দুই বন্ধুর দেখা । অনেক বছর পর।
' কেমন আছ । অনেক দিন পর তাই না ?' খুশি খুশি গলায় বললেন হেদায়েত উল্লাহ ।
'অনেক দিন বলা ঠিক হবে না । আসলে অনেক বছর পর ।’ পাল্টা হেসে উত্তর দিলেন বন্ধুবর আব্দুল্লাহ এনাম । ' সব ঠিক আছে তো ?'
'না থাকার কোন কারন নেই । তোমার ?'
'আমারও সব ঠিক । যেমন সবার চলছে ।'
‘ এসো । পাশের ক্যাফেতে বসি ।'
'বেশ ।'
অনেক বছর পর, পুরানো বন্ধুর সাথে দেখা হবার অনুভূতি এক মায়াবী অভিজ্ঞতা । যাদের অমন বান্ধব নেই তারা জানে না ।
বড় রাস্তার পাশে পুরানো ধাঁচের একটা দোকান । নীল রঙা সন্ধ্যার অন্ধকারে , গোলাপি নিয়ন সাইনে জ্বলজ্বল করছে দোকানের নাম ।
কাচের দরজা খুলে গেল উনারা সামনে যেতেই।
নরম আলো ভেতরে । মাত্র দুটো খদ্দের একা একা বসে আছে বিচ্ছিন্ন দুই জায়গায় । উনাদের সামনে রুপালি পেয়ালা । গানের বদলে সমুদ্রের গর্জন ভেসে আসছে লুকানো স্পিকারে ।
কাউনটারের বদলে পেল্লাই একটা ভেনডিঙ মেশিন ।
দুই বন্ধু ওটার সামনে দাঁড়ালেন ।
'কি খাবে ভাই ?' জানতে চাইলেন হেদায়েত উল্লাহ ।
‘ যা খুশি । ‘ এনামের জবাব । ‘ চা নাও । লাল চা ।‘
মেশিনের চায়ের বোতামে চাপ দিলেন হেদায়েত উল্লাহ । মেশিন লাল নীল বাতি জ্বেলে জানতে চাইল, চিনি সহ না ছাড়া ? আদার কুঁচি বা অন্য কোন উপাদান লাগবে কি না। হেন তেন ।
সুইচ চেপে সেইসব উত্তর দেয়ার পর ব্যাঙ্ক কার্ড ঢুকিয়ে দাম চুকিয়ে দিলেন হেদায়েত উল্লাহ । মেশিনের এক পাশে কেমন একটা ফোঁকর দিয়ে ট্রেতে করে দুটো সিরামিকের পেয়ালা বের হয়ে এলো । চা ভর্তি ।
'এরা এখনও কাগজের কাপ ব্যবহার করে না ?' অবাক হলেন এনাম ।
'তাই তো দেখছি। পুরানো মালিক বোধ হয় । অথবা মালিক মারা গেছে । যন্ত্র পাতি দোকান চালাচ্ছে ।' একই রকম অবাক হয়ে উত্তর দিলেন হেদায়েত উল্লাহ ।
ব্যাপারটা অসম্ভব কিছু না।
অনেক দোকান বা প্রতিষ্ঠানে অমন হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে । মালিক হাল ছেড়ে দেয় ব্যবসায়। তখন যন্ত্রপাতি ব্যবসা দেখা শোনা করে । নানান রকম আপ্যস আর সফটওয়ার আছে । সমস্যা হয় না। এক জুতার দোকানের মালিক মারা গেছে কুড়ি বছর আগে। দোকান চলছে । ব্যাঙ্কে টাকা জমা হচ্ছে ।
এক সময় সরকার খোঁজ নেয় । চেষ্টা করে যোগ্য উত্তরাধিকার থাকলে টাকা পয়সা তার হাতে তুলে দিতে। অমন কাউকে না পেলে কোন জনসেবামূলক কাজে টাকাটা ঢেলে দেয় ।
জনসেবামূলক মানে , যেমন- সমুদ্র থেকে প্ল্যাসটিকের বোতল তুলে । এত বছর পর আজও পাওয়া যায় বোতল ।
এক কোনে বসলো দুই বন্ধু । বাইরে সন্ধ্যা । অন্ধকার জমেনি । উড়ন্ত ল্যাম্পপোস্ট ঘুরে ঘুরে টহল দিচ্ছে রাতের আকাশে । ওদের উজ্জ্বল চুন শাদা কিন্তু নরম আলোর বীম ছিটকে ছিটকে পড়ছে নানান জায়গায় ।
বেশ ধূলা বাইরে । মানুষ কম । গত কয়েক দশক রাস্তায় মানুষ তেমন দেখা যায় না । কেউ বের হয় না । বাসায় থাকে। জানালা দিয়ে দেখা গেল , মরচে পরা টিনের বালতির মত একটা রোবট, বাজার করে বাসায় ফিরছে ।
‘ তারপর বল কি খবর ?' চিনা মাটির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে জানতে চাইলেন হেদায়েত উল্লাহ ।
'নতুন কিছু না বন্ধু ।' হাসি মুখে জবাব দিলেন এনাম । ' আগের মতই । বৈচিত্র নেই । সারাদিন বাসায় থাকি । পুরানো কাউকে পেলে খুব ভাল লাগে । পাই না তেমন । কোথায় যে সব গেল । শুনেছি আমাদের বন্ধু সিরাজ আত্নহত্যা করেছে । সিরাজকে চিনতে তো ? মোটা মত । সারাক্ষণ ঘামত ।'
'চিনেছি । কবে মরল ?'
'এক সপ্তাহ হবে ।'
মনোযোগ দিয়ে পেয়ালাটা দেখছিলেন হেদায়েত উল্লাহ । সুন্দর নীল রঙের ফুলের নকশা আঁকা । খুব চেনা চেনা ফুল । আগে হয়তো হত অমন ফুল । এখন হয় না। নইলে চেনা লাগবে কেন ?
‘ আমার বাসায় একটা কাণ্ড হয়েছে ।' মুচকি হেসে বললেন তিনি । ‘ তিন দিন আগে সরকারি লোক হাজির । পাতলা কেমন একটা যন্ত্র এনেছে । ফ্রি দিয়ে গেল।'
'কেমন যন্ত্র ?' কৌতূহল দেখালেন এনাম । '
'নাম রেডিও ।' ব্যাখ্যা করলেন তিনি । ' অনেক কাল আগে নাকি খুব ফাটাফাটি জিনিস ছিল । সবার বাসায় থাকতো । প্রথম দিকের সাইজ ছিল ইয়া বড় বড় । পরে ছোট হয়ে জুতার বাক্স আর ইটের মত হয়ে গিয়েছিল ।'
‘ এটা আবার ছোট হল কেমন করে ?' দুই হাত উল্টে বিরক্ত প্রকাশ করলেন এনাম ।
'আরে তখনকার তুলনায় আরকি । প্রথম ব্যাটারিতে চলত। পরে নানান ভার্সন বের হয়েছিল । খুব জনপ্রিয় জিনিস ছিল । ঘরের মা বউদের প্রিয় জিনিস । দুপুরে ভাত খেয়ে আর রাতে পরিবেশটা নিঝুম হলে, গান শুনত । নাটক শুনত। রেডিও নাটক বেশ চনমন করা জিনিস ছিল । অমন কিছু আরকি । প্রাচীন আমলের বিনোদন ।'
‘ তো সরকারি লোক মাগনা রেডিও বিলাচ্ছে যে ?' কারণটা বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে চেয়ে আছেন এনাম ।
'ওই তো । আমাদের বিনোদন দেয়ার জন্য আরকি । সেই হারিয়ে যাওয়া একটা যন্ত্র দিয়ে যাচ্ছে বাছাই করা কিছু মানুষ জনদের । লটারিতে যাদের নাম উঠছে তাদের আরকি ।'
‘ ভাল তো । আমিও পাব নিশ্চয়ই ?'
‘ ওরা তো তাই বলল ।'
‘ কোন বৈশিষ্ট আছে যন্ত্রটার ? নাম শুনেছিলাম ছোট বেলায় । '
'ওরা আমাদের যেটা দিয়েছে ওটার একটা অনুষ্ঠানের নাম হচ্ছে অনুরোধের আসর ।'
‘ মানে কি ?'
‘ তখন নাকি রেডিও ষ্টেশনে অনেকে চিঠি লিখে অনুরোধ করতো অমুক গানটা দয়া করে বাজাবেন ।‘
‘ চিঠি লিখে গান প্লে করার অনুরোধ ? জিনিসটা বেখাপ্পা মনে হচ্ছে না তোমার কাছে ?'
‘ মোটেও না। সময় বলতে একটা জিনিস আছে তো ? তাই না ? কত হাস্যকর জিনিস হত তখন । যেমন রাস্তায় বই বিক্রি হত ? তাও আবার কাগজের ।'
‘ কাগজের বই ? কি বল ?'
‘ তবে আর বলছি কি ।'
চুপ করে রইল দুই বন্ধু।
খানিক পর এনাম বললেন , ' আমিও শুনেছি কাগজের বইয়ের কথা । তুমি গুলশান সিনেমা হলটার নাম শুনেছ ? পুরানো দিনের লোকেরা অনেকে বলে । ওটার বাইরে কোন এক লোক নাকি দাঁড়িয়ে বই বিক্রি করতো । সেটাও ১৯৮৪ সালের কথা। একশো বছর আগে ।
' ভাল কথা মনে করেছ । সিনেমা হলের ব্যাপারটা ও ভেবে দেখ ।' মুচকি হাসলেন হেদায়েত উল্লাহ । ‘ মানুষ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে যেত পর্দায় মুভি দেখতে । লাইন ধরে টিকিট কাটতো । বাইরে না কি বাদাম ভাঁজা চানাচুর বিক্রি হত । খেত আর মুভি দেখত ।'
‘চানাচুর কি ?’
‘ জানি না।‘
‘ সেই মুভি ও নাকি এক কালে আবার শাদা কালো হত ? কি কাণ্ড !’
‘ আসলে কি সব দিন গেছে । ওয়াসিম নামে এক ভদ্রলোক ছিলেন । উনি বেশির ভাগ সময় ঘোড়ায় চলে তলোয়ার চালিয়ে মারামারি করতেন । গায়ে চুমকির পোশাক। গলায় পুঁতির মালা। পুরানো দিন । আহারে ।‘
' এই দোকানের চা তো বেশ । আরেক পেয়ালা চলুক ?’
‘ না করলো কে ? চলুক ।‘
দুই বন্ধু অনেক কথা বলল। হারানো দিনের কথা। পুরানো দিনের কথা। পুরানো মানুষজনদের কথা বলল। শেষে বিদায় নিল ।
বাড়িতে একা থাকেন হেদায়েত উল্লাহ ।
ফেরার পথে পাবলিক স্নানঘর থেকে স্নান করে ফিরলেন । মাসিক কার্ড আছে। সপ্তাহে তিন দিন স্নান করতে পারেন। বাড়িতে জল আসে সপ্তাহে দুইদিন। লিটার হিসাবে মেপে দেয় । চড়া দাম । যাদের নিজস্ব বাড়ি তারা বৃষ্টির জল জমায় ছাদের ট্যাঙ্কিতে । খরচা কিছু কমে।
রাতের খাওয়া শেষ করে নিলেন নয়টার মধ্যে । ছোট ছোট প্যাকেট । এক প্যাকেটেই মোটা ভাত, সবজি , সামান্য ডাল আর সয়াবিনের মাংসের ফালি। মাইক্রোতে গরম করে নিলেই হয় ।
তারপর গিয়ে বসলেন রেডিওর সামনে।
স্বচ্ছ কাচের মত জিনিসটা । ভেতরে কমলা আলো । কম্পাসের কাটার মত কেমন কাটা আছে ।
নব মোচড় দিলে স্টেশন বদলানোর কথা । কিন্তু স্টেশন নেই । অনুরোধের আসর নামে একটা জায়গায় কাটা থেমে থাকে। সুইচ চাপ দিলেই গান বেজে উঠে । তবে সবই পুরানো দিনের গান ।
কিভাবে এই গানগুলো সংগ্রহ করেছে ওরা ?
বাইরে তাকালেন তিনি ।
শহরটা প্রায় খালি।
গত ষাট বছর আগে অচেনা এক মড়ক এসে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ সাফ করে দিয়ে গেছে । সে ছিল এক মারাত্নক দুর্দিন । সব বিজ্ঞানিরা মিলে রক্ষা করেছিল মানব সভ্যতা । এক গাঁদা এন্টিবায়োটিক আর বিচিত্র সব ভ্যক্সিনের ফলে টিকে গেছে বাদবাকি মানুষ । সেইসব ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসাবে আচমকা বেড়ে গেছে মানুষের আয়ু ।
প্রায় অমর হয়ে গেছে যেন ।
জরা ব্যাধি থেমে গেছে । । দুই একজন এই একঘেয়ে জীবন সহ্য করতে না পেরে আত্নহত্যা করে বসে শেষ পর্যন্ত ।
রেডিও নব মোচড় দিতেই ভেসে এলো ঘোষকের ভরাট কণ্ঠস্বর , ' শুরু হচ্ছে অনুরোধের আসর । এই গানটির জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন ...। ‘
তারপর এক গাদা নাম আর ঠিকানা বলে গেল ঘোষক ।
হেদায়েত উল্লাহ ভাল করেই জানেন, এই সব নামে আজকাল পৃথিবীতে কেউ নেই। ঐ ঠিকানাগুলোতে ও খুঁজলে কাউকে পাওয়া যাবে না। ঠিকানাগুলোও নেই । যেমন আমলাপাড়া পোস্টঅফিস । কিচ্ছু নেই ওখানে ।
ছিল । অনেক অনেক বছর আগে । মারা গেছে সবাই । এই অনুষ্ঠানগুলোর কোন রেকর্ড কপি ছিল না। তখন সরাসরি অনএয়ার হত । তারপরও কোন এক কায়দা করে বায়ু কম্পন থেকে সেই সব অনুষ্ঠান হুবহু ফিরিয়ে এনেছে কর্তৃপক্ষ ।
এত খাটুনি করছে শুধু লোকজনদের অতীত দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়ার জন্য ?
ভাবতেই কেমন অবাক লাগে ।
গান শুরু হল ।
প্রেমের গান । তিনি আবিস্কার করলেন গানের কথা গুলো বেশ সুন্দর । কেমন কবিতার মত । মন স্পর্শ করে । আবেগ ছুয়ে যায় । আর বাজনাগুলো খুব সুন্দর। তেমন বিজলি চালিত যন্ত্রপাতি নেই ।
তিনি শুনতে লাগলেন হারানো দিনের গান।
একটার পর একটা ।
আবিস্কার করলেন, কেমন যেন একটা নেশার মত কাজ করছে এই গান । কেন বার বার হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে । সেই শৈশব । কত কত বছর আগের তুচ্ছ সব স্মৃতি মনে পড়ছে তার ।
কুয়াশা মাখা শীতের বিকেল । তখন শীতের বিকেলগুলো কেমন ঘন কমলা হত। লাল চায়ের মত সূর্যের আলো । পাড়াগাঁয়ে হাঁটতে গিয়ে কেমন ঘাস বিচালি ভেজা ঘ্রাণ । ফিকে সবুজ কড়াইশুটি । বর্ষার মেঘের শব্দ । শর্ষে ইলিশ । মাছদের বাড়ি ফেরা । ছাতা মেরামতওয়ালার হাঁক । গরমের হলুদ দুপুর ।
এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি । মুচকি হাসি নিয়ে জেগে রইল , বাইরে আকাশ ভর্তি বিন্নি ধানের খইয়ের মত নক্ষত্র ।
পরদিন ঘুম ভাঙ্গলো ফোনের শব্দে ।
ফোন বাজছে পাশের কামরায় । তিনি সোফায় শুয়ে ঘুমিয়ে গেছেন ।
জেগে উঠে শুধু বললেন , ' হ্যাঁ, কথা বলতে চাই ।
সাথে সাথে ফোন রিসিভ হয়ে গেল।
‘ হ্যালো, হেদায়েত ?' এনামের গলা। সাথে সাথে কামরার মাঝে জলছাপের মত ছায়া ছায়া এনামের চেহারা দেখা গেল।
'কি ব্যাপার ?'
'আরে সরকারি লোক বাসায় এসে রেডিও দিয়ে গেছে ।' খুশি খুশি গলা এনামের ।
'বাহ খুব ভাল কথা ।' খুশি হলেন তিনি । ' সময় কাটবে ভাল ।'
'একদম ফ্রি । ওরা বলেছে কোন বিল পেমেন্ট করতে হবে না।'
'জানি । সরকার কেন এমন একটা বাতিল প্রজেকট আবার চালু করছে কে বলবে । একদম হারানো দিনের টেকনোলজি ।'
' সমস্যা একটাই । সব গান পুরানো । আরও একটা জিনিস খেয়াল করলাম । যে সব খবর প্রচার করা হয় সেসবও অনেক বছর আগের খবর। খুব হাস্যকর কিন্তু মজা লাগে । যেমন বিজ্ঞাপন দিচ্ছে বাজারে এলো নতুন হাতি মার্কা আলকাতরা । নৌকার তলায় মাখাতে হয় না কি । বা গ্যাকোটাচ সাবান। '
ব্যাপারটা আগেও খেয়াল করেছেন তিনি ।
পুরানো সব অনুষ্ঠান রিপ্লে করা হচ্ছে ।
কিন্তু কেন ?
ওই পাশে ভ্যান ভ্যান করেই যাচ্ছে এনাম ।
তিনি লাইন কেটে দিলেন ।
বাথরুমে যাবেন ।
কয়েক দিনের মধ্যে এই রেডিও কেমন একটা ছকে বন্দি করে ফেলল হেদায়েত উল্লাহের জীবন ।
কাজ কর্ম নেই । বাসায় থাকেন। মাস গেলে সরকারি ভাতা জমা হয় ব্যাঙ্কে । একবার বাজারে গেলে সপ্তাহের বাজার সওদাই নিয়ে ফিরে আসেন। আগে অনলাইনে বই পড়তেন । খবর দেখতেন । এখন রাত হলেই রেডিও ছেড়ে বসে যান । শুনতে থাকেন হারানো দিনের গান ।
কারও সাথে কথা বলার ইচ্ছা কমে যাচ্ছে ।
শুধু কল্পনায় ফেলে আসা দিনগুলোতে চলে যান । যে সব স্মৃতি তার নিউরনে আছে সেই সব খুব বিবাগি করে ফেলে ।
দিন কয়েক কেমন ঘোরের মধ্যে কেটে গেল আরও । আবিস্কার করলেন অনুরোধের আসর কেমন একটা ড্রাগ হিসাবে কাজ করছে যেন ।
সময় ভাল কাটে । কিন্তু বুকের ভেতরে জন্ম নিচ্ছে কেমন হাহাকার বোধ ।
এক গরমের বিকেলে এনাম ফোন দিল , ' দোস্ত খবর শুনেছ ?'
'না কিসের খবর ? মঙ্গল গ্রহের কলোনিতে পৃথিবী থেকে আর কোন লোক নেবে না এইতো ?'
‘ আরে না। তুমি নৃপেন ভদ্রকে চিনতে ?'
‘ ছোটবেলায় আমাদের সাথে আড্ডা দিত ? লক্ষ্মী নারায়ণ দীঘির পাড়ে ওদের একটা দোকান ছিল ?’
‘ হ্যাঁ, পরোটা হালুয়ার জন্য বিখ্যাত ।‘
‘ চিনেছি । কি হয়েছে ?’
‘ আত্নহত্যা করেছে ।‘
‘আবার একজন ।‘
‘ তাইত দেখছি ।‘
চুপ করে রইলেন হেদায়েত উল্লাহ ।
‘ কি ভাবছ ?' ছায়া ছায়া চেহারায় এনাম প্রশ্ন করলো ।
যদিও এনাম ওর বাসায়। মাইল পাঁচেক দূরে । কিন্তু এই মুহূর্তে ওর ছায়া শরীর হেদায়েত উল্লাহ্র বেডরুমে । একই ভাবে এনাম দেখছে তাকে ।
‘ ভাবছি সব আত্নহত্যাগুলোর মধ্যে কেমন কেন একটা প্যাটান আছে যেন।' বললেন তিনি ।
‘ ধ্যাত। তোমার কষ্ট কল্পনা ।' এনামের হাসির শব্দ ।‘ ছোট বেলায় তুমি গোয়েন্দা কাহিনির ফ্যান ছিলে।‘
‘ হতে পারে । আচ্ছা তুমি আমার জন্য একটা কাজ করবে পারবে ?'
‘ কি কাজ ?’ এনাম অবাক ।
‘ নৃপেন ভদ্রের বাসায় একটু খোঁজ নিতে পারবে ?’
‘কোন ব্যাপারে ?’
'শুধু খোঁজ নাও ওর বাসায় রেডিও ছিল কি না। এবং কতদিন ধরে রেডিও শুনত । আমি গিয়ে আমাদের আগের বন্ধু সিরাজ , যে গত মাস কয়েক আগে আত্নহত্যা করেছে ওর বাসায় খোঁজ নিচ্ছি ।'
দম আটকে গেল যেন এনামের।
‘ কেন বলতো ?' ভয় পাওয়া গলায় জানতে চাইল এনাম ।
বন্ধুকে চেনে ভাল করেই । ক্ষুরধার মগজ এই পুরানো বন্ধুটার ।
'আমি যা ভাবছি সেটা শুনলে আমাকে পাগল ভাববে।' শান্ত গলায় বললেন হেদায়েত উল্লাহ । ' খোঁজ নাও । কাল সেই চায়ের দোকানে বসে কথা বলব । ফোনে বলা নিরাপদ না।'
সিরাজ শিকদারের বাড়ি খুঁজে পেতে সমস্যা হল না ।
এই জায়গায় আগে একটা নদী ছিল । কোন এক মউসুমে সবুজ বন ঘাস আর শাদা কাশফুলে অচেনা রকম সুন্দর হয়ে যেত । তখন সবার যেন কি হয়েছিল । সব জলাভুমি আর নদী ভরাট করে বসত বাড়ি বানাতে লেগেছিল।
নদীটা হারিয়ে গেছে ।
এই রাস্তার তলায় মড়া নদী।
কে জানে কত শামুক আর মাছের কান্না ।
সিরাজ শিকদারের বাড়িটা পুরানো ধাঁচের । বাইরে একটা আতা গাছ । হয়তো শহরের শেষ গাছগুলোর একটা । দরজার উপর কাচের স্কাইলাইট । লাল নীল হলুদ কাচ। লোহার ফ্রেমে লটকে আছে । মনে হয় বাড়িটার চোখ ।
দরজা খুলে দিল বেঁটে মত একটা রোবট। এ বাবা সিরাজও রোবট কিনেছিল ?
‘ কাকে চাই ?' ডেবলা ডেবলা চোখে চেয়ে জানতে চাইল রোবট ।
‘ সিরাজের বন্ধু আমি । বাসায় আর কে আছে ?' পকেট থেকে আইডি কার্ড বের করে যন্ত্রটাকে দেখালেন হেদায়েত উল্লাহ ।
'উনি তো মারা গেছেন । উনাকে পাবেন না । আপনি কি দাবা খেলার জন্য এসেছেন ? আমার সাথে খেলতে পারেন । ক্যাসপারের চাল জানি আমি ।'
‘ বাড়িতে কোন গার্জিয়ান নেই ।' বিরক্ত হয়ে গিয়েও সামলে নিলেন তিনি।
পুরানো রোবট । কতখানি আর চালাক চতুর হবে।
' উনার গিন্নি আছেন। ডেকে দেব ?'
ডাকতে হল না গিন্নি হাজির ।
খানিক পর ।
মুখোমুখি বসে আছে মিসেস শিকদার আর হেদায়েত উল্লাহ । সদ্য বিধবা মিসেসের মুখে শোকের ছায়া ।
‘ তারমানে আপনি বলতে চান শেষের দিকে সিরাজ একা থাকতে পছন্দ করতো ?' আলাপের খেই ধরলেন হেদায়েত উল্লাহ ।
'অনেকগুলো বছর ধরেই ও বেশ অমিশুক হিসাবে নাম করেছে।' শান্ত গলায় জবাব দিল মিসেস শিকদার । ' কারও সাথে মেলামেশা করতো না। সারাদিন বাসায় । কক্ষনো কক্ষনো বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখত । তাও শীতকালে । শেষের দিকে গান শোনার ...।'
‘ গান শোনা ?' খানিক সোজা হয়ে বসলেন হেদায়েত উল্লাহ ।
'হ্যাঁ , রোজ রাতেই গান শুনত । তখন আমি পাশে বসে থাকলেও কথা বলতে চাইত না। বেশির ভাগ সময় রুম অন্ধকার করে ...।'
'মানে আপনার বাসায় সরকারি লোক এসে রেডিও দিয়ে গেছে তাই না।' সাবধানে কথা চাল দিলেন তিনি । কারন নেই তারপরও ভেতর ভেতরে বেশ ঘেমে যাচ্ছেন ।
‘ হ্যাঁ তাই তো । একদিন সরকারি লোক বাসায় এসে জিনিসটা দিয়ে গেল । বলল ফ্রি। কোন রকম বিল নেই। নষ্ট হলে মেরামত করে দেবে। সেটাও ফ্রি। প্রথম কয়েকদিন জিনিসটা অমনি পড়ে ছিল । কি মনে করে আমিই একদিন সেটা চালু করলাম । পরে সিরাজও গান শোনা শুরু করলো । শেষে তো কেমন যেন হতাশায় ডুবে থাকতো । শেষে তো ...জানেন আমার খুব খারাপ লাগে । আমিও একা একা সেইসব গান শুনি । কত স্মৃতি যে মিশে আছে পুরানো দিনের ঐসব গানে। বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছা করে হারানো ...।'
আচমকা উঠে দাঁড়ালেন হেদায়েত উল্লাহ । ' আমাকে যেতে হচ্ছে । কিছু মনে করবেন না। আর ওই রেডিও শোনা বাদ দিন ।'
'কেন ? ' চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে ভীষণ অবাক হয়েছেন ভদ্রমহিলা।
‘ তাহলে খুব জলদি আপনিও আত্নহত্যা করবেন এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিন্ত ।'
শান্ত সুরে বোমা ফাটালেন হেদায়েত উল্লাহ ।
সেই সন্ধ্যায় ।
ক্যাফেতে বসেনি দুই বন্ধু। শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে একটা পাকা বেঞ্চির উপর বসেছে । পাশে একটা ল্যাম্পপোস্ট । কাচের তেকোনা শেডের ভেতর থেকে ঘন কমলা আলো ছড়াচ্ছে ওটা ।
‘ কি বুঝলে ?' কথার খেই ধরলেন হেদায়েত উল্লাহ ।
'ব্যাপারটা আসলেও ভয়ানক ।' বিড়বিড় করে জবাব দিলেন এনাম । কেমন চঞ্চল দেখাচ্ছে তাকে।
‘ তারমানে নৃপেন ও রেডিও পেয়েছিল ?' উত্তরটা জানেন তারপরও নিজের অজান্তেই প্রশ্ন করলেন ।
'তাই তো বলল ওর পরিবার ।'
‘ মোট আটটা আত্নহত্যার কেস স্টাডি করলাম । ফলাফল একই ।'
‘ সরকার করছে ?'
‘ কেউ তো করছে । মস্ত বড় পরিকল্পনার অংশ । এই পুরান রেডিও আবার বানিয়ে বাসায় বাসায় দিয়ে আসা। শুধু মাত্র হারানো দিনের গান সেট করে রাখা সবই সেই মহাপরিকল্পনার অংশ ।'
‘ মানে মানুষ মারা । মানুষ যাতে কমে যায় তাই তো ।' চোখ বড় বড় করে জানতে চাইলেন এনাম ।
‘ এ ছাড়া আর কিছুই না। জবাব দিলেন হেদায়েত উল্লাহ । ' ঘটনা শুরু হল আজ থেকে অনেক বছর আগে। বিচ্ছিরি এক ভাইরাসের জন্য দুনিয়ার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ মরে গেল। তখন আবিস্কার হল ভ্যাক্সিন । সেই ভ্যাক্সিন নেয়ার পর আরও আজব একটা এফেক্ট হল যারা ভ্যাক্সিন নিয়েছে তাদের আয়ু গেল বেড়ে । প্রায় অমর হয়ে গেল। জরা ব্যাধি স্পর্শ করে না। কিন্তু লাভ কি হল । সেই মানুষ গুলো বসবাস করতে লাগল বিচ্ছিন্ন ভাবে। দীর্ঘ আয়ু পেয়ে জীবনের প্রতি হতাশ হয়ে গেল। কিছুই করে না। দিনরাত বসে বসে সরকারি ভাতা পায়। খায় । কাজ কর্ম করে না।
‘ এই দিকে তারা নতুন সন্তান জন্ম দিতেও পারছে না। শুধু মঙ্গলে যারা বসতি গড়েছে তাদের জীবন যাপন চলছে সুন্দর ভাবে। ওরা পৃথিবীতে ফিরে আসতে চায় না। আবার আমাদের ওখানে নিতে চায় না। এই লম্বা আয়ু পাওয়া মানুষদের কি করা যায় ? যদি কোন ভাবে এদের মধ্যে হতাশা ঢুকিয়ে দেয়া যায় ? তবে নিজেরা আত্নহত্যা করে শেষ হয়ে গেলেই পৃথিবীর পুরানো সব ধ্যান ধারনা আইডিয়া একদম গায়েব হয়ে যাবে । আর কোন লিঙ্ক থাকবে না অতীতের সাথে ।
‘ একদম নতুন করে গড়ে উঠবে মঙ্গলের মানব সভ্যতা । পৃথিবী হবে তখন বাতিল আবর্জনা ফেলার একটা জায়গা শুধু । অথবা কয়েক হাজার বছর মানুষ শূন্য থাকলে আবার প্রকৃতির ভারসাম্য ফিরে আসবে । নদী সাগর গাছপালা সব বেড়ে উঠবে। হয়তো এটাই প্ল্যান । আর কিছু না।'
অনেকটা সময় চুপ করে রইলেন এনাম ।
‘ তাহলে রেডিও শোনা বাদ দেব ?’ জানতে চাইলেন ।
‘ অবশ্যই । সেই সাথে সবাইকে সজাগ করে তুলতে হবে । গোপনে একটা সংগঠন বানিয়ে হারানো দিনের গান নিয়ে সচেতন করতে হবে সবাইকে । সাবধান করে দিতে হবে। দুইজনে মিলে শুরু করলে সব ঠিক হয়ে যাবে ।'
‘ ঠিক বলেছ ।' মাথা ঝাঁকিয়ে সহমত প্রকাশ করলেন এনাম ।
বন্ধুর সব কথা বিশ্বাস করেন ।
পরদিন সকাল ।
কেউ ঘন ঘন দরজার বেল বাজাচ্ছে ।
‘ কে ?’ বিরক্ত হয়ে গিয়ে দরজা খুললেন হেদায়েত উল্লাহ ।
বাইরে উর্দি পরা দুইজন সরকারি কর্মচারী।
‘ কি ব্যাপার ?' অবাক হলেন হেদায়েত উল্লাহ ।
‘ আপনার রেডিও নাকি নষ্ট ?’ সুন্দর হাসি হেসে জানতে চাইল এক অফিসার ।
‘ নাহ । কোন সমস্যা নেই তো ।' আরও বেশি অবাক হলেন তিনি ।
‘ বারে , আমাদের কাছে না কাল ফোন করে বললেন ।' আগের মতই হাসছে অফিসার ।
‘ আমি ? অসম্ভব ।' চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি ।
'জিনিসটা দেখা যাবে ? আপনি চাইলে ওটা আমরা ফেরত নিতে পারি । ' জানতে চাইল দ্বিতীয় কর্মচারী ।
‘ নিশ্চয়ই । মনে মনে খুশি হলেন তিনি । জিনিসটা নিয়ে গেলে আরও ভাল হয় ।
ভেতরে ঢুকে পড়লো দুইজন । কিছু বুঝে উঠার আগেই হেদায়েত উল্লাহ্র নাকের সামনে কি একটা স্প্রে হিস করে ছিটিয়ে দিল একজন ।
মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো তার ।
টের পেলেন শরীর আলগা হয়ে পরে যাচ্ছেন ।
খপ করে ধরে ফেলল দুই কর্মচারী ।
'কাজ হয়ে গেছে।' বলল হাসি খুশি জন ।
‘ খুব ভাল ।' দ্বিতীয়জন এই প্রথম হাসল । ' বেশি চালাক ব্যাটা । সব কি ভাবে যেন জেনে গেছে ।'
'মাথাটা খুব পরিষ্কার ।'
' আর একটু হলে সবাইকে সাবধান করে দিত । ওর বন্ধুটার ব্যবস্থা করা হয়েছে।‘
‘ হ্যাঁ আরেক টিম গেছে । এরা এত চালু যে কোন ক্যাফেতে বসে কথা বলেনি । রেডিওর সামনে বসে কথা বললেও শুনতে পেতাম । ভাগ্য ভাল শহরের সব ল্যাম্পপোস্টে লুকানো মাইক্রোফোন আছে ।‘
লাশটা ধরাধরি করে দুইজন বের হয়ে গেল বাইরে অপেক্ষায় থাকা গাড়িটার দিকে ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন