সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মায়াবিনী

 দেশে ফিরলে অসুস্থ হয়ে যাই ।

গরম , শব্দ , ময়লা বাতাস শরীরে মনে অচেনা ধরণের ব্যাধির জন্ম দেয় ।
কষ্ট আর যন্ত্রণা পাই ।
অনেকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে- ' দুইদিনের বৈরাগী ভাতেরে কয় অন্ন । এই দেশে মনে হয় হালায় পয়দা হয় নাই। '
ঈর্ষা কাতর মানুষের ঐসব সংলাপ মনে ধরি না । যে বলছে, সে গোপনে কত বছর ধরে চেষ্টা করছে দেশের বাইরে যাবার জন্য, সেটা তো আমি জানি ।
শরীর ভাল লাগলে হাঁটতে বের হই ।
আমার শহর বদলে গেছে । অনেক। ক্লাসিক উপন্যাস থেকে হয়ে গেছে ফুটপাথের সস্তা প্রেমের গল্প ।
কিছুই দাগ কাটে না মনে ।
তারপরও হাঁটি । দুই যুগ আগে দেশ ছেড়েছি । জন্মেছিলাম এখানেই । কত স্মৃতি।
দেখি , এক মার্কেটের বাইরে , সন্ধ্যার পর বোরখা পড়া এক তরুণী এসে বসে ফুটপাথের উপর । সাথে নিয়ে আসে কাঠের বাক্স । উপরটা কাচের । ভেতরে সাজানো সুন্দর সব কানের দুল , নাকফুল ।
পুরানো দিনের লেইসফিতার মত ।
এই জায়গায় বসা বেশ ঝামেলার । খানিক পর পুলিশ আসে । মাল হিসাবে পঞ্চাশ থেকে একশো টাকা করে নেয় । পুলিশদের এই লোকটাকে বলে লাইনম্যান । এটাই ওর কাজ । টাকা তুলে থানার ওসির হাতে তুলে দেয় । ভাগাভাগি থানার ভেতরেই হয় । থানার অফিসারদের গলা কেটে ফেললেও স্বীকার করবে না ব্যাপারটা । কিন্তু হয়। দেশের সব থানায় এটা হয়।
আর আসে চলতি রাজনৈতিক দলের ছেলে ছোকরা । ওরাও পয়সা তুলে মাল আর পজিশন হিসাবে । বাজে লোকেরা বলে, এর ভাগ সংসদ সদস্য সাহেব পর্যন্ত পান ।
মেয়েটা সন্ধ্যার পর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত বসে ।
দ্রুত বেচা বিক্রি করে । খদ্দেরের সাথে দামাদামি করে । বুক পকেটের সাইজের বাদামী কাগজের ব্যাগে করে মাল তুলে দেয় খদ্দেরের হাতে ।
টাকা নেয় হরিণীর মত দ্রুত। ফেরত দেয় খুচরা।
দাঁড়িয়ে ওর পণ্য দেখলাম ।
বেশ সুন্দর সব জিনিস । একই জিনিস মার্কেটে ছয়গুণ বেশি দামে বেঁচে ।
মেয়েটার হাতের আঙুল দেখে অবাক হলাম । কাঁঠালের কোয়ার মত ফর্শা । সুন্দর । লম্বা । পিয়ানো বাজানোর আঙুল । যত্ন করে কাটা নখ ।
সারা মুখ ঢাকা । শুধু চোখ দেখলাম । অমন সুন্দর চোখ অনেক- অনেক- অনেক বছর পর দেখলাম ।
কেন যেন মনে হচ্ছিল, ওই মেয়ে রাস্তার মেয়ে না। ঐসব ধুলা আর কোলাহলে মানাচ্ছিল না ওকে। বাঁদি হবার জন্য জন্ম নেয়নি ও। রানী হবার জন্য জন্মেছে । ভাগ্য ওকে রাস্তায় নামিয়েছে।
হয়তো পরিবারের আর কেউ নেই উপার্জনের । বড় কোন ভাই নেই । হয়তো বাড়িতে মা অসুখে ভুগছে । লেখাপড়ার খরচ , বাসা ভাড়া । খাবার।
প্রতিটা মানুষ এক একটা গল্প ।
আমার পরিচিতা এক মেয়ে আছে । নাম বলার দরকার দেখি না।
ওর বাবা মারা গেছে । মা ছাড়া আর কেউ নেই । একদিন মা- মেয়ে দুইজনে বাড়ি থেকেই ব্যবসা ধরে । নারকেল তেল আর ঘানি ভাঙ্গা শর্ষের তেল দিয়ে শুরু করে । ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কাচের বয়াম আর প্ল্যাসটিকের ক্ষুদে বোতল কিনে তেল ভর্তি করে । চারকোণা ছোট্ট কাগজে, লাল সবুজ মার্কার পেন দিয়ে লেখে - ঘানি ভাঙ্গা শর্ষে তেল । সাথে লেখে - ঘরে বানানো নারকেল তেল ব্যবহারে কি কি উপকার তার বিশাল এক ফর্দ ।
আঠা দিয়ে সাঁটিয়ে দেয় বোতল আর বয়ামের গায়ে । নিজেরদের একটা লোগ ও বানিয়েছে ।
কী মিষ্টি !
কিছু লেবেল ছাপিয়ে আনবে সেই অবস্থা এখনও হয়ে উঠেনি । তবে ইচ্ছা আছে। অনেক খদ্দের প্রচুর সময় নিয়ে দামদামি করে শেষে আর মাল নেয় না।
ওদের খারাপ লাগে ।
আবার নতুন করে আলাপ চালায় নতুন খদ্দেরের সাথে ।
লেবেল দেখে আমি মুগ্ধ ।
কী সুন্দর হাতের লেখা ।
সুন্দর প্যাচিয়ে প্যাচিয়ে লিখে কেমন আকুতি জানিয়েছে । কেনার অনুরোধ করেনি কিন্তু কেমন একটা আবেদন আছে । কবিতা ফেল । রুবাইয়াৎ কিছু না এর কাছে ।
একটা বয়াম বিক্রি হলে নিশ্চয়ই অনেক খুশি হয় ওরা ? তাই না ?
কিন্তু আমরা তো নামী ব্র্যান্ডের জিনিস কিনে রাঘবদের খুশি করি ।দামী দোকানের দামী মোড়ক আমাদের বায়বীয় অভিজাত বানায় । ঠুনকো গরিমা বাড়ে ।
আর সেই গয়নার মেয়েটা ?
অনেক বার চোখাচোখি হয়েছিল । অমন চোখ যার আছে তাকে কোন কথা বলতে হয় না।
দাঁড়িয়ে কিছু কেনার ইচ্ছা হয়েছিল ।
লজ্জায় কেনা হয়নি ।
আরমিন থাকলে ওকে নিয়ে দাঁড়াতাম । নীল পুঁতির সেই কানের দুল আর একটা নাকের নথ কিনতাম । কোন দামাদামি না করেই । যে দামই চাইত- দিয়ে দিতাম অক্লেশে।
নথ পরলে আরমিনকে মা দুর্গার মত দেখাবে ।
আমি জানি ।
মা দুর্গাও জানে ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...