এই তো । মাত্র সেই দিনের কথা ।
ধূলাকাঁদা মেখে , সস্তাপুরের চাঁদমারি থেকে খেলা শেষে বাড়ি ফিরতাম।
পথের দুই ধারে মায়ের শাড়ির মত সরু নালা। কালো জলে টইই টুম্বুর।
এঁকে বেঁকে চলে গেছে । বহু বহু দূর ।
নালায় যেই সব পাতা ঝাঁঝি জন্মাত , ওরা অবাক করতো আমাকে ।
আরও বেশি অবাক করার মত ব্যাপার , সেই সব নালায় মাছ ছিল। অদ্ভুত সব মাছ । বিচিত্র রঙের । বর্ণের।
একটা মাছ ছিল। দেখতে , তখনকার পাঁচ পয়সার মত । কেমন চারকোণা। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, আজকাল যখন, এইসব মাছের গল্প বলি , অনেকেই চিনতে পারে না। তখন কথা বলি পুরানো দিনের মানুষদের সাথে। যারা আমার সাথেই বড় হয়েছে।
অথবা মায়ের কাছে বলি।
পুরানো দিনের মানুষ জন চেনে। এখনকার কেউ সেই বিচিত্র রহস্যময় মাছগুলো চেনে না।
আমার পিচ্চিবেলা শেষ হবার পরে, আমিও সেইসব মাছ আর জলজ আগাছা আর দেখিনি । ওদের খুঁজেছি হারানো দিনের বন্ধুর মত। কখনই পাইনি আর।
ওরা নেই।
কেন ?
অমনটা হয় কেন ?
আরও একটা ব্যাপার মনে আছে।
শীতের সময় গ্রামের বাড়ি যেতাম কখনও কখনও । সকাল সকাল বেড়িয়ে, সন্ধ্যায় শহরে ফিরে আসতাম । ফেরার পথে আবিস্কার করতাম , গাড়ির সামনের কাচে উড়ে উড়ে পড়ছে নানা রকম পোকা । মথ আর ঘাস পোকা । বা অমন কোন কিছু ।
সবার নাম কি আর জানি ?
গত বেশ কয়েক বছর গ্রাম থেকে ফেরার সময় আর কোন উড়ন্ত পোকা মৃত্যুর লোভে ঝাঁপিয়ে পড়ে না আমাদের গাড়ির সামনের কাচে ।
অনেক বার খেয়াল করেছি । অমনটা আর হয় না , আগের মত ।
কেন ?
ব্যাপারটা যে আমার একার নজরে পড়েছে অমন না কিন্তু !
এটাকে বলে উইন্ডশীল্ড ফিনমিনন windshield phenomenon।
ক্যানাডার প্রকৃতিবিদ জন অ্যাকর্ন সাহেব এই বিষয়টা মানুষের নজরে আনেন ।
কারণ কি ?
কী হতে যাচ্ছে আসলে ?
পৃথিবী থেকে পোকা কমে যাচ্ছে দ্রুত । ডেনমার্কের বিজ্ঞানীরা টানা কুড়ি বছর গবেষণা করে বের করেছে গাড়ির কাচে উড়ে আসা পোকার সংখ্যা ওখানেও ৪০% কমে গেছে ।
একই রকম রিপোর্ট পাওয়া গেছে আরও অনেক দেশে।
তো তাতে আমাদের কি ? পোকা মরে কমছে সেটা তো খুবই ভাল কথা । আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ ।
বিজ্ঞানীরা অবশ্য তেমনটা বলেন না।
উনারা বলছেন , বিলুপ্তির ষষ্ঠ পর্যায়ে পা দিয়েছে পৃথিবী। এই বিলুপ্তি পর্যায়ের প্রথম শিকার হচ্ছে মানুষসহ বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণী।
বিলুপ্তি ব্যাপারটা আগেও হয়েছে । মোট পাঁচবার ।
প্রথম বিলুপ্তির ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে ৪৪ বা ৪৫ কোটি বছর আগে।
প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে প্রকাণ্ড উল্কা পতনে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল পৃথিবী থেকে। সেটি ছিল পৃথিবী বিলুপ্তির পঞ্চম পর্যায়।
বিপদজনক পাঁচ বারের এই ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা বলেন , বিগ ফাইভ । বিগ ফাইভে প্রাণী জগতের ৭৫ ভাগ হারিয়ে গেছে । ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে সে সময়েও এত দ্রুত গতিতে কোনো প্রাণীর বিলুপ্ত হয়নি।
এখন তারচেয়ে বেশি দ্রুত গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে ।
গত পাঁচটা বিগ ফাইভ হয়েছে আগ্নেয়গিরির জন্য , তুষারযুগের সময় আর গ্রহাণুর আঘাতে ।
কিন্তু এইবার ?
এইবার হচ্ছে আমাদের জন্য ।
বেশি করে বনভূমি কাটা , বেশি প্ল্যাস্টিকের ব্যবহার , বেশি বিদ্যুৎ বা জল খরচ করা, খনিজ তেল পুড়িয়ে বেশি গাড়ি চালান অমন হাজারটা কারণ রয়েছে ।
এমনটা হতেই পারে, এই ধাক্কায় আর কোন মানুষ থাকবে না ।
কেউ না ।
হয়তো আরও কয়েক শো কোটি বছর পর জন্ম নেবে অন্য রকম কোন প্রাণী ।
ওরা আমাদের কঙ্কাল বা হাড় পেয়ে অবাক হয়ে ভাববে , ' ও বাবা এ আবার কেমন তরো জানোয়ার ?
ওরা জানবে না , আমরা ঘন বাদলার দিনে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতাম । ধূম তরল জোছনার রাতে আমরা দিশেহারা হয়ে যেতাম। কবিতা লিখতাম আমরা।
আমাদের সাবধান হতে হবে।
খুব সাবধান।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন