সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

এক টুকরো খামার

 বাঙলার মাঠ কত বড় ?

 মনে হত তেপান্তরের মাঠ । আসলে  মাত্র  ০  একর জায়গা।  ঘাসের সমুদ্রের  মত।

  এক পাশে  কয়েকটা  বাংলো  টাইপের বাড়ি ঘর।  সরকারী বড় বড় আপিসারেরা থাকে।   বাংলোর মাঠ থেকেই বাংলার মাঠ নাম হয়ে গেছে।

 

 পাশেই দুটো মস্ত ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া নিম গাছ। গাছ ভর্তি চিকড়ি  মিকড়ি পাতা। গোল গোল  নিম ফল ধরে। সাদা  একটা অদ্ভুত রকম ফুল ধরে নিম গাছে।  ফুলে মধু আছে। মৌমাছি সেই মধু নেয়। তেতো লাগে না ?

নিম গাছ দুটোর পাশেই   টিনের একটা সুন্দর ঘর।  ওটায় বাংলোর দারোয়ান থাকে। কালো রোগা মত মানুষ। মাথা ভর্তি কলমি শাকের মত চুল। হাতা  কাটা গেঞ্জি আর  খাটো লুঙ্গি পরে।  মাথায় গামছা বাঁধা। মনে হয় না স্টাইলের  জন্য  অমনটা করেছে।  ওতে মাথার ঘাম এসে মুখ ভিজিয়ে দেয় না।  ওর নাম- আত্মারাম ।

রাতের বেলা কেমন পাহারা দেয় জানি না ।

 কিন্তু  বিকেলবেলা অনেক কাজ করে। মাঠের এক কোনে এক চিলতে  জায়গা  প্রায় দিন পনের  ধরে  কোদাল দিয়ে আচ্ছা মত  কোপাতে  দেখলাম, মাটি উলট পালট করে ফেলল কুপিয়ে। শেষে কিসের দানা ছিটিয়ে দিল মুঠো ভর্তি করে।

 দানা ছিটানোর পর   অদ্ভুত রকমের বদনা দিয়ে  জমিতে  জল   দিল  কয়েকদিন  ধরে। বদনার নল ভর্তি অনেক অনেক ছিদ্র। বৃষ্টির মত  জল  ঝরে।

   এত কিছু কে খেয়াল করে ?  তখন হেমন্তের শেষ। শীত আসবে। বেশ নোটিশ দিয়ে আসে। দূরের  মেহমান আসার আগে যেমন বাদামী খামে করে চিঠি লিখে হাজির হয়, শীত ও তেমন গাছের পাতা শুকিয়ে বাদামী করে ফেলে দিয়ে জানাতে থাকে- আমি আসছি কিন্তু।গাছের শুকনো পাতা হচ্ছে  শীতের চিঠি।

একদিন দেখলাম , সবুজ কচি কচি পাতা হয়েছে আত্মারামের জমিতে। ব্যাপারটা দারুন তো। এই গুলো নাকি চারা গাছ। দানার ভেতরে গাছ ঘুমিয়ে থাকে। লম্বা ঘুম দেয়।   অপেক্ষা করে। ভাল পরিবেশ না পেলে কেউ টিকে থাকতে পারে না। দানা থেকে চারা গাছ বের হবার জন্য একই কথা।

প্রয়োজনীয় জল , রোদ , বাতাস আর মাটি পেলে দানার খোসা খুলে গিয়ে চারা গাছ বের হয়ে আসে। ঠিক যেই ভাবে স্পেসশিপের দরজা খুলে মহাকাশচারী নেমে আসে  নতুন গ্রহে।

কাস্তের মত নিড়ানি দিয়ে আবার মাটি আলগা করে দেয় আত্মারাম। ওরা লক লক করে  বেড়ে উঠতে থাকে। খুব জলদি। যেন জলদি বড় হওয়া খুব দরকার ওদের। মাত্র মাস খানেকের মধ্যে বিচিত্র সব গাছ পালা,  গুল্ম আর ঝোপে ভর্তি হয়ে গেল আত্মারামের বাগান। আগে অমন কিছু দেখনি।

ফসল তুলবেন  কবে  ?’ বেশ একটু ভাব নিয়ে জানতে চাইলাম। এমন ভাব করলাম যেন এই সব চাষবাস আর মৌসুমি সবজী নিয়ে অনেক কিছু জানি।

সমুই  অইলেই।হাসি মুখে বলল আত্মারাম।

সময় কবে হবে ?’ আরও একটু গম্ভীর ভাবে বললাম।

অইলেই দেকবা। সব কিছুর সমুই আছে। বইশাক মাসেই আম পাকে। মাগ মাসে না। আবার বান্দা  কফি শীতেই অয় ।  গরম কালে না। সুফি দরবেশদের মত বলল আত্মারাম।

আপনার গাছে তো ফল নেই।কি বুনলেন ? কিছুই দেখা যাচ্ছে না ।

সব ফল গাছে দরে নিকি ? মাটির তল্লায় ও ফসল অয়।

ব্যাপারটা বুঝলাম না।

মাটির নীচের ফসল ?

কি জিনিস আবার ?

 কিন্তু বুড়ো আত্মারাম আর কিছু বলল না। আমিও জানতে চাইলাম না।

  কয়েকদিনের মধ্যে অদ্ভুত মায়াবী ধরনের পাতা দেখা গেল। শর্ষে গাছের পাতার মত । কে জানে কিসের গাছ। মাটির তলায় কি আছে ? একবার মনে হল তুলে দেখি তো একটা। নিজেকে সামলে নিলাম।

 ফসল তোলার সময় হয়ে আসতেই এক বিকেলে কাজে হাত দিল আত্মারাম। অদ্ভুত কায়দায় টেনে তুলতে লাগল সেই পাতাগুলো। আর মাটির তলা থেকে বের হয়ে এলো রাক্ষসের দাঁতের মত গোল গোল সাদা কি যেন। খানিক বেগুনী আর ফিকে   গোলাপি ভাব আছে যেন।

কি ওটা ?’ কৌতূহলে মরে যাচ্ছি ।

হালগম । চিন না?’ আত্মারাম অবাক।

শালগম ? অমন কোন সবজী আছে নাকি ? জানি না তো। মাটির তলায় হয় বলে চিনি না । আম গাছের মত ডালে ডালে ঝুলে থাকলে চিনতাম। জলদি হাত  লাগালাম আত্মারামের সাথে। মাটি দিয়ে সারা শরীর মাখার পর মাত্র এক ডজন শালগম তুললাম। আত্মারাম ততক্ষণে সারা ক্ষেতের শালগম তুলে ফেলেছে।  

‘  কাইল্কা   আই ও।খুশি গলায় বলল  আত্মারাম। তুমারে হালগম ভাঁজা দিয়া রুটি খাওয়ামু নে।

আমার হাতে  দুটো  শালগম ধরিয়ে দিল  আত্মারাম। মজুরি।  ও দুটো হাতে করে  বাহাদুরের মত বাড়ি ফিরলাম। নিজেকে মস্ত কিছু মনে হচ্ছিল।   

আমার  অবস্থা দেখে মা হেসেই শেষ।  কল তলায় নিয়ে গরম জলে স্নান করিয়ে দিল। লেবুর ঘ্রানওয়ালা সাবান মেখে।

বাইরে হিম হিম হাওয়া। চারিদিক নিঝুম। বাতাসের শীতের ঘ্রান। স্লেট পেন্সিল নিয়ে পড়তে বসলাম। দূরের নদী দিয়ে স্টিমার যাচ্ছে। ওটা নাকি গোয়ালন্দ ঘাটে গিয়ে থামে। আখের গুড় নিয়ে ফেরত আসবে। বর্ষার মৌসুমে ইলিশ নিয়ে আসে।

পরদিন শালগম ভাঁজার  নিমন্ত্রণের কথা বলতেই মা বারণ করে দিল। গরিবের বাড়িতে নাকি  খেতে যেতে নেই। তবে বাবা   বাজার থেকে শালগম কিনে   আনল । শীতের সকালে সাদা পাতলা রুটির সাথে শালগম ভাঁজা খেলাম।

শুনলাম ,   এটা নাকি আসলে আমাদের দেশের সবজী না।ইউরোপের সবজী।   ঠাণ্ডার দেশে ভাল হয়।  শর্ষে শাক পরিবারের জিনিস।  প্রায় ৩০ ধরনের শালগম পাওয়া যায় সারা দুনিয়ায়।  খুব উপকারি খাবার । শালগমের পাতা শাকের মত খাওয়া যায়।  আগে তো ইউরোপে শালগম শূয়রের খাবার হিসাবে ব্যবহার করতো লোকজন।

   প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় জার্মানিতে খাবারের অভাব দেখা দেয়। কোন খাবারই   পাওয়া যাচ্ছিল না। বাজে আবহাওয়ার জন্য আলুর মত সবজীও হয়নি সেইবার  । তখন জার্মানির লোকজন শুধু মাত্র শালগম খেয়ে বেঁচে ছিল। মে ২২,  ১৯১৬ থেকে ১৯১৭ সালের গরম  পযন্ত। এই সময়টাকে টারনিপ উইন্টার  (Turnip Winter)  বলে।

মনে করার কোন কারন নেই শালগম একদম নতুন খাবার। ৪ হাজার বছর আগে থেকে মানুষ  এই সবজীটা খেয়ে আসছে। সেই সময় রোমের অভিজাত শ্রেণীর  লোকজন  কাঁচা  শালগমের সাথে মধু বা জিরার গুঁড়া দিয়ে আয়েস করে খেত। সালাদ টাইপের জিনিস আরকি।

 বাড়িতে মা শালগমের আচার বানাল একবার। খুব সহজ একটা রেসিপি। কিন্তু মজার খাবার। তুরস্কের লোকেরা রোজই শালগমের সালাদ খায়। বিশেষ করে কাবাবের সাথে ওটা থাকবেই।

শালগমের আচার- ৫ টা ছোট ছোট শালগম।

 ৪ টা রসুনের কোয়া। ফালি করে নিতে হবে।

২ টা তেজপাতা।

২৫০ মিলি  বা এক কাপ  ভিনেগার।

৭৫০ মিলি বা ৩ কাপ জল।

৩ চা চামচ লবণ।

কাঁচের বয়াম নিতে হবে  একটা। গরম জলে  পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিতে হবে   সেটা। শালগমগুলোর  খোসা ছড়িয়ে পাতলা ফালি করে কেটে  নিয়ে একটা বাউলে রাখ।  অন্য একটা বাউলে  ভিনেগার , জল আর লবণ নিয়ে ভাল করে মিশিয়ে নাও। চামচ দিয়ে ঘেঁটে দিলেই মিশে যাবে। বয়ামের ভেতরে যত্ন করে শালগমের ফালি রাখ। একটার উপর আরেকটা। রসুনের কুঁচি আর তেজপাতা রাখ বয়ামের ভেতরে। এইবার ঢেলে  দাও  সেই লবণ , ভিনেগার আর  জলের মিকচারটা।

খুব ঠেসে ভরার দরকার নেই। দরকার হলে অন্য একটা বয়াম ব্যবহার করবে।

 রান্নাঘরের এক কোনায় রেখে দাও টানা দশ  দিন। ব্যস হয়ে গেল শালগমের আচার। অনেকে আর মধ্যে একটা  আস্ত বীট ফালি করে দেয়। তাতে আচারটা সুন্দর  গোলাপি রঙের হয়। নইলে  কেমন ফ্যাকাসে সাদা হয়।

 তাতে কি। স্বাদ একই রকম দারুন। জিভে জল এসে যায়।

আত্মারাম ওর খেতে অনেক রকম  সবজীর দানা মিলিয়ে মিলিয়ে  ফেলে।  একের পর এক ফসল উঠে সেইজন্য

 মটরশুঁটি প্রথম দেখলাম। গাছে মায়াবী  হাতির দাঁতের মত  সাদা আর  ফিকে  গোলাপি  রঙের  ফুল ধরে।      শিমের মত ফলের ভেতরে গুঁটিশুঁটি  হয়ে শুয়ে থাকে গোল সবুজ দানার মত মটরশুঁটি। শীতের  সন্ধ্যায়     লবণ জলে খোসা সহ মটরশুঁটি সিদ্ধ করা করে খোলা মাঠে বসে খায় আত্মারাম  ।

তখন  দূরের   নদী আর  বড়   রাস্তা পার হয়ে শীতের বাতাস চলে  আসে আমাদের নগরে।  লম্বা ঘাসগুলো  শীতে জুবুথুবু  হয়ে যায়।  

কয়েক দিন পর  নল খাগড়ার মত গাছ থেকে ভুট্টা  সংগ্রহ করতে দেখলাম।

ভুট্টা কিন্তু এক ধরেন ঘাস। বিশ্বাস হয় ? হলুদ রঙেরই হয় ওরা। কিন্তু কালো , নীল, সবুজ, বেগুনী , লাল আর সাদা রঙের ভুট্টাও আছে। বাইরের দেশে গ্লাস জেম নামে এক ধরনের ভুট্টা হয়। খোসা ছড়ালেই মনে হয় ভেতরে দানার বদলে  কাঁচের পাথর বা পুঁতি বসানো   লম্বা   সারি করে। দানাগুলোর রঙ আলাদা আলাদা।   অপূর্ব ।

মধ্য আমেরিকার আদিবাসীরা  ভুট্টার চাষ করতো ৭ হাজার বছর আগে থেকে। খাবার হিসাবে ব্যবহার করতো। ক্রিসটোফার কলম্বাস যখন  আমেরিকার   আবিস্কার করে, তখন  ওখানের    স্থানীয়  আদিবাসীদের  কাছ থেকে কয়েক ঝুড়ি ভুট্টা বিনিময় করে    দেশে ফেরার সময় নতুন যে সব খাবার নিয়ে আসেন তারমধ্যে ভুট্টা ছিল। এর আগে ইউরোপের লোকজন ভুট্টা জীবনেও দেখেনি। কলম্বাসের কাছে ভুট্টা দেখে নিশ্চয়ই খুব  অবাক হয়েছিল ।ভুট্টা ছাড়াও  , আলু, টমেটো, তামাক, কাসাভা, মিষ্টি আলু, আনারস,  মরিচ

আত্মারাম যখন  গাছ থেকে ভুট্টা সংগ্রহ করে বেতের ঝুড়িতে রাখল তখন   দেখলাম  ,  খসখসে বাদামী খোসার  ভেতরে   ভুট্টাগুলো  ঘুমিয়ে থাকে। ওর বাদামী খোসা যেন বিচিত্র এক তাবু। কখনও কখনও খোসা সরে গেলে দেখা যায়  দাঁত বের করে হাসছে ওরা। টেনে খোসা নামানর পর দেখা যায়  সাদা বা মেরুন রঙের  লিলেনের সুতার মত কিসে যেন জড়িয়ে আছে ওরা।  

আত্মারামের বড় ছেলে ভুট্টাগুলো নিয়ে মহল্লার মোড়ে বিক্রি করে। সারারাত ভুট্টাগুলো ভিজিয়ে রাখে জলের গামলায়। পরদিন বিকেল বেলা বসে মহল্লার মোড়ে। মাটির কেমন একটা চুলার মত নেয় সাথে। ভেতরে চুনি পাথরের মত জ্বলে কয়লার আগুন। উপরে  ধীরে ধীরে সময় নিয়ে ঝলসানো হয় হলুদ ভুট্টা। বাতাসে কেমন লোভনীয় একটা ঘ্রান ছড়িয়ে যায়। তেঁতুলের চাটনি  মাখিয়ে দেয়া হয় সেই ভুট্টায়।

 প্রকৃতি আমাদের কত  খাবার দেয়। কিন্তু   কি ভাবে মানুষ জানলো মাটি খুঁড়ে দানা বা বীজ ছিটিয়ে দিলে গাছপালা হয় ?  সেখান থেকে ফসল পাওয়া যায়।  কি ভাবে আবিষ্কার করলো এই জিনিস ?  

বিজ্ঞানীরা বলেন , সেই গুহা  যুগেই নাকি মানুষ চাষাবাদ করা শিখেছিল। কি ভাবে ? উহু। সঠিক কেউ জানে না। আদিম মানুষ  গাছ গাছালি থেকেই নিজেদের খাবার  সংগ্রহ করে খেত। অনেক অনেক পরে  শিকার করা শেখে। তারপরও তিন ভাগের দুই ভাগ আদিম মানুষ    ফল, সবজী, বাদাম আর বিভিন্ন ঘাশের দানা খেত। শিকার করা যখন শিখল তখন অনেকেই মাছ ধরাও শিখে গেল। নদীর পাড় থেকে যোগার করতো শামুক আর কচ্ছপের ডিম। পেলে কচ্ছপ আর গিরগিটি ও ধরে নিয়ে আসতো নিজেদের বাসায়। আরে কি বলি - নিজেদের গুহার।  আর কে না জানে অনেকগুলো বছর ওরা কাঁচাই খেত সব। পরে  তো  আগুনের ব্যবহার শিখে।  তখন দেখে আরে আগুনে পুড়িয়ে খেতে তো  খুব মজা । খাবার কত নরম হয়।  হজমের সমস্যা হয় না।

 চাষবাস শিখে আরও পরে। যীশুর জন্মের ১২ হাজার বছর আগে  ফসল  চাষ  করা শুরু করে  আমাদের পূর্বপুরুষরা।  

বিজ্ঞানীদের মতে এক ধরনের বুনো  ঘাস  প্রথম চাষ করতে শেখে আদিম  মানুষ। সেই ঘাসের দানা খাওয়া যেত।  জিনিসটা দেখতে যবের মত। গুড়ো করে জল দিয়ে মাখিয়ে ময়দার ডোলের মত করতো। তারপর বড় চ্যাপ্টা পাথরের টুকরো আগুনে গরম করে সেটার উপর ময়দার দলা ঠেসে ধরত। রুটির মত কিছু একটা বানাত। কল্পনা কর- দেখতে কেমন ছিল সেই রুটি ? হাসবে না মোটেও। কারন তাওয়া বেলুনি কিচ্ছু ছিল না কিন্তু।

কিন্তু কথা হল   আদিম  মানুষ  চাষবাস বা কৃষিকাজ  শিখল  কি ভাবে  ? উত্তর জানা নেই। তখন মানুষ ছিল  যাযাবর। মানে খাবারের খোঁজে টইটই করে ঘুরে বেড়াত নানান জায়গায়। কোথাও খাবার শেষ হয়ে গেলে আবার দল বল নিয়ে নতুন জায়গায় গিয়ে বসতি গড়ত। হয়তো কোন এক বর্ষার শেষে কেউ অবাক হয়ে খেয়াল করলো - গুহার বাইরে সবুজ কচি চারা জন্মেছে। আরও বড় হবার পর আবিষ্কার করলো সেটা কোন ফসলের গাছ। সেই ঘাসের চারা যেটা থেকে যবের মত দানা পেত।

বিজ্ঞানীরা আরও বলেন- এই  কৃষিকাজটা শুরু করেছিল মেয়েরা। যারা গুহায় থাকতো। পুরুষরা তো শিকারে চলে যেত। মেয়েরা খেয়াল করতো চারা বড় হয়। ফসল দেয়। তারাই নতুন দানা রেখে দিত। গুহার সামনের নরম মাটিতে গর্ত করে  দানা রেখে লক্ষ্য রাখত নতুন চারা হয় কি না ?  তাদের কাছে কাস্তে বা কোদাল কিছুই ছিল না। তাতেও সমস্যা নেই। পশুর হাড় , কাঠের বা পাথরের  টুকরো নানান কায়দা করে ব্যবহার করতো। ঠিক আজকের দিনের কোদাল বা  নিড়ানির  মত। কত জায়গায় বিজ্ঞানীরা সেই সব নমুনা খুঁজে পেয়েছে।

পুরানো জাতি নানান কায়দা করে চাষবাস করতো। যেমন আমাদের আত্মারাম করে থাকে। এটাকে মিশালী  চাষ বলে। ক্ষেতের মধ্যে একই সময়ে দুই তিন ধরনের সবজীর চাষ। যেমন আমেরিকার আদিম আদিবাসীরা জমিতে একই সাথে   ভুট্টা, কুমড়া আর শিম বুনে। এটাকে ওরা বলে থ্রি  সিস্টার- তিন বোন।  তিন সবজীর  দানা জমিতে পুঁতে  ওখানে পচা মাছ ঢেলে দেয়।  এতে ফসল ভাল হয়।  শিমের চারা লতিয়ে ভুট্টা গাছ বেয়ে বড় হতে পারে।  শিমের কারনে জমিতে নাইট্রোজেন বেড়ে যায়। ওতে কুমড়া ভাল হয়। আবার কুমড়ার পাতা জমিতে ছায়া দিয়ে রাখে। ওতে ভুট্টা ভাল হয়। কি কায়দা।

সব ধরনের ফসল যে   একই সময়ে  চাষ  করা শিখেছিল তেমনটা না কিন্তু।  যেমন ধর- কুমড়া মাত্র ৮ বা ১০ হাজার বছর আগে মানুষ চাষ  করা  শিখেছে। ৯ হাজার বছর আগে থেকে ডাল বা মটরশুঁটির চাষ শিখেছে মানুষ। চিন দেশে ধান চাষ শুরু করেছে ১১ হাজার বছর আগে।   প্রথম যে ফল মানুষ বুনতে বা চাষ করতে শিখেছিল সেটা হল ডুমুর।   সবেচেয়ে প্রাচীন   ফসল কাটার  কাস্তে  পাওয়া গেছে  মেসোপটেমিয়া সভ্যতার লোকদের কাছে।  আজ যেখানে ইরাক সেখানেই  টাইগ্রিস নদীর পাড়ে  অতীতে খুব বড় এক জাতি বসবাস করতো। অনেক দিক দিয়েই উন্নত ছিল তারা। তাদের ওখানেই মাটি খুঁড়ে  কাঁদা মাটির তৈরি যে কাস্তে পাওয়া গেছে সেটা যীশুর জন্মের ৩ হাজার বছর আগের। নদী থেকে খাল কেটে জল এনে সেচ দেয়ার কাজও ওরা প্রথম আবিষ্কার করেছিল।

পৃথিবীর সব দেশের মানুষ  যে একই সময়ে চাষবাস  করা শুরু করেছিল অমনটা নয় কিন্তু। সবার আগে এশিয়ার লোকজন শুরু করেছিল। তা তোমার যীশুর জন্মের ১২ হাজার বছর আগে। আফ্রিকার লোকজন ১০ হাজার বছর আগে। দক্ষিণ আমেরিকার বাসিন্দারা  ৮ হাজার বছর আগে।  উত্তর ইউরোপের লোকজন সাড়ে  ৪ হাজার বছর আগে। সবই কিন্তু  যীশুর  জন্মের আগে।

তবে যাই হোক এই চাষাবাদ শেখার সাথে সাথেই কিন্তু মানুষের ইতিহাস বদলে গেল। আগের মত টই টই করে খাবারের খোঁজ করতে হয় না। শিকারের আশায় দূর দূরান্ত যেতে হত না।  ফলে  গড়ে উঠল বড় বড় সভ্যতা।আর এই সভ্যতাগুলো সবই গড়ে উঠলো নদীর তীরে। কারন চাষবাস করতে সেচের দরকার হয় যে।  আর এর ফলে কত বড় বড় সভ্যতা গড়ে উঠলো সেই ব্যাপারে তোমাদের কোন ধারনাই নেই। যেমন-  নীল নদের তীরে মিসরের সভ্যতা। প্রতি বছর নীল নদের জল বেড়ে গিয়ে বন্যা হত। বন্যা শেষ হবার পড় মাটি অনেক  উর্বরা হয়ে যায়। তখন যা বুনবে তাই ভাল হবে। মিসরীয় সভ্যতার চাষিরা তরমুজ, ডুমুর, যব, গম, পেয়াজ, বাঁধাকপি , শিম এই সব বুনত। এত পরিমাণ যব হত যে সেগুলো পচিয়ে অদ্ভুত এক পানীয় বানাত। যেটাকে বিয়ার বলে। শ্রমিকদের বেতন দেয়া হত মাটির জার  ভর্তি বিয়ার। চাষিরা কায়দা করে খাল কেটে নীল নদ  থেকে সেচের জল জমি পযন্ত নিয়ে আসতো। মোষ  আর লাঙ্গল দিয়ে হাল চাষ করাতো।

পিরামিডের গায়ে এই সব চাষবাস আর ফসল কাটার ছবি আঁকা  আছে।

ফসলের হিসাব রাখার দায়িত্ব ছিল মন্দিরের পুরোহিতদের। আর এই হিসাব প্রথমে পাথরের ব্লকে খোদাই করে লেখা হত। ওটা বেশ কষ্টের কাজ  তাই  পড়ে প্যাপিরাসের উপর লিখে রাখত।  হয়তো বেমক্কা প্রশ্ন করে বসবে প্যাপিরাস আবার কি ? জলাভূমিতে  সরু  এক ধরনের খাগড়া জলজ ঘাস হত।  উপরে ছাতার মত।  সেটা পিষে পিটিয়ে নরম করে শুকিয়ে নিলেই মোটা কাগজের মত একটা জিনিষ হয়ে যেত। ওটাই প্যাপিরাস। আর প্যাপিরাস থেকেই পেপার শব্দটা হয়েছে। যার মানে কাগজ।

 তো, সব কথার শেষ কথা শুধু মাত্র কৃষি কাজ শেখার পরই আমাদের সমাজ আর সভ্যতা সুন্দর ভাবে গড়ে উঠেছে। মানুষ বসতি করা শিখেছে। বাড়ি বানিয়েছে। খাবারের  অঢেল যোগার হবার পরই শিল্প সাহিত্যে মন দিতে পেরেছে।  আজকাল চাষাবাদ কত উন্নত হয়েছে। কত রকম প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। শুনলাম  আপেলই নাকি ৬ হাজার রকমের পাওয়া যায় সারা দুনিয়ায়। কি কাণ্ড ! কত ভাবে চাষ করা হচ্ছে। শীতের সবজী গরমের দেশেও উৎপন্ন করা হচ্ছে হরদম।

এই খাবার উৎপাদন হলেই সব শেষ হয় না। সব দেশের লোক সব খায় না। রুচি আর পছন্দ ভিন্ন।  একে বলে ফুড হ্যাবিট।  যেমন- জাপানের লোকজন শাক সবজী আর সমুদ্রের মাছ বেশি খায়। ফরাসিরা আঙুরের মদ , পনির আর ময়দার খাবার বেশি খায়। মেডিটেরিয়ান লোকজন মানে গ্রিক , স্পেন ইটালি এই সব দেশের লোকজন জলপাই, সবজী, সালাদ, মাছ আর টাটকা গুল্ম রোজ খাবেই খাবেই। আমেরিকানরা আলু আর  মাংস   বেশি খায়। এই খাওয়ার অভ্যাসটা একদম সাধারন।  তুমি নিজেই দেখ- তুমি হয়তো চিনি বেশি পছন্দ কর কিন্তু তোমার ছোট বোন হয়তো করে না। ঐ যে ফুড হ্যাবিট।যেমন  যীশু রুটি আর মাছ পছন্দ করতেন। আর  ভগবান কৃষ্ণ নাকি মাখন চুরি করে খেতেন। এটাও আসলে ফুড হ্যাবিট।

এই মুহূর্তে সারা দুনিয়ায় যে শস্য মানে ফসল হয় তাতে সবাই পেট  ভরে খেতে পারে। তারপরও খেয়াল করবে অনেকেই খাওয়া পায় না। না খেয়ে থাকে কত মানুষ ? কারন কি জানো ? ধনী দেশ অনেক খাবার নষ্ট করে। জাহাজ ভর্তি খাবার ফেলে দেয় সমুদ্রে। কেন করে ? হতে পারে ওরা হিংসুটে। আমি আসলে ঠিক জানি না।

বিজ্ঞানীরা ভাবছেন কয়েক বছরের মধ্যেই তারা চাঁদে বা মঙ্গল গ্রহে চাষবাস করবেন। লেটুস, আলু, টমেটো হেন তেন অনেক কিছু। নাসা  (NASA)  র  (National Aeronautics and Space Administration)  গবেষণাগারে  হুবহু চাঁদের আর মঙ্গল গ্রহের মাটি আর আবহাওয়া বানিয়ে সেখানে টম্যাটো আর অন্য কিছুর সবজীর দানা ফেলে চাষ করে ফসল  ফলাতে পেরেছে নাসার  বিজ্ঞানীরা।  আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শুরু  হয়ে যাবে  হয়তো সেখানের চাষবাস। পৃথিবীর লোকজন যাত্রা শুরু করবে সেখানে।

 আমার ইচ্ছা নেই সেখানে যাবার। পৃথিবীতেই থাকবো আমি।টুক টুকে  লাল টালির  বাড়ির সামনে  ছোট্ট একটা জায়গায় শীতের বিকেলে এক ফালি খামার করব। কমলা রঙের  গাজর, মিহি সবুজ ধনে পাতা, সৌখিন বিদেশী মরিচের চারা বা অমন কোন সবজীর চাষ করব। বুক ভরে নেব শিশির ভেজা মাটির ঘ্রান।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...