৌখিন মৎস্যশিকারিদের স্বর্গ বলা যায় । ফিকে হলুদ লেমন শার্ক আর বোন ফিশের জন্য বিখ্যাত ।
' আইল্যান্ডস ইন দ্য স্ট্রিম' বইটা লেখার সময় নোবেল বিজয়ী আরনেসট হেমিংওয়ে বাস করতেন এখানে ।
এত ব্যাখান করার দরকার নেই , আসল কথায় আসি ।
১৯৬৮ সালে জোসেফ ম্যানসন ভ্যালেন্টাইন নামে এক ডুবুরি তার দুইজন সঙ্গী নিয়ে ডুব দেয় বিমিনি দ্বীপের কাছাকাছি জলের তলায় ।
সেই সময় জলের তলায় অদ্ভুত একটা পথ আবিস্কার করে তারা । বড় বড় চুনা পাথরের ব্লকের তৈরি এক রাস্তার দৈঘ্য আধা মাইল আর চড়ায় ২৯০ ফুট । পথের আকৃতি ইংরেজি হরফ J এর মত ।
জলের তলার এই পথের নাম রাখা হয় বিমিনি রোড , কেউ কেউ বিমিনি দেয়াল নামেও ডাকে ।
সারা দুনিয়ার ডুবুরি আর প্রত্নতাত্ত্বিক ছুটে আসে এই এলাকায় ।
স্থানীয় কিংবদন্তী বলে , বিমিনি রোড আটলান্টিসের বাসিন্দাদের বানানো পথ ।
চলল গবেষণা ।
বের হয় নতুন নতুন থিউরি ।
কেউ কেউ বলেন, প্রকৃতিক ভাবে তৈরি হয়েছিল এই পথ । ভূগর্ভ আর সমুদ্রের চাপে এ রকম ছক ছক আকার ধারন করেছে চুনা পাথরগুলো । দেখতে পাথরের ব্লকের মত লাগে ।
আবার অনেকেই বলে মানুষের হাতে বানানো হয়েছিল । হয়তো কোন পথ । সমুদ্র বন্দর কিংবা দেয়াল ।
বয়স কত এই দেয়ালের ?
মনে করা হত পাঁচ থেকে সাত হাজার বছর পুরানো ।
মজার ব্যাপার হচ্ছে এই বিমিনি রোড আবিস্কারের প্রায় ত্রিশ বছর আগে এডগার কেসি নামের এক সাইকিক হিলার, ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন বিমিনি দ্বীপের ওই খানে আটলান্টিসের বসতি পাওয়া যাবে !
এডগার কেসি কে ?
আমেরিকার নাম করা সাইকিক হিলার । জন্ম ১৮৭৭ মৃত্যু ১৯৪৫ ।
সারাজীবন প্যারানরমাল বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতেন ।
জীবনে চৌদ্দ হাজার লোককে সম্মোহিত করে তাদের চিকিৎসা করিয়েছিলেন কেসি । সবার রেকর্ড রাখা আছে ।
মজার ব্যাপার সম্মোহিত অবস্থায় বিরাট সংখ্যক মানুষ দাবী করেছে - তারা আটলান্টিসের বাসিন্দা ছিল !
কেসির দাবী অনুসারে - আটলান্টিসের বাসিন্দারা ছড়িয়ে গেছে সারা দুনিয়ায় ।
উনার কথা অনুসারে আটলান্টিসের রহস্যের চাবিকাঠি পৃথিবীর তিনটে জায়গায় আছে ।
মিসরের স্ফিংক্সের কাছে । বাহামা দ্বীপের জলের তলায় । ইউকাটান উপদ্বীপ।
হারানো ইতিহাসের পাজলের শেষ তিনতে টুকরো রয়ে গেছে এই তিন জায়গায় । সেগুলো পেলে আবার নতুন করে লেখা হবে সভ্যতার ইতিহাস ।
কেসি তার লেখায় আরেকটা ব্যাপার উল্লেখ করে গেছেন।
পৃথিবীর মেরুর স্থানান্তর । প্রতি চার লক্ষ পঞ্চাশ হাজার বছর পর পর পৃথিবীর মেরু বদলে যায় । একদম উল্টা পাল্টা হয়ে যায় পৃথিবীর অবস্থান ।
অমন হবার ফলে ধ্বংস হয়ে যায় অতীতের সব সভ্যতা । একদম মুছে যায় সব কিছু । ঠিক অমন একটা পরিস্থিতি অচিরেই আসবে পৃথিবীর বুকে ।
বড় কোন ধুমকেতুর আঘাতে বদলে যেতে পারে পৃথিবীর অক্ষ । বা সামান্য নড়ে যেতে পারে ।
তখন সমুদ্র উথাল হয়ে গিলে ফেলবে সমস্ত নগর বন্দর ।
অনেকেই মনে করে হারানো সেই আটলান্টিস খুঁজে বের করা দরকার । তাদের ভুল থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে ।
একটা কথা পরিষ্কার , আমরাই সভ্যতার শিখরে উঠেছি অমনটা মনে করার কোন কারণ নেই ।
অতীতে হাজার হাজার সভ্যতা গড়ে উঠেছিল । আবার মুছে গেছে ।
কারও মতে আটলান্টিস পাওয়া যেতে পারে অ্যানটারটিকার বরফের তলায় । হতে পারে বলিভিয়ায় , অথবা তুরস্কে , মাল্টায় বা ক্যারাবিয়ানেও ।
অমন কি, সাহার মরুভূমির সেই বৃত্তাকার পাথরের দেয়াল, যেটা আই অভ সাহারা নামে পরিচিত । ওটা দেখিয়ে সেটাও হারানো আটলান্টিসের অংশ বলে দাবি করছে কেউ কেউ ।
প্লেটোর বর্ণনা মতে শহরটা ঘিরে ছিল বড় বড় পাথরের স্তম্ভ । যেটাকে উনি - পিলার অভ হারকিউলিস বলেছিলেন ।
তেমন কিছু আজও কোথাও পাওয়া যায়নি !
অনেকে বলে , আটলান্টিস খুঁজে না পাবার আরেকটা বড় কারন হচ্ছে ওটা লুকিয়ে আছে অ্যান্টার্কটিকায় । গহন বরফের তলায় !
কিন্তু কি ভাবে সেটা সম্ভব !
বর্ণনা মতে আটলান্টিস ছিল উষ্ণ আবহাওয়ার জায়গা । যেমনটা মেডিটেরিয়ান অঞ্চল হয় ।
কিন্তু আমেরিকান ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা অন্য রকম কথা বলেন ।
অধ্যাপক চার্লস এ হেপগুড দাবি করেন কিংবদন্তী এই দ্বীপটা আসলে ছিল অ্যান্টার্কটিকার অংশ ।
এই ঘটনার জন্য দায়ী পৃথিবীর ক্রাস্টাল স্থানচ্যুতি ।
পৃথিবীর উপরের ভাগের ভূমি নড়াচড়া করে ।
খুব ধীরে । প্রতি বিশ থেকে ত্রিশ হাজার বছর পর পর ভুমির প্রকৃতি বদলে যায় । পাল্টে যায় দেশের ভৌগলিক অবস্থান । যে কোন আধুনিক সভ্যতার জন্য এই ক্রাস্টাল স্থানচ্যুতি একটা দুঃসংবাদ ।
আজ যেখানে অ্যান্টার্কটিকা । মাইলের পর মাইল শাদা বরফ। সেখানে এক সময় সবুজ দীঘল ঘাস ছিল । এক মুঠো বরফ ছিল না।
আজ থেকে ৫০০ বছর আগের পিরি রিসের সেই বিখ্যাত মানচিত্র দেখলে অবাক হতে হয় ।
পিরি রিস ছিলেন তুরস্কের নৌবাহিনীর প্রধান । পৃথিবীর প্রথম পূর্ণ মানচিত্র তিনিই আঁকেন । হরিণের চামড়ার উপরে আঁকা এই মানচিত্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক । পৃথিবীর অনেক দেশ আবিস্কারের ৫০০ বছর আগেই এই ম্যাপে সেইসব দেশ আঁকা হয়েছে।
এমন কি অ্যান্টার্কটিকা ও। আমরা অ্যান্টার্কটিকা আবিস্কার করেছি ১৮২০ সালে ।
পিরি রিসের ম্যাপে অ্যান্টার্কটিকাকে দেখান হয়েছে বরফশূন্য বাসযোগ্য ভুমি হিসাবে ।
আজকের বিজ্ঞানিরা একমত, এখন যে অ্যান্টার্কটিকা বরফে ঢাকা রয়েছে আজ থেকে ১২ হাজার বছর আগে মানুষ বসবাস করতো সেখানে ।
অনেক বছর ধরে সেইসব শুধু বিজ্ঞানিদের অনুমান ছিল । কিন্তু কয়েক বছর আগে নাসার স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া চিত্র প্রমাণ দেয়, ওখানের বরফের তলায় মানুষে বসতির বাতিল চিহ্ন রয়ে গেছে ।
আজও ।
অধ্যাপক চার্লস এ হেপগুড দাবি করেন, আজ বা কাল আমরা সেই বরফের তলায় হারানো আটলান্টিস খুঁজে পাব ।
ফিকশন কাহিনিতে প্রথম আটলান্টিস আসে, সি ,জে , কাটক্লিফ হাইনে সাহেবের লেখা - ' দ্যা লস্ট কনটিনেনট ' বইতে । ১৮৯৯ সালে বের হয়েছিল বইটা ।
সেই থেকে আটলান্টিস ব্যবহার হয়ে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে । গল্প , কমিক্স , টিভি সিরিজ ' দ্যা ম্যান ফ্রম আটলান্টিস , আর মুভির কথা বলার তো দরকার দেখি না। ।
প্রথম চারটে মুভি বানানো হয়েছিল ১৯১৯ সালের প্রকাশিত উপন্যাস ' আটলানটিডিয়া' বইটার কাহিনি চুরি করে । ফরাসী লেখক পিয়ের বেনোইট লিখেছিলেন চনমন করা সেই কাহিনীটা ।
কাহিনির সবচেয়ে বড় টুইস্ট হচ্ছে হারানো আটলান্টিস আছে সাহারা মরুভূমির ঠিক মাঝখানে ।
সেই আইডিয়া চুরি করেই পরের অনেক কাহিনি হয়েছে । আধুনিক অ্যাকুয়াম্যান মুভি পর্যন্ত ।
কাহিনির সব চরিত্র ঘটনাচক্রে হারানো সেই আটলান্টিস খুঁজে পায় । সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল ১৯৯৪ সালে টিভি সিরিজের নায়ক ম্যাক গাইভার আটলান্টিস খুঁজে পায় । সেই তুলনায় ক্লাইভ ক্লাসলারের ' আটলান্টিস ফাউনড' অনেক বেশি পানসে । আমার কাছে ।
আটলান্টিস হান্টার নামে ট্রেজার হান্টারের মত একটা দল গজিয়েছে সারা দুনিয়ায় ।
বছরের পর বছর ধরে ওরা খুঁজে চলছে কিংবদন্তী সেই হারানো সভ্যতার । যার বর্ণনা কম, গল্প বেশি ।
প্লেটো কিন্তু আটলান্টিসের বেশ নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছিলেন ।
প্লেটোর বর্ণনা মতে - দ্বীপে বড় বড় দুটোও ঝর্না ছিল । একটা দিয়ে গরম আরেকটা দিয়ে ঠাণ্ডা জল প্রবাহিত হত ।
মাটি ভাল । সব রকমের ফসল ফলতো । কিছু ফল ফসল বাইরে থেকে জাহাজ ভর্তি করে আসতো । স্বর্ণের ব্যবহার করতো সবাই । ছিল গ্রাম , মফস্বল আর শহর ।
বনভূমি ছিল অনেক । নির্বাচিত কাঠ মিস্তিরা গাছ কেটে আসবাব বানানোর কাজ করতো ।
জীব জন্তুর বৈচিত্র ছিল , বনে পাহাড়ে নদীতে চড়ে বেড়াতো সেইসব । বেশি পাওয়া যেত হাতি । সব ধরণের প্রাণীর জন্য প্রচুর খাবার ছিল ।
ফল , শস্য , ফসল প্রচুর ফলত । চেসনাট পাওয়া যেত প্রচুর ।
দক্ষ রাজমিস্ত্রি ছিল একদল । মন্দির , প্রাসাদ , বাড়িঘর আর বন্দর বানাত । আটলান্টিস ছিল রোদেলা ভূমি । সূর্যের আলোয় সোনা রুপা দিয়ে তৈরি মন্দির আর প্রসাদ চকচক করতো । মন্দিরের সব দেবমূর্তি সোনার তৈরি ।
হাতি পুষতো সেই সভ্যতার লোকজন ।
বুনো মোষ পুজা করতো । নারকেল গাছ ছিল প্রচুর । আমোদ প্রিয় মস্তিবাজ জনগণ ।
কিন্তু অত্যাচারি , লোভী তারা । ঈশ্বরের ক্রোধের কারণ হয়েছিল । শেষে এক রাতে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি আর সামুদ্রিক ঢেউ উঠে গভীর সাগরের তলায় ডুবে গেল ।
আটলান্টিস হান্টাররা স্বেচ্ছায় দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে । একদল খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই হারানো সভ্যতার চিহ্ন । ধ্বংসাবশেষ ।
আরেকদল খুঁজছে বেঁচে যাওয়া আটলান্টিসের মানুষজন কোথায় কোথায় তাদের চিহ্ন রেখে গেছে ।
আমরা যাতে জানতে পারি ওদের ব্যাপারে ।
এত বিশাল কাহিনি শুরু হয়েছিল প্লেটোর বিখ্যাত সেই সংলাপ Timaeus এবং Critias থেকে ।
এই দুই বর্ণনা থেকেই মনের চোখে ম্যাপ বানিয়ে পরের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম খুঁজে চলেছে আটলান্টিস ।
প্লেটোর বর্ণনার সবচেয়ে বড় খুঁত, উনি নিদিষ্ট করে বলেননি কোথায় এই স্বর্গভূমি ।
যে দুই পিলারের কথা বলেছিলেন তার সাথে দুনিয়ার ম্যাপের হাজার জায়গার মিল চোখে পড়ে ।
জিব্রালটা প্রণালীর প্রবেশ পথ , ক্যানারি আর অ্যাজর দ্বীপ , অ্যানটারটিকা , চিন সাগরের কিছু দ্বীপ , আয়ারল্যান্ড , স্পেন , আমেরিকা , আন্দিজ পর্বত , অমন ডজন খানেক জায়গার সাথে প্লেটোর বর্ণনার আটলান্টিসের মিল পাওয়া যায় অদ্ভুত ভাবে ।
কিন্তু উনার বর্ণনা বড্ড বেশি নিখুঁত । শহরের বাড়িঘর । নৌযান , বন্দর । চারিদিকে বৃত্তাকার জলাভুমি । চক্রের ঠিক মাঝখানে গোলাকার ভূমি । সেখানে রাজপ্রাসাদ ।
এত কিছুর পরও কিছুই খুঁজে পাইনি আমরা ।
সাগর তলায় সভ্যতা ডুবে যাওয়া নতুন কোন কাহিনি নয় । মহাভারতের 'দ্বারকা ' আমাদের সবার কাছে একটা চেনা কাহিনি । ' টেকনোলজি অভ দ্যা গড ' বইয়ের লেখক ডেভিড চাইল্ড্রেস - এর মতে মেডিটেরিয়ান সাগরের তলায় দুইশোর বেশি ডুবন্ত নগর আবিস্কৃত হয়েছে ।
কল্পনা করতে পারেন ? দুইশোর বেশি !
বন্যা , প্রাকৃতিক দুর্যোগ , ভূমিকম্পে হারিয়ে গেছে ওরা । কেমন ছিল সেই শহরের বাসিন্দারা ? কেমন ভাষা ? কি খেত ? কেমন চিন্তা ভাবনা করতো ? ভালবাসত ? মাতাল হত প্রিয়তমার হাতের মদিরা গিলে ?
বাচ্চারা খেলত খেলার মাঠে ? ইস্কুলে যেত ?
আহা !
সেইসব নগরীর নির্মাণ শৈলী দেখে অবাক হয়ে যাই । পাথরের ব্লকের রাস্তা । নিখুঁত ধূসর দেয়াল ।
তো , আটলান্টিস । হাজার বছরের সভ্যতা হারিয়ে গেল মাত্র এক রাতেই ?
দুই একজন কি বেঁচে ছিল না ?
বিজ্ঞানীরা তেমনটা মনে করেন ।
সবাই মারা যায়নি সেই বিপর্যয়ে । ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা দুনিয়ায় । মিসরে । ইস্টার দ্বীপে । ভারতবর্ষে , এমন কি দক্ষিণ আমেরিকায় ।
আগেই বলেছি , বিশ্বাসীরা এও বিশ্বাস করে আটলান্টিসের বাসিন্দারা একদম হারিয়ে যায়নি । সেই প্রলয়ের পরও বেঁচে ছিল । ছড়িয়ে গিয়েছিল দুনিয়ার সব প্রান্তে ।
নানান আদিবাসি গোত্র তাদের দেখা পেয়ে দেবতা ভেবে নিয়েছিল ।
সেই সময় দুনিয়ার সব জায়গায় গড়ে উঠেছিল মহান সব নতুন সভ্যতা। আরেক জায়গায় মায়ানরা বানিয়ে ফেলল তাদের বিশাল মন্দির । ধু ধু বালির মধ্যে পিরামিড ।
আচমকা কোত্থেকে হাজির হল এই মিসরীয় লোকজন ? বানিয়ে ফেলল পিরামিডের মত বিস্ময়কর দালান । কোথায় পেল তারা নিখুঁত জ্যামিতিক জ্ঞান । পাথরের ব্লক বানানো শিখল কি ভাবে ?
কাঠের রোলায় গড়িয়ে কপিকল দিয়ে তুলে কিভাবে বানাল পেল্লাই এক একটা পিরামিড ?
পিরামিডের গায়ে লেখা আছে অতীতের কোন এক ঐশ্বর্যশালী রাজ্য ডুবে গেছে কোন এক ঝড়ের রাতে ।
মায়ানদের কিংবদন্তী বলে ওদের পূর্বপুরুষরা পূর্ব সমুদ্রের এক বিশাল দেশ থেকে এসেছিল। যেটা কিনা মহাপ্লাবনে সমুদ্রের বুকে হারিয়ে গেছে। সেই দেশের নাম ছিল -
আযটালান।
শব্দটা কেমন যেন আটলান্টিসের কথা মনে করিয়ে দেয় না ?
তো বিশ্বাসীরা অমন বলেন , সেই আটলান্টিসের বাসিন্দারা তখনই অদ্ভুত সব ক্ষমতার অধিকারি হয়ে গিয়েছিল । বড় বড় পাথরের ব্লক শূন্যে উড়িয়ে আনতে পারতো । পারতো জিনেটিক মোটিফিকেশন এবং নিজেদের ক্লোনিঙ করাও ।
প্রকৃতি নিয়ন্ত্রন সহ আরও সহ আজব বিদ্যা ।
পরবর্তীতে সেইসব জাদুবিদ্যা হিসাবে চেনা শুরু করেছি আমরা ।
সেই মায়ান আর মিসরীয়রা ছিল আটলান্টিসের বাসিন্দা । গড়ে তুলেছিল মায়ান মন্দির সহ পিরামিড । সূর্যের উপাসনা করতো ।
মনের শক্তি নিয়ন্ত্রন করে পাথরের ব্লক উড়িয়ে আনতো । প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ পোনাপেতে বানিয়েছিল মস্ত পাথরের দুর্গ । অমন পাথর সেই দ্বীপে আগে বা পরে কক্ষনই পাওয়া যেত না ।
বানিয়েছিল পাঁচ হাজার বছর চলে অমন ক্যালেন্ডার । নিজেদের মধ্যে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে যোগাযোগ করতো ।
কালক্রমে সবাই হারিয়ে গেছে ।
আজও আধুনিক মানুষের ভিড়ে রয়ে গেছে আটলান্টিসের বাসিন্দাদের বংশধর । এদের কারও কারও মধ্যে অতীতের গুণাবলীর কিছু কিছু রয়ে গেছে । সেই সব অলৌকিক গুণ , জাদু বা অতিইন্দ্রিয় ক্ষমতার কথা আমরা জানি না। খবরও রাখি না।
তবে ওদের অনেকের কোন ক্ষমতাই নেই ।
শুধু ভর বর্ষার দিনে , যখন গহন কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে যায় । টিপটিপ বৃষ্টি পরে তখন অকারণেই ওদের মন খারাপ হয়ে যায় । ফেলে আসা দিনের কথা বারে বারে মনে পড়ে ওদের ।
ঝড়ের রাত আর ব্জ্র্যপাত ভয় পায় ।
অমন এক রাতে সব হারিয়ে গিয়েছিল যে তাই ।
মিলিয়ে দেখুন ...।
আপনি ওদের একজন না তো ?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন