সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বিচিত্র সব খাবার


 বিচিত্র সব খাবারের গল্প শুনতাম। লোকজনের মুখে।

সব চেয়ে মজার লেগেছিল ঝলসানো উটের কাবাবের গল্প। আরব দেশে রাজা বাদশাহদের বিয়েতে নাকি  অমন উটের কাবাব বানায়। গিনেসবুকে ও এই কাবাবের কথা লেখা আছে।

প্রথমে   তিতির  পাখির   ডিম  সেদ্ধ   করা হয়। সেদ্ধ   ডিম ভরা হয়  আস্ত  মাছের  পেটের  ভেতরে। আগে অবশ্য মাছের নাড়িভুরি বের করে নেয়া হত।   সেই মাছ বেকড করে আস্ত মুরগীর ভেতরে ভরা হয়। সেই মুরগী বেকড করে ভেড়ার পেটের  ভেতরে ভরা হয়।  সেই ভেড়া বেকড করে উটের ভেতরে ভরা হয়। সাথে দেয়া হয় চাল আর আলু।

এই বার অনেক সময় নিয়ে উট  ঝলসানো শেষ  করে মেহমানদের সামনে পরিবেশন করা হয়। মেহমানরা ছুরি দিয়ে কেটে কেটে অদ্ভুত সেই উটের মাংস খায়। শুনে বেশ ভালই মনে হচ্ছে। সময় সুযোগ পেলেই খাব।

এত কথা জানলাম রিচারড স্টারলিং -এর দ্যা ফেয়ারলেস ডিনার’  বই থেকে।

খাবার নিয়ে প্রথম যে গল্পটা শুনেছিলাম সেটা হল পান্তা বুড়ি ।

কোন এক বুড়ি রোজ পান্তা ভাত রেখে দিত রাতের বেলা কোন এক তস্কর এসে খেয়ে ফেলত ।

বড় হয়ে যেটা শুনে বেশ অবাক হয়েছি , থাইল্যান্ডের কোন একটা রেস্টুরেন্টে নাকি  পেল্লাই একটা  হাঁড়িতে নুডুলস স্যুপ রান্না করা হয় । সেটা ৪৫ বছর ধরে একই হাঁড়িতে রান্না করা হচ্ছে । সেই হাড়ি ইহ জিন্দেগিতে ধোয়া পাকলা করা হয়নি ।

বেচা কেনার শেষে যে ঝোল থেকে যায় সেটার উপরে পরদিন আবার নতুন মাল মসলা ঢেলে রান্না শুরু হয় ।

মাল মসলা বলতে কবি মানে সেই রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি বুঝিয়েছেন - গরুর মাংসের ফালি , কুঁচি , মিটবল , এবং গরুর বিভিন্ন বাতিল মাংসের কুঁচি । সাথে নানান রকম মসলা ।

স্যুপ নুডুলসটার নাম-  নিউয়া টিউন ।

রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি জানিয়েছে এটা রান্নার প্রাচীন একটা কায়দা । ফলে সেই খাবারে ভিন্নধর্মী একটা স্বাদ আর দারুন চনমন করা সৌরভ পাওয়া যায় ।

খাদ্য ইতিহাসবিদেরা এটা দেখে মোটেও অবাক হয়নি । উনারা বলেছেন ব্যাপারটা নতুন কিছু না । ফ্রান্সে রাজা চার নাম্বার হেনরির আমলে এই কায়দা চালু ছিল।

এই কায়দাকে বলে- পট আ ফিউ ।

আমার মনে হয় ডাইনিরা এই কায়দায় রান্না বান্না করতো । উনাদের চুলায় সব সময় একটা হাড়ি টক বক করে ফুটতেই থাকতো।

ব্যাপারটা নিয়ে ভাল মত খোঁজ খবর নিতে হবে ।

 

মারিয়ানা আইল্যান্ডে একটাই মাত্র  শহর। নাম গ্রারাপান।

গ্রারাপানে হোটেল ,  ক্যাফে আর বারের অভাব নেই।  এক কানা গলিতে আছে কোরিয়ান একটা ক্যাফে। নাম মনে নেই।  হতে পারে নামটা - চঙ মং গং বা ধুন ফুং সাং ।   ওখানে এক টিন বিয়ার কিনলেই সিরামিকের  এক পিচ্চি বাউলে  করে  ঝলসানো বেগুনের ফালি দেয়। ফালিগুলো  একদম  দেশলাইয়ের কাঠির সমান সরু। উপরে সাদা  তিল  আর লাল  মরিচের কুঁচি দেয়া। পাতলা সয়াসসে ভেজানো থাকতো বেগুনের ফালিগুলো।

আমরা লোভীরর মত যেতাম ওখানে । মাত্র একটা বিয়ার অর্ডার করলেই মারাত্নক সেই বেগুনের ফালি !

অদ্ভুত একটা জিনিস বিক্রি হত- জ্যান্ত অক্টোপাস।  কথা হল রেস্টুরেন্টে আবার জ্যান্ত অক্টোপাস বিক্রি হয় কেমন করে ? সেটাই বলছি।

জ্যান্ত একটা অক্টোপাস কেটে কুঁচি করে সিরামিকের বাউলে করে নিয়ে আসা হয় টেবিলে। তখনও সেটা কিলবিল করে নড়ছে। খদ্দের কাঠি দিয়ে তুলে নেয় অক্টোপাসের টুকরো। ভিনেগার আর সয়াসসে চুবিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে  খায়। সাথে থাকে চাইনিজ বাঁধাকপি বা মূলার ঝাল আচার। যেটাকে কিমচি বলে  (kimchi) ।   কাঁটা অক্টোপাসের টুকরো গুলো তখনও কিলবিল করে খদ্দেরের মুখের ভেতর থেকে বের হয়ে যেতে চায়।

দেখার মত এক দৃশ্য।

অকিশট বলে একটা পানীয় খায়। গ্লাসে করে কোরিয়ান মদ সুজু (soju)  নেয়।  সেই গ্লাসে ডুবিয়ে দেয় একটা জ্যান্ত অক্টোপাসের  ঠ্যাঙ। তারপর আর কি। এক  ঢোকে গিলে ফেলে।ওটা কিলবিল করতে করতে নেমে যায় গলা দিয়ে।  

মারিয়ানা আইল্যান্ডে থাকতে এক উৎসবে গিয়ে  ম্যালেট ফিস খেয়েছিলাম।

 লম্বাটে রুপালি মাছটা খেতে দারুন। তবে রান্না করেছিল বিচিত্র  কায়দায়। মাথা আর  আঁশ ফেলে দিয়ে লবণ আর কালো মরিচ  হালকা করে মাখিয়ে নেয়া হয়েছিল। আনারসের খোসা দিয়ে প্যাচিয়ে সুতো দিয়ে বেঁধে আভেনের ভেতরে রেখে দেয়া হয়েছিল কুড়ি মিনিটের জন্য। পরে তশতরিতে রেখে পরিবেশন করা হল। টান দিতেই মাছটার মেরুদণ্ডের  কাঁটা চলে এলো হাতে।

অদ্ভুত   স্বাদ।

সিডনী শহরে একটা রাস্তার নাম -  হে স্ট্রীট ।  ট্রাম লাইনের পাশেই পিচ্চি এক  গ্রিক  দোকানে।  কাচের জারে  ভর্তি হরেক কোয়ালিটির জলপাই আর ভেড়ার দুধের সাদা পনির বিক্রি করে। টিনের গ্যালন ভর্তি জলপাই তেল। এক  থুড়থুড়ে বুড়ো-বুড়ি দোকান চালায়। একদিন ঢুকে পড়লাম ভেতরে। দারুন দোকান। মসলায় মাখান শুকনো টম্যাটো ও বিক্রি করতে দেখলাম। সেমি ড্রাই টম্যাটো বলে। বার্গার আর পাস্তায় দেয়।

এক দেয়ালে কাচের জার ভর্তি অদ্ভুত কি যেন ।  মনে হল কতগুলো ভিন গ্রহের  প্রাণী ভরে রেখেছে জারের ভেতরে।

কি ওটা ?’  আগ্রহের সাথে জানতে চাইলাম।

অক্টোপাসের আচার ।খ্যাক করে উঠলো বুড়ি।

থতমত খেয়ে গেলাম। ভুল শুনলাম না তো।   

ভাল করে হাতে তুলে নিয়ে একটা জার দেখলাম।  সোনালি জলপাই তেলে ডুবে আছে অক্টোপাসের  ঠ্যাংগুলো। একটা বয়াম নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। ইস্কুল জীবনে শেষ আচার খেয়েছিলাম। আজ আবার।

কাঁটা চামচ দিয়ে মুখে ফেললাম। অপূর্ব স্বাদের জিনিস। আগে বা পরে অমন কিছু খাইনি। গ্রিকরা বেশ অনেক আগে থেকেই এই অক্টোপাসের আচার খায়। শুনেছি।  হাজার বছর আগে ডুবে যাওয়া গ্রিক জাহাজের ভেতরেও অমন মাটির জার পাওয়া গেছে। দেখে মনে হয় অমন অক্টোপাসের আচার ছিল ওতে।

রেসিপি একদম সোজা। পেল্লাই সাইজের অক্টোপাস দিয়েও আচার বানান যায়। অনেকে মনে করে বাচ্চা অক্টোপাস দরকার। আসলে তেমন না। অক্টোপাস পরিষ্কার করে  ছোট টুকরো করে  সেদ্ধ করতে হবে।সেদ্ধ  হয়ে গেলেই অক্টোপাস লালচে মেরুন হয়ে যাবে। ভাল করে জল ঝড়িয়ে নিতে হবে  সেদ্ধ  অক্টোপাস থেকে।

এবার দরকার এক চামচ লবণ, আস্ত একটা লেবুর রস, ২টি তেজপাতা, /৬টি রসুনের কোয়া কুঁচি করা  , কয়েকটা গোল মরিচের দানা। সেইসাথে সামান্য জলপাই তেল। সব এক বাউলে রেখে সেদ্ধ অক্টোপাসের সাথে মেশাতে হবে। মেশানো হলে ,  পরিষ্কার দেখে একটা কাচের জারে রাখতে হবে ওদের ।

 

 খেয়াল রাখতে হবে জলপাই তেলে যেন সব অক্টোপাস ডুবে থাকে । যেই অংশ তেলের উপরে থাকবে সেই অংশ শক্ত আর শুকনো লাগবে।  এই আচার  ফ্রিজে  রেখে দিতে হবে ১ সপ্তাহ। চাইলে এর সাথে ধনেপাতা বা পুদিনা পাতার কুঁচি দেয়া যায়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম।

সব  শেষে বলা যায়। আমি হয়তো অক্টোপাস আচারের দোকান খুলতে পারি। বড় করে লেখা থাকবে-   অক্টোপাস আচার। বড় মজাদার। কপি রাইট- শ্রী শ্রী মিলন বাবু ।

আদি ও আসল।  কোথাও কোন শাখা নেই।

মারিয়ানা আইল্যান্ডের  আদিবাসী এক বন্ধুর নাম জুন কামাচু। সরকারী চাকরি  করতো। এখন অবসর। বিরাট মদ্যপ। অবসর নেয়ায় মদ খায় নাকি  সরকারী চাকরি করতো বলে মদ খায় পরিষ্কার না আমার কাছে।

একদিন বলল -  ‘মাছ ভাঁজা খাবে ? প্যারট ফিস ।

প্যারট ফিস নামে কোন মাছ আছে জানতাম না। অবশ্য আমার জানার ভাণ্ডার সীমিত। মাহি মাহি নামে যে কোন মাছ আছে জানতাম ? জানতাম না । অয়াহু নামে যে কোন মাছ আছে জানতাম ? জানতাম না । শুধু জানতাম ইলিশ ইংরেজি হিলসা।

ছুটির দিনে দাওয়াত  দিল জুন। এই দেশে খালি হাতে  শনিবার কেউ কারো বাসায় যায় না। এক কেস বিয়ার নিয়ে যায়। আমিও গেলাম।

 আমাকে দেখেই ফ্রিজ থেকে  একগাদা মাছ বের করলো জুন।  অবাক হলাম।  বিঘৎ খানেকের চেয়ে বড়।  অমন অদ্ভুত মাছ জীবনেও দেখিনি। শরীরে সবুজ, নীল , হালকা বেগুনি রঙের আঁশ ভর্তি। কেমন যেন একটা রঙধনুর অংশ মনে হচ্ছিল।    সবচেয়ে অদ্ভুত হচ্ছে মাছের ঠোঁট । একদম টিয়া পাখির ঠোঁটের মত। নিজে মাছ ধরতে গিয়ে যদি এমন মাছ ধরতাম দেখেই  ভয়  পেয়ে যেতাম।

চাকু দিয়ে আঁশ পরিষ্কার করলো জুন। সামান্য লবণ আর গোল মরিচের গুড়া মেখে রেখে দিল পাঁচ মিনিট । গরম ডুবো তেলে  ভাঁজা  হতেই  দেখার মত একটা জিনিস হল। ঠাণ্ডা বিয়ারের সাথে অপূর্ব এক জিনিস হল সেই প্যারট ফিস। এখনও  মুখে লেগে আছে স্বাদ।

 পলিনেশিয়ান দ্বীপগুলোতে প্যারট ফিস কাঁচা খায়। ওরা বলে রাজার খাবার। আগে নাকি দ্বীপের গোত্রের সর্দার এই মাছ খেত শুধু।অন্যদের খাওয়া বারন ছিল।   

শ্রীলংকান বন্ধুর নাম- মিহিডিকুলা সুরিয়া তুসান্তা দিলহান গায়েন পেরেরা।

এটা ওর আসল নাম না। ডাক নাম। আসল নাম বলতে গেলে এই লেখা শেষ হয়ে যাবে, অনেকটা সেই ধামাল সিনেমার ট্যাক্সিতে লিফট দেয়া  দেয়া ভদ্রলোক    শ্রী আট্টুবাট্টু রাজশেখরও শ্রীনিবাসনও পরম বাধুরাত ইয়াজ্ঞ   প্ললি  বাসুদেবা  শ্রী ভেঙ্কটা  পরম্বীর চেন্নাসোয়ামী মুত্তসোয়ামি ভেনুগোপাল আইয়ারের  মত । আমরা শুধু গায়েন মামা বলতাম।  

তো গায়েন মামা এক মজার জিনিস খাইয়েছিল। ভদকার তরমুজ।

 পেল্লাই সাইজের এক তরমুজ এনে উপরে সামান্য ফুটো করে ওখানে প্ল্যাস্টিকের এক ফ্যানেল ঢুকানো হল প্রথমে। ফ্যানেলে  আস্তে আস্তে ঢালা হল ভদকা। তরমুজ শুষে নিল সেই ভদকা। টানা চারদিন ভদকা ঢালা হল ফ্যানেল দিয়ে। তরমুজটা টই টুম্বুর হয়ে গেল ভদকা খেয়ে খেয়ে। পঞ্চম দিনের দিন ফালি ফালি করে কাটা হল মিস্টার ওয়াটার মেলনকে।

এবার সবাই খাও ইচ্ছামত। সেটা ছিল জুলাই মাসের গরমের রাত। আহা, অদ্ভুত স্বাদ। ভদকায় ভেজান তরমুজ। ফ্রিজে ছিল। তাই চনমনে ঠাণ্ডা। আর জুনিপারের ঘ্রানঅয়ালা ভদকার স্বাদ তো ছিলই । হালকা নেশা নেশা। আরও খেতাম। এক বন্ধু চেঁচিয়ে উঠছিল  হঠাৎ- ‘ মিলন আর  খাস নে। তুই  ঘোলা হয়ে যাচ্ছিস।’   

বেচারা আসলে মাতাল হয়ে গিয়েছিল।

কবে যেন এক বইতে মাখন চায়ের কথা পড়েছিলাম।

  মাখন চা। শুনতে কেমন না ?  তিব্বতের লোকজন নাকি খায় ? কাজ শুরু করার আগে তিব্বতিরা নাকি কয়েক বাউল মাখন চা খেয়ে ফেলে। কাজে উদ্দীপনা পাওয়া যায় নাকি ? পাহাড়ের উপর হাড় কাঁপানো শীত। এই মাখন শীতের হাত থেকে বাঁচায় ওদের।

বইটা পড়ার  পর থেকেই চোখের সামনে কল্পনায় ভেসে উঠত অচেনা তিব্বতের পাহাড়ি পথ। চারিদিকে  বরফ। শোঁ শোঁ  করে হাওয়া বইছে। সাথে বরফ কুঁচি।  পথের এক ধারে একটা  কাঠের হোটেল । ভেতরে কমলা আলো জ্বলছে । বাইরে  ঝুলন্ত চারকোণা লণ্ঠন। ভেতরে একগাদা তিব্বতি বসা। সবার সামনে চীনামাটির বাউল। ফুরুত ফুরুত করে সেই মাখন চা খাচ্ছে সবাই। তিব্বতি ভাষায়  যাকে পো চা বলে।

অনেক বছর হয়ে গেছে । সেই মাখন চা খাওয়া হয়নি।

সিডনি শহরে  এক তিব্বতির দেখা পেলাম। দেখতে জ্যাকি  চ্যানের মত। বেশ নিরীহ মানুষ। কোন এক কারাখানায় কাজ করে। মুচি দেখলেই লোকের যেমন মনে হয়  জুতা জোড়া কালি করা দরকার। তেমনি সেই তিব্বতিকে দেখেই আচমকা মাখন চায়ের কথা মনে হল। বলে ফেললাম।

তিব্বতি জ্যাকি চ্যান হেসে বলল- আচ্ছা সে আমাকে মাখন চা খাওয়াবে।

এক রোববার বানাল। তেমন কিছু না। সাধারন চা। বানানর পর  চায়ের সাথে  এক চামচ মাখন আর সামান্য লবণ নিয়ে আচ্ছা মত ঘুঁটে দিল। হয়ে গেল মাখন চা।  আমি ও শীতের সন্ধ্যায় আড্ডা দিতে দিতে শেষ করে ফেললাম তিব্বতীয়  প্রাচীন এই পানীয়টা।  তবে ওরা নাকি চমরী গাইয়ের দুধের মাখন ব্যবহার করে।

পরে আমি যখন একা বানিয়েছি  লবণের বদলে চিনি দিয়েই খেয়েছি। বিচিত্র এক পানীয়।

 বুদ্ধদেব গুহ আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে একজন। সেই কবেএক শীতের দুপুরে   উনার কোজাগর উপন্যাসটা পড়ে ভাল লাগা কাজ করেছিল। আজও করে। উনার একটা লেখায় একবার সালাদের অদ্ভুত এক রেসিপি পড়লাম। ভাবলাম বানাই ওটা।

তেমন কিছু না। সাধারন সালাদের মতই শসা, টম্যাটো, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ একটা বাউলে নিয়ে সাথে সামান্য লবণ, চিনি , সর্ষের তেল দিয়ে মাখালাম। কাচের একটা বয়ামে করে সেই সালাদ রেখে দিলাম রোদে। ঠিক তিন থেকে সারে তিন ঘণ্টা রোদে রাখার পর খাবারের সাথে নিলাম রোদেলা সালাদ। কি অদ্ভুত স্বাদ। বলার মত না।

প্যাপিলন নামে বিখ্যাত এক বই পড়লাম ক্লাস  সিক্সে   থাকতে। হেনরি  স্যারিয়ারের  লেখা। বেস্ট সেলার বই।  জেল পালানো  এক  কয়েদীকে নিয়ে। যদিও সে ছিল নিরপরাধ।  তো , কাহিনির নায়ক প্যাপিলনকে জেলে   শিমের দানা  সেদ্ধ  খেতে দেয়া হত রোজ। ব্যাপারটা দারুন। নিজেকে প্যাপিলন ভেবে বাসায় প্রচুর শিম খাওয়া শুরু করলাম। যদিও দানা তেমন বড় হত না।

ইস্কুলের স্যারকে  একদিন জিজ্ঞেস করে ফেললাম- ‘ স্যার,  জেলখানায় কি সত্যি শিমের দানা   সেদ্ধ  খেতে দেয় ?

স্যার ফিচিক করে হেসে বললেন- ‘ সময় হলেই বুঝবি। তোকে মনে হয় আটার রুটি আর গুড় দেবে।  খিচুড়ি পাবি সপ্তাহে একদিন ।

আপনি এত কিছু জানেন কি করে ?  অবাক বিস্ময়ে বললাম।  

হঠাৎ করেই  বদলে  গেল স্যারের চেহারা। ঘেউ ঘেউ করে বললেন-  ‘ নিপাতনে সন্ধি আর   অব্যয়ীভাব সমাস শিখে আসতে  বলেছিলাম । তার বদলে কিনা শিমের দানা...খাড়া তর শিমের দানা আমি বাইর  করতাছি।

কি বিচ্ছিরি স্যারের ভাষা। আর মুখের অঙ্গভঙ্গি।  যাক  । অন্যের সমালোচনা করে লাভ নেই।

২০১২ সালে    আফ্রিকা গেলাম। ইউগানডা। হোটেলেই প্রথম রাতেই জিজ্ঞেস করলো- চাপাতি,  কুরু আর বিজানজারো আছে । দেবে কি না।

চাপাতি মানে আমাদের ময়দার চাপাতি। কুরু  মানে মুরগি। সোহালিলি ভাষা। আর বিজানজারো মানে শিমের দানা। হায় হায়। ওটাই খাই।  নাকি ?

টানা এক বছর রোজ এক বেলা হলেও শিমের দানা খেয়েছি। লাল দানাগুলো দেখলে মনে হয় খনি থেকে সদ্য তোলা চুনি পাথর। পালিশ করা হয়নি। সারা রাত জলে ভিজিয়ে রাখতে হয় সেই চুনি মানে শিমের দানা।

 সকালে   সেদ্ধ করতে হয় ঘণ্টা খানেক। সেদ্ধ হলে একটা  পেঁয়াজ,  টম্যাটো , সামান্য  গাজরের কুঁচি দিয়ে  নাম মাত্র কয়েক ফোঁটা তেল দিয়ে বাগার দিলেই হয়ে যায় আফ্রিকার সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার। শুধু পুষ্টিকর না। সহজেই পেট ভরে যায়। কি স্বাদ। আজও মুখে লেগে আছে ।

জুল ভান সাহেবের-  টুয়েন্টি  থাউজ্যানড লিগস আন্ডার দ্যা সি ( Twenty Thousand Leagues Under the Sea) নামে  দারুন একটা বই আছে ।  ১৮৭০ সালে ছাপা হয়েছিল বইটা। সেই সময় অমন একটা বই লেখা চাট্টিখানি কথা না। আজও বইটার আবেদন একটু ও কমেনি।

সমুদ্রের তলায় অদ্ভুত  সাবমেরিন নটিলাসে করে ক্যাপ্টেন নিমোর সাথে আমিও ২০ হাজার লিগস ঘুরে এসেছিলাম।  খাবারের  টেবিলে দেয়া হয়েছিল  সমুদ্রের শ্যাওলার সালাদ, হরেক রকম মাছ,  হাঙরের ডানার স্যুপ । মোদ্দা কথা সব খাবারই সাগর থেকে যোগার করা। এটা পড়ার সময় শ্যাওলার সালাদ জিনিসটা মাথায়  রয়ে গেল।

এখন তো রাস্তায় একটা শিঙারা কিনলেই ৫০ গ্রাম খোসা সহ শসার টুকরো  হাতে ধরিয়ে দেয় সালাদ হিসাবে, দিলখুস বিরিয়ানি হাউজে দেখি টোকাই মার্কা একটা ছোকরা  বসে বসে হলুদ হয়ে যাওয়া শসা কাটে আর একই সাথে নাকের শিকনি ফেলতে থাকে। বিয়ে বাড়িতে সালাদ দিত।  নোনা জলে  ভেজানো টক হয়ে  হয়ে যাওয়া টম্যাটো আর শসার আচারের মত কি একটা জিনিস এক হাতা ঢেলে দিতে দিতে পাত্রিপক্ষ বলতো - নিজের বাড়ি মনে করে খান। বাড়িতে কি খান না খান ...

এই অবস্থায় শ্যাওলার সালাদ ? নাহ না মুমকিন। ইস্কুলের এক বন্ধু  পরামর্শ  দিয়েছিল-  পুকুরে যে পাতাঝিঝি মার্কা জিনিস ভাসে সেগুলো দিয়ে ট্রাই করব কি না ?  

মারিয়ানা আইল্যান্ডের একটা সৈকতের নাম  লাউ লাউ বিচ ( lau lau beach) ।  হাতের বুড়ো আঙ্গুল থেকে তর্জনী পযন্ত যেমন আকার হয় সৈকতটা ঠিক তেমন। একদম জংলের ভেতরে।

ওখানেই বসে ছিলাম একদিন।

বুড়ো এক আদিবাসি  অক্টোপাস ধরছিল। লোহার একটা শিক। এক মাথা ছাতার লাঠির মত বাঁকানো। ওটা দিয়েই পাথরের ফাঁক দিয়ে সুরুত করে  টেনে আনছিল বালি রঙের কালো ছিট পরা এক একটা অক্টোপাস। পুরে রাখছিল কাপড়ের ব্যাগে।   শেষে দেখি এক মুঠো সবুজ কি যেন তুলে আনল শাকের মত করে।

খাবে নাকি ? জানতে চাইল অক্টোপাস শিকারি।

কি এটা ? অবাক হলাম।

শ্যাওলা। রান্না করে  সুপে দিয়ে খেতে পার বা সালাদ বানাতে পার।

বাসায় সেই শ্যাওলা নিয়ে ফেরার সাহস পেলাম না। তবে পরের সপ্তাহেই গ্রারাপানে একটা দোকানে পেলাম আলু আর শ্যাওলার  সুপ। এক বাউল আলুর গরম সুপের সাথে শ্যাওলা আর আদার  ফালি দেয়া।  আদার ফালিগুলো সাইজে দেশলাইয়ের কাঠির সমান লম্বা আর সরু। শ্যাওলাগুলো লাগছিল ঠিক যেন পুঁইশাকের মত।  মাত্র দুই  ডলার দাম। দারুন স্বাদ।

শ্যাওলার সালাদ খাওয়া হল পরে।  পরিষ্কার ফালি করা শ্যাওলার সাথে জলপাই তেল, সাদা তিল আর লাল মরিচের কুঁচি দেয়া। এটাও মনে হল পুঁই শাকের মতই। De costi  সি  ফুডে যখন বাবুর্চি হিসাবে কাজ নিলাম তখন থেকেই তো রোজ সকালে নিজের হাতে পেল্লাই এক বাউল ভর্তি করে শ্যাওলার সালাদ বানাতে শুরু করলাম। খারাপ না কিন্তু জিনিসটা।  

জাপানী রেস্টুরেন্টগুলোতে টুনা মাছের চোখ বিক্রি হত। দেখতে খুব  বিদঘুঁটে ।  রান্না করার ঝামেলা নেই। লবণ গোল মরিচ সামান্য আদা রসুন দিয়ে  সেদ্ধ করে সিরামিকের তশতরীতে পরিবেশন  করা হয়। সামান্য ঝোল ঝোল থাকে। দেখার মত একটা জিনিস।  তরল ঝোলে চোখগুলো  ভাসতে থাকে। একদম হরর গল্প।  

কখন খাইনি । ইচ্ছে করেনি।  খেতে নাকি    সেদ্ধ  স্কুইডের   মত লাগে। উপকারি ও।   পোণাপে দ্বীপের একটা পরিবার ছিল  প্রতিবেশী।  কাঁচা টুনা মাছের চোখ ওদের চিবিয়ে খেতে দেখেছি। আলাস্কার লোকজন ও  নাকি কাঁচা খায়।

আলাস্কা যাইনি।


তাই দেখিনি। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...