সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সন্দেশপুরের নীল রাক্ষস

 


সন্দেশপুরের  রাজপ্রাসাদটা পেল্লাই সাইজের ।

তিনশোটা বড় বড় কামরা আছে রাজপ্রাসাদে। ধূলা আর মাকড়সার জালে  ভর্তি।


 প্রাসাদে মাত্র সাতজন মানুষ থাকে । রাজা, রানী, রাজকুমার  হলুদকমল, বাবুর্চি, একজন জাদুকর, একজন চাকর বা ভৃত্য নাম-  মাকড় আলী ।


 আর আছে   একটা ভূত। যাকে অবশ্য কেউ গোনার মধ্যে ধরে না।  

তো গোনার মধ্যে না ধরলে সাতজন হয় কি করে ? আসলে সাত নাম্বার সদস্য হচ্ছে পিচ্চি একটা ছেলে । ওর নাম কি  ঠিক জানি না। সবাই ওকে পিচ্চি বলেই ডাকে। ছেলেটা খুব কাজের। সব ধরনের কাজ ওকে দিয়ে হয়। জলের পাইপ নষ্ট হয়ে গেলে মেরামত করতে পারে।  সেইজন সারাক্ষণ হাতে হাতুরি আর  সাঁড়াশি রাখে।   জাদুকর যখন মস্ত একটা মাটির পাতিলে  জড়িবুটি  জ্বাল দেয় তখন পিচ্চি সহকারী হিসাবে কাজ করে। কারন কাঠের বড় চামচ দিয়ে সেই জরিবুটি ঘুঁটা দিতে পছন্দ করে পিচ্চি।

তারপরও পিচ্চির বড় পরিচয় পিচ্চি এই প্রাসাদের দারোয়ান। কারন রাজা যখন  মাটির নীচে পাতালঘরে  অন্ধকূপে বসে সোনার মোহর গুনে তখন পিচ্চিকে বাইরে দাড়িয়ে থেকে পাহারা দিতে হয়।  এই একটা কাজ পিচ্চি পছন্দ করে না।  


 অন্ধকূপ জায়গাটা মাটির নীচে  সেটা আগেই বলেছি  ।

 ঘুঁটঘুঁটি অন্ধকার। মাত্র দুই চারটে মোমবাতি জ্বলে। আর কেমন যেন ছমছমে পরিবেশ। 

ভীষণ ঠাণ্ডা।  


মোহর গুনতে  রাজা   প্রচুর সময় নেয়। বারবার গুনে। বারবার ভুল করে। আবার গুনে।  গোনা শেষ করে মোটা টালি  খাতায় লিখে রাখে।  সে এক বিরক্তকর অবস্থা। খালি হাতে পাহারা দেয়ার কাজটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ওকে দেয়া হয়েছে লম্বা একটা ঝাড়ু। ও দিয়ে কি চোর তস্কর দূর করা যায়  ? মরচে ধরা একটা তলোয়ার দিলেও না হয় কথা ছিল। হায়রে মানুষ।

কিন্তু রাজা প্রতিদিন একবার করে অন্ধকূপে নেমে আসে। বসে বসে ঘণ্টার পর  ঘণ্টা মোহর গুনে সময় পার করে দেয়।  

 মহারাজ এত সময় নষ্ট   না করে আমাকে ঘোড়া চালান শেখালেই পারে।’  ঘোৎ ঘোৎ করে   অভিযোগ করে  রাজকুমার হলুদকমল।

রান্নাঘরে কয়েকটা তাক বানিয়ে দেয়ার জন্য ও তো আমাকে সাহায়্য করতে পারে। তাকে গুড়া  মশলা রাখতে পারতাম।  দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে রানী।

‘  সঙ্গীর অভাবে তাস খেলতে পারি না।নিজের  কপালে ঠাস করে চাপড়  মেরে বলে জাদুকর। রাজা আমার সাথে বসে দুই এক দান খেলতেও তো পারেন। বায়ান্ন তাসের ছাপান্ন খেলা জানি আমি। হ্যাঁ , পিচ্চি একটা ভূত আছে বটে কিন্তু তাস খেলার জন্য আদর্শ  সঙ্গী বলা যাবে না।

রাজা  কারও  কথাই  কানে নেয় না। মোহর গুনে তার সময় থাকে না।

আজও বসে মোহর গুনছিল। বাইরে ঠায় দাড়িয়ে আছে পিচ্চি।

‘  পয়তাল্লিস, ছিচল্লিশ, সাতচল্লিশ।’  মোহর গুনছিল রাজা। আচমকা গোনা থামিয়ে বলল, ‘ কিসের শব্দ শুনলাম না ?’

শব্দটা পিচ্চিও শুনেছে। 

বলতে  আপত্তি নেই অমন ভয়াল আর শরীর হিম করা চিৎকার আগে কেউ শোনেনি।  সারা রাজপ্রাসাদে প্রতিধ্বনি খেয়ে শব্দটা  কেমন আরও ভয়ংকর শোনাচ্ছে।   শব্দটা আসছে অন্ধকূপের ভেতরের গলি থেকে। যেখানে ধনরত্ন রাখা হয়।

এত ভয় পেল পিচ্চি আর রাজা দুইজনেই দৌড়ে চলে এলো উপরে।  জাদুকর প্রাসাদের মিনারে দাড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছিল। সেও দৌড়ে নীচে চলে এলো।  চাকর মাকড় আলী আর রানীও চলে এসেছে দৌড়ে।

আবারও শোনা গেল সেই ভয়াল চিৎকার।

বন্দিশালা থেকে কেউ চিৎকার করছে না তো।কাঁপতে কাঁপতে  জানতে চাইল জাদুকর।

অনেক বছর ধরে বন্দিশালা খালি।মাথা নেড়ে বলল রাজা। জেলখানায় বন্দি রাখা অনেক  খরচের ব্যাপার।

ইঁদুর না তো ?’ রানীর প্রশ্ন।

মনে হয় না।’  রাজার জবাব।

ঘেয়ো উওউওউউ।আবার শোনা গেল সেই পৈশাচিক চিৎকার।

মাকড়শা না তো ?’ বলল   রাজকুমার হলুদকমল।

মোটেই না।

ভূত হতে পারে।’  ঢোক গিলে  বলল মাকড় আলী।

সে রকম ই মনে হচ্ছে।বলল রাজা।  জাদুকর তুমি নীচে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখ। তোমার তো একটা পোষা ভূত আছে তুমি এই ব্যাপারে ভাল জানো।

আমার ভূত এমন বাজে শব্দ করে চিৎকার করে না। ওটা ভদ্র ভূত।  হাত পা নেড়ে প্রতিবাদ করলো জাদুকর।

সে যাই হোক। তুমি নীচে গিয়ে ব্যাপারটা খোঁজ নাও। এটা তোমার কাজ।

ইস এই মাত্র মনে পড়লো চুলায় আমার পাতিল বসানো আছে। দেরি হলেই পুড়ে যাবে।এই বলে জাদুকর দৌড়ে মিনারে নিজের কামরায় চলে গেল। গিয়েই বিছানার তলায় শুয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে মরার মত শুয়ে রইলো।

আসলে এটা জাদুকরের কাজ না।বিড়বিড় করে বলল রাজা । কাজটা হচ্ছে...

বলেই সবার দিকে ফিরে তাকাল রাজা। সাথে সাথেই রানী, রাজকুমার আর মাকড় আলী  দৌড়ে চম্পট দিল।

 কাজটা হচ্ছে একজন প্রহরীর। তো পিচ্চি তুমি নীচে নেমে দেখ তো শব্দটা কিসে করছে। এটা রাজার হুকুম।

আমাকে একটা অস্ত্র   আর আলোর ব্যবস্থা করে দিন।বলল পিচ্চি।

রান্নাঘর  থেকে  একটা লোহার ডালঘুঁটনি আর হারিকেন এনে দেয়া হল পিচ্চিকে। তাই নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে সিঁড়ি বেয়ে  মাটির নীচের অন্ধকূপে চলে এলো পিচ্চি। সেই ভয়াল চিৎকার আবার  শোনা যাচ্ছে। 

ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল সে। 

কাঠের মোটা দরজাটা টান দিয়ে খুলতেই ভেতরে কেমন শব্দ পেল। আবছা আলোতে দেখতে পেল জিনিসটা। নীল রঙের উলের বলের মত। মুখ ভর্তি দাঁত। বড় বড় নখ। লিচুর মত দুই চোখ।

জিনিসটা লাফ দিয়ে পিচ্চির জুতার মধ্যে কামড় বসাতে চাইল।

 খপ করে ধরে ফেলল পিচ্চি। একদম ছোট একটা জিনিস। ছোট একটা জাম্বুরার সাইজে। নরম তুলতুলে।


 দেখেই চিনল পিচ্চি। আরে এটা তো নীল রাক্ষস। খুব দুর্লভ ধরনের রাক্ষস। সহজে পাওয়া যায় না।  ঘন অন্ধকার জমাট বেঁধে অমন নীল রাক্ষস জন্ম নেয়।  অন্ধকারে থাকতে পছন্দ করে ওরা। শুধু চিৎকার করে। কেউ ভয় পেলে খুশি হয়। বাতাস খেয়ে বাঁচে।

তুলতুলে রাক্ষসটা নিয়ে উপরে চলে এলো পিচ্চি।  

রাজার সামনে  নিয়ে বলল , এই যে মহারাজ এনেছি।

এটা ।অবাক হল রাজা।

রাজাকে দেখেই নীল রাক্ষস চিৎকার করে উঠলো। ভয়ে পিছিয়ে গেল রাজা। বলল, ‘ নিয়ে যাও এই বিচ্ছিরি জিনিসটা আমার সামনে থেকে।

কোথায় ?’

যেখানে খুশি।

রানীর কাছে নিয়ে গেল পিচ্চি।

উহু ওটা আমার রুমে রাখব না।নীল রঙ মোটেই পছন্দ না আমার। ’  সাফ জবাব দিল রানী।

রাজকুমার  আপনি নেবেন ?’ জানতে চাইল পিচ্চি।

আরে নাহ। বিচ্ছিরি। আমি কেন নেব ? ঘোড়ার বাচ্চা হলে নিতাম।

মাকড় আলী ?

না  রে ভাই আমার রুমে জায়গা নেই। জায়গার অভাবে আমার পুরানো মোজা সের দরে বিক্রি করে দিলাম।জবাব দিল মাকড় আলী।

মিনারে জাদুকরের কাছে গেল পিচ্চি। বাইরে থেকে হাক দিয়ে বলল, ‘ জাদুকর আপনি বিছানার নীচে কি করছেন ? ’

ধূলা  পরিষ্কার করছি। ধূলায় অ্যালার্জি আছে আমার।

নেবেন নাকি এই  নীল রাক্ষসটা ?’

আরে না। রাক্ষস দিয়ে আমি কি করব ?   আমার একটা পোষা ভূত আছে। ওটাকেই ঠিক মত লালন পালন করতে পারি না। এটা তো ভাই চিড়িয়াখানা না।  লাগবে না।

কি করব এটা দিয়ে।

সেটা তো ভাই বলতে পারব না। তুমি রাজপ্রাসাদের প্রহরী তোমার কাজ এই সব সিধান্ত নেয়া।বলেই জাদুকর ব্যস্ত হয়ে পড়লো জরিবুটি জ্বাল দেয়ার কাজে।

নীল রাক্ষসটা রোদ  পছন্দ করে না। সারাক্ষণ ওটা চোখ পিটপিট করছিল।  পিচ্চি বুঝতে পারল অন্ধকার ওরা পছন্দ করে। নিচতলায় অন্ধকূপে নিয়ে উলের বলের মত তুলতুলে রাক্ষসটা ছেড়ে দিল। ছাড়া পাওয়া মাত্র টেনিস বলের মত দৌড়ে পালিয়ে গেল ওটা।  সোজা গিয়ে একগাদা মোহরের উপর বসে রইল নীল রাক্ষস।

জায়গাটা পছন্দ হয়েছে ?’ জানতে চাইল পিচ্চি।

উমুঘাহাহা।মাথা নাড়লো নীল রাক্ষস।  

যাক আশা করি নীল রাক্ষসের ভয়ে কোন চোর ডাকাত  মোহর চুরি করতে আসবে না।মনে মনে ভাবল পিচ্চি। ভারি দরজা বন্ধ করে চলে এলো সে।

উপরে রাজা অপেক্ষা করছে। পিচ্চিকে দেখেই বলল,’ আরে আমি তো আমার মোহর গুনে শেষ করিনি। চলো পাতালঘরে।

মহারাজ আপনার নতুন প্রহরী আছে ওখানে।হাসলো পিচ্চি।

কে ?’ অবাক হল রাজা ।

 নীল রাক্ষসটা।

ঢোক গিলে রাজা বলল, ‘ আচ্ছা আজকে আর মোহর গুনতে হবে না। কাল বা পরশু গুনলেই চলবে। সামনের সপ্তাহে বা সামনের মাসে  হলেও চলবে।  এক কাজ করি আমরা বরং সামনের  বছরে  কাজটা করি কি বল ?’

মনে মনে হাসল পিচ্চি।

নীল রাক্ষসটা নিচের সেই অন্ধকূপেই স্থায়ী ভাবে রইল। ঠাণ্ডা আর অন্ধকার খুব প্রিয় ওর। ভীষণ চিৎকার করে। ভয়ে কেউ , মানে চোর ফোর ওখানে যায় না। মোহরগুলো নিরাপদেই আছে।

রাজাও আর ওখানে গিয়ে ঘণ্টার  পর  ঘণ্টা সময় নষ্ট করে না। প্রজাদের কাজে সময় দিতে পারে।

সবাই খুশি।

 ( Emma Laybourn  এর  The Thing in the Dungeon অবলম্বনে)

 

   

  

   

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...