সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আর্কিমিডিস রহস্য

 গল্পটা সবাই জানে। একদম ছোটবেলায় আমাদের পাঠ্য বইতে ছিল।

সিসিলির রাজা হাইরো (Hiero) ছিলেন বেশ ধর্মপ্রাণ মানুষ। একবার এক যুদ্ধে
জয়লাভের পর তিনি ঠিক করলেন মন্দিরে দেবতার জন্য একটা স্বর্ণের মুকুট তৈরি
করবেন। দেবতা যাতে খুশি হয়। মকুটটা হতে হবে একদম খাঁটি সোনার।
রাজভাণ্ডার থেকে পরিমাণ মত স্বর্ণ দেয়া হল স্যাকরাকে।
আর সেই স্যাকরাও দারুন দেখে একটা মুকুট বানিয়ে দিল। এই দিকে বাজারে বেশ গুজব
সেই স্যাকরা নাকি স্বর্ণের বদলে মুকুতে বেশ খানিক রুপা মিশিয়ে দিয়েছে। বাকি সোনা নিজেই হাপিস করেছে।
তখন রাজা হিরো আর্কিমিডিসকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন- এমন কোন উপায় আছে যাতে মুকুট না ভেঙ্গে এই জালিয়াতির ব্যাপারটা ধরা যায় ?
ব্যাপারটা শুনে বেশ চিন্তায় পরে গেলেন আর্কিমিডিস।

ভদ্রলোক বেশ বুড়ো একজন মানুষ। জ্ঞান চর্চা করেন। অংক, জ্যামিতি হাবিজাবি ভাল বুঝেন। সিসিলি দ্বীপের
জ্ঞানী মানুষ বলতে সবাই তখন আর্কিমিডিসকেই বুঝত।
তিনি চিন্তা করতে লাগলেন।
কিভাবে ? কিভাবে মুকুট না ভেঙ্গে বুঝা যায় ওটা একদম খাঁটি সোনার তৈরি,   নাকি খাঁদ
মেশানো হয়েছে।
ভাবতে ভাবতে তিনি গোসল করতে গেলেন।
পেল্লাই সাইজের একটা বাথটাবে গোসল করতেন তিনি।গরম পানি সাবান হেন তেন তো নিশ্চয়ই থাকত।
বাথটাবে বসা মাত্র বেশ খানিক পানি পিচিত করে বাইরে পরে গেল।সাথে সাথে মগজ
খুলে গেল আর্কিমিডিসের।

 হায় হায়। একদম সহজ তো।
সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছেন তিনি।
চেঁচিয়ে উঠলেন- ইউরেকা। ইউরেকা। মানে পেয়েছি।
তখন জামা কাপড় না পড়েই রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে রাজার দরবারে পৌঁছে গেলেন।
সবাই গোল্লা গোল্লা চোখে চেয়ে আছে তার দিকে।
তো বাথটাবে বসে আর্কিমিডিস কি ভাবে সেই মুকুটের রহস্যের সমাধান পেলেন ?
তিনি দেখলেন বাথটাবে বসা মাত্র বেশ খানি পানি বাথটাবের বাইরে পড়ে গেল।
নিশ্চয়ই সেই পানির আয়তন আর বাইরে উপচে পড়া পানির আয়তন সমান হবে।
এবং তিনি আবিষ্কার করে ফেললেন- কথাটা সত্য।

কোন জিনিসকে পানিতে ডোবালে
সেই জিনিসটা পানিতে যতটুকু ডুবে আছে তার সমান আয়তনের পানি সরিয়ে দেবে।
দারুন একটা সূত্র বের করে ফেললেন তিনি।
আর্কিমিডিস মুকুটটা পানিতে ডুবালেন । দেখলেন কতটুকু পানি উপচে পড়ে।
এরপর সমান ওজনের সোনা ডোবালেন। দেখলেন মুকুট ডোবানোর সময় বেশি পানি উপচে পড়ছে।তারমানে জিনিসটা একদম খাঁটি সোনার তৈরি না।
খাঁদ আছে।
স্যাকরাকে ধরা হল। বেচারা ভয়ে সব স্বীকার করলো। লোভে পড়ে সে অমন তস্করগিরি
করেছে।
যে লোক পানিতে জিনিস ডুবিয়ে চোর ধরতে পারে তার কাছে কিছুই লুকানো থাকে না।
তো এই হচ্ছে আর্কিমিডিসের সেই গল্প ।


তো কি মনে হয় ? ঘটনা বা গল্প কি সত্য ?
ইতিহাস কি বলে ?
অন্য কোন কাহিনি নেই তো ?
ইতিহাসবিদরা আরও একটা গল্প বলেন।
রাজা হাইরো আর্কিমিডিসকে বিশাল সাইজের এক জাহাজ বানানোর কাজে নিযুক্ত করেন।
সেই সময়ের সমুদ্রগামী জাহাজগুলোর চেয়ে ১৫গুন বেশি বড় হবে। জাহাজটার নাম হবে সিরাকুসিয়া ( SYRACUSIA) ।
জাহাজ তো আর্কিমিডিস বানাবে না। বানাবে শ্রমিকরা। উনি শুধু কায়দাটা বলবেন।
কিভাবে বানাতে হবে।
রাজা হাইরোর স্বপ্ন তার বানানো জাহাজটা হবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় জাহাজ।
মিসরের শাসক টলেমীকে উপহার দিয়ে চমকে দেবেন তিনি।
কিন্তু এমন বিশাল প্রায় রাজপ্রাসাদের সাইজের জাহাজ কি সমুদ্রে ভেসে থাকতে পারবে ?
আর্কিমিডিসের সময়ে এটা খুবই অসম্ভব একটা জিনিস। যেন জিজ্ঞেস করা হয়েছে- পাহাড় কি উড়তে পারবে ?
এনা পাহাড় থেকে পেল্লাই সব পাইন গাছের গুড়ি আনা হল।
স্পেন থেকে মোটা মোটা দড়ি আনা হল। আর জাহাজের খোলে মাখানোর জন্য
ফ্রান্স থেকে আলকাতরা আনা হল।
জাহাজে কি থাকবে ?
জাহাজের ডেকে  প্রহরীদের জন্য আটটা  টাওয়ার থাকবে।

টাওয়ারমানে,  যেখানে দাঁড়িয়ে দূর দূর পযন্ত
নজর রাখা যাবে। কপিকল থাকবে। এক একটা কপিকল যাতে ১৮০ পাউনড ওজনের পাথর ছুড়ে মারতে পারে শত্রুপক্ষের উপর।
যাত্রীদের জন্য সুইমিং পুল আর স্নানঘর থাকবে। সারাক্ষণ গরম পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
লাইব্রেরী থাকবে বই আর পাথরের মূর্তি ভর্তি। দেবী আফ্রোদিতির একটা মন্দির থাকবে।

এমন কি ব্যায়াম করার জিম ও থাকবে।
আর্কিমিডিসের জন্য কঠিন কাজ যেটা তা হলো রাজা হাইরো বড় বড় চারটে
কার্গো দিতে চান সাথে।
একটায় থাকবে ৪০০ টন খাদ্যশস্য। ১০ হাজার জার ভর্তি নোনা মাছের আচার।
৭৪ টন মিষ্টি পানি। পান করার জন্য। এবং ৬০০ টন উল।
সাথে থাকবে ১ হাজার যাত্রী। যাদের মধ্যে ৬০০ জন হচ্ছে সৈনিক।
সাথে কুড়িটা ঘোড়া আলাদা আলাদা আস্তাবলে।
সবাই দাবি করলো এই রকম জাহাজ কখনই বানানো সম্ভব না। একদম না।
সেটা নিয়েই ভাবছিলেন তিনি।
এবং গোসল করতে গিয়ে বাথটাবে বসে ভাবছিলেন, কিভাবে ভারি বাথটাবের পানি উপচে পড়ে ?
তখনই আইডিয়া পেলে গেলেন। ২ হাজার টনের সিরাকুসিয়া জাহাজটা যদি ২ হাজার টন
পানি অপসারণ করে। তবে সেটা কেরে মেরে করে ভেসে থাকবে। যদি ৪ হাজার টন
পানি অপসারণ করে তবে বেশ ভালই ভেসে থাকবে।
আর যদি ১ হাজার টন পানি সরিয়ে দেয়ইয়ে রাজা হাইরো তখন মোটেও খুশি হবে না।
এই সুত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আজও। আর্কিমিডিস প্রিন্সিপাল বলে।

এই জন্যই পেল্লাই সাইজের বিশাল সহ মালবাহী জাহাজ ভেসে থাকতে পারে ছোট ছোট সব নৌকার মত।
জাহাজের তলাকে বলে কীল (keel)। এই কীল যথেষ্ট ভারি করতে হবে । এবং যথেষ্ট চেপটা হতে হবে যাতে প্রচুর পানি সরিয়ে দিয়ে জাহাজটাকে ভাসিয়ে রাখতে পারে।
এখন কোন কাহিনীটা সত্য ?
যাক। জাহাজের কীল-  কে গ্রিক ভাষায় করোনা (korone) বলে।
আর মুকুটকে ইংরেজিতে বলে ক্রাউন ।
তো ইতিহাসবিদরা কি এই দুই কাহিনি মিশিয়ে ফেলেছিলেন ?
আজ আর বলা সম্ভব না।
কোন প্রমান নেই ।
আমরা শুধু কল্পনা করতে পারি সেই জাহাজটা যখন মিসরের বন্দরে গিয়ে পৌঁছেছিল
তখন সেখানকার লোকজন কেমন অবাক হয়ে গিয়েছিল এমন ভাসমান একটা প্রাসাদ দেখে।

সেই আমলের টাইটানিক ছিল যেন।

 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...