পরিচিত এক হাবড়া লেখক বলেছিলেন, ‘ ক্লাসিক বই হচ্ছে সেইসব বই - যে গুলো মানুষ পড়ে না। কিনে সাজিয়ে রাখে।‘
তর্ক করিনি।
লেখকদের সাথে তর্ক করা, আর পাণ্ডবদের বড় ভাই ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরকে জুয়া খেলতে নিষেধ করা একই জিনিস ।
অর্থহীন । বেকার । টাইম আর সময়ের অপচয়।
সময়কে লেখক -শিল্পীরা অতিক্রম করতে পারে না। সময় খুব নিষ্ঠুর। হিংসুটে। সবাইকে মুছে দেয় সে ।
তবে কেউ কেউ ভাগ্যবান। সময়ের নিষ্ঠুর থাবা এড়িয়ে টিকে যায় । কালজয়ী হয়ে যায় তাদের সেইসব লেখা।কাজ।
ক্লাসিকের হরেক সংজ্ঞা থাকলেও , এটা আসলে আমলকীর মত। খাওয়ার সময় কষটে স্বাদ থাকলেও সারাদিন সরাই ভর্তি জল পান করবেন , অলৌকিক মিষ্টি স্বাদের জন্য।
ক্লাসিক লেখকদের লেখায় জীবনবোধের বর্ণনা থাকে বেশি। থাকে ধর্ম - ইতিহাস- রাজনীতি বা আর অন্য সব ব্যাপার ।
দুই চারজন লেখক লিখেছেন খাবারের বর্ণনা । সামান্য হলেও হাতে গোনা অল্প কয়েকজন এড়িয়ে যাননি এই প্রসঙ্গ ।
তাদের লেখায় মনোলোভা সেই বর্ণনার কারনে, কিছু খাবার বিখ্যাত হয়েছে পরবর্তী সময়ে । পাঠক আস্বাদন করতে চেয়েছে সেই সব খাবার আর পানীয় । হয়েছে নতুন ব্র্যান্ড ভ্যালু ।
এই মুহূর্তে হাতের কাছে বেশ কিছু বই আছে । সেগুলো থেকেই আপনাকে বলছি।
অক্টোবর ১৮, ১৮৫১ সাল। পেল্লাই সাইজের একটা উপন্যাস বের হল। ইংল্যান্ডে। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮৬৪। নাম- মোবিডিক। আমেরিকান লেখক হারমান মেলভিন। সাইজে প্রায় মহাকাব্যের মত।
কে জানতো , পরবর্তীতে এটা পৃথিবীর সেরা পঠিত উপন্যাসগুলোর একটা হবে ! মর্যাদা পাবে মহাকব্যের মত।
একই সাথে অ্যাডভেঞ্চার- ফিকশন এবং প্রতীকী উপন্যাস হিসাবেও গণ্য হবে সমালোচকদের কাছে ।
মোবিডিককে ক্লাসিক হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরেই ।
মৃত্যুর অনেকগুলো বছর পরেও হারমান মেলভিল সাহেবের খোঁজ কেউ জানত না। তার প্রতিভা বা তাঁর শিল্পকর্ম কোনটাই পুরোপুরি স্বীকৃত ছিল না।
উনি বেঁচে থাকতে বইটা মাত্র ৩৭২৫ কপি ছাপা এবং বিক্রি হয়েছিল। উপার্জন করেছিলেন ৫৫৬ ডলার ৩৭ সেন্ট।
হারমান মেলভিন তার উপন্যাস মোবিডিক -এর পনের অধ্যায়ে ঝিনুকের স্যুপের অমন একটা মনোলোভা বর্ণনা দিয়েছিলেন।
' জিনিসটা বানানো হয়েছে ছোট্ট রসালো ঝিনুক দিয়ে। ঝিনুকের আকৃতি হেজেল বাদামের চেয়ে বড় হবে না মোটেও। আরও মেশানো হয়েছে জাহাজি বিস্কুটের গুঁড়া। সাথে শূয়রের নোনতা মাংসের পাতলা কুঁচি। মাখন দেয়ায় স্বাদ বেড়ে গেছে অনেক । পরিমিত ভাবে এসেছে লবণ আর গোলমরিচের মিহি দানা।'
বাইরে ধূসর রঙের শীতল হাওয়া। অশান্ত সাগর। খটখটে নগ্ন কাঠের টেবিলে তিমি শিকারিদের জন্য পরিবেশন করা হচ্ছে ধোঁয়া উঠা স্যুপ।
সন্দেহ নেই, পড়তে গিয়ে পাঠক বেশ লালা ফেলেছিল এই অধ্যায়ে এসে ।
পরবর্তীতে বাজারে ‘মোবিডিক স্যুপ’ নামে চালু হয়েছিল জিনিসটা।
নিজে চেখে দেখেছি।
সেই জিনিসরে ভাই।
ফরাসি সাহিত্যিক জুল ভার্নের নাম শুনেনি বা তার একটাও বই পড়েনি অমন পাঠক বোধ হয় পাগলা গারদেও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
প্রচুর লিখেছেন ভদ্রলোক। সবগুলোই মাস্টারপিস। কল্পকাহিনির জনক এই লেখকের বইয়ের লিস্ট একেবারে খারাপ না।
খাবারের কথা এসেছিল প্রায় সবগুলোতেই । নিয়মিত ভাবেই । হাতের কাছের কয়েকটা নিয়ে আলোচনা করি।
' রাউনড দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইজ' বইটা ছাপা হয়েছিল ১৮৭২ সালে। কাহিনির নায়ক ফিলিয়াস ফগ একজন ধনী ইংরেজ ভদ্রলোক। রিফর্ম ক্লাবে তাস খেলার সময় বাজি ধরে বাসেন মাত্র আশি দিনে উনি সারা পৃথিবী ঘুরে আসতে পারবেন। বাজির পরিমাণ কুড়ি হাজার পাউনড। আজকের দিনের আড়াই মিলিয়ন পাউনড।
তো সেই সময় যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল করুণ। এই অবস্থায় মাত্র আশি দিনে…। সন্দেহ নেই বইটা জুল ভার্ন সাহেবের সেরা কাজগুলোর একটা।
বইতে বেশি এসেছে শেরি আর পোর্ট নামের দুটো পানীয়ের কথা। এসেছে দারুচিনির সৌরভ দেয়া লাল ওয়াইনের কথা । টোস্ট করা রুটি আর চায়ের কথা ও এসেছে ঘন ঘন।
আরও আছে -
ব্যান্ডি। জিন । আম । ইংলিশ বিয়ার। জাপানি মদ সাকি। শুকনা গরুর মাংস। ঝিনুকের স্যুপ। আছে কাঁচা কলা, মশলা দিয়ে খরগোস রান্নার কথা।
সকালের জলখাবারের বর্ণনা শুনুন--
‘' তার প্রাতঃরাশে সাইড-ডিশ ছিল , রিডিং সস ( সবুজ পেঁয়াজ আর ওয়ালনাটের আচার দিয়ে বানানো এক ধরনের সস ) সহ একটি ব্রোলেড মাছ, (ব্রোলেড হচ্ছে আভেনের ভেতরে রেখে তাপ দিয়ে রান্না করার একটা কায়দা । এতে শুধু খাবারের উপর গরম তাপ লাগবে। বেকিং করলে খাবারের চারিদিকে তাপ লাগে। এই কায়দায় খাবার রান্না করলে ভেতরটা বেশ আদ্র থাকে। ) মাশরুম দিয়ে সাজানো রোস্ট করা গরুর মাংসের লাল ফালি । রবারবার্ট এবং গুজবেরি ফলের টার্ট । সাথে চেশায়ার পনিরের পেল্লাই একটা টুকরো । এক পেয়ালা চা। পেয়ালাটা আবার বেশ কয়েক বার চা দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়েছে । চা দিয়ে পেয়ালা ধুয়ে চা পরিবেশন এটা এখানকার একটা বিখ্যাত কায়দা।’’
১৮৭০ সালে ছাপা হয়েছিল ' টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্যা সি' বইটি। জুল ভার্ন সাহেবের সেরার সেরা অ্যাডভেঞ্চার মূলক কাজ এটা।
এতগুলো বছর পরেও দুর্দান্ত অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস হিসাবে এর জনপ্রিয়তা এতটুকুও কমেনি ।
কাহিনিতে ক্যাপ্টেন নিমো বিচিত্র ডুবো জাহাজ নটিলাসে করে আমাদের, মানে পাঠকদের ঘুরিয়ে এনেছেন সাগরের তলা থেকে।
তখনও সাবমেরিন আবিষ্কার হয়নি। কিন্তু নটিলাসের বর্ণনার সাথে আধুনিক সাবমেরিনের মিল ছিল অদ্ভুত রকমের।
ভাল কথা এক লিগ মানে চার কিলোমিটার।
অনেকে এই উপন্যাসের মধ্যে হোমারের অডেসি মহাকব্যের ছায়া পান।
গভীর সাগরের অপূর্ব বর্ণনা। দানব স্কুইডের সাথে লড়াই , সব মিলিয়ে রোমাঞ্চকর এক বই।
সেই সাথে বিচিত্র সব খাবারের বর্ণনা । যেগুলো পরিবেশন করা হত ক্যাপ্টেন নিমোর ডাইনিং টেবিলে।
'বাহ, রাগি গলায় বলল হারপুনার। 'এখানে খাবার বলতে আছেটা কি ? কচ্ছপের লিভার , হাঙরের ফালি,আর সিলমাছের বড় বড় টুকরো ?’
জবাবে নিমো বলেছিলেন,' রুটি, ওয়াইনের মত প্রচলিত খাবার পাবেন না এখানে। জল টাটকা আর পরিষ্কার। স্বাদে খানিক অন্য রকম। সাগর আমাদের সব রকমের খাবার দেয়। হরেক পদের মাছ ধরে সুস্বাদু করে রান্না করা হয়। মাংস বলতে কচ্ছপের ফালি, ডলফিনের লিভার ছোট ছোট টুকরো করে রান্না করি। খেতে শূয়রের মাংসের মতই।
'খাসা একটা বাবুর্চি পেয়েছি আমি। সাগর থেকে যাই সংগ্রহ করি, কেটে- বেছে , লোভনীয় করে পরিবেশন করে সে । মাছগুলো বেশির ভাগই অচেনা। সাগর শসা সংরক্ষণ করা হয়েছে মালয় দেশীয় কায়দায়। অতুলনীয় স্বাদ। এই যে মাখন দেখছেন, তিমি মাছের দুধ দিয়ে বানানো । উত্তর সাগরের কাছে আনিমনিস শ্যাওলা থেকে বানানো হয় চিনি।'
আরেক অধ্যায়ে লেখা-
‘ নিড এবং কনসেল ফিরে নিজেদের কেবিনে গেল । আমি চেম্বারে ঢুকলাম। রাতের খাবার তৈরি। হক্সবিলের( খোলায় বিচিত্র ছাপ আছে এমন কচ্ছপ) স্যুপ, হলোকানথাস (Holocanthus) মাছের সাদা ফালি, দেখে স্যামন মাছের চেয়েও ফাটাফাটি মনে হল আমার কাছে। লাল মুলেট, আর সাগরের শ্যাওলা।’
আরেক জায়গায়-
‘ওয়াইন, রুটি আর মাংস ছাড়া একজন ইংরেজকে মানায় না। সাথে নিদিষ্ট কয়েক ফোঁটা ব্রান্ডি বা জিন।’
মূল বইটা লেখা হয়েছিল ফরাসি ভাষায়। অনুবাদের সময় বেশ বৈচিত্র এসে গেছে অনুবাদের মধ্যে। খাবারের ব্যাপারগুলো ও বেশ গুলিয়ে গেছে তখন।
তারপরও যা আছে তা হল-
ঝিনুক, বড় গেঁড়ি শামুক, স্যাডল ঝিনুক যেটাকে অনেকে রুপালি খোসার ঝিনুক বলে। সাদা ভেনাস ঝিনুক , বিভিন্ন ধরনের সাগরের শ্যাওলা।
হাঙরের ফালি। সিন্ধুঘোটকের মাংস যেটা নাকি গরুর মাংসের মতই। কচ্ছপের মাংসের কথা এসেছে পুরো বইতে অনেকবার। ডলফিনের লিভার একদম শূয়রের মাংসের মত । আগেই বলেছি সেটা।
সামুদ্রিক শসার আচার। দক্ষিণ সাগরে পাওয়া যায় ফুকাস নামের বাদামি শ্যাওলা যেটা দিয়ে চিনি বানানো হত নটিলাসে।
হক্সবিল কচ্ছপের স্যুপ। যদিও আজকাল হক্সবিল কচ্ছপ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণী। এই কচ্ছপ প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত জেলিফিস খায়। কাজেই এর মাংসও বিষাক্ত হতে পারে।
তবে অতীতে এই কচ্ছপের স্যুপ ছিল তুমুল জনপ্রিয়। বিশেষ করে চৈনিক রাজপরিবারে।
কচ্ছপের ডিম। স্টারনা নাইলোটিকা পাখির মাংস। তিমির দুধের মাখন আর পনির।
দক্ষিণ মেরুদেশীয় র্যাবিট ফিস- যদিও দেখতে টাটকা কিন্তু স্বাদবিহীন।
কয়লার আগুনের হালকা আঁচে রুটিফল পুড়িয়ে খাওয়ার চনমনে বর্ণনা পাই আমরা জুল ভার্ন-এর ' দ্যা মিসট্রিয়াস আইল্যান্ড' বইতে । হরেক রকম মজার মজার খাবারের কথা এসেছে এখানে ও । কচি বাঁশের তরকারি, আর ঝলসানো বুনো আলুর কথা এই বইতে পড়ে লোভাতুর হয়ে গেছি কতবার ।
গরমের দুপুরে এই সব বই পড়ে মন কেমন করতো। বাইরে বাটারকাপ ফুলের পাপড়ির মত নরম হলুদ রোদ। চোখ বইয়ের পাতায়। মন ভিন্ন জগতে। অনেকের হয়তো অমন হত। কে জানে ?
১৯৮৩ সালে প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় খোলা হল জুল ভার্ন রেস্টুরেন্ট।
অবশ্যই ফরাসি খাবার। ১২০ জন খদ্দের বসার ব্যবস্থা আছে। এক পাশের দেয়ালের বদলে পুরোটাই কাচ। বসে দেখতে পাবেন শিল্পীদের শহর প্যারিসের অপূর্ব দৃশ্য।
এক বাটি স্যুপের অর্ডার দিয়েও আপনি সময় কাটাতে পারবেন। জুল ভার্নের ভক্ত হলে সময় করে একবার ঘুরে আসবেন। ঝলসানো আস্প্যারাগাস আর সেলারির স্যালাদ নাকি খুবই ভাল।
ব্রাম স্টোকার । ড্রাকুলা।
দুটো শব্দ। কত বিশাল। হরর সাহিত্যের মাত্রা বদলে দিয়েছিল এই এক বই । কাউন্ট ড্রাকুলা চরিত্র নিয়ে লেখা হয়েছে হাজার বই, মুভি, গল্প , কমিকস । কত কি ।
ড্রাকুলাকে নতুন করে পরিচয় করে দেয়ার দরকার নেই । উনি ব্রাম স্টোকারের ভ্যাম্পায়ার, ট্রান্সিলভেনিয়ান কাউনট । রাতের বেলা বাদুরে পরিণত হতে পারেন। কফিনে ঘুমায় এবং মানুষের রক্ত পান করেন ।
লেখক হ্যারি লুডলাম দাবি করেছেন, ব্রাম স্টোকার এক রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে এই ভিক্টোরিয়ান গথিক হরর লেখার আইডিয়া পেয়েছিলেন সম্ভবত ।
ব্রাম বাবু নাকি নিজেই বলেছিলেন, ' স্বপ্নে দেখি কফিনের ভেতর থেকে রক্তচোষাটা বের হয়ে আসছে। এত বিচ্ছিরি অনুভূতি হয়েছিল যে গল্পটা লিখতে বাধ্য হয়েছিলাম।'
১৮৮৮ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত রোমহর্ষক সিরিয়াল কিলার জ্যাক দ্যা রিপারের নাম আসে সবার সামনে । লন্ডন শহরটা আতংকে মুড়ে দিয়েছিল কুখ্যাত এই খুনি।
ঠিক দুই বছর পর ১৮৯০ সালে স্টোকার সাহেব ড্রাকুলা বইটা লেখার কাজে হাত দেন। ধারনা করা হয় জ্যাক দ্যা রিপারের সেই আতংক আর নিশাচর স্বভাব তাকে কাউনট ড্রাকুলার চরিত্র নির্মাণ করতে সাহায়্য করেছিল ।
বইটা প্রকাশ হয় ২৬ মে, ১৮৯৭। পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৪১৮। আর্চিবল্ড কনস্টেবল অ্যান্ড কোম্পানি এই উপন্যাসের প্রকাশক।
ড্রাকুলা বইটা ছাপা হয়েছিল তিন হাজার কপি। দাম রাখা হয়েছিল ৬ শিলিং। অনেক- অনেক সময় লেগেছিল বইগুলো বিক্রি হতে।
বেঁচে থাকতে ব্রাম সাহেব জনপ্রিয়তা বা নিজের বইয়ের কাটতি কোনটাই দেখে যেতে পারেননি।
তো , ক্লাসিক হরর ড্রাকুলাতে খাবারের বর্ণনা আছে নাকি ?
‘ … লাল মরিচ দিয়ে মাখা মাখা করে মুরগীটা রান্না করা হয়েছে। দেখেই খিদে পেয়ে যায়। মিনার জন্য রেসিপিটা দরকার। ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলাম, ঐ খাবারের নাম প্যাপরিকা হ্যানডেল ... এবং এখানের জাতীয় খাবার । কার্প্যাথিয়ানদের পাশাপাশি রোমানিয়ার যে কোনও জায়গায় এটি পাওয়া যাবে। '
এই পাপরিকা মুরগি আসলে হাঙ্গেরিয়ান খাবার। পরে রোমানিয়া আর তার আশেপাশের এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে ওখানকার ঐতিহ্যবাহি খাবার হয়ে গেছে।
তেমন কিছু না মুরগির মাংস, পেঁয়াজ, লাল মরিচ, ফালি করা পাপরিকা যেটা ক্যাপসিকাম বা বেলপেপার নামে পরিচিত , পাপরিকা পাউডার, টক দই, সামান্য ময়দা আর মাখন ।
যদি থাকে তবে টম্যাটোর পেস্ট আর রেড ওয়াইন।
না থাকলে নেই।
রান্নার পর জিনিসটা বেশ ঝোল ঝোল মাখা মাখা দেখায়। খেতেও বেশ।
বইতে আরও আছে, ভুট্টার ময়দা দিয়ে তৈরি পরিজ বা জাউ যেটার নাম মামালিগা ।
মারাত্নক লোভনীয় খাবার- ইমপ্লেটাটা ।বিশাল সাইজের বেগুনের ভেতরে চর্বিবিহীন গরুর মাংসের কুঁচি দিয়ে রান্না করা।
আর আছে রবার স্টেক।
রবার স্টেক জিনিসটা আর কিছু না, শিক কাবাবের মতই । সেই সময়ে লন্ডনে ভীষণ জনপ্রিয় ছিল।
গরুর মাংস, পেঁয়াজ, শূয়রের মাংসের পাতলা ফালির উপরে লবণ আর ঝাল মরিচের গুড়া মাখিয়ে কাঠি বা লোহার শিকে গেঁথে অনেক সময় ধরে ( ৩৫ মিনিট) আগুনের হালকা আঁচে ঝলসাতে হয়।
এটা মূলত রোমানিয়ার খাবার। উপন্যাসের প্রথম চ্যাপ্টারে বর্ণনা করা হয়েছিল। পরে অনেকেই এটাকে ড্রাকুলার কাবাব বলতো।
ড্রাকুলার কাবাব !
হায়রে মানুষ।
রুচিমত শূয়র বা গরু বাদ দিয়ে নিজেরা করতে পারেন। একটা বাউলে মাংসের আর পেঁয়াজের বড় বড় টুকরো রেখে জলপাই তেল, লবণ, রসুনের কুঁচি, মরিচের গুঁড়া ভাল করে মাখিয়ে নেবেন।
কাঠিতে একটা মাংসের টুকরো পরে একটা পেঁয়াজ এই সিরিয়াল মেনে গাঁথবেন।
তো সামনের শীতে ড্রাকুলা কাবাব করছেন তো ?
যদিও স্টোকার সাহেব ট্রান্সিলভেনিয়ার পটভূমির উপর বইটি লিখেছিলেন, কিন্তু তিনি কখনই সেই দেশে যাননি।
যতটা সম্ভব পারেন গবেষণা করেছিলেন । এবং বাকি ব্যাপারগুলো কল্পনার সাহায়্য নিয়েছিলেন ।যেটাকে মনের মাধুরী না কি বলে না ? সেটাই।
বেশিরভাগ ভিক্টোরিয়ান পাঠকই এই পার্থক্যটি জানে না। কারন ট্রেনের সময়সূচি, হোটেলের নাম এবং মুরগির বিখ্যাত খাবার যা পাপরিকা হেন্ডেল নামে পরিচিত সবই ট্র্যাভেল বই থেকে ঘেঁটেঘুঁটে সংগ্রহ করেছিলেন ব্রাম বাবু ।
সম্ভবত এটাই পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস , যেটা লেখা হয়েছ ডায়েরির দিনলিপি , সংবাদপত্রের টুকরো অংশ, জাহাজের লগবুক, টেলিগ্রাম আর চিঠি পত্রের ছকের উপর ভিত্তি করে। এটাকে বলে এপিস্টোলারি স্টাইল।
সারা দুনিয়ায় ড্রাকুলাকে নিয়ে ২১৭টা মুভি নির্মাণ করা হয়েছে। উপন্যাস লেখা হয়েছে এক হাজারের বেশি।
ব্রাম স্টোকারের আসল নাম , আব্রাহাম ব্রাম স্টোকার। জাতিতে আইরিশ। বিয়ের পর ইংল্যান্ডে চলে আসেন এবং একটা থিয়েটারে কাজ নেন।
ড্রাকুলা উপন্যাসের প্রথম নাম রাখা হয়েছিল -দ্যা আন-ডেড ।
কি ফালতু নাম।
উপন্যাসের প্রুফ দেখার সময় খানিকটা বেখেয়ালে উপন্যাসের নাম পরিবর্তন করে দিলেন স্টোকার। টাইপ করা পাতার এক পাশে বড় বড় হরফে লিখলেন- ড্রাকুলা।
উপন্যাসটি প্রকাশ হবার আটদিন আগে এটার নাট্যরূপ মঞ্চস্থ করা হয়। যে থিয়েটারে উনি কাজ করতেন সেখানেই।
১৯১৪ সালে ' ড্রাকুলার অতিথি' নামে ছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পটি, উপন্যাসটির একটি পূর্ববর্তী কাটা অধ্যায় বলে মনে করা হয়।
২০০৩ সালে ' ব্যাটম্যান অ্যান্ড ড্রাকুলা - রেড রেইন' নামে একটা কমিকস বের হয়েছিল। মারমার কাটকাট ধরনের বিক্রি হয়েছিল সেটা।
মাইক্রোসফ্টের (বিল গেটসের সাথে) সহ-প্রতিষ্ঠাতা পল অ্যালেন, স্টোকারের ড্রাকুলার পাণ্ডুলিপি ‘বড়’ পরিমাণ অর্থ দিয়ে সংগ্রহ করেছিলেন।
অভিনেতা ক্রিস্টোফার লি ১১ বার ড্রাকুলার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ভাবতেই অবাক লাগে। জ্যান্ত ড্রাকুলা ছিলেন বোধ হয় ভদ্রলোক !
শিল্পকলার প্রতি আজীবন বিশাল আগ্রহ ছিল ব্রাম স্টোকারের । ১৮৭৪ সালে ডাবলিন স্কেচিং ক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি ।
উনার বর্ণনা মতে- উপন্যাসে ড্রাকুলার পেল্লাই সাইজের একজোড়া গোঁফ ছিল। যদিও অনেক মুভিতেই ড্রাকুলার গোঁফ দেখান হয়নি। মাটির তলায় একটা গুপ্তকক্ষে কফিনের ভেতরে ঘুমাত সে। সূর্যাস্তের পর কফিন খুলে বের হয়ে আসতো । আবার মোরগ ডাকার আগেই পালিয়ে যেত।
ড্রাকুলার দুর্গ বিশাল পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। খাদ নেমে গেছে এক হাজার ফুট নীচে। দুর্গের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে চোখে পরে কার্পাথিয়ানের দম বন্ধ করা অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভা।
বিশেষ করে চাঁদনী রাতের একটা বর্ণনা আছে। আজও চোখের সামনে ভেসে উঠে রুপালি ফিতার মত নদীর কথা। দুর্গের কক্ষগুলি মনোরম এবং বিলাসবহুলভাবে সজ্জিত হলেও আয়না ছিল অনুপস্থিত। কোন কামরাতেই এক টুকরো আয়না ছিল না।
এক কামরাতে স্তূপ করা ছিল অনেকগুলো সোনার মোহর।
ড্রাকুলা উপন্যাসের দুই অংশ খুব রোমাঞ্চকর লেগেছে আমার কাছে । প্রথমটা, যখন জোনাথন টমটমে চেপে ড্রাকুলার দুর্গে যাচ্ছিল। যাত্রাপথের সেই বর্ণনা দারুন।
দ্বিতীয় অংশ , ড্রাকুলা যখন ট্রান্সিলভ্যানিয়া থেকে লন্ডনে আসছিল তখন। পঞ্চাশটা কাঠের বাক্সের মধ্যে নিজের দুর্গের গোরস্থানের মাটি ভর্তি করে জাহাজে করে যাত্রা করেছিল। সেই জাহাজের ঘটে যাওয়া কাহিনি সত্যিই রোমাঞ্চকর ।
আতংকের ব্যাপার হচ্ছে ড্রাকুলা নিজের অপশক্তি দিয়ে কুয়াশা, ঝড় এবং ব্জ্রপাত তৈরি করতে পারে।
সেইসময় এই তিনটে জিনিস দেখলেই উনার কথা খামখাই মনে হত।
বইপত্র ঘেঁটে আরও দুটো তথ্য পেলাম।
এক , ব্রাম সাহেবের নোটবইতে লেখা ছিল, কাহিনির প্লট উনি পেয়েছেন দুঃস্বপ্ন থেকে। সেই রাতে উনি নাকি মায়োনেজ মাখানো প্রচুর কাঁকড়ার মাংস খেয়েছিলেন।
দুই , বিজ্ঞানীরা ভ্যাম্পায়ার বাদুড়ের লালাতে এক ধরনের প্রোটিন আবিষ্কার করেছেন । নাম রেখেছে-ড্রাকুলিন । কাউন্ট ড্রাকুলার নামানুসারে ।
ব্রাম স্টোকারের আরও অনেক কাজ থাকলেও শুধুমাত্র ড্রাকুলা বইটার জন্য অমর হয়ে থাকবেন উনি। ভ্যাম্পায়ার ফ্যান্টাসি চালু হয় এই বইয়ের হাত ধরেই।
শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য , ড্রাকুলা শব্দটা একটা ব্যান্ড নেইমে পরিণত হয়েছে । পৃথিবীর অনেক দেশেই ড্রাকুলা ক্যাফে বা ড্রাকুলা রেস্টুরেন্ট আছে।
ভয় নেই ওগুলোর মালিক কাউনট ড্রাকুলা না। আপনি খেতে গেলে কোন বিপদে পড়বেন না। মিনাকে চিঠি লিখতে হবে না।
রোমানিয়া এক ওয়াইন কোম্পানি টকটকে লাল ওয়াইনের বোতল বাজারজাত করেছে। নাম , ড্রাকুলা রেডওয়াইন।
ওদের দাবি হিম হিম উপত্যাকার আঙুর খেত থেকে বাছাই করা আঙুর দিয়ে বানানো হয় এই ওয়াইন।
ভ্যাম্পায়ার নামেও একটা ওয়াইন আছে।
ড্রাকুলা, ড্রাকুলারস ব্লাড, এবং ড্রাকুলাস কিস নামে কয়েকটা ককটেল আছে বাজারে।
সবগুলো ককটেল লালচে রক্তের মত। তবে বেশ চনমন করা জিনিস। মূল উপাদান ভদকা, ক্র্যানবেরি জুস, মৌরির সুগন্ধযুক্ত মদ। বরফের কিউব।
ড্রাকুলা উপন্যাসে আরও আছে -
হাঙ্গেরিয়ান পুরানো দিনের সাদা মিষ্টি স্বাদের মদ টোকে,র কথা । শুধুমাত্র হাঙ্গেরিতে জন্মান আঙুর দিয়ে বানায় এটা।
স্লিভোভিটজ - প্লাম ফল দিয়ে গ্যাঁজানো ব্যান্ডি। মোটামুটি ঐতিহাসিক একটা জিনিস।
কাচের বয়াম ভর্তি ভিনেগারে ডুবিয়ে হেরিং মাছের আচার।
লাল মদ পোর্ট ওয়াইন। উত্তর পর্তুগালের ডুরো উপত্যকায় উৎপাদিত বিখ্যাত একটি পর্তুগিজ ওয়াইন।
ঝলসানো মুরগি। সালাদ। পনির। কফি। চা। শেরি। ব্র্যান্ডি।
এবং...
রসুন। রসুন। এবং রসুন।
হা হা হা।
'বন্ড, আমার নাম জেমস বন্ড।'
শিহরণ জাগানো বাক্য।
যুবকের মাথার চুল পিছন দিকে ল্যাপটানো। কালো স্যুটে বেশ চোস্ত লাগে।
যত বিপদে পড়ুক , হাতঘড়িটা কবজিতে আঁটো করে বা গলার নেকটাই হালকা ভাবে সরিয়ে ফিটফাট হয়ে লাফ দিয়ে পড়ে বিপদের মুখে।
১৯৫৩ সালে ইয়ান ফ্লেমিঙ্গের হাত ধরে ' ক্যাসিনো রয়্যাল' উপন্যাসের পাতায় জেমস বন্ড নামের এই গুপ্তচর পাঠকের মনোজগতে ঢুকে পড়ে।
মোট চৌদ্দটা রোমাঞ্চ উপন্যাস লিখেন ইয়ান ফ্লেমিং। জেমস বন্ড নামটা তিনি নিয়েছিলেন একজন বার্ডওয়াচারের নাম থেকে। মানে ইয়ান ফ্লেমিং তার উপন্যাসের নায়কের নাম কি দেবেন ভাবছিলেন। তখন তার হাতে এসে পড়ে ' বার্ড অভ দ্যা ওয়েস্ট ইন্ডিজ' নামে পাখিদের নিয়ে লেখা একটা বই। বইটার লেখকের নাম জেমস বন্ড।
ব্যস । ইয়ান ফ্লেমিঙ্গের পছন্দ হয়ে যায় নামটা।
এইভাবে তৈরি হয় আমাদের জেমস বন্ড।
তাকে নিয়ে বানানো হয়েছে মুভি, টিভি এবং রেডিও নাটক , কমিক্স, এমনকি এক ডজনের বেশি ভিডিও গেইম।
ইয়ান ফ্লেমিঙ্গের মৃত্যুর পর ব্যবসায়িক কারনে বেশ কয়েকজন লেখক মিলে চালিয়ে যাচ্ছে সিরিজটা।
এমন কি জেমস বন্ডের ছোটবেলার কাহিনি নিয়েও ইয়াং বণ্ড সিরিজের দশটা বই বের হয়ে গেছে।
আই লাভ ইট।
তো কেন জেমস বন্ড জনপ্রিয় ?
কেন বন্ড নিজেই একটা ব্যান্ড ?
মনোবিদদের মতে, প্রতিটা পুরুষ জেমস বন্ড হতে চায়। আর মেয়েরা চায় বন্ডের মত সঙ্গী।
পুরুষের ফ্যান্টাসি হচ্ছে - দামী গাড়ি, আগ্নেয়াস্ত্র, আর সুন্দরী মেয়ে । এই সব কিছুর ককটেল হচ্ছে জেমস বন্ড।
লাইসেন্স টু কিল- রোমাঞ্চকর সেই শব্দ। কিছুটা ছন্নছাড়া। ভোগী পুরুষ। পেশার খাতিরে দেশান্তরী । যমের মত ভিলেন। সব মিলিয়ে জেমস বন্ড।
জেমস বন্ড সিরিজের মধ্যে ক্যাসিন রয়্যাল বইতে যে খাবারের নাম এসেছে সেগুলো হচ্ছে- হুইস্কি , ক্যানাডিয়ান ক্লাব হুইস্কি, ক্যাভিয়ার সাথে প্রচুর টোস্ট ব্রেড, গলদা চিংড়ি, সুপ আর হরেক পদের ফল।
সিদ্ধ ডিমের কুসুম আর সাদা অংশ আলাদা আলাদা প্লেটে গ্রেট করে রেখে সাথে আবার পেঁয়াজের কুঁচি।
স্ট্রবেরি।
অর্ধেক ফালি করা আভোকাডোর সাথে ফ্রেঞ্জ ড্রেসিং।
শূয়রের মাংসের কুঁচি দিয়ে ভাঁজা ডিমের ঝুড়ি ।
ঠাণ্ডা নরওয়ে বাগদা চিংড়ি। যেটার চোস্ত ইংরেজি নাম - (Langoustines) ল্যাঙ্গোস্টিনস।
চিনি ছাড়া কফি ।
ফরাসি দেশীয় কায়দায় রান্না করা হাঁসের মাংস। যেটার নাম- পেতি ডি ফোয়ে গ্রাস।
ঠাণ্ডা কমলার রস।
ডক্টর নো বইতে যে খাবারের কথা এসেছে সে সব হচ্ছে - নোনতা মাছ, আখ। সাজানো ফলের ঝুড়িতে ফলের অলঙ্কৃত ঝুড়ি - ট্যানজারিন কমলা , জাম্বুরা, গোলাপী কলা, টক সপ,কামরাঙা । এমনকি কয়েকটি নেক্টারিন।
বুনো কলা। বেকন। রুতি-মাখন। সারা শরীরে কাঁটা ভর্তি গোলাকার সামুদ্রিক প্রাণী- সি অরচিনস । ক্যাভিয়ার।
হেইঞ্জ কোম্পানির টিনের কৌটা ভর্তি শুয়োরের মাংস এবং মটরশুটি। ভ্যানিলা আইসক্রিম সাথে হট চকোলেট সস। স্যান্ডউইচ, গ্রিল করা ভেড়ার কাটলেট। ইংলিশ পর্ক সসেজ। স্ট্রবেরি জ্যাম। মধু । সালাদ। তরমুজ। তিন ধরনের সূপ। কমলালেবুর আচার- বইতে মারমালেড লেখা আমি কমলালেবুর আচার বললাম। আশা করছি চিনতে সমস্যা হবে না।
তবে ক্যাসিনো রয়্যাল বইতে যে ড্রাই মারটিনির বর্ণনা করা হয়েছে পরবর্তীতে সেটাই বাজারে জেমস বন্ড ভেস্পার মার্টিনি নামে চলছে। দুনিয়ার যে কোন বারে গিয়ে নাম বললেই হবে।
বিভিন্ন মুভিতে বিশবারের বেশি ভদকা মার্টিনি পান করেছেন বন্ড। স্কচ অ্যান্ড সোডা পান করেছেন একুশ বার।
আমিরিকানো ড্রিংক পানীয়টা ক্যাসিন রয়্যাল বইতে সর্বপ্রথম পান করেছিলেন গুপ্তচর সাহেব।
১৮৬০ সালে ইতালির মিলান শহরের গারস্পারে ক্যাম্পারি' নামে এক বারে প্রথম চালু হয় এই ক্লাসিক পানীয়টা।
বেঁটে ওল্ড ফ্যাশন গ্লাসে এক আউন্স ক্যাম্পারি, এক আউন্স সুইট ভারমুথ আর বরফের কিউব রেখে গ্লাসে ঢেলে দিতে হবে সোডা। উপরে গারনিস হিসাবে কমলার ফালি বা হলুদ লেবুর খোসা ছিলে প্যাচিয়ে দিতে হবে।
অ্যাই সাবাস।
ক্লাস ফোরে পড়ি। গুলশান সিনেমা হলের কয়েক হাত সামনে আধবুড়ো এক লোক পুরানো বই বিক্রি করতো। উনার চোখ দুটো পচা লিচুর মত। দাঁতগুলো যেন খোসা ছাড়ানো বাদামের মত। লোক ভাল। দামে ঠকাতো না।
সপ্তাহে চার দিন যেতাম ওখানে। রাজ্যের বই আসতো বুড়োর কাছে।
এক বিকেলে বই ঘাঁটতে গিয়ে পেলাম রবার্ট লুইস স্টিভেনসন সাহেবের ট্রেজার আইল্যান্ড বইটা। নামি এক পেপারব্যাক প্রকাশনীর। পুরানো দিনের পালতোলা জাহাজ আর লেখক সাহেবের সুন্দর একটা ছবি, প্রচ্ছদে।
বাইরে পারসিমন ফলের মত রোদ। হিম হিম হাওয়া। গরীব মা ছেলে রাস্তায় বসে কয়লার আগুনে ভুট্টা পুড়িয়ে বিক্রি করছে। সৌরভ ভেসে আসছে বাতাসে।
বগলে বই নিয়ে ফিরে সন্ধ্যার পর পড়তে বসলাম।
ক্লাসিক ভাই ক্লাসিক।
রবার্ট লুইস স্টিভেনসন সাহেবের বেশি লেখার দরকার ছিল না। ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ আর ‘ দ্যা স্ট্রেঞ্জ কেস অভ ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড’ এই দুই বই কাফি । শুধু মাত্র ট্রেজার আইল্যান্ডের জন্যই অমর হয়ে আছেন তিনি ।
কত আফসোস করলাম বইটা পড়ে। আমি যদি জিম হতাম। আমাদের যদি অ্যাডমিলার বেইনবোর মত একটা সরাইখানা থাকতো ?
তখন বগলে ক্রাচওয়ালা কোন লোক দেখলেই চমকে উঠতাম। ঝড়ের রাতগুলোতে স্বপ্ন দেখতাম চোখে পট্টি দেয়া খোঁড়া জলদস্যুকে। যার কাঁধে বসে আছে কাকাতুয়া। পাখিটা চেঁচাচ্ছে- পিসেস অভ এইট।
দল বেঁধে গান গাইতাম-
সিন্দুকটা মরা মানুষের।
চড়াও হল পনের নাবিক।
আরেক বোতল রাম নিয়ে আয়।
ইয়া হো হো কি মজা।
রাম শব্দটা সেই অল্প বয়সেই মাথায় গেঁথে। গিয়েছিল । নারকেলের সৌরভওয়ালা ক্যারাবিয়ান রাম।
বইতে প্রথম খাবারের কথা এসেছে বুড়ো জলদস্যু যখন অ্যাডমিলার বেইনবো-তে এসে উঠল।
উনি বললেন - 'একদম সাদাসিধে মানুষ আমি। খাওয়া নিয়ে বায়না নেই। রাম, বেকন আর ডিম হলেই চলবে। আর আমার কামরা থেকে যেন জাহাজ দেখা যায়।'
অন্য পরিচ্ছেদে লেখা -
‘ দেখলাম, টেবিলের চারপাশে বসে আছে তিনজন , তাদের সামনে স্পেনীর় মদের বোতল আর কিছু কিসমিস …।’
আরেক জায়গায় লেখা- ' তিনি আরও বলেছিলেন, ‘ ছাগল, বেরি আর ঝিনুক খেয়ে অমন নিঝুম জায়গায় তিন বছর ধরে বেঁচে আছি ।’
পুরো ট্রেজার আইল্যান্ড ভর্তি শুধু খাবার আর খাবার।
আরও যা যা আছে- কবুতরের মাংসের পিঠা ।
পিপা ভর্তি আপেল (যেটার ভেতরে জিম লুকিয়ে ছিল) ।
নোনতা শূয়রের মাংস, বিস্কুট, পারমিসান চীজ ( ইটালিয়ান পনীর)।
ওয়াইন। ফলের আচার, ব্র্যান্ডি গ্রগ। ব্র্যান্ডি গ্রগ হচ্ছে চা ,ব্র্যান্ডি, লেবুর রস আর দারুচিনি দিয়ে বানানো পানীয়। অপূর্ব একটা জিনিস । এটা নাকি পুরানো দিনের ঘাঘু নাবিকদের প্রিয় পানীয় ছিল।
আজকাল কফির সাথে ব্র্যান্ডি দিয়েও পানীয়টা বানানো হয়। তত বেশি যুতসই লাগে না। জল , ব্র্যান্ডি আর মধু মিশিয়ে সাথে এক ফালি লেবু দিয়ে অনেক বারে আজকাল এটা পরিবেশন করা হয় অকসর।
গরম বেকন। নোনতা ভেড়ার মাংস। আরল।
আরল (Ale)- এক ধরনের পুরানো দিনের বিয়ার। ইংল্যান্ডে সেই সময় দারুণ জনপ্রিয় ছিল। মধ্যযুগে এই বিয়ারটা ছাড়া কল্পনা করা যেত না। রাজার সৈনিক হতে সাধারণ কৃষক সবার রোজকার পানীয় ছিল এটা। আড্ডার টেবিলে বা সকালের জলখাবারের সময় আরল আর রুটি ছাড়া একদম বেকার। এমনকি গির্জার সন্ন্যাসীরা পর্যন্ত নানা অজুহাতে জগ ভর্তি আল গিলে ফেলত।
এবং কনিয়াক ( লিচুর দানার রঙের ফরাসি ব্রান্ডি)।
স্যার আর্থার কোনান ডয়েল আর শার্লক হোমস।
মুদ্রার দুই পিঠ। শার্লকের জনপ্রিয়তার কাছে হেরে গেছেন কোনান ডয়েল। অথচ লেখালেখির সময় ডয়েল ভেবেছিলেন উনার সিরিয়াস লেখাগুলোই টিকে থাকবে। বাস্তবে হয়েছে উলটাটা।
আজকালকার আধুনিক পাঠকের কাছে শার্লক হোমসের কাহিনিগুলো খানিক একঘেয়ে ক্লান্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ পাঠকের কাছে এর আবেদন কখনও ফুরাবার নয়।
১৯০২ সালে ছাপা হওয়া ' দ্যা হাউনড অভ বাস্কারভিল' পড়ে দেখুন। গথিক হরর। বিশাল জলাভূমি। বিকেলের পর ঘন কুয়াশা। দূরের বাড়ির জানালায় মিটিমিটি মোমবাতির আলো। আচমকা কুকুরের ভয়াল গর্জন। আজও গা ছমছম করে উঠে । বর্ণনা, কাহিনির প্লট খুবই রোমাঞ্চকর। আনকমন।
কোনান ডয়েল সাহেব তার লেখায় খাবারের বর্ণনা খুব বেশি লিখে রেখে যান নি। কেন কে জানে !
যা আছে তা হচ্ছে -
বিয়ার, হুইস্কি , শেরি আর সোডা। ঠাণ্ডা গরুর মাংস, হাঁসের মাংস, বন মুরগী, বিফ স্যান্ডউইচ। কোন এক বিচিত্র কারনে পাউরুটি আর কফির কথা এসেছে অনেক বার।
ইংরেজ লেখক জেরোম ক্ল্যাপকা জেরোম আসলে জেরোম কে, জেরোম নামে পরিচিত। ১৮৮৯ সালে উনার বিখ্যাত বই ‘ থ্রি মেন ইন এ বোট’ প্রকাশিত হয়।
মূলত ভ্রমণ কাহিনি । সাথে মিশে ছিল স্থানীয় ইতিহাস এবং যাত্রাপথের আঞ্চলিক সংস্কৃতি। কিন্তু বইটা বিখ্যাত হয় রম্যরচনা হিসাবে।
আজও ছাপা হয়। বিক্রি হয় লক্ষ লক্ষ কপি। লেখক তার খুব প্রিয় দুই বন্ধু এবং পোষা কুকুরটা নিয়ে নদীপথে প্রমোদ ভ্রমণে বের হয়। সাথে ক্যাম্পিং করার যন্ত্রপাতি ।
তাদের যাত্রার এই সাধারণ বর্ণনা হচ্ছে বইটার মূল কাহিনি। কোথাও জোড় করে হাসানোর চেষ্টা নেই। কিন্তু আপনি না হেসে থাকতে পারবেন না।
কতবার যে পড়েছি।
সঙ্গত কারনেই খাবারের কথা এসেছে শৈল্পিক ভাবে। মনে পড়ে সেই পনিরের কথা, যেটার ঘ্রাণ ছিল এতই বাজে যে রেলগাড়ির সমস্ত যাত্রী দৌড়ে নেমে গিয়েছিল। একজন হালকা আপত্তির সুরে বলছিল, এই ঘ্রাণ তাকে মৃতশিশুর লাশের ঘ্রাণের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
শর্ষে বাটা খাওয়ার জন্য এদের আকুতি মনে পড়লে এখনও হাসি। আনারসের কৌটা খুলতে গিয়ে তিনজনেই কেমন নাকাল হয়েছিল, সবই মজার।
বইটা হাতের কাছে নেই । কাজেই নিখুঁত খাবারের তালিকা দিতে পারছি না। তবে ঠাণ্ডা মাংস, মাখন, ফলের পিঠা, আর বিয়ারের কথা এসেছে অনেকবার।
চা বানাতে গিয়ে ওদের নাকাল বেশ উপভোগ্য।
লেখক বলেছেন, কেটলিতে জল বসিয়ে অপেক্ষা করলে সেই জল ইহ জিন্দেগীতে গরম হবে না। জল বসিয়ে অন্য কোথাও যেতে হবে তবেই সেটা ফুটে কেটলি থেকে পরে যাবে। বা জল বসিয়ে জোরে জোরে বলতে হবে, ' আমার কিন্তু মোটেও চা খাবার ইচ্ছা নেই। কেউ চা খাব না আমরা।'
দেখবেন জল ফুটে যাবে।
বইটা পড়তে গেলে খাবারের প্রতি লোভাতুর হবেনই হবেন। ক্লাসিক এই বইটা কবে পড়ছেন ?
' তিনি শুনতে পেলেন অদ্ভুত এক কণ্ঠস্বর তার নাম ধরে ডাকছিল। বলছিল তাকে, কামরার ভেতরে প্রবেশ করতে। ওটা তার নিজেরই কামরা। তবে কোন এক আশ্চর্য জাদুমন্ত্রে বদলে গেছে সেটা। মেঝেতে রাজকীয় কায়দায় সাজিয়ে রাখা টার্কি, হাঁস, এবং মুরগির মাংস যা খেয়ে শেষ করা যাবে না। রোস্ট করা কচি শূয়রের বাদামী মচমচে মাংস। পেল্লাই সাইজের সসেজগুলো কেমন বেণী করে রাখা। মাংসের কুঁচি দিয়ে বানানো পিঠা। বরইয়ের পুডিং। মশলা দিয়ে মাখানো খোসা ছাড়ানো ঝিনুক। লালচে গরম চেস্টনাট। গোল্লা গোল্লা লাল আপেল। সরস কমলা, সুস্বাদু নাশপাতি, প্রচুর কেক, এবং পাঞ্চের বোল , যা তাদের সুস্বাদু বাষ্প দিয়ে চেম্বারকে ম্লান করে তুলেছে ... ।'
আ ক্রিসমাস ক্যারল ১৮৪৩ । পেইজ ৬৫/৬৬
খাদ্য ইতিহাসবিদ পেন ভোগলার বলেছিলেন, চার্লস ডিকেন্সের বিষয়টি হ'ল, তিনি ক্ষুধার্ত থাকার অনুভূতি কি সেটা জানতেন ।'
ভাল খাবার কি সেটা জানতেন না ক্লাসিক এই লেখক। তার বয়স যখন মাত্র বারো তখন দেনার দায়ে বাপকে গারদে যেতে হয়েছিল। বাধ্য হয়ে কারখানায় কাজ নেন ডিকেন্স। বেতনের পয়সা দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই শুধু রুটি আর মাখন কিনতে পারতেন।
চার্লস ডিকেন্স বাস্তব জীবনে ভোজনরসিক ছিলেন। ভিক্টোরিয়ান যুগের খাবারের বর্ণনা বারবার এসেছে তার লেখায়।
মাত্র বারো বছর বয়সে কারখানায় কাজ শুরু করেন। সেইসব অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তার লেখায় সহায়ক হয়েছে।
১৮৩৮ সালে ' অলিভার টুইস্ট' উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। ডিকেন্স প্রথম সাফল্যের স্বাদ পান ।
গল্পটি একটি অনাথ বালকের জীবন নিয়ে লেখা । সেটা যে ডিকেন্সের নিজের শৈশব থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না । এ বইতে ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত লাইন রয়েছে, -
‘ সে টেবিল থেকে উঠল। বাউল এবং হাতে চামচ নিয়ে মাস্টারের দিকে এগিয়ে গেল , কিছুটা আতঙ্কিত গলায় বলল - স্যার, দয়া করে আমাকে আরেকটু খাবার দিন।'
অনাহারী অনাথ অলিভার সাহসের সাথে বিতরণ করা এই হৃদয় বিদারক সংলাপটি প্রায় দুই শতাব্দী ধরে পাঠকদের স্পর্শ করেছে।
নিশ্চিত ভবে ধরে নেয়া যায় এটা চার্লস ডিকেন্সের শৈশবের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই নেয়া।
এই জাউ বানানো হত যব, গম বা চাল সাথে দুধ বা জল দিয়ে পাতলা করে সিদ্ধ করে। সন্তোষজনক খাবার না মোটেও । কিন্তু এতিমখানায় সেটা ও মেপে দেয়া হত।
সন্দেহ নেই ডিকেন্স সাহেব গল্পগুলিতে খাবারের বিবরণ দেওয়ার সময় একটু বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন। যখন যুবক পিপ তার বোনকে গরম রুটির কথা বর্ণনা করে, তখন অবাক হই আমরা। সামান্য জলখাবারের বর্ণনা আরও অনেক বেশি লোভনীয় মজাদার কিছুতে রূপান্তরিত করেন এই লেখক।
অনেক সাহিত্য রসিকদের মতে চার্লস ডিকেন্সের সাহিত্যের মূল চাবি ছিল এই খাবার।
আজকাল ক্রিসমাসের নিমন্ত্রণে যে সব খাবার পরিবেশ করা হয় সেগুলোও ডিকেন্স সাহেবের 'আ ক্রিসমাস ক্যারল' উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে।
আলু আর টার্কি তেমন জনপ্রিয় ছিল না সতেরো শতাব্দীতে।
পৃথিবীর অনেক দেশেই চার্লস ডিকেন্সের নামে হোটেল, ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট আর বার রয়েছে। সেই সবে গেলে আপনি ভিক্টোরিয়ান যুগের খাবার চেখে দেখতে পারবে।
পেন ভোগলার- এর লেখা ‘ডিনার উইথ ডিকেন্স- রেসিপি ইন্সপ্যায়ারড বাই দ্যা লাইফ এন্ড ওয়ার্ক অফ
চার্লস ডিকেন্স’ বইটা সময় পেলে পড়ে ফেলবেন। মজা পাবেন।
ক্লাসিক সাহিত্যে খাবারের বর্ণনার তালিকা বিশাল। আলোচনা করলে শেষ হবে না। আমি চাই আপনি নিজেই ক্লাসিক পড়া ধরুন। একটা একটা করে। আবিস্কার করুন সেইসব খাবার। উপভোগ করুন লোভনীয় বর্ণনা। চাইলে রেসিপি মত বানিয়েও ফেলতে পারেন। না করবে না কেউ।
লেখায় খাবারের বর্ণনা আসবে কি না সেটা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর পাঠক সেই বর্ণনা পছন্দ করবে কি না সেটাও পাঠকের রুচির ব্যাপার।
তবে তর্ক না করে বলা যায় প্রিয় লেখকের লেখায় কোন খাবারের কথা আসলে পাঠক অনেক সময় সেই খাবারটা চেখে দেখতে চায়। এর ব্যাখ্যা কি, আমার জানা নেই।
আমার নিজের লেখায় অনেক সময় খাবারের আর পানীয়ের কথা চলে আসে। ইচ্ছাকৃত নয়। প্রিয় জিনিসের কথা বলতে ইচ্ছা করে প্রিয় পাঠকদের সাথে।
খাবার আর বই আসলে একই জিনিস।
একটা দেহের একটা মনের।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন