----------------
দূর দূর সাগর থেকে ফিরে আসতো নাবিকেরা।
সরাইখানায় বসে মদ গিলতে গিলতে অদ্ভুত সব গল্প বলতো। নাবিকদের গল্প সবাই পছন্দ করতো। অমন বিচিত্র গল্প আর কারা বলতে পারে ?
কত দেশ, বন্দর আর সাগর দেখেছে তারা। আর দেখেছে দানব। হ্যাঁ, নাবিকদের গল্পের ভাণ্ডার ভর্তি ছিল জল দানবের গল্প। বিদঘুটে সব বর্ণনা। শুনলেই শরীর হিম হয়ে যায়।
তো , সত্যিই কি ছিল তেমন কোন জলের দানো ? যাদের গল্প হাজার বছর ধরে শুনে আসছি আমরা ?
সাগর দানবদের গল্প শুরু হল কি ভাবে ?
উম, বলা মুশকিল।
তবে মানুষ যখন পালতোলা জাহাজে করে দূর সাগরে যাত্রা শুরু করে তখন থেকেই সাগর দানোর গল্প চালু হয়ে যায় মুখে মুখে। এমন কি ১৫৩৯ সালে সুন্দর ছবিওয়ালা একটা ম্যাপ ছাপা হয়েছিল। সাগরের কোন জায়গায় কোন ধরণের দানব আছে সেই সবের বর্ণনা আর কিম্ভুত সব ছবি সহ। ম্যাপটা সাদা কালো ছাপা হয়েছিল।
সন্দেহ নেই লোকজন বেশ আগ্রহ নিয়েই সংগ্রহ করেছিল ম্যাপটা। সারাদিন ঘরে বসে সেই ম্যাপ দেখত আর খুশি খুশি গলায় বলতো- ভাগ্য ভাল রে আমি সমুদ্রে যাইনি।
বেশির ভাগ সাগর দানবদের বর্ণনা ছিল , ড্রাগন বা বড় সাগরের সাপ। অনেকগুলো মাথা আছে। আট দশটা হাত আছে। হেন তেন।
ধরে নেয়া যায় সবই গুল তাপ্পি।
তারপরও অনেকগুলো ঘটনা ঐতিহাসিক ভাবে লিখিত আছে । নানান জায়গায়। নানান সময়ে। বেশ কিছু সাক্ষী প্রমাণ ও রয়ে গেছে। তবে বিজ্ঞানীদের মতে বেশির ভাগ আক্রমণের ঘটনার জন্য দায়ী দানব আকারের স্কুইড। জায়ান্ট স্কুইড বলে যাকে। এমনিতে স্কুইড বেশ নিরীহ প্রাণী। কিন্তু জায়ান্ট স্কুইড আক্রমণ করতে পছন্দ করে। মাংসাশী.। সারাক্ষণ খিদে থাকে ওদের। লম্বায় ৩৩ ফিট হয়। ওজনে ৪৪০ পাউনড।
পৃথিবীর সব দেশেই রয়েছে সাগর তলার দানবের গল্প।
অনেক বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন অতল সাগরের মধ্যে কিম্ভুত কিছু প্রাণী আছে যারা এই পৃথিবীর না ? এসেছে বাইরের মহাকাশ থেকে । ভিনগ্রহের জলদানব ওরা।
আগস্টের ১৯। ২০১৪।
রাশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের বিজ্ঞানীরা রুটিন চেক হিসাবে স্পেস স্টেশনের কাচের জানালা পরিষ্কার করতে গিয়ে অদ্ভুত একটা জিনিস আবিষ্কার করেন। যা ওখানে থাকার কথা না।
জানালার বাইরে সেঁটে রয়েছে কয়েকটা সামুদ্রিক প্ল্যাঙ্কটন । ব্যাপারটা অদ্ভুত হলেও বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা দিলেন- পৃথিবী থেকে রকেট যাত্রা করার সময় সমুদ্রের পানির সাথে সেই প্ল্যাঙ্কটন স্পেস স্টেশন পযন্ত চলে গেছে।
হতে পারে। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে যখন স্পেস স্টেশনের জানালা পরিষ্কার করা হয়েছিল তখনও এমন কোন কিছু দেখা যায়নি। এবং লম্বা একটা সময় স্পেস স্টেশনে পৃথিবী থেকে কোন নভোচারী যায়নি। পৃথিবী থেকে সেই প্ল্যাঙ্কটনগুলো গেছে এমন সম্ভবনা ও খুব কম।
এস্ত্রোবায়োলজি - একটা বিষয় আছে। যারা মহাবিশ্বের উৎপত্তি, বিবর্তন, বন্টন এবং জীবনের ভবিষ্যত নিয়ে গবেষণা করেন। যারা বিশ্বাস করেন , পৃথিবীতে প্রথম প্রাণ এসেছিল মহাবিশ্বের অন্য কোন জায়গা থেকে। ধুমকেতু বা উল্কাপিণ্ডের সাহায়্যে। এবং শুনতে যতই অদ্ভুত মনে হোক না কেন, আজও মহাশূন্য থেকে অচেনা , অপরিচিত সব প্রাণের বীজ পৃথিবীতে আসছে। প্রতিদিন।
পল ডেভিসের মত বিজ্ঞানী বলেন- পৃথিবীতে জীবন কি ভাবে শুরু হয়েছিল সেই ব্যাপারে আমরা অবশ্য আজও নিশ্চিত না ।
পৃথিবীর সমস্ত রাসায়নিক পদার্থ মিলে মিশে এখানেই আদিম প্রান তৈরি হয়েছিল ? না পৃথিবীর বাইরে থেকে এসেছিল ?
বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারে একমত হতে না পারলেও এটা প্রমাণিত - সামুদ্রিক প্ল্যাঙ্কটন মহাশূন্যেও বেঁচে থাকতে পারে !
বায়োলজির অধ্যাপক ক্রিস্টেন ফিসার বলেন- ‘ মহাশূন্যে প্রান টিকে থাকা খুবই কঠিন। বাতাস নেই। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা । সূর্য থেকে প্রতি মুহূর্তেই নানান ক্ষতিকর আলোক রস্মি ছুটে আসছে। সেই অবস্থায় স্পেস স্টেশনের জানালায় সামুদ্রিক প্লাকটন পাওয়া বেশ চমকপ্রদ ঘটনা।’
সাগরের প্লাকটন যদি মহাশূন্যের বৈরী পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে তবে প্রশ্নটা উল্টা ভাবে করা যায়- মহাকাশের কোন প্রাণী কি ঘাপটি মেরে আছে গহীন সাগরের তলায় ? একেবারে অসম্ভব ধরণের চিন্তা ?
আমরা একটু পিছনে যাই।
পোর্টমাউথ । ইংল্যান্ড। ডিসেম্বর ২১। ১৮৭২।
ব্রিটিশ নেভির জাহাজ এইচ, এম, এস চ্যালেঞ্জার তিন বছরের জন্য সমুদ্রে যাত্রা শুরু করলো।
উদ্দেশ্য সাগরের নতুন সব প্রান আবিষ্কার করা। তখনকার সব মহারথী বিজ্ঞানীরা দাবি করতেন- সাগরের ১৮০০ ফিট নীচে কোন রকম প্রান থাকতেই পারে না। পানির চাপে চ্যাপ্টা হয়ে যাবে।
কিন্তু মার্চ ১৮৭৫ সেই চ্যালেঞ্জার জাহাজের নাবিক আর বিজ্ঞানীরা সবাই একমত হল- আগের ধারনা ভুল। ততদিনে বিচিত্র সব জলজ প্রাণী আবিষ্কার করেছে তারা। ১৮০০ ফিটের নীচের প্রান দিব্যি বেঁচে থাকে। সাগরের যত গভীরে যাওয়া হোক না কেন কেন প্রানী আছেই।
গভীরতার একেক লেভেলে একেক রকম প্রাণী।
বিচিত্র। অদ্ভুত। রোমাঞ্চকর।
গহীন সমুদ্র রহস্যময় প্রাণী দিয়ে গিজগিজ করছে। আমাদের চিন্তা চেতনা বাইরে যে জগৎ রয়েছে সেটাই সাগরের অতল।
এইচ, এম, এস চ্যালেঞ্জারের বিজ্ঞানীরা তিন বছরে মোট ৪৭০০ নতুন ধরণের প্রাণীর খোঁজ পেল। তাদের সংগ্রহ করা তথ্য লিখে রাখতে পঞ্চাশটা নোট বইয়ের ৩০ হাজার পাতার কাগজ লাগল। আক্ষরিক অর্থেই সেই যাত্রা বিজ্ঞানের নতুন মোড় আবিষ্কার হল।
জাহাজে বিজ্ঞানী ছিল মাত্র ৫ জন। সন্দেহ নেই- গাধার মত খাটতে হয়েছিল তাদের।
আমাদের দৈহিক গঠনের দুর্বলতা আছে। আছে সীমাবদ্ধতা । পানির প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে পারে না আমাদের দেহ। গরম বা ঠাণ্ডার হের ফেরে ও কাহিল হয়ে যাই সহজে। এই জন্যই আমরা মনে করি , অমুক পরিবেশে বোধহয় প্রান বেঁচে থাকতে পারে না।
অতল সাগরের প্রাণীদের সেই সবের বালাই নেই। সব কিছু উড়িয়ে দিয়ে দিব্যি বেঁচে থাকে ওরা।
সাগর তলায় এমন পাথরের টুকরো পাওয়া গেছে যা দেখে বুঝা যায় বহু বহু আগে মহাশূন্য থেকে এসে পড়েছিল সেইসব। ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া বিচিত্র সব উল্কার টুকরো ।
বয়স ? কোটি কোটি।
এবং বিশ্বাস করার মত সঙ্গত কারন আছে মরা অণুজীব লেপটে ছিল পাথরের গায়ে । দূর কোন মহকাশ থেকে কি অমন অচেনা প্রান এসেছিল আমাদের সাগরে ? ওরা বেঁচে আছে ? সাগরের একদম গহীনে যেখানে মানুষ পৌছতে পারেনি ওখানে থাকতে পারে অমন কিছু ?
‘ ভিন গ্রহ থেকে পৃথিবীতে মানুষ এসেছিল ’ অমন থিউরি যারা বিশ্বাস করে তারা বলে - হ্যাঁ সম্ভব।
ইদানিং এমন সব সামুদ্রিক প্রাণীর খোঁজ আমরা পাচ্ছি যাদের সাথে পৃথিবীর অন্য কোন প্রাণীর বায়োলজিক্যাল কোন মিল নেই।
মার্চ ২০০৫ ।
ইস্টার দ্বীপের উপকুলের কাছাকাছি বিজ্ঞানীরা অদ্ভুত রকমের কাঁকড়ার খোঁজ পেয়েছেন। নাম রেখেছেন - ইয়েতি ক্রাব। সাদা পিচ্চি এক ধরণের কাঁকড়া। পা গুলো হলুদ রঙের লোম দিয়ে ভর্তি। এই জন্যই ইয়েতি নাম রখা হয়েছে। হিমালয়ের ইয়েতিদের নামে। সাগরতলায় ডুবন্ত আগ্নেয়গিরির ফুটন্ত পানির মধ্যে ওরা সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকে। সিদ্ধ হয় না !
পানি শুধু ফুটন্ত না। বিষাক্ত ও।
ইয়েতি ক্রাব একটা মাত্র উদাহরণ। গহীন সাগরের তলায় অমন অনেক বিচিত্র প্রাণী টিকে আছে। নানান চেহারা নিয়ে।
আরেকটা উদাহরন- টিনোফোরা । এক ধরণের জেলিফিস। চিরুনি জেলিফিস ও বলে। একদম স্বচ্ছ। অন্ধকার সাগরের তলায় সাতরঙা বর্ণিল আলো জ্বেলে ঘুরে বেড়ায় ওরা।
মেরিন বায়োলিস্টরা ২০০৭ সালে পরীক্ষা করে দেখলেন টিনোফোরা জেলিফিসের নার্ভাস সিস্টেম একদম আলাদা। পৃথিবীর কোন প্রাণীর সাথেই মিল নেই। কোন দিক দিয়েই।
সম্পূর্ণ আলাদা জীবন যাপন।
ওদের শরীরে দুইটি নিউরোসিস্টেম আছে। আর সব জীবের একটা। টিনোফোরার শরীর নষ্ট হয়ে গেলেও আবার তৈরি হয়। ওর মগজ ধ্বংস হয়ে গেলেও আবার নতুন করে তৈরি করতে পারে। মানে বোঝতে পেরেছেন ? প্রায় অমর ওরা !
বিজ্ঞানীরা একটা টিনোফোরার মগজ বের করে পানিতে ছেড়ে দিলেন। দুইদিন বেঁচে রইল ওটা। দুইদিন পর আবার মগজ বের করে শরীরটা ফ্রিজে রেখে দিলেন। ফ্রিজ থেকে বের করার পর জ্যান্ত হয়ে উঠলো ওটা। নতুন মগজ হয়ে গেছে আবার ! শরীরে কাটা ছেঁড়ার কোন চিহ্ন নেই। মহাসাগরের ভিনগ্রহী প্রান যেন ।
প্রতিবছর নতুন নতুন সব সাগরের প্রাণী আবিষ্কার হচ্ছে। বিচিত্র তাদের চরিত্র। ওরা কি আসলেও এই পৃথিবীর প্রাণী ?
না বাইরে থেকে চলে এসেছে ? ওরাই কি জন্ম দিয়েছে সাগরের দানোর গল্প ?
মিয়াজাকি প্রিফেকচার।
জাপানের এক গ্রাম।
একটা দোকানে জনগণের জন্য কাচের শো কেসে অদ্ভুত কিছু জিনিস সাজানো আছে।
২০১৪ সাল থেকেই এই প্রদর্শনী চলছে। একটা সামুদ্রিক জন্তুর বাম পা আর বাম হাত রাখা আছে কাচের শো- কেসে। জিনিসদুটো ১৮১৮ সালের। স্থানীয় জেলেদের হাতে মারা গিয়েছিল জন্তুটা। জাপানের কিংবদন্তী মতে ওটা সাগরের দানো - কাপার শরীর।
কাপা ( kappa ) । সাগরের দানো।
সাগরের শিশু বলে অনেকে। মাত্র ৫ ফিট লম্বা । ছক কাটা কুমিরের মত গায়ের চামড়া। শরীরের রঙ নীল বা সবুজ। পিঠ হুবহু কচ্ছপের খোলের মত,বা কচ্ছপের পিঠের মত। মাথায় বাটির মত কিছু একটা রয়েছে। কাপা আরেক অর্থে সাগর পিশাচ।
হিংস্র । আক্রমণ করে । অনেকে মনে করে কাপার গল্প চালু হয়েছিল ছোট বাচ্চাদের ভয় দেখানর জন্য। যাতে পানি থেকে দুরে থাকে বাচ্চারা।
আজকাল দিনের জাপানের শহরগুলোতে কাপার নাম শোনা যায় না। কেউ জানেও না।
কিন্তু নিঝুম গ্রামগুলোতে সাগরের বা দিঘির ধারে আজও সাইনবোর্ড পাওয়া যায়- ‘ কাপা হইতে সাবধান।’
কিছু বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন- কাপা কোন বানানো গল্প কাহিনি না। অতীতে অমন কোন জলদানব ছিল। এবং সেই কাপার হাড় পরীক্ষা করেছেন। আসল জিনিস। কিন্তু পৃথিবীর কোন প্রাণীর সাথে জেনেটিক কোন মিল নেই।
খেয়াল করে দেখবেন সমুদ্র, নদী বা জলাভুমি আছে অমন দেশগুলোতে সাগরের দানো, পিশাচ বা মৎস্যকন্যা মার্কা কাহিনি আছেই। সবচেয়ে প্রচলিত হচ্ছে- মৎস্য কন্যা ।
ইরাকের কাছাকাছি যীশুর জন্মের ২৫০০ বছর আগের প্রাচীন সভ্যতা আশেরিয়ান । এক মজার লোক কাহিনি চালু রয়েছে ওদের মধ্যে । অনেক বছর আগে দেবী আতহারগাতিস জলাভূমিতে নেমে এসেছিল। উনার শরীর অর্ধেক মাছ মানবী রূপে।
গ্রিকদের পৌরাণিক কাহিনিতেও প্রায় একই কাহিনি আছে।
অনেক অনেক লোক কাহিনিতে এমন মৎস্য কন্যা বা মৎস্য মানবের গল্প পাবেন। যারা বাইরে থেকে এসেছিল।
গ্রিক দার্শনিক অ্যানিসিমানডার বলেছিলেন এমন এক প্রজাতির কথা যার পানির তলায় বসবাস করে।সাগরদানো বা কিম্ভুত আকৃতির সাগরের প্রাণী নতুন কিছু নয়।
প্রাচীন কাল থেকেই ছিল ওরা। আমাদের সাগরে।
পশ্চিম আফ্রিকার ডোগন জাতি প্রাচীন এক আত্মার পূজা করে। আত্মার নাম - নমো ( Nommo) । আকাশের দেবতা আমা (Amma) এই নমকে সৃষ্টি করেছিলেন। নম দেখতে মাছের মত।
সুদুর আকাশের তারা থেকে নম পৃথিবীতে এসেছিল ডোগনদের শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত করার জন্য।
উপকথায় আছে- একটা অদ্ভুত আগুনের বাহনে করে পৃথিবীতে এসেছিল নম । প্রচণ্ড শব্দ হত সেই বাহনের। নীচে নামলে ভূমি কাঁপতে থাকতো। সারা দুনিয়ার জ্ঞান ছিল নমর কাছে, সব জানত সে। ডোগনরা নমকে বলতো- শিক্ষক। মহাকাশের প্রহরী।
মহাকাশ আর নক্ষত্র নিয়ে ডোগনদের জ্ঞান ছিল অসম্ভব ধরণের উন্নত। আকাশের লুব্বক নক্ষত্রের অবস্থান সেই আদিম কালেই ডোগনরা জানত।সেটা আমরা মাত্র কিছুদিন আগে আবিষ্কার করেছি।
ডোগনদের মতে কালপুরুষের কোমরের বেল্টের ওখানে আছে আরেক তারা। পানিতে ভর্তি। সেই তারার দেশ থেকে এসেছে নম। ওখানের সবাই দেখতে অর্ধেক মাছ। অর্ধেক মানুষ।
লেক শেম্পলেন ।
উত্তর আমেরিকার বড় একটা লেক ।
৫ জুলাই । ১৯৭৭।
সান্দ্রা এবং অ্যান্টনি তাদের দুই বাচ্চা নিয়ে লং ড্রাইভে যাচ্ছিলেন। ঠিক করলেন , লেকের পারে খানিক সময় কাটাবেন তারা। নামলেন।সাঁতার কাটলেন। তখনই চোখে পড়লো জিনিসটা।
পানির সারফেস ঠেলে উপর দিকে উঠে আসছে কি যেন একটা। দ্রুত ছবি তুলে নিলেন সান্দ্রা। বিজ্ঞানীদের হাতে চলে গেল ছবিটা। ছবি আসল। প্রমাণ হয়- লেক শেম্পলেনর গহীনে আছে অজানা জলজ প্রাণী। দেখতে হুবহু লকনেস দানবের মত।
১৬০৯ সালে ফ্রান্সের অভিযাত্রী স্যামুয়েল ডি শেম্পলেন এই লেকটা আবিষ্কার করেছিলেন। সেই সময় তিনি দাবি করেছিলেন লেকের মধ্যে দানব আকৃতি কি এক জলজ প্রাণী দেখেছিলেন তিনি।
সেই থেকে আজ পর্যন্ত মোট তিনশোর বেশি রিপোর্ট পাওয়া গেছে। আমেরিকা আদিম আদিবাসিরাও লেকের জলদানবের ব্যাপারে জানতো। দানবের নাম দিয়েছিল - টাটসকোক ।
গল্প কাহিনি আর প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে- দানবটা ২০ ফিট লম্বা। পাইপের মত শরীর। মাথাটা ঘোড়ার মত।
সর্বশেষ রিপোর্ট পাওয়া গেছে ২০০৫ সালের গরমের মৌসুমে।
ডিকডিক অ্যাফলেট এবং তার সৎ ছেলে পিট বডেড মাছ ধরতে গিয়েছিল। খুব কাছ থেকে ছবি তুলেছে তারা। প্রমাণ হয়, লেক শেম্পলেন জলদানবের বাসা। তিনশো বছরের বেশি সময় ধরে বেঁচে আছে দানবটা। বা তার ছানাপোনারা।
প্রায় হুবহু একই রকমের জল দানবের খোঁজ পাওয়া যায় ক্যানাডায়। নাম- ওগোপোগো (Ogopogo ) । এর বাসা হচ্ছে অকানাগন লেক। আরেক দানব ক্রাসি। ক্রিসেন্ট লেকে এর বাসা। । জাপানি জলদানব ইসি ( issie ) । আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে - মকালী মেবেম্বে।
এবং স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত লকনেস দানব।
সবগুলো দানবের বর্ণনা হুবহু এক। পরিষ্কার বুঝা যায় একই রকম প্রানি,বা একই গোত্রের। প্রজাতির।
একই গল্প সারা দুনিয়ায় ছড়াতে পারে না যদি সেই রকম কিছু বাস্তবে না থাকে। প্রশ্ন একটাই - ওরা আসলে কি ?
সম্পূর্ণ অচেনা বিশালাকার এক ধরণের প্রাণী হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে আমাদের জলাভূমিতে । কোন এক জলের সুড়ঙ্গে চলাচল করছে ? নাকি বহু দূরের কোন মহাকাশ থেকে নক্ষত্র দরজা দিয়ে চলে আসে আমাদের গ্রহে ?
সময় এবং দূরত্ব কোন বাঁধাই না ।
স্ক্যাণ্ডিনেভিয়ার লোক কাহিনির দানব - ক্রাকেন (kraken) ।
গ্রিনল্যান্ড আর নরওয়ের পুরানো দিনের নাবিকদের মুখে মুখে শোনা যেত এর কথা। যার বর্ণনার সাথে দানব স্কুইডের কিছু মিল আছে।
১৭৫২ সালে ক্রাকেনের প্রথম লিখিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এরিন পন্টোপ্পিডন নামের এক ডেনিশ যাজকের লেখায়। বইটার নাম- ন্যাচারাল হিস্ট্রি অভ নরওয়ে। ৪০ থেকে ৫০ ফিট লম্বা ছিল ক্রাকেনের এক একটা হাত। হাতের সংখ্যা অসংখ্য।
দ্বীপের সমান বড় হত ওর শরীর। রাতের বেলা জাহাজ থেকে নাবিক এর খালাসীদের ধরে নিয়ে যেত। ফিরে আসতো পরের রাতে।
অসংখ্য ক্লাসিক লেখকের বর্ণনায় ঘুরে ফিরে ক্রাকেনের কথা এসেছে। মনে হয় সত্যি অমন কিছু ছিল। সর্বনাশা খিদে নিয়ে সাগরে ঘুরে বেড়াত ধূর্ত এক প্রাণী।
প্রাচীন মহাকাশচারী তত্ত্ব (Ancient Astronaut Theory) যারা বিশ্বাস করেন তারা মনে করেন - ওরা অন্য কোথাও থেকে ভুলে চলে আসে আমাদের সাগরে।
প্যারালাল জগৎ থেকে। সময়ের সুড়ঙ্গ দিয়ে।
অথবা গহীন সাগর তলায় এই ভিনগ্রহী দানবগুলো আজও টিকে আছে। ইয়েতি কাঁকড়া আর চিরুনি জেলিফিসের মত ! যারা আমাদের চেয়ে ধূর্ত এবং বিপদজনক। আমাদের মহাসাগরের পানি কি কোন রকম পোর্টহোল তৈরি করে ? যা দিয়ে এই দানবগুলো ভিন্ন জগৎ থেকে অনায়াসে চলে আসে ?
মায়ানদের উপকথায় যেমন আছে- পানির তলায় সুড়ঙ্গ দিয়ে অন্য জগতে যাওয়া আসা করা যায়!
টুলুম ( Tulum) । মেক্সিকোর উপকূলীয় শহর।
মায়াদের শেষ শহর এখানেই বানিয়েছিল ওরা। পাহাড়ের খাদের শেষ মাথায় ছোট্ট একটা দালানবাড়ি।
মন্দির ওটা। ডুবন দেবতার মন্দির।
এই দেবতা সোজা আকাশ থেকে সমুদ্রে নেমে এসেছিল। আর কোন বিস্তারিত বর্ণনা নেই ডাইভিং গড বা জলসাঁতারু দেবতার ব্যাপারে। ডাইভিং গড এই মন্দির তার বন্দর হিসাবে ব্যবহার করতো। এখান দিয়ে সে চলে যেত ভিন্ন জগতে।
ঠিক যেন অ্যাজটেকদের জলের দেবতা টুলালকের মত। টুলালক নাকি সাগর তলার জলের সুড়ঙ্গ দিয়ে ভিন্ন এক জগত থেকে এসেছিল। দুই জাতির দুই দেবতার মধ্যে কত মিল।
মায়ান শহরের টুলুমের ধ্বংসাবশেষের বাইরে মেক্সিকান জঙ্গলের সীমানায় একটি রহস্যময় ডুবন্ত গুহা আছে।
জায়গাটার নাম আঞ্জেলিটা সিনোট (Angelita Cenote) ।
মায়ানদের ভাষায় সিনোট শব্দের মানে- পবিত্র কুপ বা কুয়া। অপূর্ব সবুজ বনের ভেতরে গেলে আচমকা পথ রোধ করে দাঁড়াবে এই কুয়াটা । ২০০ ফিট গভীর চুনাপাথরের কুয়াটা দেখলেই গা ছমছম করে উঠে। অনেকখানি ধসে গেছে কালের প্রবাহে ।
সুদুর অতীতে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে এই কুপ বা জলাভূমিটা তৈরি হয়েছিল। ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে। যখন ডাইনোসর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত উল্কার আঘাতে তৈরি হবার জন্যই এখানে জমে গিয়েছিল অচেনা কোন ম্যাগনেটিক ফিল্ড। আজও ওখানে রয়ে গেছে অসংখ্য ক্রিস্টাল পাথর। প্রচণ্ড তাপে এবং চাপে তৈরি হয়েছিল স্ফটিক গুলো।
বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন ক্রিস্টাল পাথর পৃথিবীর প্রাকৃতিক কম্পন পরিবর্তন করে ভিন্ন মাত্রার শক্তি তৈরি করতে পারে। অতীতে সেই পাথরগুলো তৈরি করতো অচেনা কোন এনার্জি ?
যার ফলে সহজেই খুলে যেত প্যারালাল দরজা ?
আঞ্জেলিটা সিনোট প্রকৃতির এক রহস্য।
সারফেসের মিষ্টি পানি ১০০ ফিট নীচেই নোনতা পানির সাথে গিয়ে মিশেছে। সমুদ্র থেকে আসছে সেই নোনা পানি। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্যময় আন্ডারওয়াটার রিভার। ডুবো নদী ।
অ্যাজটেকরা বিশ্বাস করতো, এই জায়গা দিয়েই আত্মা ভিন্ন জগৎ থেকে আসা যাওয়া করতো । অ্যাজটেকদের কাছে এটাই ভিন্ন জগতে যাবার দরজা।
উপর থেকে পবিত্র কুপ দেখতে যেমন হোক ১৫ ফিট নীচের পানি স্ফটিকের মত স্বচ্ছ । ১০০ ফিট নীচেই পানি মহাশূন্যের মত কালো কুচকুচে। মনে হয় মহাশূন্যে পৌঁছে গেছে ডুবুরী। এবং ১০০ ফিট নীচেই সব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
অজানা কোন উৎস থেকে আলো এসে পড়েছে। অদ্ভুত এক জগৎ সেখানে । অনেক মরা গাছ পরে আছে। মনে হয় ভিন্ন দুই পৃথিবীর মাঝখানের জায়গা ওটা।
অ্যাজটেকদের ধর্মে হুবহু এমন বর্ণনা দেয়া আছে। যেখান থেকে দেবতা টুলালক এসেছিল।
এমন জায়গাগুলোই কি নক্ষত্রদরজা তৈরি করে ? অ্যাজটেকরা এই কুপের গহীনে এসেছিল ? বর্ণনা দিল কিভাবে ? স্কুবা ড্রাইভিঙের জিনিস ছাড়া গিয়েছিল কি ভাবে ?
তো, জলের নীচের সেই দানবগুলো , যেগুলোর গল্প আমরা শুনে আসছি বছরের পর বছর ধরে , লকনেস মনস্টার , কাপা, ক্রাকেন এরা কি শুধুই গল্প ?
নাকি ভিন্ন গ্রহের কোন অজানা দানব ?
যারা জলের নীচের সুড়ঙ্গ দিয়ে ভিন্ন জগৎ থেকে চলে এসেছিল ? এইভাবেই ভিন্ন ডাইমেনশনাল ভ্রমণ করে ওরা ?
না কি মায়া আর অ্যাজটেকরা গল্প ফেঁদেছে পানির গোল ঘূর্ণিচক্রের ভেতর দিয়ে ভিন্ন জগতের আত্মা আর দেবতা চলে আসে? একই কাহিনি দুই জাতির মধ্যে ঢুকে গেল কিভাবে ?
আঞ্জেলিটা সিনোটের মত এমন আরও জলাভূমি আছে নিশ্চয়ই ? কিংবা নদী, সাগর, পুকুর ? যেখান দিয়ে ভিন গ্রহের বা প্যারালাল জগতের দানব চলে আসে । আজও ।
বিজ্ঞানীরা বলে- খুবই সম্ভব !
আগস্ট ১৩। ২০১৩।
অদ্ভুত একটা জিনিস আবিষ্কার করলেন নাসার বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর চারিদিক দিয়ে সারাক্ষণ একটা রেডিয়েশন বের হচ্ছে। ইলেট্রোম্যাগনেটিক বেল্ট।
নিজের চারিদিকে শব্দের একটা তরঙ্গ ছড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবী। গোল একটা বেল্টের মত সেই তরঙ্গ । টানা দুই বছর নজর রাখার এবং শব্দ তরঙ্গ রেকর্ড করার পর চমকে যাবার মত তথ্য আবিষ্কার করলেন বিজ্ঞানীরা । শব্দটা খুব পরিচিত।
একদম হ্যাম্পব্যাক তিমি মাছের গানের মত !
রেডিয়েশন শব্দ তৈরি করে। প্রতিটা গ্রহ শব্দ তৈরি করে।
মহাকাশের সব কিছুই শব্দ তৈরি করে।
কিন্তু পৃথিবী হুবহু তিমি মাছের গানের মত শব্দ তৈরি করছে ! এটা কি শুধু কাকতালীয় ?
পৃথিবীর ৭০ % পানি। এই বিশাল সাগর মহাসাগরের ১০% আজও আবিষ্কার করতে পারিনি আমরা। মহাশূন্যের চেয়ে অনেক অনেক বেশি রহস্য রয়ে গেছে সাগর তলায় ।
এমন কি হতে পারে না, দূর কোন জলজ গ্রহ যেখানে প্রান আছে ওরা আমাদের পৃথিবীর ইলেট্রোম্যাগনেটিক বেল্টের শব্দ শুনে বুঝতে পারে এখানে পানি আছে ?
জলজ নক্ষত্র সভ্যতাকে আমাদের পৃথিবী সংকেত দিয়ে বলছে- এখানে পানি আছে! চলে এসো !
বিচিত্র এই নক্ষত্র সভ্যতায় অসম্ভব বলে কিছুই নেই।
সবই সম্ভব !

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন