সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ক্ষুদে মাছ অ্যাঞ্চোভি

 অ্যাঞ্চোভি (anchovy) নামটা শুনে অনেকেই ভড়কে যায়।

 বিশেষ করে তোম্বা চেহারার ইটালিয়ান পিৎজাওয়ালা যখন জানতে চায়,  পিৎজাতে অ্যাঞ্চোভি  দেবে কিনা বা সীজার সালাদে দুই একটা অ্যাঞ্চোভি  থাকবে কিনা তখন  অনেক বাঙ্গালী খদ্দের সবজান্তার ভান করে বলে- আরে ভাই দ্যান তো । পিৎজা কি   নতুন খাই নাকি। আমার দাদার কুলখানির সময় তিনশো পিৎজা দিয়ে শোকার্ত   মানুষজনকে আপ্যায়ন করেছিলাম।

 পরে অ্যাঞ্চোভিয়ালা খাবারটা যখন টেবিলে আসে হায় হায় করে উঠে সেই  সবজান্তা পিৎজা লাভার।

 নো ইয়োর প্রডাক্ট বলে একটা কথা আছে।

 জানুন।

 জানলে ক্ষতি নেই।




 একদম ক্ষুদে  একটা মাছ এই  অ্যাঞ্চোভি । রুপালী রঙের, খানিক সবুজ আভা আছে।  নোনা   জলে  থাকে। লম্বায় বেশি হলে ৩ ইঞ্চি হবে। দেখতে হেরিং মাছের মত।

 আটলান্টিক থেকে নরওয়ে। সাউথ আফ্রিকা থেকে মেডিটেরিয়ান সাগর,  কোথায় নেই ওরা?

 সারা দুনিয়ার পাওয়া গেলেও ইতালির উপকূলে বেশি ধরা পরে।  তবে স্পেনের অ্যাঞ্চোভির স্বাদ সবচেয়ে দারুন।

 দল বেঁধে  থাকে ।  অগভীর আর গরম স্রোতে ঝাঁক বেঁধে সাঁতার কাটে।

অনেকে সারডিন মাছের সাথে অ্যাঞ্চোভি র পার্থক্য ধরতে পারে না।  টাটকা অ্যাঞ্চোভি বিক্রি খুব কমই হয়। বেশির ভাগ সময় কাঁচের বয়ামে বা  টিনের কৌটার মধ্যে ভরে বিক্রি করে।  জলপাই তেলে ডুবানো থাকে। এমন কি  মাছটা পেস্ট বানিয়ে টুথপেস্টের টিউবের মত টিউবে করেও বিক্রি করে।

 আটলান্তিক মহাসাগরে অ্যাঞ্চোভি বেশ ঝাঁক বেধে চলাচল করে । ঠিক যেন নীল সমুদ্রে কালো  মেঘের দলার মত। পুরানো দিনের নাবিকেরা বড় মাছ ধরার টোপ হিসাবে    অ্যাঞ্চোভি ব্যাবহার করতো।

 ইটালির সিসিলির বন্দরগুলোতে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত  সময়টাতে  যদি বেড়াতে যান,  তবে দেখতে পাবেন হীরের কুঁচির মত বরফ ভর্তি কাঠের বাক্সে ঘুমিয়ে  আছে পিচ্চি পিচ্চি অ্যাঞ্চোভি । ওখান থেকে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন কারখানাতে।

 কারখানায় নিয়ে মাছের নাড়িভুঁড়ি বের করে পরিষ্কার করে। আঁশ পরিষ্কার করে অতিরিক্ত  ফ্যাট ফেলে দেয়।

 কাঁচের জারে বা টিনের কৌটায় অ্যাঞ্চোভি ঠেসে ভরার আগে লবণে  মাখিয়ে নেয়। ওতে  কেমন    নোনা ইলিশের মত একটা ভাব হয়ে যায়।  জলপাই তেলে বয়াম বা টিন ভর্তি করে  সিল  করা হয় মুখটা।

বিক্রির উদ্দেশ্যে শহরে চলে যায়।

আমার মনে হয় ইটালিয়ান আর মেডিটেরিয়ান শেফদের জন্য এই মাছটা এত বেশি  বিখ্যাত হয়েছে।  সত্যি বলতে কী ,   যতটা না এর স্বাদ।  তার চেয়ে বেশি এর সুনাম।

ওরচেস্টারশায়ারের   মত বিখ্যাত সস বানাতে অ্যাঞ্চোভি লাগবেই।   অস্বীকার  করার কোন  উপায় নেই,   পিৎজা - পাস্তা আর সীজার সালাদে অ্যাঞ্চোভি   দিলে  খাবারের  স্বাদ বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়।

 সেই পুরানো দিনে রোমানরা মাটির জালার মধ্যে অ্যাঞ্চোভি ভরে রাখতো ,  শুধু লবন দিয়ে। মাছের পরতে পরতে লবন ঢুকে যেত।  জল বের হয়ে শুঁটকির   মত হয়ে যেত জিনিসটা । সংরক্ষণ করতে পারতো বহু দিন।

আজও অনেক  ডুবে যাওয়া প্রাচীন রোমান  জাহাজে  সেই রকম  মাটির জালা পাওয়া যায় ।

   মজার হলেও সত্যি,  জ্যামাইকার   একটা শহরের নাম অ্যাঞ্চোভি । কেন কে জানে, খোঁজ  পেলে আপনাদের জানাবো।

 জেলেরা বলে- জোসনা রাতগুলোতে নাকি অ্যাঞ্চোভি সহজেই ধরা পরে। ওদের রূপার ফালির  মত শরীর ঝিকিমিকি করতে থাকে ভরা চাঁদের আলোতে।

 পুরানো দিনের নাবিকেরা মাটির জালা ভর্তি করে লবণ দিয়ে মাখানো অ্যাঞ্চোভি  সঙ্গে নিত।ওষুধ হিসাবে।  ওটা খেলে নাকি সী সিকনেস থেকে মুক্তি পেত।  আর প্রয়োজনীয় প্রোটিন পাওয়াতে সারাদিন গাধার মত খাটুনি করতে পারতো।

 অ্যাঞ্চোভির ঝাঁক কখনই শেষ হয় না। ওদের যেন শেষ নেই।

 একটা মাছ ২৫ হাজার করে ডিম পারে। লম্বাটে সসেজের আকারের ডিম।  মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পরই ডিম থেকে ছানা পোনা বের হয়ে সাঁতার কাটতে থাকে  ।

 মে থেকে অক্টোবর মাসে অগভীর জলে  চলে আসে ওরা। প্লাকটন খাওয়ার  লোভে। ধরাও পরে ঝাঁকে ঝাঁকে। বিশেষ করে ভরা জোসনার রাতে।

 নোনতা স্বাদটা বাদ দিলে অ্যাঞ্চোভি বেশ উপকারি মাছ। খাবারের  মধ্যে যত ভিটামিন থাকা দরকার প্রায় সবই আছে।  ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, আয়রন। ফসফরাস, ওমেগা ফ্যাট -থ্রি ।  কি নেই?

 ব্রেইন ড্যামেজ হতে শুরু করে হাড়ের ক্ষয় সবই নাকি ভাল হয়ে যায় পিচ্চি এই  মাছটা খেলে।

 আগস্টের ১৮, ১৯৬১ সালে একটা  অদ্ভুত  কাণ্ড হয়েছিল।

 ক্যালিফোনিয়ার নর্থ মনটরে উপকূলে এক ঝাঁক সামুদ্রিক পাখী পাগলের মত উড়ে   এসে রাস্তায় পরে মারা গিয়েছিল।

 বেশ রহস্যময় একটা ব্যাপার।

 আর এই ব্যাপারটা নিয়ে আলফ্রেড হিচকক তার বিখ্যাত সিনেমা -দ্যা বার্ড বানিয়েছিলেন।

 তো, পুরানো দিনের কিছু নাবিক দাবি করতো অ্যাঞ্চোভি মাছ খেলে পাখী অমন  পাগলের মত আচরণ করে।

 তবে ব্যাপারটা ডাহা মিথ্যা কথা।  নাবিকদের কোন কথাই আমি বিশ্বাস করি না।  ওরা গল্প ছড়াতে পছন্দ করে। এই জন্য আমরা যেমন বলি- আষাঢ়ে গল্প।  তেমনি বাইরের দেশে  ওরা বলে- নাবিকদের গল্প।

 অ্যাঞ্চোভি র হাজার রেসিপি আছে। তবে সীজার সালাদ আর পিৎজার সাথে  দারুন যায়।  পিৎজা ডেলেভারি বয়দের সেই বিখ্যাত সংলাপ- পিৎজার সাথে অতিরিক্ত  অ্যাঞ্চোভি চান স্যার ?

 ইটালিয়ানরা ২০০০ বছর আগে থেকেই রুটির সাথে এই  মাছ দিয়ে খেত।

 ১৮০০ সালের দিকে ইটালিয়ানরা  আমেরিকায় যাবার পর এই কায়দা করে   জনপ্রিয়  করে ফেলে মাছটাকে । ১৯১০ থেকে ১৯২০ সালে শিকাগো শহরের সব পিৎজার  দোকানগুলোতে মুঠো মুঠো অ্যাঞ্চোভি ব্যবহার করতে থাকে।  পিৎজার সাথে অ্যাঞ্চোভি খাওয়া সেই সময়  একটা বড় রকমের ফ্যাশন হয়ে যায়।

 নিজেদের ভোজন রসিক প্রমান করার জন্য লোকজন তখন  অ্যাঞ্চোভি দেয়া পিৎজা খাওয়া শুরু করে।

 ২০১১ সালের হিসাব মতে,  পিৎজার জনপ্রিয় উপাদান হচ্ছে- পনির,ক্যাপসিকাম,  টমেটো,পেঁয়াজ আর অ্যাঞ্চোভি ।  আর এই যুগে ইটালিয়ান পিৎজার সাথে জলপাই আর অ্যাঞ্চোভি ? মাস্ট গো ।

 আহ।  জল এসে গেছে জিভে।

 সীজার সালাদের ড্রেসিঙে অ্যাঞ্চোভি না থাকলে হয় কি করে ?  নরম আঠালু পনির, ডিমের হলুদ কুসুম রসুনের কুঁচি আর নোনা অ্যাঞ্চোভি ।  কল্পনা করুন।

 অ্যাঞ্চোভি র হরেক রেসিপি থাকলেও সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে , অ্যাঞ্চোভি   স্যানডউইচ।

একদম সোজা।

টোস্ট করা দুই টুকরো পাউরুটির মাঝে  সামান্য মাখন দিতে হবে। ৩ থেকে ৪টা অ্যাঞ্চোভি র ফালি । যদি মন চায় তবে  লেটুস আর একফালি টমেটো।

 ব্যস রেডি।

 ব্যক্তিগত ভাবে আমি অ্যাঞ্চোভি র মহা ফ্যান না। গরম ভাতের সাথে কয়েকবার খেয়েছি।

 তবে এটা ছাড়া ক্লাসিক  রেস্টুরেন্টগুলো   চলেও না।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...