ফুল ছাড়া নিজেকে কল্পনা করতে পারি না।
আমার পাশে ফুল নেই এমনটা হতেই পারে না ।
টেবিলে ফুল রাখি সব সময়। ডেইজি, গোলাপ বা চন্দ্রমল্লিকা এমন এক তাড়া ফুল টেবিলে থাকলে কাজের গতি বেড়ে যায়।
রঙ বেরঙের ফুল আমাকে মনে করিয়ে দেয়- জীবন আসলেও সুন্দর। সব সময়।হাঁটতে বের হলেই চারিদিকে তাকাই। বুনো ফুল খুঁজি। এমন কি পাহাড়ের গোঁড়ায় লুকিয়ে থাকা নিতান্ত দীন হীন অখ্যাত ফুল ওঁ আমি খুঁজি।
যদি দেখি সেই অখ্যাত ফুলগুলোকে আমি চিনতে পারছি না তখন নিজেই ওদের নাম রাখি। কারন সবারই একটা নাম থাকা দরকার।
সেটা ছিল বসন্তের প্রথম দিন।
মানে হিন্দুদের পঞ্জিকা হিসাবে।কিন্তু হিমালয়ের গোঁড়ায় গ্রামগুলোতে মনে হয় শীতের মাঝাঁমাঝি।
সাই সাই করে হিমেল বাতাস এসে কাপিয়ে দিচ্ছিল দাঁড়িয়ে থাকা পাইন গাছের জঙ্গলটাকে। খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বাসায় ফিরছিলাম।
পাহাড়ের উপর ঊষার সাথে দেখা হল। নয় বছরের মেয়ে ঊষা। ইসকুল থেকে ফিরছিল। দ্রুতবেগে। মাথায় শক্ত করে স্কাফ বেঁধে রেখেছে। যাতে ঝড়ো পাহাড়ী হাওয়ায় ওর চুলগুলো এলো মেলো না হয়ে যায়। ওর চুল আর চোখের মণি গভীর কালো। গাল দুটো গোলাপি।
'দেখ, একটা নতুন ফুল।' আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বলল সে।
মাখন হলুদ রঙের নিঃসঙ্গ একটা ফুল ফুটে আছে। শীতে ঘাসগুলো ম্যাটমেটে বাদামী রঙের হয়ে গেছে। সেই বিচ্ছিরি ঘাসের উপর তারার মত উজ্জল লাগছিল অচেনা হলুদ ফুলটাকে।
এমন ফুল আগে কখনই দেখিনি। কি নাম ওটার কে বলবে? কোন ধারনা নেই। বিজ্ঞানীরা নিশ্চয় কোন না কোন একটা নাম রেখেছে। কিন্তু আমার কাছে নতুন আবিস্কারের মত।
এইসব বিরান প্রান্তরে আর জঙ্গলে যে সব ফুল পাওয়া যায় সে গুলোর নাম বের করা মুশকিল হয়ে যায়। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ও ভুল করেন।
তারাও নানান হাস্যকর আচরণ করেন। ভাবেন একটা নিদিষ্ট ফুল শুধু তার মায়ের গোরস্তানেই ফুটে।
এই ধরনের ভুলের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি ফুল নিয়ে লেখা বইপত্র বা ফিচারগুলো ঘাঁটি।
হিমালয় পর্বতের ফুল টুল নিয়ে লেখা হয়েছে তেমন বই খুব কম আছে ।
হিমালয়ের ছয় থেকে সাত হাজার ফুটের মধ্যে যে সব ফুল গাছ পাওয়া যায় সেগুলো নিয়ে কিছু বই আছে অবশ্য ।
বাদলার দিনগুলোতে পাহাড়ের ঢালে এক ধরনের গাছ হয়। পাতাটা তীরের ফলার মত। ফিকে লাল রঙের একটা ফুল হয়। এলাকার লোক জন বলে- খাটটি মিথি।কারন গাছের পাতা একটু টক স্বাদের। গরু এই পাতা খেতে পছন্দ করে।
অনেকেই বলে এই গাছ খেলে গরুর ডাইরিয়া হয়। আর সেই গরুর দুধ দিয়ে ভাল মাখন বানানো যায় না।এই
গাছের পাতা দিয়ে ইউরোপে এক সময় সালাদ বানাত। ঐ যে টক টক স্বাদ আছে যে।
আরেকটা আগাছা দেখতাম। পাথরের খাঁজে জন্মে। পুরানো বাড়ির দেয়ালেও দেখেছি। ভেড়া,ছাগল খুব খায়।শরৎ আর বসন্তে ফুল ফোটে। গোলাপি রঙের ফুল । হাওয়াই মিঠাইয়ের রঙের। মনে হয় কাগজ কেটে আঠা দিয়ে জুড়ে বানানো হয়েছে। এমন অনেক ফুলের নাম জানা হয়নি।
কুড়িটা ভিন্ন ধরনের ডেইজি ফুলই পেয়েছি। কিছু ফুল তুলার মত। কিছু যেন দুধে ধোয়া।
কোন কোন উদ্ভিৎবিদের কাছে যখন এইসব ফুলের বর্ণনা দিয়েছি বেচারা বিরক্ত হয়েছে।
কিছু ফুল খুব সহজেই চেনা যায়। যেমন সাদা আর গোলাপি রঙের বুনো গোলাপ।
যেটাকে ডগ রোজ বলে। বসন্তের শুরুতেই জঙ্গল আর পাহাড়ে দেখা যায় ওদের।কিন্তু এমন বিচ্ছিরি নামের কারন কি?
কুত্তা গোলাপ !
কোন নাম হল ?কারণটা হচ্ছে, ওটা গ্রিক নাম থেকে নেয়া হয়েছে। যার অর্থ ছিল জলাতঙ্কের প্রতিকার।
একটা কথা মনে রাখবে আমাদের বাপ, দাদা বা দাদার দাদা বা পূর্ব পুরুষরা ফুল সম্পকে কৌতুহলি হত বা সংগ্রহ করতো তখনই যখন দেখত ফুলটা খাওয়া যায় বা ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করা যায়। সুন্দরের জন্য ফুল যোগার করতো না তারা।
চেহারা দেখে তারা কিছুটা অনুমান করতো। ডাক্তারের কম্পপাউডারের মত ।যেমন মনে কর আখরোট বাদামের কথা। এর খোসা দেখতে মানুষের মাথার খুলির মত শক্ত। আবার ভেতরের বাদামটা দেখতে মাথার
মগজের মত। কাজেই বহু বছর ধরে আখরোট মাথা ব্যাথার ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করা হত। বিভিন্ন দেশে।
কিছু গাছপালা দারুন রকমের বিখ্যাত হয় শুধু এর অপব্যবহারের জন্য।যেমন মনে কর তামাক পাতা। তামাক গাছে সুন্দর এক ধরনের ফুল হয়। কিন্তু ফুলের জন্য কি তামাক গাছ বুনি আমরা ? না। তামাক গাছের কথা বললে কি কেউ বলবে, ভাই দারুন ফুলের গাছ । আপনার বাগানে আছে নাকি ?
বলবে না ।
পেঁয়াজ ফুলের কথা কেউ বলবে ওটা লিলি ফুলের মত সুন্দর ?
বলবে না। অথচ পেঁয়াজ আর লিলি একই পরিবারের।
কারো বাগানে গিয়ে যদি মুগ্ধ হয়ে বলি, 'বাহ দারুন ফুল তোঁ । কী ফুল?'
বাগানের মালিক তোম্বা মুখে জবাব দেবে, আরে ভাই আলু ফুল ওটা। আহ্লাদের কিছু নেই।
কথা সত্য।
আলু গাছেও অদ্ভুত সুন্দর ফুল হয়। কে তার খোঁজ রাখে ?
প্রত্যেকটা বুনো ফুলের একটা করে কেতাবি নাম আছে। কিন্তু আমার কাছে পাহাড়ি নামটাই বেশি ভাল লাগে। আপন লাগে। কেতাবি নামগুলো বড্ড বেশি খট মট।
কসমস ফুলটার কথা বলি ?
গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে। মানে মহাবিশ্ব। ফুলটা সূর্যের প্রতীক। ট্রপিক্যাল আমেরিকা থেকে এসেছে। টিকে আছে আমাদের দেশে। খুব বেশি যত্ন নিতে হয় না। এক মুঠো দানা ছিটিয়ে দাও এক ফালি জমিতে। এমন কি পাথুরে মাটিতেও ।
কয়েক মাস পড় দেখবে রোদে দাঁড়িয়ে ফুল গুলো সাম্বা নাচ দিচ্ছে।
ওরা ধরতে গেলে বুনো ফুল। পুরোপুরি না। তেমন যত্ন নিতে হয় না।
ওদের জন্য খোলামেলা জায়গা লাগে। ঠাসা ঠাসি জায়গায় ভাল ভাবে ওরা বাড়ে না।
অক্টোবরের নরম রোদে এক ঝাঁক কসমস ফুটে থাকলে দারুন লাগে।
অনেকেই কসমস পছন্দ করে না। বা করলেও বাগানে বুনতে চায় না।
কত রকম ব্যাপার যে আছে।
দাদুকে একবার বেশ কিছু গাঁদা ফুলের চারা বুনতে দেখেছিলাম। দিদি মা বিরক্ত হয়ে চারাগুলো তুলে ফেলেছিল।
ফলে বেশ কয়েক দিন দাদু দিদিমার সাথে কথা বার্তা বন্ধ করে রেখেছিল ।
পরের মাসে দাদু কিছু ভিন্ন জাতের গাঁদা ফুল বুনল বাগানে। ফরাসি গাঁদা ফুল বলে।
এবার কিন্তু দিদিমা বিরক্ত হল না। সবাইকে দেখাতে লাগল, এই দেখ আমাদের বাগানে ফ্রান্সের গাঁদা ফুল আছে।
আজব কাণ্ড।
বিদেশী মেহমান এলে আমরা যেমন করি আর কি।
তোমরা হয়তো জানো না শিম গাছে দারুন আকাশী নীল রঙের ফুল হয়।নার্সারির গোলাপ গাছের চেয়ে বুনো গোলাপ বেশি ভাল লাগে ।
ডগ রোজের কথা আগেই বলেছি। সাদা -গোলাপি রঙের অপূর্ব ফুল।
বুনো রাস্পবেরি একই প্রজাতির গাছ। সুন্দর ফুল হয়। দেখতে ডগ রোজের মতই।
রোদ পছন্দ করি। তাই কমলা রঙের রোদে হলুদ কোন ফুল ফুটে থাকলে পছন্দ করি। যেমন- সূর্যমুখী। ক্যালিফনিয়ার পপি। শীতের জুঁই। ঝুমকো লতা। বুনো স্ট্রবেরির হলুদ ফুল।
এমন কি সাদা মাটা শর্ষের হলুদ ফুলও দারুন।
তবে গরমের দিনগুলোতে হলুদ ফুল ততটা ভাল লাগে না।
তখন নীল বা হালকা বেগুনি রঙের ফুল চোখে ভাল লাগে। যেমন- নীল অপরাজিতা, নীল ঝুমকাফুল, আর বাগান বিলাস।অচেনা একটা বুনো গোলাপ দেখি,চকলেটের মত পাপড়ি। সারা বছরই ফুল ধরে। বেডরুমের জানালা দিয়ে দেখা যায় ।
এমন দৃশ্য দেখলে মন এমনিতেই ভাল হয়ে যায়।
কি একটা অচেনা আইভি লতা ঝুপসি হয়ে ঝুলে আছে বাগানের দেয়াল ধরে।
জানালা খুললেই মিষ্টি বাতাস নিয়ে আসে। আর এক গাদা পাতা এনে ফেলে দেয় নির্জন কামরার ভেতরে।
প্রতেকবার জানালা খোলার পর পর কামরা পরিষ্কার করতে হয়।
এমন কি টাইপ রাইটারের ভেতরেও আইভির পাতা ঢুকে থাকে।
পিচ্চি একটা হলুদ ফুল হয়। মনে হয় ক্ষুদে সূর্যমুখী ফুল। নাম কেলেনডুলা (Calendula)।
এটা আসলে গাঁদা ফুলের একটা বুনো প্রজাতি। কোন রকম সৌরভ নেই। এই গাছের পাতা হালকা করে ঘষে দেখবে মিষ্টি একটা সৌরভ আছে, মন ভাল হয়ে যায়।
কিছু ফুলের ঘ্রানে বাগানে সাপ চলে আসে। যদিও সাপের ঘ্রান শক্তি খুব কম। মাটির কাছাকাছি
কিছু ফুলের সৌরভ ওরা পছন্দ করে।
হিমালয়ের আশে পাশে দীঘল ঘাসে নাম না জানা অনেক রকম ঘাসের ফুল ফুটে। কি সুন্দর।
হালকা বেগুনি। কাঁচা সোনার মত সোনালী। নরম মাখনের মত রঙ। ফিকে গোলাপি।
আফসোস ওদের একটার ও নাম জানি না আমি।
তবে একদিন ওদের সবাইকে চিনব আমি।
রাস্কিন বন্ড এর - Flowers এর ছায়া অবলম্বনে

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন