সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কুউউ ঝিঁক ঝিঁক




দুপুরবেলা বের হই 

এই সময়টা বেশ ঝিনকি দেয়া রোদ 

 সব হলুদ  আর  হলুদ । দরকারের চেয়ে ও    বেশি ঝকমক করে  সব কিছু    বিকেলে বের হলে চারিদিকটা  দেখার সময় পাওয়া যায় কম 

খুব কম  পোষায় না  

একা একা ঘুরতে ভাল লাগে  সব কিছু বেশি বেশি দেখা যায়  কিন্তু আজকে নেপালকে নিয়ে যাব  ইষ্টিশন দেখব । ওকে কথা দিয়েছি যে ।

ভাগ্য ভাল হলে দেখব  রেলগাড়ি 

 আসবে তো গাড়িটা ?

নেপালের বাড়ির সামনে এসে দেখি,  বারান্দায় লোহার রড ধরে ঝুলে আছে  ।  নড়ছে চড়ছে না ।

প্রথমে ভেবেছিলাম মারা গেছে , লাশ ঝুলছে  

পরে দেখি,  পাশে ওর বাবা দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখে বলেছে - আরও ত্রিশ সেকেন্ড 

চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম 

আমাকে দেখে নেপালের বাপ খেঁকিয়ে উঠলো , ' রোদে বের হও কেন ?

' সমস্যা কী   ?' প্রশ্ন করলাম 

'কালো হয়ে যাবে  '

'ওকে কি শাস্তি দিচ্ছেন না কি ? বিস্কুট চুরি করে খেয়েছে আবারও ?  '

'না। আজ সেটা করেনি। তবে   রোজ ঘড়ি দেখে ঝুলাই  প্রথম পনের দিন আড়াই মিনিট করে  পরে পাঁচ মিনিট  এই ভাবে প্রত্যেক পনের দিন আড়াই মিনিট করে বাড়বে ' ব্যাখ্যা করল নেপালের বাবা 

কারণ কি ?' অবাক না হয়ে পারলাম না  

'লম্বা হবে  দেখতে পাও না  বাঁটুল  একদম বাটখারা সাইজ  তোমারও অমন করা উচিৎ  নইলে বয়ামের সাইজ হয়ে থাকবে  বোতল হতে পারবে না '

জি আচ্ছা ' মাথা কাঁত করে সায় দিলাম 

সময় হতেই পাকা ফলের মত টুপ করে খসে পড়লো নেপাল 

'যা সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসবি ' পিছন থেকে শাসানী দিল নেপালের বাবা 

আমরা হাঁটতে লাগলাম  

আমাদের চলার পথেই গাবলুর বাসা   ওদের  জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম  গাবলু বই খুলে কান্না কান্না গলায় পড়ছে - হাঁস মুরগি ঘরে তোল  দাদীকে অসুধ দাও  মামির হাতে দুধ ভাত খেতে ভারি মিঠে  ঘরে আছে ভাপা পুলি পাটি শাপলা পিঠে 

পাশেই ইয়া বড়  ঝাঁড়ু হাতে বসে আছে গাবলুর মা  চেঁচিয়ে প্রশ্ন করছে – ‘ কারে ওষুধ দিতে অইব ?'

কান্না কান্না গলায় গাবলু বলছে - দাদিরে ওষুধ দিতে অইব 

'ঘরে কি কি আছে ?' আবার প্রশ্ন 

'পিদা আছে ' কাঁদছে গাবলু 

'কি ঘরে তুলতে অইব ?'

'আঁশ মুরগা ?' গাবলুর নাকে  চোখে  জল 

'ভাল কইরা এক লাইন বিশ বার কইরা পর। নাইলে তর মাথা ভাইঙ্গা মুড়ি ঘণ্ট বানামু আমি '

চিল্লানি দিয়ে বলল গাবলুর মা ।  

আমি আর নেপাল মনে মনে সুখী হলাম । সুখী হতে বেশি কিছু লাগে না । সামান্য কারনেই সুখী হওয়া যায় ।

 কল্পনায় দেখতে পেলাম,  প্রচুর মুগ ডাল আর গাবলুর মাথা দিয়ে মুড়িঘণ্টা বানানো হয়েছে । এলাকার   সবাই খাচ্ছে । মনটা ভাল হয়ে গেল ।   গাবলু আমাদের শত্রু ।

আমাদের এলাকায় পুকুর বেশি 

এত বেশি পুকুর আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না। 

সবার আলাদা নাম থাকা দরকার ছিল  নেই  অন্যের নামের  ব্যাপারে   মানুষ খুব  অলস  কুকুর হলেই টমি আর বিড়াল হলেই মিনি নাম দিয়েই খালাস 

বিশ্বাস করবে না আমাদের এলাকায় মুতালেব , হেকমত , বাতেন , ইউনুস অমন নাম হালি হালি আছে  বাধ্য হয়ে উনাদের নামের সাথে লম্বা , বাইটটা   , কাইল্লা , গাল কাঁটা এই সব শিরোনাম ব্যবহার করে চিনি 

তবে এত পুকুরের মধ্যে শুধু রামবাবুর পুকুর ওটার নাম আছ 

উনি রামায়ণের লক্ষণের বড় ভাই না। কোন এক মহান ভদ্রলোক  সবার উপকার করতেন  শেষে কোলকাতায় চলে গেছেন  ভাল মানুষদের দেশ ছাড়তে হয় 

পুকুরটা আমাদের প্রিয়  এখানেই সাঁতার শিখেছে  

তখন আমরা ' রবিনসন ক্রুসো ক্লাব' খুলেছিলাম 

এই ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একদিন সবাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে চলে যাব  কোন জাহাজে খালাসির কাজ নিয়ে প্রশান্ত বা আটলান্টিক সাগর পাড়ি দেব।

সঙ্গত কারনেই  আজ হোক কাল হোক  জাহাজ  ডুববেই 

তখন  যেন  সাঁতরে কোন দ্বীপে উঠতে পারি , সেই জন্যই  এই  ক্লাবের সূচনা   আর চাঁদমারি টিলার ওখানে গিয়ে আলু পুড়িয়ে খেয়ে একটা ক্লাস করেছি  আলুটা কল্পনায় বুনো শূয়র বা হাঙরের লিভার ভেবে নিয়েছিলাম 

মরিচের চারা বুনে চাষবাসও শিখে নিয়েছি ।

কাজের কাজ হয়েছে এই সব ট্রেনিংগুলো 

রামবাবুর পুকুরে সাগর দানো নেই। স্কুইড নেই। হাঙর নেই। কিন্তু  রোমাঞ্চকর পুকুর।  পুকুরে শামুক আছে। জলঘাস ।  পাড়ে বিকেলে বসে  শখের মাছ শিকারিরা। তারা আমাদের নায়ক ।  

হাঁটতে হাঁটতে নেপালকে বললাম – ‘ তোমার মন খারাপ নাকি ?'

মাথা নাড়লো , ' উহু , একটু চিন্তায় আছি '

'কি নিয়ে ?'

' কাল তেঁতুল খেতে গিয়ে আস্ত একটা দানা গিলে ফেলছি '

' সর্বনাশ ' থমকে গেলাম  পা থেমে গেল  

' সেটাই  ' চেহারা করুন করে বলল সে  ' দুই এক সপ্তাহের মধ্যে দানা থেকে তেঁতুল গাছ হবে  গাবলুর কোন মামার নাকি অমন হয়েছিল  শেষে কান দিয়ে ডাল পালা বের হয়েছে '

'এখন উপায় ?' ভয় পেয়ে গেলাম  

'মরণ মেনে নেয়া ছাড়া তো কোন উপায় দেখছি না । নিয়তির লেখন না যায় খণ্ডন ।  ' শুকনো মুখে বলল নেপাল  ' তুমি যে আমার কাছ আট আনা পয়সা পেতে ওটা মাফ করে দিতে হবে '

'নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই ' ব্যস্ত হয়ে বললাম  ' আর দুইটা মার্বেল পেতাম  খেলায় জিতেছিলাম  ফেরত দিতে হবে না। '

খুশি হল নেপাল 

'কিছু খেতে ইচ্ছা করছে ?' গম্ভীর ভাবে জানতে চাইলাম  

টিভিতে নাটকে দেখেছি মৃত্যু আসন্ন নায়িকার বাবা জিজ্ঞেস করছিল  মনে গেঁথে গেছে। টিভি সিনেমার মত দরকারি জিনিস আর হয় না।

'এক টাকার সন্দেশ হলে ভাল হয় ' দয়া দেখাচ্ছে অমন ভাবে বলল নেপাল 

এক টাকায় চারটে সন্দেশ পাওয়া যায়  

গোল  শাদা  উপরে পয়সা ফুলের ছাপ দেয়া 

অথবা ছক্কা সাইজের দশটা পাওয়া যায়  লাল রঙের  খেলে মুখ আর জিভ লাল হয়ে থাকে  কেমন পৈশাচিক 

এই সব মজার সন্দেশ খেলে মা রাগ করে  এই সব নাকি বাতিল আটা আর রেশনের চিনি জ্বাল দিয়ে বানায় 

বাজে জিনিস 

কথা সত্য 

আমরা সস্তায় কেনার জন্য চকোলেট ফ্যাক্টরিতে চলে গেলাম  নামে ফ্যাক্টরি  হলেও   চার্লি এন্ড লজেন্স ফ্যাক্টরির মত তেমন কিছু না ।   আসলে এটা একটা বাসা বাড়ি  কুটির শিল্প না কি যেন বলে  এই পরিবারের সব সদস্য , দুপুরে খাওয়ার পর সন্দেশ আর লজেন্স বানায়  রান্নাঘরে আটা চিনি রঙ জ্বাল দিয়ে টিনের লম্বা ট্রে-তে ঢেলে দেয় সেই লাভা ।খানিক পর ঠাণ্ডা হলেই  কাঠের  রুলার   দিয়ে  মেপে,  চাকু দিয়ে  লম্বা দাগ দেয় । পরে সেই দাগ মত চাপ দিলেই ছক্কা   ছক্কা  সন্দেশ হয়ে যায় ।

প্ল্যাস্টিকের ব্যাগে সন্দেশ  ভরে কুপির আগুনের উপর ব্যাগটা কায়দা করে ধরতেই সেটার মুখ বন্ধ হয়ে যায় 

পরে বাড়ির কর্তা দোকানে দোকানে ঘুরে জিনিসগুলো বিক্রি করে।

আমরা গেলে অনেক সস্তায় দেয়  তবে সেগুলো  সব  ভাঙ্গা চুরা । দোকানে দিতে পারবে না । তাই আমাদের সস্তায় দেয় ।

এক টাকায় মুঠো ভরে যায় 

মৃত্যু পথযাত্রী     নেপালের জন্য এক টাকার সন্দেশ কিনে খেতে খেতে চললাম রেল স্টেশনের দিকে 

নেপালকে বেশি দিলাম ।সামনের সপ্তাহেই মারা যাবে , তাই  বেচারা ।  জীবন এত ছোট কেন ?

রামবাবুর পুকুর পাড় আসতেই দোকানদার ফটিক চৌরাস্তা আমাদের দিকে বিষ মাখা চোখে চেয়ে বললেন , ' তোমরা দেখি আজকাল আমার দোকান থেকে কিছু কিন না , ঘটনাটা কি ?'

ফটিক চৌরাস্তা ভাইয়ের দোকান থেকে   সহজে   আমরা কিছু কেনা কাটা করি না   ওজন কম  দিয়ে  আর বাসি জিনিস বিক্রি করে উনি এই এলাকায় খুব বিখ্যাত  

এক হালি ডিম আনলে একটা ডিম পচা হবেই  ফেরত দিতে গেলে চোখ মুখ রাবণের মত করে বলবেন , ' আরে ভাই ডিম কি আমি পারছি ?  সকাল বেলায়  ঝুড়ির মধ্যে ভাল ডিম রাখলাম আর তুমি নিতে না নিতেই নষ্ট হয়ে গেল  এটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না  বদল  করে দেয়ার প্রশ্নই উঠে না  ?'

উনার বদনাম করতে গেলে সারা সপ্তাহ শেষ হয়ে যাবে  মহাভারতের মত আঠারো ইয়া মোটা মোটা পর্ব হয়ে যাবে । কাজেই বাদ। কিন্তু একটা উদাহরণ দেয়া উচিৎ ।উদাহরণ না দিলে কোন কিছুই পোক্ত হয় না। সেইজন্য পরীক্ষার প্রশ্নে লেখা থাকে- উদাহরণ সহ লেখ।  

একবার ইদে সেমাই কিনেছিলাম 

বাসায় রান্নার পর দেখি তেতো বিষ 

এক বাউল রান্না করা সেমাই আর চামচ নিয়েই উনার কাছে গেলাম  বললাম , ' ফটিক ভাই সেমাই তো নষ্ট !

কই দেখি দেখি  বলেই উনি চামচ দিয়ে সুরুত সুরুত করে বাউলের সব সেমাই খেয়ে বললেন , ' আলহামদুল্লিয়াহ , দারুন জিনিস  চিনি হালকা কম ,আর বুদ্ধি করে এক মুঠো কিসমিস দিলে জিনিসটা একেবারে বেহেস্তের খাবার হত  কই আমি তো কোন দোষ পেলাম না  পয়সা ফেরত দেয়ার প্রশ্নই উঠে না '

এই হচ্ছে উনার গল্প 

উনার দোকান টিকে আছে বাকি মাল বিক্রি করে 

এলাকার গরীব মানুষজন রেগুলার বাকিতে কেনে  ইয়া মোটা একটা খাতায় সেইসব লিখে রাখেন ফটিক চৌরাস্তা ভাই ।খাতাটা তেল তেলে হয়ে কেমন বাসি বেগুনির মত দেখায় 

আমাদের হাতের সন্দেশ দেখে ফটিক চৌরাস্তা ভাই হতাশ গলায় বললেন , ' এইজন্য কথায় বলে মক্কার মানুষ হজ্ব পায় না।'

ফটিক ভাইয়ের আক্রমণে খানিক দিশেহারা হয়ে গেলেও সামলে নিলাম 

'আপনি আছেন আপনার ব্যবসা নিয়ে। ' খানিক পাঁচ ফোঁড়ন মার্কা মেজাজ দেখিয়ে জবাব দিলাম  ' নেপাল যে কোন সময় মারা যাবে আপনি জানেন সেটা ?'

চোখ দুটো লাড্ডু লাড্ডু হয়ে গেল চৌরাস্তা ভাইয়ের , ' ক্যান ক্যান  পরীক্ষায় ফেল করে ইঁদুর মারার বিষ খেয়েছে নাকি  কিন্তু বিষ তো আমার দোকানেও ছিল '

বলেই খ্যাক খ্যাক করে শেয়ালের মত হেসে ফেললেন 

যেন ' হাসির অ্যাটম বোম' বা ' দম ফাটানো নির্বাচিত কৌতুক ' মার্কা  বই থেকে বেছে সবচেয়ে সেরা কৌতুকটা পরিবেশন করেছে 

সব খুলে বললাম 

শুনে আরেক কিস্তি হেসে ফেললেন , ' তোমরা আসলে বোকা  আন্তজাতিক মাপের বোকা  বিদেশে রপ্তানি করা যাবে সেই রকম বোকা  অবশ্য দোষ তোমাদের না। দোষ হচ্ছে তোমাদের পরিবারের  উনারা যদি আয়োডিন যুক্ত লবণ খাওয়াত তবে তোমাদের এই দশা হত না। আয়োডিন খুব দুর্লভ খনিজ দ্রব্য  এই যে দেখ লবণের প্যাকেট  দুই ধরনের প্যাকেট রেখেছি  সাহা সল্ট আর ইসলাম সল্ট  যাতে সব ধর্মের মানুষ নিতে পারে। কারও ধর্ম নাশ না হয় সেটা খেয়াল রাখা দরকার  সিপাহি বিপ্লবের কারণ কি জানো ?’

জানি না ।

জানো না কেন ?’

কারণ ঘটনার সময় আমরা উপস্থিত  ছিলাম না।

 সুন্দর লজিক। বলছি শিখে নাও।    ইংরেজরা বন্দুকের কার্তুজে শূয়র আর গরুর চর্বি মাখিয়ে রেখেছিল  সেই কার্তুজ,  বন্দুকে ভরার সময় মুখ দিয়ে কাটতে হত  আর কোম্পানির সিপাহিদের মধ্য হিন্দু মোসলমান দুই ছিল । সিপাইরা তখন বেশ বিরক্ত হয়ে উঠে ইংরেজদের উপর।    যাকগে কথা ফেনিয়ে লাভ নেই  এখন যদি তোমরা আমার দোকান থেকে হজমি কিনে খাও,  তবে পেটের ভেতরের তেঁতুলের দানা একদম হজম হয়ে যাবে '

এত সহজ পথ রয়েছে ?

আমরা অবাক হয়ে গেলাম 

'আপনি সত্যি বলছেন ?' অবাক গলায় বলল নেপাল 

'খেয়েই দেখ ' কথা বলা শেষ করে দুই প্যাকেট হজমি নামিয়ে ফেললেন চৌরাস্তা ভাই 

আমরা শুনেছি উনার দোকানের হজমি আসলে কয়লার গুঁড়োর সাথে লবণ মিহি করে দিয়ে বানায় 

কিন্তু বাঁচতে হবে তো !

'দাম কত ?' প্রশ্ন করলাম 

'আট আনা ' গ্যাল গ্যালে হাসি দিয়ে জবাব দিলেন 

'কিন্তু টাকা শেষ হয়ে গেছে তো ' ঢোক গিলে বললাম 

উনার মাথার কাছে একটা টিনের সাইন বোর্ড ঝুলছিল -

নগদ বিক্রি পেটে ভাত  

বাকি দিলে মাথায় হাত ।।

সেটা দেখিয়ে বললেন , ' মানবতা আমার ভেতরেও আছে ।   ব্যবসা  করব কিন্তু  ভোক্তাদের  দিকে   নজর রাখব না সেটা হতেই পারে না ।  ক্লাস নাইনে  বুক কিপিং ছিল আমার । জানি সবই ।   আমি বাকির খাতায় লিখে রাখছি । কাল বিকেলের মধ্যে টাকাটা না দিলে সোজা চলে যাব তোমার বাবার কাছে ।'

কথা শেষ করে কেমন একটা হাসি দিলেন 

উনাকে দেখাচ্ছিল জেমস হেডলি চেইজের উপন্যাসের ব্ল্যাকমেইলার ভিলেনের মত  যার কাছে সেই পিস্তলটা আছে  যেটা  দিয়ে নায়িকাকে খুন করা হয়েছে  সেটায় আবার নায়কের ফিঙ্গার প্রিন্ট রয়ে গেছে 

কিন্তু দুই প্যাকেট হজমি কেন ?' বিরক্ত হলাম ।  আমি তো  আর  তেঁতুলের দানা গিলে খাইনি '

' দুই প্যাকেটই নেপালের জন্য ' হাসলেন চৌরাস্তা ভাই  ' তেঁতুলের দানা অনেক শক্ত  হজম হতে বেশি হজমি লাগবে  দানা শক্ত বলেই তেঁতুল কাঠ অনেক শক্ত হয়  এই যে গয়না নৌকা বানায় কোন কাঠ দিয়ে ?'

'কোন কাঠ দিয়ে ?'

'তেঁতুল কাঠ '

ঢেঁকি বানায় কোন কাঠ দিয়ে ?’

কোন কাঠ দিয়ে?’

তেঁতুল।

'কিন্তু বটফলের দানা তো পিচ্চি  গাছ তো কত বড় হয় '

'সেটাই জ্ঞানীরা বলে গেছেন দানা দেখে নানা চেনা যায়   বট হচ্ছে নানা গাছ ।   মানে হচ্ছে মুরুব্বী গাছ ।   যাও খেয়ে ফেল হজমি  লেট করলেই দেরি হয়ে যাবে  টাকা কিন্তু কাল বিকেলে চাই '

আবার হেসে ফেললেন ।

হেডলি চেইজের ব্ল্যাকমেইলারের মত 

প্যাকেট খুলে মাত্র মুখে দিয়েছে হজমি , তখনই পিছনে শোনা গেল মিহি গলা , ' তরা কি খাস ? আমারেও দে  নাইলে বাসায় গিয়ে বিচার দিমু 

ফিরে দেখি আমাদের শত্রু দাঁড়িয়ে আছে।

গাবলু 

ময়লা হাফ প্যান্ট  হাতা কাটা স্যানডো গেঞ্জি  সেটার গায়ে আবার নাম্বার দেয়া  অমন গেঞ্জি পরে ফুটবল খেলে বিদেশে  ওর মাথা ভর্তি ফোঁড়া  কিছু কাঁচা  কিছু পেকে হলদে হয়ে গেছে  যে কোন সময় আগ্নেয়গিরির মত ফেটে যাবে 

জীবনেও কিছু কিনে খায় না গাবলু  কিন্তু আমরা কিছু খেতে গেলেই কোত্থেকে এসে হাজির হয় 

ওকে আমরা ঘৃণা করি 

বললাম, ?খাবি ? এই নে   খা ।

ও লোভীর মত সামনে আসতেই হাত মুঠো করে আঙুলের গাঁট দিয়ে শক্ত করে আঘাত করলাম ওর মাথায় ।এই আঘাতকে বলে - টাউল্লা । ব্যাথায় চিৎকার করে উঠলো গাবলু -  মাগো উউউউ  এক্ষণই তর বাইত গিয়া বিচার দিমু।

আমরা ঝেড়ে দৌড় দিলাম 

নিরাপদ দূরত্বে এসে একটা পুকুর পাড়ের বাঁধানো ঘাটে বসে পড়লাম   পুকুরটা অনেক বড় হলেও টোপা পানা  জমে কেমন সবুজ হয়ে গেছে   আস্ত একটা পান্না যেন  পুকুরের পাশে হাসি হাসি চেহারায় একটা বরই গাছ  শীতে প্রচুর বরই হয় ।একটু লম্বাটে  মিষ্টি  সবুজের মধ্যে গহন ঘন মেরুন ফোঁটা।  

আমরা  প্রত্যেক  শীতে মৌসুমে  'বরইহুড' হিসাবে কাজ করি  বইরহুড জিনসটা আসলে রবিনহুডের মতই  একটু আলাদা  মানে আমি আর নেপাল এই গাছের বইর পেড়ে নিজেরা না খেয়ে গরীব বাচ্চাদের মধ্যে বিলিয়ে দেই 

জিনিসটার মধ্যে বেশ একটা মহত্ব আছে  গাছের মালিক দুষ্টু লোক  কাউকে দেবেন না।একাই খাবেন।

তখন মাত্র রবিনহুড বইটা পড়েছি  কাজেই অমন করা দরকার  বড় হলে আমরাও ডাকাতদল বানিয়ে ধনীদের বাড়িতে লুটপাট করে গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেব ।এলাকায় কার কার বাড়িতে ডাকাতি করব সেটাও ঠিক করে ফেলেছি 

হজমি খাওয়ার পর নেপালের মুখ কুচকুচে কালো হয়ে গেল 

বীভৎস !

'এখন কেমন লাগছে ?' জানতে চাইলাম 

'মনে হয় বেঁচে যাব ' খুশি খুশি গলায় বলল নেপাল 

পুকুর পাড়ে একতলা একটা বাড়ি  কেমন পুরানো দিনের বাড়ি  পেল্লাই বারান্দা  সেই বারান্দা আবার কেমন সিঁদুর লাল  রঙ করা   মাঝে লম্বাটে বৃত্তাকার   কালো ফুল  বারান্দায় মাটির টবে কয়েকটা পাতা বাহার গাছ  অমন গাছ বাজারে এক টাকা দিলে দশটা পাওয়া যায় না। মনে হয় সবগুলো পাতার মধ্যে কোন এক রঙ মিস্ত্রি তার ব্রাশ তুলি ঝেড়ে অতিরিক্ত রঙ চিরকি মিরকি করে ফেলে দিয়েছে লাল - হ্লুদ-সাদা।

বাড়ির মালিক কোলকাতায় থাকে  রাত্রে কেউ একজন ভেতরে ঘুমিয়ে পাহারা দেয় 

এই  বাড়ির   বারান্দা আবার দাবা ক্লাব হিসাবে ব্যবহার করে এক হালি বুড়ো ।

উনারা দিনরাত ছক কাটা একটা বোর্ড নিয়ে বসে বসে রাজা উজির মারে । দাবা ক্লাবের ওখানের সেসব বুড়োরা বসে থাকে উনারা আমাদের দেখলে খেঁকিয়ে উঠে , ' এত রোদের মধ্যে ঘুর ঘুর কর ক্যান ? কালো হয়ে কয়লা হয়ে যাবে তো ।'

অন্য একটা কচ্ছপের মত চেহারার বুড়ো সাথে বাংলা বইয়ের টীকা ও টিপ্পনী দেয়ার মত করে বলে, ' দেন ঘুরতে দেন। কয়লা হাজার হাজার সেন্টিগ্রেড তাপে পুড়ে হীরা হয়ে যায়। ওরাও হয়ে যাবে।'

বলা শেষ করেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে ফেলে। যেন হাসির অ্যাটম বোম মার্কা বই থেকে বেছে  সবচেয়ে সেরা কৌতুকটা বলে ফেলেছে।

 

বারান্দায় এক কোনে পাহাড়ের মত পেল্লাই শরীর নিয়ে পড়ে ড়ে ঘুমায় শম্ভু নামে এক বড়দা।

অলস বলে উনার  অনেক বদনাম ।

যত কিছু হয়ে যাক দুনিয়ায় ,নিউ মেট্রো আর ডায়মণ্ড হলে গিয়ে  সপ্তাহে উনি একটা সিনেমা দেখেন,  । জাম্বু নামে এক ন্যাড়া মাথার গুণ্ডা থাকলে উনি সিনেমাটা বেশি উপভোগ করেন । কাহিনি যেমন তেমন হোক,   প্রচুর   ফাইট থাকলে আর সিনেমার শেষে একটা গান গেয়ে পরিবারের সবাই সবাইকে খুঁজে পেলে উনি বেশ আনন্দ পান ।

 শম্ভু দা  কিন্তু বাচ্চাদের কাছে উনি ভীষণ জনপ্রিয় ।

গামছা দিয়ে পুকুর থেকে মাছ ধরতে পারেন ।  দারুণ লাটিম আর নাটাই বানাতে পারেন । সুতায় মাঞ্জা দিতে পারেন । ঝিনুক ঘষে চাকু বানিয়ে ফেলতে পারেন। রাস্তায় বাতিল নষ্ট হয়ে যাওয়া ব্যাটারি ভেঙ্গে ভেতর থেকে কয়লার লম্বা টুকরো বের করে আমাদের তাক লাগিয়ে দিতে পারেন।   এবং ভিন পাড়ার ঘুড়ি কেটে গেলে দৌড়ে গিয়ে ধরে এনে মাত্র চার আনায় আমাদের কাছে বিক্রি করেন ।

এত গুণ থাকার পরও উনার বাবা মা খুব বকে ।

উনি সময় সুযোগ পেলেই এই বারান্দায় এসে ঘুমিয়ে থাকেন । অনেক গরমেও জায়গাটা নাকি সুমেরুর   মত ঠাণ্ডা ! উনাকে আমার হাকলবেরি ফিন বইয়ের 'জিম' নিগ্রোটার মত অনেকটাই লাগে ।

আজও দেখি পাহাড়ের মত পড়ে ঘুমাচ্ছেন ।

একবার ভাবলাম ডাকব নাকি ? পরে বাতিল করে দিলাম ।

বেশ মিষ্টি একটা হাওয়া ।

হাওয়ায় দূরের দেশের ঘ্রান ।

 

কোন একটা মৌসুমে আচমকা পূবালী হাওয়া বইতে শুরু করে।

বাতাসের এই রহস্য আজও বুঝি না। শ্যামলাহিড়ী  বাবুর  বাড়ির বাগানে কেরসিন কাঠের ফালি দিয়ে টিনের ঘরের মত পিচ্চি দুই তিনটে খোপ দেয়া ঘর বানিয়ে রাখা হয়। ভেতরে হলুদ রঙের খড় গুঁজে দেয় বাড়ির কেউ। থাকে তশতরী ভর্তি ডালের দানা। এক পেয়ালা জল।

এটা পাখিদের বাসা ।

কোন এক বিষণ্ণ দুপুরে শ্যামলাহিড়ী বাবুর কিশোরী মেয়ে চলে গিয়েছিল মেঘের ওপারের দেশে। অচেনা অসুখে ভুগে। সেই থেকে পাখিদের দানা পানি দেয় এই বাড়ির মানুষরা। পাখিরা গিয়ে মেয়েটাকে বলবে- তোমাদের বাড়ির মানুষগুলো খুব ভাল।

একটা লেবু পাতার মত পোকা দেখলাম ।

আচমকা দেখলে মনে হয় কচি একটা পাতা  লেপটে  আছে দেয়ালে । খানিক মনোযোগ দিলেই বুঝতে পারবে ওটা আসলে একটা পোকা ।

কত চালাক । সুন্দর লুকিয়ে থাকতে পারে । নাম জানি না।  জানলে ভাল হত । কিন্তু দুনিয়ায় তো পোকার অভাব নেই ।

পান্নার মত একটা গুবরে পোকা আছে । নাম ক্রিসমাস বিটল। এই পোকা শুধু ক্রিসমাসের সময় এবং শুধু মাত্র অস্ট্রেলিয়ায় দেখা যায় । তবে দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর পোকা হচ্ছে এক ধরনের শুঁয়ো পোকা । সেক্রোপিয়া মথ । শরীর ভর্তি যেন হলুদ সবুজ লাল ফুল ধরে আছে ।

আমরা তত বেশি পোকা চিনি না। কেউ চিনিয়ে দেয়নি তাই । গঙ্গা ফড়িং চিনি । অনেকে ঘাস ফড়িং বলে । সুন্দর সবুজ রঙ । ঘোড়ার মত লাফিয়ে চলে সেই অজুহাতে ঘোড়া ফড়িং বলে।

আর একটা চিনি - কাচপোকা । আচমকা বনকলমি গাছের পাতায় ডালে যখন ওদের দেখি মনে হয় দামি দুর্লভ কোন রত্ন । অমন রত্নের লোভে সেই সময়ের বণিকেরা পাল তোলা জাহাজে করে চলে যেত দূরের দেশগুলোতে ।

পিরামিডের ভেতরেও ছিল অমন রত্ন ।

কাচপোকার গায়ে যে দিক থেকে আলো পড়ুক না ঝিলিমিলি করে উঠবেই ।

 

ইষ্টিশনে পৌঁছানোর দুটো রাস্তা আছে ।

বড় রাস্তা দিয়ে গেলে সময় কম  কিন্তু মানিক টেইলারস আর কানু নাপিতের দোকান সামনে পড়ে 

সমস্যা 

এই দুই দোকান একদম পাশাপাশি  সারাক্ষণ একটা কেওয়াজ লেগেই আছে  বিশেষ করে ঈদের আর পূজার আগের রাতে মানিক টেইলারসে একটা ভীষণ রকমের গণ্ডগোল হয়  এক গাদা মানুষ ঝগড়া করে  অর্ধেকের বেশি মানুষ দাবি করে তাদের কাপড় তৈরি হয়নি 

মানিক বাবু লাল মুখে দাবি করেন পরদিন সকালেই সবাই কাপড় জামা  পাবে  এই পরদিন কথাটা নাকি উনি মাস ধরেই বলছেন  

উনার মুখ লাল লজ্জার কারনে না। মুখ ভর্তি পান সেইজন্য 

বাকি অর্ধেক মানুষ ঝগড়া করছে জামা বেশি ঢিলা বা টাইট হয়ে গেছে  যে মাপ দিয়েছিল সেই মাপ মত হয়নি  একজন হাঁটু পর্যন্ত ঝুল ওয়ালা পাঞ্জাবি পরে দাবি করছেন উনি নাকি হাফ হাতা জামার অর্ডার দিয়েছিলেন 

মানিক বাবু স্বীকার করছেন সামনের বার অমন ভুল হবে না।

কানু নাপিতের দোকানে সব সময় ভিড়  এত মানুষ ? সবার চুল দাঁড়ি কি রোজ তিন হাত করে লম্বা হয় ?

অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কার্ল মাকস  বা মধুসূদন দত্ত কিন্তু দিব্যি জীবন চালিয়ে গেছে 

এই দুই দোকানের সামনে দিয়ে গেলে উনারা সবাই ফিরে তাকায় আমার দিকে  চিৎকার করে বলেন - আবার রইদে বাইর হইছস ? খাঁরা তর বাপে আসুক 

ভাব দেখে মনে হয় আমার বাবা উনাদের মাসিক বেতন দিয়ে আমার পিছনে লেলিয়ে দিয়েছে  আর রোদ যে শরীরের জন্য উপকারি সেটা উনারা জানেন না ?

আদ্ভুত কাণ্ড !

বাধ্য হয়ে আমরা রামবাবুর পুকুর পাড়ের উল্টা দিকের রাস্তা সব সময় ব্যবহার করি 

নির্জন পথ  

চারিদিকে গাছ গাছালি আর পান্নার রঙের পুকুর। নিম গাছ  কদম আর কৃষ্ণচুড়া  তিনটে বড় বড় কড়ই আছে পথের এক কোনে। পাতায়  পাতায় ঝুপসি । যেন  অচেনা কোন কাঁকনপুর । দিনের বেলায় কেমন ছায়া ছায়া  কোন এক  বাওকুরানি   হাওয়ার    মউসুমে সোনার মোহরের মত শুকনো পাতা ঝরে পরে  

পুরো রাস্তাটা কালো পিচের  বড় বড় হলুদ শুকনো পাতা পরে থাকে  মনে হয় কালো হীরার উপর সোনার কুচি। 

সেই পথে পিচ্চি একটা সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে একই রকম পিচ্চি একটা ছেলে  সাইকেলের পিছনে দড়ি দিয়ে কয়েকটা ব্লু ক্রসের খালি টিন বেঁধে নিয়েছে  ব্লু ক্রস হল কনড্যান্স মিল্ক  

খালি টিনগুলো অমসৃণ রাস্তায় বাড়ি খেয়ে খেয়ে কেমন ত্যাম ত্যাম শব্দ করছে 

প্রশংসা পাওয়ার আশায় আমাদের দিকে চকচকে চোখে চাইল পিচ্চি  

প্রশংসা অমন একটা জিনিস দান করলে আরও বেশি পাওয়া যায় ।  সেইজন্য পিচ্চিকে বললাম , ' খুব সুন্দর  শব্দ কিসের ?’  

'ইঞ্জিন লাগিয়েছি ' গর্বিত পিচ্চি জবাব দিল  ' বাবা বলেছে বড় হলে আমাকে নাইট রাইডারের গাড়িটা কিনে দেবে ।  '

তোমরা কি বড়লোক ?' জানতে চাইলাম 

'হ্যাঁ,  ওই যে পুকুর পাড়ের লাল বাড়িটা , ওটা আমাদের  সিরামিক ইটের দেয়াল  লবণ দিয়ে সিরামিক ইট বানায়  দশটা সাধারণ লাল  ইটের দামের সমান একটা সিরামিক ইট  '

হাঁটতে লাগলাম 

সাঁই করে চলে গেছে ইঞ্জিনওয়ালা পিচ্চি বড়লোক  সাথে সেই ত্যাম ত্যাম ইঞ্জিনের শব্দ।

সামনের মোড়ে দেখি কাচের বয়াম হাতে করে হেঁটে আসছে আমাদের দূর সম্পর্কের বন্ধু পিঙ্কু  ওর কাছে সত্যজিৎ রায়ের  সব বই আছে ।  বিভূতি বাবুর বাঘের মন্তর বইটা আছে ।  সেইজন্য ওকে আমরা  বেশ  পাত্তা দেই । ওর চোখে চশমা ।   আড়ালে কেউ কেউ দেড় ব্যাটারি বলে । কাজটা ঠিক না।

  হাতে  ধরা  বয়ামের ভেতরে সাঁতার কাটছে কেমন লাল টুকটুকে একটা   শিং  মাছ ।

কোথায় যাচ্ছ ?' জানতে চাইলাম ।

 জানি কি উত্তর দেবে । রোজ এমন সময় বয়াম হাতে মহল্লাটা এক পাক ঘুরে আসে পিঙ্কু ।

'মাছটাকে মহল্লাটা দেখাচ্ছি ।' হাসি মুখে জবাব দিল পিঙ্কু । ' রোজ করি তো । আরও দুই চার দিন হলেই দুই সপ্তাহ হবে । তারপর নিয়ে ছেড়ে দেব পুকুরে ।'

কী   লাভ তাতে শুনি ?' জানতে চাইল নেপাল ।অবাক হয়ে বয়ামটা দেখছে । কাচের গোলাকার সুন্দর বয়াম । ভেতরে কিছু ঝাঁঝিপানা । অস্থির ভাবে মাছটা সাঁতার কাটছে ।

'লাভ হচ্ছে গিয়ে,  আমাদের জগত চেনালাম আর  কি ।' হাসি মুখে ব্যাখ্যা করলো পিঙ্কু । ' পুকুরে ফিরে গিয়ে ওর বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনদের বলতে পারবে ডাঙ্গার জগতটা কেমন । বলবে  বড় বড়  দালানের কথা। সবুজ পেল্লাই সব গাছের কথা । রিক্সা , গাড়ি । হই চই । বিজলির আলো, দোকান পাট ।   সব বলবে। অন্য মাছেরা অবাক হয়ে শুনবে । আমাদের মহল্লার গল্প ছড়িয়ে যাবে পুকুরের তলার  জলের জগতে । এই মাছটা বুড়ো হলে অনেক স্মৃতি নিয়ে বাঁচবে । কেউ ওর কথা বিশ্বাস করবে । কেউ করবে না।'

আমরা খুশি হলাম ।

পিঙ্কু চলে গেল ।

খানিকটা হাঁটতে দেখি আমাদের পরিচিত ভানটু দৌড়ে যাচ্ছে। একটা পলিথিন ব্যাগের দুই হাতল সরু এক লাঠির মাথায় গিঁট দিয়ে বেঁধেছে। ওর দৌড়ের কারণে উল্টা দিকের বাতাস এসে মউসুমি পালের মত ফুলে উঠেছে পলিথিন ব্যাগ।

ও চেঁচাচ্ছে , ' সাবধান ক্যাপ্টেন , সামনে পিত সাগরের ঝড়। '

কোথায় ক্যাপ্টেন , কোথায় ঝড় কে বলবে ? আসলে সিন্দবাদ টাইপের বই পড়ে ওর মাথা মুথা নষ্ট হয়ে গেছে। একেবারে ছোট মানুষ।

একবার আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম , ভানটু দৌড়ে এসে বলে, মিলু ভাই জলদি আসেন । আমাদের বাগানে কে বা কারা যেন কয়েকজন বুড়ো সাধুকে খুন করে লাশ পুঁতে ফেলেছে। শরীর পাইনি। শুধু মুণ্ডু পেয়েছি।'

জলদি দৌড়ে গেলাম।

গিয়ে কাটা মুণ্ডু পরীক্ষা করে ওকে বললাম , ' এইগুলো সাধু সন্ন্যাসী বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুণ্ডু না। তালের আঁটি। দা নিয়ে আয় কেটে দেই। ভেতরে মজার শাঁস আছে। খাবি।'

সেই থেকে ভানটু আমার ভক্ত।

 

প্রত্যেকটা রেল স্টেশন এক একটা কবিতা বা ছোট গল্পের মত।কখন বা তেলরঙ্গে আঁকা ছবির মত । কেউ কি এটা অনুভব করতে পারে ?

ক্লাস টুতে যখন পড়ি,  মানে বেশ পিচ্চি তখন । একা একা হাঁটতে হাঁটতে মহল্লা থেকে বেশ দূরে চলে গিয়েছিলাম । অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম দুই পাশে কালো দুই পুকুর । জল কলমি ভর্তি । পাশে ঢোল কলমির দংগল ।

লম্বা সবুজ ঘাসের মধ্যে লালটুকটুকে একটা গুমটি ঘর ।

ভেতরে পিতলের হ্যারিকেল জ্বালিয়ে বসে আছেন এক ভদ্রলোক । গলায় মাফলার । হাতে খবরের কাগজ । টেবিলেই ইয়া বড় খাতা । তেল চিটচিটে । মনে হয় খাতাটা গরম তেলে ভেজে বাসি করে ফেলা হয়েছে ।

ভদ্রলোক বসে বসে টিনের কালাই করা পেয়ালায় চা গিলছেন । খানিক দূরে টেলিগ্রাফ মেশিন । দেয়ালে সাদা ঘড়ি।

সব মিলিয়ে জমজমাট ব্যাপার।

স্বপ্নের মত একটা স্টেশন !

তখন থেকে কোন রকম ফুরসৎ পেলেই চলে যেতাম চাষারা ইসটিশনে । প্রত্যেকটা মৌসুমে দেখাত মত ছিল জায়গাটা ।

সাই সাই করে ডাকাতিয়া হাওয়া বয়ে যেত , দীঘল ঘাস শনশন করে শব্দ তুলত ভর দুপুরে । প্রায় আখের পাতার মত লম্বা ঘাস জন্মায় । অনেকদিন ভেবেছিলাম ওটা আলিফ্যান্ত ঘ্রাস ।

গুমটি ঘরের উপর ছিল নিম গাছ । ওদের চিরকি মিরকি পাতা ঝরে পরত কেমন করে । একটা মিষ্টির দোকান । কয়েকটা এলুমিনিয়ামের থালা ভর্তি মিষ্টি, পান্তুয়া , চমচম । পিতলের থালা ভর্তি গুড়ের জিলিপি ।

দুইবেলা পরোটা বানাত । সাথে ডেকচি ভর্তি  নরম  সবজি ভাজা। ঘ্রাণে পাগল হয়ে যাবার দশা । এক কড়াই গ্রিজের মত হালুয়া ।

টিনের বিতিকিচ্ছিরি একটা বালতি করে চা বিক্রি করত এক বুড়ো । একটা বয়াম । সেটার ভেতরে লাঠি বিস্কুট ।

দূরপাল্লার যাত্রীরা শখ করে কিনত এক পেয়ালা চা। শূন্য পেয়ালা বালতিতে চুবিয়ে পরের জনকে দিত বুড়ো । এক বালতি জলে সারাদিন চলতো। অমন আর কিছু মানুষ থাকলে সারা দুনিয়ায় জলের অভাব জীবনেও দেখা দিত না ।

সব কেমন ছবির মত।

আমি একা একাই ইষ্টিশনে চলে আসি ।

কেমন মিহি নরম স্বপ্নের মত জায়গা । মনে হয় যে কোন সময় হারিয়ে যাবে । মিলিয়ে যাবে বাতাসে ।

ঝক ঝক শব্দ করে ট্রেন আসে অনেক সময় পর পর । যায় কোথায় ওরা ?

লেনিনগ্রাদ ? অ্যারিজোনা ? ক্যালিফোনিয়ায় ?  যেখানে সোনার খনিতে কাজ করে এক গাদা দুরন্ত  লোক । দিনের শেষে ঝর্নার জলে ট্রাউট মাছ ধরে কয়লার আগুনে পুড়িয়ে খায় । সাথে থাকে বেকন ভাঁজা । কালো কুচকুচে কফি। আপেলের পিঠা।

নাকি শিকাগো ? নাকি নিউ ইয়র্ক  ?  বড় বড় দালান বাড়ি । একটার উপরে উঠে অভিমানে বসে থাকে কিংকং ।

আমি কবে যাব ?

হাঁটতে হাঁটতে নেপাল জানতে চাইল - আমরা কি রেড ইনডিইয়ানদের এলাকায় চলে এসেছি ?

ওটা একটা কথার কথা । শুনতে ভাল লাগে তাই বলি ।

আসলে ইষ্টিশনের কাছে খানিক জায়গার মাটি লাল । আর একটা গামছার সাইজের চওড়া নালা আছে । সারা বছর ঝির ঝির করে ঠাণ্ডা জল  হেঁটে  চলে যায় এক ডোবা থেকে অরেক ডোবায় ।

শেষ তক চলে এলাম ইষ্টিশনে ।

ইষ্টিশনের ঘড়ির হাত পাগুলো  ইশারায়   বলছে,  বিকেল পাঁচটার একটু বেশি ।

তাতে কিন্তু রোদের তেজ কমেনি একটুও । পোখরাজ পাথরের মত রোদের রঙ ।

এখানের বাতাসও দেশান্তরী । পাগলাটে । হু হু করে বয় । পাশে কালো কুচকুচে পেল্লাই ডোবা । নাম রেখেছি  আটলান্টিক । সারাক্ষণ বয়ে যাওয়া হাওয়ার তোড়ে কেমন শিশু ঢেউ জন্মায় । জলের মধ্যে কলমিলতা আর হেলেঞ্চার ঘ্রাণ ।

কয়েকটা লোক লোহার শিক দিয়ে মাটি খুঁড়ে কচ্ছপ বের করার চেষ্টা করছে । কখনও পায় কচ্ছপের ডিম ।

কচ্ছপের  জন্য আমার মায়া লাগে ।

আমাদের আরেক বন্ধু ভ্যাবলা কচ্ছপ পুষতো । হাতের তালুর মত সাইজ । কড়ির মত খোসা । নাম দিয়েছিলাম নিনজা  টারটেল । বাসি পাউরুটি দিলে বুড়ো মানুষের মত খেত । অনেক সময় ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে ।

এই ফাঁকে বলে রাখি আমার আরও  একটা  বন্ধু আছে  । কাউন্ট অব মন্টিক্রিস্টো । ওর আসল নাম মন্টি । কিন্তু ক্লাসিক বই পড়ার জন্য আমি ওকে এমন নামে ডাকি । ব্যাপারটা বেশ মনোরম ।

আমাদের দূর সম্পর্কের আরও দুই বন্ধু আছে।

দুইজনের নামই রবিন। আমরা সুবিধের জন্য ডাকি একজনের নাম রবিনসন ক্রুসো। আরেক জন সুইস ফ্যামিলি রবিনসন।

এখন যে রবিনসন ক্রুসো সে আসলে সাঁতার জানে না।

আর সুইস ফ্যামিলি রবিনসন যে ওদের বাড়িতে একবার ইলেকট্রিক সুইচ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

বাড়ির সবাই মানে পুরো ফ্যামিলির সবাই বিজলির শক খেয়েছিল। সেইজন্য এই নাম।

সহজ হিসাব।

 

ট্রেন আসবে কখন ?' বেশ একটা ভাব নিয়ে পাশে বসে থাকা ভিক্ষুকে জিজ্ঞেস করলাম ।

কইতে পারি না। আমি হপায় বইলাম ভিক্কা করতে । ভিক্কা দিবেন ?’   বিরক্ত বুড়ো জবাব দিল ।

পাশের দাদ খুঁজলির মলম বিক্রেতা জবাব দিল , এই ইত্তু পরেই আইব ।

মলম বিক্রেতার গায়ে এই গরমে সাফারি কোট । উনি সব কথা শুরু করেন ,  ‘ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওষুধ বিক্রি করি বলে অবহেলা করবেন না জনাব ।  শেক্সপিয়ার বলেছেন ...

তারপর পেল্লাই সাইজের একটা ইংরেজি বাক্য বলে ওষুধের গুণাগুণ ব্যাখ্যা করেন । উচ্চ শিক্ষিত মানুষ  না । কিন্তু  ইংরেজি বললে মানুষ পাত্তা দেয় । ওষুধ কেনে ।

ইষ্টিশনের চেহারা দেখতে হলে খানিক চুপচাপ বসে থাকতে হয় ।

আমরা তাই করলাম ।

রোদে ভিজে উড়ে যাচ্ছে পিতলের টুকরার মত চিল । ডোবায় ঝাঁপ দিয়ে উঠে সরপুঁটি । দূরে টায়ার পুড়িয়ে ভাত রান্না করছে দুঃখিনী মা । দুটো অলস লোক বসে বসে গুলতানি মারছে । ষোলগুটি খেলছে । গুটি বানিয়েছে রেল লাইন থেকে পাথর কুড়িয়ে ।

রেল লাইনের দুই পাশে চকমকি পাথর দিয়ে ভর্তি । কয়েকটা এত সুন্দর , হীরা ফেল ওর ঝিকিমিকির কাছে । মনে হয় অমূল্য সেই হীরা যার লোভে বণিকেরা দুর্গম পাহাড়ে চলে যেত । যেখানে গভীর খাদের মধ্যে পড়ে আছে অগুনতি হীরা । নিচে নেমে সেইসব তুলে  আনা অসম্ভব । কারণ হিরে পাহারা দেয় ভয়াল সব অজগর সাপ ।

তখন বণিকেরা মাংসের টুকরোর মধ্যে আঠা মাখিয়ে ফেলে দেয় খাদের মধ্যে । বড় বড় ঈগলের দল ঝাঁপিয়ে গিয়ে নিয়ে আসে সেই মাংস । আঠার জন্য সাথে উঠে আসে হীরার টুকরা ।

পরে ঈগলের বাসা থেকে বণিকেরা নিয়ে আসে হীরার টুকরোগুলো ।

 

হাওয়া বইছে কেমন মন খারাপ করে। বাতাসে নিম ফুলের সৌরভ ।

আচমকা শব্দ শোনা গেল ।

কুউউ ঝিঁকঝিঁক ।

রেলগাড়ি আসছে । কে যেন বলল ।

দেখলাম আসছে ওটা ।

হাফ প্যান্টের পকেট থেকে নেপাল একটা আলুমিনিয়ামের দশ পয়সা বের করলো । নয়নতারা ফুলের মত । সোজা দৌড়ে গিয়ে রেল লাইনের উপর রেখে এলো পয়সাটা ।

কি হবে ওতে ?' অবাক না হয়ে পারলাম না।

দেখ না চুপ করে ।' হাসল নেপাল ।

হন হন করে চলে এলো রেলগাড়িটা ।

পরিশ্রম করায় তেতে আছে রেলগাড়ির ইঞ্জিনটা   । ফোঁস ফোঁস করে দম ছাড়ছে । স্বাভাবিক । কতগুলো মানুষ আর মাল সামান নিয়ে দৌড়ে এসেছে । এখান থেকে নাকি কমলাপুর গিয়ে থামবে ।

অবাক হয়ে আমরা দেখতে লাগলাম রেলগাড়িটা ।

'কয় সের লোহা লেগেছে কে জানে ?' নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করলাম ।

'কম পক্ষে পাঁচশো টাকার লোহা  ।' মুখ কুঁচকে জ্ঞানী মার্কা ভাব করে বলল নেপাল ।

দম নেয়ার জন্য ইষ্টিশনে খানিক থামল রেলগাড়িটা । লোকজন উঠল । কেউ কেউ নামলো । আস্ত হারমোনিয়াম নিয়ে উঠে গেল এক ভিক্ষুক । ওটা বাজিয়ে গান গায় । এ আপ্নাহে দিল তো আওয়ারা ।

এত ভিড়ের মধ্যে ধাউস হারমোনিয়াম নিয়ে চলাচল করে কি ভাবে কে জানে ?

কুউউ ঝিঁক ঝিঁক করে আবার শ্বাস নিয়ে চলে গেল লোহার শুঁয়াপোকাটা ।

পয়সাটার কি হল? মারা গেছে ?' রেলগাড়িটা চলে যেতেই লাইনের দিকে চেয়ে বললাম ।

দৌড়ে গিয়ে পয়সাটা নিয়ে ফেরত এলো নেপাল ।

দেখে যার পর নাই অবাক হলাম ।  চ্যাপ্তা হয়ে কেমন একটা গোলাকার জিনিস হয়ে গেছে ।

এটা দিয়ে তো কিছু কেনা যাবে না ? হতাশ হলাম । নষ্ট হয়ে গেল তো।

কিনব না । হাসি মুখ নেপালের। এইখানে একটা ছিদ্র করব । পরে কাইতন দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে দিলেই কেমন একটা লকেট হয়ে যাবে। পুচকির জন্য বানানো হবে।

পুচকি নেপালের ছোট বোন।

আসলে কিছুই নষ্ট হয় না। সব কিছুই দামি। নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিসও দামি।

দিনটা অনেক ভাল গেছে । সবচেয়ে বড় কথা রেলগাড়ি দেখলাম । আজ রাতে ঘুম ঘুম চোখে কুউউ শব্দ শুনতে  পেলে আরও বেশি ভাল লাগবে । রোজকার চেয়েও বেশি ভাল লাগবে।

এবার বাসায় ফিরতে হবে। সূর্য পূর্ব দিকে চলে গেছে ।

কাঞ্চনরঙা রোদে সব মায়াবী দেখাচ্ছে ।

হাঁটতে লাগলাম । আবার সেই পথ । যে পথে এসেছিলাম ।  সেই পথেই  ফেরা। জীবনের নিয়ম ।

মোড়ের সামনে দেখি আমাদের শত্রু গাবলু গুড়া দুধ নিয়ে দোকান থেকে ফিরছে । কাগজের কোনে গুড়া দুধ দিয়েছে দোকানী । পেছন পেছন হেঁটে আসছে একটা তাগড়া কুকুর । ঠিক যেন বাস্কারভিলের সেই কুকুরটা।  

আমাদের দেখে গাবলু   বলল , ' তরা আমারে বাসা পর্যন্ত দিয়ে আয় । কুত্তাতার জন্য হাঁটতে পারতাছি না।'

ওর সঙ্গী হলাম ।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...