সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দূরের বাতিঘর


 শহরের শেষ লাল টালির বাড়িটা ছিল আমাদের।

 

  আমার  শহরে তখনও  দুই চারটে টালির ঘর পাওয়া যেত। টালির চেয়ে সস্তা হত  টিনের দাম। গ্যালভানাইজড টিন শব্দটা বেশ  শুনতাম । মরিচা ধরে না। বেশ চকচক করে ।

কে আর দাম দিয়ে টালি কেনে ?

 

 

আমাদের ছোট্ট বাড়িটার টিনের চাল থাকলেও  সামনের অর্ধেক একদম টুকটুকে লাল টালির। সত্যি সত্যি লাল। বর্ষায় যখন প্রচুর বৃষ্টি হয় ,  শ্রাবণী মেঘের জলে সেই ভেজা ভেজা  টালির উপর কেমন  মিষ্টি নীলাভ সবুজ  রঙের শ্যাওলা জন্মে। 

 

 সেগুলো আবার ভাদ্র মাসের তাল পাকা গরমে মরেও যায়।

 

লাল টালির উপর ওই শ্যাওলা যখন হয় তখন বাড়িটা ফ্যারো দ্বীপের বাসার মত লাগে।

 

বাড়ির ঠিক দশ কদম সামনে একটা পুকুর।

 

  বেশ কয়েকটা কচ্ছপ  থাকে পুকুরটাতে। ওদের পরিবার- পরিজন,  বন্ধু -  ান্ধব ,   আত্মীয় - স্বজন  আর ইয়ার দোস্তদের নিয়ে ।

 

  নিঃসঙ্গ , পেল্লাই একটা গজার মাছও আছে।  নামকরা অনেক মৎস্য শিকারি মেলা চেষ্টা চরিত্র করার পরও মারতে পারেনি।অনেক আগে,  কে নাকি মানত করে ওই মাছটা ছেড়েছিল পুকুরের জলে।

 

ও দিব্যি আছে। নিম পাখি ডাকা অলস দুপুরে পুকুরের কালো জলে বুদবুদ উঠে। তখন বুঝি ও আছে।

খুব কম মানুষেই ওকে দেখেছে। আমি দেখিনি। কিন্তু জানি , ও আছে।

 

 

কোন একটা মৌসুমে,  একদম চকচকে  পান্না রঙের ঘাস  ফড়িঙ উড়ে উড়ে চলে আসে আমার পড়ার টেবিলে।ওদের চোখ যেন সবুজ পেপারওয়েট।

 

আমার ছোট ভাই ওদের ধরে ধরে জুতার খালি বাক্সে জমায়। বাক্সটা   ওর ব্যক্তিগত ঘাস  ফড়িঙের খামার।

মাঝে মাঝে জুতার বাক্স সামান্য ফাঁক করে উঁকি দিয়ে ফড়িঙগুলো গুণে হিসাব রাখে।   সুযোগ পেয়ে  দুই একটা ফড়িঙ লাফ দিয়ে পালিয়ে যায়।

 

তখন ওর হাউ মাউ কান্না দেখে কে ?

    

 

আমি  বাঁধা দেই না।

 

 ওর বয়সে আমারও একটা পিচ্চি পুকুর ছিল। পুকুরটার সাইজ আমাদের বিছানার সমান । ওটা ভর্তি কিলবিল করতো হাজার হাজার ব্যাঙ্গাচি। মনে হত,  আস্ত একটা মহাসাগর আর হাজার হাজার তিমি মাছের মালিক আমি।   

 

বেশ একটা ভাব আসত নিজের মধ্যে ।

 

বাড়ির সামনের  পুকুর থেকে দুই একটা শামুক কি মনে করে রাস্তায় চলে আসে।পুকুরে খাবারের অভাব নেই। তারপরও কেন চলে আসে কে বলবে ?  ওদের শরীরে জিলিপির মত প্যাচ দেখে বুঝা যায় ওদের বয়স কত। যত বেশি প্যাচ তত বয়স বেশি। মানুষের মনের মত !

 

 

 

 

 

 

দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বাঁচেএই শামুকগুলো  

 

এই বাড়িতেই   আমি প্রথম মুরগির পালক দিয়ে বাতাসের দিক  নির্ণয় যন্ত্র বানিয়ে ফেললাম । মানে যেটাকে উইন্ডস্কোপ বলে ইংরেজিতে। আবার উইন্ড ভেইন ও বলে।

 

 সাদা ধপধপে মুরগির  একটা পালকের গোঁড়ার দিকের সামান্য ছিঁড়ে ফেলে দিলাম।

জিনিসটা দেখতে হল শেক্সপীয়র সাহেবের কলমের মত।যেটাকে কুইল বলে।

 

   মায়ের সেলাইয়ের বাক্স থেকে চুরি করা একটা সুচ  পালকটায় গেঁথে  কঞ্চির সাথে বেঁধে দিতেই কাণ্ড হল। বাতাস যেই দিকে থেকে আসে  সেই দিকেই মুখ করে থাকে আমার যন্ত্রটা।

 

মনটা ভাল হয়ে গেল।

 

একই সাথে বেশ খেটে পিটে  কাচের একটা বোতল আর তেল মাপার চুঙ্গি দিয়ে  একটা  রেইন গজ মানে বৃষ্টি মাপার যন্ত্র বানিয়ে ফেললাম। মাত্র জ্যামিতি বক্স কিনেছি।  স্বচ্ছ একটা স্কেল ছিল। মিলি মিটার সেন্টি হতে ইঞ্চি পর্যন্ত দাগ দেয়া। কাজ সহজ হয়ে গেল আমার।

 

দরকার নেই তবু একটা কথা বলছি। আমাদের ইস্কুলের এক স্যার জ্যামিতিকে বলে জমিতি। উনার কথা হল-  ‘প্রাছিন মিছরের লোকজন জমির হিসাব মাফার জন্য এই কায়দা আবিস্কার করেছিল। তাই একে বলে জমিতি।

 

বাদলার দিনে  বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখি।

 

মনে হয় দূরের  কোন বাতিঘরে বসে আছি।

 

সাঁই সাঁই বৃষ্টি। কাউনের দানার মত বৃষ্টির জল।

 

রান্নাঘরে চায়ের পাতা ফুটানোর সৌরভ।আমার  মা চা বানাচ্ছে।

 

তখন মনে হত , লাইট হাউজে চাকরি পেলে অনেক মজা হবে।

 

দূর সাগরে যেখান দিয়ে ত্রিস্তান দা কুনহা  দ্বীপে যায় মানুষজন। বা কফি ক্লাব আইল্যান্ড !

 

দ্বীপের কি অভাব আছে ?

 

ক্রিসমাস আইল্যান্ড। এগ আইল্যান্ড। হাঙরের দ্বীপ।

 

নাম জানা অজানা হাজার হাজার দ্বীপ।

 

কল্পনায় দেখি ,  অমন দূর কোন জায়গায় একটা লাইট হাউজে কাজ করছি । একদম একা। আমার গায়ে সাদা উলের টারটল নেক ফুল হাতা সোয়েটার। কালচে নীল প্যান্ট। গলায় সিমেন্টের রঙের তুলট  মাফলার।

 

সেলারের তাক  ভর্তি টিনের কৌটা। আর শুকনো খাবার।

 

  হাতির দাঁতের রঙের অনেক- অনেক  মোমবাতি। একটা  কম্পাস। টিনের একটা কেটলি ,   জল ফুটিয়ে কফি বানানর জন্য। কয়েকটা চিনামাটির পেয়ালা। একটা ভেঙ্গে গেলে যাতে বিপদে না পরি।

 

কাচের গোল বয়াম ভর্তি ভিনেগারে ডুবিয়ে রাখা  গোলাপি  পেঁয়াজ আর সাদা  বাঁধাকপি।  পেল্লাই ঝিনুকের খোসা দিয়ে বানানো থালা। পিতলের এক লণ্ঠন। চার কোনা। চারদিকে কাচ।

 

এই লণ্ঠন নিয়ে প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে রোজ সন্ধ্যায় বাতি জ্বেলে দেই আমি।

 

সপ্তাহে বা মাসে একদিন জাহাজ এসে খাবার আর রসদ  দিয়ে যায় আমাকে । সাথে থাকে প্ল্যাস্টিকে মোড়ানো চিঠি। আমার লেখা চিঠি আর ডাকটিকিট নিয়ে খুশি মনে বিদায় নেয়   জাহাজের  ক্যাপ্টেন। যাবার আগে দড়ি দিয়ে গিঁট বাঁধার কয়েকটা কৌশল শিখিয়ে দেয় একজন পুরানো জাহাজি। ওর বাহুতে মৎস্যকুমারীর উল্কি।গাল ভর্তি গিজগিজে দাঁড়ি।  গলায় একটা রেশমি রুমাল কায়দা করে বাঁধা ।  

 

কোন এক বন্দরে গিয়ে নারকেল পচানো মদ খেয়েছিল সেই গল্প ও বলে।

 

 

লাইট হাউজ কিপারদের খাবার খুব খারাপ দেয় না

যা দেয় সেটা এক বছরে এইরকম-

গরুর মাংস - ২০০ পাউনড

শূয়রের মাংস - ১০০ পাউনড

ময়দা- পেল্লাই এক পিপে ভর্তি

চাল- ২৫ পাউনড

শিমের দানা- ২৫ গ্যালন

চিনি- ৫০ পাউনড 

কফি- ২৪ পাউনড 

ভিনেগার-  গ্যালন 

মাখন - সাড়ে  তিন পাউনড   

আলু -  বুশেল 

 পেঁয়াজ-  বুশেল 

বুশেলের হিসাবটা একটু বিতিকিচ্ছিরি যেমন   বুশেলে  গ্যালন অথবা ৩২  কোয়ার্টস অথবা  বুশেলে ৩৫ .  লিটার অথবা  বুশেলে ৬৪ পা ইন্ট    

এই হিসাবগুলো  দারুণ লাগে   কিশোর ক্লাসিক বইগুলো পড়ে পড়ে এমন অবস্থা হয়েছে,  এই শব্দগুলো শুনলেই  মাথার ভেতরে   বেশ   ঝিনকি    মার্কা একটা ভাব এসে যায়

এই সব ছাড়াও দেয়া হবে চায়ের পাতা আটার নরম বিস্কুট এটার নাম শিপ বিস্কুট জাহাজি বিস্কুট বয়ামে বা টিনের ক্যানেস্তারায় রেখে দিলে সহজে নষ্ট হয় না অনেকটা তক্তি বিস্কুটের মত 

 সামান্য পরিমাণে টম্যাটো আর শুকনো আপেল 

খারাপ না

 

সবাই চলে যায়।

 

 

বাঁধাকপির পুর দেয়া পিঠা খেতে খেতে বাড়ির চিঠি পড়তে বসি।

 

 

একটা নিঃসঙ্গ অ্যালবাসটর পাখি দূরে  উড়ছে  । নোনা বাতাস। পিতলের মত হলুদ রোদ।  সন্ধ্যায় কুয়াশা নামে। রাতের রঙ হয় বেগুনি আর নীল মেশানো কেমন অদ্ভুত একটা রঙের। যেটাকে বলে লায়লা (Lila)  কালার। এই লায়লা আবার আলিফ লায়লা থেকে এসেছে। মানে হাজার রাত্রি !   

 

 

লাইট হাউজে চাকরি করা হয়নি।

 

 কিন্তু আজ জানি  প্রত্যেকটা মানুষই লাইট হাউজ কিপারের মতই নিঃসঙ্গ।

 

 একা।

 

কিন্তু সবাইকে আলো  দিয়ে পথ  দেখানো তার কাজ।

 

 

জীবনটা আসলে অমনই।

 

 

        

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...