পিরামিড মামা, আমার আপন মামা না।
বন্ধু যজ্ঞিদাসের আপন মামা। উনার আসল নামটা বেশ বিচ্ছিরি রকমের বড়। নামটা ভাল না লাগায় উনার ছোটকা নাম বদলে পিরামিড রেখেছেন।
উনার আগের নামটা কেমন যেন কোলকাতার বাবুদের নাম মনে হয়। তাছাড়া উচ্চারন করাও বেশ ঝক্কির। কিন্তু পিরামিড নামটা বেশ আন্তজাতিক। বিশ্বের বিস্ময়। সবাই অবাক হয়- হায় হায় অমন নাম কেন ?
তখন ব্যাখ্যা দেয়া যায়। এই ব্যাখ্যা দেয়ার কাজটা পিরামিড মামা বেশ পছন্দ করেন।
তবে আমরা উনাকে কুট্টি মামাও বলতাম। মানে ছোট মামা। উনি বন বিভাগে চাকরি করেন। বন বিভাগে চাকরি কাজটা যে বেশ মজার সেটা কে না জানে। কুট্টি মামার ভাব সাব দেখেই বুঝা যেত। বছরের বেশির ভাগ সময় উনি গায়েব হয়ে থাকেন। ছয় মাসে একবার বাসায় আসেন। পূজার আগে বা ভাইফোঁটার সময়।বা শীতের শুরুতে। বা বর্ষার আগে।
পেল্লাই এক সুটকেস নিয়ে নামেন। পাড়ার সবাই গলা বাড়িয়ে উনাকে দেখে। কারও দিকে না তাকিয়ে গটমট করে গিয়ে ঢুকে পড়েন অন্দরমহলে। টানা পনের বা কুড়ি দিন থাকেন। পড়ে পড়ে ঘুমান। ইচ্ছে মত খাওয়াদাওয়া করেন। আলুর পোস্ত দম, গাওয়া ঘিয়ে ভাঁজা লুচি, বউ বাজারের পাঁঠার ঝাঁল ঝাঁল মাংস, লক্ষ্মী বিলাস চালের সাদা ভাত, কৈ মাছের পাতুরি, টেংরা মাছের টক, লাল মুলার সালাদ, শালগমের আচার , লাউ পাতায় মোড়া ভাপা শর্ষে ইলিশ।
কত বলব ? খাওয়ার কি শেষ আছে নাকি ?
দুপুরে কুট্টি মামা ঘুমান। বা বিদেশী বই পড়েন। যেটাকে ক্লাসিক সাহিত্য না কি যেন বলতেন উনি। পেল্লাই সব কাগজের বই। পেপার ব্যাক বলে। উপরে পেঙ্গুইনের ছবি। পেঙ্গুইন প্রকাশনী বই আর কি। এই সব বই দেখলেই লোভ লাগে।
মনে হয় -আহা, ইংরেজি জানলে কত হাজারে বিজারে বই পড়া যেত !
কিন্তু আমরা অত ভাল ইংরেজি কেউই জানি না। আমরা বাধ্য হয়ে দস্যু হীরকবাহন আর গোয়েন্দা বাজপাখি কিসিমের সিরিজের বই পড়ি।
সন্ধ্যার পর কুট্টি মামা ছাদে গিয়ে বসেন।
বড় দেখে একটা শীতল পাটি বিছান হয় ছাদে। কাচের নীল পেয়ালাতে করে এক পেয়ালা জাফলঙের চা খান সেই সময়। সাথে ছাপা সন্দেশ। আর আমাদের সাথে গল্প করেন। সবই বনের গল্প। কুট্টি মামার ভাঁড়ারে গল্পের শেষ নেই। মনে হয় সারা দুনিয়ার জঙ্গলের গল্প জানেন মামা।
উনার গল্প শুনে আমাদের মন কেমন উসকো খুসকো হয়ে যায়। চোখের সামনে ভেসে উঠে- দূরের ঘন সবুজ বন। পুরানো সব গাছ পালা ঠাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শীতের মউসুমে বাদামী বিস্কুটের মত রঙ হয়ে ঝরে পড়ে গাছের পাতাগুলো। শীতের শিশিরে ভিজে সকালের স্নান সেরে নেয় বনের গাছপালা। তারপর সারদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রোদ পোহায়।
লাল টালির একটা বাংলোতে থাকেন কুট্টি মামা। রাতের বেলা বাইরে আগুন জ্বালিয়ে বসে পাহারা দেয় দারোয়ান। দুই একটা মহুয়ার ফল খায় মুখে পুরে। কখনো বন থেকে নিয়ে আসে কাঠ বাদাম , অনেকে বাক্স বাদাম বলে। মেরুন রঙের ফলের ভেতরে লাল ভেলভেটের মধ্যে বাদামগুলো ঘুমিয়ে থাকে।
ফাঁদ পেতে ধরে তুলতুলে খরগোশ।
জঙ্গলের জীবন কত সুন্দর !
পাহাড় থেকে বন মোরগের ঝাঁক নেমে আসে পোকা খাবার লোভে। জাল পেতে ধরা হয় নাস্টারসিয়াম ফুলের মত টকটকে লাল বনমোরগ। সুগন্ধি লতাগুল্ম দিয়ে পোড়ালে অপূর্ব স্বাদ হয় সেই মোরগের । বাঁশের ভেতরে চিকন চাল আর মাংসের টুকরো ভরে আগুনে ঝলসে নিলে বিচিত্র স্বাদের একটা পোলাও হয়ে যায়। পাওয়া যায় কত রকম বুনো সবজি ।
কখনো পাহাড় থেকে নেমে আসে কালো রঙের হাতি। ফসল নষ্ট করে ফেলে ওরা। টিনের ক্যানেস্তেরা পিটিয়ে ভয় দেখিয়ে তাড়াতে হয় সেই হাতির পাল। রাত জেগে পাহারা দিতে হয় ফসল বাঁচানোর জন্য ।
কুট্টি মামার মুখে গল্প শুনে আমরা ঠিক করি, বড় হয়ে ফরেস্ট অফিসার হব। সারা দুনিয়ার বন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে পারব। স্নান করার সময় স্নানঘরের শার্সি দিয়ে বাইরে তাকালে দেখব দীঘল ঘাসের বনে দাঁড়িয়ে আছে চিত্রা হরিণ। বারান্দায় ঝুমকো লতার সাথে দোল খাচ্ছে গঙ্গা ফড়িং। হলুদ রঙের মায়াবী পাখি খড়কুটো দিয়ে বাসা বানায় বারান্দায়। থোকায় থোকায় ফুটে আছে কমলা, গোলাপি আর লাল রঙের লান্টানা ।
তারা জ্বলা রাতে খোলা ছাদে বসে কুট্টি মামার গল্প শুনছিলাম । কত দূর থেকে হিম হাওয়া দৌড়ে আসছিল ছাদের উপর । কেমন শীত শীত করছিল। আকাশ ভর্তি চুমকির মত তারা। কুট্টি মামার হাতে নীল কাচের পেয়ালা। কমলা রঙের চা।
‘বুঝলি , চাকরির প্রথম দিন । সেই বার গিয়েছিলাম তরাইয়ের জঙ্গলে।’ পেয়ালাতে চুমুক দিয়ে বললেন কুট্টি মামা। ‘ মাত্র পোস্টিং হয়েছে। প্রথম দিনেই ভাল লেগে গেল। বাংলোটা সুন্দর, ইংরেজরা বানিয়েছিল। ভেতরে একটা ফায়ারপ্লেস ও আছে। পাথরের ব্লক দিয়ে বানান। বারান্দায় বসে ভুট্টার সুপ খেয়ে হাঁটতে বের হলাম। সুপের মধ্যে আবার সেদ্ধ করা তিতির পাখির ডিম দেয়া। গোল মরিচের গুঁড়া দিয়ে খেতে বেশ লাগে।
বাইরে বাদামী ঝোপঝাড় ভর্তি আঁকাবাঁকা পথ।
খানিক দূরে দেখি ঘন ঝোপের নিচে তিনটে পেল্লাই বিড়াল ছানা। একদম উলের বলের মত। দেখেই চিনতে পারলাম। বনবিড়াল। ফরেস্ট ওয়াইল্ড ক্যাট। বনের ভেতরে থাকে। একদম বাঘের মত দেখতে। এরা গাছে চড়তে পারে তরতর করে। এক গাছের ডাল থেকে অন্য গাছে লাফ দিয়ে যেতে পারে। ইঁদুর, খরগোশ, ছোট পাখি এই সব শিকার করে খায়। এদের চামড়া দেখতে সুন্দর তাই অনেক দেশেই ওদের শিকার করা হয়। চামড়া দিয়ে রাশিয়ায় মেয়েদের ব্যাগ বানায়। প্রকৃতির অপূর্ব এক প্রাণী এই বনবিড়াল।
দারুন লাগে আমার।
সামনে এগিয়ে গেলাম।ভাল মত আদর করলাম সব কয়টাকে । একটার মাথায় চাটি মেরে দিলাম।
চেয়ে দেখি মাথায় লাকড়ির বোঝা নিয়ে একজন বুড়ো মত লোক হেঁটে আসছে। আমাকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো পানতুয়ার মত বড় বড় হয়ে গেছে।
“বিড়ালের বাচ্চাগুলো দেখতে একদম বাঘের বাচ্চার মত তাই না ?” লোকটার দিকে চেয়ে হেসে বললাম।
বুড়ো লোকটা ঢোক গিলে বলল- “ সাহেব ওগুলো বিড়ালের বাচ্চা না। বাঘের বাচ্চা।মা বাঘটা আশে পাশেই আছে। এসে পড়বে যে কোন সময়। ’’
কথা শেষ হতেই লাকড়ির বোঝা ফেলে চোঁ চোঁ করে দৌড় দিল। বাধ্য হয়ে আমিও দৌড় দিলাম। তারপর কি হল সেটা বলার দরকার দেখি না। আপাতত নিচে গিয়ে ফুলকপির বড়া পাঠিয়ে দিতে বল দেখি।’
আচমকা গল্প শেষ হতেই আমরা যার পর নাই বিরক্ত হলাম।
আশা করেছিলাম দারুন চোস্ত একটা গল্প হবে।
কিন্তু গল্পের বাকি অংশ আমরা জীবনেও শুনিনি।
.jpg)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন