সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মউসুমের জাদু

 দিল্লিতে ছিলাম বেশ আগে। 


দিল্লির কাছাকাছি উত্তর প্রদেশে মিরাট নামে একটা শহরে প্রায়ই হানা দিতাম, মানে বেড়াতে যেতাম। 

মৌসুমের জাদু দেখেছি তখন।


 ছোট একটা হোটেলে ছিলাম । প্রায় মাস খানেক ধরে বৃষ্টি হচ্ছিল না।


তবে বাতাসটা ছিল ভেজা ভেজা। আর বাতাসগুলো ঠেলে ঠেলে দূর থেকে কালো মেঘ নিয়ে আসছিল। 

দলা দলা কালো মেঘ। মৌসুমটা তখন বিরতি নিচ্ছিল। আমি জানি। পাখীরা জানে।সবুজ ঘাসেরা জানে। 

বাতাসে অল্প খানিক মেঘ ভাসছিল। আমি , ঘাস আর পাখীরা আমাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝছিলাম। 


তারপর একদিন ,প্রথম জানালার শার্সিতে আর কাঠের তক্তাতে দুই এক ফোঁটা বৃষ্টি ঝরলো। তারপর কালো এক পর্দার মত বৃষ্টি নেমে এলো ।

রূপার পাতের মত বৃষ্টির ফোঁটাগুলো  রাস্তার উপর কুচকাওয়াচ করছিল।  বৃষ্টির ফোঁটাগুলো  ঝুমঝুমি বাজানোর মত শব্দ করছিল টিনের চালে। সেখান থেকে বেলকনি গড়িয়ে পড়ছিল নীচে। 

বসে ছিলাম পাথরের মত নড়াচড়া না করে। ঘামে ভেজা জামা আর ধুলোয় মাখা চুল ভিজে গেল। 

বাইরের রাস্তা খালি হয়ে গেল মুহূর্তেই। বাস, মোটর গাড়ি আর মোষের টানা গাড়িগুলো ব্যস্ত ভাবে দৌড়াতে লাগলো।এক গাদা নেঙটা বাচ্চা রাস্তার মধ্যে ছুটোছুটি করতে লাগলো অকারন উল্লাসে।
 বৃষ্টিতে যেই বাচ্চারা দৌড়ায় সাধারণত ওদের প্রায় সবাই ন্যাংটা থাকে। 

মধ্য রাস্তায় ভাসতে লাগলো রাশি রাশি হলুদ গাঁদা ফুলের পাপড়ি। মন্দির থেকে ফেলে দিয়েছিল। ভিজে চলে এসেছে জলে ভেজা পথে।কালো পথে হলুদ ফুল । 

বৃষ্টি থামল । যেমন হঠাৎ এসেছিল। তেমনই। 

তবে দিনটা করে গেল ঠাণ্ডা আর ভেজা। বেশ কিছু পোকা গরমের দিনটায় আরামে ঘুমায়। বৃষ্টিতে ওদের বাসা বাড়ি ভেঙ্গে ভবঘুরে হয়ে যায়। বেলকনির পাশে আলো ছিল। সেই আলোতে সারারাত পাগলের মত পোকা ছুটে এসে জানালার কাঁচে মাথা ঠুকলো।

 বাথরুমের ভেতরে একটা ব্যাঙ আবিষ্কার করলাম। নিজের বাথরুম মনে করে বসে আছে সে। আমাকে দেখে অবশ্য ব্যাঙটা ভেগে গেল। তার কারন ও আছে। বেলকনির কাছে প্রচুর পোকা জমেছে। রাতের খাবারটা সেরে ফেলতে চায় সে। 

এইসব পোকা ঢুঁকে পড়লে টিকটিকিও বেশ খুশি হয়। দেয়াল সাপটে ধরে ওরা অপেক্ষা করে। পোকা পেলেই গোলাপি জিভ বের করে ছুটে যায়। তবে আমার মতে গরমের মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিটা রাতের বেলাই ভাল। গভীর ঘুমে বৃষ্টির শব্দ কেমন অদ্ভুত লাগে। ভেজা মাটির সোঁদা ঘ্রান নাকে আসে। জানালা দিয়ে ডাকাতের মত ঢুকে পড়ে খসে পড়া শুকনো নিম পাতা।



বাদলার মৌসুম ব্যাঙ প্রজাতির জন্য এক মহা সুযোগ। যখনই মন চায় এরা গানবাজনার আসর বসায় । একদল থামলে আরেক দল গাইতে শুরু করে। কে জানে কোন রকম প্রতিযোগিতা হয় কিনা ওদের মধ্যে। গরমের দিনগুলোতে ওরা কেমন যেন মন মরা আর পানসে জীবন যাপন করে।


এমন ঘন বর্ষার রাতে জানালা খুলে রাখতে ভাল লাগে। কিন্তু বাদলার রাতে অচেনা কিছু পতঙ্গ উড়ে আসে। একবার ঘুমের মধ্যে আমার মুখের ভেতরে চলে গিয়েছিল একটা । 

কাজেই জানালা বন্ধ। 

পতঙ্গ আমার প্রিয়। ঘুম তারচেয়েও প্রিয়। 

 এক ঝাঁক জোনাকি জ্বলছে  বাইরে আমের বাগানে। ঝিকিমিকি। 

মশারির বাইরে রক্ত পিপাসু এক দঙ্গল মশা।  ভেতরে ঢোকার জায়গা খুঁজছে। রাস্তার অই পারে অনেকগুলো বাবলা গাছের সারি। হলুদ ফুল ঠেসে ধরেছে গাছগুলোতে। ফুলগুলো গোল বলের মত । উপরে মিহি দানার মত নরম রেণু।হালকা মিষ্টি ফুলের সৌরভ ভেসে আসছে ।

 পথের মধ্যে লাইন দিয়ে আছে গাছের সারি। সব মৌসুমেই নানান রঙের ফুল ধরে। নীচে লাইন দিয়ে হেঁটে যায় মোষ আর ভেড়ার পাল। পথের শেষে একটা আধটা পুকুর থাকে। ওখানে নেমে মোষগুলো কাঁদার মধ্যে গড়াগড়ি খাবেই খাবে। বা ঘোলা জলে ডুবে থাকবে শুধু নাকটা ভাসিয়ে।


বৃষ্টি শেষ হলে কয়েক দিন পরই ফড়িং ভর্তি হয়ে যায় চারিদিক। এখানে ওখানে চারিদিকে শুধু ফড়িং আর ফড়িং । সবুজ- হলুদ -লাল কত বিচিত্র রঙের। ঝাঁক বেঁধে উড়ে ওরা। ওরা খুব ভাল। মশার ডিম আর ডাঁশ পোকা খেয়ে পরিবেশ রক্ষা করে।

 মৌসুম এলে চারিদিক অনেক সবুজ হয়ে যায়। বাতা্সের ময়লা ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়। বেগুনি রঙের পাহাড়গুলো অনেক কাছে এসে পড়ে। যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। আকাশ ভর্তি মেঘের দলা ভাসে।

 পাহাড়ের উপর মেঘের ছায়া পড়ে। বসন্ত আসার আগেই বাদলার মৌসুম ওর জাদু দেখিয়ে যায়।
রাস্কিন বন্ড – এর The Magic Of The Monsoon – এর, ছায়া অবলম্বনে।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...