আমাদের এলাকাটা ছিল পুকুরে ভর্তি ।
প্রতিটা মহল্লায় ওরা আছে । সুন্দর মত একটা করে ।
হাজা মজা না। টলটলে কালো জল ভর্তি। দুই পাশে লম্বা লম্বা নেপিয়ারের ঘাস ভর্তি। ঢোল কলমির দঙ্গল।
বিদেশ হলে লেক বলতো ওরা।
একটা ছোট পুকুর যে কত বিচিত্র হতে পারে তোমরা অনেকেই জানো না।
কত ঝিম ধরা দুপুরে পুকুরের পাড়ের নরম ঘাসের উপর বসে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছি । পুকুরের মধ্যে ছিল আরেক জগত।
এক গাদা জীবজন্তু, জলজ লতা গুল্ম আর পোকা মাকড় মিলে নিজেদের একটা পরিবার বানিয়ে নিয়েছিল। একে অপরের উপর নির্ভরশীল। সবাই মিলে এক অদ্ভুত পরিবার।
পুকুরের ১০ থেকে ১৫ ফুটের মধ্যে সূর্যের আলো যায়। ওখানে বিচিত্র রকমের জলজ ঘাস জন্মে।
তুমি যদি পুকুর পাড়ে বসো, প্রথম কিছুক্ষণ ওখানের বিচিত্র জগতটা বুঝতেই পারবে না।
খানিক সময় দাও। অপেক্ষা করতে হবে।
চোখে পড়বে কিছু রঙিন ফড়িং। লাল টুকটুকে। ওরা উড়ে উড়ে কচুরি পানা বা জল কলমির ঢগায় বসার চেষ্টা করছে বারবার।ঘাস ফড়িং দারুন লাগে আমার কাছে। নীল, সবুজ, লাল আর হলুদ।
কত সুন্দর সুন্দর রঙের যে হয় ওরা। বলার মত না। ঘাস ফড়িং হচ্ছে পৃথিবীর সেরা রঙচঙ্গা পতঙ্গের মধ্যে একটা। আধা ইঞ্চি হতে পাঁচ ইঞ্চির মত বড় হয় ওরা।
সারা পৃথিবীতেই ওদের পাওয়া যায় তবে গরমের দেশগুলোতে থাকতে পছন্দ করে। আর জলের কাছাকাছি থাকতে ভালবাসে।
ফড়িং আমাদের উপকার করে । ওরা মশার ডিম খেয়ে ফেলে।
খুব বেচারাম এই ঘাস ফড়িং। আমাদের কামড় দেয় না বা হুল ফুটায় না।
বিজ্ঞানীদের মতে ঘাস ফড়িং ৩০০ মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে আছে।
বাপরে।
সারা পৃথিবীতে প্রায় ৫ হাজার বিভিন্ন ধরনের ঘাস ফড়িং পাওয়া যায়।ওরা আপাতত অলস ভাবে উড়লেও ঘণ্টায় ৩০ মাইল বেগে উড়তে পারে।
করলার দানার মত একটা পোকা পাবে। ওদের বলে ডাফনিয়া (Daphnia) । ওরা সবুজ শ্যাওলা খেয়ে বেঁচে থাকে। মাছেরা খায় ওদের। অ্যাকুরিয়ামের মাছের খাবার হিসাবেও বিক্রি হয় বাজারে।যদি খেয়াল কর তবে দেখবে অদ্ভুত এক ধরনের মাকড়সা হিলহিল করে হেঁটে বেড়াচ্ছে পুকুরের জলে। ঠিক যেন কাঁচের উপর দিয়ে হাঁটছে।
ওদের জল মাকড়সা বলে। ডুব দিয়ে জলজ ঘাসের সাথে সেঁটে থাকতে পারে। আর বাতাসের বুব্বুদ বানিয়ে ওটার ভেতরে থাকে ।
পিচ্চি পিচ্চি এক ধরনের শামুক পাবে। ওদের অবশ্য গেঁড়ি বলে।
ওরা ও দল বেঁধে থাকতে পারে। ঘাসের সাথে বা ঘাটের সিঁড়ির সাথে নিজেরদের আঁটকে রাখে। ঘাস লতা পাতা খায়। মাছেরা ওদের খায়। এবার পুকুরে হাঁস যদি সাঁতার কাটতে নামে তবে হাঁসদের জন্য ঈদের আনন্দ হয়ে যায়।
লুটে পুটে খায় ওরা।
পুকুরের এই পিচ্চি শামুক দেখে তোমরা ভাবতেই পারবে না শামুক কত পদের আর পেল্লাই সাইজের হতে পারে। ১২ ইঞ্চি লম্বা আর দুই পাউনড ওজনের হয় আফ্রিকান শামুক।
শামুক ধীরে ধীরে হাঁটলেও ওর পিছন পিছন আঠার মত জিনিস রেখে যায়।
আর এই আঠা ভীষণ শক্ত। দেখবে ওরা উল্টো হয়ে ঝুলেও হাঁটতে পারে।
ওহ ভাল কথা শামুক কিন্তু কানে শুনতে পারে না । ওদের অবশ্য কান নেই। অ্যানটিনার মত দুটো শিং আছে। তাই দিয়েই ওরা চোখের কাজ চালায়।
বেচারা শামুক।
ওরা রোদ পছন্দ করে না। দিনের বেলায় নড়াচড়া করতে চায় না।
রাত হলেই তস্করের মত হাঁটা হাঁটি শুরু করে। আর মেঘলা দিন ওদের দারুন পছন্দ । দেখবে মেঘলা দিনে ওরা কোত্থেকে যেন তোমাদের উঠানে চলে আসবে। শামুক গরিব হতে পারে কিন্তু দুর্বল না।
সারা দুনিয়ায় মোট ২ লক্ষ ধরনের শামুক আছে।আর মধ্যে ৫০ হাজার শামুকের নাম ধাম আমরা জানি।
সাংঘাতিক ব্যাপার না ?
পুকুরেও পিচ্চি পিচ্চি ঝিনুক থাকতে পারে। অসম্ভব না। এক দম ছোট। কিন্তু থাকে। থাকে বিচ্ছিরি দেখতে জোঁক।
নানা ধরনের মাছ থাকবে। খলসে মাছ থেকে পুঁটি, টাকি , মাগুর, শিং। পুকুরের কিছু মাছই আছে। আমি ফলুই আর বাঁশপাতা মাছও দেখছি।ছোট ছোট চিংড়ির অভাব নেই।
কাঁকরা ও থাকে শ্যাওলার তলায়। সতর্ক ভাবে বেড়িয়ে আসে , যখন একটু চুপ চাপ থাকে পুকুরের পরিবেশ।
আর থাকে এক গাদা ব্যাঙ। বেঙাচি ও পাবে। ওরা ঝাঁক বেঁধে থাকে।
ওরা সবাই মিলিয়ে একটা জগৎ। এক সাথে থাকে। একে অপরের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।
বিজ্ঞানীরা যাকে বলে পণ্ড ইকোসিস্টেম (pond ecosystem) বা পুকুরের বাস্তুতন্ত্র।
এই জিনিসটা শুরু হয় সূর্যের আলো থেকে।
সূর্যের আলোতে পুকুরের শ্যাওলা গুলো বেঁচে থাকে। সেই সাথে বেঁচে থাকে প্লাকটন ।
এই শ্যাওলা আর প্লাকটন হচ্ছে উৎপাদক। ওরা কাউকে খায় না। শুধু আলো খায় । এই জন্য ওদের উৎপাদক বলে।
ওদের খায়, ক্ষুদে মাছ, পোকা , মশার লার্ভা আর শামুক।পুকুরের বেশির ভাগ বাসিন্দা শ্যাওলা খায়। এদের বলা হয় প্রাথমিক খাদক বা ভোক্তা ।
ছোট মাছ, কিছু জলজ পোকামাকড়, চিংড়ি, ব্যাঙ ইত্যাদি হল সেকেন্ডারি ভোক্তা। এরা ও নিজেদের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না বা শেওলা আর প্লাকটন খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। এই জন্য প্রাথমিক ভোক্তা খেয়ে বেঁচে থাকে।
তারপরও পিচ্চি মাছ আর ব্যাঙের বাচ্চাদের খায় বড় মাছেরা। শামুক আর ঝিনুকদের খায় হাঁস আর মাছরাঙা পাখী।
টারশিয়ারি খাদক বা ভোক্তা বলে এদের । এরা তিন নাম্বার । খিদে পেলে ঘুরে ঘুরে খায় ।
এটা নিয়ম। প্রকৃতি এই নিয়ম বানিয়েছে। কষ্ট পাবার কিছু নেই।
বড় একটা এলাকাতে ছোট একটা পুকুর থাকলেও পরিবেশটা সুন্দর হয়ে যায়।
প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে বেড়ে উঠতে পারে।
আজ কাল আর তেমন পুকুর নেই। সব ভর্তি করে বাড়ি ঘর বানানো হচ্ছে। এটার বাজে প্রতিক্রিয়া পড়ছে আমাদের উপরেই।
তারপরও আমার সেই পুকুরটা আছে।
অলস দুপুরে আজও সেই পুকুরের পাড়ে বসি আমি। ফিরে যাই পিচ্চি বেলায়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন