সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নীল সাগরের অজানা দানব

 হারিয়ে যাওয়া অতীতে বিশাল আকারের কিম্ভুত কিছু প্রাণী ছিল । 

সেটা কিন্তু জানতাম না আমরা। কেউ অনুমান ও করতে পারেনি। সবাই ভাবতো চারিদিকের এই পরিবেশ চিরকাল অমন ছিল। একই রকম। এইসব জীবজন্তু তাও ছিল একই রকম।


 চিরকাল।

গল্প শুরু ১৬৭৬ সালে ।

 রবার্ট প্লোট নামে এক ভদ্রলোক ইংল্যান্ডের এক মিউজিয়ামের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তার নোট বইতে বিশাল একটা হাড়ের স্কেচ এঁকে লিখে রাখেন- ‘ হাড়টা সম্ভবত কোন দানব আকারের মানুষের হাড় হবে।’ 

কিন্তু পরে জাদুঘর থেকে রহস্যময় ভাবে হাড়টা হারিয়ে যায়। কোন খোঁজ পাওয়া যায় না সেই রহস্যময় হাড়ের।এই নিয়ে আর কোন খবর পাওয়া যায়নি। 

কেন অমনটা লিখেছিলেন ভদ্রলোক ?

১৮২২ সালে ইংল্যান্ডে মেরি অ্যান মেন্টেল নামে এক ভদ্রমহিলা আর তার স্বামী শখের বশত খোঁড়াখুড়ি করতে গিয়ে বিদঘুঁটে কিছু দাঁত পায়। মনে করে বিশাল কোন কুমিরের দাঁত। সেই সময় আরও নানান জায়গায় অমন হাড় বা দাঁত পাওয়া যাচ্ছিল। মানুষ ভয় পাচ্ছিল এই সব পেল্লাই সাইজের হাড় আর দাঁত দেখে।

 কি এই সব ? ভয়াল কোন দানব না তো ? 

এই ভাবেই চলছিল। ১৮৪১ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রিচার্ড ওয়েন বুঝতে পারলেন, এই সব বিচিত্র হাড়গোড় আর দাঁত ভিন্ন ধরণের কোন প্রাণীর। যারা বেঁচে ছিল অনেক অনেক আগে, হারিয়ে গেছে ওরা কালের আঘাতে। ডাইনোসর নামটা উনারই দেয়া। যার অর্থ – বিশাল আকারের গিরগিটি।

সেই সাথেই বদলে গেল যেন পৃথিবীর ইতিহাস। জীব জগতের ইতিহাস । 

বিশাল সব দানব। ওরা ছিল। কোটি কোটি বছর আগে। ওদের রাজ্যত্ব ছিল কোটি কোটি বছর ধরে। দীঘল আর ঘন অরন্যে ঘুরে বেড়াত ওরা। সারাক্ষণ শোনা যেত ভয়াল গর্জন। তারপর হারিয়ে গেছে। সেটাও অনেক অনেক বছর আগে।
কি হয়েছিল সেই সময় ? কেউ জানে না।

৬৫ মিলিয়ন বছর আগে সারা দুনিয়ায় ওরা ছিল। চারিদিকে ঘুরে বেড়াত দানব সাইজের ডাইনোসর । আট তলা দালানের সমান এক একটা। আকাশে উড়ে বেড়াত । এমন কি অথৈ সাগরেও ওরা ছিল। রাজার মত। দিন হয়তো এই ভাবেই যেত।
কিন্তু না। 

সেই সময় আকাশ ভেদ করে ভয়ংকর এক অতিথি এলো। ১২ মাইল ব্যসের এক উল্কা । এসে আঘাত করলো পৃথিবীকে। একশোটা আণবিক বোমা বিস্ফোরিত হলে যেমনটা হয়, ঠিক ততটুকু ক্ষমতা ছিল সেই উল্কাপিণ্ডের।

 উল্কার ছাইয়ে আকাশ কালো হয়ে গেল। অমন রইল বছরের পর বছর। বদলে গেল দুনিয়ার আবহাওয়া। ৭০% প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেল । সেই সাথে হারিয়ে গেল আমাদের এই ডাইনোসর।

কবের ঘটনা এটা ?


৬৫ মিলিয়ন বছর আগে। আর মানুষ ? ওরা পৃথিবীতে এলো আরও অনেক অনেক পরে। আধুনিক মানুষ মানে তোমার আমার মত দেখতে যে মানুসগুলো ওরা পৃথিবীতে এসেছে ২ লক্ষ বছর আগে। মনে হচ্ছে না কত আগের কথা ? উহু । মাত্র কিছুদিন আগের কথা।

আচ্ছা আমরা ধীরে ধীরে একদম প্রথম থেকে বলা শুরু করি ?


পৃথিবীর ইতিহাসের দীর্ঘ এই সময়টাকে যদি ১২ ঘণ্টা ধরি, তবে মানুষ এসেছে বারোটা বাজার মাত্র ১২ সেকেন্ড আগে। পৃথিবীর প্রথম প্রাণ   এসেছিল সমুদ্রে।

 এক দম পিচ্চি সাইজের ব্যাকটেরিয়া। সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগে। খালি চোখে দেখা যেত না। ৬৫০ মিলিয়ন বছর আগে ওরা জমাট বেঁধে দেখার মত একটা চেহারা নিল। 


নরম তুলতুলে দেহের এক কোষী প্রাণী। 


পরের ৪০০ মিলিয়ন বছর অনেক পরিবর্তন হল ওদের। আকারে। গড়নে। প্রকৃতিতে। কত রকম পরিবর্তনের পর চেনা মাছের চেহারা নিল। ৩০০ মিলিয়ন বছর আগে সমুদ্র থেকে মাটিতে উঠে এলো বিদঘুটে সরীসৃপের চেহারা নিয়ে। উভচর হয়ে। ওদের একদল আবার আকাশে উড়া শিখে গেল গেল। জীবজগতের জন্য সেটা ছিল স্বর্ণযুগ। এক একটা পোকা বা ফড়িং ছিল তিন ফুট লম্বা।

বিশাল সব ডাইনোসর হল তখনই। সেই রকম বিশাল আকারের প্রাণী আগে বা পরে কখনই আর জন্ম নেয়নি পৃথিবী নামের গ্রহতে। বাকি যারা ছিল তাদের অবস্থা করুন ছিল সেটা অনুমান করতে পারি। 

এই ভাবেই চলত হয়তো বাকি জীবন। যদি না সেই উল্কা এসে আঘাত না করতো। আর পট পট করে সব ডাইনোসর মরে না যেত । সবাই মরে গেল । এমন কি সাগরে যে ডাইনোসরগুলো থাকতো ওরাও। মেরিন রেপটাইল বলে যেগুলো কে ।


বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত সাগরের তলায় মেরিন রেপটাইল যাদের নাম দেয়া হয়েছে Sea Rex ওরাও মারা গেছে । 
সবাই।

 ট্রায়োসিস, জুরাসিক এবং ক্রিটেসিয়াস এই তিন যুগে ওরা টিকে ছিল। সাগর তলের এই দানবদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হল ইকথিউসরাস (Ichthyosaurus) । পেল্লাই সাইজের হলেও লেজের সাহায়্যে সাঁতার কাটতো । 

একদম মাছের মতই । সব যুগেই ওরা ছিল সাগরের রাজা। ওরা ছিল তখন থেকেই যখন পৃথিবীতে কোন মহাদেশ তৈরি হয়নি। ছিল শুধু সাগর। মহাদেশগুলো সব এক জায়গায় তাল পাকিয়ে ছিল এক সাথে। 

এখন যেখানে ইউরোপ সেই জায়গায় দল বেঁধে ঘুরে বেড়াত । সাগরের পানি ছিল গরম। নিজেদের মধ্যে লড়াই করতো খাবার নিয়ে। সাঁতার কাটতো দারুন। লম্বা হত ১৩ ফিটের মত। বিপদজনক প্রাণী। থাকতো দল বেঁধে।

দেখতে যাই হোক ওরা ছিল প্রায় ডলফিন আর তিমির মত। ওরা বাচ্চা প্রসব করতো। ইকথিউসরাসের কিছু ফসিল এত টাটকা পাওয়া গেছে যেটায় দখা যায় পেটের ভেতরে বাচ্চা ছিল। ডিম না। গোল বড় আকারের চোখ, চোখের উপর রিঙের মত গোল হাড় । সাগরের তলায় পানির প্রচণ্ড চাপ থেকে চোখ রক্ষা করতো সেই গোল হাড়। সাগরের তলায় অতল অন্ধকারে ওরা দেখতে পেত পরিষ্কার।

এত কোটি বছর আগের হারিয়ে যাওয়া প্রানীদের নিয়ে এত কিছু আমরা জানি কি ভাবে ? 
উত্তর- ফসিল। 

এত ফসিল পাওয়া গেছে বলার মত না। বিজ্ঞানীরা বই পড়ার মতই ফসিল দেখে হারিয়ে যাওয়া সেই অতিথি নিয়ে সব জানতে পারে।

ডাইনোসর শব্দটা আবিষ্কারের অনেক অনেক আগে থেকেই সাগর দানবদের এই ফসিল পাওয়া গেছে পৃথিবীর নানান জায়গায়। মেরি অ্যানি নামে এক ভদ্রমহিলার কথা না বলে পারছি না। উনিশ শতাব্দীর প্রথম দিকে উনি প্রচুর ফসিল পেয়েছিলেন। খেলার ছলে মাটি খুঁড়তে গিয়ে। দক্ষিণ ইংল্যান্ডের উপকূলে। সারা জীবন ধরে উনি ফসিল খুঁজে গেছেন। 

এবং দারুন সব ফসিল পেয়েছেন। সবই ইংল্যান্ডের ন্যাচারাল মিউজিয়ামে আছে।
ফসিল দেখে জানা যায় সেই সময়ে সাগরে আরেক ভয়াল দানব ছিল। প্লিসিওসরাস (plesiosaurs ) ২০৩ মিলিয়ন বছর আগের সাগরের রাজা। শরীরটা বিশাল। ৪৯ ফিট পযন্ত হত । গলা জিফারের মত লম্বা। বৈঠার মত চারটে পা ছিল যা দিয়ে দুরন্ত গতিতে সাঁতার কাটতে পারত , সাগর তখনও গরম ছিল। তবে বেশ শীতল হয়ে আসছিল। 

পৃথিবীতে নতুন সব প্রাণ  জন্ম নিচ্ছিল তখন। 

সাগরের মহাআতঙ্ক ছিল প্লিসিওসরাস। সারাক্ষণ খিদে লেগেই থাকতো ওদের। আক্রমণ করতো স্বজাতীয়দের বা অন্য সব মেরিন রেপটাইলদের। সারাক্ষণ খাওয়ার উৎসব চলছে সাগরের গভীরে। কাউকে ভয় পাবার দরকার ছিল না ওদের। উল্টা সবাই ভয় পেত প্লিসিওসরাসদের। এর মুখের চোয়ালই ছিল ১০ ফুট লম্বা। চাকুর মত বড় বড় দাঁত।

দিন সমান যায় না।

আরেক ভয়াল দানবের খোঁজ পাওয়া গেল। ফসিল থেকেই। ওদের নাম -মোসাসোর ( Mosasaur) অনেকে মোসাসরাস মনে করতে পারে। কিন্তু ওটা অন্য জিনিস। 

ক্রিটেসিয়াস যুগের শেষ দানব ছিল এই মোসাসোর । সাগরের খাদ্যচক্রের শিখরে ছিল ওরা। সবাইকে খেত। আগের যত সাগর দানব ছিল সবচেয়ে বেশি বিপদজনক হয়ে গেল এই মোসাসোর।

পৃথিবীর আবহাওয়া তখন বেশ দারুন । যদিও বেশ গরম । ইউরোপ তখনও সমুদ্রের তলায়। 

প্লিসিওসরাস তখনও ছিল বেশ কিছু। কিন্তু ওরা দুর্বল হয়ে গেছে। ওদের রাজ্যত্ব শেষ। ৫০ ফিটের মত লম্বায় হত মোসাসোর। সর্বভুক – সব খায়। মাছ। কাছিম। এমন কি প্লিসিওসরাসদের ও খেত। দেখতে কিছুটা আধুনিক হাঙরের মত হলেও শ্বাস নেয়ার জন্য ওদের উপরে উঠতে হত। দেখতে হাঙরের মত হলেও ততদিনে আটলান্টিক সাগরের 

অন্য পাড়ে বিশাল সব হাঙর জন্মে গেছে। মেগালোডন নাম ওদের। কিন্তু সাগর দানবদের মধ্যে শেষ হিরো হচ্ছে আমাদের এই মোসাসোর। এর পরে আর কেউ আসেনি। হয়তো বিবর্তনের নিয়মে সাগরে নতুন কোন দানব জন্ম নিত।

 কিন্তু তেমন কিছু হল না। একদিন সব ডাইনোসর অবাক হয়ে দেখল আকাশ থেকে নেমে আসছে আগুনের বড় একটা গোলা। ওটাই ছিল ওদের সামাজ্যের শেষ দিন।

আর এই যে এত কিছু চমৎকার গল্প , সবই আমরা জানতে পারলাম পাওয়া ফসিল থেকে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...