সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অদ্ভুত সব মেহমান



--------------

হিমালয়ের উপত্যাকায় যখন কুয়াশা  পড়ে   তখনই  মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হয়।

বৃষ্টি  এসে যেন   ঝাড়ু দিয়ে যায়  পাহাড়ে  ।  

  বুনো জীব জন্তু     আশ্রয় খোঁজার জন্য  যারপরনাই  ব্যস্ত হয়ে পড়ে তখন

 

সেটাই স্বাভাবিক।

রাস্কিন বণ্ড সাহেবের  বাড়িটা জঙ্গলের ধারেই।

 নিমন্ত্রণ না দিলেও বাদলার  দিনে অনেকেই সেখানে  চলে আসে। নিরাপদ  আশ্রয় পাবার আশায়।

সন্দেহ নেই,  রাস্কিন সাহেব বাড়ির জানালা খুলে  ওদের জন্য  সুবিধে করে দে এক রকম।   

 জানালা খুলে রাখার   কারন? -  টাটকা বাতাস  পছন্দ করেন তিনি। আর জানালা দিয়ে  যদি কোন পাখি , পোকা বা পশু  কামরার  ভেতরে  ঢুকে পরে  তাহলেও   উনার কোন আপত্তি নেই।

কোন রকম উপদ্রব বা ঝামেলা না করলেই হল।

  তবে   ইদানিং   বাঁশপোকাদের উপর মেজাজ সামলে রাখতে পারছেন না।   গত রাতেই একটা গিয়ে  পড়েছিল জগের জলের মধ্যে ।

 ওটাকে জগের ভেতর থেকে তুলে  উদ্ধার করে জানালার বাইরে ছেড়ে দিয়েছিলেন রাস্কিন সাহেব।

কি কাণ্ড!

কয়েক মুহূর্ত পরেই ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনে দেখেন  ওটা ফিরে এসেছে। আবার সেই জগের জলের মধ্যে  গিয়ে পড়েছে। আবার গিয়ে  বাঁচালেন   বোকাটাকে। তুলে   নিয়ে গিয়ে বাইরে ছেড়ে দিলেন

 

সন্দেহ নেই উজ্জ্বল আলো আর কামরার ভেতরের আরামদায়ক পরিবেশ বেচারাকে   আবার  নিয়ে এলো । হেলিকপ্তারের মত উড়ছে ওটা। নামার জন্য জায়গা খুঁজছে। জলদি গিয়ে  জগের  মুখ  ঢেে দিলেন

ওটা গিয়ে ফুলদানির বুনো ফুলের মধ্যে বসে রইল। থাকুক ওখানেই। না করলো কে ?

 দিনের বেলা একটা পাখি আসে। মাঝে মাঝেই ।  গাঢ় নীল রঙের ।

খুবই নার্ভাস ধরনের পাখি। বেশির ভাগ সময়  জানালার পাশে বসে বাইরের বৃষ্টি দেখে।  আলাপচারিতার কোন আগ্রহ নেই পাখিটার। বৃষ্টি থামলেই ফুড়ুৎ করে উড়ে যায়। কোন ঠেকা পড়েছে  যে  কথা বলবে ?

একটা কাঠবিড়ালী আসে কখনও কখনও।

ওর বাসা আসলে একটা ওক গাছে  ছিল । কিন্তু এখনতো   সেটা বৃষ্টিতে  ভিজে জলমগ্ন। সম্ভবত সে অবিবাহিত। সাথে আর  কাউকে দেখেননি রাস্কিন সাহেব  । মোদ্দা কথা একাই থাকে।

  বাড়িওয়ালা বণ্ড সাহেবকে  ভাল করেই চেনে । এবং বেচারা বেশ ভালই সাহসী বলতে হবে।  রাস্কিন বন্ডের  সামনেই টেবিলের পায়া বেয়ে উপরে উঠে যায় মুখরোচক খাবারের লোভে। এবং পেয়েও  যায়  ।

কারণ  জেনে শুনে ইচ্ছা করে কিছু খাবার রেখে দেন রাস্কিন বণ্ড

প্রথম যখন কাঠবিড়ালীটাকে দেখেছিলেন  তখন বেশ পিচ্চি ছিল।  বন্ডের  হাত থেকেই খাবার নিত। এখন দে না।  উনিও   মাত্র কিছু দিনের জন্য এসেছেন      উনার  আসলে পোষা কাঠবিড়ালির দরকার নেই।  দরকার মেহমান। ও মেহমান হয়েই থাকুক।

গত সপ্তাহে  টেবিলে বসে ইয়া বড় একটা  প্রবন্ধ লিখছিলেন

 আচমকা দেখেন ,  কাগজের দিস্তার মধ্যে পান্নার মত সবুজ একটা পোকা বসে আছে। দেখতে  গঙ্গা ফড়িঙের মত । নাম - ম্যান্টিস ( mantis) , মনে হয় সামনের হাত দুটো জোড় করে প্রনাম করছে।

  কাঁচের গোল্লার মত গুলটি  মার্কা চোখে বন্ডের   দিকে  তাকিয়ে  ছিল।মাঝে মাঝেই পোকাটা নিরুদ্দেশ হয়ে যেত। আবার  ফিরে এসে বসে থাকত  ড্রেসিং টেবিলের আয়নার উপর।

    সবচেয়ে রহস্যময় আর  আকর্ষণীয় মেহমানটা আসে রাতের বেলা। যখন কামরাতে নরম  আলো জ্বলে ।

পিচ্চি একটা বাদুর।   দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। জানালা দিয়েও আসে যদি আর কোন উপায় না থাকে। বাল্বের  আলোর চারিদিকে মথ উড়ে বেড়ায়। বাদুর মশায় ওদের জন্যই আসে। খাবে।

রাস্কিন বণ্ড সারা জীবনে যত বাদুর দেখেছেন,   সবাইকে  বেশ উঁচু দিয়েই উড়ে যেতে দেখেছেন । কমপক্ষে সিলিঙের কাছাকাছি। কিন্তু এই বেচারাম বাদুরটা  চেয়ারের পায়া বা টেবিলের তলা দিয়েও উড়ে বেড়ায়। একবার সিঁড়ির কাছাকাছি  রাস্কিন বন্ডের  পায়ের সাথেও টক্কর খেয়েছে।

ওর রাডার কি কাজ করে না ? নাকি বেচারা পাগল হয়ে গেল ?

আলমারি থেকে বই খুঁজে নিলেন রাস্কিন বণ্ড । বইয়ের নাম- ন্যাচারাল হিস্ট্রি । বইতে   অনেক আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও বাদুরের এমন অস্থির আচরণের কারন পেলেন  না।

শেষে অনেক পুরানো একটা বই পেয়ে গেলেন  স্টেনডেল   ইনডিয়ান ম্যামেল - নাম বইটার । কোলকাতার ছাপা। ১৮৮৪ সালে ছাপা হয়েছিল  । ওখানেই পেলেন , যা খুঁজছিলেন

এক জায়গায় লেখা- ‘মুসৌরীর কাছাকাছি দক্ষিণ দিকের পাহাড়ে কাছে জারিপানি গ্রামে    এক ধরনের বাদুর পেয়েছিলেন ক্যাপ্টেন হুটন  । মাত্র তিন সেন্টিমিটার হয়। গায়ের রঙ মেটে।  অন্য বাদুরের মত উঁচুতে উড়ে না। মাটির কাছাকাছি থাকে...’  

বই পড়ে রাস্কিন বণ্ড  যা বুঝলেন  সেই ১৮৮৪ সালেই এই পিচ্চি বাদুর প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।  

 আজকাল দেখা যায় না।

অনুমান করলেন  বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সেই বাদুরের কোন একটার দেখা পেয়েছেন তিনি।

 জারিপানি গ্রামটা   এখান থেকে মাত্র তিন  কিলোমিটার দূরে।  রাস্কিন বণ্ড   খুশি , ওদের একজন উনার  বাসায় আসে। ওরা বেঁচে আছে। একেবারে হারিয়ে  যায়নি।

একদিন দেখেন  পিচ্চি সেই বাদুরটা উনার   বিছানার রেলিঙ্গে পা উপরে দিয়ে মাথা নীচে দিয়ে ঝুলে আছে। বাদুরেরা যেমন করে।

ভাল লাগল দেখে। থাকুক বেচারা ওখানে। নিঃসঙ্গ লেখকের সঙ্গী হয়ে।

  অদ্ভুত এই বাদুরটা  যদি ওর বন্ধু বান্ধব বা ইয়ার দোস্তদের নিয়ে আসে তবেও উনি আপত্তি করবেন না।

 লেখকের কাঠের বাড়িতে ওরা সারাজীবনের জন্য ওয়েলকাম  

( রাস্কিন বন্ড এর-  Visitors from the Forest এর অবলম্বনে )

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...