এক
আমার মা যে এক সময় ছােট্ট একটা মেয়ে ছিল কে জানত? আমিই কি জানতাম নাকি?
জানলাম যখন বাসার ছবির অ্যালবামের মধ্যে মা-র স্কুল জীবনের একটা ছবি পেলাম। তখন।
ছবিটা সাদাকালাে। তাতে মা আর, মায়ের এক বান্ধবী বসা। মায়ের চুলগুলাে পিছন দিকে টেনে বাঁধা। পনি ঘােড়ার লেজের মত। কোলের উপর ধরা ঢাউস একটা বই। কী শান্ত আর সুন্দর দেখতে মা। পুরানাে দিনের। সিনেমার নায়িকাদের মত। যখন নায়িকাগুলাে অযথা ঝাপাঝাপি করত না। |
মায়ের শৈশব কেটেছে একা। আর কোনও ভাই বােন ছিল না মায়ের। মা যখন খুবই ছােট...এই বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তার মা অর্থাৎ আমার দিদিমা পটল তুলেছিল। কতটুকু পটল তুলতে পেরেছিল তা অবশ্য আমি জানি না। বাধ্য হয়ে মা-র ছােট্ট বেলা কেটেছে তার ঠাকুরমার কাছে। ঠাকুরমা ভালই ছিল। তবে মা-কে দিয়ে প্রচুর কাজ করাত। নিজে খুব। নিজে খুব একটা কাজ করতে চাইত না। আর তার রান্না ছিল খুবই বিচ্ছিরি। প্রচুর ঝাল দিত। তখন ইলিশ মাছ সস্তা ছিল। পুরাে ইলিশের মৌসুমটা প্রত্যেক দিন ইলিশ মাছ রান্না করত বাসায়। বিরক্তিকর।
রান্না হত পাটপাতার ঝােল, কলমি শাকের ঝােল, চালতার ডাল। হাতের তালুর মত বড় পুঁটি মাছ ভাজা । অথবা ঝােল। এত ঝাল! খেতে কষ্ট হত মার। উপায় কী? খাওয়া নিয়ে অভিযােগ কার কাছে করবে?
. তবে প্রায় বিকেলে মা তার বাবার সাথে হাঁটতে বের হত। তখন রাস্তা-ঘাট ছিল সুন সান। নীরব। কতদূর চলে যেত বাবা আর মেয়ে। শেষে একটা মিষ্টির দোকানে বসে দই আর মিষ্টির অর্ডার দিত দাদু মার জন্য। অনেক সময় নিয়ে মা পাখির মত অল্প অল্প করে খেত দই-মিষ্টি। তারপর আবার হেঁটে বাড়ি ফিরত দুজন।
পথে কত দোকানপাট। ছিট কাপড়ের দোকান । বাহারি জুতার দোকান। একটা দোকান ভর্তি আলতা, চুড়ি আর লেইস ফিতা। চারকোনা বােতল ভর্তি সুগন্ধি তেল। চিনি, গুড় আর হীরার খনির মত মিছরির দোকান। মায়ের বয়স মাত্র চার বছর। দাদুর হাত ধরে সেগুলাে দেখতে বাড়ি ফিরত দুজন।
রেল লাইনের পাশে ছিল বড় এক মসজিদ। মসজিদের দেয়ালে ছােট ছােট চিনামাটির টাইলসের কারুকাজ।
মা ভাবত অনেকগুলাে চিনামাটির পেয়াল আর তশতরী ভেঙে পরে দেয়ালটা বানিয়েছে রাজ মিস্ত্রীরা। । মসজিদের পাশে বড় একটা রুটির | দোকান। এর সামনে দিয়ে গেলেই চমৎকার একটা ঘ্রাণ পাওয়া যেত। শীতের বিকেলে মা অবাক হয়ে দেখত ভিতরে ডালিমের দানার মত গনগনে কয়লার আগুন জ্বলছে। একটা রােগা পটকা লােক ব্যস্ত -সমস্ত ভঙ্গিতে কাজ করছে। লম্বা বৈঠার মত একটা কাঠের টুকরাে করে আগুনের কুণ্ডের ভিতরে রুটি রাখছে একটার পর একটা।
বিশাল এক একটা রুটি। নরম। কী মিষ্টি ঘ্রাণ । আর স্বাদ। দাম মাত্র দশ আনা। শীতের সন্ধ্যাগুলােতে ফেরার পথে ঢাউস এক পাউরুটি নিয়ে বাড়ি ফিরত দুজন।
রাস্তাঘাটগুলাে সন্ধ্যার পর ভূতের গলির মত হয়ে যেত। ঘণ্টাখানেক পর টুংটাং ঘন্টা বাজিয়ে চলে যেত দু'একটা রিকশা। শেয়ালের ডাক শােনা যেত দূরের ঝােপঝাড়ে। কুয়াশা পড়ত তখন খুব। নীল রঙের। আর মিষ্টি একটা ঘ্রাণও থাকত কুয়াশাতে।
তখন চায়ের চল খুব একটা হয়নি। এখনকার মত দশকদম পর পর চা-য়ের দোকান তখন কল্পনাও করতে পারত না মানুষ। অনেকের কাছেই চা ছিল বিলাসিতা। টাকা গরম পানিতে গুলিয়ে চুকচুক করে খাবার মতই।
কিন্তু মায়ের বাড়িতে চা চলত বেশ। চায়ের স্বাদ মা প্রথম পেয়েছিল কলকাতা হাওড়া ইস্টিশনে গিয়ে। মাটির ভাঁড়ে করে কলকাতায় চা দিত সে সময়। শুধু মাত্র ভাঁড় সগ্রহের লােভে চা খেত মা।
শীতের সন্ধ্যায় মাটির চুলাতে চা বসাত একটা মায়ের ঠাকুরদা। সে সময় বু-ক্রস' নামে একটা কনডেন্সড মিল্ক খুব চলত। সেটাই আনা হত বাসায়। প্রচুর কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে খাকি রঙ বানিয়ে চা খেত দাদু আর নাতনি। বাইরে ঝুম ঠাণ্ডা। শরীরে চাদর জড়িয়ে চুলার পাশে
ওমের জন্য বসে থাকত ছােট্ট মা আমার । | হয়তাে ভাবত তার মায়ের কথা! কোথায় গেল এক রত্তি মেয়েটাকে ফেলে! মেঘের
পাড়ের দূর কোনও দেশে?
বাড়ির বাইরে ছিল অনেকগুলাে বাঁশ ঝাড়। সারা রাত ধরে শনশন করে অদ্ভুত এক শব্দ হত । অপার্থিব। ভয় পেত মা। বুড়ি ঠাকুর মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাত।
শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠেই পেত বুড়ি ভর্তি কমলা। মায়ের কাছে শীত মানেই কমলা। কমলা খেয়েই শীতের সকালগুলাে পার করে দিত মা।
মজার ব্যাপার হচ্ছে মাত্র তিন বছর বয়সে মা-কে নিয়ে স্কুলে ভর্তি করা হলাে। ব্যাপারটা হয়তাে শিশুশ্রমের পর্যায়ে পড়ে যায় (মজা করলাম) কিন্তু উপায় ছিল না। বাড়িতে মা আর বুড়ি ঠাকুরমা একা। আর কোনও বাচ্চা-কাচ্চা নেই। কাজেই স্কুলে গেলে খেলার সাথী পাবে এমন মনে করেই এ কাজ করা হলাে।
কাজের কাজ হলাে সেটা। স্কুল জীবন খুবই মজা লাগল মায়ের কাছে। অনেকখানি হেঁটে স্কুলে যেতে হত। কুছ পরােয়া নেই। তাই যেত মা। ছুটি হলে অপেক্ষা করত গেটের বাইরে। ঠাকুরমা গিয়ে নিয়ে আসত।
কালাে কুচকুচে স্লেট-পেনসিল কিনে দেয়া হলাে। নতুন এক জোড়া স্যাণ্ডেল। স্কুল থেকে ফ্রি পাওয়া গেল সবুজ সাথী টাইপের বই।
আরেকটু বড় হতেই দুটো বাঁধানাে খাতা। স্কুলের বাইরে হরেক পদের খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত ফেরিওয়ালারা, আচারওয়ালা, ইসক্রিমওয়ালা, আর হাওয়াই মিঠাইওয়ালা।
বড়সড় একটা কাঠ আর কর্কশীট দিয়ে বানানাে পেটি ভর্তি থাকত আইসক্রিম। দুধ মালাই ১ আনা করে। মনমাতানাে দুধের স্বাদ।
সাথে কিশমিশ দেয়া। রঙিন আইসক্রিম ২ পয়সা করে ।
সাদা, লাল আর মাখন রঙা। আর পাওয়া যেত চকবার। ২ আনা করে।
আচার ভাল লাগত না মায়ের। বদলে । পছন্দ করত 'গােলগােল্লা'। ময়দার তৈরি মিষ্টি একটা গােলাকার জিনিস। ডুবাে তেলে ভাজা।
দারুণ। তা ছাড়া গােলগােল্লার বড় সুবিধে এই যে মাত্র একটা গােলগােল্লা খেতে খেতেই বাড়ি পৌঁছে যাওয়া যেত সহজে।
সে তুলনায় হাওয়াই মিঠাই বড় ঠক পড়ে যায়। এক আঁটি ১ আনা করে। মিঠাইওয়ালার সামনে থাকে একটা মেশিন। যেটাতে চিনির মিহি গুড় দিয়ে মেশিনটা চালু করলেই জালের মত জমা হতে থাকে মিঠাইগুলাে। । হাত দিয়ে তুলে আটি বানিয়ে ফেলে মিঠাইওয়ালা।
সাদা আর গােলাপি । মেঘের দলা যেন এক একটা। ইয়া বড়। কিন্তু মুখে দিলেই ফুস। একটা খেলে পােষায় না। আরেকটা কিনতে হয়। আমার ছোট্ট মায়ের কাছে অত পয়সা কই? আমিও তো তখন নেই ধারে কাছে!
বরং ১ আনা দিয়ে হাতি-ঘােড়া বিস্কুট কেনা যেত অনেকগুলাে। মােট ১৬টা বিস্কুট পাওয়া যেত। দোকানে কাচের বিশাল বয়ামে
ভর্তি থাকত সেগুলাে। বুড়াে এক দোকানদার বসে বসে ঝিমুত। মা গিয়ে চকচকে নক্ষত্রের মত একটা ১ আনার মুদ্রা দিয়ে বলত, দাদু, বিস্কুট দ্যান।
দাদু ১৬টা বিস্কুট দিলে মা ভাল করে দেখত একই রকম বিস্কুট দুটো পড়েছে কিনা! নানান জীবজন্তুর ছাপ দেয়া ছিল সেগুলাে। করে। হাতি, ঘােড়া, বাঘ, মাছ, পাখি, জিরাফ, হনুমান ...
একই রকম দুটো জন্তু বা জানােয়ার পড়ে গেলে মা অনুরােধ করত দাদু, এটা বদলে দ্যান।'
মাঝে সাঝে বিরক্ত হত দোকানদার দাদু। কারই বা ভাল লাগে ঝিমুনি বাদ দিয়ে নতুন করে বিস্কুট খুঁজে দিতে। ঢাউস কাচের বয়ামটা এগিয়ে দিতেন মায়ের সামনে। বলতেন, 'তুই বাইচছা ল।'
. মা চটপট বেছে নিত পছন্দের জীবজন্তু বিস্কুটগুলাে। দোকানি আবার ঝিমুচ্ছে।
ইচ্ছা করলেই মা দু'চারটে বিস্কুট বেশি নিতে পারে। পাওয়া যেত চকবার। ২ আনা করে।
কিন্তু এ সময়ই মায়ের ভিতরে সততা চেপে বসে বেশি করে। আস্তে করে বলে, 'দাদু, দুটো বিস্কুট বেশি দ্যান।'
আবার ঝিমুনি ভেঙে যেতে যারপর নাই বিরক্ত হন দোকানি। বলেন, 'নেহ।' দুটো অতিরিক্ত বিস্কুট নিয়ে কাগজের ঠোঙা ভর্তি করে বাসায় ফিরত মা। দুই বেণী | ঝুলিয়ে।
দুই
ইস্কুল থেকে ফিরে আবার কাজ করতে হত মাকে। ঘর ঝাড় দেয়া, থালা বাটি ধােয়া, আরও হাজার কাজ। চার বছরের একটা ছােট্ট মেয়ের জন্য একটু বেশি বটে। কিন্তু সেটা বলবে কে? মায়ের বাবা সারাদিন বাইরে জীবিকার জন্য। ঠাকুর দাদাও তাই। বুড়ি ঠাকুরমা অলস আগেই বলেছি। সন্ধ্যার পর পড়তে বসত মা। কমলা আলাে জ্বলত হারিকেনে। শ্লেটে বসে বসে লিখত মা আমার। দুই তিনদিন পর পর কালাে কয়লা দিয়ে আচ্ছামত মেজে ঘষে নিত সেটা। এতে আরও কালাে কুচকুচে হয় স্লেট ।
লিখতে ভাল লাগে।
সন্ধ্যার পর একা বসে বসে পড়ত মা। বাইরে ঠাকুরমা আড্ডা মারছে প্রতিবেশী মহিলাদের সাথে। হেনতেন কত কী! এই সময়টাতে বেশ ভয় ভয় লাগত। নানান ধরনের ভূতের গল্পগুলাে মনে পড়ত একটা একটা করে। হারিকেনের আলােতে চারপাশে বড় বড় ছায়া পড়ত। এমনকী নিজের ছায়াটাকেও অচেনা মনে হত তখন। মনে হত মাচার উপর
ঘাপটি মেরে বসে আছে অচেনা দানো প্যাচার ডাক, বেড়ালের কান্না, ওহ্!
ওদিকে বাইরে বুড়ি : আড্ডা মারছে তাে মারছেই। মা বাইরে গেলেই খেকিয়ে উঠবে সে। তবে এর কিছু পরই দাদু আসত বাজার নিয়ে। আরও একটু বেশি রাতে করে ফিরত বাবা। ভয়গুলাে কোথায় পালাত তখন!,
ইস্কুলে যেটা ভাল সেটা হচ্ছে দিদিমণিগুলাে ভাল। যত্ন করেই পড়া দিত। এখনকার মত মােবাইল ফোনে গেইম খেলত না দিদিমণিরা। আর মাঝেমধ্যেই উপহার পাওয়া যেত। যেমন-একবার দেয়া হলাে। প্যাকেট ভর্তি আটটা করে খেজুর। বুড়াে আঙুলের সমান, বড় বড়। মনে হয় গুড়ের ঢেলা। আর একবার এল গুড়াে দুধ। তখন সবাই বলত বিলাতি দুধ। আজকাল যেমনঅনেক উজবুক টমেটোকে বলে বিলাতি বেগুন | সে রকমই।
স্কুলে টিফিন পিরিয়ডে গুঁড়াে দুধ দেয়া হচ্ছে। মাও গিয়ে দাঁড়াল লাইনে। দিদিমণি জিজ্ঞেস করলেন, ‘নিবি কীভাবে?
. তাই তাে! কী করা!
বড় ক্লাসের একটা মেয়ে দেখিয়ে দিল কীভাবে একটা টুকরাে কাগজ, কায়দা করে দিয়ে বন্ধ করে মােচড় দিলেই সেটা একটা কোণ’ হয়ে যায়। আর সেটাতে ভর্তি করে নেয়া যায় তুষারের মত গুড়াে দুধ।
স্কুল ছুটির পর চোঙা ভর্তি মানে কাগজের কোণভর্তি গুঁড়ো দুধ নিয়ে হাঁটা ধরল মা বাড়ির দিকে। অর্ধেক উড়ে গেল বাউ কুড়ানি বাতাসে। সেগুলাের লােভে পিছন পিছন আসতে লাগল ডাইনােসরের একটা বাচ্চা। মানে বিশাল একটা কুকুর আর কী!
দিনগুলাে ভাল যাচ্ছিল মায়ের।
একদিন স্কুলের বাইরে দেখা গেল আজব একটা লােককে। লােকটা রােগা চিমসে ধরনের। মাথায় লাল গামছা বাধা। ঢােলা একটা ফতুয়া পরনে। লােকটার সামনে সিন্দকের মত কাঠের বড় এক বাক্স। তাতে
জাহাজের জানালার মত অনেকগুলাে গােল গােল কাঁচের জানালা। সেগুলােতে মুখ-চোখ ঠেকিয়ে ছেলে-মেয়ের দল কী যেন দেখছে। আর লােকটা সুর করে ছড়া কাটছে
আগ্রাকা তাজমহল দেখ।
বান্দর কা নাচ দেখ।।
কী সুন্দর দেখা গেল...'
মা বুঝতে পারল বায়স্কোপ।।
এত ভিড়। সবাই দেখছে। এক আনা করে । এক আনা অনেক পয়সা।
বায়স্কোপ দেখতে গেলে খাওয়ার জন্য কোন পয়সা থাকবে না । মনটাই খারাপ হয়ে গেল মায়ের । আগেই বলেছি - আমি সেই সময় ছিলাম না ।
কিন্তু বায়স্কোপের ভূতটা মাথা থেকে গেল না মায়ের। কী আছে সেই রহস্যময় বাক্সের ভিতরে?
পরদিন চিমসে লােকটা রহস্যময় বায়স্কোপের বাক্স নিয়ে আবার এল। সুর করে ছড়া (নাকি গান?) কাটতে লাগল। আজও দারুণ ভিড় হলাে। কাচ্চা-বাচ্চা, ছেলে-বুড়াে সবাই ঠেলাঠেলি করে দেখছে কাচের গােল
জানালাতে মুখ ঠেকিয়ে। একটা শাে শেষ হলেই মুড়ির টিনের ঢাকনা দেয়ার মত ঢাকনা কায়দা করে দিয়ে বন্ধ করে ফেলছে জানালাগুলাে ।
লােকটা ভারি বজ্জাত। এক চিলতে ফ্রি দেখার উপায় নেই কারও। মাত্র ১ আনা পয়সার জন্য দেখা হচ্ছে না অপার্থিব এই জিনিসগুলাে। ঢাউস বাক্সের ভিতরে আরেক ডাইমেনশন। রহস্যপুরী। বাতাসে।
ছাড়া প্রতিদিন ১ আনা পয়সা হাতেও থাকে না মায়ের। দু'একবার চেষ্টা করেছিল বান্ধবীদের সাথে মাত্র কয়েক সেকেনডের জন্য ফ্রি দেখা যায়
: কী না! মাত্র কয়েক সেকেণ্ড হলেই চলবে।
: ব্রেনের কোষে কোযে থেকে যাবে সৈগুলাের চিরস্থায়ী ছাপ।
কিন্তু বান্ধবীগুলােও বড় স্বার্থপর।
কয়েক সেকেন্ডের জন্যও ওরা ছাড়তে চায় না কাঁচের জানালাগুলাে। শেষে এক সপ্তাহ পর নিজেকে আর বঞ্চিত করতে পারল না মা। টিফিনে কিছু না খেয়ে ১ আনা পয়সা তুলে দিল চিমসে বায়স্কোপওয়ালার হাতে। আজ বড় খুশির দিন মায়ের।
অধীর আগ্রহে চোখ রাখল কাচের জানালাতে। উত্তেজনায় চোখ দুটো খোসা ছাড়ানাে সেদ্ধ ডিমের মত বড় বড় হয়ে গেছে।
শুরু হলাে অনুষ্ঠান।
ক্যানক্যানে গলায় ছড়া কাটতে শুরু করল বায়স্কোপওয়ালা।
কি একী?
কোথায় সেই বুড়িগঙ্গার ইসটিমার?
কোথায় মতিঝিলের শাপলা? লওনের ঘড়ি? তাজমহল ?
ভিতরে কাগজের উপর রঙিন ছবি সাঁটানাে! ব্যস! এই-ই। চিমসে লােকটা
হ্যান্ডেল ঘুরাচ্ছে। ছবিগুলাে একটার পর একটা দ্রুত চলে যাচ্ছে। আর কিছু না! কিন্তু এর চেয়ে সুন্দর সুন্দর ছবি তাে মায়ের বাসায় দেয়ালে আঠা দিয়ে সাঁটানাে আছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল মায়ের। বাচ্চা শিশু আহাদে বেলুন নিয়ে খেলার সময় আচমকা বেলুন ফেটে গেলে যেমন হয়, তেমনই হলাে।
সেদিন শুকনাে মুখে বাড়ি ফিরল মা। .জীবনে আর কখনওই দেখেনি বায়স্কোপ!
তিন
সকাল বেলা তা শীতই হােক বা গরম, বেতের ছােট্ট একটা ঝুড়ি নিয়ে ফুল তুলতে যেত মা। তখনকার দিনে প্রায় সব হিন্দু বাড়িতেই ফুলের বাগান থাকত। ফুল নিতে গেলে তেড়ে মারতে আসত না কেউ।
মা ফুল সংগ্রহ করত। কত পদের, ফুল গাছ-বােতাম ফুল, সূর্যমুখী,
ডালিয়া, নয়নতারা, কলাবতী, দোপাটি, লিলি, গাঁদা, উঁইচাপা, দোলনচাপা, রজনীগন্ধা, কদম, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচুড়া।
পুকুর ভর্তি সাদা সাদা শাপলা। অন্য গাছপালাও কি কম নাকি? রঙ বেরঙের পাতাবাহার, গীমাশাক, সুমুনি শাক, লজ্জাবতী
গাছ, শ্যামালতা, বনমেথি, টাকা পাতা, বন , পালং, বনতুলসী, আরও কত কী!
মায়ের মজা লাগত এক ধরনের ক্যাকটাস গাছ দেখে। সবুজ নানরুটির মত। তাতে কাঁটা ভর্তি। আরেকটা ক্যাকটাস গাছ তাে দারুণ।
মনে হয় কেউ তাকে ' হ্যান্ডসআপ' বলেছে,
সে হাত দুটো আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে তুলে দাঁড়িয়ে আছে!
দারুণ না?
সেই ছােট্ট বেলাতেই মা গাছপালা বিশেষজ্ঞ হয়ে গিয়েছিল। (ইচ্ছা করলেই নার্সারির ব্যবসা শুরু করতে পারে মা এখন!) .
নতুন ক্লাসে উঠতেই মায়ের একজন মাস্টার দরকার হয়ে পড়ল। যিনি অন্তত অংক আর ইংরেজিটা একটু বুঝিয়ে দিতে পারবেন।
বাবা আর ঠাকুরদা ফিরত অনেক রাতে।
অনেক রাত মানে রাত আটটা কি নয়টা। সে সময় অনেক রাত। এখন তাে ক্লাস থ্রি বা ফোরের একটা পুঁচকে বাচ্চাও রাত এগারােটার
সময় টিভির সামনে বসে। ক্ষুদে নর্তক আর গায়ক কম্পিটিশন দেখে, বা 'কৌন বনেগা ভগ্নিপতি’ টাইপের অনুষ্ঠান দেখে। তখন সে সব হবার জো ছিল না।
তা ছাড়া বাড়ির মানুষের কাছে পড়াও হয় না সে রকম। আদরের আতিশয্যের কারণেই।
কাজেই মায়ের ঠাকুরদার এক বন্ধু জীবন বাবুর কাছে লেখাপড়া শুরু হলাে মায়ের। জীবন বাবুর বাড়িতে যে জিনিসটা প্রথমেই মাকে মুগ্ধ
.করল তা হচ্ছে কলের গান। অদ্ভুত একটা যন্ত্র।
সাথে সেঁটে আছে সন্ধ্যা মালতী ফুলের মত দেখতে বিশাল একটা পিতলের চোঙ। বড় বড় কালাে রুটির মত রেকর্ড। সেগুলাে চড়িয়ে
দিয়ে পিন বসিয়ে দিলেই পিতলের চোঙ দিয়ে গান বের হয়। এ সব আবার কী?
কোথায় পাওয়া যায় এই সব বিচিত্র জিনিস? জীবন, বাবুর বাসায় পড়তে গেলেই দেখা যেত ভদ্রলােক ইজি চেয়ারে বারান্দাতে বসে আছেন। বাইরে গাছপালার ঠাসবুনট।
ভিতর থেকে কলের গান ভেসে আসছে..কত দিন দেখিনি তােমায়...'
প্রচুর গানের রেকর্ডে ঠাসা ছিল জীবন
বাবুর বাসা। তার মেয়ে কলকাতা থেকে পাঠাত প্রতিমাসেই নিত্য নতুন রেকর্ড।
আরেকটা অবাক করা জিনিস হচ্ছে, কাঠের বড় একটা দেয়াল ঘড়ি। ইয়া বড়। টক টক্ করে কাটাগুলাে চলছে। ভিতরে হাতের কাঁটা মুঠোর মত বড় একটা দোলক দুলছে অল্প ভর্তি। প্রত্যেক ঘণ্টায় পিলে চমকে দিয়ে সেটা ঠন ঠন করে বেজে উঠত। ঘড়িটার দাম নাকি সাত টাকা।
মাগগো মা।
এই প্রথম মা বুঝতে পারল তারা অনেক, অনেক, অনেক গরিব। মনটা .
খারাপই হয়ে গেল তার।
জীবন বাবুর বাড়িতে অদ্ভুত আর দুর্লভ সব জিনিসের ছড়াছড়ি। যেমন কাঁচের বড় এক গােল্লা। ভিতরে রঙিনফুল। রঙের ফোঁটা দিয়ে
বানানাে। জিনিসটা আসলে পেপার ওয়েট। কী ভারি। হাত থেকে পড়ে গেলে বুড়াে আঙুল থেতলে যাবে। রান্নাঘরে পিতলের দারুণ একটা চুলা। ঝকমক করছে স্পেসশিপের মত। কেরােসিন দিয়ে পাম্প করলেই সুন্দর : নীলরঙের আগুন জ্বলে। মায়ের বাসায় মাটির
তিনটে নাকওয়ালা চুলা। বেহায়ার মত হাঁ করে থাকে। ওখান দিয়েই কাঠ আর কয়লা দিতে হয়। রান্নার সময় ধােয়া। খুবই কষ্ট হয় রান্না করতে ছােট্ট আমার মায়ের। ও রকম একটা পিতলের চুলা কেনা যায় না? নীল রঙের আগুন জ্বলবে। আগুনটা কত ভদ্র! একটু ধােয়া বের
হয় না। মা ঝটপট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে হাতে হাত টাকা হলে সে নিজেই কিনবে এমন একটা চুলা।
জীবন বাবু নিজের মেয়ের মতই যত্ন করে মাকে লেখাপড়া শেখাতেন। সন্ধ্যাবেলা পড়া শেষ হবার পর তার বাড়ির লােকজন অনেক
সময় খাইয়ে দিত মাকে। বেশিরভাগ সময় পিঠা পায়েস জাতীয় কিছু একটা।
সেই সময় একা একা হেঁটে বাড়ি ফিরত মা। বাইরে ধূসর অন্ধকার। দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকত মা।
একবার বর্ষাকালে হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় সাপের গায়ে পা দিয়ে ফেলছিল মা। বাড়ির কাছটাতে রাস্তাঘাটে বেশ জল জমে ছিল। আর ছিল কতগুলাে ছিন্নমূল কচুরিপানার তূপ। বেতফলের মত অন্ধকার জায়গাটা। । দ্রুত হাঁটছিল মা। হঠাৎ করেই পায়ের তলায় চাপা পড়ল পৃথিবীর আদিম কুৎসিত প্রাণীটা।
সড়াৎ করে চলে গেল সেটা। ভাগ্য ভাল মায়ের। দৌড়ে বাড়ি ফিরল ছােট্ট মেয়েটা বই খাতা বুকে চেপে। ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে
তার। সে রাতে ভয়ে ভয়ে কাটল মায়ের।
কোথায় যেন শুনেছিল ব্যথা পাওয়া বা আহত সাপ রাতের বেলা বাড়িতে এসে কামড়ে প্রতিশােধ নিয়ে যায়! বাপস, কী ভয়ঙ্কর! বেশ
অনেকগুলাে দিন ভয়ে কেটেছিল মায়ের।
চার
দিন কেটে যায় স্বপ্নের মত। ঝরা শিশিরের মত দেখি রাত আসে। ঋতু বদলায়। শীত, গরম, বর্ষা যায়। মা যখন ক্লাস ফোরে উঠল তখন টুক
করে মরে গেল তার বাবা। চমৎকার! কে যেন বলেছিল, ঈশ্বর যা করেন ভালর জন্যই ত করেন। ভদ্রলােককে একলা কোনও নির্জন রাস্তায়
পেলে দেখাতাম মজাটা! এই সব কি ঈশ্বরের ভাল করার নমুনা? আর ভাল কাজগুলাে তিনি বেছে বেছে শুধু একজনের জন্যই করে থাকেন ?
ছােট্ট মা আমার বুড়াে ঠাকুরমা আর ঠাকুরদা-র কাছে বড় হতে লাগল। বাবাকে নিয়ে তার কত স্মৃতি ! শীতের সন্ধ্যাগুলােতে বাবার
হাতে হাত ধরে কত দূর পর্যন্ত হেঁটে যেত মা। কত কিছু দেখে বাড়ি ফিরত!
একটা বড় ছাপাখানার সামনে গিয়ে অবাক হয়ে দেখত, ভিতরে
কাকের পালকের মত আধাে আলােছায়া।
একজন বুড়াে কাজ করছে। চোখে ভারি পাওয়ারের চশমা। চশমার জন্য চোখ দুটো দুই টাকা দামের রসগােল্লার মত বড় বড় দেখাচ্ছে। লােকটার সামনে বড় একটা বাক্সের মত। | অনেকগুলাে খােপ তাতে। সেই খােপগুলাে ভর্তি সীসের অক্ষর। ব্যস্ত হাতে লােকটা অক্ষরগুলাে নিয়ে ব্লকের মধ্যে বসাচ্ছে। দ্রুত। : ঝাপাক! ঝাপাক শব্দ করে কতগুলাে কাগজে কী সব ছাপা হচ্ছে।
আরও একটু দূরে অনেকগুলাে বই বাধাইয়ের দোকান। কতগুলাে মহিলা, পুরুষ কাজ করছে সেখানে। পুরানাে ল্যাগব্যাগে ছেঁড়া
বইগুলাে অনেক যত্ন করে সেলাই করে বাঁধাই করে দেয় তারা। খুবই মজবুত হয়। খরচ মাত্র আটআনা। মানে ৫০ পয়সা।
বাবার হাত ধরে দুই পাশের অবাক পৃথিবীটা দেখে বাড়ি ফিরত ছােট্ট মা আমার।
মাঝে মাঝে রাস্তা থেকে সেদ্ধ ডিম কিনে খাওয়া হত। গরম ডিমটা অর্ধেক করে ভিতরে দেয়া হত অচেনা স্বাদের লবণ (আসলে বিট লবণ)
আর জাফরানী রঙের ঝাল মসলা।
এক শিশি রক্তরঙা আলতা, চুলের ফিতা আর সুগন্ধি একটা চিরুনি নিয়ে বাড়ি ফিরত দুজন।
বাবা মারা যাবার পর দিনগুলাে কষ্টে কাটল আমার মায়ের। সেগুলাে বলার দরকার দেখি না।
দুঃখগুলাে অনাদরে থেকে মরচে পড়ে যাক। সুখ থাকুক যত্ন করে স্মৃতির আলমারিতে তােলা। বুড়ােবুড়ি দু’জন পাখির ডানার মত
ভালবাসা দিয়ে জড়িয়ে রাখত আমার ছােট্ট
মাকে। মা একা একা রান্না করত, পড়াশুনাা করত আর চমৎকার সেলাই করত রঙ বে রঙের সুতাে দিয়ে। একটুকরাে ফেলনা কাপড় আমার মায়ের হাতে পড়লে সেটা হয়ে যেত ইন্দ্রের সভার সিংহাসনের কুশন।
| ক্লাস সেভেনে উঠতেই কলম পেল মা দাদুর কাছ থেকে। সাথে এক দোয়াত কালাে কালি। তিন চারটে বাহারি কলম ছিল মায়ের।
এই সময় দাদু মায়ের জন্য কিনে দিল একটা
রূপকথার বই। নাম-রাক্ষসের মায়াপুরী। | প্রচ্ছদে দাঁত বের করা ভয়াল এক রাক্ষস। এই বইটাই বদলে দিল মার চিন্তা-চেতনা'। বলা :
দরকার-মায়ের কাছ থেকে আমি পেয়েছিলাম- একেবারে ছেলে বেলাতে। সেখান থেকেই আজকে আমি এখানে ' মানে :
আপনাদের সামনে । মা চাইত আমি লিখি। তাই ।
ক্লাস সেভেনে স্কুলের বেতন ছিল সাড়ে সাত টাকা, যা দেয়া ছিল খুবই কষ্টের! আমার মনে হয় কাহিনিটা ক্রমাগত কষ্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শেষ করে ফেলি এই সব কষ্ট। | কী বলেন?
ক্লাস টেনে ওঠার পর মায়ের বিয়ে হয়ে গেল আমার বাবার সাথে। আমার ঠাকুরদা মানে বাবার বাবা মা-কে দেখে পছন্দ করেছিল
ছেলের বউ হিসাবে।
তাে, মায়ের বয়স তখন মাত্র চৌদ্দ ।
আজ কাল হলে আমার বাপকে বাল্যবিবাহের অপরাধে জেল খাটতে হত। সেটা বোধহয় মজার হত।
আমি কল্পনায় দেখতে পাই আমার বাবা জেলখানাতে লােহার গারদ ধরে হাপুস নয়নে কাঁদছে। তার নাক দিয়ে সিকনি’ মানে সর্দিও ঝরে পড়ছে কান্নার সাথে সাথে।
হাঃ হাঃ হাঃ।
যাকগে। তাদের প্রথম সন্তান হলাম, এই আমি।
মায়ের কাছ থেকে আমি পেয়েছি, জেদী মনোভাব। সৎসাহস আর সব ফ্যান্টাসীকে বাস্তব করার জন্য প্রবল ইচ্ছাশক্তি। আজ আমি জীবিকার জন্য পৃথিবীর সব প্রান্তে ঘুরে বেড়াই। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ হতে আফ্রিকার গহীন অরণ্যে। কখনও বরফে ছাওয়া নরডিক দেশ । কখনও ভিন্ন কোন মহাদেশে ।
মনটা পড়ে থাকে মায়ের কাছেই।
কারণ আমার মা আমার কাছে এখনও ছোট্ট একটা মেয়ে।
[উৎসর্গ মাকে, এ ছাড়া আর কাকে?]

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন