আজকাল ভৌতিক শব্দটার ব্যবহার কম হয় ।
হরর বলে । সবাই।
রোমাঞ্চ শব্দটাও বলে না কেউ বলে না । থ্রিলার বলে ।
এবং এই সবের মধ্যেও কয়েক ডজন শাখা প্রশাখা হয়ে গেছে । দিন দিন শাখা আর ডাল পালার সংখ্যা বাড়ছেই ।
সমস্যা নেই । যত পদ তত ভাল নিমন্ত্রণ ।
দুনিয়ার আর কোন জীবজন্তু পড়তে পারে না। আমরা পারি। সন্দেহ নেই, অদ্ভুত এক নিমন্ত্রণে এসেছি আমরা । উপভোগ করা উচিত এই বইয়ের উৎসব।
এখন কথা হল , গা ছমছমে, দারুণ রকম ভৌতিক কাহিনি বা ফাটাফাটি ধরনের
রোমহর্ষক রোমাঞ্চ গল্প কিভাবে লেখা যায় ?
কোন ফর্মুলা বা সূত্র আছে ? প্রাচীন মিসরীয়দের জ্যামিতির মত ? যে ভাবে গুপ্ত লতাগুল্ম ব্যবহার করে তিব্বতে চা বানায় তেমন কিছু ?
আপাতত মনে হতে পারে , কাহিনিতে ঠেসে ঠেসে পিশাচ , মড়া লাশ , কিম্ভূত সব দানব দিলেই সেটা ফাটাফাটি একটা হরর কাহিনি হয়ে যাবে ।
আমার বিশ্বাস হয় না ।
এইচ,পি লাভক্রাফটের মতে - ' সবচেয়ে প্রাচীন আর পোক্ত ভয় হচ্ছে অজানা অচেনা ভয় ।'
যে লেখক সুন্দর লোভনীয় ভাষায় শব্দের ইন্দ্রজাল দিয়ে বর্ণনা করতে পারে, সে ধরে রাখতে পারে পাঠকদের ।
মোহ আর মায়া দিয়ে ।
পাঠক ধরে রাখার কায়দাটাই হচ্ছে সাসপেন্স ।
সাসপেন্সের বাংলা হতে পারে উদ্বেগজনক অবস্থা । অনিশ্চয়তা। উৎকণ্ঠা , দোলায়মান , নিলম্বন , ঘর্মাক্ত ভাব। ইত্যাদি । ইত্যাদি । হেন তেন ।
আমরা সাসপেন্স- ই বলি ?
সহজ হয় । কেমন ?
পাঠকদের এই অবস্থাটায় ভাল করে নিতে পারতেন জেমস হেডলি চেইজ । প্রাচীন রোমাঞ্চের জাদুকর । ভূত দানো ছাড়াই উনি সাসপেন্সের রাজা ।
অদ্ভুত সব চরিত্র উনার উপন্যাসে । মাতাল, ব্যর্থ ব্যবসায়ী , লোভী সুন্দরী , হতাশ কিন্তু উচ্চাকাঙ্খী সুদর্শন যুবক , নির্দয় ব্ল্যাকমেইলার সব আছে উনার কাছে ।
খুন , আবার খুন । গাড়ির পিছনের ডালায় বা বাথরুমে লাশ ।
বাইরে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে । যে আপনাকে রক্ষা করবে ভাবছেন , গিয়ে দেখেন সে সোফায় বসে আছে। কিন্তু কপালে গুলির ছিদ্র । মেরুন রঙা রক্ত শুকিয়ে আপেলের জেলি হয়ে নীলচে ডুমো মাছি ভনভন করছে । একা একা তেলিভিস্ন চলছে। সামনে পেয়ালা ভর্তি চা। এখনও গরম। খুনি মাত্র চলে গেছে। বা আশে পাশেই আছে ।
উফ ।
সাসপেন্স এটাই।
উনার কাহিনিতে নায়ক আর ভিলেন একাকার হয়ে যায়। কাহিনির শেষ পরিণতি খুবই দুঃখজনক । সবাই ট্র্যাজিক হিরো । লোকসানের ভাগিদার ।
সকলই গরল ভেল ।
সাসপেন্স কী জিনিস , সেটা টের পেয়েছিলাম, আল্যান সোলফিলডের ' ভেনম' পড়তে গিয়ে ।
লন্ডনের ইটন স্কয়ারে একটা ধনীর বাড়ি । দশ বছরের পিচ্চি এক বাচ্চা ফিলিপ । ওর বাপ মা বাইরে গেছে । বাড়ির ড্রাইভার আর বুয়া মিলে, ফরাসি এক সন্ত্রাসীর সাহায়্যে বাচ্চাটাকে জিম্মি করে ফেলে ।
উদ্দেশ্য ?
বিচ্ছিরি ধরনের মুক্তিপণ আদায় ।
এই দিকে পোষা জীবজন্তুর দোকান থেকে বাস্তসাপ অর্ডার করেছিল পিচ্চি ফিলিপ । কিন্তু কাণ্ড দেখ , বাস্তসাপের বদলে ভুলে চলে এসেছে ভয়ানক বিষধর এক মাম্বা ।
বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওটা । বাইরে পুলিশ । বাড়ির ভেতরে কিডন্যাপার।
এই একটা উপন্যাস , ডিসেম্বরের শীতের ঘন রাতে, পড়তে পড়তে ঘেমে গিয়েছিলাম ।
কী হবে ? হায় হায় !
গোয়েন্দার চিফ সুপারিনটেনডেন্ট উইলিয়াম বুলোচের পক্ষে কী সম্ভব হবে বাড়ির ভেতরে ঢোকার ? সাপটা কোথায় ? বেডরুমে ?
প্রত্যেকটা চরিত্র দরকারি । ফালতু একটা ও সংলাপ নেই ।
আর কাহিনি ?
সাপের মত ঠাণ্ডা । ভয়ানক । গতিশীল ।
অথবা উইলিয়াম আইরিশ সাহেবের ' আফটার ডিনার স্টোরি' , যেখানে বাড়ির কর্তা পাঁচজনকে রাতের খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ দিয়ে এনেছেন । চোস্ত এক চোট খাওয়া দাওয়া শেষে উনি জানালেন, এই পাঁচজনের মধ্যে একজন তার ছেলেকে খুন করেছে ।
প্রতিশোধ নেয়ার জন্য খুনির খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছেন । কেউ পালাতে চাইলেই বাইরের পিস্তল হাতে দাঁড়ানো লোকটা গুলি করে বসবে ।
এটা কোন কথা ?
উইলিয়াম আইরিশের আফটার ডিনার স্টোরি
মারাত্নক ধরনের প্রিয় গল্প আমার।
কত বার পড়েছি বলার মত না। রেডিও নাটকও শুনেছি তুষার ঝরা রাতগুলোতে।
শেষে নিজে করলাম ছায়া অবলম্বন - রাতের খাবারের খোশগল্প
সাসপেন্স আরেক ভাবে হয় - কাহিনির মূল নায়ক বা তার প্রিয়জন কী বেঁচে থাকবে ?
আর্থার হেইলি সাহেবের ' রানওয়ে জিরো এইট' বইটার কথা বলি ?
কানাডার টরেনটো থেকে ভ্যাঙ্কুভারে উড়ে যাচ্ছে একটা বিমান । ওদের খাবারের জন্য কী একটা সামুদ্রিক মাছ দেয়া হল ।
সেই মাছ খেয়ে অসুস্থ হয়ে গেল পাঁচজন যাত্রীসহ দুইজন পাইলট ।
কিভাবে নামবে নীচে ?
জর্জ স্পেনসার নামে এক যাত্রী গিয়ে বসলো পাইলটের সীটে । পেশায় ট্রাক্টর চালক !
কী হবে এখন ?
বইটা ছাপা হয়েছিল ১৯৫৮ সালে ।
আজকালের মত, সেই সময় বিমানের ভেতরের অবস্থা , ককপিটে পাইলট আর সব হাবিজাবি যন্ত্রপাতি নিয়ে কোন ধারনা ছিল না পাঠকদের । কন্ট্রোল রুমের সাথে রেডিওতে যোগাযোগ এবং বাদবাকি সব কিছু মিলিয়ে একটা দম বন্ধ করা কাহিনি ।
তুমুল বিক্রি হওয়া বই ।
এই ফর্মা ভেঙ্গে পরে কত নাটক আর বস্তাপচা কাহিনি হয়েছে । কিন্তু সেই সময় ' রানওয়ে জিরো এইট' তুলনাহীন একটা বই ।
আজকাল অনেক ফ্যাঁকাসে মনে হতেই পারে।
অন্য আরেক কায়দায় পাঠককে তাতিয়ে রাখা যায় - কাহিনির নায়ক কাকে খুঁজছে দীর্ঘ সময় ধরে ?
কী হয়েছিল নায়কের অতীত জীবনে ?
লুই লামুর সাহেবের বুনো পশ্চিমের বেশ কিছু গল্প অমন ভাবে ফাঁদা হয়েছে ।
নায়ক বারে ঢুকে এক পাইন্ট বিয়ারের অর্ডার দিয়ে বারটেন্ডারকে বলে বসে , ‘ আমি একজনকে খুঁজছি যার কপালে কাটা দাগ আছে । খুব দ্রুত বন্দুক চালায় । কেউ খোঁজ দিতে পারলে দুই ক্যারাটের হীরার টুকরা দেব তাকে । ‘
কামরার সবাই ফিরে তাকায় নায়কের দিকে ।
অথবা মরার আগে আদিবাসী সর্দার বলে গেল কোথায় আছে মরমরের হারানো সোনা ।
পাঠকের আগ্রহ ধরে থাকে শেষ পর্যন্ত ।
সাসপেন্সের মূল চাবি হচ্ছে , পাঠকের মনে প্রশ্ন থাকতে হবে ।
এক বা অনেক প্রশ্ন ।
উত্তর জানতে পৃষ্ঠা উল্টাতে হবে ।
প্রশ্নের একটা উত্তর মনে মনে পাঠক ভেবে নেবে । বোধ হয় অমুক খুনি । আরও ভাল হয় খানিক পড়ার পর যদি দেখে তার অনুমান ভুল ।
যেমনটা হয় আগাথা ক্রিস্টির খুন খারাবির বইগুলো ।
আরেকটা ভাল দিক হচ্ছে অল্প অল্প করে জট খোলা ।
সম্পূর্ণ একটা চিত্র দেখার চেয়ে অল্প অল্প করে কাহিনি পাঠকের বা দর্শকের সামনে ভেসে উঠলে ভাল হয় ।
যেমন -
'সাত সকালেই বাক্সটা নিয়ে হাজির হয়েছে রঘু । বার বার পিছন ফিরে দেখছে । নাহ , কেউ অনুসরণ করেনি । শীত, তাও বগল ভিজে গেছে ঘামে। আকৃতির তুলনায় বাক্সের ওজন বেশি । ভারি কিছু আছে ভেতরে । বারবার ঘড়ি দেখছে । সিকান্দার বিল্লাহ আসবে বাক্সটা ডেলিভারি নিতে । অথচ সিকান্দারকে জীবনেও দেখেনি ।'
কি ? মোটামুটি আগ্রহ চলে এসেছে না ?
উদাহরণ হিসাবে ‘ড্রাকুলা'- র কথা বলা যায় ।
অদ্ভুত এই উপন্যাসটা লেখা হয়েছে - চিঠি , ডায়েরি , জাহাজের লগবুক আর খবরের কাগজের রিপোর্ট দিয়ে ।
মানে কাহিনির চরিত্রগুলো নিজেরা যা জানছে , আমরা শুধু ততটুকু জানতে পারছি ।
কাজেই রয়ে যাচ্ছে রহস্য আর কৌতূহল । সাথে ভয় ।
কাহিনি জমজমাট করতে আগে পরিবেশটা সুন্দর করে পাঠকের চোখের সামনে তুলে ধরতে হবে ।
আগাথা ক্রিস্টির সেই কাহিনিটা মনে আছে ?
দশজন নর- নারী একটা দ্বীপে আমন্ত্রণ পেয়ে বেড়াতে যায় । গিয়ে দেখে বাড়ির মালিক নেই । ওই দিকে ফেরার উপায় নেই। সাগরে ঝড় । বন্দি হয়ে গেল সবাই বৈরি পরিবেশে । আর এর মধ্যে শুরু হল একটার পর একটা খুন ।
এই বইতে সব পাঠকও বন্দি ছিল দ্বীপে। দুর্গের মত সেই বাড়িতে ।
অপূর্ব গা ছমছমে বর্ণনা ।
এটার আইডিয়া নিয়ে বলিউডে বানানো হয়েছিল গুমনাম মুভিটা। বাজারি হিট হলেও বেশ কাঁচা কাজ।
পুরানো জামানায় অনেক লেখক বানাতেন - পেল্লাই সাইজের প্রাসাদ । গোপন কুঠুরি । গুপ্তদরজা । প্যাঁচানো সিঁড়ি ।
পাঠক আজও পছন্দ করে এইসব ।
আজও পাঠক পছন্দ করে পুরানো বাড়ি । খোলা জানালা দিয়ে হা হা করে বাতাস বয়ে যাচ্ছে বৈঠকখানায় । দরজার পাল্লা শব্দ করে নড়ছে । আছে কোথাও গোপন সরুপথ । স্যাত স্যাতে ভেজা সিঁড়ি।
গলির শেষ মাথায় আছে কিছু একটা । কেউ আছে ওখানে ।
ঝুপ করে কুয়াশা পড়ে গেল সন্ধ্যার পর। দূরের কিছু চোখে পড়ে না ।
নেমে এলো ঝড় । বিজলির চমক ঘনঘন ।
এবং এই সময় বাইরে কারা হাঁটাহাঁটি করছে । কারও থাকার কথা নয়, কিন্তু আছে ।
সেইজন্য আজও ভিক্টোরিয়ান লন্ডনের পটভূমিতে কাহিনি জমজমাট হয় ।
স্যার আরথার কোনান ডয়েলের ' দ্যা হাউনড অভ বাস্কারভিল' পড়েছিলাম শীতের এক কুয়াশা মাখা নীল সন্ধ্যায় । ইশকুলের ছাত্র আমি।
সেই কতকাল আগের লেখা । আজও মচমচে ।
বনেদী পরিবার। অভিশাপ । পেল্লাই সাইজের প্রেতকুকুর । জলাভূমি থেকে হিম হিম ঠাণ্ডা উঠছে । গভীর রাতে গগনবিদারী চিৎকার । কী ওটা ?
যারা লিখতে পারে সামান্য জিনিস ব্যবহার করেও পাঠকদের ভয় ধরিয়ে দিতে পারে।
মধ্যরাতে আচমকা ফোন বেজে উঠা । দরজার বাইরে কুকুরের ডাক । জলাভূমির পাশে নিঃসঙ্গ বাড়ির জানালার শার্শিতে হলুদ আলো ।
সামান্য বর্ণনা কিন্তু পাঠক হয়ে যায় রোমাঞ্চিত ।
সব লেখকের একটা স্টাইল থাকা দরকার । একান্ত নিজের । আমার পরিচিত নাম করা এক সম্পাদক বলেছিলেন - ' কী হচ্ছে জানার চেয়ে ঘটনাটা কিভাবে বলা হচ্ছে সেটা বেশি আকর্ষণ করে আমাকে ।'
উনার কথাটা পছন্দ হয়েছে আমার ।
মনে আছে ইস্কুল জীবনে কোন কেওয়াজ হলে, সবাই এক সাথে ঘটনা স্যারকে বলা শুরু করতেই, স্যার সবাইকে থামিয়ে একজনকে বেছে নিয়ে বলতেন - তুই সব খুইল্লা ক দেহী ।
মানে ছেলেটা সব জামাকাপড় খুলে বলবে অমনটা না কিন্তু।
এই 'তুই' ছেলেটা দারুণ বর্ণনা করে স্যারের কাছে সব বর্ণনা দিতে পারতো । ওর বর্ণনা ভঙ্গি একটা স্টাইল । স্যারের পছন্দ। সব শুনে স্যার বুঝতে পারতেন - কে চক দিয়ে বোর্ডে স্যারের কার্টুন এঁকেছে। ঘটনার মূল মাস্টারমাইন্ড কে এবং স্যারকে কী করতে হবে এখন ।
আপনি কি এডগার অ্যালান পো-র ' দ্যা টেল টেল হার্ট' গল্পটা পড়েছেন ?
এই গল্পে কাহিনির চেয়ে চরিত্রের মানসিক অবস্থার বর্ণনা বেশি রোমাঞ্চকর । এবং আচমকা দুম করে কাহিনি শেষ হয়ে যাওয়া ।
এক কথায় অসাধারণ ।
যারা আলফ্রেড হিচকক সাহেবের মুভি দেখেছেন তারা জানেন । এই ভদ্রলোক তুচ্ছ - নিঃসঙ্গ দৃশ্য ব্যবহার করে দর্শকদের বেশ রোমাঞ্চিত করে ফেলতে পারতেন ।
কালো বাঁটুল ধরনের ফোন ।
নিঃসঙ্গ একটা পাখি ।
প্যাঁচানো সিঁড়ি - উপরে উঠে গেছে ।
একটা মেয়ে পর্দা টানা শাওয়ার রুমে স্নান করেছে ।
এ সবই দর্শকের স্নায়ুতে পীড়া দিত ।
আরেকটা পয়েন্ট হচ্ছে - নাটকীয় ঝামেলা ।
ব্যাখ্যা করছি ।
সারাক্ষণ পাঠক অপেক্ষা করতে পারবে না। কিছু চমক লাগবেই। সেই চমকটা কী ? তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা কখন হবে ?
এই দিক দিয়ে ক্লাইভ কাসলার আর উইলবার স্মিথ আমার কাছে সেরা ।
মনে নেই - সেই আইসবারগের ভেতরে জাহাজ । যেটা ওখানে থাকার কথা না । কিন্তু আছে ।
বা একদল টুরিস্ট এসে নৌকা ভাড়া করে যাদের দেখে মোটেও টুরিস্ট বলে মনে হয় না । দেখেই সন্দেহ হয়, ছুটি কাটাতে আসেনি ওরা । ডুবে যাওয়া একটা জাহাজ নিয়ে এত কৌতূহল কেন ?
সাবাস ।
কী সব বর্ণনা ।
এইসব কাহিনিতে নায়কের দুর্দশা - পাঠকের আনন্দ ।
গ্রিক নাটক - অডিপাস রেক্স । নায়ক তার বাপকে খুন করে নিজের অজান্তেই মা -কে বিয়ে করে ।
সব তার অজান্তে হচ্ছে কিন্তু আমরা সব জানছি । জেনে হায় হায় করছি ।
শেষ কায়দা হচ্ছে , ক্লিফ হাঙ্গার ।
মানে কাহিনি আপনি এমন জায়গায় শেষ করবেন বা বিরতি দেবেন যে পাঠক পরের পর্ব বা অংশ পড়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়বে ।
এই কায়দা পুরানো জামানায় রেডিও নাটক বা আধুনিক টকশো -তে বেশি ব্যবহার হয় । এমন জায়গায় থামায় যে ... তখন শুরু হয় বিজ্ঞাপন বিরতি । অমুক মার্কা তেল ব্যবহার করুন। তমুক জিনিস না কিনলে জীবন বৃথা। বাচ্চাদেরর গুড়া দুধ। রান্নার তেল। শ্যাম্পু। এই দিকে টেনশনে আমরা শুঁটকি হয়ে যাচ্ছি।
আশির দশকের বাংলা সিনেমায় বিরতি ছিল ভয়ংকর জায়গায় । দর্শক জলদি হিসু করে ফেরত আসতো । পাছে কোন দৃশ্য মিস করে ফেলে ।
কিশোর বেলায় একটা স্পাই থ্রিলার সিরিজ পড়তাম । তখন এই সিরিজের বেশির ভাগ কাহিনি দুই পর্বে শেষ হত । প্রথম পর্ব এমন জায়গায় শেষ হত, দুপুরের ভাত খেয়ে পকেটে টাকা গুঁজে দৌড়ে বের হতাম । বইটার পরের পর্ব কেনার জন্য । দুপুরের গনগনে রোদ আর বর্ষার কালি গোলা বৃষ্টির মধ্যেও চলে যেতাম। পরের পর্ব আমার লাগবেই। নায়ক বিপদে !
ক্লিফ হ্যাঙ্গারের সেরা উদাহরণ - আরাবিয়ান নাইট । আলিফ লায়লা ।
শাহ্জাদি অমন জায়গায় কাহিনি শেষ করছে যে বাকি অংশ শোনার জন্য বাদশাহ শাহরিয়ার পরের রাতের জন্য অপেক্ষা করছেন ।
কী হবে কানা আর দর্জির । আলিবাবার গুহা খুলবে কী করে ?
রোমাঞ্চ উপন্যাস লিখতে গেলে এই ক্লিফ হ্যাঙ্গার কায়দা আসবেই। কিন্তু ঘন ঘন এই কায়দা ব্যবহার করলে পাঠক বিরক্ত হয়ে যেতে পারে।
মনে হতে পারে সস্তা কায়দা ।
নাম করা সুপার হিট একটা বাংলা রোমাঞ্চ উপন্যাস পড়তে গিয়ে আবিস্কার করলাম - কাহিনির সব চরিত্রের মোবাইল ফোনের ব্যাটারি শেষ হয়ে যায় কোন এক দুর্দান্ত মুহূর্তে । অথবা নেটওয়ার্ক থাকে না ।
বেচারা লেখক ।
কিন্তু ক্লিফ হাঙ্গারের সীমিত ব্যবহার বারবিকিউর উপর রসুন- মরিচের বাটা প্রলেপের মত কাজ করে।
পাঠক ক্লিফ হ্যাঙ্গার উপভোগ করে ।
কী হতে যাচ্ছে ?
পিস্তলটা কী পাওয়া যাবে ?
সোফায় লাশটা কার ?
গভীর রাতে টমটম চালিয়ে কে নামলো ?
পাঠক ঘেমে অপেক্ষা করে । এবং যুক্তিগত পরের অংশ আশা করে ।
তো এই হচ্ছে সাসপেন্স তৈরির কায়দা ।
আপনারা আমার ব্যাপারে প্রশ্ন করতে পারেন , আমি কী কায়দাগুলো জানি ?
আজ্ঞে না ।
বিধাতা আমাকে সেই শক্তি বা যোগ্যতা দেয়নি ।
তাই অগ্রজদের লেখা পড়ি । দারুণ একটা মউতাতে থাকি । স্বপ্ন দেখি একদিন আমিও উনাদের মত এই জাদুর কায়দা শিখব ।
অথবা কখনই পারব না। সবাই সব কিছু পারে না।
( শেষ )

আরেকটা অসাধারণ।
উত্তরমুছুন