সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বারান্দার ভূত

 অনিলের মা দারুন সব ভুতের গল্প জানেন।  

আমাদের সাথে দেখা হলেই  বেশ  সব গল্প  শুনিয়ে দেন। আমাদের কলজে শুকিয়ে যায় সেই গল্প শুনে। উনার গল্পের স্টক  অফুরন্ত।

এক সন্ধ্যায় অনিলের বাবা শহরের বাইরে   গেছে কি একটা কাজে। আমি আর কমল ওদের বাসায় নিমন্ত্রণ পেলাম।   বাজারের কাছেই দোতলা একটা বাড়িতে থাকতো অনিলরা। রাতে আমরা ওখানেই থাকব।

আমাদের পেয়ে অনিলের মা রাজ্যের সব ভূতের গল্পের ঝাঁপি খুলে বসলেন। বলতে লাগলেন  একটার পর একটা ভূতের গল্প।  তখন হল কি,  গল্প   বলার সময়  অনিলদের বাসার কাজের  ঝি বারান্দায় এসে দাঁড়াল। মাত্র স্নান করে এসেছে। চুল খোলা।

হ্যা রে, তোকে না কত বার বলেছি এই ভর সন্ধ্যায় বারান্দায় খোলা চুলে দাঁড়াবি না। চুল বেঁধে নিবি।অনিলের মা বললেন।

মাথায় এখনও তেল দেইনি  গিন্নি মা।বলল কাজের ঝি ।

আরে খোলা চুলে বারান্দায় আসলে ভুতে ধরবে তোকে। এই ধরনের ভূত তক্কে তক্কে থাকে। কোন মেয়ে খোলা চুলে বাইরে আসলেই  ধরে নিয়ে যায়।

হায় হায়।ভয়ে দ্রুত নিজের মাথার চুল খোপা করে নিল। লাফ দিয়ে  বারান্দা থেকে কামরার ভেতরে  চলে গেল। নিরাপদ জায়গায়।

কমল, আমি আর অনিল বিছানায় বসে ছিলাম। উলটোদিকের বিছানায় বসে ছিল কমলের মা। একদম  পাড়া গাঁয়ের  মানুষ উনি। এমন একটা   জায়গা থেকে এসেছে -ওখানের সবাই ভূত প্রেত আর আজগুবি জিনিস ভীষণ ভাবে বিশ্বাস করে।

আপনি কি ভূত দেখেছেন কাকি মা ?’ জানতে চাইলাম।

মাঝে মাঝে দেখি তো।বললেন অনিলের মা।দাঁড়াও একটা গল্প বলি। মথুরায় এক উর্দু  শিক্ষক ছিলেন। নিপাট ভাল মানুষ। তোমাদের বয়সের ছাত্রদের ক্লাস নিত। একটা ছোট ছেলে ছিল খুবই মেধাবী।

একদিন ক্লাস চলছিল। এক কোনে ছোট ছেলেটা বসা। শিক্ষক বললেন - ‘’এই অমুক তুমি  তমুক বইটা নিয়ে এসো তো।’’   

 

 বইয়ের আলমারি ছিল ক্লাস রুমের শেষ মাথায়। ছোট ছেলেটা ছিল খুব অলস। করল কি। নিজের বেঞ্চিতে বসেই হাত বাড়িয়ে দিল। সেই হাত  লম্বা হয়ে সোজা আলমারি থেকে বই নিয়ে শিক্ষক মহাশয়ের হাতে তুলে দিল।

 রুমের ভেতরে আর সব ছাত্র এই দৃশ্য দেখে ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ওই ছেলেটা আসলে ছিল ভূত। সব সময় খেলাধুলায় ফাস্ট হত।

ইশ, আমি যদি ভূত হতাম।আফসোস করল অনিল। ‘  ভলিবল খেলায় কত ভাল করতে পারতাম।

তারপর অনিলের মা শুরু করলেন আরেক ভূতের গল্প। এই ভূতের নাম মুঞ্জাই। খুব পাজি ভূত। পিপুল গাছের  উপরে  থাকে। নিঝুম জায়গায়।  গরুর গাড়ি বা সাইকেল নিয়ে গঞ্জের পথ থেকে ফেরার সময়  এই গাছের তলায় এলেই ভূতটা গরুর গাড়ি আর সাইকেল উল্টে ফেলে দেয়।

 

একবার নাকি বাস ও ফেলে দিয়েছিল।

রাতের বেলা পিপুল গাছের তলা দিয়ে আসার সময় সাবধান।আমাদের সতর্ক করে দিলেন  অনিলের মা। ভুলেও হাই তুলবে  না। যদি ভুলে দিয়ে ফেল তবে মুখের সামনে হাত  তুলে মুখ চাপা দেবে। যদি ভুলে যাও তবেই শেষ।  মুঞ্জাই তোমার   গলার ভেতরে ঢুকে যাবে। গাছের উপর তুলে ফেলে দেবে। জান নিয়ে টানাটানি।

এই সব কাহিনি থেকে  বাঁচার জন্য প্রসঙ্গ বদলানোর দরকার। কমল বলল , ওর কোন এক বন্ধুর বিছানার তলায় নাকি সাপ পাওয়া গেছে একদিন   সকালে।

সাপটাকে মেরে ফেলছিল তোমার বন্ধু।’  আগ্রহের সাথে জানতে চাইলেন   অনিলের মা।

নাহ। পালিয়ে গেছে।কমল জবাব দিল।

ভাগ্য ভাল সকাল সকাল দেখেছিলে। কিছু না করলে সাপ কামড় দেয় না।

রাত এগারটা বেজে গেল।

 

রাতের খাওয়া শেষ করে আরেক দফা ভূতের গল্প  শুনলাম অনিলের মায়ের মুখে। এমনকি এও শুনলাম অনিলের  মৃত  ঠাকুর মায়ের আত্মা ও নাকি এই বাসায় ঘুরাঘুরি করে। বারান্দায় দেখা যায় বুড়িকে।

 

 

গল্প শুনে কেমন যেন লাগছিল।  

 

এর মধ্যে আমার   আর কমলের ঘুমানোর জন্য আলাদা একটা কামরা  দেয়া হয়েছিল। সেটা একদম বারান্দার সাথেই। অনিলের মা বললেন , ভয় পেলে আমরা যেন শিবের নাম নেই। শিব হচ্ছে হিন্দুদের তিন জন প্রধান দেবতার একজন। ভদ্রলোক বেশ গুরুত্বপূর্ণ দেবতা।  

আমাদের কামরায় গিয়ে শোয়ায় সাথে সাথে কেমন বিচিত্র অনুভুতি হতে লাগল।

চারিদিকে বিদঘুঁটে কালো ছায়া ।    পরিবেশটা কেমন যেন । কমল পাশেই।  ভয় পাওয়া চেহারা। ওকে চাঙ্গা করার জন্য গান গাইতে  শুরু করলাম আস্তে আস্তে।  অনিলের মায়ের বর্ণনা  করা সব গল্প মনে পড়তে লাগল একে একে।

উফ কি মুশকিল।

হঠাৎ করেই আমাদের পিলে চমকে গেল। কে যেন দরজা ধাক্কা দিচ্ছে।  শব্দ শুনে বুঝলাম অনিল আর ওদের বাড়ির ঝি দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। খুলে দেখি ওদের চেহারা শুকনো আর ফ্যাকাসে।  কেমন চিমসে মেরে গেছে ।  অনিলের মায়ের গল্প ভালই  কাজ করছে  সবার  মনে।

তোরা ঠিক আছিস ?’ ঢোক গিলে বলল অনিল। ইয়ে, মানে...  চল না আমার সাথে এক ঘরে ঘুমাবি  । ওটা বেশি নিরাপদ। আমাদের ঝি  মুলিয়া তোদের বিছানা পাতি নিয়ে গিয়ে বিছিয়ে দেবে আমার রুমে। যাবি ?’

আরে না না। আমরা ঠিক আছি।প্রতিবাদ করলাম আমি আর কমল।

 একটু ভাব দেখালাম।  মরে গেলেও স্বীকার করব না যে ভয় পেয়েছি। কিন্তু সাথে সাথেই অনিলের কামরায় চলে গেলাম। বেঁচে গেলাম যেন।

 

মনে হচ্ছিল রাজ্যের সব ভূত বারান্দায় আমাদের জন্যই  দাঁড়িয়ে আছে। মুলিয়া আমাদের বিছানা এনে দিল অনিলের রুমে।

 

বাকি রাত এক সাথে ঘুমাব। ভয় নেই। এত কিছু যখন হচ্ছিল তখন অনিলের মা মানে আমাদের কাকিমা কিছুই জানেন না। কে জানত উনি দোতলায় আমাদের খোঁজেই আসবেন ? এবং সোজা আমাদের রুমে যাবেন ?

 খানিক পর উনার চিৎকার শুনলাম পাশের রুমে হায় ভগবান রাস্কিন আর কমল অদৃশ্য হয়ে গেছে । ওদের বিছানা দুটো পযন্ত  ভূতে নিয়ে গেছে রে।’  

দৌড়ে  বের  হল । বের হয়েই দেখল   বারান্দায়  কতগুলো পা ঝুলে আছে। শরীর নেই। ভয়ে চিৎকার করে  অনিলের মা জ্ঞান হারালো।   

 

   বারন্দায় কাপড় শুকানোর  জায়গায় আমাদের পায়জামা ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। উনি  জানবে কেমন করে ?

আর এর পরে থেকে অনিলের মা আমাদের ভূতের গল্প বলতো না। কক্ষনই না।

( রাস্কিন বন্ড এর - Ghosts on the Verandah অবলম্বনে ।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিনি পয়সার বিপদ

  বৃষ্টি । গহন ঘন ঝুম বৃষ্টি । শ্রাবণ মাস । বৃষ্টির  মউসুম ।   যেই সময়ের যেটা ।     গত কয়েক  দশক ধরে  বৃষ্টি এত কম হয়  ,   আষাঢ় -   শ্রাবণ এই শব্দ দুটো বাঙালি ভুলে গেছে । বাংলা ক্যালেন্ডারে এই নামে দুটো  পাতা আছে। ব্যস - এই ।    যারা  আশির দশকের মানুষ ,   তারা জানতো এই দুই  মাসের  ইন্দ্রজালের প্রভাব  ।টানা একুশ দিন বৃষ্টি হয়েছে অমন রেকর্ডও আছে জলবায়ু দপ্তরে  , মানুষের  স্মৃতিতে । এই বছরের  বৃষ্টি       পুরানো তামার পয়সার মত মানুষদের  মনে  ভেজা স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে  । গাড়ি চালাচ্ছেন দিলদার খান ।  পুলিশের লোক  , এস আই। পিছনের সিটে ঘুম ঘুম চোখে বসে আছে কনস্টেবল  ইব্রাহীম খলিল । সাধারণত খলিল গাড়ি চালায় । আজ বৃষ্টির তোড় এত বেশি ,   কী   মনে করে ওকে পিছনে বসিয়ে স্যার নিজেই চালাচ্ছে । মনে মনে বিরক্ত  খলিল । রাত বারোটায় শিফট শেষ হবে। কোথায় থানায় বসে চা খাবে। বাদামের খোসা ঠুস ঠাশ করে ভেঙ্গে  মুখে দেবে ।  সহকারী কনস...

অদ্ভুত সব টিনের কৌটা

অনেক গুলো   বছর   আগে    টিনের   এক    কৌটা   পেয়েছিলাম ।     ক্রিসমাসের   উপহার   ।   অবাক   হয়েছিলাম   দেখে   ।   একি আজব চিজ। সুভেনিয়র   মনে   হলেও  ,   খুলে   দেখি ,   ভেতরে   মসলা   দেয়া   খোসা ছড়ানো  ঝিনুক ।   এত   সুন্দর   দেখতে  , বলার   মত   না   ।    আর   হ্যাঁ  ,   তক্ষুনি   খেয়ে   ফেলতে   হবে   না ।   মোট   পাঁচ   বছর   রাখা   যাবে  ! কোন   তাড়া   নেই   ।     হায়   হায়  ! ভেবে   অবাক । মানুষ   কেমন   করে   এই   কায়দা   আবিস্কার   করল  ? মানে   খাবার   সংরক্ষণের   এই   কায়দা  ? খোঁজ   নিলাম   ভাল   করে    ।   নাহ  ,   এর   ইতিহাস   অনেক   প্রাচীন ।     সেই   গুহাযুগেই ...

সরাইখানার গোলমাল

  সরাইখানার   গোলমাল   আসে   কানে , ঘরের   সার্সি   বাজে   তাহাদের   গানে , পর্দা   যে   উড়ে   যায় তাদের   হাসির   ঝড়ের   আঘাতে   হায় ! - মদের   পাত্র   গিয়েছে   কবে   যে   ভেঙে ! আজও   মন   ওঠে   রেঙে দিলদারদের   দরাজ   গলায়   রবে , সরায়ের   উৎসবে ! ---------- জীবনানন্দ   দাশ       খাবার রান্না করা আর   পরিবেশন ের জায়গা ,   দুটোই  সমান  গুরুত্বপূর্ণ।   খাবারের স্বাদ , খদ্দেরের রুচি   আর ব্যবসা এই  তিনটের  জন্য হাই স্কিল লোক রাখা দরকার। যারা কাজটা জানে। ভাল সার্ভিস দিতে পারে। দক্ষ লোক আপনার লাগবেই।     খাবার বা পানীয় যে খানেই পরিবেশন হোক সেটাই - হসপিটালিটি বিভাগ। খদ্দেরের খুশির জন্যই বেশ খানিক ঝাঁ চকচকে পরিবেশ রাখতে হয়।   একই সাথে   ভাল কর্মী দরকার হবে আপনার। যারা  পরিশ্রম করতে পারে। হাসিখুশি। নিয়ম মেনে চলে। এবং পরিছন্ন।  রয়েছে  শেখার আগ্রহ । ...