সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বাড়িতে এক অজগর সাপ

 শেষ পযন্ত দাদু ইনডিয়ান রেলওয়ে থেকে অবসর নিল।

তারপর থেকে আমরা হিমাচল প্রদেশের দেহারে বসবাস করতে  শুরু করলাম । বাড়ির পোষা জীবজন্তুর খেয়াল রাখতে রাখতে বেশ আনন্দের সাথে সময় চলে যেতে লাগল দাদুর। আমাদেরও।

এর মাঝে দাদু এক কাণ্ড করল। বাজারের এক সাপুড়ের কাছ থেকে বিশ রুপী দিয়ে বাচ্চা একটা অজগর   সাপ  কিনে ফেলল। এবং রাস্তার ছোট ছোট   বাচ্চা কাচ্চাদের নজর  কাড়ার  জন্য   অজগর সাপটা    গলায় মাফলারের মত ঝুলিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল।

ঘটনার সময় আমি দাদুর পাশেই ছিলাম।

এবং দাদুর পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে বেশ অহংকারী একটা ভাব চলে এসেছিল। নিজেকে বেশ তালেবান মনে হচ্ছিল আমাদের।

দেহারে দাদুকে সবাই চেনে।  দয়ালু মানুষ হিসাবে ।   এমনিতেই সবাই তাকে সম্মান করে  ।

দূর থেকেই দাদুকে সম্মান জানাছিল সবাই। কিন্তু কাছে এসে  যখন গলায় ঝুলান অজগর দেখতে পেল তখন বেশ তোম্বা হয়ে গেল ।  ছিটকে দূরে চলে যাচ্ছিল সবাই।

বাড়িতে ঢুকতেই দূর থেকে আমাদের প্রথম দেখল টুটু- আমাদের পোষা বানর।

কাঁঠাল গাছের ডালে বসে সুন্দর দোল খাচ্ছিল সে।

দূর থেকে অজগর সাপটা দেখে বানরটা একদম উজবুক হয়ে গেল। সেই প্রাচীন কাল থেকেই  সাপ আর  বানর  ওরা একে অপরের শত্রু । চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলল সে।

আমাদের পোষা তোতা পাখিটার নাম পাপাই। বারান্দায় বসে ছিল।  বিচ্ছিরি ভাবে শিস দিতে লাগল আমাদের দেখে  । শিসের শব্দ একদম ট্রেনের হুইসেলের মত। ওকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এই বাজে অভ্যাসটা রপ্ত করেছে যখন আমরা আগে রেল ইসটিশনের পাশে থাকতাম।

এত সব চিলা চিল্লি শুনে দিদা বারান্দায় চলে এলো। দাদুকে গলায় সাপ ঝুলিয়ে আসতে দেখে দিদার প্রায় অজ্ঞান হবার দশা।

দিদা সব ধরনের পোষা জীবজন্তু বেশ পছন্দ করতো। কিন্তু সরীসৃপ টাইপের জিনিস একদম পছন্দ করতো না। এমন কি পিচ্চি নিরীহ ধরনের গিরগিটি দেখলেও তার শরীরের রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে যেত।

এখন অবস্থা দেখে  তো  মনে হচ্ছে না অজগরের বাচ্চাটাকে বাসায় রাখা যাবে।

' সাপটা তোমাকে মেরে ফেলতে পারে।' কাঁদতে কাঁদতে বলল দিদা।

'বোকার মত কথা বলবে না।' দাদু বলল।' আরে এটা একদম পিচ্চি বাচ্চা।'

' আমাদের সাথে থাকতে থাকতে ওর অভ্যাস হয়ে যাবে।' বললাম। দাদুর পক্ষে উকালতির চেষ্টা করছি।

' বুঝলাম সাপটার অভ্যাস হয়ে যাবে।' বলল দিদা।' কিন্তু ওর সাথে অভ্যস্ত হবার কোন ইচ্ছা নেই আমার। আর মনে রাখ  , কাল  তোর  রুবি মাসি আমাদের এখানে আসছে। আমাদের সাথেই থাকবে। যদি শুনে এই বাসায় একটা সাপ আছে তবে এক মুহূর্ত ও থাকবে না । সাথে সাথেই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।'

' আমরা যদি রুবিকে প্রথমেই সাপটা দেখিয়ে দেই তা হলে বোধ হয় কাজ হবে।' বলল দাদু।

' ওটাকে বাড়ি থেকে বের কর।' দিদা সাফ বলে দিল।

'সাপটা বাগানে ছেড়ে দিতে পারি না। ওটা হয়তো মুরগীর খাঁচার মধ্যে গিয়ে বসে থাকবে। '

' মুরগীর জন্য সেটা ভাল হবে না।' যুক্তি দিতে চাইলাম আমি।

কিন্তু এই সব যুক্তিতে লাভ হল না । দিদা সাপটাকে বাড়ি থেকে বিতারিত করবেই।

' ওটাকে বাথরুমে আঁটকে রেখে দরজা বন্ধ করে রাখ।' দিদা বলল।' তারপর যাও। বাজারে গিয়ে সেই লোকটাকে খুঁজে বের কর, যার কাছ থেকে অজগরটা কিনেছ। আরও বিশ রুপী দাও। লাগলে চল্লিশ রুপী দাও। সে আসুক। এসে সাপটা নিয়ে যাক। আগের বিশ রুপী ফেরত দিতে হবে না।'

দাদু আর আমি মিলে সাপটা বাথরুমে নিয়ে রাখলাম। কায়দা করে উপরে একটা খালি গামলা চাপিয়ে দিলাম। যাতে ভেগে যেতে না পারে।

দাদুর চেহারা বিষণ্ণ। বলল- ‘তোর দিদা ঠিকই বলেছে রে। রুবিকে নিয়ে চিন্তা করছি না। কিন্তু টোটো আর পাপাই সাপটার সাথে থাকতে পারবে না ।'

আমরা দৌড়ে বাজারের দিকে গেলাম। যেমন করে হোক সাপুড়ে ব্যাটাকে খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু বেশি দূর যেতে পারলাম না। বেশ কয়েকজন সাপুড়ে আমাদের পাগলের মত খুঁজছে। তারা কোত্থেকে যেন শুনেছে দাদু সাপ কেনা শুরু করেছে। তাই সবাই হরেক পদের হরেক সাইজের সাপ নিয়ে বিক্রি করতে চলে এসেছে।

সবাই নিজের নিজের সাপের গুন কীর্তন করছে। তার সাপটাই সেরা। শুধু দুধভাত খায় । কোন উৎপাত করে না। হেন তেন।

' না ,না। ' প্রতিবাদ করলো দাদু।' আমরা নতুন করে আর কোন সাপ কিনতে চাই না।আমাদের কেনা সাপটাই ফেরত দিতে চাই।'

সবাই জানালো - যেই লোকটা মানে যেই সাপুড়ে আমাদের কাছে সাপ বিক্রি করেছে সে তরিঘড়ি গ্রামে ফিরে গেছে। গ্রামের জঙ্গলে দাদুর জন্য আরও একটা অজগর খুঁজছে।

অন্যান্য সাপুড়েরা আমাদের সাপটা কিনতে চায় না। বিক্রি করতে চায়।

এই সব উত্তেজিত সাপুড়েদের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি আর দাদু অনেক পথ ঘুরে বাড়ি ফিরলাম। সদর দরজা দিয়ে বাড়িতে না ঢুকে বাগানের দিকের দেয়াল বেয়ে ঢুকলাম। বুনো অর্কিডের কাঁটার খোঁচা খেয়ে আমাদের হাত পা অনেক জায়গায় ছিলে গেল।মোরব্বার মত।

গোল্লা গোল্লা চোখে বারান্দায় দিদা দাঁড়িয়ে আছে।আমাদের চেহারা দেখেই বুঝে গেছে যে কাজে আমরা গিয়েছিলাম সেটাতে দারুন ভাবে ব্যর্থ হয়ে ফিরেছি। লাভের বেলায় ঘণ্টা।

' ঠিক আছে ।' বলল দিদা।' ওটাকে তোমরা বাইরে কোথাও ছেড়ে দিয়ে এসো। খবরদার বাড়িতে যেন ফেরত না আসে।'

' এক্ষণই করছি দিদা।' আশ্বাস দিয়ে বললাম।' একটু ও চিন্তা করবে না তুমি।'

দাদু গিয়ে বাথরুমের দরজা খুলল। পিছনে খুব কাছ ঘেষে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।অবাক হয়ে আবিস্কার করলাম- বাথরুমে অজগরটা নেই।

'ওটা চলে গেছে রে ।' ঘোষণা দিল দাদু।

'কারন আমরা বাথরুমের জানালা খোলা রেখেছিলাম ।' জবাব দিলাম।

' কাজটা তোমরা জেনে শুনেই করেছ।'  সব শুনে  বলল দিদা। ' কিন্তু সাপটা বেশি দূর যেতে পারেনি। যাও, বাইরে গিয়ে মাটিতে ভাল করে খোঁজ কর।'

তন্ন তন্ন করে পুরা বাড়িটা খুঁজলাম। বাগান,ছাদ, রান্নাঘর, এমন কি মুরগীর খোঁয়াড়েও দেখলাম। সাপের কোন চিহ্ন নেই।

অজগরটা কোথায় গেল ?

' সাপটা মনে হয় বাগানের দেয়াল বেয়ে বাইরে চলে গেছে রে ।' খুশি খুশি গলায় বলল দাদু। 'বেশ হয়েছে।'

সাপটাকে আর দেখা গেল না।

এর মধ্যে আনটি রুবি রাজ্যের পোঁটলা পুঁটলি নিয়ে আমাদের বাড়িতে হাজির হলেন।বুঝা যাচ্ছে বেশ কয়েকদিন থাকবেন আমাদের সাথে।তোতা পাখিটা এক টানা কান ঝালাপালা করা শিস দিয়ে আনটি রুবিকে স্বাগত জানালো ।

পরের কয়েক দিন আমি আর দাদু বেশ আতঙ্কের মধ্যে রইলাম।

অজগরটা যদি হঠাৎ করে হাজির হয় একদিন ?   অমনটা হলে  আমার আর দাদুর কপালে বেশ দুঃখ আছে।

বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল। অজগরের বাচ্চাটা ফিরে এলো না। আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

ওর কপালে ভাল কিছুই হয়েছে নিশ্চয়ই।

 রুবি মাসী  বানর আর তোতা পাখীর সাথে ভালই সময় কাটাচ্ছেন।

এক সন্ধ্যায় আমাদের চমকে দিয়ে বাগান থেকে ভয়াল এক চিৎকার ভেসে এলো।

মুহূর্ত পরেই বারান্দায় দৌড়ে চলে এলেন আনটি রুবি। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন -' পেয়ারা গাছের নিচ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হাত  বাড়ালাম  পেয়ারা পাড়ব বলে। ওটা সোজা চেয়ে ছিল আমার দিকে। বড় বড় চোখ। আমাকে গিলে খেয়ে ফেলবে    যেন ।'

' আহা , শান্ত হও তো দেখি।' আনটি রুবির মুখে গোলাপ জল ছিটিয়ে দিতে দিতে বলল দিদা।' আমাদের বল তো, কি দেখেছ ?'

' একটা সাপ।' ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল আনটি রুবি।' একটা বিশাল অজগর পেয়ারা গাছটাকে পেঁচিয়ে আছে। ওর চোখ দুটো ভয়াল। আমার দিকে ভয়ঙ্কর ভাবে চেয়ে ছিল।'

'সাপটা আসলে বুঝে উঠতে পারছিল না পেয়ারা আর তোমার মধ্যে তফাৎ কি ।' ফিচেল মার্কা একটা হাসি দিয়ে বলল দাদু।

আড়চোখে আমার দিকে তাকাল দাদু।আমাদের মধ্যে ভাবের বিনিময় হল।সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে দৌড়ে দুজনে পেয়ারা গাছের নীচে চলে এলাম।

অজগরটা নেই। ছিল কিনা তাই বা কে বলবে ?ধারনা করে নিলাম হয়তো সাপটা ফিরে এসেছে। আর চুপচাপ কোথাও লুকিয়ে আছে।অনেক খুঁজেও পেলাম না।

একদিন সকালে দেখি আমার ড্রেসিং টেবিলের উপর কুঁচকে শুয়ে আছে সাপটা। অপলক চোখে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে চেয়ে আছে।

দৌড়ে দাদুকে ডাকতে চলে গেলাম। দুই জন যখন  হাঁপাতে হাঁপাতে  ফিরে এলাম। ওটা   চলে গেছে।

কয়েকদিন পর ওটাকে বাগানে দেখলাম।

বাগানের লোহার মই বেয়ে ছাদে উঠে যাচ্ছে সর সর করে। আমাকে দেখে ফুড়ুৎ করে ড্রেনের পাইপের ভেতরে ঢুকে গেল।

' ওটা বোধ হয় ড্রেনের পাইপের ভেতরে আস্তানা বানিয়েছে।' দিদাকে বললাম।

' খাওয়া দাওয়া পায় কোত্থেকে ?' দিদা জানতে চাইলো।

' মেঠো ইঁদুর ধরে খায় হয়তো। জানো না ওরাও তো ড্রেনের পাইপে আসে।'

'হুম।' চিন্তিত ভাবে বলল দিদা।' খারাপ না। ইঁদুরের হাত থেকে মুরগীর বাচ্চাদের রক্ষা করছে সাপটা।'

সাপটা যদি ছাদে আর ড্রেনে থাকতো অত চিন্তা করতাম  না । কিন্তু  সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায় ওটা।যখন যেখানে মর্জি।আনটি রুবির ড্রেসিঙ টেবিলের উপর ও দেখা গেল ওকে, আয়নায় নিজের চেহারা দেখছে।

' আশকারা দিতে দিতে ওর সাহস বেড়ে গেছে।' বলল দিদা।' রুবি তুমি এক মিনিটের জন্য সাপটা ধর তো।'

আনটি রুবি ভয়াল এক চিৎকার দিয়ে দৌড়ে বারান্দায় চলে গেলেন।

সেখানে তার চিৎকারের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের তোতা পাখীটাও চেঁচাতে লাগল।

বেচারি আনটি রুবি। ভেবেছিলেন আমাদের সাথে বেশ কিছুদিন থাকবেন। সপ্তাহ খানেক থেকেই মালপত্র নিয়ে লউখন চলে গেলেন।

ওখানেই তিনি একটা ইশকুলের দিদিমণি। বাচ্চাদের পড়ান। উনি আমাদের জানালেন-আমাদের বাড়ি থেকে ইশকুল অনেক নিরাপদ তার কাছে। জীবনেও আসবেন না আমাদের বাড়িতে।

অজগরের বাচ্চাটা বাড়িতেই রয়ে গেল।

দাদুই ওটাকে হাত দিয়ে ধরত। দেখে আমারও লোভ হল। একদিন সাপটা যখন লোহার মই বেয়ে ছাদে উঠছিল আমি কায়দা করে হাত বাড়িয়ে দিলাম। ধীরে ধীরে ওটা আমার হাত বেয়ে গলায় এসে ঝুলে রইল মাফলারের মত।

সাপটা বরফের মত ঠাণ্ডা। পিচ্ছিল আর খসখসে।আমার শরীর বেয়ে নড়াচড়া করতে লাগল। বাগানে নিয়ে এলাম।

বাগানের এক কোনে খালি একটা ঝুড়ির মধ্যে রেখে দিলাম ওকে।

পলকহীন , ভাবলেশহীন চোখে সাপটা চেয়ে রইল আমার দিকে।মনে মনে ওটা কি ভাবছে কে বলবে ?

ভাবছে কিনা তাই বা কে জানে ?

বাইরে চলে গেলাম। একটু সাইকেল চালাব।

খানিক পরে ফিরে এসে দেখি দিদা বাগান থেকে পেয়ারা পেরে ঝুড়ি ভর্তি করছে।

সাপটা নেই। আবার কোথায় চলে গেছে।

ঝুড়িটা ভর্তি হতেই দিদা বলল-' মেজর মল্লিকের বাসায় এই ঝুড়িটা পৌঁছে দিতে পারবি ? আজ উনার জন্মদিন। আমি উনাকে দারুন একটা সারপ্রাইজ দিতে চাই।পেয়ারা পেলে খুশি হবেন ভদ্রলোক। '

পেয়ারা ভর্তি ঝুড়িটা সাইকেলের ক্যরিয়ারে রেখে প্যাডেল মেরে রওনা হলাম।

মেজর মল্লিক সাহেবের বাড়ি রাস্তার শেষ মাথায়।

' কি খোকা ? দিদা আমার জন্য কি পাঠিয়েছে ?' খুশি খুশি গলায় বললেন মেজর মল্লিক সাহেব।

' আপনার জন্মদিনের উপলক্ষে সারপ্রাইজ উপহার স্যার।' বিনয়ের সাথে জবাব দিয়ে উনার সামনেই ঝুড়িটা রাখলাম।

ঠিক সেই সময়ই গা ঝাড়া দিয়ে পেয়ারার ভেতর থেকে কয়েক ফুট লম্বায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো কি একটা জিনিস  ।ওর শরীরের ধাক্কা খেয়ে ঝুড়ি থেকে পেয়ারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো চারিদিকে। হায়রে ! অজগরের বাচ্চাটা পেয়ারার তলায় ছিল। কে জানতো ?

আতংকে চিৎকার করে উঠলেন মেজর সাহেব। দৌড়ে বাড়ির ভেতরে যাবার সময় দরজার পাল্লায় ধিমাই করে উনার মাথাটা ঠুকে গেল।

সাপটাকে ঝুড়ির মধ্যে ভরে ওটা তুলে নিয়ে চম্পট  দিলাম। যেভাবে সাইকেলে বসে ঝড়ের বেগে প্যাডেল মেরে মেইন গেইটের বাইরে চলে এলাম ওটা দেখার মত ছিল। এই গতিবেগ ছিল একটা রেকর্ড। খামাখা অমন করিনি।  যথেষ্ট কারন ও ছিল। মেজর মল্লিক উনার দোনলা শটগানটা নিয়ে দৌড়ে বাইরে চলে এলেন। দুই হাতে সেটা তুলে ধরে আস্ফালন করতে লাগলেন। মুখ চোখ লাল হয়ে গেছে।

' পেয়ারাগুলো পৌঁছে দিয়েছিস ?" বাড়ি ফেরা মাত্র দিদা জানতে চাইলো।

'হ্যাঁ পৌঁছে দিয়েছি।' সত্য কথাই বললাম।

' নিশ্চয় খুশি হয়েছেন ?'

' উনি কাল চিঠি লিখে তোমাকে ধন্যবাদ জানাবেন।'

পরদিন সত্যি সত্যি চিঠি এলো।

 মেজর মল্লিকের চিঠিটা এরকম-

"আপনার সুন্দর ভালবাসাপূর্ণ সারপ্রাইজ উপহার পেয়েছি। আপনি হয়তো জানেন না , ডাক্তার আমাকে উত্তেজিত  হতে বারন করেছে। আমার ব্লাড প্রেসার এমনিতেই অনেক হাই। আপনার নাতিটার উন্নতির কোন লক্ষণ আমি দেখছি না। আগের মতই রয়ে গেছে। যাই হউক পুরা ব্যাপারটা আমি একটা মজার কৌতুক হিসাবেই গ্রহণ করলাম..."

' কি অদ্ভুত চিঠি ।' অবাক হয়ে বলল দিদা।' বেচারা বোধ হয় অসুস্থ । পেয়ারা কি ব্লাড প্রেসারের জন্য খারাপ নাকি ?'

' আরে নাহ, পেয়ারা খুবই ভাল জিনিস।হয়তো অন্য কোন ব্যাপার মিকচার হয়ে উনার মেজাজ মন মর্জি খারাপ ছিল।' দাদু সাফাই গাইল।

দাদু ঠিকই বুঝতে পেরেছে ব্যাপার আসলে কি।

সাপটা বাধ্য হয়ে আমাদের সাথেই রইল। দিদা ও  এর মধ্যে  ওকে বেশ মেনে নিয়েছে।

 কয়েকদিন পর  ঠিক করা হল আমরা লখনউ যাব। বেড়াতে।গরমের ছুটি। লখনউ বেশ বড় শহর। দেহার থেকে ৩০০ মাইল দূরে । আমাদের আনটি রুবি ওখানেই থাকে। আগেই বলেছি।

ওখানে কিছু দিন থাকবো আমরা। এখন তো এই বান্দর, সাপ এবং তোতা পাখী সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া চলবে না।

' পাপাইয়ের কি হবে ?' জানতে চাইলাম।

' পাপাই তো পোষা কোন প্রাণী না।' বলল দিদা।' ও আমাদের সাথেই যাবে।'

আমরা যখন দেহার রেল ইষ্টিশনের প্ল্যাটফর্মে পৌঁছলাম তখন বেশ বিচ্ছিরি ব্যাপার হল। তোতা পাখিটা হুবহু রেলগার্ডের বাঁশি আর ট্রেনের হুইসেল নকল করে চিক্কুর দিচ্ছিল। সবাই বেশ হকচকিয়ে যাচ্ছিল। যাত্রী আর যাত্রীদের আত্মীয় স্বজনরা রেল গাড়ি ছেড়ে দেবে মনে করে দৌড়া দৌড়ি শুরু করছিল। ভিড়, ধাক্কা। ঝামেলা।

ব্যাপারটা এতবার হল যে ভুল বুঝাবুঝির ফলে যখন ট্রেন ছেড়ে দিল বেশ কিছু যাত্রী তখনও ইষ্টিশনে রয়ে গেল। গার্ডের বাঁশি ওরা ভেবেছে পাখীর ডাক।

হায়, হায়।

'পাখিটার গলা টিপে ধরতে পারলে না।' ট্রেনটা ভীষণ গতি পেয়ে নিরাপদ দূরে যাবার পর দাদু বলল।

'তোতা পাখীর গলা টিপে ধরব কেন ?' বিরক্ত হয়ে বলল দিদা।'ওর জন্য ও টিকেট কিনেছি। আর ও যদি সিটি বাজিয়ে ওর যাত্রা উপভোগ করতে চায় তবে আমরা বাধা দেয়ার কে ?'

যাত্রা পথে অনেক গুলো ইষ্টিশনে ট্রেনটা থামল। জানালা দিয়ে হরেক ফেরিওয়ালা হাত বাড়িয়ে দিল জিনিস পত্র বিক্রির আশায়।

আমাদের তোতা পাখিটা সবার হাতের আঙুলে বা নাকে কামড় দিল।

একজন টিকিট চেকারের কানে খামচি দিয়ে নাস্তানাবুদ করে ফেলল।

 বাইরে রাত হয়ে আসছিল।

দিদা পেল্লাই এক কম্বলে নিজেকে জড়িয়ে শুয়ে পড়লো।

' খুব ধকল গেছে রে। আমি ঘুমিয়ে পড়ি।' বলল।

' আমরা কিছু খাব না ?' জানতে চাইলাম।

'আমার খিদে পায়নি। বাড়ি থেকে বের হবার আগে খেয়ে নিয়েছিলাম। একটা ঝুড়িতে তোদের জন্য খাবার আছে। খেয়ে নে।'

দিদা দেখলাম ঝিমুতে লাগল। তোতা পাখীটাও কেমন ঘুম ঘুম ভাব করে মাথা নাড়ছে।

ট্রেনের কুউউ ঝিঁক ঝিঁক শব্দ আর চাকার এক ঘেয়ে শব্দে সবার মধ্যে তন্দ্রালু ভাব।

' আমার খিদে পেয়েছে।' বললাম।' দিদা আমাদের জন্য কি বানিয়েছ ?'

' পুর দেয়া পরোটা, ডিমের অমলেট আর তন্দুরি চিকেন।'

খানিক পর   বেতের টিফিন বাক্সটা টেনে নিলাম ট্রেনের কর্ম্পাটমেন্ট মাঝে। বেশ ঢিলে করেই ফিতে বাঁধা। ঢাকনাও দেখি প্রায় খোলা।

ঢাকনা খোলার সাথে সাথেই বড় একটা চমক পেলাম। ভেতরে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে আমাদের সেই অজগরের বাচ্চাটা। আর আমাদের টিফিনের কোন চিহ্ন নেই।

'হায় হায়। ভেতরে সাপটা তো।' চেঁচিয়ে বললাম।' ও আমাদের সব নাস্তা খেয়ে ফেলেছে।'

'ফালতু কথা।' বিরক্ত হয়ে  পাশে এসে বসতে বসতে বলল দাদু ।  ' অজগর পরোটা আর ডিমের অমলেট পছন্দ করে না। ওরা জ্যান্ত খাবার খেতে পছন্দ করে। আরে এটা পুরানো ঝুড়ি।  হুবহু নতুনটার মত দেখতে। নতুন ঝুড়িতেই আমাদের নাস্তা ছিল। ওটা ভুলে বাসায় রেখে চলে এসেছিস রে।'

আস্তে করে ঝুড়িটা বন্ধ করে দিদার বিছানার তলে রেখে দিয়ে ফিসফিস করে দাদু বলল-'তর দিদাকে এটা দেখাস না। ভাববে আমরা ইচ্ছা করেই সাপটা সঙ্গে করে এনেছি।'

' আছা। কিন্তু আমার তো খিদে পেয়েছে।' নালিশ জানালাম।

'অপেক্ষা কর। পরের ইষ্টিশনে গাড়ি থামলেই আমরা পাকোড়া কিনে খাব। এই মুহূর্তে আমরা বরং তোতা পাখিটা জন্য আনা কাঁচা মরিচ থেকে কয়েকটা খাই।'

' আমার লাগবে না। তুমি খাও।'

দাদু আর তোতাপাখি কচমচ করে কাঁচা মরিচ খেতে লাগল।

খানিক পরই রাত আরও গভীর হল।

তখনই করিডোরের শেষ মাথা থেকে বিরাট এক হল্লা শুনতে পেলাম।

চিৎকার শুনে তোতা পাখী জেগে আবার চিক্কুর দিতে লাগল। বাধ্য হয়ে আমি আর দাদু উঠে বসলাম। দেখতে হবে কি হয়েছে।

শুনতে পেলাম কে যেন চিৎকার করছে- সাপ ! সাপ !

বিছানার নীচে রাখা ঝুড়ির দিকে তাকালাম। ওটার ঢাকনি খোলা।

' অজগরটা বের হয়ে গেছে।' বললাম।

দাদু পাগলের মত ছুটে গেল বাইরে।

পিছন পিছন আমিও। প্রায় ডজন খানেক লোক ট্রেনের বাথরুমের বাইরে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই উত্তেজিত।

' কোন সমস্যা ?' সতর্ক ভাবে জানতে চাইলো দাদু।

' পাহানার ভিত্রে যাইতে পাত্তাছিনা ।' জবাব দিল কেউ।  পাহানার  ভিত্তে একটা হাপ।'

' দেখি আমাকে একটু দেখতে দিন। আমি সাপের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ।' জবাব দিল দাদু।

সবাই গোল্লা গোল্লা চোখে সম্মানের সাথে দুই দিকে সরে দাঁড়াল। আমরা বাথরুমের ভেতর মানে যেটা পায়খানা বলল লোকটা সেটার ভেতরে গেলাম।

নাহ। ভেতরে সাপের কোন চিহ্ন নেই।

' ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে বাইরে চলে গেছে।' ফিস ফিস করে বলল দাদু।' সমস্যা হল ওটা এখন অন্য কোন কামরায় আছে রে।'

তারপর গলা উঁচু করে বাইরে থাকা জনতার উদ্দেশে বলল-' ওটা চলে গেছে। ভয়ের কিছু নেই। একদম পিচ্চি একটা অজগরের বাচ্চা। ভয় পাবার কোন কারণই নেই। হে হে।'

ভিড় ঠেলে আমাদের কর্ম্পাটমেন্টে ফেরত আসতেই চমকে গেলাম। দিদা জেগে বসে আছে।

' তোমরা আমাকে না জানিয়ে সাপটা নিয়ে এসেছ ? ভাল। লজ্জা নেই তোমাদের।' বলল দিদা।' আমাকে বলেছে সাপটা বাসায় আছে। অথচ পুরো যাত্রা পথেই ওটা আমাদের সঙ্গেই ছিল । তাই না ?'

দাদু হাত পা নেড়ে নানান ভাবে ব্যাখ্যা দিল । বুঝাতে চাইলো পুরা ব্যাপারটা একটা সাধারন অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা। আসলে গাড়িতে মাল তোলার সময় মল্লিক সাহেব ভুলে ...হেন তেন।

দিদা কঠিন চেহারা করে চেয়ে রইল আমাদের দিকে । বাকি জীবন আমাদের আর বিশ্বাস করবে না।

' যাই হোক সাপটা আর নেই।' শেষ কথা বলে বাঁচতে চাইলো দাদু। ' ওটা বাথরুমের জানালা দিয়ে বাইরে পড়ে গেছে। আমরা দেহার থেকে একশো মাইল দূরে।  বাকি  জীবনেও সাপটার সাথে তোমার আর দেখা হবে না,'

কথা শেষ করার আগেই কর্কশ শব্দ করে রেল গাড়ির চাকা ঘষা খেতে লাগল। গতি কমে  এলো চলন্ত ট্রেনের।

' হায় হায়। এখানে তো কোন ইষ্টিশন নেই।'

বলেই জানালা দিয়ে কচ্ছপের মত গলা বের করে বাইরে তাকাল দাদু।

 একটা লোক লাফ দিয়ে ট্রেন থেকে নেমে চিৎকার করে দৌড়ে পালাচ্ছে।

'আরে এটা তো কয়লা দেয়ার মজুরটা। ট্রেনের চুল্লিতে কয়লা ঠেসে দেয় ও।' বলল দাদু।' আমি বরং গিয়ে দেখি  সমস্যাটা কি?'

'আমিও আসছি।' বলেই দাদুর পিছন পিছন দৌড় দিলাম।

টানা সোজা দৌড়ে গিয়ে হাজির হলাম ইঞ্জিন রুমে।

' কি ব্যাপার বলেন তো।' হাঁক দিল দাদু। ' কোন সমস্যা ? আমাকে বলতে পারেন। আমি ইঞ্জিন বিশেষজ্ঞ।'

কিন্তু ইঞ্জিন ড্রাইভার যেন বোবা হয়ে গেছে।

বেচারাকে কেউ দোষ দিতে পারবে না।

কারন অজগরের বাচ্চাটা উনার দুই পা সুন্দর করে প্যাচিয়ে ধরে রেখেছে।

ড্রাইভার নড়তে চড়তে পারছে না।

' ব্যাপারটা আমরা দেখছি।' বলল দাদু।

কায়দা করে সাপটা ছড়িয়ে তুলে দিল আমার হাতে।

ড্রাইভার ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল।

চেহারা হোয়াইট প্রিন্ট কাগজের মত সাদা হয়ে গেছে। থর থর করে কাঁপছে।

' মনে হচ্ছে আমাকেই ইঞ্জিন চালাতে হবে।' বলল দাদু।' আমাদের লখনউ পৌঁছে হবে। দেরি করলে চলবে না। তোর আনটি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।'

ড্রাইভার বাঁধা দেয়ার আগেই দাদু ব্রেক রিলিজ দিল । ইঞ্জিন চলতে লাগল সাথে সাথেই।

' কিন্তু দাদু কয়লা ফেলার মজুরটাকে তো আমরা পিছে ফেলে দিয়েছি। ' বললাম।

' ওর কথা বাদ দে । তুই বেলচা মেরে মেরে কয়লা দিবি ।'

দাদুর কথায় কেমন একটা জোস এসে গেল। অজগরটাকে ড্রাইভারের সীটে রেখে গায়ের জোরে বেলচা মেরে মেরে কয়লা দিতে লাগলাম ইঞ্জিনের চুল্লিতে।

কয়েক মুহুতেই ইঞ্জিনের গতি বেড়ে গেল।

অন্ধকার ছিঁড়ে ভীষণ গর্জন করে সামনে দৌড়ে যেতে লাগল আমাদের রেলগাড়ি।

ঘন ঘন সিটি মারতে লাগল। আর আকাশ ভরে গেল কালো ধোঁয়ায়।

' ভাই আপনারা বেশি জোরে গাড়ি চালাচ্ছেন।' কাঁদতে কাঁদতে বলল ড্রাইভার।

' যে সময়টা নষ্ট হয়েছে সেটা পুষিয়ে নিতে হবে না।' বলল দাদু। ' তা আপনার কয়লা মজুর পালিয়ে গেল কেন ?'

' পালায়নি তো।  গার্ডকে ডাকতে গিয়েছিল। আপনারা ওদের দুই জনকে পিছে ফেলে চলে এসেছেন।'

পরদিন ভোরে আমরা লখনউতে নিরাপদে পৌঁছলাম।

ব্যাপারটা সাংঘাতিক হত। কিন্তু না। ভাগ্য ভাল। লখনউ রেল ইষ্টিশনের ইষ্টিশন মাস্টার দাদুর অনেক পুরানো বন্ধু। দুইজন দুই জনকে ভাল করেই চিনতেন।

আমরা টাইম টেবিল হিসাব থেকে কুড়ি মিনিট আগে পৌঁছেছি।

গুমটি ঘরে বসে ইষ্টিশন মাস্টার আর ড্রাইভারের সাথে করে গরম এক পেয়াল চা খেলেন দাদু।

  এই ফাঁকে আমি অজগরের বাচ্চাটাকে আমি টিফিন রাখার ঝুড়ির মধ্যে ভরে দিদার মালপত্র নামাতে লেগে গেলাম।

পাপাই মানে তোতা গিয়ে বসল দিদার কাঁধে। ওখানে বসে থেকেই মুখ- মাথা ঘুরিয়ে যাত্রীদের উপর সন্দেহ মাখা নজর বুলাতে লাগল।

আনটি রুবিকে পাপাই প্রথম দেখল। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে।

কান ঝালাপালা চিক্কুর দেয়া শুরু করল ও।

আনটি রুবি খাওয়া দাওয়া বেশ পছন্দ করেন। প্রথমেই দৌড়ে এসে টিফিন রাখার ঝুড়ি আমার হাত থেকে তুলে নিয়ে বললেন-' হুম বেশ ভারি লাগছে। আমার জন্য কিছু খাবার নিশ্চয়ই রেখেছিস। সব খেয়ে ফেলিস নি তো ? আমি ঝুড়িটা ট্যাক্সিতে তুলে রাখছি।'

' আমরা কিছুই খাইনি।' ফ্যাকাসে হেসে বললাম।

'চল, অনেক দিন তর দিদার হাতের রান্না করা খাবার খাইনি।' খুশি খুশি গলায় বললেন আনটি রুবি।

আমি ভয়ে ভয়ে আছি। এখনই না রুবি আনটি ঝুড়িটা খুলে না ফেলে।

ততক্ষণে দাদু ও চলে এসেছে তার বন্ধু ইষ্টিশন মাস্টার আর সেই কাহিল ড্রাইভারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে।

ট্যাক্সিতে বসলাম সবাই।  ড্রাইভারকে বার বার রাস্তা চিনিয়ে দিতে লাগলেন রুবি আনটি ।

ধুলার মেঘ উড়িয়ে আমাদের ট্যাক্সি চলতে লাগল শহরের পথে।

' ঝুড়িতে কি আছে রে।' বললেন আনটি রুবি।' একটু উঁকি দিয়ে দেখি ?'

'এখন না। বাসায় গিয়ে হলে ভাল হয়।' ঢোক গিলে তম্বা মুখে বলল দাদু।

পাপাই দিদার কাঁধে এখনও বসে আছে। গোল্লা গোল্লা চোখে ঝুড়িটা দেখছে ও।

আনটি রুবির বাসায় গিয়ে দেখি টেবিল ভর্তি হাজার পদের জলখাবার।

মনে পড়ল কাল থেকে না খাওয়া।

' যা বানিয়েছি খুব বেশি না।' বললেন আনটি রুবি। ' আচ্ছা ঝুড়ি খুলে তোরা যা খাবার এনেছিস তাও বের করি । কি বলিস ?'

হাত বাড়ালেন ঝুড়ির দিকে।

ঢাকনা খুলে ভেতরে তাকালেন আনটি রুবি।

মাত্র কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে কোন রকম প্রতিবাদ না করে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেলেন। জ্ঞান হারিয়েছেন।

দাদু সাপটা নিয়ে বাগানে চলে গেল। একটা বড় ঝুপসি ডালিম গাছের শাখায় যত্ন করে  ওটাকে প্যাচিয়ে রাখলেন।আনটি রুবির জ্ঞান ফেরার পর অনেক চিল্লা ফাল্লা করলেন।

উনি বার বার দাবি করলেন সাপ দেখেছেন টিফিনের ঝুড়ির মধ্যে ।

আমরা গম্ভীর মুখে তাকে খালি ঝুড়ি দেখালাম।

' পুরা ব্যাপারটা তোমার চোখের ভুল। ' গম্ভীর গলায় ব্যাখ্যা করল দাদু।' আজ কাল  খুব বেশি পরিশ্রম করছ। তাই এই অবস্থা।'

' হ্যাঁ, ইস্কুলের বাচ্চাদের পড়ানোর কাজটা খুব কঠিন। মানসিক চাপ পড়ে।' সতর্ক ভাবে দালালি করলাম।

দিদা কিছুই বলল না।

বোবা হয়ে রইল।

তোতা পাখী পাপাই সব দেখেছে। চিক্কুর পেরে সব বলতে চাইলো আনটি রুবিকে।

ভাগ্য ভাল ও ট্রেনের সিটি ছাড়া আর কিছু পারে না।

রাস্কিন বন্ড- এর   Snake Trouble অবলম্বনে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...