খাবার আর পরবাসের বিচিত্র জীবন নিয়ে লেখা শুরু করলেও নামকরা এক পত্রিকার সহ-সম্পাদকের আগ্রহে ভৌতিক - অতিপ্রাকৃত গল্প লেখা শুরু করি অনেকটা ঝোঁকের মাথায় মাথায়।
কানাফকির , হ্যালোইন , অশুভ জন্মদিন ।
তখন বেশ একটা দিন ছিল।
সিডনিতে ক্লিভল্যান্ড স্ট্রীটের ৯/ ২০৯ বাড়িটার কথা মনে নেই ? কত বার না বললাম ? নানান সময়ে, নানান গল্পে । বাড়িটা আজও আমার স্মৃতিতে চুমকির মত ঝিকিমিকি করে।
ওটা বাড়ি না। প্যারালাল জগতের দরজা।
বাইরে যত শীত আর দুধের সরের মত কুয়াশা থাকুক , ভেতরে গেলেই পাওয়া যায় আরামদায়ক আশ্রয়। কাঠের বারান্দা। আড্ডা দেয়ার রুম। কয়েক শো পেইন্টিং। আর রাজ্যের বই।
স্বপ্নের মত একটা কামরা ছিল আমার। ফায়ারপ্লেস। শৌখিন বার।
ওখানেই আড্ডা বসত। অতিথিরা বলতো তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া নানান ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা।
লাল আঙুরের মদিরার পাত্র হাতে নিয়ে শুনতাম সেইসব। চেষ্টা করতাম সেই সব কাহিনির লৌকিক ব্যাখ্যা দেয়ার। আমার বিশ্বাস ছিল- যুক্তির বাইরে কিছুই হয় না ।
আসলে না।
সবই সম্ভব এই খানে।
সত্য হরর কাহিনি- শিরোনামে লেখা হল আরও কিছু গল্প। রাক্ষস, আমাদের বাড়িতে শয়তান থাকে।
আমার শৈশব আর কিশোর বেলা ছিল গহন মায়াবী।
সন্ধ্যাবেলায় খেলার মাঠ থেকে বাড়ি ফেরার পথে দেখি, দূরের বাড়ির জানালার শার্সিতে অস্ত যাওয়া সূর্যের কমলা আলো কেমন শয়তানের চোখের মত ঝিকিয়ে উঠছে।
কুয়াশায় ডুবে যেত চোর কাঁটা মাখা দূরের মাঠ। শুনতাম শেয়ালের ডাক। মনে হত লন্ডন শহরের বুকে হেঁটে বেড়াচ্ছে ওয়্যারউলফ।
নির্জন পথে মস্ত কয়েকটা ঝুপসি কড়ই গাছ। বাড়ি ফেরার পথে নিঝুম এক গলিতে এসে চমকে উঠতাম মাঝে মধ্যে।
একবার দেখি বিশাল এক ঝুপসি কড়ই গাছের নীচে জমে আছে এক গাদা মরা মানুষের খুলি। ভয়াল।
মায়ের কাছে গল্প শুনেছিলাম, নীল কমল আর লাল কমল যখন তেপান্তরের মাঠে যায় তখন তারা দেখতে পায়, এরকমই বাড়ির পাহাড়, সোনার পাহাড় আর মরা মানুষের খুলির পাহাড়। কিন্তু এখানে এ রকম শহরতলির নিঝুম পথে এল কী করে এগুলো!
ভয়ে ভয়ে সামনে গিয়ে দেখি অন্য কিছু। কিছু দূরে বসে তালের শাঁস বিক্রি করে কিশোর এক ছোকরা। দিনের শেষে শাঁসশূন্য তালের খোসাগুলো ফেলে দিয়ে যায় এখানে। শাঁসবিহীন শূন্য তালের খোসাগুলোই আমার কাছে মরা মানুষের খুলি বলে মনে হত।
কল্পনাপ্রিয় মন আমার।
ঝড়ের রাতে টুং টাং করে বেজে উঠত দূরের সাধু পলের গির্জার ঘণ্টা। মনে হত দূর সাগরে মস্ত ঝড় উঠছে । অমন ঝড়ের রাতে সাগরের অতল থেকে উঠে আসে ভয়াল সব দানো।
অথবা কাউন্ট ড্রাকুলা ডিমিটার জাহাজে করে সাগর পাড়ি দিয়ে ইংল্যান্ডে আসছে। সাথে পঞ্চাশটা কফিনের মত বাক্স। বাক্স ভর্তি মাটি।
অথবা ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসছে দূরের কারপেথিয়ান দুর্গ থেকে!
ওরা আসে নিঝুম রাতে আমার প্রথম বই। চেষ্টা করেছিলাম ভিন্ন ধাঁচে হরর গল্প বলার । নিজের মত করে । বাজার চলতি গল্পগাঁথার চেয়ে সামান্য আলাদা মাত্রায়। কত টুকু সফল হয়েছি সেটা পাঠকই জানে।
বইটা অনেক বছর ধরে আউট অভ প্রিন্ট। তবে মায়াকাননের সৌজন্যে আবার এলো।
বাকি সব কিছু আবারও পাঠকের হাতে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন