বর্ষাকাল ডাকাতদের জন্য দারুন চনমন করা একটা সময়।
বৃষ্টির জল পেয়ে নদীগুলোর সাহস বেড়ে দুই কূল উপচে উঠে।
গ্রামের নিচু সমতল পথ ঘাট ডুবে এক একটা গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ছন্নছাড়া দ্বীপের মত। যোগাযোগের উপায় থাকে না।
রাতের বেলা টিমটিম করে কুপি বা হারিকেলের জ্বলে। দূর থেকে অমন বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলো দেখতে বড্ড রহস্যময় লাগে তখন ।
ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার রাতে , শাখা নদী থেকে লম্বা কালো ছিপ নৌকা বেয়ে বড় নদীতে চলে আসে ডাকাতের দল। দলের মধ্যে এমন লোক থাকে যারা খুব নিঃশব্দে দাঁড় বাইতে পারে । আর কে না জানে , ছিপ নৌকা তো বাতাসের আগে চলে।
নদীর কলকল আর রাতের বাতাসের সাইসাই শব্দে নৌকার দাঁড়ের শব্দ চাপা পড়ে যায়। অমাবস্যা রাত ডাকাতি করার জন্য খুবই ভাল। ভরা জোসনার চান্দিনা রাত ভাল না। বহু দূর থেকেই ডাকাতদের নড়াচড়া কারও না কারো চোখে পড়ে যায়।
নিয়ম হল লুটের মাল অর্ধেক পাবে দলের সর্দার।
বাকি অর্ধেক সমান ভাগ হবে দলের সব সদস্যদের মধ্যে। নিয়ম খুব কড়া। ডাকাতি করার আগে যে বাড়িতে লুট করতে যাবে সেই বাড়ির ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে আসে ডাকাত দলের একজন। যে খোঁজ নিয়ে আসবে সে সমান ভাগ পাবে। সে ডাকাতি করুক বা না করুক ।
খোঁজ নিতে হয় নানান ফিকির বা কায়দা করে।
খোঁজ মানে- বাড়ির কর্তার আয় উপার্জন কেমন ? বাড়িতে নগদ টাকার পরিমাণ কেমন হতে পারে ? বাড়ির কর্তার কাছে বন্দুক ফন্দুক আছে কি না ? বাড়ির সদস্য সংখ্যা কত ? বাচ্চা আর বুড়ো কতজন ? মেয়েরা গয়না গাটি কেমন পরে। প্রতিবেশীদের বাড়ি ঘর কতটা দূরে দূরে।
সেই সাথে পালানোর পথটাও খেয়াল রাখতে হবে।
বেশ কয়েকদিন খোঁজ নেয়ার পর সর্দার নিজেই ঠিক করবে কবে ডাকাতি করতে যাবে। কয়েক দফা মিটিং হয় নিজেদের মধ্যে।
ডাকাতদের নিজস্ব নৌকা থাকে । সেগুলো শাখা নদীর মধ্যে অগভীর জলে ডুবিয়ে রাখে। যাতে কেউ না জানে ওগুলোর হদিস । অথবা বিল থেকে নরম ঘাস কেটে আনার জন্য সেই নৌকা ব্যবহার করে।
অস্ত্র থাকে। রামদা, বল্লম , বা বড় বড় কাঠের লাঠি। লোহার অস্ত্র গোপনে লুকিয়ে রাখে। কেউ যদি থানায় গিয়ে দারোগা বাবুর কাছে নালিশ করে তবে ঝামেলা হতে পারে । সেই ভয়েই লুকিয়ে রাখতে হয়। হতে পারে শ্মশানের বড় কোন গাছের উপরে। বা বিরান মাঠের মধ্যে কোন শিমুল গাছের তলায়। মাটিতে গর্ত খুড়ে। জায়গাটা শুধু ওরাই চিনতো।
তো কয়েক দফা মিটিং শেষ হবার পর সর্দার নিজেই দিন ঠিক করতো। মানে রাত ঠিক হত।
এবং অম্যাবস্যা হত বেশির ভাগ সময়।
ভরা জোসনা এড়িয়ে যেত সতর্কতার সাথে।
দলের সবাই রাতের বেলা এসে হাজির হত সেই জায়গায়, যেখানে অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সামান্য মদ খাওয়া হত। মদ খাওয়াও ডাকাতি করার একটা অংশ। ওতে সাহস বাড়ে। মনের ভেতরে বাড়তি একটা চনমনে ভাব চলে আসে।
নদী থেকে ছিপ নৌকা তুলে নিয়ে যাত্রা শুরু হত। যে বাড়িতে ডাকাতি করবে তার কাছাকাছি এসে সব ডাকাত সারা শরীরে ভাল করে তেল মাখিয়ে নিত । যাতে সবার বাইম মাছের মত পিচ্ছিল হয়ে যায়। সাহসী কোন চৌকিদার যদি সাপটে ধরতে চায় ডাকাতদের, তখন ঠিক মাছের মতই পিছলে পালিয়ে যেতে পারবে।
সবার মুখে মাখা হয় ভুসো কালি। চেহারা যাতে চেনা না যায়। মাথায় লাল গামছা বা কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা হয়। দুই এক ডাকাত নাকি কানে মাকড়ি পড়তো বা জবা ফুল রাখত। সত্য মিথ্যা বলতে পারব না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অমনটা লিখেছেন। উনি মিথ্যা কথা বলার মানুষ না।
এবার বাড়ির কাছা কাছি এসে, হা- রে- রে- রে- রে বলে বিকট ডাক ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়তো। বাড়ির লোকজনদের মেরে হাত পা বেঁধে, ভয় দেখিয়ে লুটে পুটে নিত নগদ টাকা কড়ি। গয়না। সুবিধে হলে ধান বা চালের বস্তা । নিদেন পক্ষে বাড়ির থালা বাসন হাঁড়ি পাতিল সব। দরকার মনে করলে খুন খারাবিও করতো ডাকাতদল ।
কাজ শেষে দৌড়ে গিয়ে নিজেদের নৌকায় উঠত।
দ্বিগুণ বেগে বৈঠা মেরে ধরত বাড়ির পথ । লুটের মাল সামান ভাগ হয়ে যেত সঙ্গে সঙ্গে। কিছু দিন লুকিয়ে রাখত জিনিসগুলো। বিক্রি করতে গেলেই ধরা পরে যাবে যে। পরিস্থিতিটা একটু শান্ত হলেই আস্তে ধীরে বিক্রি হত সেই জিনিস।
ডাকাত দল এর পর মাস তিনেক বা চারেক বসে চুপচাপ দিন গুজরান করতো। অলস সময় কাটাত। আর খোঁজ রাখত। কে টাকা পয়সা বানাচ্ছে। কার কাছে নগদ টাকা আছে। আবার সময় সুযোগ পেলে ঝাঁপিয়ে পড়তো কোন গেরস্থের বাড়িতে।
শুধু যে বর্ষাকালে ডাকাতি করতো এমন না কিন্তু।
শীত - গরম সব ঋতুতেই ওরা ওদের কাজ চালিয়ে যেত।
তবে বর্ষাকালটা ছিল বেশ ভয়ের সময়। গ্রামগুলো বিছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সবাই থাকতো বেশ আতঙ্কের মধ্যে ।
যাদের ঘরে টাকা পয়সা আছে তাদের তো ঘুম হারাম হয়ে যেত।
ভাল চৌকিদার পাওয়া ও বেশ মুশকিল হয়ে যেত বর্ষার দিনগুলোতে। বৃষ্টির রাতগুলোতে দেখা যেত, চৌকিদার নিজের বাড়িতে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। এমন ও হয়েছে চৌকিদার নিজেও ডাকাতদলের সদস্য হয়ে গেছে। গোপনে গিয়ে খবর দিয়েছে সর্দারের কাছে , কোন বাড়িতে লুট করলে মেলা টাকা কড়ি পাওয়া যাবে।
আমি এখন যে ঘটনা তোমাদের বলব সেটা মুন্সিগঞ্জের কমলাঘাট এলাকার। ১৯৪৫ সালের কথা।
বর্ষাকাল চলছে ।
রাত মাত্র নয়টা। কিন্তু মনে হচ্ছে গহন নিঝুম রাত।সেই সময় এটা অবশ্য গভীর রাতই ।
সূর্য ডুবে যাবার সাথে সাথে রাতের খাওয়ার আয়োজন সেরে নেয় গ্রামের মানুষ। কেরোসিন তেল বাঁচাতে চায়। খামাখা তেল পুড়িয়ে লাভ কি ? আজকাল আবার বাজারে তেমন কেরোসিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
সন্ধ্যার পর পরই রাতের খাওয়া দাওয়ার পাট শেষ করেছেন নীলকান্ত বাবু ।
মোটা লাল চালের ভাত, মাগুর মাছের ঝোল আর সোনামুগ ডাল। খাওয়া শেষে এক লিটার দুধ আর পরোটার মত বিশাল একটা আমসত্ব খেয়ে ভাবলেন জীবনটা আসলেও খারাপ না। আবার মনে পড়লো আজ বিকেলেই হাট থেকে পাট বিক্রির টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কাল সকালে সদরে গিয়ে মহাজনের দপ্তরে জমা দিলে তবে শান্তি। টাকা ওখানেই নিরাপদে থাকবে। উল্টা কিছু সুদ পাওয়া যাবে।
বাড়িতে টাকা রাখা একদম নিরাপদ না। চারিদিকে ডাকাতি হচ্ছে বেশ। বর্ষা নামতেই ডাকাতদল বেশ জোরে সোরে নেমে পড়েছে। পাশের কয়েকটা গ্রামে অনেকগুলো ডাকাতি হয়ে গেছে ।
নীলকান্ত বাবু নিজের ঘর থেকে বের হয়ে এলেন।
উনারা যৌথ পরিবার। পাঁচ ভাই এক সাথেই থাকেন। পাশাপাশি পাঁচ ভাইয়ের ঘর। অবস্থা ভাল থাকায় টিনের চৌচালা ঘর তুলেছেন। বাড়ির মাঝে বেল আর নিম গাছ। কয়েকটা বরই আর করমচা গাছ মিলিয়ে সুন্দর ছায়া ছায়া নির্জনবাস বসতি। বাড়ির নিচেই নদীর ঘাট। ওখানেই বৈঠক খানা। বাইরের লোকজন এলে ওখানেই বসে। পান তামাক খাওয়া হয়। খোশ গল্প ও চলে।
উঠানে দাঁড়িয়ে চারিদিকটা দেখলেন নীলকান্ত বাবু।
নিঝুম।
আকাশ মেঘলা থাকায় চারিদিকে কেমন কালিগোলা অন্ধকার। নদী থেকে ভেজা বাতাস দৌড়ে আসছে সোজা বাড়ির দিকে। গাছের পাতার শন শন শব্দ কেমন যেন ছমছমে করে তুলছে পরিবেশটা । পুরো বাড়িটা একবার চক্কর দিয়ে এলেন নীলকান্ত বাবু। অজানা কেমন একটা যেন অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। বাড়ির সবাই ঘুমে। বাকি চার ভাই তাদের গিন্নি আর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঘুমাচ্ছে। ঘরে তার গিন্নি আর শিশু পুত্র ও ঘুমে।
আজকের রাতটা যেন কেমন অন্য রকম- মনে মনে ভাবলেন তিনি।
ঠিক করলেন আজ রাতে ঘুমাবেন না। বৈঠকখানায় বসে কাটিয়ে দেবেন। সকালে জলখাবার খেয়ে ছোট ভাইকে নিয়ে সদরে গিয়ে টাকা জমা দিলেই নিশ্চিত।
বৈঠকখানা বাড়ির শেষ মাথায়। ওখান থেকে চারিদিকটা বেশ দেখা যায়। বৈঠকখানা থেকেই মাটি কাটা পথটা নীচে নেমে গেছে। গিয়ে মিশেছে গ্রামের মেঠো পথের সাথে। এখন বর্ষা, নদীর জল বেড়ে উঠে একদম বৈঠকখানার কাঠের বারান্দা পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। ছপ ছপ করে শব্দ করছে ধলেশ্বরীর ঘোলা জল ।
হারিকেনের সলতে বাড়িয়ে দিলেন।
কেরোসিন ভরা হয়েছে বিকেল বেলা । বাদুরের চিহ্ন আঁকা কাঁচের চিমনি মেজে ঝকমকে করা হয়েছে। বেশ উজ্জ্বল আলো দিতে লাগল হারিকেনটা। বৈঠকখানার বাইরে কায়দা করে ওটা রাখলেন। আলো সামনের দিকে এমন ভাবেই পড়লো যাতে বেশ দূর পযন্ত নজরে আসে। যদিও নদীর ঘোলা জল আর ভেসে যাওয়া কচুরি পানার স্তূপ ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নদীর জল দেখাচ্ছে কালো । যেন কয়লা দিয়ে আঁকা।
বৈঠকখানার এক কোনে ঠেস দিয়ে রাখা আছে কয়েকটা হুঁকো। একটা নিয়ে খানিক তামাক সেবনের আয়োজন করলেন। খোলা বাতাসে শীতের আমেজ লাগছে তার। চুপচাপ তামাক টানতে লাগলেন।
অনেক সময় কেটে গেল।
ঝি ঝি পোকা আর ব্যাঙের ডাক মিলে অদ্ভুত একটা হচ্ছে দূরের ডুবে থাকা বেতের জঙ্গল থেকে। মাঝে মাঝে হঠাৎ করেই থেমে যাচ্ছে ওদের কোলাহল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার শুরু করছে। যেন সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এর পরে কোন গানটা গাইবে। দূরের হিজল আর যজ্ঞডুমুর গাছের ডাল থেকে সোনালী- কালো কলাবাদুরের ডানা ঝাপটানোর শব্দ এলো। ফল চুরি করতে যাচ্ছে ।
সময় কাটতে লাগল। এক ঘেয়ে সময়। শামুকের মত সময়ের গতি।
কি একটা জিনিস দেখে যেন সতর্ক হয়ে গেলেন নীলকান্ত বাবু।
কি সেটা ?
চিন্তা করতে লাগলেন। কিছু যেন একটা চোখে পড়ছে তার। কিন্তু ...।
ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন।
নদীর জলে ভেসে ভেসে কয়েকটা কচুরি পানার দঙ্গল ঠিক তাদের বাড়ির দিকেই আসছে ! আর সব কচুরির দঙ্গল স্রোতের সাথে ভেসে চলে যাচ্ছে স্রোতের দিকেই। কিন্তু এই সাতটা স্তূপ ধীরে ধীরে চলে আসছে এই দিকেই। অমন হয় নাকি ?
আরও একটু খেয়াল করতেই বুঝে গেলেন আসল ব্যাপারটা।
মোট সাতজন ডাকাত মাথার উপর কচুরি পানার স্তূপ রেখে ধীরে ধীরে সাঁতরে এই বাড়ির দিকেই আসছে। ওদের পুরো শরীরটা জলের নীচে । চোখ আর নাক উপরে। সেটাও ঢেকে রেখেছি কচুরির স্তূপ দিয়ে। যাতে মনে হয় শুধু কচুরি পানাই ভাসছে। কে বুঝবে ?
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন নীলকান্ত বাবু। চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তোলার কোন মানে হয় না। বহু দূরে দূরে প্রতিবেশীদের ঘর। চেঁচালে এত দূর শব্দ যাবে না। গেলেও কেউ আসবে কিনা সন্দেহ। বাড়ির লোকজন ভয়ে তরাসে বিরাট হই চই শুরু করবে। অমন চেঁচামেচি শুনলে ডাকাতদের উৎসাহ যাবে বেড়ে।
বৈঠকখানার দেয়াল ঘেঁষে রাখা ছিল বড় একটা মাছ মারার কোঁচ। শক্ত হাতে তুলে নিলেন সেটা। আঠারো ফলার কোঁচ। নিয়মিত যত্ন নেন তিনি জিনিসটার। সপ্তাহে একদিন তেল মাখিয়ে রাখেন, মরচে যাতে না ধরে। পাথর আর বালি ঘষে ঘষে ফলা করে রাখেন জরির মত চকচকে। মাছ শিকারি হিসাবে বেশ সুনাম আছে নীলকান্ত বাবুর। কোঁচ গেঁথে বড় বড় মাছ ধরায় জুরি নেই তার।
বুঝতে পারলেন কচুরিপানাগুলো ভেসে বৈঠক খানার পিছন দিক দিয়ে উঠার চেষ্টা করছে। ডাকাত দল বুঝতে পেড়েছে আলো জ্বলছে মানে কেউ হয়তো জেগে আছে। আবার অনেক ধনী লোকের বাড়ির কাচারি ঘরে বা বৈঠকখানার সারারাত অমন একটা আলো জ্বলে। হারিকেন বা হ্যাজাক।
কোঁচ নিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইলেন নীলকান্ত বাবু। নিজের প্রাণ দিয়ে হলেও আজ ডাকাতদের প্রতিরোধ করবেন।
তবে ডাকাতদল বুঝতে পারেনি কিছুই। আগের মতই একই ছন্দে স্রোতের তালে তালে ভেসে আসছে কচুরিপানার দঙ্গল। নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছেন নীলকান্ত বাবু। আরও কাছে এসে গেছে। একটু পরেই মাটিতে পা ঠেকবে ডাকাতদলের । তখন দৌড়ে উঠে হুড় মুড় করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়বে সবাই। ঠেকানো যাবে না। লুটে নেবে সব। খুন জখম ও করবে।
গায়ের জোরে কোঁচ ছুড়ে মারলেন নীলকান্ত বাবু।
সবার সামনে যে কচুরিপানার দঙ্গলটা ছিল সেটা লক্ষ্য করে। ঘ্যাচ করে সেটা বিঁধল । অচেনা জলদানবের মত ভয়াল গলায় চেঁচিয়ে উঠলো ডুবে থাকা ডাকাতটা। মুহূর্তেই সেই জায়গার জল রক্তজবা ফুলের মত লাল হয়ে গেল। রাতের আঁধারে মনে হল এক দোয়াত কালি ঢেলে দিয়েছে কেউ।
কোঁচের হাতলের সাথে শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। সেই দড়ি ছিল নীলকান্ত বাবুর হাতের কবজির সাথে প্যাচ দেয়া। পালাউ দ্বীপের হাঙর শিকারিরা যেমন করে। টান দিতেই কোঁচ ফিরে এলো তার হাতেই। ইচ্ছে - দ্বিতীয় আঘাত করবেন পরের ডাকাতটাকে।
কি অদ্ভুত।
একটা ডাকাতও সামনে এলো না। আগের মতই ডুবে ফিরে চলল উল্টা দিকে। যেই দিক দিয়ে ওরা এসেছিল।
চুপচাপ। নিঃশব্দে।
ডাকাতের চিৎকার ছিল বেশ ভয়ঙ্কর। বাড়ির ভেতর থেকে নীলকান্ত বাবুর অন্য চার ভাই জেগে দৌড়ে চলে এলো। হাতে লাঠি । সব শুনে টুনে কমবেশি বিরক্ত হলো সবাই। ছোট ভাই বিরক্ত হয়ে বলল- আপনি বোকার মত এমন করতে গেলেন কেন ? এখন ডাকাত দল যদি কাল বা পরশু দল বল নিয়ে প্রতিশোধ নিতে ফেরত আসে ? তখন ?
কিন্তু ডাকাতেরা বাড়িতে ঢুকলে টাকা পয়সা গহনা সবই লুটে নিত। বললেন নীলকান্ত বাবু।
তবু ভাল। টাকার উপর দিয়ে সব যেত। এখন তো জানের উপর ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হবে। বিরক্ত হয়ে বলল মেঝ ভাই।
হু। ওরা কাল বা পরশু ঠিকই ফিরে আসবে। গম্ভীর মুখে বলল সেঝ ভাই।
সবাই তিরস্কার করতে লাগল নীলকান্ত বাবুকে।
রাতটা জেগে কাটালো সবাই। ঘুমের প্রশ্নই উঠে না। ভয় হচ্ছিল। ওরা না আবার চলে আসে। বাড়ির বউয়েরাও বাচ্চা কাচা কোলে জেগে বসে আছে।
ভোর হল। ডালিম ফুলের মত নরম রোদ উঠল পূর্ব দিকে। মোরগ ডেকে উঠলো । পাখীর কিচির মিচির। সকাল বেলায় সদরে চলে গেল দুই ভাই। টাকা জমা দিয়ে এলো মহাজনের দপ্তরে।
বিকেল বেলা বাকি চার ভাই জানালো , তারা কেউ আজ রাতে বাড়িতে থাকবে না। নিশ্চিত, ডাকাত দল ফিরে আসবে।
নীলকান্ত বাবু দুঃখী গলায় বললেন- বাড়িঘর রেখে চলে যাওয়া কি ঠিক হবে ? তাছাড়া থাকবেই বা কোথায় ? পাঁচ ভাই মিলে থাকলে ভাল হত না ? সবাই মিলে বাড়ি পাহারা দিতে পারতাম ।
কেউ রাজি হল না। সাফ জানিয়ে দিল বড় ভাইয়ের বোকামির মাশুল তারা দিতে পারবে না।
নৌকা করে সবাই চলে গেল।
প্রতিবেশী দুই চারজন মুখে মুখে ঘটনার প্রশংসা করলেও কেউ রাত জেগে নীলকান্ত বাবুর সাথে পাহারা দিতে রাজি হল না। সবাই নিশ্চিত আজ বা কাল ডাকাত দল ফিরে আসবেই। শোধ নিতে। ওদের প্রতিশোধ হবে ভয়ংকর । বিকেল হতে হতেই চলে গেল সবাই ।
সন্ধ্যার পর পর নীলকান্ত বাবুর বাড়ি একদম ভূতুরে হয়ে গেল।
সামান্য কিছু ভাত তরকারী খেয়ে মনে মনে তৈরি হয়ে নিলেন তিনি ।
আগের রাতের মতই একটা হারিকেল জ্বেলে রেখে দিলেন বাড়ির উঠানের ঠিক মাঝখানে। কোঁচ হাতে ঘাপটি মেরে বসে রইলেন বাড়ির এক কোনের কদম গাছের উপরে। এখান থেকে চারিদিকটা ভালই দেখা যায় ।
সারারাত বসে রইলেন। গাছের দুটো শাখা ইংরেজি Y হরফের মত ছিল। ওখানেই কায়দা করে বসে রইলেন।
খানিক পর পর সতর্ক ভাবে চারিদিকটা দেখে নিতেন। ডাকাত দল ফিরে আসবেই।
সারারাত পাহারা শেষ করে সকালে নেমে এলেন কদমগাছের উপর থেকে। ক্লান্ত। রান্নাঘরে বসে চিড়ে আর গুড় দিয়ে জলখাবার শেষ করলেন। খানিক পর বাকি চার ভাই তাদের বউ বাচ্চা, প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে ফিরে এলো। ওখানেই রাত কাটিয়েছিল ।
তবে আবারও সন্ধ্যায় চলে গেল সবাই ।
সেইদিন থেকে বদলে গেল নীলকান্ত বাবুর জীবন।
সারাদিন পড়ে ঘুমান তিনি। আর কোঁচ হাতে সারারাত জেগে বাড়ি পাহারা দেন।
একা।
এই ভাবে ছয় মাস যাবার পর বাকি চার ভাইয়ের ভয় খানিক কাটল। ওরা ফিরে এলো বাড়িতে। নীলকান্ত বাবু পরের বর্ষাকাল পযন্ত এই রাত জাগার ডিউটি দিয়ে গেলেন।
ডাকাতরা ফিরে এলো না।
মজার ব্যাপার হল আশে পাশের গ্রামগুলোতে আর কখনই ডাকাতি হয়নি। কখনই না।
ব্যাপারটা নিয়ে সবাই বেশ আলোচনা করতো। শেষে সবাই এক মত হল- আশেপাশের সব গ্রামে এই সাত ডাকাত বাবুই লুটতরাজ চালাত। নীলকান্ত বাবু সম্ভবত ডাকাত দলের সর্দারকে মেরে ফেলেছিল। দলের বাকি সদস্যরা আর সাহস পায়নি ফিরে আসতে। যদি সর্দার না মরে অন্য কোনটা মারা যেত ? তবে নিশ্চিত করে বলা যায় ওরা হয়তো ফিরে আসতো।
অথবা আসতো না। ভয়ে।
যাক, কমলাঘাটে আর কখন ডাকাতের উপদ্রব হয়নি। এতেই আমি খুশি। ওটা আমার মায়ের গ্রাম। আর নীলকান্ত বাবু আমার মায়ের ঠাকুর দাদা। পিচ্চি বেলায় অনেক বৃষ্টির দমকা হাওয়া ভেজা সন্ধ্যায় মুড়ির সাথে বেগুনী, আলুর চপ, পেঁয়াজের ফুলুরি , তেলে ভাঁজা মাখা খেতে খেতে মায়ের মুখে এই গল্প শুনে রোমাঞ্চিত হয়েছি।
আজ তোমাদের বলার লোভ সামলাতে পারলাম না।
বললাম।
( শেষ)


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন