সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ছোট্ট নদী কত দূরে ?

 পাহাড়, জঙ্গল বা সমুদ্রের কাছাকাছি থাকলে মনে হয় প্রকৃতির সাথেই আছি

বেশ ভাল লাগেছোটবেলা বা যুবক বয়সে দেখেছি অ্যাডভেঞ্চারের ঘ্রান আমাকে অচেনা

পথে ডাকেপরবর্তীতে প্রায়ই সেটা স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকেপ্রকৃতির কাছা কাছি হাঁটলে জীবন সম্পকে ধারনা অনেক পরিস্কার হয়

 আমি ছিলাম  ছোট্ট বালকআমার  আর নদীর মাঝখানে ছিল পাহাড়

সেটা ছিল আমার পিচ্চিবেলাআমি পিচ্চিনদী পিচ্চিকিন্তু পাহাড়টা বিশাল

ঘন পাহাড়ি বন নদীটাকে প্রায় লুকিয়ে রেখেছিলকিন্তু আমি জানি ওটা কোথায় আছেআর দেখতে কেমন

নদীটাকে কখনই নিজের চোখে দেখিনিতাতে কি? গ্রামের লোকজনের কাছে ওর অনেক গল্প শুনেছিনদীর জল-জলের মাছ- পাথর- স্রোত, সব সব শুনেছি আমি

শুধু মাত্র নদীর জলটাকে হাত দিয়ে স্পর্শ করলেই ব্যক্তিগত ভাবে নদীটাকে চিনে ফেলব

 এক সকালে  বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম

ওখানে উপত্যাকা , ঘন জঙ্গলপারে নদী

আমার পা থাকতো খালিএর মানে না আমার ভাল কোন জুতা নেইআছে

তারপরও খালি পায়ে অন্য রকম আনন্দ পেতামবেশ বাঁধন ছেঁড়া মনে হত

খালি পায়ে গরম পাথর আর ঠাণ্ডা ঘাসে পা দিলে অচেনা এক অনুভূতি হত

তা ছাড়া জুতা মোজা পড়াও বেশ ঝাঁমেলা

তখন সকাল এগারটা বাজে

বাবা মা শহরে গেছেনবাবার কোন এক বন্ধুর বাড়িতে

সন্ধ্যার আগে ফিরবেন না

 ইচ্ছা করলেই  বাইরে যেতে পারি ।  ঘরে পাউরুটি আছেসাথে করে নিয়ে

যেতে পারিযাওয়ার পথে বুনো ফল পাকুড় পেতে পারি, ভাগ্যে থাকলে

এই রকম সুযোগের জন্য অপেক্ষা করছিলাম বোধ হয়

একবার হারিয়ে গেলে আর পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবেঅন্ধকার হবার আগে

যদি ফিরে আসতে পারি বাবা- মা মোটেই জানতে পারবে না আমি কোথায়

গিয়েছিলাম

বাড়ির ভেতরে ঢুঁকে পাউরুটিটা খবরের কাগজ দিয়ে যত্ন করে প্যাচিয়ে

নিলাম

তারপর বাসার সব দরজা জানালা ভাল মত বন্ধ করলাম

 উপত্যাকার পাশ দিয়ে সরু পথটা গেছেগির্জার চূড়ার মত সরু পথ

পথটা কেউ বানায়নিপায়ে হেঁটে হেঁটে হয়েছেগ্রামের বাসিন্দারা , কাঠুরেরা, গোয়ালারা,

মেষপালকরা আর খচ্চরের গাড়োয়ানরা আসা যাওয়া করে এই পথ ধরে

পাহাড়ের গোঁড়ায় বা নদীর পাড়ে কোন গ্রাম নেই

একজন কাঠুরের সাথে দেখা হতেই জানতে চাইলাম- নদীটা কত দূরে

 

লোকটা বেঁটে আর গাঁট্টা গোঁটটামুখ ভর্তি অসংখ্য ভাঁজশরীর ভর্তি মাংসের

পেশিগুলো টোবলা টোবলা হয়ে আছে

'সাত মাইল' জবাব দিল কাথুরে'কিন্তু জানতে চাইছ কেন ?'

'আমি ওখানে যাচ্ছি'জবাব দিলাম

'একা ?'

'নিশ্চয়'

"তিন ঘণ্টা লাগবে ওখানে যেতেআর ফিরতে ফিরতে চারিদিক অন্ধকার হয়ে যাবে

আর রাস্তাটা কিন্তু মোটেও সহজ না'

"কিন্তু আমি ভালই হাঁটতে পারি ' জবাব দিলাম

ভাবলাম বাসা থেকে ইস্কুলে যেতে রোজই তো দুই মাইল হাঁটিএ আর এমন কি

কাঠুরে ভদ্রলোককে ছাড়িয়ে হাঁটতে লাগলাম।  

পথটা ছিল আসলেই খুব বিচ্ছিরিদুই বার আছাড় খেলামগড়িয়ে গিয়ে ঝোপে পড়লামপাইনের ঝোপ ভর্তি বড় বড় কাঁটা

ভাল খোঁচাই খেলামদুই ধারের পথ ভর্তি ঘন সতেজ ফার্ন -এর ঝোপ

রসালো লতাপাতা ভর্তি

হঠাৎ করেই অচেনা এক উপত্যাকার মধ্যে পড়লামপথের শেষ প্রান্ত থেকে

একটা মেয়ে হেঁটে আসছিল

মেয়েটার হাঁটে একটা কাস্তে,ঘাস কাটছিল হয়তোতার নাকে আর কানে অদ্ভুত

রকমের রিঙতার দুই হাত ভর্তি বালানড়াচড়া করলেই রিনিঝিনি

শব্দ করছিলযেন বালাগুলো নিজেদের মধ্যে কথা বলছে

'নদীটা কত দূরে জানেন ?' জানতে চাইলাম

মেয়েটা সম্ভবত নদীতে আগে কখনই যায়নিবা মনে মনে অন্য কোন কিছু ভাবছিল

কারন বিন্দুমাত্র চিন্তা না করেই বলল-' বিশ মাইল'

আমি হেসে নিজের পথ ধরলাম

মাথার উপর দিয়ে নীল সবুজ পালকের এক তোতাপাখী উড়ে গেল

পথের এক পাশ দিয়ে ছোট্ট একটা ঝর্ণা ঝিরিঝির করে বয়ে যাচ্ছিল

থেমে জল খেলাম বেশ খানিকটা

বেশ ঠাণ্ডা আর খনিজ ঘ্রান আছেমুহূর্তেই চাঙ্গা হয়ে উঠলাম

কিন্তু খানিক পরেই আবার তেষ্টা পেলসূর্যটা পাহাড়ের এক পাশে লটকে আছে

পাথুরে পথ গরম হয়ে গেছেপায়ের তলা পুড়ে যাচ্ছিল

তারপরও আমার ধারনা ঠিকই পৌঁছে যেতে পারবমাত্র তো একঘণ্টা হেঁটেছি

পথের সামনেই একটা ছোট্ট ছেলেকে দেখলাম কয়েকটা ছাগল ছড়াচ্ছে

'নদীটা কতটুকু দূরে ?' জানতে চাইলাম

 রাখাল ছেলেটা হেসে বলল;'বেশি দূরে নাসামনের পাহাড়টা পার হয়ে গেলেই নীচে ওটা'

খিদে পেয়েছিলপ্যাকেট খুলে পাউরুটি বের করে সমান ভাগ করে অর্ধেক সেই ছেলেটাকে দিলাম

পাহাড়ের গোড়ায় বসে চুপচাপ খাওয়া শেষ করলাম

খাওয়া শেষ করে আমরা এক সাথেই হাঁটতে লাগলামআর লাগাতার কথা বলতে লাগলাম

কথা আর কথা

এক সময় ছেলেটা আমাকে রেখে বিদায় নিলবাকি রাস্তা আমাকে একা যেতে হবে

অচেনা

অচেনা পাহাড়ি পথের চারিদিকে তাকালাম

উঁচু পাহাড়ের জন্য আমার বাড়ি কোথায় সেটা বুঝতে পারছিলাম নাআর নদীরও

কোন নাম গন্ধ নেইবড্ড মুশকিলে পড়লামসঙ্গে কেউ থাকলে হয়তো ফিরে যেতাম

কিন্তু একা

এখন বাড়ি ফিরে যাবার কোন মানে হয় নাঅর্ধেকের বেশি পথ চলে এসেছিনদী না দেখে যদি ফিরে যাই তবে সারাজীবন মনে মনে খানিক লজ্জা বোধ কাজ করবে

হাঁটতেই লাগলাম

পাথরের তৈরি কয়েকটা কুঁড়ে ঘর আর আবাদি জমি পার হলাম হেঁটে

যেতেই লাগলাম, যেতেই লাগলাম

এক সময় এমন একটা জায়গায় গেলাম যেখানে কোন কুঁড়ে ঘর নেইআবাদি জমি নেই

শুধু জঙ্গলরোদ আর নিসঙ্গতা ।  ছম ছম দুপুর

কোন মানুষজন নেইমানুষ জন আছে বা ছিল তেমন কিছুর প্রমান নেই

শুধু গাছ, পাথর, ঘাস আর বুনো ফুলআর সুনসান নির্জনতা

এমন নির্জনতা আগে পরে আর পাইনিআকাশটা বড্ড বেশি নীলসবুজ ঘাসের উপর ঝুলে

আছে ওটা

সামনের বড় একটা বাঁক পার হতেই নদীর কলকল শব্দ পেলাম

আনন্দে আর বিহবলতায় পাগলের মত দৌড় দিলাম

যতক্ষণ পযন্ত পায়ে বরফের মত ঠাণ্ডা জলের ছোঁয়া না পেলাম ততক্ষণ পযন্ত দৌড় থামালাম না

নদীর জল ছিল নীল- পরিষ্কার আর অপূর্ব

(শেষ)

 রাস্কিন বন্ড- এর   How Far Is The River ? এর ছায়া অবলম্বনে

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...