সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমার যত গাছ গাছালি

 ছোটবেলার কথা মনে হলেই গাছের কথা মনে হয় আমারআম, লিচু,কাঁঠাল, পেয়ারা, লেবু এই গাছগুলো আমার শৈশবের সাথে জড়িয়ে আছে

গাছগুলো সবাই দাঁড়িয়ে  যেন তাকিয়ে থাকে  আমার দিকেবৃষ্টি না হলে ওদের পাতাগুলো কেমন ফ্যাকাসে হয়ে যায়জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই অনেক গাছ পালা দেখতে পেতামজানালার পাশে বসেই  তোআমার বেশির ভাগ লেখা লেখির কাজগুলো করি

বাইরে তাকালেই গাছেরা মনে করিয়ে দেয় ,ওরা ওখানেই আছেআমাকে ছেড়ে চলে যায়নি

দেহরা নামে একটা জায়গায় থাকতাম ছোটবেলায়

বেশ গাছ গাছালি ভরা জায়গাদাদুর বাড়ি ভর্তি ছিল আম, নিম, পেপে, কাঁঠাল আর পুরানো বট গাছ

কিছু গাছের চারা দাদু নিজের হাঁতে বুনেছিল আর আমার সাথেই বেড়ে উঠেছিলঠিক আমার ভাইয়ের মত

দুই ধরনের গাছ আমার ভাল লাগতোএক, যেই গাছগুলোতে বেয়ে উঠা যায়আর দুই, যেই সব গাছ বেশ ফল টল দেয়

কাঁঠাল গাছ এই দিক দিয়ে সেরা।  দুটো যোগ্যতাই  ওর আছে

কাঁঠাল আমার প্রিয় ফল নাতবে সবজী হিসাবে রান্না করলে ভাল লাগেগাছটা বেশ বড়পাতা আছে প্রচুরআর সহজেই বেয়ে উঠা যায়

গরমের দুপুরে পিপুল গাছের ছায়া সবচেয়ে সেরাবাতাস এলেই পাতাগুলো কেমন যেন শন শন শব্দ করেখুব কম বাতাসেও পাতাগুলো নড়তোইনডিয়ার প্রায় সব গ্রামেই পিপুল গাছ একটা হলেও থাকতোদিনের শেষে ওটার তলায় বসে কেউ না কেউ আড্ডা দিত

বাগানের বট গাছের কথা আগেও একবার বলেছি

ওটার বয়স আমাদের শহরের বয়সের সমানএকদম বুড়োকতদিন বট গাছের উপর উঠে ওটার সবুজ ঘন পাতার আড়ালে লুকিয়ে ছিলামওখান থেকে লুকিয়ে থেকে সারা দুনিয়ার উপর নজর রাখা যেতো

বট গাছ নিজেই একটা পৃথিবী

এটার শাখায় পাতায় আর ডালে কত রকমের পোকা মাকড় আর পাখ পাখালি থাকে বলার মত নাকত রকমের প্রজাপতি এসে ডিম পাড়ে বট গাছের পাতায়

একটা মৌসুমে বট গাছটা তো একেবারে গান বাজনার আসর মনে হয়পাখী, পোকা , কাঠবিড়ালি সবাই হৈ চৈ করে

 খেলনা একটা বাঁশি থাকে আমার হাতেওটা   ফুঁ দিয়ে আমিও গোলমাল আরও বাড়াই

বট গাছে যে লাল রঙের ডুমুর হয় আগেও বলেছিমানুষ ওটা খেতে পারে নাকিন্তু ওটা খাওয়ার লোভে বুলবুলি, শালিক, কাক ,আর টিয়া পাখী এসে সারাক্ষণ চিৎকার চেঁচামেচি করে ঝগড়া করে

রাত হলেই বট গাছের পরিবেশ একদম নিঝুম হয়ে যায়কারন পাখ পাখালি সবাই বিশ্রামে গেছে, কিন্তু ফ্যাপ ফ্যাপ করে ডানা ঝাপতে উড়ে আসে বাদুড়সারারাত এই বাদুর বাবাজিরা বট গাছের ফল কুড়মুড় করে চিবিয়ে খায় আর

ডানা ঝাপটে বিচ্ছিরি শব্দ করে

আমার প্রিয় একটা গাছ ছিল জাম গাছঅনেকে জাভা পাম বলতোকালো কুচকুচে ফল ভেতরটা অদ্ভুত বেগুনি আর গোলাপি মেশানো এক রঙবৃষ্টির মৌসুমে ফলটা পাকতো

বাগানের মালির ছেলেটাকে নিয়ে গাছে চড়ে যেতামমুঠো মুঠো জাম খেতামখেতেই থাকতামখেতেই থাকতামএক সময় আমদের মুখ , ঠোঁট ,গাল আর জিভ বিচ্ছিরি কালচে বেগুনি রঙের হয়ে যেত

একত্রিশ থেকে উনচল্লিশ বছর সময়টা আমি দেরাদুন জেলার মউসুরিতে কাটিয়েছিলাম

হিমালয় পাহাড় থেকে আমার বাসার দূরত্ব ছিল মাত্র সাত হাজার ফুট বসার ঘরে একটা বিশাল জানালা ছিল খুলে বাইরে তাকালেই চোখ পড়ত ঘন অরন্যের ছায়া, ওরা আসলে সব সময়ই আমার আশে পাশেই ছিল

 আখরোট গাছটার কথা না বললে খারাপ দেখাবেএটা এমন ভাবে হাত পা ছেড়ে দাঁড়িয়ে ছিল যে সারা মৌসুমেই দেখা যেত ওকেশীত এলে ওর পাতা খসে গিয়ে একেবারে ফকির হয়ে যেত

মোটা ডালা পালাগুলো দেখতে যামিনী রায়ের আঁকা ছবির মহিলাদের হাতের মত লাগতোবসন্তে প্রত্যেকটা ডালায় কচি নরম সবুজ পাতা গজাত আবারগরমের মাঝাঁমাঝিতে গাছটা পাতায় একেবারে গিজগিজ করতোতারপরই

সবুজ একটা জ্যকেট পড়ে আখরোটের জন্ম হতো

ফলটা ধীরে ধীরে পাকতো

খোসার ভেতরে পাকা ফলটা দেখতে হুবহু মানুষের মগজের মতএই জন্যই তো পুরানো দিনের বৈদ্যরা মাথা ব্যাথা হলে আখরোট খেতে বলতো

পাশের পাহাড় ভর্তি ছিল পাইন গাছের সারিহিমালয়ের বিখ্যাত নীলচে পাইন গাছ

মাঝে মাঝে ওখানে বসতামশন শন পাতার শব্দে ঘোর লেগে যেত

মাঝরাতে কামরার জানালা খুলে দিতাম কখনও কখনও পিগমি প্যাঁচা ছিল এক রকমখুব ছোটওদের ডাক শুনতে পেতাম,শুনতে পেতাম হরিণের চিৎকারসেই শব্দে চিতাবাঘের মনে লোভ জাগতো

 

 

রাতের কিছু কিছু শব্দ ঠিক চিনতে পারতাম না

এখন জানি সেইগুলো আসলে রাতের নিজস্ব শব্দরাতের বেলা গাছ পালা মানুষের মত  নড়াচড়া করেওদের ডাল পালার হাত আর পাতার আঙ্গুল নাড়াচাড়া করে গহীন রাতেখস খস শব্দ হয় রাতের বাতাসে

আর মাঝে মাঝেই কোন কারন ছাড়াই পরিবেশটা একদম সুনসান হয়ে যেত

তার ঠিক  খানিক পরই চাঁদ উঠতো আকাশে

জঙ্গল আর আকাশের মাঝাঁমাঝি ঝুলে থাকতো  হলদে  সোনালী চাঁদটা

 যারা সারা জীবন শহরে থাকে তারাও দুটো গাছ পছন্দ না করে পারবে নাশাল আর মহুয়াএই দুই গাছ অরন্য প্রকৃতিকে মাতাল বানিয়ে রাখেশাল গাছ শহরেও জন্মায়কিন্তু একা নিঃসঙ্গ একটা শাল গাছ আর কি করতে পারে ?

কিছু নাওরা এক সঙ্গে বিশাল দল বল নিয়ে থাকলে সুখে থাকে

দক্ষিণ আর মধ্য ভারতের বনভূমি জুড়ে আছে এই শাল গাছের দঙ্গলকাঠের জন্য এই গাছ বিখ্যাতদামি গাছসেটা বড় কথা নাএর বাকলে আঘাত করলে কষ বের হয়ওটাই রজনপুড়িয়ে ধূপ দেয়া হয় সন্ধ্যা বেলায়

হিন্দুদের পূজা অর্চনা ধূপ ছাড়া হয় নাকি ?

জেলেরা নৌকার তলায় আচ্ছা মত রজন ঘষেনৌকার ফুটো বন্ধ করার জন্যদুই তক্তার মাঝের ফাটল জোড়া দেয়ার জন্যবড় বড় আর উজ্জল শালপাতা গুলো যে ফালতু জিনিস সেটা ভেবো না

বিহারের সাঁওতালরা শালপাতায় খাবার খায়এমন কি ওগুলো দিয়ে কায়দা করে পেয়ালাও বানায়

একটা পাতার সাথে আরেকটা সুন্দর করে জোড়া দিলেই ভাত আর ডাল মেখে খাওয়া যায়

ডেয়ো পিঁপড়েদের দেখতাম এই শুকনো শাল পাতা যোগাড় করে নিয়ে নিজেদের জন্য বাসা  বানায়

ওখানে নিজেদের বাচ্চা কাচ্চা রাখে

শাল গাছে একটা পোকা পাবেইসেটা হল ঘুঘুরে পোকাঅনেকে উচিঙরে পোকা বলে

গরমের বা বৃষ্টির দিনগুলোতে বিচ্ছিরি শব্দ করে এই পোকা ডাকেএকগাদা ঘুঘুরে পোকা যখন এক সাথে ডাকে তখন বিরাট কেওয়াজ হয়সবাই আলাদা আলাদা শব্দে ডাকেবিচ্ছিরি লাগে

শাল গাছের সাথে গৌতম বুদ্ধের কিছু কাহিনি আছে

গৌতম বুদ্ধের জন্মের সময় উনার মা হাতের মুঠোয় করে শাল গাছের ডাল ধরে রেখেছিলেনতারপরই গৌতম বুদ্ধ পৃথিবীর আলো দেখেছিলেনগৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর শাল গাছের ফুল ঝিরিঝিরি করে ঝরে পড়ছিল যদিও সেটা

ফুলের মউসুম ছিল না

আর অনেক গুলো শালগাছ তার মৃতদেহের উপর ঝুঁকে ছায়া দিয়েছিল অকাতরে

আদিবাসীদের জীবনে জঙ্গলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ গাছ হচ্ছে মহুয়ামহুয়ার ফুল কাঁচা বা রান্না করে দুই ভাবেই খাওয়া যায়

মধ্য আর পশ্চিম ভারতের অনেক আদিবাসীই মহুয়া খেয়ে বেঁচে থাকেভাত ওদের কাছে  খুবই দুর্লভ

গরিব মানুষগুলো সারা বছরই মহুয়া খায়চাল পাবে কই ? মহুয়ার দানা পিষলে তেল বের হয়সেই তেল একদম ঘিয়ের মত- রান্নার কাজে লাগেআবার প্রদীপের জ্বালানী হিসাবেও ব্যবহার করা হয়শুধু তাই না

মহুয়ার তেল দিয়ে সাবানও বানায় ওরাগরমের শুরুতেই মহুয়া গাছের ফুল ফোটে

জঙ্গলের আদিবাসীদের ঘরে তখন ফসল থাকে নাকাজ থাকে নাওটা ঠিক চাষ বাসের

মৌসুমও নাগরমে কাজ করা যায় না মাঠে

মহুয়ার ফুল সংগ্রহ করা মস্ত বড় একটা কাজ হয়ে দাঁড়ায় সবার জন্য

গ্রামের সবাই দল বেঁধে বের হয়ে পড়ে মহুয়া যোগাড় করতে

মাঝে মাঝে গাছের গোঁড়ায় আগুন ধরিয়ে দেয় যাতে সহজে মহুয়া সংগ্রহ করতে পারে

মহিলারা বসে বসে ঢাউস সব ঝুড়ি বানায়ঝুড়ির মধ্যে বাচ্চা রেখে পিঠে বেঁধে নিত কায়দা করেতারপর মহুয়া কুঁড়াতে ছুটে যেত

এই দিনগুলো খুব বেশি দীর্ঘ হত নামাত্র পনের দিন

আদিবাসীরা সবাই তখন বনে বনে ঘোরেমহিলা,পুরুষ সবাই মহুয়া কুড়িয়ে নেয়এমন কি টলমল করে হাঁটতে শেখা পিচ্চি বাচ্চাগুলোও বাপ মায়ের সাথে সাথে যায়

একটু খোলা জায়গা পেলেই রোদে ফেলে মহুয়া শুকানো হয়

শুকিয়ে ছোট হয়ে যায় খানিক, আর সাদা রঙ থেকে হয়ে যায় বাদামী

এমনিতেই খাওয়া হয়, তবে কখনও কখনও শালের দানা আর সামান্য চাল দিয়ে রান্না হয়

মহুয়া প্রথমে সেব্ধ করা হয়সাথে শালের দানাওটা আগে থেকেই রোদে শুকিয়ে মচমচে ঝলসে রাখা হয়ওটাও সেব্ধ করা হয়সব শেষে সামান্য চাল দেয়া হয়বেশ কিছু বুনো জানোয়ারও মহুয়া বেশ পছন্দ করেযেমন, ভাল্লুক

কিন্তু কেউই গাছে উঠে মহুয়া সংগ্রহ করে নাঅপেক্ষা করে

রাতের বেলা ফুল ফোটেফুল ঝরে নীচে  জমে থাকে কার্পেটের মত

 

 

( রাস্কিন বন্ড এর-  Notes of My Favourite Trees এর ছায়া অবলম্বনে)


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...