শীতের মৌসুমে মানুষগুলো বিপদে পড়ে যেত।
টানা চার মাস হাড় ঝমঝমে শীত। বরফ পড়ছে। তো পড়ছেই।
আচমকা খাবার শেষ হলে মস্ত বিপদ। কয়েক মাইলের মধ্যেও কোন সুধীর বাবুর মুদির দোকান নেই। প্রতিবেশী বহু দূরে - দূরে। মন চাইলেও কারও দরজা খট খট করে বলা যাবে না- এক পেয়ালা চিনি দেবেন কাকি ? পরশু দিন বা তরশু দিন বাজার থেকে আনলেই ফেরত দিয়ে দেব।
শুনতে আজগুবি মনে হলে ও উত্তর আমেরিকার প্রথম দিকের জীবন যাপন এমনই ছিল । সারা বছর যাই কর না কেন শীতের জন্য অতিরিক্ত খাবারের মজুদ দিয়ে ভাঁড়ার কামরা ভর্তি করে রাখতে হবে।লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডার ভদ্রমহিলার বইগুলো পড়লে আপনারাও টের পাবেন।
খাবার জমিয়ে রাখার বেশির ভাগ কায়দা আসলে এই শীতের জন্যই। হরেক কায়দা করে খেতে হত। শুকনো মাংস আর ময়দা মিলে মিশে হয়ে যেত- মিট পাই।
পনির , মাখন বা চর্বি বেশ কাজে দিত তখন।
ভাঁড়ার ঘরে রাখার জন্য আলু, গাজর , শালগম এই ধরনের শিকড় জাতীয় সবজি বেশ কাজের।অন্য সবজি রাখা বেশ একটা ঝক্কির ব্যাপার।
তখন একটা সবজি বেশ হিরোর ভুমিকা পালন করতো - পেঁয়াজ। নিম্নপদস্থ অবহেলার পাত্র পেঁয়াজ সারা বছর তেমন একটা পাত্তা না পেলেও শীতের দিনগুলোতে সে হয়ে যেত রক্ষাকর্তা। বিশেষ করে গরীব মানুষজন - যাদের ভাঁড়ার ঘরে মাংসের মজুদ তেমন একটা থাকতো না।
সামান্য চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন, মাংসের অভাব একটা মাত্র সবজি মেটাতে পারে। পেঁয়াজ।
তখন রসুনের ব্যবহার অত চালু হয়নি ।
আজকাল পিৎজা সস হতে শুরু করে, পাস্তা বা স্প্যেগেটিতে এক কোয়া হলেও রসুন চলে আসে। তখন অমনটা হয়নি।
পেঁয়াজ মাত্রই তখন সৌরভ আর স্বাদ। যেমন, আপনি কোন কিছুতে চিনি দিলে সেটা মিষ্টি হবেই হবে। তেমনই স্বাদ মানেই বা খাবারে সৌরভ মানেই পেঁয়াজ।
তখনই বাড়ির গিন্নিরা আবিস্কার করল পয়া একটা খাবার। অনিয়ন স্যুপ। তেমন কিছু না প্রচুর পেঁয়াজ কুঁচি কুঁচি করে কেটে সামান্য মাখন দিয়ে ভেজে তাতে গরম জল দিয়ে কর সিদ্ধ । সাথে তেজপাতা আর লবঙ্গ দিয়ে বেশ খোশ মেজাজি একটা ভাব হয়ে যায়। যদি থাকে সামান্য সাদা ওয়াইন, দাও ঢেলে । ইয়ে মানে যদি থাকে তবে স্বাদ বাড়ানোর জন্য গরু বা শূয়রের মাংস সিদ্ধ জল থাকে দাও ঢেলে ।
খাবার টেবিলে পরিবেশন কর বোল ভর্তি করে পেঁয়াজের সেই সূপ । সাথে মাখন দিয়ে তাওয়ায় টোস্ট করা দুই এক ফালি বাদামি রুটি।
সহজে পেট ভড়ে যায়। শরীর হয়ে যায় বেশ উষ্ণ।
সারা দুনিয়ার বিখ্যাত এই "ফ্রেঞ্চ অনিয়ন স্যুপের জন্ম এইভাবেই।
তবে রোমানরাও পেঁয়াজের স্যুপ খেত। সস্তা জিনিস, তাই। প্রচুর পেঁয়াজ হত তখন। গরিবেরাই খেত। ধনীরা পেঁয়াজ এড়িয়ে চলতো।
আর কে না জানে সব গরীবের খাবারই পরবর্তীতে ধনী আর বিলাসী খাবার হয়ে গেছে।
সিমোন বেক, লুইসেট বার্থোল এবং জুলিয়া চাইল্ড মত ফুড রাইটারেরা মন্তব্য করেছেন, "পেঁয়াজ ছাড়া সভ্যতা কল্পনা করা কঠিন। "
ব্রিটেনে, ১৮২৭ সালে প্রকাশিত ‘ দ্য কুক অ্যান্ড হাউসওয়াইফস ম্যানুয়াল’ -এ পেঁয়াজ স্যুপের প্রথম রেসিপি ছাপা হয়েছিল।
এই শতকের শুরুতে, লন্ডনের পিকাডেলির রাস্তায় অনিয়ন স্যুপের দোকান খোলা হয়। বেশ কয়েকটা । দূর পাল্লার যাত্রীরা বা মাতালেরা কিনে খেত এক আধ বোল।
মাতালদের দাবী - প্রচুর মদ্যপানের পর যখন সব কিছু আউলা বাউলা লাগে মানে যেটাকে আজকাল হ্যাং অভার বলে, তখন গরম পেঁয়াজের স্যুপ খেলে মাতলামি কেটে যায় । শরীরে বেশ তাগড়াই একটা ভাব এসে যায়।
সারা রাত খোলা থাকতো পেঁয়াজের স্যুপের দোকানগুলো।
আজকাল অভিজাত ক্যাফেগুলোতে ফ্রেঞ্চ অনিয়ন স্যুপের নামে যা বিক্রি হচ্ছে সেটা কিন্তু মূল রেসিপি থেকে হাজার গুণ দূরে চলে গেছে ।
আদিম অনিয়ন স্যুপ ছিল একদম সাধারণ সহজ একটা জিনিস।
রোমানদের হিসাবে পেঁয়াজের এই স্যুপ খাওয়া হত প্রায় এক হাজার বছর আগে থেকেই। আগেই বলেছি সেটা। তবে তখন নাকি আবার ওষুধ হিসাবেও অনেকে খেত।
কী কাণ্ড !
তবে রোমানদের সময়ে পেঁয়াজের স্যুপে পেঁয়াজের পরিমাণ থাকত কম। বেশি করে ঠেসে দেয়া হত কড়াইশুটি , পার্সলে , সাথে অন্য কোন সবজি।
আজকাল বাজারে যে রকম অনিয়ন স্যুপ চলে সেটা জনপ্রিয় করেছিল ফরাসিরাই। সেইজন্য তো এই স্যুপের নাম ফ্রেঞ্চ অনিয়ন স্যুপ হয়ে গেছে।
যারা আমার কাছ থেকে খাবারের গল্প শোনেন , নিশ্চয়ই জানেন বেশির ভাগ খাবারের গল্প একদম থ্রিলার গল্পের মত। একই খাবারের জন্য অনেক- অনেক শাখা গল্প ছাড়িয়ে থাকে। ক্লাসিক এই পেঁয়াজের স্যুপেও আছ রাজকীয় গল্প।
গল্পটা অমন - ফ্রান্সের রাজা পনেরোতম লুই মানে সবাই যাকে লুই XV বলে, উনি গিয়েছিলেন শিকারে।
ভাল কথা।
রাজা গজারাই তো শিকার করবে। আপনি আমি না তো।
শিকার শেষে হান্টিং লজে ফিরে খানিকটা খিদে অনুভব করলেন। নিজেই গেলেন রান্নাঘরে। কিছু বানাবেন আর কি।
হায় হায়।
গিয়ে দেখেন রান্নাঘরে পেঁয়াজ, মাখন আর শ্যাম্পেন ছাড়া কিছু নেই। এটা কোন কথা ?
তখন রাজা লুই এইসব জিনিস ঘুঁটে মুটে বানিয়ে ফেললেন প্রথম অনিয়ন স্যুপ।
গল্পটা জনপ্রিয় হলেও বেশ কিছু প্লট হোল আছে গল্পে। তারচেয়ে বড় কথা, এই গল্পের বহু আগে থেকেই দুনিয়ার নানান দেশে অনিয়ন স্যুপ খাওয়া হচ্ছিল।
আর রাজা শিকার করতে গিয়েছে শুধু মাত্র পেঁয়াজ , মাখন আর শ্যাম্পেন নিয়ে ?
এইসব কি ?
অনিয়ন স্যুপের দ্বিতীয় গল্পটা আমাদের বলেছেন আলেকজান্ডার দ্যুমা, সেই বিখ্যাত থ্রি মাস্কেটিয়ারের লেখক।
দ্যুমার কথা হিসাবে অনিয়ন স্যুপ জনপ্রিয় করেছিলেন , লরেনের ডিউক স্ট্যানিস্লাস লেসজিনস্কি । যিনি আবার ছিলেন পোল্যান্ডের প্রাক্তন রাজা।
তিনি ভ্রমণ করার সময় একটা সরাইখানাতে খেতে বসে পেঁয়াজের স্যুপের স্বাদ গ্রহণ করেছিলেন।
বাইরে ছিল ঠাণ্ডা। গরম ধোঁয়া উঠা পেঁয়াজের স্যুপ খেয়ে মনে হল, জিনিসটা শুধু স্বাদু না পেট ও জলদি ভরে গেল।
তখনই তিনি রান্নাঘরে ঢুকে বাবুর্চিকে হুকুম দিলেন তার সামনেই যেন অনিয়ন স্যুপ বানিয়ে দেখায়। জিনিসটা শিখবেন ।
পেঁয়াজের ঝাঁঝে তার চোখ দিয়ে টলমল করে জল ঝরেছিল। তারপরও পুরো ব্যাপারটা নিজের চোখে দেখেন। নোট বইতে লিখে নেন রান্নার কায়দা।
তারপরও তিনি রান্নার পুরো ব্যাপারটা বেশ কয়েকবার দেখে, শিখে নেন অনিয়ন স্যুপ বানানোর শৈল্পিক বিদ্যা।
এই গল্পে দাবী করা হয়নি ডিউক স্ট্যানিস্লাস লেসজিনস্কি অনিয়ন স্যুপ আবিস্কার করেছিলেন। কারণ এই ঘটনার একশো বছর আগেই ছাপান বইতে পেঁয়াজের স্যুপের বর্ণনা আছে। তবে সন্দেহ নেই স্ট্যানিস্লাস লেসজিনস্কি পেঁয়াজের স্যুপ জনপ্রিয় করেছিলেন।
কারণ এই ঘটনার পর তিনি কাউকে নিমন্ত্রণ দিলে অবশ্যই পেঁয়াজের স্যুপ খাওয়াতেন। আন্তরিক ভাবে জিজ্ঞেস করতেন , জিনিসটা কেমন হে ?
তারপরে ও অনিয়ন স্যুপের আবিস্কারক হিসাবে কাউকে ব্যাক্তিগত ভাবে বাহবা দেয়ার দরকার মনে করি না।
উনিশ শতকের শুরুতে ফ্রান্সের লোকজনের কাছে অনিয়ন স্যুপ বেশ জনপ্রিয় হয়ে যায়।
লেস হ্যালস , প্যারিসের কেন্দ্রীয় তাজা সবজি আর কাঁচা বাজার। প্রায় একশো বছর ধরে ওখানের ফুটপাথে অনিয়ন স্যুপ বিক্রি হত।
উনিশ শতকে লেখক এমিল জোলা তার লেখায় বর্ণনা করেছেন-
‘টিনের পেল্লাই কড়াই , ভর্তি স্যুপ। হালকা ধোঁয়া উঠছে। অল্প আঁচের স্টোভের উপরে বসা। কয়লার ফ্যাকাশে আভা স্টোভের ভেতরে । পাশেই বেতের ঝুড়ি উপর তোয়ালে বিছিয়ে উপরে রাখা পাতলা রুটির ফালি। বিক্রেতা মহিলা একটা দুটো রুটি তুলে নিয়ে ফেলে দিচ্ছে হলুদ মগে। হাতা করে স্যুপ নিয়ে ভর্তি করে দিচ্ছে পেয়ালা।’
দারুণ বর্ণনা, তাই না ?
ভাল কথা, তখন কিন্তু বাঁধাকপির স্যুপ ও বিক্রি হত রাস্তা ঘাঁটে। কিন্তু সময়ের দৌড়ে বাঁধাকপির স্যুপ ক্লাসিক জিনিস হতে পারে নি। যেমনটা পেরেছে অনিয়ন স্যুপ।
পেঁয়াজের স্যুপে তখনও পনিরের কুঁচি দেয়া শুরু হয়নি। আরও পরে অভিজাত দোকানে যখন বিক্রি শুরু হয়, তখন দোকানিরা চালু করে পনিরের কুঁচি ।
অভিজাত দোকানগুলোতে লিখিত দাবী ছিল, ওয়াইন হ্যাং ওভারের প্রভাব কাটাতে অনিয়ন স্যুপ কাজের জিনিস। তাদের এই বিজ্ঞাপন বেশ কাজে দিয়েছিল তখন।
১৯১৩ সাল পর্যন্ত অনিয়ন স্যুপের যত রেসিপি ছাপা হয়েছে সবগুলোতেই আগে পনিরের কুঁচি আর টোস্ট করা রুটি দিয়ে উপরে স্যুপ ঢেলে দেয়া হত।
এটাই আদিম রেসিপি।
কিন্তু ১৯২৭ সালের রেসিপি ‘স্যুপ এলোনীয় গ্যাতিনে’ নামে যে রেসিপি ছাপা হয় তাতে স্যুপের উপরে রুটি আর রুটির উপরে পনিরের কুঁচি দেয়ার কথা লেখা হয়।
এবং এই নিয়ম মেনেই সারা দুনিয়ায় এখন ফ্রেঞ্চ অনিয়ন স্যুপ বানানো হচ্ছে। এটাই জনপ্রিয়। দেখতেও ভাল।
যে কোন পেল্লাই খানাপিনা শুরুর আগে ফ্রেঞ্চ অনিয়ন মস্ত কাজের একটা জিনিস।
আপনি যদি আজকাল খেতে যান হয়তো আপনার এশিয়ান জিভে জিনিসটা ততবেশি আকর্ষণীয় লাগবে না। এর চেয়ে পেঁয়াজের ফুলুরি বা পাকোড়া বেশি ভাল লাগবে।
কিন্তু খাবারের ইতিহাসে ফ্রেঞ্চ অনিয়ন স্যুপ নিজের একটা জায়গা দখল করে রেখেছে। থাকবে আরও অনেক দিন।
আর যেহেতু খাবার নিয়ে হবে আপনার পেশা , শিখে নিন পেঁয়াজের স্যুপ বানানো। বানিয়ে প্রিয়জনকে বা নিজেকেই পরিবেশন করুন মখমলের মত শীতের কোন এক সন্ধ্যায়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন